| 2 মার্চ 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প ধারাবাহিক

অসমিয়া উপন্যাস: গোঁসাই মা (পর্ব-১২) । নিরুপমা বরগোহাঞি

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Nirupama Borgohainঅভিযাত্রী’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি বিজেতা নিরুপমা বরগোহাঞি ১৯৩২ সনে গুয়াহাটি শহরে জন্মগ্রহণ করেন।১৯৫৪ সনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ এবং ১৯৬৫ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসমিয়া সাহিত্যে এম এ পাশ করেন। লেখিকার প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে ‘সেই নদী নিরবধি’, ‘এজন বুড়া মানুষ’, ‘এপারর ঘর সিপারর ঘর’ সহ মোট একুশটি উপন্যাস এবং ‘সতী’, ‘নিরুপমা বরগোহাঞির শ্রেষ্ঠ গল্প’ইত্যাদি দশটি গল্প সংকলন রয়েছে।


দ্বিতীয় খণ্ড -তিন

রুণীহয়তো আরও কী সব বলতো– কিন্তু মায়ের মাঝখানে বাধা প্রদান তার কথার স্রোত বন্ধ করে দিল।

শ্রীমতী গোস্বামী অত্যন্ত ক্লান্ত স্বরে বললেন–’ আজকাল আর ঘরে বাইরে কোথাও শান্তি রইল না, সব জায়গাতেই কেবল এই আন্দোলনের কথা, পুরুষ মহিলা, বুড়ো এটাই সকলের হরিনাম হয়ে উঠেছে। আমার কখনও কখনও এত ক্লান্ত লাগে, কোথায় যাব, কোথায় গিয়ে শান্তি পাব–’

রুণী হেসে ফেলল এবং বলল–’ অসমিয়ার এই চরম অস্তিত্বের সংকটের সময় মানুষ প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিচ্ছে, তুমি তোমার মানসিক শান্তিটুকু বিসর্জন দিতে পারবে না যখন তুমিও কিন্তু একজন বড় দেশদ্রোহী, মা!’

শ্রীমতী গোস্বামী মেয়ের এই কথায় কিছু না বলে তুমি চা খেতে লাগলেন এবং গোস্বামী টেবিল থেকে সরে গেলেন নিজের প্রতি এই করুণার ভাবটি নিয়ে যে – কারও স্বামী হওয়ার চেয়ে সন্তান হওয়াটা কত সৌভাগ্যের কথা!

শ্রীমতী গোস্বামীর মনের শান্তি সত্যিই নাই হয়ে গেছে। এই আন্দোলনের শুরুতে যখন বাড়িতে অপু এবং রুণী তর্ক-বিতর্ক করত তখনও তার মন অশান্ত হয়েছিল। ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার দিকে পিঠ দেখিয়ে এই সমস্ত কথায় মত্ত হয়ে পড়েছে, বাবাকে বললে মানুষটা এই সমস্ত কথায় গুরুত্ব না দিয়ে কেবল বাইরে বাইরে পালিয়ে বেড়াতে চায়। অপু এবং রুণীর কথাগুলি কানে গেলে তার অদ্ভুত ধরনের একটা ভয় বুকটাকে চেপে ধরতে চায়– তখন রুণী সবসময়ই বলত যে এই ধরনের আন্দোলন করলে বা সেই আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হলে মানুষের মধ্যে মারপিট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, অসমে থাকা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে থাকা সদ্ভাব হারিয়ে যাওয়ার ভয় রয়েছে। এরমধ্যে রুণী নিজের কথাগুলির সত‍্যতার যেন প্রমাণ পেয়েছে এই ধরনের আত্মপ্রসাদের মনোভাবে একদিন অপুকে বলেছিল–’ দেখ দাদা, আমি যে সমস্ত কথা আজ দুটো মাস চিৎকার করে বলছি আজ এই ২৯ নভেম্বরের ‘ নাগরিক’ কাগজেও লিখেছে, শোন শোন কী লিখেছে:.. একটি দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের পরিবেশ এই সমস্ত লোকদের তাদের অসৎ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সুযোগ করে দেবে এবং তার ফলে চিরকাল শান্তিময় এবং সাম্প্রদায়িকতার কলুষমুক্ত অসমে নতুন করে হিংসা-দ্বেষ এবং সাম্প্রদায়িকতার আমদানি হবে।’


আরো পড়ুন: অসমিয়া উপন্যাস: গোঁসাই মা (পর্ব-১১) । নিরুপমা বরগোহাঞি


শ্রীমতী গোস্বামী ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন যে এখন যে অবস্থা হয়েছে তার পরে তিনি তার ছেলে মেয়েদের কোনোমতেই শাসন করতে পারবেন না, কথা শোনাতে পারবেন না। কি পরিস্থিতিতে কিছু সচেতন মানুষের মুখেই কেবল এই কথা, অসমের অস্তিত্বের সংকটের কথা, ভোটার তালিকায় লক্ষ লক্ষ বিদেশির নাম থাকার কথা, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য কালগ্ৰাসে বিলুপ্ত করে খেলার কথা। ঘরে বাইরে সব জায়গাতেই বর্তমান এই সমস্ত কথা, কেউ যেন এত বছর ধরে শুয়ে থাকা অসমকে হঠাৎ জাগিয়ে দিল। এখন সমগ্র অসমের ছেলে-বুড়ো যুবক-যুবতি বুড়ি প্রত্যেকেই ভয়ংকরভাবে সচেতন হয়ে উঠেছে যে অসমের অস্তিত্ব ভীষণভাবে বিপন্ন । তাই নিজেকে বাঁচাতে হলে অসমিয়া জাতি একত্রিত হয়ে শেষ শরাইঘাটের রণে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। শ্রীমতী গোস্বামীর অবাক লাগে যে পাশের শইকীয়ার পরিবারের মুখেতো এই সমস্ত কথা খই ফোটার মত ফুটতে থাকে, কেবল তাই নয়, সমস্ত সামর্থ্য নিয়ে তিনি সব ধরনের কার্যসূচিতে যোগদান করেন এবং মুখে এক অতিশয় গুরু গম্ভীর ভাব ফুটিয়ে শ্রীমতী গোস্বামীকে বলেন যে আজ অসমের জনগন যে অহিংস গণতান্ত্রিক এবং শান্তিপূর্ণ নীতিতে বিদেশি বিতাড়ণ আন্দোলনে নেমে পড়েছে,তা দেখে মহাত্মা গান্ধী বেঁচে থাকলে আনন্দে তাঁর হৃদয় নেচে উঠত, পৃথিবীর কোথাও না হওয়া এই ধরনের এক শান্তিপূর্ণ আন্দোলন যে আজকের যুগেও হতে পারে সেই কথায় বিশ্বের সমস্ত মানুষই অবাক হয়েছে ….

এরকম অনেক কথাই শইকীয়ানী বলেন, অবশ্য এই সব পরবর্তী সময়ের কথা,রুণী এবং অপু তর্কাতর্কি করা অক্টোবর নভেম্বর মাস কবেই অতিক্রান্ত হয়ে গেছে আর এখন এপ্রিল মাস এসে পড়ল বলে।

আশ্চর্যের কথা যে শইকীয়ানী বলা কথাগুলি অপু ও রুণীর সঙ্গে তর্ক করার সময় বলে । অপুর প্রতি শ্রীমতী গোস্বামীর ভালোবাসাটা একটু বিশেষ ধরনের।রুণীর প্রতিও ভালোবাসা কম নয়, কিন্তু অপুর প্রতি যে বিশেষ ভালোবাসা, সেই বিশেষটুকুর উপাদান হল গভীর উদ্বেগবোধ এবং অন্তর জুড়ে থাকা এক ধরনের শঙ্কা, একটা অনিশ্চয়তা বোধ। নিপুকে হারানোর ফলে বোধহয় অন্য একটি পুত্রকে হারানোর একটা বোবা ভয়ের বীজ যেন তার অন্তরে অংকুর মেলতে চায়।

এখন রাজ্যটিতে এরকম একটি পরিস্থিতি হয়েছে– ইতিমধ্যে অপুর বয়সের কয়েকটি ছেলে আত্মাহুতি দিয়েছে, সেই ছেলেগুলি অপুর মতোই অসমের অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং তারপরে ওরা বিভিন্ন ধরনে মৃত্যুবরণ করেছে; সেই মৃত্যুর খবর গুলি পেয়ে শ্রীমতী গোস্বামীর চোখের সামনে ভেসে উঠে এক একটি মায়ের যন্ত্রণাদগ্ধ মুখ, সেই মায়েদের সঙ্গেতার কোনোদিনই দেখা হয়নি, তাই তাদের মুখগুলি তার কাছে অপরিচিত, কিন্তু তবুও সেই মুখগুলি তার কাছে পরিচিত, যন্ত্রণায় কান্নায় পুত্রকে আর কোনোদিন দেখা না পাওয়ার চরম নৈরাশ্য ভরা দুঃখে বিকৃত হওয়া মুখভঙ্গিই সেই মুখ গুলির বিশেষ আকৃতি, সেই মুখগুলির প্রত্যেকের চেহারা অবিকল এক, একদিন এই মুখ গুলির মতোই যন্ত্রণার রক্তাক্ত গর্ভ ঠেলে তারও অবিকল এক চেহারার মুখ একটির জন্ম হয়েছিল। তাই শ্রীমতী গোস্বামী কোনোদিন চোখে না দেখলেও মনের চোখে সেই প্রতিটি পুত্রহারা মাতার মুখেই দেখতে পান এবং অহরহ সেই মনের চোখের সামনে ঝুলে থাকা যন্ত্রণায় বিকৃত মুখগুলি এক অদ্ভুত বোবা ভয়ে তাঁর তার কেবল অন্তরই নয়, সমস্ত সত্তা অসার করে তোলে। কিন্তু এই সমস্ত কথা তিনি কাউকে বলতে পারেন না, মনের ভেতরে একাই ধড়ফড় করতে থাকেন এবং অপু পিকেটিং আন্দোলনের অন্য কার্যসূচিতে বেরিয়ে গিয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে থাকেন। একদিন তো তার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল– অপু পিকেটিংয়ে বেরিয়ে যাওয়ার এক ঘন্টা পরে দূর থেকে গুড়ুম গুড়ুম গুলির শব্দ ভেসে এসেছিল, বাড়িতে তখন কেউ ছিলনা এবং শ্রীমতী গোস্বামী পাগলের মতো বাইরে বেরিয়ে গিয়ে বাগানের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে পথ দিয়ে যাওয়া আসা করা দুই একটি ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিল–’ গুলির যে শব্দ শোনা যাচ্ছে সেটা কোথায়, পুলিশ কি পিকেটিংকারীদের উপর গুলি চালিয়েছে?’ স্বাভাবিক ভাবেই তাকে কেউ আশ্বাসবাণী শোনাতে পারছিল না– সবারই একই উত্তর–’ আমরা সেদিকে যাইনি, তাই কিছুই বলতে পারছি না…’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত