‘‘নদী ও নারী”-র কথা

কোনো চলচ্চিত্র বিষয়ে আলোচনায় উপন্যাসটিকে টানবার প্রয়োজন আছে কি ? প্রতিটি চলচ্চিত্রই তো একেকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ একক শিল্পসত্ত্বা। তবে এক্ষেত্রে কিছুটা প্রয়োজন দেখছি একারণে যে, হুমায়ুন কবীরের “নদী ও নারী” পূর্ব বাংলার গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসের একটি। ফলে উপন্যাসটির চলচ্চিত্রায়নে নির্মাতার সফলতার খতিয়ানে উপন্যাসটির প্রসঙ্গ আসতেই পারে। এছাড়া এটাও বোধ হয় প্রতিটি সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রেরই নিয়তি যে রসগ্রাহিতার আলোচনায় তাকে ওই বিশেষ উপন্যাস বা সাহিত্যকর্মটির প্রতিতুলনার মধ্য দিয়ে যেতেই হয়।

হুমায়ুন কবীরের (১৯০৬-১৯৬৯) সমসাময়িককালের অনেক ঔপন্যাসিকের উপন্যাসেই যখন উঠতি মধ্যবিত্তের  জীবনকাহিনী বর্ণিত হচ্ছে, কিম্বা অবক্ষয়ী সামন্ত সমাজের, তখন হুমায়ুন কবীর এমন এক বিরান চরের মানুষদের কাহিনী বেছে নিলেন যেখানে শ্রেণীগুলি গড়েই ওঠেনি তেমন। মানুষ ও প্রকৃতির আদি দ্বন্দ্বই যেখানে মুখ্য। আর সেই প্রকৃতির প্রতিনিধি হচ্ছে— পদ্মা নদী। মানুষের ভাগ্যের ক্ষেত্রে প্রায় নিয়তির মতই সেখানে পদ্মার সদা উপস্থিতি। প্রকৃতির সঙ্গে এই আদিম শক্তির দ্বন্দ্ব “নদী ও নারী” উপন্যাসটিকে শক্তি যুগিয়েছে । চলচ্চিত্রটিকেও।

গ্রামীন মুসলমান জীবনের পটভূমিতে বেশ কিছু উপন্যাস লিখেছিলেন মুসলমান সাহিত্যিকেরা- কাজী ইমদাদুল হক “আবদুল্লাহ”, নজিবর রহমান “আনোয়ারা”, শওকত ওসমান “জননী”, শহীদুল্লাহ্ কায়সার “সংশপ্তক”। আর বাংলা সাহিত্যে কিছু উপন্যাস লেখা হয়েছে যা একান্তভাবে নদীর্নিভর, যেখানে কোনো বিশেষ নদী ও তার পারের মানুষদের নিয়েই উপন্যাসটি আবর্তিত হয়েছে, যেসব উপন্যাসে সেই নদীটিই হয়ে উঠেছে যেন একটি জীবন্ত চরিত্র- আলাউদ্দিন আল আজাদের “কর্ণফুলী”, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র “কাঁদো নদী কাঁদো”, অদ্বৈত মল্ল- বর্মনের “তিতাস একটি নদীর নাম”, দেবেশ রায়ের “তিস্তা পারের বৃত্তান্ত”, বা মাণিকের “পদ্মা নদীর মাঝি”। তবে হুমায়ুন কবিরের “নদী ও নারী” উপন্যাসে দুঃখবাদী অদ্বৈত মল্লবর্মনের স্মৃতিমেদুর বেদনার তীব্রতা নেই, ওয়ালীউল্লাহ্র “কাঁদো নদী কাঁদো”-র আধুনিক ন্যারেটিভ বৈচিত্র্যও নেই, নেই মাণিকের “পদ্মা নদীর মঝি”-র মত সমাজচিত্র ও চরিত্রগুলি উপস্থাপনে সর্বাত্মক বলিষ্ঠতাও। বরং কিছু কিছু দিক দিয়ে এই উপন্যাসটি শামসুদ্দীন আবুল কালামের “কাশবনের কন্যা”-র, বেশ কাছাকাছি। তবে “কাশবনের কন্যা”-য় যেরকম মানব-মানবীর জীবনের শুধু রোমান্টিক দিকটির উপর জোর দেয়া হয়েছে, সেদিক থেকে হুমায়ুন কবীরের উপন্যাসটি সমাজচিত্র ও জীবনজিজ্ঞাসার প্রশ্নে আরো গভীরসন্ধানী। “নদী ও নারী” চলচ্চিত্রটি  নির্মাণের পটভূমি সম্পর্কে এ ছবির চিত্রনাট্যকার মুর্তজা বশীরের ভাষ্য হচ্ছে; “সাদেক খান নদী ও নারী-র পরিচালনা বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছিলেন, আমার আনেক দিনের বন্ধু, পঞ্চাশ দশক থেকে চিনি। সাদেক আমাকে হঠাৎ বললো যে সে ফিল্ম করবে- বাস্তবধর্মী, অনেকটা ফ্লাহার্টির কাজের মতো। তো সে আমাকে হুমায়ুন কবীরের “নদী ও নারী”-র পড়তে দিয়ে চিত্রনাট্য তৈরি করতে বললো, ’৬৩ সালের প্রথম দিকে – সিŒপ্ট লিখতে আমার বোধ হয় দু’মাসের মতো সময় লেগেছিল।’  মুর্তজা বশীর অবশ্য শুধুমাত্র “নদী ও নারী” চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার ছিলেন না, ছিলেন প্রধান সহকারী, শিল্পনির্দেশক ও সংলাপ রচয়িতাও। চিত্রনাট্যটি রচনার সময় উপন্যাসটি থেকে গ্রহণ-বর্জনের প্রশ্নে ওঁর বক্তব্য; “ফিল্মে পরিচালক গল্পের মূল সুর অক্ষুণœ রেখে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের স্বাধীনতা রাখেন। তো ‘নদী ও নারী’ করতে গিয়ে আমি মোটামুটি ফ্রীডম নিয়েছি। যেমন উপন্যাসে কুলসুম বলে যে চরিত্র ছিল, সেটি আর ফিল্মের কুলসুম চরিত্রটি কিন্তু এক না- নামটা শুধু ব্যবহার করা হয়েছিল, মাঝপথে চরিত্রটির মৃত্যু হয়। এটা ফিল্মের প্রয়োজনে করা হয়েছিল। কারণ, নদী যে কত ভয়ংকর এবং পদ্মা যে একটি সর্বনাশী নদী ওটা দেখানোর জন্য এটা অমাকে করতে হয়েছে। তাছাড়া এই ফিল্মে বেশ কিছু ঘটনা আছে যেমন বেশ্যাপল্লীতে যাওয়া ইত্যাদি অনেক কিছু যা মূল উপন্যাসে ছিল না। তবে উপন্যাসের শুরু এবং শেষ আর মাঝে বেশ কিছু মূল বই থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।”

তবে আমরা দেখব যে শুধুমাত্র উপন্যাসের কুলসুম চরিত্রটির ক্ষেত্রেই নয়, পরিবর্তন অন্য কিছু চরিত্রের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। যেমন উপন্যাসের আয়েষা (নজু মিয়ার মা), হতে পারত আরেক ইন্দির ঠাকরুণ- চলচ্চিত্রে প্রায় অনুল্লেখিত। অনুল্লেখিত বয়ে গেছে বলিষ্ঠ চরিত্র রহিম বখস্, কিম্বা বিয়েপাগলা হামদু বুড়োর চরিত্রটিও। উপন্যাসে বসিরের চরিত্রের যে ব্যাপকতা ছিল তাও সঙ্কুচিত। এসবই অবশ্য একজন চিত্রনির্মাতা বা চিত্রনাট্য রচয়িতার স্বাধীনতার মধ্যেই পড়ে, বিশেষ করে আমরা যদি মনে রাখি যে, চিত্রনাট্যটি উপন্যাসটির লেখক হুমায়ুন কবীর দ্বারা গৃহীত হওয়ার পরেই ছবিটির কাজ শুরু হয়।

তবে কিছু কিছু বিষয় রয়ে গিয়েছিল উপন্যাসটিতে যা আমার ধারণা চিত্রনাট্যে গ্রহণ করলে চলচ্চিত্রটি আরো সমৃদ্ধ হোত। যেমন দূর্ভিক্ষের এক সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে উপন্যাসটিতে। আষাঢ় মাস, বীজ বোনার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বর্ষার নামগন্ধ নেই। দুই-এক দিনের মধ্যে যদি বর্ষা না নামে, এবারও আকাল সুনিশ্চিত। এর আগের দু’বছরও প্রায় আকালই গেছে। আসগর মিয়া ভাবে; “যারা আজ চুরি করছে, তারাও এককালে গেরস্ত ছিল। নিজের জমিজমা চাষ করেছে, এখন অনটনে দিশে না পেয়ে পরের হাঁড়িতে হাত দিচ্ছে। তাদের বাড়ির বউ, বড়ির ছেলেমেয়ের দল বনেবাদাড়ে শাকপাতা খূঁজে বেড়াচ্ছে, বন জঙ্গলের ফলমূল যা পাচ্ছে, তাই হাতড়ে নিয়ে আসছে। তার কাছেও অনেকে এসেছিল কাজের জন্য, কিন্তু কি কাজ দেবে সে ? তারও তো সেই একই অবস্থা।”

আকালের বর্ণনায় রয়েছে;

“চাষীদের মধ্যে অনেকে তখন না পেরে গোয়ালের গাই, হালের বলদ জবাই করে ফেলে। বলে, নিজেদের খোরাক জোটে না, এদের দানাপানি দেব কোথা থেকে ? না খেয়ে ওরা মরবেই, তাই মিছামিছি কষ্ট না দিয়ে বরং ওদের গোস্ত খেয়ে নিজেরা দু’চার দিন বাঁচবো। খোদা যদি সুদিন দেয়, তবে গরু-বলদ আবার হবে। …………………………………….

এক মহাজন পদ্মাপার থেকে ধান বোঝাই নৌকা নিয়ে রওয়ানা দিয়েছিল। কিন্তু সে নৌকা ধুলদী পৌছায়নি, মহাজনের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। নৌকাশুদ্ধ মহাজন যে কোথায় মিলিয়ে গেল, কেউই জানে না। খালি সবাই লক্ষ্য করে যে, বড় গাঙের চরে যে লাঠিয়ালের দল থাকে, কিছু দিন পেট ভরে খেয়ে তারা বেশ  মোটাসোটা হয়ে উঠল। …………….

লোকে একবস্তা চালের জন্যে জমি বেচতে চায়, বাসন-কোসন বেচতে চায়, গাই-বলদ বেচতে চায়, জরু মেয়ে বেচতেও রাজী। বেচতে চায় সবাই, কিন্তু কিনবে কে ?”

নদী তথা প্রকৃতিনির্ভর পূর্ববাংলার কৃষক জীবনে ফসলের প্রাচুর্য্যরে বিপরীতেই যে আকাল-দূর্দিনের সদা উপস্থিতি, “নদী ও নারী” চলচ্চিত্রে বাস্তবচেতনার সেই মাত্রাটি অনুপস্থিত।

কিম্বা উপন্যাসে ওই যে সাবলীল চিন্তার অধিকারী নজু মিয়া পীরের আস্তানার কোরান পাঠরত তালেব এলেমটিকে জিজ্ঞেস করেছিল;

“কি পড়ছ ভাই?

ছেলেটি আশ্চর্য হয়ে বলল; কোরান পড়ছি, তাও বোঝেন না ?”

নজু বলল, মুখ্য সুখ্য মানুষ আমরা কোরান শরীফের কি জানি ? কি পড়ছ বল না ভাই ?

ছেলেটি আরো আশ্চর্য হয়ে জবাব দিল, কেন এই তো বললাম যে কোরান পড়ছি আবার জিজ্ঞাস করছেন কেন ?

নজু মিয়া বলল, হ্যাঁ ভাই, কোরান যে পড়ছ তো বুঝলাম, কিন্তু আমি জাহেল পাড়াগাঁয়ের মানুষ, আমি তো কোরানের অর্থ বুঝতে পারি না। যে সুরা পড়ছ, তার মানে বুঝিয়ে দাও না ভাই।

ছেলেটি বলল, মানে, কোরান শরীফের মানে? খোদার কালাম পড়ছি, হেফজ করে করে মুখস্থ করছি, তার আবার মানের কথা ভাবে কে” ?

চিত্রনাট্যে সমাজচেতনার এই মাত্রাটিও অনুপস্থিত যা আমরা পেয়েছিলাম “সূর্য দীঘল বাড়ী”-তে। হুমায়ুন কবীরের উপন্যাসে সমাজচেতনার যে দিকগুলি ছিল, তাকে বরং কিছুটা রোমান্টিক স্তরেই যেন নিয়ে এসেছেন চিত্রনাট্যকার।

সে অধিকারও নির্মাতা বা চিত্রনাট্যকারের অবশ্যই রয়েছে তবে হারানো চলচ্চিত্রিক সম্ভাবনাগুলোর জন্যে কারো মনে বেদনা জাগতেই পারে। পদ্মার বিভিন্ন রূপ, যা রবীন্দ্রনাথ অমর করে এঁকে গেছেন “ছিন্নপত্র”-তে, অসম্ভব জীবন্ত সূক্ষ্ম যেসব রূপ হুমায়ুন কীবরের মূল উপন্যাসেও এসেছে; “চোখ ধাঁধানো আলোর মধ্যে বিশীর্ণ পদ্মার ওপার দেখা যায় না। কে বলবে যে ভাদ্রেও ভরা পদ্মার আজ এ দশা। ভাদ্রের নদীর ভরা যৌবন। আজ যৌবনের শেষে পাঁজরার হাড়ের মতো এখানে ওখানে চর জেগে উঠেছে।”  কিম্বা নৌকাডুবিতে নজু মিয়ার মৃত্যুর পর;  “বৈশাখী ঝড় যেমন হঠাৎ শুরু হয়েছিল, তেমনি হঠাৎ থেমে গেল। হয়তো ঘন্টাখানেক তুফান ছিল, হয়তো তার চেয়েও কম। বাতাস শান্ত হয়ে গেল, বিরাট পদ্মার বুকে লম্বা ঢেউয়ের রেখা দিগন্ত থেকে দুলতে লাগলো।

“পশ্চিম আকাশে তখনো দুই খন্ড ছেঁড়া মেঘ। মেঘের শিখায় আগুন জ্বালিয়ে সূর্য ডুবে গেল।”

এসব চিত্রিক সম্ভাবনা চিত্রনাট্য নেয়নি। হয়তো সাদাকালো বলে সুযোগও কম ছিল। তবে সাদাকালো ছবিতে আলোছায়ার খেলার যে অপার সম্ভাবনা থাকে, উপন্যাসটিতে তারও যে দু’একটি বর্ণনা ছিল, তাও অব্যবহৃত থেকেছে। যেমন নজু মিয়ার মৃত্যুর পর; “মালেকের ভয় বেড়ে গেল। চারিদিকে জমাট অন্ধকার, তার মনে হতে লাগল যে সে অন্ধকার যেন জীবন্ত। ঘরে মাটির পিলসুজে চেরাগ জ্বলছিল, কিন্তু তার স্তিমিত কম্পমান আলোকে অন্ধকার না কমে যেন আরও গাঢ় মনে হচ্ছিল। দেয়ালের গায়ে কালো ছায়া, অন্ধকারের মধ্যে যেন ভুতুড়ে জানোয়ারের চলাফেরা”।

এসবই হারিয়ে যাওয়া চলচ্চিত্রিক সম্ভাবনা। এসব অবহেলিত সম্ভাবনাগুলির জন্যে বেদনা জাগে এই কারণে যে নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার তথা গোটা ফিল্ম ইনস্টিটিউটটির গভীর আন্তরিকতা ও সাদাকালো আলোকচিত্রের ক্ষেত্রে “নদী ও নারী”-র অনন্য অর্জন সত্ত্বেও, একটি পরিপূর্ণ ধ্রুপদী চলচ্চিত্র হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এ ছবির যে সীমাবদ্ধতাগুলি, সম্পাদনার পরেই তা হয়তো চিত্রনাট্য।

চিত্রনাট্যকার মুর্তজা বশীর ইতালি গিয়েছিলেন ১৯৫৬ সালে। পথিমধ্যে কলকাতায় পাহাড়ী স্যানাল তাকে বলেছিলেন ইতালিতে গিয়ে ফিল্ম ক্লাবের সদস্য হতে।  ইতালীতে তখন ভিসকন্তি, রসোলিনি, ডি সিকার অর্থাৎ নিওরিয়ালিজমের যুগ। মূলতঃ ন্যারেটিভ রিয়ালিস্টিক আঙ্গিকের ছবি “নদী ও নারী”- র চিত্রনাট্য তাই হয়তো নিওরিয়ালিস্ট আঙ্গিকেই লেখা। হয় তো একটু অতিসরলীকৃত, অতি সাদামাটা নিওরিয়ালিজম !

নতুন চর উপড়ানো বটগাছ

ভোরের আবছা আলো। কয়েকটা জেলে নৌকা । প্রথম শটেই প্রত্যাশাটা তৈরি হয়- নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গের ছবি দেখছি। নেপথ্যে ক্ষীণ সঙ্গীত; “নিদয় নদীরে……………… আমারে করিলি তুই কাঙ্গালী।” ছবির শুরুতেই একটা আবহ তৈরি হয়ে যায়।

কয়েক শটের পরে ভাঙ্গা বটগাছ। বহু ঘটনার সাক্ষী বটগাছটি উপড়ে পড়ে আছে। শিকড়গুলি উর্ধ্বমুখী। উৎপাটিত বটগাছটি অনেক কিছুরই প্রতীক হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। শিকড়ের ফাঁকে কয়েকটি ভীত মুখ। সতেরোবার নদীতে ঘর ভাঙ্গা সিনিক আজিজের উচ্চকিত ঘোষণা, যে চরিত্রটিতে সে সময়ের জনপ্রিয় কৌতুকাভিনেতা সুভাষ দত্ত ব্যতিক্রমী অভিনয় করেছেন, সবাইকে সচকিত করে; “এখনও তোমরা ঘরে বইস্যা স্বপ্ন দ্যাখতাছ ………… এইবার আর রক্ষা নেই। সর্বনাশী খাইবো, সক্কলেরে জঠরে নিবো।” গয়ের পঞ্চায়েত স্মৃতিকাতর নজু মিয়া এসে বটগাছটি র্স্পশ করে দাঁড়ায়। শুরু হয় ছবির তিনটি ফ্লাশব্যাকের প্রথম ফ্লাশব্যাকটি।

এক বিরান চরে এসে নামে নজু, আসগর , আজিজ ও বসির। নজু বলে; “এই সমুদরের ওপর দেশ বানামু। অন্যের জমিতে আর মনিষ খাটুম না।  কি কও স্যাঙ্গাইৎ ?” আসগর বলে; “ঠিক কইল্যা। মনিষই যদি খাটুম তবে দ্যাশ ছাড়লাম ক্যান ? কিসের লাইগ্যা ?”

নতুন চরের মাটি, ফলে বর্ষায় ধান আর চৈত্র-বৈশাখে চৈতালী ফসল মিলবে এন্তার। ভিটেছাড়া ভূমিহীন দেহসর্বস্ব ক্ষেতমুজুরের দল। হালের গরুবলদ তারা পাবে কোথায ? তাই নজু মিয়া আর আসগর নিজেরাই লাঙ্গলে কাঁধ দেয় গরুর বদলে। নজু মিয়া উচ্ছ্বাসে বলে; “মাটি তো না, সোনা।” কিন্তু নৈরাশ্যবাদী আজিজ অত সহজে মজে না; “কিন্তুক ভাই, নদী যে সোনার হরিণ, তারে তোমরা ক্যামনে বাঁইধ্যা রাখবা ?”

পরে চরে যখন প্রথম গাছ লাগায় নজু মিয়া, এস.এম. সুলতানের সেই “প্রথম বৃক্ষরোপণ” চিত্রকলাটির মতই যেন তা দ্যোতক হয়ে ওঠে। জমিতে ধান লাগানোর পর তারা বউ ও নারীদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে; “না হইলে আমাগো ধান সিদ্ধ করবে কেডা!” পরে নারীদের ধান সিদ্ধ ও ধান মাড়াইয়ের শট্ আসে মন্তাজ হিসাবে।

ত্রিভুজ প্রেম বন্ধুত্ব সমাচার

আসগর ও আমিনার বাল্যপ্রেম কোনো পরিণতি পায় না আমিনার মামীর সহজ অর্থনীতিবোধের কাছে। আসগর মিয়া মাত্র ত্রিশ বিঘা জমি করেছে, আর নজু মিয়া কয়েক’শ বিঘা। তো আমিনাকে নজু মিয়ার সঙ্গেই বিয়ে দেওয়া হবে। এবং হয়ও।

যে নারীর ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায় তার কিছুই করার থাকে না  বিষণœ চোখে দরজার পাশে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া। এক ধ্রুপদী ত্রিভুজ প্রেমের গল্প হয়ে ওঠার সম্ভাবনায় পূর্ণ হয়ে ওঠে কাহিনী। কৃষাণ, চর ও নদীর প্রেক্ষাপটটি যে সম্ভাবনায় বাড়তি এক সিনেমাটিক মাত্রা যোগ করে। নদীর পারে দাঁড়ানো বিষণœ আসগর। দূরে অস্তমিত সূর্য। অত্যন্ত সুষমাময় এক শট্ যে রকম বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন শট্ জুড়ে থাকে গোটা ছবির শরীরে।

অবশেষে আমরা পাই সেই অত্যন্ত চমৎকার শট্টি। নববিবাহিতা আমিনা শ্বশুর বাড়িতে আসছে। বিকালের ম্লান আলো। ফোরগ্রাউন্ডে আসগর। লংশটে ঘাটে নৌকা থেকে আমিনা নামল। পেছনে নজু। মেয়েরা আমিনাকে ঘাট থেকে বাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ধানক্ষেতে কোড়াপাখির ডাক আর নদীর ম্লান বিকেলের বিষণœতা গোটা শট্টিকে এমন একটা মাধুর্য দিয়েছে যে রকম একক শট্ এদেশের চলচ্চিত্রে খুব বেশি চোখে পড়ে না।

এই গোটা দৃশ্যটাই আসে ফ্লাশব্যাকে যখন লং শটে দেখি চরের নতুন জেগে ওঠা জমিতে নজু ও আসগরের দলের লেঠেলরা মুখোমুখি। নজু বলেছিল; “তুমি পশ্চিমের চর নিছ, নাও, পুবের চর আমার। খুটগাইরা সীমানা বাঁইধা দিলাম। এই দিকে নজর দিও না!” জবাবে আসগর বলে; “পরের জিনিষে নজর আমি দিই না। হেই স্বভাব আমার নাই।” পরে আবারও বিড়বিড় করে বলে; “পরের জিনিষে নজর আমি দিই না!” আসগরের ফ্লাশব্যাক থেকে ঘটনা এগিয়ে চলে। আমরা জানতে পারলাম কেমন করে আসগরের পরিবর্তে নজুর সঙ্গে আমিনার বিয়ে হয়। ঈর্ষান্বিত আসগর নজুকে খুন করতে চায়। গর্ভবতী আমিনার কাতরোক্তি; “আমার সন্তানেরে তুমি পিতৃহীন কইর না।” শেষ হয় দ্বিতীয় ফ্লাশব্যাকও।

ঈর্ষা শাস্তি সমাচার

ছবির তৃতীয় ফ্লাশব্যাকে শুরু হয় আমিনার মাধ্যমে যখন দেখি পদ্মার নৌকাডুবিতে নজু মিয়ার মৃত্যু হয় এবং পঞ্চায়েৎ আসগরের উপর দায়িত্ব পড়ে নজু-আমিনার পুত্র মালেকের সম্পত্তি দেখাশোনার। এ তল্লাটে সম্পত্তি রাখতে হয় লাঠির জোরে, তাই এ কারণে নজুর শত্রু হলেও শক্তিশালী আসগরই যোগ্য মানুষ এ ব্যাপারে, ভাবে পিতৃমাতৃহীন মালেকের অভিভাবক বশির। তবে জমি শুধু মানুষের হাত থেকে রক্ষার সমস্যা নয়, রাক্ষসী পদ্মাও তো সবসময় লক্লকে জিব বের করেই বসে আছে। কখন কার ক্ষেতখামার ঘরবাড়ি গ্রাস করে তার ঠিকঠিকানা নেই। চরের এ জীবন যেন যথার্থই প্রত্যেকেই প্রত্যেকের বিরুদ্ধে, এবং এক অলঙ্ঘ্য নিয়তি, এক্ষেত্রে পদ্মা— যেন সবার বিরুদ্ধে।

আমিনার ফ্ল্যাশব্যাকে আমরা দেখি ঈর্ষান্বিত নজু আমিনাকে তালাক দিচ্ছে। অসহায়া আমিনা পদ্মায় ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করতে চায়। আসগর তাকে উদ্ধার করে। এখন থেকে সে আসগরের ঘরনী। আসগর যখন বালক মালেককে তার হাতে আবার এনে দেয়, মাতৃত্বের অশ্রুজল মালেকের মাথার উপরে ঝরে পড়ে। শুরু হয় তৃতীয় ফ্ল্যাশব্যাকটি এবং শেষও হয় আমিনার মালেককে আদর করার মধ্য দিয়ে।

এর আগে আমরা দেখেছি ঈর্ষাকাতর নজুর অস্থিরতা, সুখহীনতা। গাঁয়ের কামেল ফকির তাকে বলছে; “দুষমনকে দোস্ত বানাও। আল্লাহ্র হুকুম। আর তুমি বানাইছ দোস্তরে দুষমন।” কিন্তু নজুর ঈর্ষাকাতর স্বভাবে এসব সদুপদেশ কোনো প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়।

প্রাচীন বটগাছের কোটরে কামেল ফকিরের বসবার আয়োজনটি বেশ সিনেমাটিক। দৃশ্যটি সাদাকালো আলোকচিত্রের একটি ভাল উদাহরণ। নজুর প্রতি জীবনাভিজ্ঞ ফকিরের উপদেশটি ছিল গভীর; “আর যদি দোয়াই চাও, তবে সব চাইয়া বড় দোয়া করলাম, খোদা তোমার মনে শান্তি দেউক।” চেল্লায় বসা ফকিরের উপদেশ; “নিজের চাইয়া বড় দুষমন আর নেই। মন যদি না মানাইতে পারো, তয় এই মনের জ্বালাতেই খতম হইবা”। অতঃপর ফকির-নজু-আসগরের এক প্রতীকী ত্রিভুজ কম্পোজিশনের পর আসন্ন অশুভের ব্যাপারে ফকিরের তীক্ষè উপলদ্ধি; “ইশান কোণে ঝড়ের রেখা। নদীর পার আজদহের মত ফুঁসতাছে। তুফানে নাও মাতালের মত। বাজপাখীর মত বাদলের ছোঁ। …….যাও। সব ঝুট। দুই দিনের জিন্দেগী, তার লাইগ্যা এত কাইজ্যা !”

পাগলা মেহের আলীর জীবনর্দশনই যেন ফুটে ওঠে ফকিরের উপলব্ধিতেও।

এরপর পদ্মার কালবৈশাখী। টালমাটাল নজু মিয়ার নৌকা। সাউন্ডট্রাকে বদর বদর। নৌকাডুবিতে নজু মিয়ার মৃত্যু। আমরা দেখি নদীর কিনারে জলকাদায় শিশুরা খেলছে। নজুর মৃতদেহ আসছে নৌকায়। দূরে অর্ধমগ্ন প্রতীকী গাছ।

নজুর মৃত্যুর পর নতুন পঞ্চায়েত আসগরের কাছে বশিরের প্রস্তাব, এখন থেকে এতিম মালেকের সম্পত্তি আসগরই দেখাশোনা করুক। জীবনাভিজ্ঞতা আসগরকেও স্থৈর্য্য  দিয়েছে। সে বোঝে; “মানুষের দাফনের সাথে দোস্তি দুষমনি হগলই শ্যাষ হইয়া যায়।”

তিনটি ফ্লাশব্যাক চলচ্চিত্রিক নিরীক্ষা

আগেই বলেছি তিনটি ফ্লাশব্যাকে তিন জনের দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে “নদী ও নারী” ছবির কাহিনীটি বর্ণিত। দ্বিতীয় ফ্লাশব্যাকে যে নজু মিয়া মৃত, ফ্লাশব্যাকে তাকে আবার পর্দায় দেখা, সে সময়কার দর্শকের মনন, অতখানি চলচ্চিত্রিক ছিল না। মনে রাখতে হবে ষাট দশকে তখন উভয় বাংলাতেই কলকাতার টালিগঞ্জের ছবিগুলির একরৈখিক ন্যারেটিভ কাহিনীর রমরমা। সেই যুগে জটিল এই বর্ণনারীতির কারণেই হয়তো “নদী ও নারী” ছবিটি সেকালে জনপ্রিয় হয়নি। তবে যুগের বিচারে এই নিরীক্ষাটা ছিল, নিঃসন্দেহে এক সাহসী প্রচেষ্ট।

নিরীক্ষার প্রচেষ্টা অন্যত্রও ছিল। যেমন বানের সময আমিনা ঘর থেকে বের হতে পারল না। আসগর তাকে উদ্ধারে ছুটে এল। তারপরেই আসগরের ফ্রীজ শট্। আমিনার নিয়তি দর্শকের কাছে পরিষ্কার হয়ে ফুটে ওঠে।

তেমনই সেই ভয়াবহ বান আসার আগে, যা ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘর-বাড়ি ক্ষেত-গৃহস্থালী, সকল স্বপ্ন, আমরা দেখতে পাই কয়েকটা খালি ফ্রেম (blank frame)। ছবি নেই, শুধু সংলাপ। আসগর বলছে; “ম্যাঘ নাই, ম্যাঘ নাই, শ্যাষে এমন ম্যাঘ নামলো। ( দীর্ঘশ্বাস ) আল্লাহ্ জানে কি হইবো !”

  ছবিবিহীন খালি ফ্রেমে শুধু সংলাপের এই ব্যবহার নিরীক্ষার আরো একটি সাহসী প্রয়াস এদেশের চলচ্চিত্রে।

তবে “নদী ও নারী”- র এই নিরীক্ষা সে সময়ের তুলনায় অগ্রসর হলেও খুব দূরবর্তী কিছু ছিল না। কারণ কাছাকাছি সময়কালেই জহির রায়হানের “কাঁচের দেয়াল”, “কখনো আসেনি” বা  সালাউদ্দিনের “সূর্যস্নান” এরকম কিছু নিরীক্ষাসমৃদ্ধ চলচ্চিত্রিক ছবি ঢাকায় তৈরি হয়েছে। “নদী ও নারী” এই ধারারই আরেকটি বলিষ্ঠ সংযোজন যেখানে চলচ্চিত্রিক ভাষা প্রয়োগের প্রচেষ্টা চলচ্চিত্রটিকে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত রয়েছে।

সংলাপ, জুতোহীনতা চরের কৃষকেরা

“নদী ও নারী” ছবিটির ইমেজগুলি এত চমৎকার চলচ্চিত্রিক, যেমন আসগরের গাছের গুড়ির ঘাটে অজু করা, কিন্তু সংলাপগুলি আবার, দুঃখজনকভাবে, প্রায়শ:ই নাট্যধর্মী। চরিত্ররা শুধুমাত্র সেই বাক্যগুলিই বলে যা কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যেতে দরকার। এর ফলে এক ধরণের কৃত্রিমতা সৃষ্টি হয়, এমনকি ইমেজগুলির শরীরেও সেই কৃত্রিমতা লেপ্টে থাকে।

এই সংলাপ প্রসঙ্গে ছবির চিত্রনাট্যকারের ভাষ্য; “এই বইয়ের সংলাপও আমার লেখা। মূল উপন্যাসে সংলাপ সাধু ভাষায় ছিল। প্রথম যে চিত্রনাট্যটি আমি তৈরি করেছিলাম সেটা সাধু ভাষায় ছিল। পরে সাদেক খানের পরামর্শে সংলাপগুলিকে পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক ভাষায় রূপান্তরিত করি। তবে এ ব্যাপারে যে দিকটি সব চাইতে উল্লেখযোগ্য তা’ হচ্ছে- সংলাপের ক্ষেত্রে অভিনেতাদের যথেষ্ট ফ্রীডম আমি দিয়েছিলাম। তার ফলে তারা অনেক সময় চিত্রনাট্যের মূল সংলাপকে নিজেদের মতো করে গুছিয়ে বলেছে।”

“স্যাঙ্গাৎ”, “পঞ্চায়েৎ” চিত্রনাট্যে এরকম কিছু ব্যবহৃত শব্দের উৎস উপন্যাসই, তবে মূল উপন্যাস থেকে নির্মাতারা আসলে সামান্যই নিতে পেরেছেন, কারণ উপন্যাসের সংলাপের সাধু ভাষা চরিত্রানুগ নয়, ছিল লেখকানুগ। নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকারকে একটা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই কাজ করতে হয়েছে।

এক টপশটে আমরা দেখি ধুলদীর হাট। কোনো বাজার কি এতখানি খোলা ক্যামেরা দিয়ে বাংলাদেশের কোনো ছবিতে আমরা দেখেছি, শুধুমাত্র “সূর্য দীঘল বাড়ি” ছবিটির গঞ্জের সেই বিশাল প্যান শটটি ছাড়া ? হাটে ধান বেচে গরু কিনতে এসেছে নজু মিয়া-আসগরেরা। গঞ্জের বাজারের পাশেই বেশ্যাপল্লী। বেশ্যামেয়েটির চেহারা যথার্থই তার পেশার অনুরূপ। বাজারের এই দীর্ঘ শট্গুলির একটা সমাজতাত্ত্বিক তাৎপর্য রয়েছে। এসব শটে এক বিশেষ যুগের বিশেষ মানুষদের সামাজিক চিত্র ফুটে ওঠে। “সূর্য দীঘল বাড়ি”-তেও এরকম গঞ্জের ছবি রয়েছে যা আগামী দিনের গবেষকদের প্রয়োজনে লাগতে পারে।

গঞ্জে যেখানে দরজিদের লাইন শেষ আর মনিহারী দোকানের শুরু সেখানে হেকিম সাহেবের দোকান, যে হেকিম সাহেবের বড় শখ ছিল মালেকের ধরা কুমিরের কলিজা ও গুরদা দিয়ে তিনি এমন এক দাওয়াই বানাবেন যে; “ষাট বছরের বুড়ির মুখে ছেমরির জেল্লা আসব। আর আশি বছরের থুরথুুরা বুড়া বিশ বছরের মত জোয়ান হইব।”  হুঁকা, গড়গড়া, বসার ব্যবস্থা, চাষী নজু মিয়ার জুতা-পরা-না-পরা ইত্যাদির মাধ্যমে হেকিম ও নজু মিয়ার দৃশ্যটি কৃষকের শ্রেণী অবস্থান ও গ্রামীণ সমাজিক চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে বেশ তাৎপর্য্যপূর্ণ।

এছাড়া চর দখলের সিকোয়েন্সটিতে ঢাল-সড়কি-বল্লম নিয়ে দাঁড়ানো কৃষক-লাঠিয়ালের দল, জমি নিয়ে “কাইজ্যা”-র গ্রাম-বাংলার চিরন্তন সেই এক বিশেষ ছবিকে, পর্দায় মূর্ত করে তুলেছে।

নারী জলের হাতছানি

নৌকা নিয়ে দুই বন্ধু গ্রামে ফিরে আসে। পারে নেমে তারা দেখে কলসী কাঁখে এক সুন্দরী তরুণী। আসগর বলে; “ওই তো মামীর মাইয়া আমিনা।” নীচুভাবে ক্যামেরা ধরা। ফোরগ্রাউন্ডে নদীর জল, পেছনে স্নানরতা কলসী কাঁখে নারীরা। “তিতাস একটি নদীর নাম”-য়েও এরকম লো-অ্যাঙ্গেল শট্ ব্যবহার করেছেন ঋত্বিক। এই বিশেষ ধরনের উপস্থাপনা নদী ও নারীর মধ্যে এক সম্পর্কসূত্র যেন অন্বেষা করে। নারীর অসহায়তার, যাকে পুরুষপ্রধান সমাজ চিরকাল নারীর রহস্যময়তা বলে মনে করেছে, এবং যেন নদীর গতিপথের রহস্যময়তার কারণে তাকে সহজেই তুলনা করেছে নারীর সঙ্গে। নারীর দেহের বাঁকে যেন নদীর বাঁক, তবে এই প্রতিতুলনার আরো গভীর সমাজ-নৃতাত্ত্বিক কারণও রয়েছে। নদীর পলি দেয়— শস্য, নারী দেয়— সন্তান। পূর্ব বাংলার শিল্পী-সাহিত্যিকরা যে নদী ও নারীর প্রতীককে প্রায়শই সমার্থক দেখেছেন, সেটার গভীর অবচেতন সমাজনৃতাত্ত্বিক কারণও রয়েছে।

নদীর মত নারীর স্বরূপও বিভিন্ন থেকেছে। কাশবনের কন্যার সারল্য, কপিলার উচ্ছলতা, আমিনার দুঃখভোগের ধৈর্য ও সহনশীলতা, এই সবই নদীর বিভিন্ন রূপেরই প্রতিফলন যেন। বাঙালী নারীর মর্ষকামিতার মধ্যে নদীর সর্বসহনশীলতার প্রতীক খুঁজে পেয়েছে বাঙালী পুরুষ শিল্পী-সাহিত্যিকেরা। আমিনা সেই আদলে গড়া এক চরিত্র। আত্মহত্যা করতে আমিনার নদীর পার ধরে ছুটে যাওয়ার দৃশ্যটি silhouette -র এক চমৎকার ব্যবহার। এই বিশেষ শট্টিতে ছবির সঙ্গীতাংশও যথার্থ নাট্যরস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। “সূর্যস্নান” ছবিটিতেও জলে ডুবে নারীর আত্মহত্যার শটে silhouette -য়ের ব্যবহার আমরা দেখেছিলাম। দু’টিই অত্যন্ত সফল ব্যবহার।

এ সেই সামাজিক আবহ যেখানে; “মেয়ে মানুষের স্বামী গৃহস্থালী ভিন্ন অন্য কোনো গতি  নেই”  ফলে সলজ্জ ভঙ্গিমায় যে নারী এসে খাবার দেয়, সেই কুলসুমের সঙ্গে সহজেই আজিজের বিয়ে হয়ে যায়। আবার পদ্মার জলে কুলসুমের মৃত্যুও স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে রয়। লংশটে , লো-অ্যাঙ্গেলে নদীর কিনারে ভাসমান কুলসুমের মৃতদেহ ভেসে আসে যা দেখে আজিজ প্রকৃতিস্থতা হারায়। নদী যেন নিয়তির মত টানে, এ ছবির সব চরিত্রকেই,  বিশেষ করে- নারীদের। আবার এটাও নিয়তি, বেশ্যাপল্লীটিও নদীর কাছেই। নারী পণ্য হয়। নদীর কিনারেই।

ক্যাজুন বালকটি মালেকের কুমীর

কুমীর মারার দৃশ্যটির প্রস্তুতি উপন্যাসে ছিল; “গাছে ঢাকা গাঁয়ের পথ হঠাৎ শেষ হয়ে গেল- খোলা জমিতে এসে সামনেই চোখে পড়ল বিরাট নদী, হেমন্তের স্নিগ্ধ আলোকে বিরাট অজগরের মতন পড়ে রয়েছে।”

চলচ্চিত্রে কুমীর মারার দৃশ্যটি একটু পরে এলেও এই দৃশ্যটি ছবিটির এক বড় সম্পদ। দুরন্ত বালক মালেকের ছিপে আটকে যায় কুমীরটি। কুমীর ! হ্যাঁ ফ্লাহার্টির “লুইজিয়ানা স্টোরি”-র কথা মনে পড়ছে নিশ্চয়ই! ফ্লাহার্টির ক্যাজুন বালকটির মতই মালেকের কুমীর ধরা। যে ভাবে লুইজিয়ানার বালকটি জলে নেমে কুমীরকে টেনে আনতে চায়, মালেকও সেরকম। অবশেষে গাঁয়ের পুরুষরা এসে আটকে পড়া কুমীরটাকে সড়কি দিয়ে মারে। মৃত কুমীরটির একটা টপশট্ দেখি আমরা। অশুভের প্রতীক কুমীরটি মৃত এবং বিধ্বস্ত। পরবর্তী  লংশটে গর্বিত পিতা নজু মিয়া হাটের মধ্য দিয়ে হাঁটছে। আশেপাশের লোকজন তাকে শ্রদ্ধায় সালাম জানাচ্ছে, বলছে; “আপনার ছেলে নাকি দশগজা কুমীর মেরেছে, পঞ্চায়েৎ”?

মালেকের স্টিমার দেখা, খুলনা-ঢাকার মধ্যেকার স্টীমের স্টিমার, মিসিসিপির মত, বা যেন সেই ক্যাজুন বালকের প্রথম তেলের জাহাজ দেখার মতই , কিম্বা- অপুর রেলগাড়ি দেখা। মালেককে প্রকৃতির সন্তান, আরেক অপু হিসাবেই যেন আঁকতে চেয়েছিলেন পরিচালক। মালেক ও নুরী, দুই বালক-বালিকা যেভাবে নদীর পারে দৌড়ে বেড়ায়, তা বাঙালী দর্শককে অনিবার্যভাবে অপু-দুর্গার গ্রাম-বাংলার প্রকৃতির মাঝে দৌড়ানোর কথা মনে পড়াবে। তবে অপার প্রকৃতির মাঝে মুক্ত আনন্দে বালক-বালিকার এই ছুটে চলা- এতো চিরন্তন।

মালেক অনেকটাই অপুর আদলে গড়া হলেও পদ্মাপারের এই অপু অনেক সাহসী। বিভূতিভূষণের সংবেদনশীল লাজুক অপু বাড়ির পেছনে বাগানে তীর-ধনুক দিয়ে কল্পিত দৈত্যদানবের সঙ্গে লড়ত। আর পদ্মাপারের এই অপু দূরন্ত সাহসী- যে বাস্তবে জীবন্ত কুমীর ধরে।

গতিহীন সম্পাদনা বিশ্বাসযোগ্যতার সমস্যা

ক্যামেরার কাজ চমৎকার পেলব সুন্দর “নদী ও নারী”-র। ক্যামেরা মোটামুটি স্থির থেকেছে। তবে প্রতিটি কম্পোজিশনের পেছনেই চিন্তার যে ছাপ রয়েছে তা বোঝা যায়। এ ছবির আলোকচিত্রী উইলিয়াম গুথ সাদাকালো আলোকচিত্রের এমন এক মান তৈরি করে গেলেন যার সঙ্গে সমসাময়িক ছবিগুলির মধ্যে একমাত্র এ.জে.কারদারের “জাগো হুয়া সাভেরা” ও পরবর্তীকালে “সৃর্য দীঘল বাড়ি”-র আনোয়ার হোসেনের কাজের প্রতিতুলনা টানা যেতে পারে। চাঁদপুর ও ফরিদপুরের মাঝামাঝি যে রাজেশ্বরী চরাঞ্চলে মূলত শুটিং হয়েছে, তার নদী, চর ও ধানক্ষেতের অপার সৌন্দর্য আমেরিকান এই আলোকচিত্রীর সহজাত ক্যামেরা-দক্ষতাকে সহায়তা করেছে। করেছে কিছুটা রোমান্টিকীকরণও। কুমীর মারার দৃৃশ্যটি অবশ্য ঢাকার অদূরে মীরপুরে তোলা।

ক্যামেরা স্থির রেখে static shot ও সূর্যের বিপরীতে লেন্স মেলে ধরে  silhouette শট্ নেয়ার প্রতি গুথ যেন ওঁর বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছেন। সঙ্গীতে বাহাদুর হোসেনের কাজ শ্রবণমধুর। ভাল লাগে সঙ্গীতে পল্লীর নিজস্ব সুরের ব্যবহার। আর নদীপারের গঞ্জে দোতারা বাজিয়ে যে উত্তরা মানুষটি গান গাইছে, তিনি যে লোকশিল্পী হরলাল রায়, এই আবিষ্কার এক বাড়তি পাওনা ! ছবিটিতে ডিটেলিং-য়ের কাজে নজর ছিল। ছাতার পট্টি পর্যন্ত দেয়া হয়েছে বাস্তবতা আনতে। তবে কারো কারো নতুন লুঙ্গী বাস্তবতাবোধকে ব্যাহত করেছে। কোনো তারকা নেই। অভিনেতা মাসুদ আলী খানকে দিয়ে আসগর চরিত্রটি করানো, নির্মাতার বাস্তবতার প্রতি দায়বদ্ধতার প্রকাশ। তেমনই কৌতুকাভিনেতা সুভাষ দত্তকে দিয়ে একটি ট্রাজিক চরিত্র রূপায়ণ, আরেক সাহসী নিরীক্ষা। তবে আমিনাকে ঠিক পরিশ্রমী কৃষকের কন্যা বা বউ মনে হয়নি।

তবে ছবিটির দুর্র্বলতম অংশ নিঃসন্দেহে এর সম্পাদনা । প্রথমে establishing একটি লংশট, মাঝে চরিত্ররা যখন কথা বলছে তখন তাদের মিড শট্ বা ক্লোজ আপ এবং শেষে আবার লংশট, এই গতানুগতিকতার ঊর্ধ্বে সম্পাদক আবদুর রহমান সর্বদা উঠতে পারেননি। তাছাড়া সম্পাদনার গতিটি বেশ শ্লথ। ছবি র্তর্ত করে এগিয়ে যায় না। সম্পাদনা নিজ থেকে ছবিতে কোন ছন্দ সৃষ্টি করতে পারে না, যে ছন্দ সৃষ্টি সম্পাদনার এক গুরুত্বপূর্ণ দিক। এছাড়া কিছু কিছু সিকোয়েন্স মাত্রাতিরিক্ত ছোট হওয়ার কারণে কারো মনে হতে পারে যে ছবির নির্মাতা কাহিনীটি বলার ক্ষেত্রে কিছু কিছু ঘটনা ও চরিত্র পর্দায় যতখানি সময় দাবি করে তা’ দিতে পারেননি। মুর্তজা বশীরের বক্তব্য থেকে আমারা সমস্যার কারণটি বুঝতে পারি; “সাদেক খান আর তার কিছু বন্ধুবান্ধব অর্থ যোগাড় করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে দোসানী ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউশন নেয়। ……….. অনেক সময় দেখা যায় প্রফেশনাল পরিবেশকদের অর্থলগ্নী সৎ চলচ্চিত্রকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যেহেতু দোসানী ইনভল্ভ হয়েছিল এবং তারা ঈদে ছবি রিলিজ দেয়ার সিন্ধান্ত নিয়েছিল- দেখা গেছে তাদের প্রেসারে মূল স্ক্রিপ্টে কিছু কাঁটছাট করতে হয়েছিল – তাড়াহুড়ো করে অনেক সিকোয়েন্সকে ছোট করতে হয়েছিল। এতে আমার চিত্রনাট্যকে খর্ব করা হয়েছিল।”

সেই পুরাতন দ্বন্দ্ব! শিল্প ও অর্থের দ্বন্দ্ব ! এটা দুঃখজনক যে বাণিজ্যিক পরিবেশকদের চাপে ষাট দশকের অন্যতম সেরা এ ছবিটির কিছু অংশের কাজ দ্রুত এবং তাড়াহুড়ো করে শেষ করতে হয়েছিল। অন্যথায় যে গভীর আন্তরিকতা ও শিল্পবোধ নিয়ে এ ছবির নির্মাতা, আলোকচিত্রী, চিত্রনাট্যকার ও অন্যান্যরা কাজ করেছিলেন, যথার্থ স্বাধীনতা পেলে এ ছবির শৈল্পিক মান আরো ধ্রুপদ মানের হতে পারত।

পদ্মার ভাঙ্গন নতুন বাড়ির সন্ধানে

আজিজ উপলব্ধি করেছিল; “এই খানদিয়া একটা চোরাস্রোত যাইতেছে লাগে”। পদ্মা তার কাছে সবসময়ই কালনাগিনী, রাক্ষসী, যাকে বিশ্বাস নাই। কয়েক শট্ পরেই আমরা জানতে পারি আজিজের প্রিয়তমা স্ত্রী কুলসুমকে পদ্মা টেনে নিয়ে গেছে। কুলসুম— ছবিতে পদ্মার প্রথম শিকার। পরে নজু, সব শেষে আমিনা।

আষাঢ় মাস, বৃষ্টির লক্ষণ নাই। ফসল পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। গাঁয়ের বালিকারা তাই মাথায় জলের বদনা নিয়ে বেরিয়েছে । মুখে ছড়া;

“কচুর পাতায় হলদি

 বৃষ্টি নাম জলদি”।

বৃষ্টি নামানোর এ এক প্রচীন লোকজ আচার। আসগর মিয়া নুরুর বদনা ভেঙ্গে ফেলে; “গান গাইলে ম্যাঘ নামবো, ছাই হইবো। ……….. এই সব তুকতাকে কিছুই হয় না। যদি হইতো আইজ দুইমাস ধইরা আসমান এমন থাকতো না।”

অবশেষে বৃষ্টি নামে। বিরামহীন, অবিশ্রান্ত। বৃষ্টির মন্তাজগুলি অর্থবহ হয়ে ওঠে। বৃষ্টিতে ভিজে এক কিশোরীর অপার আনন্দ প্রকাশ। কিন্তু কৃষকের অনেক স্বপ্নের বর্ষা ক্রমশ এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। বৃষ্টির জল উঠে আসে ঘরের কিনারে। বৃষ্টি অবশেষে পরিণত হয় বন্যায়। উন্মত্ত পদ্মার সবভাসানিয়া বন্যা। বন্যার বণর্না ছিল; “দুকুল ভাসিয়ে রাক্ষসী পদ্মা ছুটে এলো গাঁয়ের মধ্যে। জলের প্রবল তোড়ে সারা গাঁ কম্পমান । সবাই তখন ভয়ে কাঁপছে, বাড়িঘর আর টেঁকে না। অন্ধকার বাড়তে লাগলো, সঙ্গে সঙ্গে বন্যার জলও বাড়তে লাগলো। সবাই বলতে লাগলো আজ রাত বুঝি আর কাটে না। অবশেষে প্রভাত হো’ল, কালরাত্রি কাটলো। কাল সন্ধ্যায় যেখানে ছিল বর্ধিঞ্চু গ্রাম, ঘর বাড়ি উঠোন, আজ সেখানে গ্রামের কোন চিহ্ন নেই। পুরাতন নিশানা সব কিছু লোপ পেয়ে গেছে। জলের উপরে এখানে ওখানে ভাসছে মোচার খোলার মত দুচারটি নৌকা। ঊর্ধ্বে আবার নির্মেঘ আকাশ। কোথাও তার সীমানা নেই। নীচে জলের বিস্তার। প্রকৃতির সে সমারোহের মধ্যে মানুষের চিহ্ন যেন ধুয়ে মুছে লোপ পেয়ে গেছে।”

সর্বস্বহারা মানুষের দল আবার নৌকায় বেরিয়ে পড়ে। ঘর-গেরস্থালী ও আমিনাকে হারিয়ে নদীর বুকে মালেক আর নুরুকে নিয়ে আসগরও ভেসে পড়ে নৌকায়। মালেক বলে; “চাচা, ভাইবা কি হবে কও? তুমি না কইছিলা নদীর চরে ঘর বাধমু”। আসগর; “হ বাবা। নদীর মানুষ আমরা , ভাঙ্গা গড়া আমাদের নিত্য সাথী। ( একটু থেমে ) বালুচরের উপর ঘর বান্ধি। বারবার ধুইয়া মুইছ্যা যায়। হার মানি না। নোতুন ঘর আবার বান্ধি। কিন্তু …. ”।

এক নতুন বাড়ির কথা বলেছিল জীবনযুদ্ধে বিপর্র্যস্ত এক প্রৌঢ়কে এক শিশু ঋত্বিকের “সুবর্ণরেখা”-য়। পদ্মা পারের এই কৃষকপুত্রটিও আশা রাখে নতুন চরে তাদের নতুন বাড়ির উপর। শেষ আশাবাদের কথাটি অবশ্য শোনায় চিরকালের সিনিক আজিজ মিয়াই; “আসগর ভাই, ভাটির দিকে বাইয়া চলো”। সব সময় কালো গেঞ্জি পরা অজিজের পরনে এ শটে দেখি সাদা গেঞ্জি – আশাবাদের প্রতীকই হয়তো। চমৎকার ডিটেলিংয়ের কাজ। পদ্মার জলে ঝিকিমিকি, রোদের আলোছায়ায় এই নতুন ভাগ্যান্বেষীদের সারি সারি নৌকা আবারও এগিয়ে চলে। পদ্মা-মেঘনার মোহনায় আবার নতুন কোনো এক চরের দিকে।

শেষ কথা

“নদী ও নারী” ছবির এক বিশেষ সম্পদ এর চিত্রগ্রহণ। আমার মনে হয়, সাদাকালোর আউটডোরের কাজে এ ছবি এদেশের চলচ্চিত্রে একটি মাইলফলক হয়ে রয়েছে। নদী ও নৌকার বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল, ধানক্ষেত ও সাধারণ ভাবে গ্রামীণ জীবনের চিত্রায়নটা যথার্থই রয়েছে। দূর্বলভাবে সংরক্ষিত আর্কাইভের অত্যন্ত ত্রুটিযুক্ত প্রিন্টকে ছাপিয়েই এ ছবির ভিস্যুয়াল সৌন্দর্য্য আমাদেরকে মুগ্ধ না করে পারে না। বিশেষ করে তিনটি শটের কথা উল্লেখ না করে পারছি না। প্রথমটি আসগরের POV থেকে আমিনার বউ হয়ে নৌকা থেকে নেমে আসার দৃশ্য, যেটি আগেই আলোচিত হয়েছে; দ্বিতীয়টি আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে নদীর পার ধরে আমিনার ছুটে যাওয়ার silhouette শটটি এবং তৃতীয়ত বন্যার পর সারি সারি নৌকায় ওদের আবার ভাটির দেশে যাওয়ার দৃশ্য। জলে সূর্যালোক পড়ে চিকচিক করছে নতুন এক আশার প্রতীক হয়ে। কোনো চলচ্চিত্রের শরীরে এ ধরণের ঋদ্ধ একেকটি একক শট্ গোটা চলচ্চিত্রটিকেই সমৃদ্ধ করে। অনেক সময়ই একটা গোটা ছবির কাহিনী , চিত্রনাট্য, অনেক কিছুই পরবর্তীতে আর স্মরণে আসে না, স্মরণে গ্রথিত হয়ে থাকে শুধুই কোনো একটি বা দুটি বিশেষ ইমেজ বা চিত্রকল্প। মালার্মে বলেছেন, একটা গোটা কবিতা শুধু নয়, এর একটি পঙক্তিও যদি আগামীকালের মানুষ মনে রাখে, সেটাই কবিতাটির সাফল্য। “নদী ও নারী”-র র্সাথকতা এখানে যে চিরকালীন স্মরণযোগ্য এরকম একক শটের কোনো অভাব নেই ছবিটিতে।

এ ধরনের ছবির আরেক বড় দিক হচ্ছে সমাজবাস্তবতার চিত্রণ। পঞ্চাশ বছর পরেও “তিতাস একটি নদীর নাম”ও “সুর্য দীঘল বাড়ি” -র তাৎপর্য রইবে, এক বিশেষ যুগে, এক বিশেষ সমাজের মানুষদের জীবনযাপন কেমন ছিল তা বুঝতে। সেই নিরিখে “নদী ও নারী”-র সাফল্যও উল্লেখযোগ্য। এ ছবির আরেক বড় সাফল্য নিঃসন্দেহে নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গের মানুষের জীবনের সেই গভীর দিকটি, নদী ও মানুষের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের দিকটিকে এ ছবি ছুঁয়ে যেতে পেরেছে। শত সীমাবদ্ধতার মাঝেও এটিই হয়তো “নদী ও নারী” ছবিটির সবচেয়ে বড় অর্জন।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত