সিনেমার নন্দনতত্ত্বে অক্টোবর বিপ্লবের প্রভাব

এটা কৌতূহলোদ্দীপক যে চলচ্চিত্রের ভাষা ও নন্দনতত্ত্বের বিবর্তন অনেকটাই ঘটেছে বিশ্বের বড় কোনো রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে। আর যে রাজনৈতিক ঘটনাটি বিশ্ব চলচ্চিত্রের ভাষা ও নন্দনতত্ত্বে সবচে বড় পরিবর্তনটা ঘটিয়েছিল, তা’ হচ্ছে, ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব। একটা শিল্পমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের ভাষার আজকের এই যে বিকাশ, এর জন্যে কোনো একক বড় রাজনৈতিক ঘটনার প্রতি যদি চলচ্চিত্রশিল্পকে কৃতজ্ঞ থাকতে হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে তা-অক্টোবর বিপ্লব।

বিপ্লবের কিছু দিন পরই ১৯১৯ সালের আগস্ট মাসে বিপ্লবী সোভিয়েত সরকার চলচ্চিত্রশিল্প ও বাণিজ্যের পূর্ণ জাতীয়করণ করল। লেনিন ঘোষণা করলেন; “এখন থেকে আমাদের কাছে (সোভিয়েত রাষ্ট্রের কাছে) চলচ্চিত্র হচ্ছে সবচে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পমাধ্যম।” এই সিদ্ধান্তের ফল ছিল যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী।

বিপ্লবের আগেও রাশিয়ায়, সেই নির্বাক যুগের চলচ্চিত্রে, “ইউজিন ওনেগিন” বা “ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট” জাতীয় কিছু ভালো ছবির চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও, সে কালের রুশ ছবি মূলতঃ ছিল হলিউডের গরিবী সংস্করণ। অক্টোবর বিপ্লব যে রুশ চলচ্চিত্রে, মানে ও গুণে, কী বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়েছিল তা বোঝা যায় রুশ বিপ্লবের আগের দশ বছর ও পরের দশ বছরের রাশিয়ার চলচ্চিত্রের মধ্যেকার পার্থক্যটা দেখলে।

ক্ষমতা গ্রহণের পর লেনিনের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত সরকার চলচ্চিত্র বিষয়ক দু’টো নতুন ও মৌলিক কাজ করলেন। চলচ্চিত্র যে একটা লেখাপড়ার বিষয়, এ ব্যাপারটি রুশ বিপ্লবী নেতৃত্বই প্রথম বুঝেছিলেন। প্রতিষ্ঠা হোল বিশ্বের প্রথম ফিল্ম স্কুল-‘মস্কো ফিল্ম ইনস্টিটিউট।’ আর তা’ প্রতিষ্ঠা হোল ১৯২০ সালের সেই দুঃসময়ে যখন দেশে গৃহযুদ্ধ চলছে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলছে বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের অর্থনৈতিক অবরোধ, দেশে খাদ্যাভাব, বিদ্যুৎ নেই, সেই অবস্থাতেও সোভিয়েত নেতৃবৃন্দ চলচ্চিত্র শিক্ষার বিষয়টিকে যে অগ্রাধিকার দিলেন, তা’ তাদের আলোকিত ও আধুনিক মননেরই প্রকাশ। এর সুফলও তারা পেলেন। জন্ম নিল – সের্গেই আইজেনস্টাইন, পুদোভকিন, লেভ কুলেশভ, দভচেঙ্কো, জিগা ভের্ততের মতো একঝাঁক প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকার যাঁরা কেবল রাশিয়ার নয়, গোটা বিশ্বের চলচ্চিত্রেরই ভাষা ও নন্দনতত্ত্বটাকে পাল্টে দিলেন।

ফিল্ম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা ছাড়াও আরেকটা অভিনব ও মৌলিক জিনিষ করলেন সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ। তা হচ্ছে “এজিট-ট্রেন”(Agit-Train) নামে এক ধরণের ট্রেনের প্রচলন করলেন তাঁরা। উদ্দেশ্যটা ছিল, বিপ্লব তো হয়েছে পেত্রগাদ, মস্কো, এসব বড় শহরে। বিশাল সোভিয়েত ইউনিয়নের গ্রামাঞ্চলে, রুশ দেশের প্রত্যন্ত বিস্তীর্ণ কৃষি প্রান্তরে বিপ্লবের বাণী কী ভাবে পৌঁছনো ? খুব মৌলিকভাবেই তাঁরা আনলেন এই এজিট-ট্রেনের ধারণাটা, যে ট্রেনে ক্যামেরা ছিল, ফিল্ম পরিস্ফুটনের রসায়ণাগার ছিল, ছিল ছবি দেখানোর প্রজেক্টর, আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ও কলাকুশলীরা। বিশাল রাশিয়ার একেকটা অঞ্চলে ট্রেনটা যেত, স্থানীয় কৃষক ও গ্রামবাসীদেরকে এই ট্রেনে রাখা চলচ্চিত্র দেখানো হো’ত, কখনো বা স্থানীয় কোনো বিষয় নিয়ে ছবি তুলে তা দেখানো হো’ত। বলার অপেক্ষা না যে এ ট্রেন ছিল খুবই জনপ্রিয় এবং যে সব অঞ্চলের উপর দিয়ে এই এজিট-ট্রেন যেত, সেসব পশ্চাৎপদ  কৃষিপ্রধান এলাকা সব বলশেভিক বিপ্লবের সপক্ষে, অর্থাৎ ‘লাল’ হয়ে যেত। সিনেমার যে একটা বিশাল প্রভাববিস্তারকারী ভূমিকা রয়েছে, বিশেষ করে কোনো বক্তব্যকে জনগণের কাছে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে, সেটা লেনিন ও ওঁর মেধাবী কমরেডরা চলচ্চিত্রের প্রথম জমানার সেই দিনগুলোতেই খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন।

তবে অক্টোবর বিপ্লবের পরপরই অবস্থা ততোটা ভাল ছিল না। কারণ অর্থনৈতিক অবরোধ, কাঁচা ফিল্মের সংকট, বিপ্লবের ফলে চলচ্চিত্রের পুরনো শিল্পটা তচনচ হয়ে যাওয়ার ফলে, সিনেমা শিল্প রাশিয়ায় খুবই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। অবস্থা যে কতটা খারাপ হয়েছিল তা বোঝা যাবে এ থেকে যে বিপ্লবের আগে মস্কোতে যেখানে ১৪০টি সিনেমা হল ছিল, বিপ্লবের পরে তার মধ্যে মাত্র ১০টি সিনেমা হল চালু ছিল। তবে দূরদর্শী ও ধৈর্য্যশীল নীতি নেওয়ার ফলে, বিশেষ করে ১৯২১ সালে লেনিনের নিউ ইকনমিক প্লান, বা ‘নেপ’ গ্রহণ করার ফলে, যে নীতিতে ব্যাক্তিপুঁজিকে কিছু ছাড় দেয়া হো’ল, ফলে আবারও ফিল্মের যন্ত্রপাতি আর কাঁচামাল পাওয়া শুরু হো’ল, ফলে চলচ্চিত্র শিল্পেও এল তেজীভাব। বেড়ে গেল ছবি নির্মাণের সংখ্যা ও গুণগত মান। পার্থক্যটা বোঝা যাবে এ দু’টি সংখ্যা থেকে যে ১৯২১ সালে যেখানে মাত্র ১১টি ছবি তৈরী হয়েছিল, ১৯২৪ সালে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬৭-টিতে।

তবে নতুন সোভিয়েত রাষ্ট্রে কী ধরণের ছবি তৈরী হবে তা’ নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেও মতবিরোধ ছিল। নেতৃস্থানীয় অনেক কমরেডই ফিল্মে আভা গাঁর্দ জাতীয় নানা নিরীক্ষার বিরুদ্ধে ছিলেন। কিন্তু লেনিনের আলোকিত নেতৃত্ব, এবং পরে ১৯২৫ সালের জুলাইয়ের সোভিয়েত পলিটব্যুরোর এক ইতিবাচক সিদ্ধান্তের ফলে, চলচ্চিত্রে সৃজনশীল নিরীক্ষার সামনে থেকে অনেক বাঁধা সরে যায়। কিছুটা উদারনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসে এবং অসাধারণ কিছু চলচ্চিত্র আমরা নির্মাণ হতে দেখি-“দি ব্যাটলশিপ পতেমকিন” (১৯২৫), “অক্টোবর” (১৯২৭), “মাদার” (১৯২৬), “আর্থ” (১৯৩০)। আইজেনস্টাইন-পুদোভকিন-কুলেশভ-দভচেঙ্কো-জিগা ভের্তভের মতো মেধাবী পরিচালকেরা রাশিয়ার চলচ্চিত্রকে খুবই উচ্চ এক শিখরে নিয়ে গেলেন। তবে কেবল চলচ্চিত্রনির্মাতারাই নয়, এ কৃতিত্বের দাবীদার হিসেবে সিনেমার বাইরের জগতের অন্ততঃ দু’জন শিল্পীর নাম তো বলাই যায়, কবি মায়াকোভস্কি আর নাট্যপরিচালক মেয়েরহোল্ড, যাঁরা আইজেনস্টাইনসহ তরুণ চলচ্চিত্রনির্মাতাদেরকে নানাভাবে সাহায্য ও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। এঁরা ছাড়াও সাহিত্যিকদের মধ্যে ম্যাক্সিম গোর্কি, আলেকসান্দার ব্লক, আলেতিলস্তয় নানাভাবে চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং বিপ্লবোত্তর রুশ সিনেমার সৃজনশীল বিকাশে অবদান রেখে গেছেন।

কোনো শিক্ষকের তালিকায় যদি এমন সব ছাত্রদের নাম থাকে-আইজেনস্টাইন, পুদোভকিন, কুজনেৎসেভ, তা হলে বুঝতে হবে তিনি খুব উঁচুদরের শিক্ষকই ছিলেন! তেমনই এক শিক্ষক ছিলেন লেভ কুলেশভ (১৮৯৯-১৯৭০)। প্রথম দিকে কুলেশভ সরকারী মস্কো ফিল্ম ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ দিতেন। কিন্তু ওঁর প্রশিক্ষণ প্রণালীটি একান্ত নিজস্ব ও ভিন্নধর্মী হওয়ায় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কুলেশভের বিরোধ ঘটতে থাকে। তখন সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ কুলেশভকে একটা আলাদা স্টুডিওই গড়ে দেন যা পরে ”কুলেশভের ওয়ার্কশপ” নামে বিখ্যাত হয়ে ওঠে এবং যেখানে চলচ্চিত্র মাধ্যমটির ভাষা ও নন্দনতত্ত্ব নিয়ে কুলেশভ ও ওঁর ছাত্ররা যুগান্তকারী সব নিরীক্ষা চালাতে থাকেন। চলচ্চিত্র নন্দনতত্ত্বে যে অবদানটির জন্যে কুলেশভ, এবং পরে আইজেস্টাইনসহ বিপ্লবোত্তর রুশ চলচ্চিত্রকারেরা বিশেষ কৃতিত্বের দাবী করতে পারেন, তা’ হচ্ছে-মন্তাজ। এই মন্তাজতত্ত্ব নিয়ে পরে আমরা কিছুটা বিশদে আলোচনা করব। তবে এই পর্যায়ে মন্তাজের সৃষ্টি সম্পর্কে “মাদার” ছবির পরিচালক পুদোভকিন কী বলেছিলেন তা একটু দেখে নেয়া যাক। পুদোভকিন ওঁর “আর্ট অব সিনেমা” বইটির ভূমিকায় বলেন; “আমরা চলচ্চিত্র সৃষ্টি করে থাকি, কিন্তু কুলেশভ সৃষ্টি করেছেন চলচ্চিত্র বিজ্ঞান। লেভ কুলেশভ আমাদের দেখার চোখ তৈরী করে দিয়েছেন এবং তিনিই আমাদেরকে মন্তাজ রীতির অ-আ-ক-খ শিখিয়েছেন।”

বিপ্লবের গৃহযুদ্ধের সেই দিনগুলিতে মস্কোয় কিছুই পাওয়া যেত না। এমন কী বিদ্যুতও ছিল না ঠিক মতো। সেই সময় ঠান্ডা বরফের মাঝে স্যঁতসেতে কোনো ঘরে, বা  বরফাচ্ছন্ন কর্দমাক্ত পথে, হয়তো অভুক্ত অবস্থাতেই, মন্তাজের রীতি-প্রকরণ নিয়ে, এর ইন্টেলেকচুয়াল ও এপিক সম্ভাবনা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করে চলেছেন কুলেশভের ছাত্ররা-আইজেনস্টাইন ও পুদোভকিনেরা। জন্ম নিচ্ছিল আধুনিক চলচ্চিত্রের ভাষা ও ব্যাকরণও।

চলচ্চিত্র নন্দনতত্ত্বের ইতিহাসে শট সাজানোর ক্ষেত্রে কুলেশভের একটা নিরীক্ষা “মোঝুখিন এক্সপেরিমেন্ট” নামে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে। কুলেশভ সে আমলের পরিচিতমুখ একজন অভিনেতা মোঝুখিনের ভাবলেশহীন মুখের একটা ছবি তুললেন। তারপর শট নিলেন থালাভর্তি কিছু খাদ্য দ্রব্যের। তারপর তুললেন কফিনে শায়িত একজন মহিলার মৃতদেহ। মোঝুখিনের শটটা যখন থালাভর্তি খাদ্য দ্রব্যের শটটির পাশে রেখে দেখানো হো’ল মনে হো’ল মানুষটার মুখটা যেন ক্ষুধার্ত। আবার ওই মুখের ছবিটাই যখন পুতুল-নিয়ে-খেলা-করা শিশুটির শটের পাশে স্থাপন করা হো’ল মনে হো’ল মুখটি যেন স্মিত মুখে হাসছে, বাচ্চাদের দেখে আমরা যে রকম হেসে থাকি। আবার ওই একই শট যখন কফিনে-শোয়ানো-মহিলার মৃতদেহটার পাশে রাখা হো’ল তখন মনে হো’ল-মুখটা খুবই বিষন্ন। কুলেশভের এই নিরীক্ষার ফলে সিনেমায় শট সাজানোর মন্তাজতত্ত্বের আদি রূপটা প্রকাশ পেল। তা’ হচ্ছে কোনো একটা একক শটের অর্থ অনেকটাই নির্ভর করে তার আগে বা পরে দর্শক কী শট দেখছে। আগে-পরে রাখা শটের কারণে কোনো বিশেষ শটের ভিন্ন একটা অর্থ সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে। এবং যায়ও। শট সাজানোর এই সহজ তত্ত্বটিকে পরে আরো জটিল ও বিদগ্ধ রূপ দিলেন প্রতিভাবান আইজেনস্টাইন। শুরু হোল চলচ্চিত্র সম্পাদনার আধুনিক এক ভাষা। তবে তার আগে আমরা লেভ কুলেশভ ও ওঁর অবদান সম্পর্কে আরো কিছু কথা বলে নিতে চাই।

অক্টোবর বিপ্লবের পরে জারের আমলের চলচ্চিত্র শিল্পপতিরা কাঁচা ফিল্ম নষ্ট করে, মেশিনপত্রের ক্ষতিসহ নানা অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করে দেশ থেকে পালিয়ে যায়। রুশ বিপ্লবকে আঁতুড়ঘরেই ধ্বংস করতে চৌদ্দটি সা¤্রাজ্যবাদী দেশ এই নতুন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গড়ে তোলে শক্তিশালী বাণিজ্যিক অবরোধ। ফলে বিপ্লবের পর তৎকালীন নবগঠিত সোভিয়েত ইউনিয়নে অন্যান্য অনেক পণ্যদ্রব্যের মত কাঁচা ফিল্মেরও ছিল গভীর সঙ্কট। দেশে কাঁচা ফিল্ম নেই, তাই নতুন ছবি তৈরী করার সুযোগও নেই। কুলেশভ তখন হাতের কাছে নাগাল পাওয়া পুরনো মার্কিন ও ফরাসী ছবির প্রিন্ট কাটাকাটি করে, নতুন ভাবে সেসব শট আবার জোড়া লাগিয়ে, সম্পাদনা নিয়ে চালাতে থাকলেন নানারকম নিরীক্ষা-শুরু হো’ল মন্তাজ-রীতির বৈচিত্র্যময় সব সম্ভাবনা। এই যে কোনো কাঁচা ফিল্ম ব্যবহার না করেই কোনো চলচ্চিত্র সৃষ্টি, এ নিরীক্ষার নাম কুলেশভ দিয়েছিলেন “ফিল্মস উইদাউট ফিল্মস” যা ভবিষ্যতে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে “কুলেশভ এফেক্ট” নামে পরিচিতি পেয়েছে। পরে যখন আবার কাঁচা ফিল্ম পাওয়া শুরু হো’ল তখন এই প্রথাবিরোধী ও নানাভাবে ছবি কাটাকাটির মাধ্যমে নানা রকম মন্তাজ সৃষ্টির অপার সম্ভাবনার দিকটা বোঝা গেল।

তবে কুলেশভের নিরীক্ষার কোনো শেষ ছিল না। যেমন, যেহেতু গৃহযুদ্ধ ও পশ্চিমা দেশগুলোর অবরোধের কারণে দেশে নেগেটিভ ফিল্ম নেই, ফলে ছবির প্রিন্ট কী দিয়ে করা ? কুলেশভ তখন পুরনো ফিল্মের গা থেকে রাসায়নিক প্রলেপটা তুলে ফেলে নতুন ইমালশান মাখিয়ে এক ধরণের গৃহনির্মিত কাঁচা ফিল্ম তৈরী করলেন। অবশ্য এ ফিল্মের প্রিন্ট বেশী দিন টেঁকসই ছিল না। তবে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও যে ফিল্ম তৈরী করা সম্ভব, এ ঘটনা সে ব্যাপারে একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ হয়ে রইল, বিশেষ করে সেই সব চলচ্চিত্রকারদের জন্যে, যাঁরা এস্টাব্লিশমেন্টের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে ছবি তৈরী করতে চান।

কুলেশভের আরেকটা অবদানও স্মরণীয়। সে যুগে স্তানিস্না¯ভস্কির “মেথড অভিনয়”-কে অলঙ্ঘনীয় ধরা হোত। কুলেশভ বললেন যে স্তানিস্নাভস্কির অভিনয়রীতি মঞ্চের জন্যে সুপ্রযোজ্য হলেও সিনেমার পর্দার জন্যে সর্বদা উপযুক্ত নয়। ওঁর “দি স্ট্রেঞ্জ অ্যাডভেঞ্চার অব মিস্টার ওয়েস্ট ইন দি ল্যান্ড অব বলশেভিকস” (১৯২৪) ছবিতে স্তানিস্নাভস্কির অভিনয়রীতির বাইরে অভিনয় করিয়ে কুলেশভ মৌলিকত্বের পরিচয় দিয়েছেন যা সে যুগের বিচারে ছিল যথেষ্টই সাহসী এক পদক্ষেপ।

তাছাড়া একই দৃশ্যের জন্যে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় তোলা ভিন্ন ভিন্ন শট জুড়ে একটাই জায়গা বোঝানো, এই যে “রিক্রিয়েটেড স্পেস” বা “ক্রিয়েটেড জিওগ্রাফি” সৃষ্টি, সিনেমার এই ধারণাটাও কুলেশভের সৃষ্টি। সাইবেরিয়ার দৃশ্য দেখাতে আর সাইবেরিয়ায় শুটিং করতে যাবার দরকার নেই। ঘন বরফাচ্ছদিত একটা প্রান্তর হলেই চলে। বর্তমানে সব ছবিতেই এই “রিক্রিয়েটেড স্পেস”-য়ের ব্যবহার দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু চলচ্চিত্রের সেই হাঁটি হাঁটি পা পা সময়ে এ ধারণাটার আবিষ্কারও ছবি নির্মাণে ব্যাপক শ্রম, সময় ও সম্পদ বাঁচিয়েছে।

তবে কেবল একজন চলচ্চিত্র-তাত্ত্বিক ও চলচ্চিত্রের সম্পাদনা নিয়ে নিরীক্ষাকারী হিসেবেই যেন কুলেশভকে দেখা না হয়। কুলেশভ একজন সৃজনশীল নির্মাতাও। ওঁর “দি স্ট্রেঞ্জ অ্যাডভেঞ্চার অব মিস্টার ওয়েস্ট ইন দি ল্যান্ড অব দি বলশেভিকস” (১৯২৪) ও “বাই দি ল ” (১৯২৬) যথেষ্টই উপভোগ্য ছবি।

বিপ্লবোত্তর রুশ চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে সের্গেই আইজেনস্টাইন (১৮৯৮-১৯৪৮) নিঃসন্দেহে ছিলেন সবচে’ মেধাবী ও সৃজনশীল। আইজেনস্টাইন যথার্থই ছিলেন একজন মৌলিক ও প্রথাভাঙ্গা আইকোনোক্লাস্ট শিল্পী। স্থাপত্যের ছাত্র ছিলেন। পরে লালফৌজে যোগ দেন। শীতপ্রাসাদ আক্রমণের সময় তরুণ আইজেনস্টাইন পেত্রগ্রাদে ছিলেন। প্রত্যক্ষ করেছেন শ্রমিক-সৈনিক শক্তির অপরিমেয়তা। এক সময় এজিট ট্রেনে পোস্টার লেখা ও ছবি আঁকার কাজ করেছেন। পরে যোগ দেন প্রলেটকুল্ট থিয়েটারে। কিন্তু ব্যাপক সংখ্যক জনগণের কাছে বক্তব্যকে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে মঞ্চের চেয়ে সিনেমার সুবিধা বেশী দেখে চলে এলেন ছবির জগতে এবং অচিরেই ওঁর হাত দিয়ে বের হওয়া শুরু হো’ল অনবদ্য সব চলচ্চিত্র যার অনেকগুলোই চিরকালের জন্যে মাস্টারপিস হিসেবে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ও নন্দনতত্ত্বে জায়গা করে নিয়েছে-“স্ট্রাইক” (১৯২৪), “দি ব্যাটলশিপ পতেমকিন” (১৯২৫), “অক্টোবর” (১৯২৭), “আলেকসান্দর নেভস্কি” (১৯৩৮), “আইভান দ্য টেবিরল” (১৯৪৪-৪৫, দুই পর্বে)। তবে আইজেনস্টাইন কেবল একজন চলচ্চিত্র-নির্মাতাই ছিলেন না, ছিলেন চলচ্চিত্রের তাত্ত্বিক ও একজন চলচ্চিত্র দার্শনিকও। ওঁর অপরিমেয় মেধা দিয়ে  মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী আইজেনস্টাইন সিনেমার ভাষা ও নন্দনতত্ত্বকে ব্যাখ্যা করতে চাইলেন। আর এ ব্যাপারে আইজেনস্টাইন প্রচুর লেখালিখিও করেছেন যা ওঁর বইগুলিতে সন্নিবেশিত হয়ে আছে। আইজেনস্টাইনের লেখা “ফিল্ম ফর্ম”, “ফিল্ম সেন্স” ও “নোট্স ফ্রম এ ফিল্ম ডিরেক্টর” এসব বইগুলি প্রতিটা চলচ্চিত্রের ছাত্রের জন্যেই আজ হয়ে উঠেছে অবশ্য পাঠ্য টেক্সটবইয়ে।

ওঁর প্রথম ছবি “স্ট্রাইক” (১৯২৪) সম্পর্কে আইজেনস্টাইনের ভাষ্য ছিল, এ ছবিতে; “বুর্জোয়া সিনেমার ব্যক্তিত্ববাদ ও ত্রিভুজ নাটকের বৈপরীত্যে জনতার যৌথ উদ্যোগ ও মিলিত কর্মকান্ড আমরা পর্দায় তুলে ধরলাম।” দর্শক দেখতে পেল, এ সত্যিই এক নতুন ধরণের সিনেমা, দৃশ্যগত এক নতুন ধরণের-নন্দনতত্ত্বও।

আইজেনস্টাইনের পরের ছবি “দি ব্যাটলশিপ পতেমকিন” (১৯২৫) ছবিটিকে অনেকেই বিশ্বের সর্বকালের সেরা সিনেমা মনে করেন। জনপ্রিয়তার অর্থে নয়, চলচ্চিত্রের ভাষা ও শৈলীর ব্যবহারের দিক থেকে। ছবিটি ১৯০৫ সালে রুশ নৌ-বাহিনীর “পতেমকিন” নামে এক যুদ্ধজাহাজের নাবিকদের বিদ্রোহ নিয়ে তৈরী। এ ছবিতে কৃষ্ণসাগরের পারে ওদেসা বন্দরের সিঁড়িতে কসাক বাহিনীদের চালানো একটা গণহত্যার দৃশ্যকে, যা “ওদেসা স্টেপ সিকোয়েন্স” নামে খ্যাত, দুনিয়াজুড়েই চলচ্চিত্র-নন্দনতাত্ত্বিকরা বিশ্ব চলচ্চিত্রের সেরা একক সিকোয়েন্স হিসেবে মর্যাদা দিয়ে থাকেন।

১৯২৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের দশম বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ আইজেনস্টাইনকে একটা চলচ্চিত্র নির্মাণের দায়িত্ব দেন। রুশ বিপ্লব নিয়ে জন রীডের বিখ্যাত বই “টেন ডেজ দ্যাট শুক দ্য ওয়ার্ল্ড” নিয়ে আইজেনস্টাইন নির্মাণ করলেন “অক্টোবর”(১৯২৭) ছবিটি। এছাড়া ওঁর “ওল্ড অ্যান্ড নিউ”(১৯২৯) এবং “আলেকসান্দর নেভস্কি”(১৯৩৮)-ও গুরুত্বপূর্ণ ছবি। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নে নির্মিত ওঁর সর্বশেষ ছবি মধ্যযুগের অত্যাচারী জার আইভানকে নিয়ে “আইভান দি টেরিবল” (১৯৪৪-৪৫, দুই পর্বে)। ছবিটির জন্যে আইজেনস্টাইন ঝামেলায় পড়েন। সোভিয়েত রাশিয়ায় তখন স্তালিনের ঘোরতর ব্যক্তিপূজার আমল। স্তালিন হয়তো মনে করেছিলেন এ ছবিতে ওঁর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। ফলে আইজেনস্টাইনের পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নে আর ছবি নির্মাণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরে হলিউডের বামপন্থী কিছু বন্ধুর আমন্ত্রণে আইজেনস্টাইন আমেরিকায় যান। তবে হলিউডী মুভীমোগলরা আইজেনস্টাইনকে ঠিকই চিনেছিল। আইজেনস্টাইনকে তারা আমেরিকা ছাড়া করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা বলত; “একজন লাল পরিচালক একটা লালফৌজ রেজিমেন্টের চেয়েও বিপজ্জনক।” এবং তারা আইজেনস্টাইনকে আমেরিকা ছাড়তে বাধ্যও করে। যেমনটি তারা করেছিল ম্যাকার্থীবাদের দিনগুলিতে চ্যাপলিনকেও হলিউড ছাড়তে।

আমেরিকায় ছবি বানাতে না পেরে আইজেনস্টইন চলে গেলেন মেক্সিকোতে। সেখানে শুটিংও করলেন। কিন্তু পুঁজির সঙ্কটে ছবিটা আর শেষ করতে পারলেন না। পরে অবশ্য “কু ভিভা মেক্সিকো” নাম দিয়ে ওই ছবিটা বের হয়।

এটা দুঃখজনক যে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ভাষা ও নন্দনতত্ত্বে যে মানুষটির এত বড় অবদান সেই আইজেনস্টাইনের পরিণতিটা সুখের হয়নি। স্তালিনের ব্যক্তিপুজার আমলে, বিশেষ করে “আইভান দি টেরিবল” করার পর থেকে স্তালিনীয় আমলাতন্ত্রের দাপটে, আইজেনস্টাইনের পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নে ছবি তৈরী করা আর সম্ভব হয়নি। অন্য দিকে আমেরিকায় গিয়েও হলিউডের স্থূল পুঁজিতান্ত্রিকতায় ওঁর পক্ষে ছবি বানানো অসম্ভব হয়ে পড়ল। এটা মানব-সংস্কৃতিরই এক বড় ক্ষতি হয়ে দাঁড়াল যে আইজেনস্টাইন আর ছবি বানাতে পারলেন না। কারণ ওঁর প্রতিটা ছবিই সিনেমার ভাষা ও নন্দনতত্ত্বের সীমান্তকে প্রসারিত ও এই নবীন শিল্পটিকে বিরাটভাবে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।

আইজেনস্টাইনের সবচে বড় অবদান কুলেশভের পরে মন্তাজের ধারণাটাকে তিনি নানাভাবে বিকশিত করে, তাকে সংজ্ঞায়িত ও প্রণালীবদ্ধ করে, কেবল ওঁর সিনেমাগুলিতেই ব্যবহার করলেন তা নয়, ওঁর লিখিত বইগুলিতেও সে সম্বন্ধে বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিলেন। এস্কাইলাস-সফোক্লিসের যুগে তাঁদের ধ্রুপদ নাটককে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার জন্যে যেমন একজন এরিস্টটলের জন্ম হয়েছিল, তেমনি সিনেমার জন্মযুগে এই নবীন শিল্পকে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করার জন্যে যেন এলেন-আইজেনস্টাইন। যিনি একাধারে নিজেই একজন সৃজনশীল শিল্পী আবার শিল্পের বৈয়াকরণিকও। বলা চলে আধুনিক চলচ্চিত্রের ব্যাকরণটার জন্মই হো’ল আইজেনস্টাইনের হাত ধরে।

“মন্তাজ” শব্দটি আদিতে এক ফরাসী শব্দ। এর সহজ মানেটা হচ্ছে সম্পাদনা। কিন্তু কুলেশভ-আইজেনস্টাইনসহ রুশ চলচ্চিত্রনির্মাতারা এর ভিন্ন এক মানে উপস্থাপন করলেন। শটগুলি শুধু পাশাপাশি রাখা বা Juxtaposition নয়, গ্রিফিথ-পোর্টাররা এই Juxtaposition শব্দটা ব্যবহার করতেন, কুলেশভ-আইজেনস্টাইন বড় করে আনলেন, শট সাজানোর ক্ষেত্রে একেবারেই ভিন্ন এক ধারণা- এই মন্তাজ তত্ত্বটি। ওঁদের হাতে “মন্তাজ” শব্দটিই অর্জন করল ভিন্ন এক অর্থ।

মন্তাজের প্রথম ব্যবহার আইজেনস্টাইন করেন ওঁর “দি স্ট্রাইক” (১৯২৪) ছবিটিতে। নাম দিয়েছিলেন “মন্ট্রাজ অব অ্যাট্রাকশন্স” (Montage of Attractions)। সহজ অর্থে প্রতিটি শটে এমন কোনো উপাদান থাকা চাই, যা তার আগের বা পরের শটের সঙ্গে যুক্তভাবে, দর্শকের মনকে মনোযোগী ও আকৃষ্ট রাখতে বা ক্রমাগত সামনের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। আর এ ক্ষেত্রে কেবল পরিপার্শ্ব থেকে নয়, প্রয়োজনে মূল থীমের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাইরে থেকেও কোনো বিষয়ের শট ব্যবহার করা যেতে পারে।

সাহিত্যে অবশ্য বিষয়টা আগে থেকেই কিছুটা ছিল-Portmanteau word। মানে একই শব্দের মাঝে একাধিক শব্দ ও অনুভূতির অবস্থান। যেমন alcohol + holidays মিলিয়ে alcholidays । জেমস জয়েস যেমন ব্যবহার করেছেন Silvamoonlake বা Skybrightly -র মতো শব্দ। বাংলায় যেমন ধোঁয়া + কুয়াশা = “ধোঁয়াশা” শব্দটি। এসব শব্দের অর্থ বুঝতে তেমন অসুবিধা ঘটে না। সাহিত্যে এক শব্দের মধ্যে এই একাধিক অনুভূতির অবস্থান, এই Portmanteau word -কেই, বলা চলে সিনেমায় মন্তাজতত্ত্বের আদি ভিত্তি।

এই মন্তাজতত্ত্বকে আইজেনস্টাইন ক্রমশঃ দাঁড় করালেন মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী তত্ত্বের ভিত্তির উপর। নামও দিলেন “ডায়ালেক্টিকাল সিনেমা” বা “দ্বান্দ্বিক সিনেমা”। মার্কসীয় দ্বান্দ্বিকতার তত্ত্ব-থীসিস-অ্যান্টিথীসিস-সিনথীসিসের উপর ভিত্তি করে আইজেনস্টাইন গড়ে তুলতে চাইলেন ওঁর দ্বান্দ্বিক সিনেমার তত্ত্ব। গ্রিফিথের যুগে, সৃজনশীল চলচ্চিত্র সম্পাদনার ক্ষেত্রে, দু’টো শটের মধ্যে সংযোগকে গুরুত্ব দেয়া হো’ত। আইজেনস্টাইন গুরুত্ব দিলেন দুটো শটের মধ্যেকার সংঘর্ষের উপর। ফলে ১+১=২ নয়, সিনেমায় মন্তাজের ব্যবহারে তা’ হবে ১ x ১=৩। আইজেনস্টাইনের মতে, এটাই হচ্ছে-দ্বান্দ্বিক সিনেমা।

আইজেনস্টাইনের মতে চলচ্চিত্রে মন্তাজ পাঁচ রকম হতে পারে;

(১)          মেট্রিক মন্তাজ (Metric Montage) – ইমেজের দৈর্ঘ্য ও পর্দায় তার স্থায়িত্ব অনুযায়ী মন্তাজ;

(২)          রিদমিক মন্তাজ (Rhythmic Montage)  – দুটো শটের মধ্যেকার ইমেজের মাঝে ছন্দের দ্বন্দ্ব;

(৩)         টোনাল মন্তাজ (Tonal Montage)  – ছবির সাদা-কালো রঙয়ের মাঝে বা রঙগুলির মধ্যেকার   টোনালিটির পার্থক্যের দ্বন্দ্ব।

(৪)          ওভারটোনাল মন্তাজ (Overtonal Montage) – ছবির কোনো বিশেষ একটা ইমেজকে পরে  ছবির অন্য কোনো একটা ইমেজের পাশে রেখে বিশেষ একটা অর্থ সৃষ্টি করা।

(৫)          ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজ (Intellectual Montage) – যে মন্তাজগুলি বুঝতে দর্শককে তার  বুদ্ধিবৃত্তিকে (Intellect) ব্যবহার করতে হয়। এসব মন্তাজগুলির প্রকৃত মাজেজা উপলব্ধি করতে হলে দর্শকের  ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান, এসব সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে।

ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজকে আইজেনস্টাইন আবার দু’ভাগে ভাগ করেছেন-“হিস্টোরিকাল মন্তাজ” (Historical Montage) ও “এপিক মন্তাজ” (Epic Montage)। হিস্টোরিকাল বা ঐতিহাসিক মন্তাজ হচ্ছে যে মন্তাজে ইতিহাসের কোনো ঘটনা, ব্যক্তি, প্রতীক বা অনুষঙ্গকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আর এপিক মন্তাজ হচ্ছে যে মন্তাজে ধর্ম, পুরাণ, মীথ, মহাকাব্য, দেবদেবী, এরকম অনৈতিহাসিক কোনো অনুষঙ্গের উল্লেখ থাকে।

“পতেমকিন” (১৯২৯) ছবিতে আইজেনস্টাইন দু’টো শটের মাঝের গতির দ্বন্দ্ব দিয়েও মন্তাজ সৃষ্টি করে বক্তব্য ফুটিয়ে তুলেছেন। যেমন জাহাজে বিদ্রোহী নাবিকেরা একবার বাঁয়ে ছুটছে, একবার ডানে-প্রতীকে গণচেতনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিম্বা ওদেসার সিঁড়ি দিয়ে জনতা দ্রুত নীচে নামছে/ কাট্/ পরের শটেই মৃত সন্তান কোলে এক উদ্ভ্রান্ত মা একাকী উপরে উঠছেন। দু’টি বিপরীতমুখী শটের এরকম Juxtaposition -য়ে সৃষ্টি হচ্ছে-দ্বান্দ্বিক সিনেমা। আইজেনস্টাইনের মতে কেবল পাশাপাশি দু’টি শটের সংঘর্ষের দ্বান্দ্বিকতা নয়, ফিল্মের গোটা কাঠামোটাও হতে হবে দ্বান্দ্বিক, হতে হবে উত্থান-পতন, উত্তেজনা-স্থিরতায় সুনির্মিত, অনেকটা সিঁড়ির ধাপের মতো, এবং এই ভাবে দ্বান্দ্বিকতার মাধ্যমে এক একটা সিঁড়ি উপরে উঠে ছবির বক্তব্য এগিয়ে যাবে।

তবে মন্তাজ নিয়ে আইজেনস্টাইন সবচে’ বেশী নিরীক্ষা করেছেন ওর “অক্টোবর” (১৯২৭) ছবিটিতে। রুশ বিপ্লবের দশম বার্ষিকীতে তোলা এ ছবিতে স্মলনি প্রাসাদে লেনিনদের অভুত্থান পরিকল্পনার সভা, জারের প্রাসাদের পতন, ক্ষমতালাভের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী কেরেনস্কির ফুলবাবুগিরি, সবই আছে এ ছবিতে। আর আছে মন্তাজ নিয়ে নানা রকম সৃজনশীল নিরীক্ষা। বিশেষ করে মন্তাজের ওই রূপটা নিয়ে, যাকে আইজেনস্টাইন বলতে পছন্দ করতেন-“ইনটেলেকচুয়াল মন্তাজ”। আইজেনস্টাইন বলতেন কেবল দৃশ্যগত বাস্তবতা নয়, বিমূর্ত কোনো ধারণাকে পর্দায় তুলে ধরতে পারাই মন্তাজের সবচে’ বড় সাফল্য। আর এক্ষেত্রে দর্শকদের দিক থেকেও প্রয়োজন পড়বে তার বৃদ্ধিবৃত্তির (Intellect) ব্যবহারের। যে ঘনত্বে ও পৌনঃপুনিকতায় আইজেনস্টাইন “অক্টোবর” ছবিটিতে ইনটেলেকচুয়াল মন্তাজের ব্যবহার করেছেন, তা প্রতীকের ইঙ্গিতে ও গভীরতায় টি.এস এলিয়টের “ওয়েস্টল্যান্ড” বা জয়েসের গদ্যের মতোই ঘন ও বহুমাত্রিক। দু’একটি উদাহরণ দেয়া যাক।

যেমন ক্ষমতালাভের পর কেরেনস্কি সাড়ম্বরে শীতপ্রাসাদে ঢুকছে। জারের প্রাসাদে তো নানা রকম মূর্তি। আমরা দেখি নেপোলিয়ন বুকে হাত রেখে উদ্ধত ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে/ কাট্/ আমরা দেখলাম কেরেনস্কিও নেপোলিয়নের মতো বুকে হাত তুলে দাঁড়িয়ে। মন্তাজটি অর্থপূর্ণ-এই নতুন শাসকও মুখে এখন গণতন্ত্রের কথা বললেও অন্তরে সে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মতোই একজন স্বৈরাচারী। এখন নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ইতিহাস যে দর্শক জানেন তিনিই এ মন্তাজটির প্রকৃত স্বাদ উপভোগ করতে পারবেন যে কী ভাবে ফরাসী বিপ্লবের পর ক্ষমতা দখল করে নেপোলিয়ন নিজেকে স¤্রাট ঘোষণা করেছিল। আবার দেখি একটা ট্যাঙ্ক একটা খাদ পেরোয়/ কাট/ কেরেনস্কি জারিনার শূন্য বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে-কেরেনস্কির অসহায়ত্ব। কিম্বা প্রতিবিপ্লবী জেনারেল কর্নিলভ বলশেভিক বিপ্লবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামছে ধর্মের নামে। আইজেনস্টাইন কাট করে দেখান বারোক যীশু, ডিম্বাকৃতি উজুমি দেবী এসব ধর্মীয় প্রতীককে। দর্শকের মননে পরিস্কার হয়ে ওঠে যুগে যুগে ধর্মের প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকাটি। মননে, কারণ মঞ্চনাটকে ব্রেশটের এলিয়েনেশন তত্ত্বের মতো ইনটেলেকচুয়াল মন্তাজও মূলতঃ দর্শকের চিন্তাশক্তিকে নাড়া দিতে চায়, কেবলই তার আবেগকে নয়। আইজেনস্টাইনের কাছে ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজ এমন এক চলচ্চিত্রিক উপাদান যা দিয়ে তিনি শুধুমাত্র দর্শকের মানসিক আবেগকে বাড়াতে চান না, দর্শকের চিন্তাপ্রবাহকেও প্রভাবিত করতে চান।

একটা ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজ তো আরো সূক্ষ্ম। কেরেনস্কি মুকুটের মতো দেখতে ডেকান্টার নিয়ে খেলা করে, মুকুট মাথায় দেয়/ কাট্/ কারখানার বাঁশী। ইঙ্গিত নতুন এক স্বৈরাচার আসছে, শ্রমিকশ্রেণী জেগে ওঠ। এখানে দু’টো শটের মন্তাজের মাধ্যমে শুধু দু’টি পরস্পরবিরোধী শক্তি নয়, পরস্পরবিরোধী দু’টি শ্রেণীর, দু’টি ভিন্ন মতাদর্শের মধ্যেকার দ্বন্দ্বও যেন ফুটে ওঠে। এক দিকে স্বৈরাচার, অন্য দিকে জনগণের শক্তি। আইজেনস্টাইন বিশ্বাস করতেন এরকম বিমূর্ত আইডিয়াকে চলচ্চিত্রের পর্দায় তুলে ধরতে পারাই, ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজের সবচে সফল ব্যবহার।

তবে কেবল শটে শটে সংঘর্ষের ফলে ছবির পর্দায় চিরন্তন সংঘাত চলতেই থাকবে, সেভাবে যেন আইজেনস্টাইনের তত্ত্বকে সীমিত করে দেখা না হয়। মার্কসীয় দ্বান্দ্বিকতার তত্ত্বে থীসিস্ ও অ্যান্টি থীসিসের দ্বন্দ্বে যে রকম সীনথীসিসের জন্ম হয়, তেমনি পাশাপাশি অবস্থিত দু’টো শটের সংঘর্ষই ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজের শেষ কথা নয়। শুধুমাত্র অংশের যোগফলই সমগ্র নয়, সমগ্রতার নিজেরও একটা বিশেষ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ কথা যেমন পদার্থ বিজ্ঞানে সত্য, আইজেনস্টাইনের ছবির ক্ষেত্রেও সত্য। “অক্টোবর”-সহ আইজেনস্টাইনের যে কোনো মন্তাজসমৃদ্ধ ছবিই তার প্রমাণ।

তাছাড়া কেবল পাশাপাশি দু’টো শট সাজানোই নয়, প্রতিটা শটের নিজের ভেতরেও থাকতে পারে আয়তন ও গভীরতার দ্বন্দ্ব, পুরোভূমির সঙ্গে পশ্চাৎভূমির দ্বন্দ্ব, দূরত্ব ও কোণের দ্বন্দ্ব এবং দৃশ্য ও শব্দের দ্বন্দ্ব। এক শটের ভেতরেও মন্তাজ হতে পারে এবং হয়ও। আইজেনস্টাইন তার নাম দিয়েছেন “Mise-en-Cadre”। সিনেমা, রুশ বিপ্লবের আগে যা ছিল কেবলই প্রযুক্তির এক যাদুকরী চমক, অক্টোবর বিপ্লবের পরে আইজেনস্টাইনদের হাতে তা ক্রমশঃই হয়ে উঠল গভীর মননশীল ও নান্দনিক এক শিল্পমাধ্যম।

আর সিনেমার ভাষায় একটা গোটা ছবির কাঠামোতে মার্কসীয় থীসিস-অ্যান্টিথীসিস ও সিনথীসিসের উপস্থাপনা আইজেনস্টাইন কীভাবে করতে চেয়েছেন তার একটা উদাহরণ দিই। “পতেমকিন”-য়ের বিদ্রোহী নাবিকদের সম্বর্ধনা জানাতে ওদেসাবাসীরা সমাবেত হচ্ছে-থীসিস; ওদেসা বন্দরের সিঁড়ির উপর জারের কসাকবাহিনীর আবির্ভাব ও গণহত্যা পরিচালনা-অ্যান্টিথীসিস, এবং পতেমকিন জাহাজ থেকে কসাক বাহিনীর হেডকোয়ার্টারে গোলাবর্ষণ ও তা’ ধ্বংস-সিনথীসিস। এটাকে একটা গোটা দৃশ্যের দ্বান্দ্বিক চলচ্চিত্রায়ণের উদাহরণ বলা যেতে পারে।

রঙয়ের ক্ষেত্রেও দ্বান্দ্বিকতা ব্যবহারের সুযোগ নিয়েছেন আইজেনস্টাইন ও রুশ নির্মাতারা। এমন কী সাদা-কালো ছবিতেও। “দি জেনারেল লাইন” ছবিতে দেখি কালো হচ্ছে অশুভ, সাদা হচ্ছে সুখ, আশা, শুভ। আবার “আলেকসান্দার নেভস্কি”-তে দেখি সাদা হচ্ছে নিষ্ঠুরতার রঙ, কালো হচ্ছে ইতিবাচক রঙ। নৃশংস জার্মান নাইটদের পোশাকের রঙ সাদা, আর রুশ দেশপ্রেমিক যোদ্ধাদের পোশাকের রঙ হচ্ছে-কালো।

তবে একথা যেন মনে না করা হয় যে ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজ কেবলই বুদ্ধির খেলা, মানবিক আবেগের কোনো জায়গা এখানে নেই। তা হলে আইজেনস্টাইনকে খুব ভুল পাঠ করা হবে। বরং মানুষের মহওর এক আবেগ, মানুষের উপর মানুষের শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আবেগ, তাকে জাগ্রত ও সচেতন করাই ছিল আইজেনস্টাইনের মন্তাজতত্ত্বের মূল লক্ষ্য।

তবে আইজেনস্টাইনের বিরুদ্ধে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যমমানীদের একটা অভিযোগ ছিল যে ওঁর ছবি বড় বেশী বুদ্ধিবৃত্তিক। শ্রমজীবী মানুষ বা সাধারণ দর্শকেরা তা’ অনেক সময়ই বুঝে উঠতে পারেন না। অভিযোগ ছিল চলচ্চিত্রের আঙ্গিক নিয়ে আইজেনস্টাইনের নিরীক্ষাগুলি শ্রমজীবী সাধারণ মানুষদের মাথার উপর দিয়ে যায়। আর স্তালিনের আমলে এসব মধ্যমমানীরা সোভিয়েত রাষ্ট্রতন্ত্রে খুব উঁচু সব পদেই ক্ষমতাসীন ছিলেন। ফলে আইজেনস্টাইনকে খুবই প্রতিকূলতার মাঝে কাজ করতে হয়েছে।

আইজেনস্টাইনের সমসাময়িক ও রুশ বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট আরেকজন সৃজনশীল পরিচালক ছিলেন পুদোভকিন (১৮৯৩-১৯৫৩)। পুদোভকিন প্রথম জীবনে মস্কো স্টেট ফিল্ম স্কুলে নিজউরীল ক্যামেরাম্যান ও পরে অভিনেতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। এর পরে হন চিত্রনাট্যকার, সহকারী পরিচালক ও শেষে একজন সফল নির্মাতা। প্রথম জীবনে কুলেশভের ওয়ার্কশপেরও একজন উৎসাহী ছাত্র ও দক্ষ সহকারী ছিলেন পুদোভকিন। সর্ব অর্থেই ওঁর দীক্ষাগুরু ছিলেন কুলেশভ। পুদোভকিন বেশ বিজ্ঞানচেতনার মানুষ ছিলেন। বলা চলে পৃথিবীর প্রথম বিজ্ঞানবিষয়ক প্রামাণ্যচিত্রটি পুদোভকিনের পরিচালনায় নির্মিত-পাভলভের মস্তিষ্কবিজ্ঞান অনুযায়ী মানবমস্তিস্ক নিয়ে “মেকানিক্স অব দি ব্রেইন” (১৯২৬) । তবে যে চলচ্চিত্রটির জন্যে পুদোভকিন অমর হয়ে রইবেন তা’ হচ্ছে মাক্সিম গোর্কির ধ্রুপদ উপন্যাস “মাদার”-য়ের এক ধ্রুপদ চিত্রায়ন “মাদার” (১৯২৬) ছবিটি।

যদিও আইজেনস্টাইনের সতীর্থ ও বান্ধব ছিলেন পুদোভকিন তবে মন্তাজতত্ত্ব সম্পর্কে দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গীর বেশ পার্থক্য ছিল। আইজেনস্টাইন যেখানে শটে শটে সংঘর্ষের কথা বলেছেন, পুদোভকিন সেখানে জোর দিতে চেয়েছেন শটে শটে সংযোগের উপর। ওঁর কাছে মন্তাজ হচ্ছে বিভিন্ন টুকরোর সংযোগ, ঠিক একটি শিকলের মতো, ইঁটের পরে ইঁট গেঁথে যেমন একটা দালান তৈরী করা হয়। মন্তাজকে পুদোভকিন মূলতঃ দেখেছেন একটা প্রতীক হিসেবে এবং ওঁর “মাদার” ছবিতে সে রকম প্রতীকের অভাব নেই।

তাছাড়া আইজেনস্টাইনের ছবিতে যেমন বুদ্ধিবৃত্তির দিকে ঝোঁক, পুদোভকিনের ঝোঁক আবার গীতিময়তার দিকে বেশী। আইজেনস্টাইন আর পুদোভকিনের প্রতিতুলনা টেনে সত্যজিৎ রায় যথার্থই বলেছিলেন; “সঙ্গীতের উপমা দিলে বলতে হয় আইজেনস্টাইন যেন বাখের কথা স্মরণ করান, আর পুদোভকিন যেন বেটোফেনের সমগোত্রীয়।”

আসলেই পুদোভকিনের ছবিগুলিতে ওঁর গীতিময় মনের এমন একটা ছাপ ফুটে ওঠে যা বিপ্লবোত্তর অনেক রুশ নির্মাতারই ছিল না। তৎকালীন জনপ্রিয় প্রলেটকুল্টবাদে প্রভাবিত অনেক নির্মাতার অতিরিক্ত বুদ্ধিবাদিতা বা কেবলই “ইন্টেলেকচুয়াল সিনেমা” নিয়ে তাঁদের অতি উৎসাহের ফলে অনেকের কাজেই মানুষের স্বাভাবিক মানবিক আবেগ-অনুভূতি পর্দায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে। সে অভিযোগ পুদোভকিনের বিরুদ্ধে করা যাবে না। পুদোভকিন কখনোই অতিরিক্ত বুদ্ধিবাদের কাছে ওঁর হৃদয়বৃত্তিকে হারাতে দেননি। পুদোভকিন হয়তো সেই ধারার একজন বামপন্থী শিল্পী যাঁর সম্পর্কে হয়তো বলা চলে; “আমি বামপন্থী, কিন্তু হৃদয়ের চেয়ে বামে যেতে রাজী নই।”

বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত সরকারী নন্দনতত্ত্ব ছিল “সোশ্যালিস্ট রিয়ালিজম” বা “সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাবাদ”। পার্টির এই সাংস্কৃতিক লাইন বা কেবল বুদ্ধিবৃত্তির বদলে পুদোভকিনের দর্শকের হৃদয়ের কাছে আবেদন, এ একটা সংযোজনই বলব। তাছাড়া বিপ্লবোত্তর সে সময়ের, আইজেনস্টাইনসহ, অনেক রুশ নির্মাতার ছবিতে ব্যক্তিনায়ক তেমন নেই, শ্রেণী বা যৌথতা হচ্ছে শক্তি, জনতাই যেন নায়ক, কিন্তু পুদোভকিনে যৌথতা থাকলেও, নায়ক হচ্ছে ব্যক্তি, “মাদার”-য়ে কখনো দেখি তা পাভেল, কখনো বা তার মা। শ্রেণী বা যৌথতার বদলে ব্যক্তিকে ছবির প্রধান প্রটাগনিস্ট করা, এ-ও সে যুগের সোভিয়েত আবহে পুদোভকিনের এক সাহসী কাজই।

তাছাড়া যুথবদ্ধতা সব সময় ইতিবাচক নাও হতে পারে। একা খারাপ এবং যৌথতা ভালো এ ধারণা সব সময় কি ঠিক ? ফ্যাসিস্টরাও তো যুথবদ্ধ থাকে। ওদেসার সিঁড়িতে দলবদ্ধভাবে যে নৃশংস কসাক সৈন্যরা এগিয়ে আসে একটা অশুভ পাথুরে দেয়ালের মতো, এবং চালায় গণহত্যা, তারাও কিন্তু একক ব্যক্তি মানুষ ছিল না, ছিল এক-যৌথ শক্তিই।

“মাদার” ছবির ক্যামেরাম্যান ছিলেন অত্যন্ত সৃজনশীল এক চিত্রগ্রাহক আনাতোলি গলোভনায়া। সে যুগে প্রতিভাবান পরিচালক ও ক্যামেরাম্যানদের এক ধরণের যুগলবন্দী জুটি গড়ে উঠতে লক্ষ্য করি আমরা, যাঁদের কাজ অক্টোবর বিপ্লবোত্তর রুশ ছবিকে নান্দনিকতার একটা উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল-পুদোভকিন-গলোভনায়া, আইজেনস্টাইন-টিশে, দভচেঙ্কো-দেসুৎস্কি।

রাজনীতি ও গীতিময়তাকে সফলভাবে মেলাতে সক্ষম ছিলেন বিপ্লবোত্তর আরেক রুশ পরিচালক আলেকসান্দার দভচেঙ্কো (১৮৯৪-১৯৫৬)। একটা চমৎকার গীতল সুষমা জুড়ে থাকে ওঁর ছবিতে। তাই কেউ কেউ দভেচঙ্কোকে বলে থাকেন “চলচ্চিত্রের কবি”। ফ্রেমের নান্দনিক কম্পোজিশন, আলোছায়ার শৈল্পিক ব্যবহার, প্রয়োজনে স্লো-মোশনের ব্যবহার, এসব দভচেঙ্কোর ছবিকে এমন একটা অনন্য সুষমা দিয়েছে যে ধারার সেরা এক উদাহরণ হচ্ছে ওঁর ছবি “দি আর্থ” (১৯৩০)। এক যৌথ খামার গড়তে গ্রামে যায় এক তরুণ কমিশার। স্থানীয় প্রতিক্রিয়াশীল কুলাকদের হাতে নিহত হয় সে। ছবির কাহিনী এটা হলেও পুরো ছবি জুড়ে রয়েছে নদী, শস্যক্ষেত, সংবেদনশীল নারীর মুখ, খোলা প্রান্তরে ঘোড়া, উদার আকাশ। দভচেঙ্কোর “দি আর্থ” ছবির গীতিময় সৌন্দর্য্য এ ছবিকে চলচ্চিত্রের নির্বাক যুগের এক মাস্টারপীসে পরিণত করেছে। “দি আর্থ” তুলে ধরে মানব জীবননাট্যে প্রকৃতিরও যেন একটা ভূমিকা রয়েছে। মানবজীবনে প্রকৃতির ভূমিকাকে তুলে ধরা, যে ধারাটি পরবর্তীকালে বিশ্বের অনেক চলচ্চিত্রকারকেই প্রভাবিত করে এসেছে, যার মাঝে আমাদের সত্যজিৎ রায়ও রয়েছেন, সে ধারার এক আদিপুরুষ ছিলেন দভচেঙ্কো। তবে স্তালিনযুগের সরকারী আমলারা এক সময় দভচেঙ্কো, ও বিশেষ করে “দি আর্থ” ছবিটির বিরুদ্ধেও, লেগেছিল। ছবিটিকে তারা “পরাজয়বাদী”, এমন কী “প্রতিবিপ্লবী”-ও অ্যাখ্যা দিয়েছিল!

বিপ্লবোত্তর আরেকজন চলচ্চিত্রকারের কথা বলতেই হবে-জিগা ভের্তভ (১৮৯৬-১৯৫৪)। ভের্তভ কাহিনীচিত্রে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। মনে করতেন, কাহিনীচিত্র হচ্ছে কৃত্রিম, বানোয়াট। ওঁর আগ্রহ ছিল জীবন আসলেই যেমন সেই বাস্তবতার প্রামাণ্যতায়। উনি একটা আন্দোলনই শুরু করেন “কিনো-আই” নামে। যার মূল কথা হচ্ছে ক্যামেরাও একটা চোখ, একটা গোপন চোখ, মানুষের চোখের মতোই তা’ সব কিছু দেখে। আর জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা। সব কিছুই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়। তাই সব কিছুরই ছবি তুলে রাখাটা জরুরী। ওঁর “ম্যান উইথ এ মুভী ক্যামেরা” (১৯২৯) এ ক্ষেত্রে এক ধ্রুপদ সৃষ্টি। সোভিয়েত চলচ্চিত্র বিভাগের পক্ষ থেকে “কিনো প্রাভদা” নামে জিগা ভের্তভ বিশ-পঁচিশ মিনিট দৈর্ঘ্যের মোট তেইশটি সংবাদচিত্র তুলেছিলেন যা সে সময় সিনেমা হলে দেখানো হো’ত। আজ বিশ্বজুড়ে সিনেমা ও টেলিভিশন মিলিয়ে তথ্যচিত্র ও রিপোর্টাজের যে বিশাল জগৎ, বলা চলে, জিগা ভের্তভের মাধ্যমেই তার শুরু।

আজ যদি কেউ জানতে চায় বিশ-তিরিশ দশকে রুশদেশে মানুষের জীবন কেমন ছিল, কেমন পোষাক পরত তারা, ঘরবাড়ী-রাস্তাঘাট-যানবাহন কেমন ছিল, মায় কেমন ছিল মেয়েদের চুল বাঁধার ধরণ, একশ’টি বই পড়েও যা জানা যাবে না, জিগা ভের্তভের তোলা পাঁচ মিনিটের ফুটেজ দেখে তার চেয়ে অনেক বেশী জানা যাবে। চলচ্চিত্র ফুটেজের যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও আর্কাইভাল মূল্য আছে, জিগা ভের্তভই সেটা প্রথম তুলে ধরলেন। আর আজ তো ফিল্ম ফুটেজ ধরে রাখার জন্যে পৃথিবীর দেশে দেশে ফিল্ম আর্কাইভই গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে, বিশেষ করে প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের ইতিহাসে, জিগা ভের্তভ এক অমর নাম।

ক্যামেরার ফ্রেমের নানা জ্যামিতিক কোণ বা কম্পোজিশনের ব্যবহারেও বিপ্লবোত্তর রুশ চলচ্চিত্রনির্মাতারা, বিশেষ করে আইজেনস্টাইনের, ব্যাপক ভূমিকা ছিল। আইজেনস্টাইন ওঁর ছবিগুলিতে খুবই দক্ষতার সঙ্গে-গোলাকৃতি, কৌণিক, তীর্যক, ইংরেজী L -আকৃতি, S -আকৃতি, ত্রিভুজ বা ডায়াগোনাল এসব জ্যামিতিক রূপের অনবদ্য ব্যবহার করেছেন। আইজেনস্টাইন যে প্রথম জীবনে স্থাপত্যবিদ ছিলেন সেই দক্ষতা ও চেতনা কম্পোজিশনের ক্ষেত্রে ওঁর চলচ্চিত্রচর্চাকে গভীরভাবে সমৃদ্ধ করেছে। ক্যামেরাকে বাঁকাভাবে ধরা বা ডায়াগোনাল ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, যেমন “পতেমকিন” ছবিতে কামানের বাঁকা অ্যাঙ্গেল, বা অন্যত্রও এই ডায়াগোনাল অ্যাঙ্গেলের ব্যবহার, আইজেনস্টাইনসহ রুশ চলচ্চিত্রকাররা এতই করেছেন যে পরে ক্যামেরাকে ডায়াগোনাল বা বাঁকাভাবে ধরা অ্যাঙ্গেলটার নামই হয়ে গেল-“রাশিয়ান অ্যাঙ্গেল”।

সে যুগে তখনও চলচ্চিত্রে শব্দ আসেনি। ফলে আইজেনস্টাইনসহ সে যুগের চলচ্চিত্রনির্মাতাদের ব্যাপকভাবে ভরসা করতে হয়েছে ক্যামেরার দৃশ্যগত সৌকর্ষ ও ফ্রেমের নান্দনিকতার উপর। এল গ্রেকোর আঁকা শহরটাকে যেমন ভেতর থেকে, বাইরে থেকে, বিভিন্ন রাস্তাঘাট থেকে ভিন্ন ভিন্ন অ্যাঙ্গেলে দেখা যায়, তা’ আইজেনস্টাইনকে মনে করিয়ে দিয়েছে ক্যামেরার সাবলীল মুভমেন্টের কথা। জাপানী প্রিন্ট থেকে তিনি নিয়েছেন সুপার ক্লোজ-আপের ধারণা। জাপানী অন্য ঐতিহ্যবাহী শিল্পমাধ্যম, যেমন কাবুকী নাটক তাকে দিয়েছে আবেগের নাটুকেপনা ও জোলো সেন্টিমেন্টালিজমের উর্ধ্বে থাকার অনুপ্রেরণা। আইজেনস্টাইনের শিল্পজিজ্ঞাসা ছিল সুগভীর। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ-কাল ও সংস্কৃতি থেকে বিষয়, প্রতীক ও উপাদান নিয়ে উনি ওঁর চলচ্চিত্র ও শিল্পতত্ত্বকে সমৃদ্ধ করতে চেয়েছেন। শিল্পের ক্ষেত্রে আইজেনস্টাইন যথার্থ অর্থেই ছিলেন একজন বিশ্বায়িত শিল্পী।

সিনেমাশিল্পে বিপ্লবোত্তর রুশ চলচ্চিত্রকারদের আরেক অবদান ছিল-“টাইপেজ” (Typage)। চরিত্রের শ্রেণী, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী দৈহিক গড়ন ও  মুখাবয়বকে পর্দায় তুলে ধরা। অবশ্য সাহিত্যে আগেই গোর্কি ও অন্যান্য বামপন্থী রুশ সাহিত্যিকেরা এই টাইপেজের ধারণাটাকে অনেকটাই সামনে নিয়ে এসেছিলেন। টাইপেজ-তত্ত্বের মূল বিষয়টা হচ্ছে পেশার কারণে একজন পরিণত মানুষের নিজের অজান্তেই কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও শরীরী ভাষা গড়ে ওঠে যা অনেকটাই তার পেশা ও শ্রেণীর ইঙ্গিতবহ। চলচ্চিত্রে টাইপেজের প্রয়োজনীয়তা খুব বেশী। কারণ লিখিত সাহিত্যে চরিত্রটা সম্পর্কে দু’এক লাইন লিখে চরিত্রটাকে বর্ণনা করা যেতে পারে। কিন্তু সিনেমার পর্দায় চরিত্রটাকে একবার দেখেই  আমাদেরকে তার সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক অবস্থান বা শ্রেণীগত রূপটা বুঝে নিতে হয়। ফলে অভিনেতার দৈহিক গড়ন ও মুখবয়ব, যাকে রুশ শিল্পীরা টাইপেজ বলতেন, তা সিনেমার পর্দায় খুবই কার্য্যকর এক উপাদান। যেমন “পতেমকিন”-য়ের ওদেসা সিঁড়ির দৃশ্যের চরিত্রদের এক নজর দেখলেই আমরা বুঝতে পারি, কে বুর্জোয়া, কে শ্রমজীবী মানুষ, কেই-বা দোদুল্যমান মধ্যবিত্ত।

চলচ্চিত্রে শব্দ এল ১৯২৭ সালে। শব্দকে তখন মনে করা হো’ত এক হলিউডী উৎপাত কারণ সাউন্ডট্রাকের সংলাপ ক্যামেরার নান্দনিক কাজকে অনেকটাই আচ্ছন্ন করে ফেলছিল। আর হলিউডের প্রথম দিককার ছবিগুলির সাউন্ডট্রাকে তখন কেবলই কথা বা সংলাপ ভরে থাকত। যা ছিল “মুভীজ”, তা’ হয়ে গেল “টকীজ”। রুশ চলচ্চিত্রনির্মাতারাই প্রথম উপলব্ধি করেন যে চলচ্চিত্রে শব্দ মানে কেবল কথা বা সংলাপ নয়, শব্দের আরো নানা রকম নান্দনিক ব্যবহার সম্ভব। শব্দ নিয়ে তাঁরা কত গভীরভাবে ভেবেছিলেন তা’ বোঝা যায় ১৯২৮ সালে শব্দ সম্পর্কে আইজেনস্টাইন-পুদোভকিন-আলেক্সান্দ্রভের বিখ্যাত যৌথ বিবৃতিটি থেকে। চলচ্চিত্রে শব্দের আগমনকে তাঁরা স্বাগত জানালেন, তবে এ-ও যোগ করলেন যে সিনেমায় সংলাপ যেন থিয়েটারী ঢঙয়ে ব্যবহৃত না হয়, ব্যবহৃত হয় যেন মন্তাজ রীতিতে। দৃশ্য ও শব্দের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্কের ব্যাপারটা ছবিতে শব্দ আসার আগেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন আইজেনস্টাইন। “স্ট্রাইক”-য়ের একটা দৃশ্যে আছে পর্দায় শ্রমিকেরা ঘোরাফেরা করছে আর একজন অ্যাকডির্য়ান বাজাচ্ছে। অ্যাকডির্য়ন বাজানোর ব্যাপারটি শ্রমিকদের চলাফেরার ছন্দের ও মানসিক অবস্থার সঙ্গে খাপ খেয়েছে চমৎকার। অথচ ছবিটি নির্বাক এবং বাস্তবে সাউন্ডট্রাকে কোনো শব্দই শোনা যাচ্ছিল না!

তবে অক্টোবর বিপ্লবের পরপরই রুশ চলচ্চিত্রে সৃজনশীলতার যে ব্যাপক প্রকাশ আমরা দেখেছিলাম তা খুব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। লেনিনের মৃত্যুর পরে, বিশেষ করে ত্রিশের দশকের শুরুর দিকে, বলশেভিক পার্টিতে ক্ষমতার নানা পালাবদলের ধাক্কা সিনেমার পর্দার উপর আছড়ে পড়ল। সে সময় শিল্প-সংস্কৃতি সম্পর্কে কমিউনিস্ট পার্টিতেও কট্টর দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পাওয়া শুরু হো’ল। আইজেনস্টাইনকেও এ ব্যাপারে অনেক ভুগতে হয়েছিল। ওঁর “অক্টোবর” ছবির বিরুদ্ধে “ফর্মালিজম” বা আঙ্গিকসর্বস্বতার অভিযোগ উঠল। কমিউনিস্ট পার্টির উপর স্তালিন ও ওঁর স্তাবকদের প্রভুত্ব যত বাড়তে থাকল, সোভিয়েত সিনেমাও তত স্তালিনের ব্যক্তিপূজার কাজে ব্যবহৃত হওয়া শুরু হো’ল। যেমন আইজেনস্টাইনের “অক্টোবর” ছবির প্রথম সম্পাদিত অংশটা থেকে স্তালিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রটস্কিকে বাদ দিতে হবে বলে স্তালিনের সক্রিয় তত্ত্বাবধানে “অক্টোবর” ছবিটার এক বড় অংশ, প্রায় এক হাজার ফুট ফিল্ম, কেটে বাদ দিতে হো’ল! রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্খার শিকারে শিল্প কী ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় তার এক ন্যক্কারজনক উদাহরণ হয়ে রইল “অক্টোবর” ছবির এই ঘটনাটি।

অবস্থা এতটা খারাপ হো’ল যে আইজেনস্টাইনের “বেজহীন মীডো”-র মতো সম্ভাবনাময় একটা চলচ্চিত্রকেও স্তালিনের আমলাতন্ত্র মাঝপথে আটকে দিল। সোভিয়েত রাষ্ট্রে এবং আমলাতন্ত্রে ততদিনে শুরু হয়ে গেছে মধ্যমমানীদের রাজত্ব। অক্টোবর বিপ্লব সৃজনশীলতার যে অগ্নিস্ফূলিঙ্গটি জ্বালিয়ে তুলেছিল সে উজ্জ্বল শিখাটি রাশিয়ার সিনেমার পর্দা থেকে আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে থাকল।

তখনকার সোভিয়েত শিল্পনীতি ছিল “সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা”(Socialist Realism)। আইজেনস্টাইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে উনি “সোশ্যালিস্ট রিয়ালিজম” থেকে সরে গেছেন। এখন এই “সোশ্যালিস্ট রিয়ালিজম” বা “সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা”-টা আসলে কী ? শিল্পে ও নন্দনতত্ত্বে কীভাবে তা কাজ করবে ? এ কী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরের বাস্তবতা ? না কী যে সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখা হচ্ছে সেই স্বপ্নের বাস্তবতা ? তা হলে এখনকার জীবনের প্রকৃত দৈনন্দিন বাস্তবতার ছবি কে আঁকবে ? আর তা আঁকলে দোষ কী ? এসব বিষয়ে সোভিয়েত রাষ্ট্রের সরকারী ব্যাখ্যা তেমন মেলে না। স্তালিনের আমলাতন্ত্রে সে রকম মেধাবী মানুষও কেউ ছিলেন না যে বা যারা “সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা”-র যথার্থ ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম। তারা কেবল মুখে তোতাপাখীর মত “সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা”, “সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা” আওড়াতেন। আসলে আইজেনস্টাইনের মতো সত্যিকারের বিশাল মাপের সৃজনশীল এক শিল্পীকে বোঝার মেধা স্তালিনের স্তাবক আমলাদের ছিল না। আর এ ব্যাপারে আইজেনস্টাইনের নেমেসিস যেন ছিলেন সুমিয়াৎস্কি নামে চলচ্চিত্র শিল্পের এক বড় আমলা। “বেজহীন মীডো” ছবিটাকে সুমিয়াৎস্কি তো আটকে দিলেনই, এমন কী আইজেনস্টাইনকে রীতিমতো ক্ষমা চাইতে হো’ল “সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা” থেকে সরে আসার জন্যে! সুমিয়াৎস্কির কথা আজ আর কেউ মনে রাখেনি। কিন্তু আইজেনস্টাইনের, তথা বিশ্ব সিনেমা শিল্পের, যা ক্ষতি হো’ল তা তো ওই আমলাটি করেই ফেলেছিল। বিশ্ব সিনেমার, কারণ আইজেনস্টাইনের প্রতিটা ছবিই তখন বয়সে নবীন সিনেমা শিল্পটারই ভাষা ও নন্দনতত্ত্বকে আরো প্রসারিত ও বিকশিত করে চলছিল। সংস্কৃতির ইতিহাসে আমরা  দেখি যুগে যুগেই সুমিয়াৎস্কির মতো আমলারা কী ভাবে শিল্প ও শিল্পীদের ক্ষতি করে এসেছে। সম্ভবামি যুগে যুগে !

আর “আইভান দি টেরিবল” (১৯৪৪-৪৫, দুই পর্ব) ছবিটি নিয়ে যে দুঃখজনক ঘটনা ঘটল তার জন্যে সরাসরি স্তালিনকেই দায়ী করা যেতে পারে। যদিও ছবিটা ছিল আইভান নামে মধ্যযুগের এক রুশ স্বৈরশাসক জারকে নিয়ে, কিন্তু স্তালিন বোধহয় এ ছবির মাঝে নিজের প্রতিচ্ছায়াকে দেখতে পেয়েছিলেন। চোরের-মন-পুলিশ-পুলিশের মতো ওঁর মনেও কু ডেকে উঠল। “আইভান দি টেরিবল” ছবিটি নিষিদ্ধ হোল। নিষিদ্ধ হলেন আইজেনস্টাইনও। এরপরে সোভিয়েত ইউনিয়নে আইজেনস্টাইন আর ছবি বানাতে পারেননি। স্তালিন হয়তো বুঝতে খুব ভুল করেননি। আসলে সব স্বৈরশাসকের রূপই তো এক। তা সে মধ্যযুগীয় এক জার হোক কিম্বা বিশ শতকের কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষমতাসম্পন্ন সাধারণ সম্পাদকই হোক, আমলা-পুলিশ-গোয়েন্দা নিয়ে স্বৈরশাসনের প্রকাশ তো প্রায় একই রকম !

আইজেনস্টাইন ও তৎকালীন অক্টোবর বিপ্লব-উত্তর অন্যান্য আরো কিছু রুশ চলচ্চিত্রকারদের জীবনেতিহাস ও পরিণতি দেখলে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে, তা হচ্ছে, শিল্পীর প্রকৃত স্বাধীনতা খুবই দূর্লভ এক বস্তু। স্তালিনের আমলাদের হাতে বিপর্যস্ত আইজেনস্টাইন আমেরিকায় গিয়েছিলেন এই আশা নিয়ে যে “মুক্ত” বিশ্বে হয়তো উনি মুক্তভাবে ছবি বানাতে পারবেন। কিন্তু অচিরেই বুঝলেন এখানেও সিনেমার শিল্পদেবীটি বন্দিনী-হলিউডের পুঁজিপতিদের হাতে। ফলে আমেরিকায় ছবি তৈরীর একাধিক প্রকল্প শুরু করেও কোনোটাই আর শেষ করতে পারেননি আইজেনস্টাইন। বোঝা গেল, সমাজতান্ত্রিক আমলাতন্ত্র, বা ধনতন্ত্রের ব্যক্তিপুঁজি-শিল্পীর প্রকৃত স্বাধীনতা যেন এক মরীচিকাই। এক অধরা সোনার হরিণ !

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত