| 2 মার্চ 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

এ্যাক্র্যোব্যাট ফ্যামিলি উইথ মাঙ্কি

আনুমানিক পঠনকাল: 14 মিনিট

‘সার্কাস দেখতে যাবেন? শহরে সার্কাস আসছে!’

ছোট কাকার বাড়ির কেয়ার টেকার লিটু পাশের দোকান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনে এনে রাসেলের হাতে দিতে দিতে বলে।

‘সার্কাস?’

‘হয়- সার্কাস- দ্য লায়ন সার্কাস নামে এক পার্টি আইছে। হ্যাগো খেলা দ্যাখলে মন ভাল হইয়া যাইবে আনে! বন্ধুর দুঃখ ভুইলা যাইবেন। আপনের বন্ধু স্যুইসাইড খাইছে, না?’

‘তুমি জানো? কে বললো?’

‘কইছে- আপনের কাকাই কইছে!’ এটুকু বলে সলজ্জ হেসে ঘাড়ের কাছটায় চুলকাতে থাকে লিটু।

মাত্রই দুপুরের ঘণ্টা দুইয়ের ভাত ঘুম থেকে উঠেছে রাসেল। ঢাকায় ত’ এমন ভাত ঘুমের অবকাশ মেলে না। দু’দিন হয় পটুয়াখালি এসেছে। শুক্র-শনির আগে পরে দু’টো সরকারী ছুটি যোগ করে চার দিন ছুটি মিলে গেছে। পটুয়াখালির ভেতরেই গ্রামে তাদের দেশের বাড়ির ভিটে-মাটি ছাড়াও মূল শহরে এই বাড়িটা তৈরি হয়েছিল রাসেলের বাবার কৈশোরেই। বাবার অংশ আছে এখানে। তবে, বাবা যেমন ঢাকায় থিতু হয়েছেন তেমন বাবার বড় দুই ভাই ত’ বহুদিন হয় আমেরিকা প্রবাসী। পটুয়াখালি শহরের এই চার তলা বাড়িটা এখন ছোট কাকাই দেখছেন। ছোট কাকার দুই ছেলেও কানাডায় প্রবাসী। কাকীকে বেশি বয়স না হতেই গেঁটে বাতে ধরেছে। ব্যথায় প্রায়ই শয্যাশায়ী থাকেন। কাকা তুলনায় এখনো শক্ত-সমর্থ। প্রবাসী ছেলে-মেয়ে আর অসুস্থ স্ত্রীর কারণে দম বন্ধ করা অফুরন্ত সময় কাটাতে সদ্য রিটায়ার করা ছোট কাকা অনেকটা সময় এখন নানা রকম সামাজিক কাজে-কর্মে ব্যস্ত থাকেন। ঘর দ্যাখে বাড়ির কেয়ার টেকার লিটু আর দু’টো কাজের মেয়ে। রাসেল জানতো যে পটুয়াখালিতে এসেও হয়তো তার ভাল লাগবে না। তবু জয়ের মৃত্যুর পর থেকে ঢাকায় থাকাটা কেমন অসহ্য হয়ে উঠেছিল।

‘যা- কয়দিন কাটায় আয়! আমার ত’ শ্বশুর বাড়ি অনেকদিন যাওয়া হয় না!’

মা উদাস স্বরে কথাটি বললেও রাসেল জানে বিধবা মা তার কোনদিনই যাবে না ঐ বাড়িতে। তরুণী বধূ হিসেবে শাশুড়ি বা বড় দুই জায়ের কোন কোন আচরণ অল্প বয়সে মা’র মনে যে ছায়াপাত করেছিল তা’ আজো মোছেনি। বাবার মৃত্যুর পর মা আরো খানিকটা স্বাধীন। ঢাকায় তাদের বাসাটি যেহেতু বাবা চলে যাবার আগে মা’র নামেই উইল করে গেছেন, কাজেই বাসার ভাড়াতেই মা যথেষ্ট নিজের কর্তৃত্ব নিয়ে চলতে পারেন। রাসেলের বড় ভাইই বরং নিজে চাকুরিজীবী হয়ে ও চাকুরিজীবী স্ত্রী সমেতও মা’র সংসারে যথেষ্ট নমিত হয়েই চলে। ছোট বোনটার বিয়ে সামনে। সামনে মানে সামনের মাসেই। মাত্র সে বিয়ের মহা তোড়জোরে যখন ব্যস্ত-সমস্ত ঝাঁপ দিতে যাবে রাসেল এবং চারুকলার সদ্য পাশ করা ছাত্র হিসেবে বোনের বিয়ের গায়ে হলুদ থেকে শুরু করে যাবতীয় অনুষ্ঠানের সাজ-সজ্জার দায়িত্ব যখন তার ঘাড়ে, তখনি এলো সেই ভয়ানক দুঃসংবাদ। শুক্রবার ছুটির দিনের সকালের খাবারের টেবিলে মোবাইলে ফোন দিল সুমন। তাদের বন্ধু-বৃত্তের সবচেয়ে মেধাবী আবার সবচেয়ে বাউন্ডুলে, খানিকটা বাইপোলার ডিস-অর্ডারে ভোগা জয় গতরাতে তার মীরপুরের মেসবাড়িতে আত্মহত্যা করেছে। জয়ের বাড়িঅলা জয়ের মোবাইল ফোন ঘেঁটে তার বন্ধুদের ফোন দিচ্ছেন। জয়ের বাবা-মা’কেও জানানো হয়েছে। তারা গাইবান্ধা শহর থেকে রওনা করেছেন।

‘আমি কিছুই বুঝতেছি না। শালা এইটা কি করলো? তুই আয়রে- আয়- সবাই মিলা গিয়া বডিটা দেখি। পুলিশে নাকি খবর দিছে- ওর বাড়িঅলা ত’ বললো!’

সকালের খাবার আর চা রেখে ছুটে গেছিল রাসেল। মীরপুর-১১’র অনেক ভেতরের দিকে এক ঘিঞ্জি গলিতে শ্যাওলাধরা এক বাড়ির চারতলা থেকে ছাদে ওঠার সিঁড়িতে একটি রুম ভাড়া নিয়ে থাকত রাসেল। সাথে লাগোয়া খুবই স্বল্প পরিসর একটি বাথরুম। আলনায় শার্ট-প্যান্ট, লুঙ্গি কি কাঠের টেবিলে কিছু বই-পত্র…বইগুলোর কয়েকটি রাসেলের চেনা…নীলক্ষেতের ফুটপাথে পুরনো বইয়ের দোকান থেকে রাসেল আর জয় মিলেই কিনেছিল। পিকাসোর ব্লু আর রোজ পিরিয়ডের উপর একটি বই। মার্ক শাগাল আর গগ্যাঁর জীবনী। অস্বীকার করা যাবে না মফস্বল থেকে এসেও বিদেশী আর্টের ভাল বই ঝাঁ করে বুঝে নেয়া এবং দরকারে এক বেলা না খেয়েও কিনে ফেলার যে প্রবণতা দূর গাইবান্ধার নিম্নবিত্ত পরিবারের জয়ের ছিল, অতটা প্যাশন ঢাকার স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত ঘরের রাসেলের ছিল না। এত মেধাবী ছেলে। তবু কিসের এত নৈরাশ্য চেপে ধরেছিল জয়কে তা’ কে জানবে? ফাইন্যাল পরীক্ষাতেও মোটামুটি ভাল নম্বর ছিল সব বিষয়ে। তবু শেষের দিকে কেমন গুটিয়ে নিচ্ছিল নিজেকে সব কিছু থেকে। ওর গার্লফ্রেন্ড মেয়েটা অনেক চেষ্টা করেছিল ওকে হাসি-খুশি রাখার, কাজের ভেতর রাখার। কিন্তু মেয়েটির সাথে জয়ের দিক থেকে দিনের পর দিন একতরফা দুর্ব্যবহার মেয়েটাকে একসময় হারিয়ে দিল। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার যুদ্ধে তাকে কিছুতেই আর জিততে দিল না। ভার্সিটির হোস্টেল ছেড়ে মীরপুরের অনেক ভেতরের দিকে একটি মেস বাড়িতে কেন চলে গেছিল জয় তা-ও জানেনি রাসেল। শেষের তিন-চার মাস জয়ের সাথে যোগাযোগটা খুব বেশি রাখতে পারেনি রাসেল। সে নিজেও কি জয়ের প্রেমিকা রেখার মতই হতাশ ও ক্লান্ত হয়ে উঠেছিল জয়ের প্রতি? ধৈর্য্যচ্যূতি ঘটেছিল তার? মনে হয়েছিল জয় শুধু শুধুই দুঃখবিলাসী হয়ে উঠছে? হ্যাঁ, অংশত: তাই। সারাক্ষণ একটা থম ধরা, খিটখিটে মেজাজ হয়ে যাচ্ছিল জয়ের। গাঁজায় আসক্তি তৈরি হয়েছিল ওর তৃতীয় বর্ষেই। দেখতে দেখতে কেমন এক প্রতিকার অযোগ্য নিরাময় অযোগ্য অবস্থায় চলে যায় সে! এদিকে পরীক্ষা পাশের পর রাসেলও ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল কোনমতে একটি চাকরি যোগাড়ের জন্য। মাস চারেক বিপুল উদ্যম ব্যয়ে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় ক্রিয়েটিভ ডিজাইনার হিসেবে যেই না মাত্র সে কাজ পেল, তার ভেতরেই এমন একটা খবর! শেষের দিকে জয়ের প্রতি যত বিরক্তি তৈরি হোক তার, বন্ধুর মৃত্যুর সংবাদ যখন ফোনে হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে দিল সুমন- সুমনের মতই জয়ের শেষের দিকের অকারণ খিটখিটে মেজাজ বা দুর্ব্যবহার সব ভুলে রাসেল, সুমন বা শিহাব- ওদের কাছের বন্ধুত্বের শুরুর হাসি-খুশি দিনগুলোই অম্লান হয়ে উঠলো। প্রথম বর্ষের এক বল্গা ঘোড়ার মত কাটানো সব দিন, দ্বিতীয় বর্ষে ওদের গ্রুপ এক্সিবিশনের আগের প্রস্ততি, তৃতীয় বর্ষে একবার একটি রিভার ক্রুইজে তিনদিন কাটানোর সময় ভারত ও নেপালের নামী চিত্রশিল্পীদের সাথে আর্ট ক্যাম্প করার অভিজ্ঞতা…সব কিছু ফেলে এভাবে চলে যাওয়ার কি মানে হয়রে? অপরাধবোধও হচ্ছিল খুব। বন্ধুদের ভেতর রাসেলই ত’ সবচেয়ে কাছের ছিল জয়ের। জয়ের কেন এত ম্যুড স্যুইং হচ্ছে, কেন সে ঢুকে পড়ছে ডিপ্রেশনের হাঁ করা হাঙর মুখের ভেতরে…বন্ধু হিসেবে সে ত’ একটু বোঝার চেষ্টা করতে পারত? জয়ের বাবা-মা রত্নেশ্বর বর্মণ ও মালতী রাণী বর্মণ আসলেন। জয়ের চেহারাও যেমন খানিকটা মঙ্গোলয়েড ছিল, তেমন চেহারার দুই নর-নারী।

‘হামারার চেংড়ি দুইখান। চেংড়া উটি একটাই। আর ত’ বেটার হাতে মরার সময় মুখে আগুন না পামো!’

জয় বলেছিল বটে তার বাবা সাধারণ কৃষক। ক্ষেতি গিরস্থ করে। তাই বলে এতটাই নিন্মবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছে সে এটা কেন গত কয়েক বছরে বোঝেনি রাসেল, শিহাব বা সুমন? জয়ের মামা ঢাকায় থাকেন। ভদ্রলোক একটি সরকারী স্কুলের শিক্ষক। তিনিই তোড়জোর করছিলেন ভাগ্নের লাশ তার জন্মস্থানে নিয়ে যাবার।

ঝটিতি হাতে জয়ের জামা-কাপড় আর আর্টের উপর মোটা কিছু বাংলা-ইংরেজি বই-পত্র সব গুছিয়ে ওর মা-বাবার হাতে তুলে দেবার সময় জয়ের বাবা রত্নেশ্বর বর্মণের মুখ কেমন করুণ দেখালো, ‘উ ইংরেজি বইগিলান হামারা বুঝিবার না পাঁও! তোমরা উয়ার বন্ধু আছিলা। তোমরা উটি লাও। তোমাদের পড়ায় লাগিবেক।’

জয়ের মামার ধার-দেনা করে যোগাড় করা মাইক্রোবাস ভাড়া ওরা বন্ধুরা শেয়ার করতে চেয়েছিল। তবে দরিদ্র পরিবারটির আত্মসম্মানবোধ অপরিসীম। কিছুতেই ছেলের বন্ধুদের সাহায্য নিল না তারা। জয়ের গ্রামে গিয়ে বন্ধুকে চিতায় তুলে দিয়ে তবে আর ফিরেছিল রাসেল-শিহাব-সুমন। চিতা জিনিসটা কেমন যেন তীব্র নিষ্ঠুর! কবরে তা-ও একটা ভরসা থাকে যে এই বোধ করি এখানেই মৃত প্রিয়জনটি নিরিবিলি ঘুমোচ্ছে। কিন্তু লেলিহান চিতায় পুড়তে থাকা মানুষের মাংসের মত বীভৎস, নিষ্ঠুর দৃশ্য আর কিছু কি আছে? জয়ের গ্রাম থেকে ফেরার পর রাসেলের এক ঘোর অবসাদ পেয়ে বসে! মৃত্যু তবে এত সহজ?

‘মা- কয়দিন ঘুরে আসি দেশের বাড়ি থেকে?’

‘আয়- মনটা ভাল লাগবে একটু ঘুরে-ফিরে এলে!’

‘সার্কাস স্যার সন্ধ্যা সাতটায় শুরু হবে। কত আইটেম যে দেহায় তা’ কইয়া হারা যাবে না! দেখনের পর মাথা-টাথা সব ফ্রেশ হইয়া যাবেআনে! আপনি চা-টা খাইয়া রেডি হন,’ লিটু বলতে থাকে।

ইতোমধ্যে কাকার বাড়ির কাজের দুই মেয়ের ভেতর ছোটটি…বয়স বারো/তেরো হবে… বিকেলের খাবার হিসেবে ট্রে-তে ঘন দুধের চা, টোস্ট আর চানাচুর-মুড়ি মাখা রেখে যায়।

‘তাড়াতাড়ি খাইয়া লন, স্যার! খাইয়া চলেন যাই।’

ঘাড় নেড়ে রাজি হয় রাসেল।

‘আপনে কি স্যার ছবি আঁকেন? আপনে পেইন্টার?’

লিটুর কথায় অস্বস্তি ভরে কাকার বাসায় যে রুমে তাকে থাকতে দেয়া হয়েছে, সেই রুমেরই টেবিলের কোণায় গত দু’দিন হয় আঁকতে শুরু করা দু’টো ছবির দিকে তাকায় রাসেল। ঢাকায় শেষ কয়েক মাস এ্যাড এজেন্সির অর্ডারি ছবি ছাড়া কিছুই সে আঁকতে পারছিল না। কিন্ত জয়ের গ্রাম থেকে ঘুরে আসার পর থেকেই মাথায় ঘাই দিচ্ছিল একটি ছবি। পটুয়াখালি আসার আগের দিন সুমন এসেছিল রাসেলের সাথে দেখা করতে।

‘যাবি আমার সাথে পটুয়াখালি? দু’জন মিলে গেলে ভাল লাগত!’

‘যেতে পারলে সত্যি ভাল লাগত- কিন্ত আমাদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে এখন পরীক্ষা চলছে। ড্রয়িং টিচার বলতে গেলে একা আমি। বোঝ কি চাপ চলছে? এই এটা কি আঁকছিস রে? জয়- দেখতে দেখতে এখনি ছবির বিষয় হয়ে গেল?’

‘হুমম্-’

‘তুই শালা এটা পিকাসোর ব্লু পিরিয়ড থেকে নকল করছিস না?’

‘যাহ্- কি বলিস?’

‘নকল দোষের কি? জীবনানন্দ যদি হেলেন অবলম্বনে বনলতা সেন নকল করতে পারে- দেখি- দেখি- দোস্ত- এইটা তোমার পুরাই দ্য ডেথ অফ কাসেমেগাস আর কাসেমেগাস ইন হিজ কফিন ছবি দুইটার অনুকরণে আঁকা। পিকাসোর মতই নীল রঙে আঁকছো দেখি!’

‘এখানে কফিন পেলি কই? আমি ত’ আঁকছি চিতায় জয় বর্মণ!’

‘ঐটুকু আত্মীকরণ ত’ তোমাকে করতেই হবে! বিউটিফুল-স্মার্ট- জয়ের নীল মুখে হাল্কা সাদায় চিতায় শোয়ানোর সময় ওর মুখের চন্দনতিলক, নীলের ভেতরেই চিতার আগুনের লালচে শিখার আভাস- ব্রিলিয়ান্ট, দোস্ত! দ্যাখো-পটুয়াখালি যাইতে যাইতে পিকাসোর মতই ব্লু আর রোজ পিরিয়ড শুরু না হয় তোমার!’ সুমন বলেছিল।

‘এই ছবিটা সোন্দর হইতেছে!’ লিটু আঙুল নির্দেশ করে।

‘কোনটা?’

ফেরিঘাটে বসা এক বুড়ো একতারা বাদকের ছবির দিকে আঙ্গুল তুলে দেখায় লিটু। মাত্র দু’দিন হয় কাজটা শুরু করেছে রাসেল।

পটুয়াখালি আসার পথে পরশুর আগের দিন ফেরিঘাটে এক বুড়ো একতারা বাদককে দেখেছিল রাসেল।

‘এইটা-’

‘আর ওটা ভাল হচ্ছে না?’

‘আপনার ফেরেন্ডের ছবি যিনি মারা গেছেন?’ একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে লিটু, ‘মরণের কথা কি মরণের ছবি আমার ভাল লাগে না, স্যার!’

লিটুর জায়গায় শিহাব বা সুমন থাকলে কি বলত যে ‘বুড়ো একতারা বাদক’ ছবিটাও তার পিকাসোর ‘দ্য ওল্ড গিটারিস্ট’-এর প্রভাবে প্রভাবিত? ফেরির দোতলায় পদ্মা নদী থেকে তোলা টাটকা ইলিশ মাছ ভাজা আর পাতলা মসুর ডালের সাথে করকরে শুকনো মরিচ দিয়ে ভাত মেখে রাসেল যখন মাত্রই বিগত কয়েক দিনের এক অতি চেনা বন্ধুর সহসা মৃত্যু, দূর গাইবান্ধার এক গ্রামে তাদের ক’জনের শ্মশান যাত্রা, চিতার কাঠের স্তুপের উপর স্নান শেষে ধূতি-পাঞ্জাবি পরানো, গলায় গাঁদা ফুলের মালা আর কপালে চন্দন তিলক পরানো জয় কুমার বর্মণের মুখ ভুলে যাবার চেষ্টা করছিল, তখনি এলেন সেই বৃদ্ধ একতারা বাদক।

‘জয় গুরু!’

একতারা বাদক কেন যেন ঠিক রাসেলের সামনের একটি চেয়ারে এসেই বসে। নিচে বর্ষার পদ্মা নদী তার আকুল বিস্তারে হা হা ছুটে চলেছে! নদীর বাতাস ঝাপটা দিচ্ছে রাসেলের শার্টে আর চুলে। আর তখনি সেই বুড়ো একতারা বাদক সামনে এসে বসলো। তাকে দেখেই মনে হলো পিকাসোর সেই বৃদ্ধ গিটারিস্টই যেন উঠে বসেছে। ঘন বর্ষায় আকাশ মেঘসজল। পিকাসোর নীল পর্বের ছবিগুলোর ক্যানভাসের মতই আকাশ যেন মেঘনীল। হাতে একতারার খোলটি ঐ গিটারের রঙের মতই হলুদ। আর চারপাশ সবটাই যেন থম ধরা নীল। নি:সীম বেদনার নীল। পটুয়াখালি আসার আগে গোয়ালন্দেও থেমেছিল বৈকি রাসেল। নদীর উপর ভাসমান পতিতাপল্লীর নাম সে বহু শুনেছিল। স্বচক্ষে সে এবারই প্রথম দেখলো। সে যখন গেল তার ঘন্টা দুই আগে এক ছাত্র সেখানে খুন হয়েছে। তাই নিয়ে থানা-পুলিশ-পতিতা পল্লীর সর্দারনী-দালাল-পতিতা মিলে সে যে কি কর্কশ আরতি! দৌলতদিয়া আসলেই এক বিচিত্র জায়গা। প্রতিদিন হাজার তিনেক খদ্দের আসে আর দেড়/ দু’হাজার নারী সেখানে দেহ বিক্রি করে। আছে দশ বছরের মেয়েরাও যাদের ভেন্টোলিন কি ওরাডেক্সন নামের গরু মোটা-তাজা করার ট্যাবলেট খাইয়ে রাতারাতি স্বাস্থ্যবতী যুবতী করার চেষ্টা করা হয়। চোখের উপর দিয়ে সার সার দৃশ্য চলে গেল একটি বেলা জুড়ে। ক্লান্ত আর ওষুধ খেয়ে মোটা হওয়া গণিকাদের আঁকতে গিয়ে রাসেলের সব ক্যানভাস কি ছিঁড়ে যাবে? ওরাডক্সিনে ফুলে ওঠা তাদের স্তন যদি হঠাৎই ফেড়ে ফ্যালে রাসেলের ক্যানভাস? দৌলতদিয়ায় পল্লীর একদম শেষ মাথায় যে প্রৌঢ়া মা তার দুই ছেলে আর দুই মেয়েকে নিয়ে থাকে- বড় মেয়েটিই মা বুড়িয়ে যাবার পর এখন খদ্দের ঘরে নেয়, ছোট ভাই দু’টো স্কুলে যায় আর একদম ছোট বোনটির বয়স মাত্র পাঁচ। সেই ঘরে যখন ঢুকলো রাসেল, তখন দেখল লাল-সাদা বল প্রিন্টের ফ্রক পরা পাঁচ বছরের একটি ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে দু’রুমের ঘরটায় (আসলে পার্টিশন দিয়ে একটি রুমকেই দু’টো রুম করা হয়েছে যার একপাশে বড় বোনটি খদ্দের নেয় আর একপাশে প্রৌঢ়া মা’টি বাকি তিন শিশু-কিশোর সন্তানকে নিয়ে থাকে- রোজগার করা মেয়ে আর তার কাছে আসা খদ্দেরদের মাঝে মাঝে এটা-সেটা খাবার যেমন চা কি পানি পাঠানো হয়) তার মা’র সাথে তাদের তিন ছোট ভাই-বোনের থাকার জায়গায়  কাঠের টেবিলে রাখা একটি বাটিতে রাখা কয়েকটি তালের বড়া খাচ্ছিল লুব্ধ ভঙ্গিতে। চোখে লেগে গেল। ওকেই ত’ এঁকেছিল নারীলোলুপ দৈত্যটি- হ্যাঁ, পিকাসো ওকেই এঁকেছিল লো গুরমেট বা ‘লোভী শিশু’ শিরোনামে।  

‘পাঁচ বছর পর ওরেও নামাবো। দশের ভেতর যদি মাসিক হইয়া যায়, তখন ঐ ওরাডক্সেন খাওয়াইলে বুক-টুক হবেনে বড় মাইয়াগো মতো- একা ওর বড় বুবুর কষ্ট হয় রোজ এত খদ্দের নিতে।’

মুখে এক খিলি পান গুঁজতে গুঁজতে বলেছিল নূর বানু নামের একদা পতিতা সেই প্রৌঢ়া। 

২. সার্কাস-সার্কাস-সার্কাস! দ্য লায়ন সার্কাস!

সুপ্রিয় পটুয়াখালিবাসী-

বরাবরের মত এবারও সপ্তাহব্যপী বাণিজ্য মেলার দ্বিতীয় দিনে আমরা দ্য লায়ন সার্কাস কর্তৃপক্ষ এনেছি আপনাদের জন্য এনেছি আমাদের বিশেষ আয়োজন!

কালো প্যান্টের উপর সাদা ঝুলের পাঞ্জাবি পরা উপস্থাপক স্টেজের উপর মাইক্রোফোন হাতে বলে চলেছে, ‘প্রথমেই বরাবরের মত শুরু করছি জোকার নাচ দিয়ে। এরপর হবে আমাদের নারী এ্যাথলেটদের নানা পরিবেশনা। শুরুতে জোকার নৃত্য! হাততালি দিন- ভাই ও বোণেরা! জোরে জোরে হাততালি!’

বিপুল ফূর্তিতে সবাই করতালি দেয়। স্টেজে এবার সাত জন ছোট ছোট বামন মানুষ এলো। মুখে জোকারের মত লাল নাক লাগানো। তারা হেলে-দুলে নাচলো কিছুক্ষণ। রাসেলের ধাঁ করে মনে এলো মার্ক শাগালের ‘সার্কাস’ কবিতার কয়েকটি লাইন। সাউন্ড সিস্টেমে জোরে গান বাজছে: ‘ওরে সালেকা- ওরে মালেকা- পারলি না ফুলবাণু বাঁচাতে!’ গানের সাথে সাথে সাত বামন নাচছে। ওরা কি সেই তুষার শুভ্র মেয়েটির সাত অরণ্যে কুড়িয়ে পাওয়া ভাই যারা বিমাতার চক্রান্তে সর্বস্ব হারানো রাজকণ্যাকে আশ্রয় দিয়েছিল তাদের ছোট্ট কুঁড়েঘরে? আচ্ছা- সার্কাস দল সাত/ সাত জন বামন মানুষকে পেল কোথায়?

‘সূধী দর্শকবৃন্দ- কৌতুক নাচের জন্য আমাদের সাত জন ক্লাউনকে দিন করতালি,’ মাইক্রোফোন হাতে ঘোষক আবার স্টেজে এসেছে, ‘এবার শুরু হতে যাচ্ছে আমাদের সত্যিকারের শিহরণ জাগানো, দুঃসাহসী নারী ও পুরুষ এ্যাথলেটদের নানা সাহসী খেলা। এ পর্যায়ে দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে যাবেন আমাদের সাহসী নারী শিল্পী রহিমা সুলতানা- সাহসী নারী শিল্পী রহিমা সুলতানা! তার জন্য একটি করতালি—’

শীষ বাজানো শুরু হয়। বছর চোদ্দ-পনেরোর একটি পাতলা গড়নের মেয়ে হলুদ গেঞ্জি আর হলুদ হাফপ্যান্টের নিচে দীর্ঘ কালো মোজা পরনে। হলুদ ফিতায় দু’পাশে দু’টো কলা বেণী। দু’জন দু’জন করে চারজন যুবক শুন্যে টাঙ্গানো দড়িটার প্রান্ত স্টেজের দু’কিনারে যে দু’টো বাঁশের পোলের সাথে লাগানো, সেটা শক্ত করে চেপে ধরেছে। অপুষ্ট তবে অকুতোভয় কিশোরীটি স্টেজের এক প্রান্তে রাখা মই বেয়ে উঠে দড়ির উপর পা দ্যায় এবং দড়ির উপর দিব্যি হেঁটে যেতে থাকে। দ্যাখো রাসেল- তোমার পুরুষের চোখ এই শীর্ণ কিশোরীর শীর্ণতর বুক ও নিতম্ব তবু যতটা যা বিভাসিত, তা-ও দেখছে হাভাতের চোখে। যদিও শীর্ণ এই কিশোরী তোমার বোন ইরিনার কৈশোরের খানিকটা হাড্ডিসার গোছের চেহারার সাথে মিলে যায়। সেই ইরিনা এখন দিব্যি স্বাস্থ্যবতী তরুণী। দু’দিন পর বিয়ের জল গায়ে পড়বে। সার্কাসের এই মেয়েরা কোথা থেকে আসে? কতটা ক্ষুধা তাদের শত শত পুরুষের শীষ আর করতালির ভেতর থেকে হাফপ্যান্ট পরে দড়ির উপর দিয়ে হাঁটিয়ে নেয়? স্টেজে এখন লাল ও নীল আলোর বীম থেকে থেকে ভাসছে। সাথে হিন্দি গান বাজছে: ‘সোনে কিতনা সোনে হ্যায়/ সোনে য্যায়সে তেরি-!’ রুদ্ধশ্বাসে দ্যাখে রাসেল। গ্রামের এই অপুষ্ট মেয়েগুলোই সার্কাসে পুরুষ রিং মাস্টারদের হাতে এ্যাবিউজড হতে হতে যেটুকু শেখে, এরাই ভলগা পাড়ের রুশ দেশে বা পূর্ব ইউরোপের জিমন্যাস্টিকসের শিক্ষকদের হাতে পড়লে হয়তো দেশকে একটা/ দু’টো অলিম্পিকও এনে দিতে পারতো হয়তো। তবে, বাইরে একথা বলা যাবে না। শুনলেও সবাই হেসে গড়িয়ে পড়বে। কি রোগা মেয়ে! যদি দড়িতে তাল সামলাতে না পারে? যদি পড়ে যায়? না- রহিমা সুলতানা নামের রোগা হ্যাংলা মেয়েটা ঠিক সময়মতো দড়িতে হাঁটা শেষ করে স্টেজের এক প্রান্তের মই বেয়ে ঠিক নেমে যায়। 

‘ধন্য ধন্য বলি তারে- ধন্য রহিমা সুলতানারে!’

লালনের গান দু’কলি গাইবার ভঙ্গি করে আবার ঘোষণায় সপ্রতিভ হয় ঘোষক, ‘ভাই ও বোণেরা- এবার স্টেজে আসছেন আমাদের সাহসী বোন আবিদা বেগম। সাহসী বোন আবিদা বেগম! তার বুকের উপর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাবে তিনজন সাইকেল আরোহী। আবিদা বেগমের জন্য করতালি!’

সবই কি ‘সাহসী বোনদের’ খেলা নাকি? পুরুষ এ্যাথলেট নেই? এদিকে দর্শক মেতে উঠেছে সার্কাসের একটির পর একটি আইটেমে। আবিদা বেগম নামের ঈষৎ পৃথুলা আর খানিকটা বয়েসী, গোলাপী টাইটস আর উপরে হলুদ গেঞ্জি পরা (হলুদ গেঞ্জি কি এই সার্কাস কোম্পানীর ইউনিফর্ম?) এক নারী এসে স্টেজে রাখা একটি চৌকির উপর শুয়ে পড়লো। সাউন্ড সিস্টেমে দীপিকার ‘ঘুমর ঘুমর’ শুরু হয়েছে। ঈষৎ স্বাস্থ্যবতী আবিদা বেগমের দেহের উপর রাখা হলো একটি তক্তা। এবার তার উপর সাইকেল চালানো শুরু হলো। তিন/তিন জন পুরুষ সাইকেল আরোহী সাঁ সাঁ বেগে সাইকেল চালিয়ে যেতে শুরু করলো।

‘খেলা যে বেডি দেখাইতেছে হ্যার মনে হয় কোলে নতুন বাচ্চা। দর্শকগো দিকে যহন হাত নাড়লো, তখন বুকের কাছটা গেঞ্জি য্যান ভিজা দেখাইলো।’

রাসেলের পাশে বসা বোরখা পরা তবে নিকাব খোলা এক মাঝবয়সী নারী তার পাশের তরুণীটির দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলতে চাইলেও বাক্যটি পষ্টই রাসেলের কানে এসে লাগল।

‘ঘামে ভিজছে হয়তো!’

তরুণী মুখ ঘুরিয়ে জবাব দেয়।

‘ওরে- আমি সাত বাচ্চার মা! তোগো মত আইজকালকার মাইয়া না যে একডা দুইটা গুঁড়া-গাড়া জন্ম দিয়াই শেষ। দুধের ভিজা আর ঘামের ভিজার পার্থক্য আছে। আমিও দুধ ভেজা বুক নিয়া ধান ভানছি, উঠান লেপছি, ঘরের সব কাম হরছি। শাউড়ি বেডি মোরে কইলাম কামে ছাড় দেয় নাই। কিন্তু এই বেডির বুকের উপর দিয়া ত’ অহন তিন/তিন খান জোয়ান পুরুষ সাইকেল চালাইবে আনে! হ্যায় তো আরো কষ্টের কাম! এই শরীলে মাতারি খ্যালতে আইছে ক্যান?’

‘কি হরবে আম্মা? অরা সার্কাস দলের মাইয়ারা ত’ এইসব দেখায়। অগো কাজই এই। এইটাই অগো রুজি-রোজগার!’

মাঝ বয়সিনী এবার ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলে, ‘প্যাটই মাইনষের আসল দুশমন। এই দুধ ভেজা বুকের উপর সাইকেল চলবে আনে- বুঝছো মনু?’

সামনের কাতার থেকে দুই যুবক দর্শক বিরক্ত মুখে পেছন ফেরে, ‘আপনে অহন থামেন খালাম্মা! এই মাতারি মানুষ যেইহানে যাবে হেইহানেই শুদু ঘন কথা কয়।’

রাসেলের অনভ্যস্ত, নাগরিক পুরুষ চোখে এত দূর থেকে সার্কাসের নারী এ্যাথলেটের টিশার্টের উপর বুকের কাছটা ভেজা কিনা বা ভিজলেও সেটা স্তন্যদায়িনী কোন মায়ের বুকের সিক্ততা কিনা তা’ সোডিয়াম বাতির লাল-নীল আলোর ভেতর থেকে বোঝাটা দুষ্কর হতো। পাশে বসা মাঝবয়সিনী যা সহজে শনাক্ত করতে পারলেন! মাঝবয়সিনীর কথায় রাসেলেরও এবার উদ্বেগ পেতে শুরু করে। এবং সত্যি সত্যি খানিকটা স্বাস্থ্যবতী সেই নারীর বুকের উপর সাইকেল চলতেই থাকে বেশ খানিকটা সময় জুড়ে। ওর দুধের শিশুটি এই মূহুর্তে কার কাছে? সে কি তার মায়ের স্তন্য পানের জন্য আকুল কান্না জুড়েছে? আবহে যথারীতি বাজছে: ‘কনক প্রীত কি সার পে ওধ কার/ঘুমার ঘুমার ঘুমে/ ঘুমার ঘুমার ঘুমে/।’

‘সাবাশ সাহসী বোন আবিদা বেগম! এবার আসছেন বোন আবিদা বেগমেরই জীবনসঙ্গী মাকসুদুর রহমান। দর্শকদের তিনি উপহার দেবেন বানরের খেলা। বানর মাকসুদুর রহমানের তালিম মাফিক আপনাদের সবাইকে আদাব-সালাম দেবে, বন্দুক দিয়ে বোর্ডে রাখা বেলুনের দিকে ছুঁড়বে গুলি আর মাথায় পরবে টুপি। হ্যাঁ- ভাই-বানরের খেলা!’

দর্শক-শ্রোতার ভেতর শিশু-কিশোরদের এই পর্যায়ে সবচেয়ে খুশি হতে দেখা যায়। স্টেজে বেশ বড়সর আয়তনের একটি বানরের সাথে তার ট্রেনার মাকসুদুর রহমান ঢোকে। বাচ্চারা অনেকেই বাদাম, কলা কি চকলেট ছুঁড়ে মারে স্টেজে বানরটির দিকে। বানরটি সত্যি সত্যি অবিকল মানুষের ভঙ্গিমায়- বলতে গেলে প্রায় টান টান হয়ে সালাম দেয়। তারপর একপাশে রাখা বোর্ডে সার সার বেলুনের দিকে খেলনা বন্দুক উঁচিয়ে গুলি ছুঁড়তে থাকে। গোটা মাঠ জুড়ে প্যাভিলিয়ন টাঙ্গানো স্টেজ ভরে ওঠে শিশু-কিশোরদের কলোচ্ছাসে।

‘ও আম্মা- হত্যি- বানরে কি বিলে গুলি করে! কি বিলে বেলুন ফাটায়- দ্যাহো!!’ 

‘প্রিয় দর্শক ভাই ও বোনেরা- আপনারা কি ক্লান্ত বোধ করছেন?’

‘না-না-’ দর্শক সারি থেকে উত্তর প্রতিধ্বনিত হয়।

‘হা- হা- দ্য লায়ন সার্কাসের খেলা কাউকে কখনো ক্লান্ত করে না। দু’ঘণ্টার বিনোদনে টিকেটের ফুল পয়সা উশুল। এবার আসছেন সার্কাসের সাহসী পুরুষ ভাই মৃত্যুঞ্জয় রায়- মৃত্যুঞ্জয় রায়! ব্লাইন্ডফোল্ড হয়ে- জি হ্যাঁ- দুই চোখ কালো কাপড়ে বেঁধে তিনি দাঁড়াবেন। তার শরীরের দিকে ছুঁড়ে দেয়া হবে অসংখ্য ছুরি- তবে বিঁধবে না! হা-হা-হা- মৃত্যুঞ্জয় রায়ের জন্য করতালি!’

দর্শক ফেটে পড়ে করতালিতে। মৃত্যুঞ্জয় রায় নামে খয়েরি ট্রাউজার এবং গায়ে এই কোম্পানীর ট্রেডমার্ক ইউনিফর্ম সেই হলুদ গেঞ্জি পরা লম্বা আর পাতলা, শ্যাম বর্ণের এক যুবক এসে দাঁড়ায়। দু’টি মেয়ে এগিয়ে এসে তার চোখে কালো কাপড় শক্ত করে বেঁধে, দু’পাশ থেকে দুই হাত ধরে একটি শক্ত কাঠের বোর্ডের নিচে দাঁড় করিয়ে চলে যায়। আবহে মিউজিক বাজছে। বেহালার শান্ত সুর। দু’জন যুবক একটি টেবিলে রাখা বড়সর একটি স্টিলের ট্রে থেকে হাতে তুলে নিতে একটির পর একটি ছুরি। ছুরিগুলো মৃত্যুঞ্জয়ের কাঁধ, বুক, মাথা, বাহু সহ তার দেহের নানা স্থান বরাবর ছুঁড়ে মারা হতে থাকে। এবং কোন এক অলৌকিক মন্ত্রবলেই হয়তো প্রতিটি ছুরিই মৃত্যুঞ্জয় রায় নামের এই সার্কাস শিল্পীর শরীরের নানা জায়গার আধা ইঞ্চিরও কম জায়গা অবধি এসে থেমে যায়। বিদ্ধ আর করে না। আধা সেন্টিমিটার দূরত্বে কাঠের বোর্ডের কোন না কোন বিন্দুতে ছুরিগুলো অস্থানে বিদ্ধ হতে থাকে। পুরো মাঠ জুড়ে  দর্শকরা পিনপতন নিঃশ্বাসে খেলা দেখছে। রাতে বৃষ্টি নামবে বোধ করি। একটু একটু ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। আকাশে হাল্কা বাজের আভাস।

‘…মৃত্যুঞ্জয় রায় মৃত্যুকে জয় করেছেন। প্রিয় দর্শক, আবহাওয়ার অবস্থা খুব ভাল নয়। দ্রুতই বৃষ্টি নামতে পারে। হাল্কা ইলশে গুঁড়ি ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি এক/দু’ফোঁটা পড়া শুরু করেছে। এমতাবস্থায়, নির্দ্ধারিত সময়ের পনেরো মিনিট আগেই আমাদের আজকের আয়োজন শেষ করতে হতে পারে। এখন স্টেজে আসছেন শেষ আকর্ষণ- যে মেয়ে তার শরীরে ঢেউ তুলে, অঙ্গে অঙ্গে ঢেউ তুলে রাশিয়ান মেয়েদের অলিম্পিক জিমন্যাস্টিকসের খেলা ‘ব্যালে উইথ রিং’ দেখায় সেই মিস শান্তনা সরকার আপনাদের সামনে আসছেন! শান্তনা সরকার!’

সামনে-পিছনের যত যুবক ছেলে কনকনে বাদলা হাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে এবার শীষ বাজায়। দুই আঙ্গুল মুখে পুরে কড়া হুইসেল বাজতে ওঠে। মঞ্চে এবার প্রবেশ করে সত্যিকারের সুশ্রী এক তরুণী। এর পোশাক সবার থেকে আলাদা। গায়ে ট্রেডমার্ক হলুদ গেঞ্জি নয়। সে পরেছে হাল্কা গোলাপী রঙের টাইটস আর সাদা টিশার্ট। চুল হর্সটেইল করা। ঊনিশ-কুড়ি বছরের মেয়েটির শরীর না খুব কৃশ না খুব ভারি। হ্যাঁ, অলিম্পিকে রুশ জিমন্যাস্ট মেয়েদের মতই এর হাতেও একটি রিং। তবে রুশ মেয়েদের তালিম ও পাবে কোথায়? মঞ্চে ‘ডোলা রে ডোলা রে ডোলা- বাজে ডোল- বাজে ডোল’-এর সাথে ও যতটা সম্ভব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই খানিকটা নাচলো রিংয়ের ভেতর। দর্শকদের ভেতর থেকে করতালি যতটুকু উঠলো সেটা ওর ঊনিশ-বিশ বছর বয়সের স্বাভাবিক সুশ্রীতাকে উপজীব্য করেই। রিং নাচ চলতে চলতেই আকাশে ঝলকে উঠলো বজ্র।

‘দুঃখিত ভাই ও বোনেরা- আমাদের অনুষ্ঠান আজ এখানেই শেষ করে দিতে হচ্ছে! রিং নাচ আরো কিছুক্ষণ চলতে পারতো। তবে বৈরী ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় তা’ সম্ভব হচ্ছে না। আপনারা শান্তনা  সরকারকে তুমুল করতালির মাধ্যমে বিদায় জানান- ভাই ও বোনেরা- দ্য লায়ন সার্কাসের পক্ষ থেকে পটুয়াখালিবাসীকে আবারও অভিনন্দন ও প্রাণঢালা শুভেচ্ছা।’ 

…আকাশে ততক্ষণে কড় কড় শব্দে বাজ ডাকতে শুরু করেছে। ‘সোয়া নয়টা বাজে, স্যার! ওঠেন- বাসায় সবাই চিন্তা করতে আছে।’

লিটুর কথায় সিট থেকে উঠতে না উঠতে রাসেল দ্যাখে আকাশের পূব দিক থেকে ধেয়ে আসছে হি হি হিমেল হাওয়া। দেখতে দেখতে গত কয়েক মিনিটের ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি ঝম ঝম শব্দে জোরে পড়তে শুরু করে। সামনে অসংখ্য মানুষ- পেছনে অসংখ্য মানুষ। কোন দিকে যাবে রাসেল? লিটু কোথায় গেল? প্রচন্ড ভিড়ের ভেতরে ঠেলাঠেলি করতে করতে প্রায় মিনিট বিশেক পরে ভেজা শার্টে আর চুঁইয়ে জল গড়িয়ে পরা চুলে রাসেল নিজেকে আবিষ্কার করে সার্কাসের স্টেজের পেছনে ত্রিপল টাঙ্গানো তাঁবুতে সার্কাসের শিল্পীদের গ্রিনরুমের সামনে। শান্তনা সরকার নামের মেয়েটি ব্যস্ত সমস্ত হাতে একটি ছাতা নিয়ে হৃষ্ট-পুষ্ট আবিদা বেগমকে বলছে, ‘দিদি- গেলাম- মা’র ব্যথাটা বাড়ছে। আমার বাড়ি ত’ শহর দিয়া দশ মাইল ভিতরে। বাস-রিক্সা-ভ্যান কিছু মিলবে কিনা এখন কে জানে?’

আবিদা বেগম টিশার্ট আর ট্রাউজার বদলে শাড়ি পরেছে। শাড়ির নিচে একটি শিশু তার স্তন্য পান করছে বেশ বোঝা যাচ্ছে। পাশেই দাঁড়িয়ে তার স্বামী মাকসুদুর রহমান বলছে, ‘তোর মা’র কোমর ত’ ভাঙ্গলো এই লায়ন সার্কাসের খেলা দেখাতি গিয়ি, শান্তনা! গোপালগঞ্জের মানুষ আমি- কাউরে ডরাই না! সত্য কথাই কবো। তা’ লায়ন সার্কাস তারে কয় টাকা দিয়িছে? বলে মা’র মেয়েরে চাকরি দিয়িছে। চাকরি দিয়িছে কি দয়া করিছে নাকি? খেলা দেখায়েই ত’আয় করিস !’

শান্তনা সরকারকে অত সাহসী মনে হয় না। সে চারপাশে আড় তাকিয়ে বলে, ‘আ-স্তে দাদা- চারপাশে ম্যানেজার কাকার লোকজনে ভর্তি। ছেলেরা সব বিষ্টির ভেতর বিড়ি টানতে গেছে। তবু সাবধানে কথা কওয়া ভাল। আসি দাদা- ও আবিদা দি- যাই!’

‘তাড়াতাড়ি আয়। দিন-কাল ভাল না!’

তাঁবুর ভেতর একটি বেঞ্চে বসে আবিদা বেগম কোলের শিশুটিকে স্তন্য পান করাতে থাকে আর বেঞ্চে হাত রেখে পাশে দাঁড়িয়ে মাকসুদুর রহমান বলে চলে, ‘এই শান্তনা মেয়েটি খুবই অভাগী। সুভাষ কাকা মানে ওর বাপে সিংহের সাথে খেলা দেখাতি গিয়ি মরিছে। তার কাছে আমি বাঁদরের খেলার ট্রেনিং প্রথম পাই। ওর মা কোমর ভেঙ্গে শয্যাশায়ী আজ দুই বছর। ও ত’ মেট্রিকিতি জিপিএ-৫ পাওয়া মেয়ে। সব ফেলি সার্কাসে আসিছে পেটের দায়ে। কবে সে-ও হাত-পা ভাঙ্গে কে জানে? ম্যানেজার কি তাই বলি কারুকে তার হকের পাওনা দেবেআনে?’

আবিদা বেগম ফোঁস করে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু বলে, ‘আল্লাহ্-’

স্টেজের বাঁদরটা কোত্থেকে হঠাৎই তাঁবুর ভেতর ঢুকে ঠিক আবিদা বেগমের পায়ের কাছে গুটি-সুটি মেরে বসে। আর তখন দু’সপ্তাহ আগে সদ্য মৃত বন্ধু জয় কুমার বর্মণের রেখে যাওয়া এবং নীলক্ষেতের ফুটপাথের দোকানে কেনা ‘ব্লু এ্যান্ড রোজ পিরিয়ড ইন পাবলো পিকাসোস পেইন্টিং’ বইয়ের এ্যাক্রোব্যাট ফ্যামিলি উইথ মাঙ্কি ছবিটি রাসেলের চোখে বৃষ্টির জলের অবিরাম তোড়ের ভেতরেই ঝাপসা নয়…বরং স্পষ্ট হতে থাকে। তৃতীয় বর্ষে তারা দুই বন্ধু মিলে এই ছবিটির উপর পড়ে পরীক্ষার হলে লিখেওছিল:

ছবিটির শিরোনাম থেকেই স্পষ্ট যে পিকাসোর এই ছবিটি একটি এ্যাক্রোব্যাট পরিবার নিয়ে আঁকা। চারটি দেহ আছে এখানে: বাঁ দিকে একজন পুরুষ বসা, নারীটি একটি শিশুকে কোলে নিয়ে ছবির মধ্যভাগে আর একটি বানর নিচের দিকে ডানে বসা। চরিত্রগুলোর গায়ে কাপড় খুব সাদামাটা। বাঁ থেকে ডানে পিকাসো মাত্র তিনটি রং ব্যবহার করেছেন: কমলা, সবুজ ও নীলাভ রং। ধ্রুপদী বা রেনেসাঁ চিত্রকলা থেকে এই ছবিতে ক্যানভাসের ডেপথ কিছুটা কম।

এই ছবিতে পিকাসো মাতৃত্ব ও মানবীয় দূর্দশাকে প্রধান উপজীব্য করেছেন। মাতিসেঁর দ্য জয় অফ লাইফের মত আদর্শ, আধুনিক জীবন নয়, পিকাসো সমাজের অধিকতর নিন্মবর্গের জীবনকে তাঁর ছবির উপজীব্য করেছেন। বন্ধু কাসেমেগাসের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন ডিপ্রেশনে ভোগা পিকাসো নীল পর্বের সময়ে এঁকেছেন মৃত বন্ধু কাসেমেগাস, ভিখিরি, পতিতা, লোভী শিশু বা বৃদ্ধ গিটারিস্টের ছবি।  ১৯০১ থেকে ১৯০৪ অবধি বিষাদময় নীল পবের্র পরই পিকাসোর ছবি প্রবেশ করে গোলাপী পর্বে। এই পর্বেও (১৯০৪-০৬)  সমাজের নিন্মবর্গের চরিত্র নিয়ে কাজ করলেও প্রচুর সার্কাস শিল্পী, এ্যাক্রোবাটদের দরিদ্র তবে হাসি-খুশি, প্রাণোচ্ছল জীবন তাঁর রং-তুলিতে দেখা দেয়। ছবির রংয়ে নীলের বদলে কমলা,সবুজ, গোলাপী তথা তুলনামূলক বর্ণিল নানা রংয়ের ব্যবহার দেখা দিতে থাকে। এ্যাক্রোব্যাট ফ্যামিলি উইথ মাঙ্কি তাঁর এসময়েরই একটি সিগনেচার ওয়ার্ক।’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত