| 17 এপ্রিল 2024
Categories
রাজনীতি

দিল্লি জয় হিন্দুত্বেরই বিজয়

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

শমীক ঘোষ

 

বিজেপি ৭। কেজরিওয়ালের আপ তার ঠিক ৯-গুন। ৬৩।

দিল্লি বিধানসভা ভোটের এই ছবি দেখে আমাদের অনেকেই খুব খুশি। হবেন নাই বা কেন? আগের লোকসভা ভোটের পর থেকে বিজেপির আর কোনও আগল নেই। রাজনৈতিক আক্রমণের নিকৃষ্টতম মানে নেমে এসেছে ভারতের শাসক দল। সবরকম বিরোধিতাকে বুলডোজারের মতো উড়িয়ে দিয়ে একতরফা ভাবে নিজেদের মত চাপিয়ে দিচ্ছেন তাঁরা।

এর মাঝে, দিল্লিতে কেজরীওয়ালের কাছে মোদি-শাহর পর্যদুস্ত হওয়া কোথাও আমাদের খুশি করে। আমরা সেটাকে শাহীনবাগের যুক্তিযুক্ত গণপ্রতিরোধ নিয়ে বিজেপি নেতাদের কুবাক্যের প্রতিশোধ ভেবে নিই।

কিন্তু সত্যিই কি তাই?

রিয়েলপলিটিক বলে একটা কথা আছে। কথাটাকে সহজ করে বলা যায় – রাজনীতিতে নীতি বা আদর্শের থেকে সহজ প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়া।

কেজরিওয়াল এইবার সেটাই করেছেন। দক্ষ রাজনীতিবিদের তাই তো করা উচিত।

বিজেপি নেতারা অন্য সব জায়গায় যা করে থাকেন, এইবার দিল্লিতেও তাই করতে গিয়েছেন। উগ্র হিন্দুত্ব তাস খেলেছেন। শাহীনবাগ তাঁদের কাছে পাকিস্তানের সমর্থক। কেজরিওয়াল বা আপের সঙ্গে দ্বৈরথের সময়েও উন্নয়নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ধর্ম।

সেখানে কেজরিওয়াল পিচ বুঝে নিখুঁত ব্যাটিং করেছেন। তিনি জানতেন, বিজেপির এই উগ্র হিন্দুত্ববাদের জন্য সংখ্যালঘুরা ভয় পেয়ে এক জায়গায় ভোট দেবেন। কিন্তু শুধু সংখ্যালঘু ভোট দিয়ে তো দিল্লির ভোটে জেতা যাবে না। বরং তার জন্য আরও জরুরী সংখ্যাগুরুর ভোট। তাই তিনি নরম হিন্দুত্বের পথ নিলেন।

বিজেপি কথিত ‘পাকিস্তান’ শাহীনবাগের আন্দোলনকারীদের কাছে গেলেন না একবারও। বরং পাল্টা হুমকি দিলেন, তাঁর হাতে পুলিশ থাকলে তিনি দু’ঘণ্টায় রাস্তা আটকে করা এই আন্দোলন তুলে দিতেন।

হিন্দুত্ব নিয়ে বিজেপির আক্রমণ আটকাতে তিনি হনুমান চালিশা মুখস্থ বলে দিলেন। ভোটের আগেও চলে গেলেন হনুমান মন্দিরে। নিজেকে বারবার হনুমান ভক্ত বলে পরিচয় দিলেন।

সত্যি কথা বলতে গেলে কেজরিওয়াল নিজে চিরকালই এই সফট হিন্দু তাস খেলেছেন। ইউপিএ সরকারের সময়, আন্না হাজারের সঙ্গে যে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন করে কেজরিওয়ালের উত্থান, তাতে যে সঙ্ঘের প্রবল সমর্থন ছিল এটা কারও অজানা নয়। কেজরির সেই সময়ের সঙ্গীদের অনেকেই পরে বিজেপিতে গিয়েছেন।

৩৭০ নিয়ে কেজরির অবস্থান একদম বিজেপির মতো আগমার্কা। রামমন্দির নিয়েও তাই ছিল। রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা করার নেহরুপন্থী সেকুলার হওয়ার ভণিতা তাঁর ছিল না।

কেজরির এই অবস্থানই স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেয়, আপের জয় নিয়ে আমাদের আদিখ্যেতা আসলে কতটা ভুল। এই জয় নিয়ে আসলে নরেন্দ্র মোদির চিন্তা করার তেমন কিছুই নেই। যে হিন্দু ভোট পেয়ে কেজরি এখন জিতলেন, সেই একই হিন্দু ভোট লোকসভার সময় বিজেপিতে যাবে। ঠিক গত তিনটে ভোটে যা হয়েছে।

বিজেপির চিৎকৃত হিংস্র হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে তিনি একটু নরম ভদ্র হয়ে সেই হিন্দু হৃদয়ই জয় করলেন। এটাই রিয়েল পলিটিক। কেজরির হয়ত তাই করা উচিত ছিল।

কিন্তু কেজরির এই জয় একই সঙ্গে এই দেশের ধর্মীয় মেরুকরণের চেহারাটা আরও একবার পরিস্কার করে দিল। বুঝিয়ে দিল, এই দেশের জনতা এখন তাঁর জনপ্রতিনিধির হিন্দু পরিচয়ই চায়। আর সেই প্রবল হিন্দুত্ব জনজোয়ারের মুখে সেকুলার আর সংখ্যালঘুর আসলে তুলনামূলক একটু কম উগ্র হিন্দুকে ভোট দেওয়া ছাড়া বাঁচার কোনও উপায়ও নেই।

শাহীনবাগ, জামিয়া, জেএনইউ -এর ধর্মীয় মেরুকরণ বিরোধী আন্দোলন আসলে এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে গুরুত্বহীন। এই দেশের বেশিরভাগ মানুষই বরং সংখ্যাগুরুর ধর্ম নিয়ে রাজনীতিকেই সমর্থন করেন। আর তাই মোদি-শাহর রাজনীতিই এই দেশে পাকাপাকি ভাবে জায়গা করে নেবে।

হিন্দু,হিন্দু, তোমার কি কোনও অহিন্দু নেই ভারত?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত