| 19 এপ্রিল 2024
Categories
প্রবন্ধ সাহিত্য

একুশের চেতনায় একুশের কবিতা এবং পরম্পরা

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

অনু ইসলাম


আমাদের জাতিসত্তার প্রথম পরিচয় ১৯৫২ সালের মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। যদিও এই ঘটনার অনেক আগে ১২০২ সালে এই দেশ মুসলমান শাসকদের দখলে ছিল। তখন যারা মুসলমান ধর্মগ্রহণ করেছিল আমরা তাদের বংশধর। কিন্তু মুসলমান হওয়ার অনেক অনেক আগে থেকে জাতিগতভাবে আমরা বাঙালি হয়ে আছি। সে ক্ষেত্রে আমরা পূর্ব থেকেই জাতিগতভাবে বাঙালি এই নৃতাত্তি্বক সত্য মানতেই হবে। একুশে ফেব্রুয়ারি, মানে একুশ। এই শব্দে অন্তর্নিহিত আছে আমাদের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চেতনা। আমরা যা কিছু ঐতিহ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি একুশ তারই উন্মোচন। আমাদের জাতীয় আন্দোলনগুলোর মাঝে ভাষা আন্দোলন পৃথিবীর ইতিহাসে এক মহান ঘটনা। যাই হোক, প্রসঙ্গ একুশের চেতনায় একুশের কবিতা এবং পরম্পরা। বাংলা কবিতার সঙ্গে রাজনৈতিক চেতনার সম্পৃক্ততা দীর্ঘ ঐতিহ্যের স্মারক। ১৯৪৭ সালে ধর্মভিত্তিক ভারত বিভক্তির প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের একটি ভূখ- হিসাবে পূর্ব বাংলা স্থিত হয়। তখন এই অঞ্চলের ৯০-৯২ শতাংশ মানুষই বাঙালি আর সমগ্র পাকিস্তানের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ কথা বলতো বাংলায়। ১৯৪৮ সালে ভাষার জন্য প্রথম আন্দোলন হয় কিন্তু তা পরিপূর্ণভাবে সফল হতে পারেনি । অর্থাৎ ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতা হয়তো রাজনৈতিক অনেক কারণ হিসাবে আখ্যায়িত। তারপর ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন ঘোষণা করেন যে, ‘উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হতে যাচ্ছে’। তাঁর এই বক্তব্যের প্রতিবাদে ধর্মঘট ও মিছিল বের হয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা শিক্ষায়তনে এবং এক পর্যায়ে তা বিশাল আন্দোলনের রূপ পায়। এতে ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে অনেক শ্রেণীর মানুষ আহত ও নিহত হয়েছে ভাষার জন্য। এভাবে অনেক রক্ত আর প্রাণহানির মধ্য দিয়ে আমরা বাঙালিরা ফিরে পাই আমাদের মুখের মধুর ভাষা বাংলা ভাষা। অর্থাৎ মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। যদিও ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান শাসক চক্র শোষণ ও নিপীড়নের জন্য ভাষাগত সাংস্কৃতিক আঘাতটিকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয় বাঙালির ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারকে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে। তখন ১৯৪৭-১৯৫১ পর্যন্ত আমাদের কবিতা ছিল ইসলামী ভাবধারায় প্রভাবিত। তখন বাংলা ভাষায় রচিত কবিতা হারাতে থাকে নিজস্বতা। কবিতা জুড়ে বসে সাম্প্রদায়িক চেতনা। অর্থাৎ সে সময়কার কবিতায় বিষয়গত স্থান দখল করেছিল ইসলাম, মানে ইসলামী বিষয়ে কবিতা লেখা। এদের মধ্যে প্রধান ছিলেন সে সময়কার কবি গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ, ছদরুদ্দীন, সুফী জুলফিকার হায়দার প্রমুখ। তাই সে সময় কবিতাকে বলা হতো প্রগতিবিমুখ, অনাধুনিক এবং অনুর্বর। গবেষকরা অবশ্য সে সময়টাকে বাংলা ভাষার ‘সাহিত্যিক-শৈল্পিক বন্ধ্যাত্ব’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তখন এই ভাষা আন্দোলনই সাহিত্যিক বন্ধ্যাত্ব থেকে মুক্তির উজ্জ্বল সিঁড়ি ছিল। এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে অনেক কবিতা লেখা হয়েছে। সেই সব কবিতায় ইসলামী মূল্যবোধের চেয়ে দেখা গেছে মানবতাবোধ, দেশজ উত্তরাধিকার, মাতৃভাষার প্রতি মমত্ববোধ সর্বপোরি অসম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। এই ধারায় একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হচ্ছে ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত প্রথম একুশের সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ যা বাঙালির স্বাধিকার বোধের প্রথম উন্মেষ। ভবিষ্যতের উত্তরসূরিদের কাছে একুশের সংগ্রামী দিনের তাৎপর্য কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা সঠিকভাবে তুলে ধরতে না পারলে, যথাযথ দলিল লিপিবদ্ধ করে যেতে না পারলে সেটা হবে আমাদের কলঙ্ক, ব্যর্থতা আর মূঢ়তারই পরিচায়ক। এই সরল সত্যটাকে উপলব্ধি করে হাসান হাফিজুর রহমান ঝাঁপিয়ে পরেন তার এই সঙ্কলনের আরাধ্য কাজে। কোনো বাধাকে বাধা বলে মানেননি। কেন না একুশ ছিল আমাদের স্বাধীনতার প্রথম অঙ্কুরোদগম। তাঁর এই সঙ্কলনে অনেকেই কবিতা লিখেছেন তাঁদের কবিতার শিরোনাম ছিল ‘একুশের কবিতা’ এই সঙ্কলনের মূল্যায়নে আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেছেন, হাসান হাফিজুর রহমান- এই আন্দোলনের আঘাতে যেভাবে সাড়া দিলেন তার ভেতরে বাংলাদেশের তৎকালীন সমাজ মানুষের একটা চেহারা উৎকীর্ণ। তাঁর এই সঙ্কলনটি তৎকালীন সময়ে বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। হাসান হাফিজুর রহমানের সঙ্কলনটি ছাড়াও বিশেষ উল্লেখ করা চলে তা হলো কবি আজিজুল হাকিম ও কবি আবদুর রশিদ ওয়াসেক পুরী সম্পাদিত ‘একুশের কবিতা’ (প্রকাশ ১৯৫৪ একুশে ফেব্রুয়ারি) এটি ছিল ২৫ পৃষ্ঠার ছোট কবিতা সঙ্কলন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এই সঙ্কলনের অনেক কবিতা ১৯৫২ সালে রচিত এবং সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ পত্রিকায় তৎকালেই প্রকাশিত হয়। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের ও একুশের মর্মন্তুক ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রথম কবিতা রচনা করেন চট্টগ্রামের তৎকালীন ‘সীমান্ত’ পত্রিকার সম্পাদক কবি মাহবুব উল-আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতাটি। এটি একুশের প্রথম কবিতা হিসেবে খুবই আলোচিত যা বাংলা সাহিত্যে এক মাইলফলক। এই কবিতাটি প্রচারিত হবার পর তৎকালীন সরকার সাথে সাথে তা বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করেন। মাহবুব উল-আলম চৌধুরীর কবিতায় উদ্ভাসিত হয়েছিল বাঙালির অর্থাৎ এদেশের মানুষ শুধু কাঁদতে জানে না, অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মরতে জানে, জানে প্রতিবাদ করতে।

তার একটি চিত্রিত রূপ চোখে পড়ে তাঁর কবিতায়- যারা আমার অসংখ্য ভাই বোনকে হত্যা করেছে/ যারা আমার হাজার বছরের ঐতিহ্যময় ভাষা অভস্থ/ মাতৃস্বম্বোধনকে কেড়ে নিতে গিয়ে/ আমার এই সব ভাই বোনদের হত্যা করেছে/ আমি তাদের ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি। ইতঃপূর্বে অবশ্য এই তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছিল যে, তৎকালীন ‘অগত্যার’ সম্পাদক ফজলে লোহানী কর্তৃক তাৎক্ষণিকভাবে রচিত আর একটি কবিতা (সে সময়কে কেন্দ্র করে) ‘অগত্যা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বাংলাই হচ্ছে বাঙালির মাতৃভাষা। মাতৃভাষার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে সমগ্র বাঙালি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেন না বাঙালির কাছে স্বদেশ তার মায়ের মতোই মূর্ত হয়ে ওঠেছিল। শাসকদের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তের বিপরীতে সেই প্রজন্মের প্রতিবাদ আর লড়াইয়ের অংশগ্রহণ আর সমর্থকে কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তার ‘একুশের কবিতায়’ বলতে থাকেন- যে ছেলে বাড়ি আসবে বলে মায়ের কাছে চিঠি লেখে এবং যারা বাংলা ভাষাকে কেড়ে নিতে চায় তাদের তাড়িয়ে তারপর বাড়ি ফিরবে সেই প্রতিশ্রুতি উদ্ভাসিত-‘মাগো, ওরা বলে,/সবার কথা কেড়ে নেবে/তোমার কোলে শুয়ে/গল্প শুনতে দেবে না/বলো, মা, তাই কি হয়?/ তাই তো আমার দেরি হচ্ছে/ তোমার জন্য কথার ঝুড়ি নিয়ে/তবেই না বাড়ি ফিরবো। প্রত্যেক জাতির একটি বৃহৎ আশ্রয় হলো তার মাতৃভাষা। মাতৃভাষা বেঁচে থাকে বা বিকাশ পায় প্রত্যেক জাতির নতুন নতুন প্রজন্মের লালনের মধ্যদিয়ে আর ঠিক এভাবেই মানুষ ও ভাষা তার অস্তিত্ব খুঁজে পায় যা অমরতা লাভ করে পরস্পরের আশ্রয় ও পরিচর্যার ওপর। কবি আহসান হাবীব প্রতিকাশ্রয়ী হয়ে কবিতায় সেই মহিমাকেই মূর্ত করেছেন- আশৈশব অস্তিত্বের প্রহরী আমার/কথারা যখন/ জননীর কণ্ঠ থেকে মালা হয়ে ঝরে/ আমাকে জড়ায়/ তখন কেবল/ জানি আমি কথারই জননী এবং জন্মভূমি।/আমি তার পরিচর্যার ভার/ নিয়েছি এবং তার লালনেই থাকতে চাই সমর্পিত প্রাণ। বাঙালি জাতি পূর্ব থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছিল মাতৃভাষার প্রতি অকুণ্ঠ মমত্ববোধের উপলব্ধি নিয়ে। যার কারণে জীবন বোধের গভীরতায় মাতৃভাষা স্বতন্ত্র সত্তার অধিকারীরূপে শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়। কবি শহীদ কাদরীর ‘একুশের স্বীকারোক্তি’ কবিতায় সেই শ্রদ্ধা আর মমত্ববোধেরই চিৎকার শোনা যায়- অর্থাৎ যখনই চিৎকার করি/ দেখি, আমারই কণ্ঠ থেকে/ অনবরত ঝরে পরছে অ, আ, ক, খ। ভাষার প্রশ্নে বাঙালি জাতির অস্তিত্ব যখন বিপণ্ন হওয়ার পথে তখন বাঙালির বীর সন্তানরা মৃত্যুতে ভিত না হয়ে শোকাহত না হয়ে প্রতিবাদ করেছিল এবং প্রতিরোধ গড়েছিল অস্তিত্ব ধ্বংসকারী শাসকদের বিরুদ্ধে। কবি সুফিয়া কামালের কবিতায় সেই অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়-আশ্চর্য এমন দিন। মৃত্যুতে করে না কেহ, শোক/ মৃত্যুরে করে না ভয়, শঙ্খাহীন, কীসের আলোক/উদ্ভাসিত করে ক্লান্ত দেহ, মুখ, পদক্ষেপ/ সংকল্পের দ্যুতি তরে দৃঢ়তার প্রচার প্রলেপ/করেছে ভাস্বর। একুশের শহিদদের স্মৃতিকে অমস্নান করার প্রত্যয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছে নির্মিত হয় শহিদ মিনার। এটি ছিল ভাষা মর্যাদা লড়াইয়ের উৎসর্গিত দুর্জেয় ও নির্ভিক তরুণদের চেতনার স্তম্ভ। এই চেতনা স্তম্ভে রক্তাক্ষরে খোদিত হয়েছিল ভাইয়ের আত্মারদান, বোনের শোকাচ্ছাস। কিন্তু পাকিস্তানি নিপীড়ক সরকার শহিদদের স্মৃতিস্তম্ভের ওপর আঘাত আনে, স্মৃতির মিনারটি ভেঙে দেয় এরই প্রতিক্রিয়ায় স্বদেশবাসীকে অভয় বাণী শুনিয়ে কবি আলাউদ্দিন আল-আজাদ উচ্চারণ করেছিলেন- স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার?/ভয় কি বন্ধু আমরা এখনো/ চার কোটি পরিবার/খাড়া রয়েছি তো/সে ভিত কখনো কোনো রাজন্য পারেনি ভাঙতে/ ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙ্গুক/একটি মিনার গড়েছি আমরা/চার কোটি কারিগর। জীবন যখন বিকশিত হতে থাকে সাহিত্য তখন থেমে থাকিতে পারে না। জীবনের রূপ ও অন্তরাত্মা ভেদ করে শিল্প সাহিত্য উজ্জীবিত হতে থাকে। একুশও তেমনি বাংলা সাহিত্যে নতুন মাত্রায় সঞ্চার সৃষ্টি করেছিল। ভাষা আন্দোলনের পর বাংলা কবিতায় একুশের চেতনার প্রভাব বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। যেমন-১৯৫৮ সালে সামরিক সরকারের কালোথাবা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ- এই সব জায়গায়তেই একুশের চেতনার প্রতিফলন দেখা যায়। সামরিক সরকার কৌশলে একুশের চেতনাকে বিনিষ্ট করতে উদ্যোগী হয়ে ওঠে এতে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যক ক্ষেত্রে হতাশা দেখা দেয়। একুশের চেতনা জাত স্বপ্ন সংকোচের মুখোমুখি হয়। কবিতায় সেই হতাশাগ্রস্ত সময়ের প্রতিছবি ভেসে ওঠে- চেতনার পথে দ্বিধাহীন অভিযাত্রা/ তারপর সেই কালো বাদুড়ের পাখনা আড়াল/ হালকা আঁধারে ঢাকা/ দৈত্যের আনাগোনা/ ভেলকী হাতের অদৃশ্য কৌশলে/বছরে বছরে রূপান্তরিক মূল্য/একুশে ফেব্রুয়ারি। রক্তাক্ত একুশ আমাদের শিখিয়েছিল দেশপ্রেম কিন্তু একুশের চেতনায় যখন হতাশাগ্রস্ত তখন শহিদদের বীরত্ব গাথাকে সামনে রেখে জাতীয় ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার বোধের প্রশ্নে সে হতাশা কাটিয়ে উঠার প্রবণতা মূর্ত হয়। হতাশাগ্রস্ত সময়ের কাছে সমর্পিত না হয়ে কবি আল মাহমুদ শক্তি অর্জন করেছিলেন একুশের চেতনায় যেমন- তাড়িত দুঃখের মতো চর্তুদিকে স্মৃতির মিছিল/রক্তাক্ত বন্ধুদের মুখ উত্তোজিত হাতের টঙ্কারে/তীরের ফলার মতো/ নিক্ষিপ্ত ভাষায় চিৎকার/বাঙলা বাঙলা/কে নিদ্রামগ্ন আমার মায়ের নাম উচ্চারণ করো? অনেকটা সময় পর আবার ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলন পরে তা ক্রমান্বয়ে ১১ দফা আন্দোলনে পরিণত হয়। এক পর্যায়ে ১৯৬৯ সালে তা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এখানেও একুশের চেতনা পুনরায় নতুনরূপে গতি পায়। এই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে কবি শামসুর রাহমান একুশের চেতনায় নতুনভাবে জেগে উঠেন ‘বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ কবিতায় তার সেই রূপ উদ্ভাসিত-নক্ষত্র পুঞ্জের মতো জ্বলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছো আমার সত্তায়/আজন্ম সাথী আমার/ঊনিশশো বাহান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি/বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।/তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো/বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা। তাছাড়া একুশ যেন আমাদের চেতনারই রঙ ধারণ করে আছে এবং একুশের শহিদরা যেন আবার পুনরায় রাজপথে নেমে এসেছে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে পরিণত করার প্রত্যয়ে সেই অভিব্যক্তি ও প্রকাশ পায় শামসুর রাহমানের কবিতায়- একুশের কৃষ্ণষ্ণচূড়া আমাদের চেতনারই রঙ/বুঝি তাই ঊনিশশো ঊনসত্তরেও আবার সালাম নামে রাজপথে, শূন্যে তোলে ফ্ল্যাক/বরকত বুকপাতে ঘাতকের থাবার সম্মুখে/ সালামের বুক আজ তরুণ উন্মত্থিত মেঘনা/সালামের মুখ আজ তরুণ শ্যামল পূর্ব বাংলা। স্বাধিকারের চেতনা থেকেই বাঙালি তার ভাষার মর্যাদা দানে একুশে ফেব্রুয়ারিতে আত্মোৎসর্গ করেছিল তা নিঃসন্দেহ। কিন্তু ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে এসে সেই স্বাধিকার চেতনাই আবার জাতীয়তাবাদের সোচ্চার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়। যার কারণে বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের যুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জন করেছিল একটি স্বাধীন পতাকা, সার্বভৌম বাংলদেশ। কবি কামাল চৌধুরীর কবিতায় সেই ধ্বনিই অনুরণিত হয়েছে- অন্ধকার পায়ে ছিলে/অবশেষে হামাগুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়েছে/ফ্লাগুনে রক্তঝাউ পরে আছে বসন্তের জামা/ আমি তার এক হাত পরে অন্য অংশ দিয়েছি ভাইকে/বোনকে দিয়েছি তার সবগুলো সবুজ বোতাম/ আর সুতো/আমরা সবাই মিলে ভাগ করে পেয়ে গেছি একটি পতাকা। মুক্তিকামী মানুষের কিসের ভয়? যেখানে মানুষ কবরের পাশে থেকে নিজে কবর হয়ে গেছে অথবা শহিদের পাশে থেকে শহিদ এবং নিজের আঙ্গুল যেন শহিদের অজস্র মিনার হয়ে জনতার হাতে হাতে ছড়িয়েছে। একুশের এই চেতনা আর অনুভূতি মানুষ যেন এক নতুন উদ্দীপনায় মেতে ওঠেছিল জয়ের জন্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই অভিব্যক্তি প্রকাশ পায় কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতায়- এই দেখো অন্তরাত্মা মৃত্যুর গর্ভে ভরপুর/আমারই আত্মার প্রতিভাসে এই দেখো আগ্নেয়াস্ত্র /কোমরে কার্তুজ, অস্তিও মজ্জার মধ্যে আমার বিদ্রোহ/ উদ্ধত কপালজুুড়ে যুদ্ধের রক্তজয়টিকা। বাঙালির জাতীয়তাবাদ একটি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। আর ভাষাই বাঙালির এই জাতীয়তাবাদের মূূল উপাদান। ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়েই বাঙালি চিহ্নিত করে নিয়েছিল তার আপন পরিচয়। আমাদের ঐতিহ্য যে ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে এবং আমদের জীবন চেতনার সংস্পর্শে যার সবচেয়ে গভীর অন্তরঙ্গ ও অবিচ্ছেদ্য একুশ তারই অবলোকন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা পেয়েছি আমাদের নিজস্ব ভাষাসহ সবুজের মাঝে লাল সূর্যের মতো একটি সুন্দর স্বাধীন স্বদেশ। আজ এই ফেব্রুয়ারি মাসে সমস্ত ভাষা শহিদের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। সুশ্রী হোক প্রতিটি বাংলা ভাষার মানুষ এবং বাংলা ভাষার জয়ধ্বনি হোক সব সময় প্রতিটি বাঙালির মননে।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত