| 16 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

সাদা ফতুয়া পরা লোকটা ও মাংশের গন্ধ

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

পিচের পথ ধরে হাঁটছে, শ্রাবনের দুপুর শেষ। শুরু বিকেলের রোদ্দুর মাথায় নিয়ে। গন্তব্য তার জানা নেই হেটে চলাই তার মুখ্য। বাঁ দিকে শহরের কোলাহল, জ্যামের ভিড়ের ভিতর থেকে ট্রাফিকের চিন্তাশীল হাতের ইশারা। আবেদনময় ক্যানভাসারের সুর, এসব ফেলে স্টেশনের দিকে চলল সে। রেললাইনের স্লিপারে তাল রেখে অবস বাতাসে বুক ভরে সে চলছে। মনের ভেতর যেন নির্জনতার বাসা। দুপাশের সারি বাধা ইউক্যালিপ্টাসের সাথে ভাগাভাগি অক্সিজেন। ঘন পাতার ফাঁক থেকে ছিটকে পড়া রোদ্দুর, ক্রমেই শরীর থেকে শরীর ছুয়ে যাচ্ছে তার। অদুরে ভেঙে পড়া একটি গাছের পীঠে বসে থাকা কিশোরের চোখে চোখ পড়ল, দেখল কোমল কচি ঠোঁটে সিগারেটের ঘনটান। লোকটাকে কিশোর ছেলেটির গোপন বেদনা অনুভব করার উসকানি দিলো। সে ভাবলো ছেলেটা প্রেমিকার অপেক্ষমান প্রেমিক। প্রতি টানের ধোয়ায় আড়াল করছে ছেলেটির মুখ। আর অপেক্ষমান যন্ত্রনা গুলো ধোয়ার সাথে মিশে যাচ্ছে। ছেলেটিকে সে অতিক্রম করবার আগেই একটি মেয়ে এসে উপস্থিত হল। অবশিষ্ট সিগারেট টুকু ছুড়ে ফেলে দিলো দূরে, আর মুখে লেগে আছে লুকাতে চেয়ে লুকাতে না পারা হাসি। এদিকে লোকটার সম্মুখে সিগারেটের ধোয়া উড়েগেল। তার চোখে এখন ধোয়া আচ্ছন্ন এদিকে আকাশ ডেকে নিয়ে আসছে মেঘ। থেমে নেই হেটেই চলেছে ঘোরলাগা মানুষের মতো। লোকটার দেহে সাদা ফতুয়া চোখ ভরে আসছে অন্ধকারে দুর থেকে মৃদু শব্দে ট্রেনের আওয়াজ, তার ঠোট নড়ছে আওড়াচ্ছে-

‘গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর ছলছল শব্দে জেগে উঠলাম আবার’
মানুষের সব কিছুতে হয়তো প্রকৃত প্রসংগ দরকার হয়না। তবে বহু দূর থেকে ভেসে আসা ট্রেনের শব্দ বহমান নদীর মতো মনে হতেপারে।
এবার কি এক অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গেল লোকটা, জনমানব হীন এক অন্ধকার নিজেকে দেখতে পেলনা চার পাশ কালো নিজের অস্তিত্ব টুকু টের পাওয়া যাচ্ছেনা যেন অনুভব করে নিতে হচ্ছে। লোকটার সাদা ফতুয়াও সে কালোয় মিশে গেছে।

ফতুয়া পরা লোকটা সম্ভিত ফিরে পেয়ে চোখে হাতদিলো একি চোখ খোলা তবে এতো কালো কেন চারিপাশ। তবে কি অন্ধ হয়ে গেলাম! চোখ বন্ধ করে আবার খুললো তাও কিছু দেখা গেলনা। দিশে হারা না হয়ে দশদিক দেখতে থাকলো, নিজেকে আবিস্কার করার চেষ্টা করলো সে কোথায় । খানিক পরে ধারনা হল সে কোন হল ঘরে ঠুকে পড়েছে। ফতুয়া পরা লোকটা নিজের বীপরিত দিকে ফিরতে চাইল, এইভেবে হয়তো বেরবার রাস্তাটা পাবে। কিন্তু একি একটা ঘ্রান এসে লাগলো তার নাকে সে এক অদ্ভুত হালকা ঘ্রান। লোকটা পেছনে না সামনে চললো বেশ ধীরে ধীরে। ভাবনার ভেলা তার হৃদয়ের তটে এসে আর একবার থামলো। এ কি করছি কোন মানুষের অস্তিত্ব নেই শ্বাস প্রশ্বাস টুকু টের পাবো। কোন পাখিও নেই যদি গোপনে উড়ে যেত তবুওতো ডানায় পালকের সংঘর্ষ গুনতাম। তবে কি আমি পৃথিবী ছেড়ে অন্য গ্রহে চলে এসেছি । ভাবতে ভাবতে লোকটা এগিয়েছে অনেকটা। এবার থমকে দাড়ালো একি এবারযে একটা গন্ধ, কেন ঘ্রানটা গন্ধ হয়ে গেল? তবে কি দূরত্ব মানুষকে বিভ্রান্তিতে রাখে আবার ধীর গতিতে আগাতে শুরু করলো সাদা ফতুয়া পরা লোকটা। আগাতে আগাতে হঠাৎ থেমে গেলো আবার একি এতো কাঁচা মাংশের গন্ধ। ফিরবার সিদ্ধান্ত এবার সে নিলোনা এগিয়ে চললো। হঠাৎ সমুখে হুমড়ি খেয়ে পড়ল লোকটা। পা বেধেঁ গেছে বস্তুটা ভারি কিছু হবে। তবে বস্তুটা আসলে কি বুঝতে পারলনা। কিন্তু হলঘরের মতো কোথাও যে ঢুকে পড়েছে তা লোকটা টের পেল পড়ে যাওয়া প্রতিবিম্বিত শব্দে। সাদা ফতুয়া লোকটা পড়ে গিয়ে আর উঠলোনা দিক হারাবার ভয়ে। সে ভাবছে, কোন ভুল হচ্ছে নাতো! এটা কি পৃথিবীর কোন হলঘর নাকি অন্য গ্রহ, আর কোন প্রানের অস্তিত্ব নেই এখানে! নাকি আমি একাই। তবে পৃথিবী কি আমাকে পরিত্যাগ করেছে। কোন ভিনগ্রহ, গ্রহন করেছে প্রানের অস্তিত্ব টিকে থাকে কিনা দেখতে! বেচে থাকা যাবে কিন্তু এই অন্ধকার কালোয় অসম্ভব হবে। এসব ভাবতে ভাবতে এক আলোর উপস্থিতি ঘটল। যেমন মঞ্চে একজন এ্যাক্টর এর উপর বর্ষিত হয়।
সাদা ফতুয়া পরা লোকটা প্রকৃতই একটি বড় হল ঘরের মতো জায়গায় ডুকে পড়েছে। মূলত আকাশের মেঘাচ্ছন্ন কেটে সূর্যের উপস্থিতি ঘটেছে। অমনি উপরের বেশ বড় ফাকা থেকে আলো এসে পড়লো অন্ধকার কালো ঘরটির মধ্যে। সে আলোয় যা দেখাগেল তারজন্য কোন প্রস্তুতি ছিলনা সাদা ফতুয়া পরা লোকটার। একজন কিশোরী মেয়ের মৃত দেহ। তার মুখের সমস্ত রেখাচিত্র গুলোতে অসংখ্য অভিযোগ। তার হাতের মুঠোয় ধরা ধুসর কাপড়ের টুকরোয় বোঝা যাচ্ছে বেচেঁ থাকার আপ্রান চেষ্টার বিফলতা। মেয়েটার দেহের উর্ধাঙ্গ খালি। আর ছেড়া ছেড়া স্যালোয়ারে রক্তের ধারা। আর সেইযে এক গন্ধ, সে গন্ধের তীব্রতা কল্পনা করতে পারছেনা সাদা ফতুয়া পরা লোকটা। কতজন পুরুষ যে ধর্ষন করেছে। আর পড়ে যাওয়া সেই ভারি বস্তুটি বৃক্ষের মোটা ডাল। মেয়েটার মাথার আঘাত সেই ডালের।
সাদা ফতুয়া পরা লোকটা ঝট করে উঠে পড়লো সে ফিরে যাবে। তাৎক্ষনিক মন বলে উঠল তোর রক্ত ফিরে যাওয়ার নয়, তোর পূর্বপুরুষ তা করেনি। তবে কেন ফিরে যাওয়া! এবার বিস্মৃত চোখ নিয়ে যেন কিশোরীর সামান্য যন্ত্রনাটুকু অনুভব করতে গিয়ে ব্যার্থ ভঙ্গুর অন্তরীণ চোখ মেলে চাইল। মেয়েটি তার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। জানতে চাইছে তার অপরাধ। বলছে অভিমানও, পৃথিবী আর দেখা হলনা। কিন্তু অনেক সপ্ন যে বেচেঁ থাকছে পৃথিবীতে। বুঝাতে চাইছে মেয়ে হয়ে জন্মানোর বেদনা।
সাদা ফতুয়া পরা লোকটা অস্থির হয়ে সারা পকেট খুঁজতে লাগল সিগারেট, তার শরীর নিকোটিন চাইছে। কিন্তু চেষ্টা বিফল কিছুই পেলনা। লোকটা ভাবলো অসহায় একটা প্রানি এই মানুষ। অরণ্যে বসবাস কালে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা দুরভাগ্য বসতো হয়নি। এরা না হিংস্র শক্তিশালী বাঘ, না হরিনের মতো দ্রুতগামী। শুধু পৃথিবীতে টিকে থাকা তার বুদ্ধি বৃত্তি। যুগের পর যুগ শতাব্দির পর শতাব্দী নিজেদের আয়ত্তে আনতে লাগল সব। বস করতে লাগলো অন্য প্রানীদের নিজেরা টিকে থাকার জন্য। আর নারী যেহেতু মানব জন্মদানের যন্ত্র, তাই উৎপাদনের হিসাবে তাকে বস করেছে সব কালে। পুরুষতন্ত্র সমাজ তৈরিতে তারা উঠেপড়ে লাগল। নারী কে অসহায় হিসাবে জাহির করতে করতে তাদের গৃহপালিতের মতো বন্ধি করলো। তাই বলে তৃতীয় বিশ্বের বিশ্বায়ন, সাম্য, সৃজনশীল সব বিফলে যাবে! পুরুষতন্ত্রের নাম রক্ষা করবে এভাবে! কি লাভ মানুষের এই সব সামাজিক নির্ভরশীলতা। আর ধর্ম যুগে যুগে মানুষকে বদলকরে স্বার্থের সমীচীন গর্তে পুরতে। শিখিয়েছে ভোগবাদ, সুখবাদ। সিখাইনি নৈতিকতা, অধিকার, নারী ও পুরুষ দুটোই মানুষ। সাদা ফতুয়া পরা লোকটা নিজ পায়ের আঙুলের দিকে তাকিয়ে ভাবছে কি উত্তর দিবো মেয়ে! কি বলবো তোমায়? এ তোমার নিয়তি। জানো তো মানুষ যখন ব্যার্থ হয় তখন নিয়তির উপর দোষ চাপিয়ে সস্তি পেতে চায়।
সাদা ফতুয়া পরা লোকটা কোন ক্রমেই সস্তি পাচ্ছে না শুধু ঘামছে। আবার বুক পকেটে হাত দিলো, ব্যার্থ হলো দ্বিতীয় বার। কোন ব্যাবস্থা নেই নিকোটিনের।  প্রবল ভাবে বুকের ভেতরটা নিকোটিন চাইছে। সাদা ফতুয়া পরা লোকটা দাড়াতে পারলনা হঠাৎ পড়ে গেলো। যেভাবে বৃক্ষ তার শেকড় থেকে মাটি বিচ্ছিন্ন হলে দ্রুম করে পড়ে যায় তেমনি।
সাদা ফতুয়া পরা লোকটা পড়ে গিয়ে দেখছে যেনো বিসর্জিত একটা শষ্য খেতের মধ্যে শুয়ে আছে অন্ধকারে। অসংখ্য জোনাকি খেলা করছে। উড়ন্ত জোনাকির আলো ভেদ করে লোকটা যেন আকাশ দেখতে চাইছে। একটা নক্ষত্র তার চোখে পড়ুক অন্তত একটি তারা। বিফল সবই কিছুই দেখা গেলনা। অসয্য ঝিঁঝিপোকার চিৎকার কানে লাগলো। অমনি চোখ মেলে দেখল সেই হল ঘর। উঠে বসলো দাঁড়াবার ইচ্ছেটুকু মনে এলেও দাঁড়াতে পারলো না।
এবার আলো আস্তে আস্তে দূরে সরতে লাগল। সেই মেয়েটি আলোর মধ্যে। শরীরে আকাশ রঙের গাউন, তাতে পৃথিবীর মানচিত্র আঁকা। কপালে একটি তারা লাল রঙের। পুরো হল ঘরে মৃদু আলো। সাদা ফতুয়া পরা লোকটা দেখলো সে হল ঘরের মাঝখানে দাড়িয়ে। দুইপাশের আসন ভর্তি মানুষ। কিন্তু একি করে সম্ভব! কারো ঘাড়ে মাথা নেই। মঞ্চে মেয়েটি আস্তে আস্তে শূন্যে ভেসে উঠছে। তার সামনে আরো একজন অভিনেতা তারও ঘাড়ে মাথা নেই। যেখানে মাথা থাকে ঠিক সেই খানে মেয়েটি চুমু খেতে খেতে মিলিয়ে গেল। আবার হল ঘর অন্ধকার কালো। সাদা ফতুয়া পরা লোকটা সরল গলায় আওড়ালো-
‘তবু এই পৃথিবীর সব আলো একদিন নিভে গেলে পরে,
পৃথিবীর সব গল্প একদিন ফুরাবে যখন,
মানুষ রবে না আর, র’বে শুধু মানুষের স্বপ্ন তখন… ’
লোকটা আবার মাটি থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া বৃক্ষের মতো দ্রুম করে পড়ে গেল।

এই দিগন্ত থেকে সবে সূর্য বিদায় নিবে। একটা কুসুম আলোর গোধূলি বেলা। মানুষের চলাচল বেড়েছে। সবারই এখন উদ্দেশ্য মাফিক চলা কোথায় যেন ফিরতে হবে। রেললাইনের পাসে ভাঙ্গা বৃক্ষের পিঠে বসে থাকা সেই প্রেমিক প্রেমিকা হেটে আসছে হাতে হাত ধরে। যতো এগিয়ে আসছে দেখছে মানুষের ভিড়। ক্রমেই যেন বাড়ছে। এবার কাছাকাছি এসে কৌতুহল চোখে নিয়ে ভিড় ঠেলে দেখল ট্রেনে চাপাপড়া একটি মৃত দেহ। দুজনের গায়ে কাটা দিয়ে উঠল কারন মৃত ব্যাক্তির ঘাড়ে মাথা নেই। ছেলেটা নিজ মনে বলল এতো সেই সাদা ফতুয়া পরা লোকটা। 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত