| 15 এপ্রিল 2024
Categories
নারী

তারাখসা

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

ছাড়ো,কী করে তোমার বই হচ্ছে বছর বছর বুঝি না ভেবেছ? ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বলল সার্থক।সুমনা খুব শান্ত গলায় জিঞ্জেস করল কী করে?
ন্যাকামো করে,গলে পড়ে।না হলে এত লেখকদের লেখকদের পয়সা দিয়ে বই করতে হচ্ছে,আর তুমি কী বালছাল লেখো,সে সব প্রকাশকরা প্রতি বছর ছেপে চলেছে?
তথ্যের সোর্স?
সোর্স কীসের?এমনিই বোঝা হয়।নর্মাল লজিক।বুক ফেয়ারে এত সেজেগুজে আসোও তো ওই জন্যই।পাঠক আর প্রকাশক দুইই ঘায়েল।
ও,তোমার লজিক টা তোমাদের লজিকের মতো।তবে তো একদম ঠিক আছে।
কী ঠিক আছে?
আমার পথ চলা।আমি জানি যে যখনই তোমরা আমার মেধা,বুদ্ধি,স্কিল,অধ্যাবসায়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারে না,তোমাদের লজিক বলে, বেশ্যা।
আমি কি বলেছি ‘বেশ্যা ‘শব্দ টা?
না,ওটা আমার লজিক বুঝে নিয়েছে। হেসে বলে সুমনা। নাও,এবারে তোমার লজিক নিয়ে ফুটে যাও।তোমাকে আমার আর দরকার নেই।
হ্যাঁ,ঠিক বলেছ,দরকার ছিল এতদিন।দরকার ফুরিয়েছে,ফুটে যেতে বলছ।
ঠিক তাই।যার লজিকের বোঝা তার সঙ্গিনী কে ‘স্লাট’ বলায় কথায় কথায়,যে বান্ধবীর গুণ টুকু খোলা মনে accept করতে পারেনা,তার দরকার আমার কাছে মুহূর্তে ফুরিয়ে যায়। এই তুমি যাবে? না আমি তোমার গায়ের উপরে বমি করে দেব?
যাচ্ছি 
চলে যায় সার্থক।
ফালতু মেজাজ খারাপ করার এলিমেন্ট একটা।”-লিটল্ ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নের দিকে এগোয় সুমনা। সুমনা চৌধুরী,ইতিহাসের প্রফেসর,উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা,চোখে ক্যাটস আই ফ্রেমের চশমা,হাতে বেশ কিছু বই,কাধে একটা কলমকারী ব্যাগ।পরনে মেরুন রঙের খাদি শাড়ি,কনট্রাস্ট কলমকারী ব্লাউজ।দেখা হয়ে যায় সুপর্ণার সঙ্গে।
কী রে সার্থককে দেখলাম তোর খুব নিন্দে করছে চারপাঁচ জনের সঙ্গে!
করতে দে।কুত্তা ঘেউ ঘেউ করে।গলা শুকালে লেজ নেড়ে নেড়ে আসবে আবার।
রাজর্ষিটা ও জুটেছে বুঝলি। বলছে, ‘সার্থক তোকে আগেই বারণ করেছিলাম আমি।আমার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ে ওকে আমি বলেছিলাম তোমার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।এত্ত বেহায়া মেয়ে মাইরি! লজ্জা পাওয়া তো দূর অস্ত,এগিয়ে এসে চোখে চোখ রেখে বলে ‘দেখো,দেখো না। ‘আমি সেদিন বুঝেছি মহা বেহায়া মেয়েছেলে একটা!
সুমনা শুধু হাসে। বলে,ওরা তো আবার প্রেম হারানো টা কে বলে “মেয়েটার কাছে ল্যাঙ খেয়েছে, এবং তা পৌরুষত্বের কাছে বড়ই অসন্মানের। তাই ওকেও ফুটিয়ে দিয়েছি যেদিন ভালো লাগেনি আর, সেটা মুখ ফুটে বলতে পারে না।এই সব বলে। কারো আমাকে দেখতে ইচ্ছে করলে,আমার লজ্জা পাওয়ার কী কারণ আছে বল তো? ওকে দেখতে আমার ভালো লাগছিল,তাই এগিয়ে গিয়ে বলেছি দেখো। তুই তো জানিস কোন রকমের চাওয়া কে আমি লুকিয়ে রাখতে জানিনা।
ছাড়।ওরা তোর যোগ্যই না।
আসলে মেয়েরা কারোরই যোগ্য না। দয়ার যোগ্য। আর সেই দয়াটা কে যে অস্বীকার করে সে খারাপ,সে স্লাট। এসব নিয়ে ভাবলে লিখব কখন?আবার হয়তো উল্টোটা ও।রাগ হয় বলে লিখি। লিখে যাই। চল চা খাই।
আজ বুক ফেয়ার শেষে আমার বাড়ি যাবি?টিচার্স খাওয়াবো। বলল শ্বেতা।
লোভ দেখাস না। চল,চা খাই।
চায়ের দোকানে গিয়ে দেখে সার্থকদের গ্রুপটা চা খাচ্ছে। সুমনা তাকায় না।চা দিতে বলে দুটো।
কী হল দেখতেই পাচ্ছো না? চিনতেই পারছো না! রাজর্ষি বলে ওঠে।
চিনতে চাইছি না।
ও,তাইই? রাজর্ষি একটু টলে এগিয়ে আসে।নির্ঘাত নেশা করেছে।
আমরা সব ফালতু না? বলে বাঁ হাতটা চেপে ধরে সুমনার।সুমনা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা না করে ডান হাতে ঠাটিয়ে একটা চড় মারে রাজর্ষিকে। রাজর্ষি থতমত খেয়ে যায়।সুমনা এগিয়ে গিয়ে বলে ‘শোন, তোদের দম থাকলে লিখে দ্যাখা আমার চেয়ে বেশী লিখে, সংখ্যায় অন্ততঃ,এইসব চুদুরবুদুর করতে আসিস না।আর হ্যা,রাজর্ষি এত যখন তোদের আমাকে নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছে তবে “সুমনা পরিত্যক্ত পুরুষ এক হও ক্লাব খোল।চা খাবি ভাই? আহা,লেগেছে? চা খা কমে যাবে।’ নিজের চা টা খেতে খেতে শ্বেতার হাত ধরে ওখান থেকে বেরিয়ে আসে সুমনা।
মুডটা খিঁচড়ে গেছে। এই বাড়ি যাব বুঝলি।
সুমনা কানে হেডফোন লাগিয়ে ট্যাক্সির সিটে গা এলিয়ে দেয়।
সুমনা বাড়িতে একটি আশ্রিত বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে থাকে। অ্যাডাপ্ট করা বা ‘আমার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছি ‘ বলার আইনি চাপ প্রচুর এখন।ও তাই বলে,আমার বাড়িতে থেকে কাজ করে।একটা বাচ্চা মেয়েকে বাড়িতে রেখে কাজ করানোও আইন বিরুদ্ধ,কিন্তু তাতে আইন রক্ষকদের সমস্যা নেই।অ্যাডাপ্ট করতে গেলে লক্ষ ঝামেলা। এই মেয়েটাকে মানুষ করাই এখন সুমনার একমাত্র নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।ওকে রোজ বাড়ি ফিরে পড়ায়।ওপেন স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে।বোর্ডের পরীক্ষাটাতো দিক আগে। শুধু পড়ানো নয়,ব্যালান্সড ডায়েটের দিকেও নজর রাখে সুমনা।রোজ ওকে নানা গল্প ব’লে ব’লে জীবন শেখায়।পনেরো বছরের স্বাতী একমনে শোনে দিদির কথাগুলো।মাঝে মাঝে উত্তর দেয়। আজ বাড়ি ফিরেই সুমনা মুখ হাত ধুয়ে শুয়ে পড়ে।স্বাতী চা নিয়ে আসে।
এই তোর হাতে ওটা কী রে?
বিপত্তারিনীর সুতো।
কে দিল?
পাশের বাড়ির কাকু।তোমার জন্যও দিয়েছে, পরতে পারো।সব বিপদ কেটে যাবে।দেখ স্বাতী,তুই হাতে কী পরবি তা তোর ব্যাপার,কিন্তু একটা লাল সুতো আমাকে রক্ষা করবে? আমাকে এত শক্তিহীন মনে হয় তোর?
স্যরি দিদি। স্যরির কোন ব্যাপার নেই।পাশে এসে বোস।জানিস মেয়েদের ভিতরে এক অনন্ত শক্তি আছে,তা সে চিনতে পারে না।অথবা ভুল ভাবে চেনে।তাকে ছোট থেকে এসব সুতো,ডোরে বেঁধে রাখা হয়।বেঁধে রাখা হয় শাখা,পলা,নথ এ।তার একটা জীবনে পদে পদে ভয় পেতে শেখে সে।আমার শাশুড়ি বলতেন বিয়ের আগে ওনাকে দুই হাতে দুটো সরু চুড়ি পরে থাকার কথা বলা হত,ভাইয়ের মঙ্গলার্থে।তারপর শাখা,পলা,নোয়া সারাজীবন পরলেন স্বামীর মঙ্গলার্থে।ভয়,সব সময় ভয়। শাখা ভেঙে গেছে পর্যন্ত বলা যাবে না।সে শব্দ উচ্চারণ করলেই সংসারে অনর্থ ঘটে যাবে।তাকে দায়ী করা হবে সব বিপর্যয়ের জন্য।বলতে হবে ‘বেড়ে গেছে’।একটা জীবন ধরে আমরা শুধু ভয় পেয়ে যাব? কখনো নদীর ধারে জ্যোৎস্নার আলো কী করে জলের উপরে খেলা করে দেখতে পারি নি।ভয়,কেউ তুলে নিয়ে যাবে।

কেউ ইঁটের টুকরো রেখে যাবে শরীরে।দেখ্ ভয় আমিও পাই ওই ইটের টুকরো,ওই ভাঙা বোতল যোনিতে ঢুকে যাওয়া কে।তাই অনেক জায়গায় যেতেই পারি না।কী করব?আমার শরীরে তো কোন সুপারম্যানের শক্তি নেই।কিন্তু বাকী সব ভয় থেকে নিজকে মুক্ত করেছি।আর মুক্ত করতে করতে বিচ্ছিন্ন হয়েছি,পরিবার ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে আমায়,ডিভোর্স হয়েছে,লোকে নিন্দে করেছে,বারবার ডুবতে ডুবতে ভেসে উঠেছি।শোন,নিজের শর্তে বাঁচতে গেলে একা হতেই হবে।একা বাঁচতে গেলে ভয় পেলে চলেনা বুঝলি। স্বাতী তাকিয়ে থাকে চুপচাপ।সুমনা ওর মাথায় হাত বোলায়,”অত আপসেট হওয়ারও কিছু নেই,চল ভালো কিছু রান্না করি তোর জন্য,ব্যাগের মধ্যে তোর জন্য অনেক বই আছে,যে কোন একটা পড়তে শুরু করে দে পছন্দ মতো।

সুমনা চিলি -মাশরুম বানাতে যায়।রান্নাঘর থেকেই বলে “নিন্দিত নন্দন” বলে একটা বই আছে দেখ।ওটা শুরু কর।বুঝলি একজন মহিলা চাইলে তার উপরে ঘটে যাওয়া সব বিপর্যয় কে উপেক্ষা করেও সুন্দরের আরাধনা করতে পারে,দেশের সর্বোচ্চ সম্মান পেতে পারে।
খেতে বসেছে দুজনে স্বাতী আর সুমনা।
কী ব্যাপার বল তো ,চুপচাপ এতো?কিছু হয়েছে?কিছু বলতে চাস?
একটা ঘটনা ঘটেছে।
কী?
সামনের দোকানে একটা ছেলেকে এত জোরে মেরে ফেলেছি যে নাক ফেটে গেছে।ওরা সবাই আমাকে শাসিয়েছে,দেখে নেবে বলে।
খাওয়া থামিয়ে দেয় সুমনা।
কী হয়েছিল এগজ্যাস্টলি ?
রোজ দোকানে গেলে আজেবাজে কথা বলে।ইগনোর করি।আজ ওড়না ধরে টেনেছে।তার আগে বলছিল বুক নিয়ে অসভ্য সব কথা।ওড়নায় টান পড়তেই মাথা গরম হয়ে যায়,হাতের ব্যাগে সসের শিশি ছিল,ভিনিগারের বোতল ছিল,ওটা ঘুরিয়ে মুখের উপর মেরেছি,নাক ফেটে গেছে।তারপর বলে নাকি টানেনি,ঘড়িতে আটকে টান পড়েছিল ওড়নায়।ওরা আমাকে রাস্তায় টেনে নিয়ে যাবে বলেছে,খুব ভয় করছে।
বেশ করেছিস,কিন্তু একটা চড় মারতে ইচ্ছে করছে তোকে।ফোন করিসনি কেন তারপর?কাল সকালে এফ আই আর করতে হবে।ভয় পাওয়ার কিছু নেই।ব্যবস্থা দেখছি।লোকাল পার্টির নেতা কেও ফোন করে রাখছি।
হ্যালো,অরিন্দম,একটা হেল্প চাই…। শুনলে তো বিষয় টা।তোমার সঙ্গে তো ওসির খুব দোস্তি।
একটু বলে দাও না।আমি কাল সকালে যাবো।
হ্যালো,সেঁজুতিদি।শুনলে তো ঘটনাটা।পুলিশকে কাল জানাবো।অরিন্দম বলে দিয়েছে,কিন্তু ‘নারী সমিতি ‘থেকে একটা অবস্থান চাই ওই দোকানের সামনে।একটা সার্বিক চাপ না ক্রিয়েট করলে পুলিশ গুরুত্ব দেবে না।মেয়েটা আনসেফ ফিল করছে।ওকে গো,থ্যাংক ইউ,থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।
শোন স্বাতী,যা করেছিস,ঠিক করেছিস।এসব জানোয়ারকে ভয় পেতে হবে না,তবে সতর্ক থাকতে হবে।এইসব ছেলেরাই অতর্কিতে অ্যাসিড ছুঁড়ে পালায়।আমি সামলে নেবো।”
স্বাতী এসে জড়িয়ে ধরে কাঁদে সুমনাকে।
সুমনা বলে, ‘কাঁদিস না।’
কিন্তু চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকে।
এখন রাত একটা।ছাতে বসে দুই অসম বয়সী নারী গান গাইছে,স্বাতী বুঝতে পারছে “আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে” গাইলে পুজো পুজো মনে হয়।ওই লাল সুতো বাঁধলে ঠিক তেমন মনে হয় না।বুঝতে পারছে “দুরূহ কাজে নিজের দিও কঠিন পরিচয় ” কী?
ও শিখছে,ওর থেকে শিক্ষা -দীক্ষা -চেতনা কেড়ে নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে অনন্ত এক জীবন।দাঁড়িয়ে আছে ওর শরীরটাকে ওর জীবনের চেয়ে গুরুত্ব দেবার জন্য,দাঁড়িয়ে আছে ভয় পাওয়ানোর জন্য।কিন্তু না,এক আকাশ ভর্তি তারায় ও আজ চিনে নিচ্ছে নতুন আলোর পথ।
সতর্ক থাকতে হবে,ভয় পেলে চলবে না।একেবারেই না।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত