| 23 এপ্রিল 2024
Categories
ইতিহাস এই দিনে

অন্য চোখে নেতাজি

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

আজ ২৩ জানুয়ারী নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর শুভ জন্মতিথি। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। নামটির পাশে দুটি ভাবনা আছে। একটি জন্মভূমি অর্থাৎ সবার উপরে আমার দেশ অপরটি অনুপ্রেরণা। দেশবাসীর কাছে তিনি চিরকালের এক মহানায়ক। এক আনফরগটেন হিরো। ভারতের ও বিশ্বের মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসের এক বিতর্কিত ও বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র। 

 ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


সুভাষের শিক্ষাজীবন

ছোটবেলা থেকেই সুভাষচন্দ্র, পড়াশোনার বিষয়ে ভীষন মনোযোগী ছিলেন, আর তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় কটকের এক প্রোটেস্ট্যান্ড ইউরোপীয় স্কুল থেকে। এরপর ১৯০৯ সালে তিনি সেখান থেকে ভর্তি হন কটকের রাভেনশো কলেজিয়েট স্কুলে। স্কুলে পড়ার সময়, তিনি সেই স্কুলের প্রিন্সিপাল বেনিমধাব দাসের ব্যক্তিত্বের উপর বিশেষভাবে প্রভাবিত হন এবং তাঁরই সহযোগীতায় ছোট্ট সুভাষ, স্বামী বিবেকানন্দের বই পড়তে আগ্রহী হয়ে পড়েন।

সুভাষচন্দ্র বোস অবশ্য পরবর্তীকালে তাঁর লেখায় এটা উল্লেখ করেছিলেন যে, স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও লেখা বই তাঁকে একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীতে পরিণত করেছিলো। স্বামীজির লেখা বই পড়েই তিনি তাঁর জীবনের আসল উদ্দেশ্য খুঁজে পান।

সাল ১৯১১, যখন নেতাজী ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কলকাতায় প্রথমস্থান অধিকার করেন। এরপর তিনি ১৯১১ সালে ভর্তি হন কোলকাতার প্রেসিডেন্সিতে, কিন্তু সেখানে শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে ভারত বিরোধী মত পার্থক্যর জন্য ভীষন সংঘাত শুরু হয়।

সেই সংঘাতে, যেহেতু সুভাষচন্দ্র ভারতীয় ছাত্রদের পক্ষে ছিলেন তাই তাঁকে এক বছরের জন্য কলেজ থেকে বহিস্কার করে দেওয়া হয় এবং পরীক্ষা দেওয়ারও অনুমতি দেওয়া হয় না।

তারপর ১৯১৮ সালে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে, দর্শনে সাম্মানিক সহ বি.এ পরীক্ষায় পাশ করেন তিনি।

কলকাতায় পড়াশোনা শেষ করে সুভাষচন্দ্র বসু, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত ফিজউইলিয়াম কলেজে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন। সেখানে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করে তিনি প্রায় নিয়োগপত্র পেয়ে যান, কিন্তু বিপ্লব সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি হওয়ার জন্য সেই নিয়োগও প্রত্যাখ্যান করেন।

চাকরি প্রত্যাখ্যান করার পর তিনি আবার ইংল্যান্ড ছেড়ে ভারতে চলে আসেন এবং এখানে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন। সেই দলে ঢোকার তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো, ভারতকে যেভাবেই হোক ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীন করে তোলা।

১৩ই এপ্রিল ১৯১৯, যখন অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড ও দমনমূলক রাওলাট আইন সমস্ত ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এইরুপ বিশৃঙ্খলার পর, নেতাজী ‘স্বরাজ’  নামক একটি খবরের কাগজের হয়ে লেখালেখি শুরু করেন এবং বঙ্গীয় প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির প্রচারের দায়িত্বে নিযুক্ত হন।

এরপর চিত্তরঞ্জন দাশ ১৯২৪ সালে যখন কলকাতা পৌরসংস্থার মেয়র হন, সেইসময় সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর অধীনে কাজ করতেন। চিত্তরঞ্জন দাশই ছিলেন তাঁর রাজনৈতিক গুরু, কারণ তাঁর কাছ থেকেই সুভাষচন্দ্রের রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়।

নেতাজির প্রেম

অসহযোগ আন্দোলনের কারণে জেলে যাওয়ার পর থেকেই নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর শরীর বেশ খারাপ হয়ে পড়ে। চিকিৎসার জন্য সুভাষ বসুকে শেষমেশ অস্ট্রিয়ায় যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার।

অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অবস্থানকালে এক ইউরোপীয় প্রকাশকের কাছ থেকে বই লেখার অনুরোধ পান সুভাষ বোস। ‘দা ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’ নামে ওই বই লেখার জন্যই তখন সহকারী হিসেবে ২৩ বছর বয়সী এমিলি শেঙ্কলকে নিয়োগ দেন তিনি। ১৯৩৪ সালের জুন মাস; সুভাষ চন্দ্রের বয়স তখন ৩৭ বছর। স্বাধীনতাকামী এ নেতা তখন হয়তো ধারণাও করতে পারেননি ওই অস্ট্রীয় তরুণী তার জীবনে নতুন ঝড় তুলে দেবেন।

সুভাষ চন্দ্র বসুর বড়ভাই শরৎ বসুর নাতি ও প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সুগত বসুর লেখা ‘হিজ ম্যাজেস্টিজ অপোনেন্ট-সুভাষ চন্দ্র বসু অ্যান্ড ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল এগেইনস্ট এম্পায়ার’-এ লিখেছেন, এমিলির সঙ্গে সাক্ষাতের পরেই সুভাষের জীবনে একটা নাটকীয় পরিবর্তন এসেছিল। দুজনের মধ্যে প্রেমপত্র বিনিময় হতো। এমিলিকে উদ্ধৃত করে সুগত বসু তার বইতে লিখেছেন, প্রেমের আভাসটা সুভাষ চন্দ্র বসুর দিক থেকেই এসেছিল। ১৯৩৪-এর মাঝামাঝি সময় থেকে পরের বছর দু’য়েক অস্ট্রিয়া আর চেকোস্লোভাকিয়াতে থাকার সময় সম্পর্কটা আরো মধুর হয়ে উঠেছিল। যুদ্ধের সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলোতে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য সাহায্য পাওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপের মধ্যে সুভাষচন্দ্র নিজের প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতেন। তারপর চিঠিতে উঠে আসে দু’জনার আবেগঘন কথোপকথন।
সুভাষ চন্দ্র এক চিঠিতেই লিখেছিলেন, আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। হতে পারে, পুরো জীবনটাই হয়তো জেলে কাটাতে হবে, অথবা আমাকে গুলি করা হবে, কিংবা ফাঁসিও হতে পারে। এও সম্ভব যে তুমি হয়তো আমাকে কখনো আর দেখতেই পাবে না, অথবা আমি হয়তো কখনো তোমাকে চিঠিও লিখতে পারব না। কিন্তু ভরসা রেখ, তুমি চিরকাল আমার হৃদয়ে থাকবে, আমার মনে, আমার স্বপ্নে থাকবে। যদি এই জীবনে সম্ভব না হয়, তাহলে পরের জীবনে তোমার সঙ্গেই থাকব আমি।
এই চিঠি দেওয়া-নেওয়ার পালার মাঝেই প্রথম যেবার এমিলি আর সুভাষের দেখা হয়েছিল, তখনই তারা বিয়ে করেন। ১৯৩৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর তাদের বিয়ে হয়েছিল অস্ট্রিয়ার বাদগাস্তিনে। দুজনেরই পছন্দের রিসর্ট ছিল ওটা। তবে দুজনেই নিজেদের বিয়ের ব্যাপারটা গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সুভাষ চন্দ্র আর এমিলি শেঙ্কলের প্রেমপর্বের ওপরেই একটা বই লিখেছেন তিনবার ভারতের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া ড. কৃষ্ণা বসু। ‘আ ট্রু লাভ স্টোরি-এমিলি অ্যান্ড সুভাষ’ নামের ওই বইটিতে দুজনের প্রেমপর্বের অনেক জানা-অজানা তথ্য রয়েছে।

১৯৩৪ থেকে ১৯৪৫; এই প্রায় একযুগ সময়কালে দুজনে বছর তিনেকেরও কম সময় একসঙ্গে কাটাতে পেরেছিলেন। এর মধ্যে ১৯৪২ সালের ২৯ নভেম্বর জন্ম নেয় তাদের একমাত্র সন্তান অনিতা। মেয়েকে দেখার জন্য ওই বছর ডিসেম্বরে ভিয়েনায় পৌঁছান সুভাষ চন্দ্র। তারপরে বড়ভাই শরৎ চন্দ্রকে বাংলায় লেখা একটি চিঠিতে সুভাষ চন্দ্র স্ত্রী-কন্যার ব্যাপারে বিস্তারিত জানিয়েছিলেন।

তারপরেই সুভাষ চন্দ্র বসু সেই মিশনে রওনা হন, যেখান থেকে এমিলি আর অনিতার কাছে আর কোনোদিনই ফিরে আসেননি। এমিলি সুভাষের স্মৃতি নিয়েই ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। একটা ছোট টেলিগ্রাফ অফিসে চাকরি করেই তাদের সন্তান অনিতাকে জার্মানির প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ বানিয়েছেন এমিলি। এ সময় সুভাষ চন্দ্রের পরিবার থেকে কোনোরকম সাহায্য নিতে অস্বীকার করে গেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, সুভাষ চন্দ্র নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে যে গোপনীয়তা রক্ষা করতে চাইতেন, এমিলিও সম্পূর্ণভাবে তার মর্যাদা রেখে গেছেন চিরজীবন। 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত