| 5 মার্চ 2024
Categories
গদ্য সাহিত্য

অবন ঠাকুরের খুদি রামলীলা

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

দেবদত্ত গুপ্ত


বাংলার শিল্পকলার আধুনিকতার প্রাণপুরুষ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির অন্যতম শ্রেষ্ঠ নক্ষত্র। নিজের ভাবনা ও স্বদেশ বোধ থেকে তৈরি করেছিলেন এমন একটি ধারা যা তাঁরই ছাত্রদের হাতে লালিতপালিত হল ‘বেঙ্গল স্কুল’ নামে। সূর্য, বিষ্ণু, বুদ্ধ, শিব ও সতী ইত্যাদির আড়ালে সেদিন খুঁজে নেওয়া শুরু হল ভারতীয়ত্বের স্বরূপ পরিচয়। আসলে ব্রিটিশ রাজের শিক্ষা পরিকল্পনাকে অতিক্রম করে একটি মনের মত রাস্তা খুঁজে নেওয়ার প্রয়াস। মেকলে সাহেব মন্তব্য করেছেন যে, ভারতের ঐতিহ্য এতই সামান্য যা নাকি এশিয়াটিক সোসাইটির একটা তাকে’ই ধরে যায়। আর তখনই বাংলার শিল্পীরা উঠে পড়ে লাগলেন। তাঁদের পথ দেখালেন অবনীন্দ্রনাথ। আনো তুলে রামায়ণ, মহাভারত আর অজন্তার দেওয়াল থেকে ছবি। শৈলী তুলে আনো মুঘল রাজপুত আর পাহাড়ি ধারা থেকে। চলুক ছবির পর ছবিতে ওয়াশের আস্তরণ। নিবিড় হোক ছবি দেখার চর্চা।

এরকম যখন চলছে ঠিক তখনই ১৯৩৪-৩৫ নাগাদ যাত্রাপালার ঢঙে রামায়ণ লিখতে শুরু করলেন অবনীন্দ্রনাথ। বালকবালিকাদিগের জন্য লিখিত। বড় মাপের একটি খাতা ভরে লিখতে শুরু করলেন সেই পালা। পালার নাম ‘খুদ্দুর যাত্রা’। আর আদুরে নাম দিলেন ‘খুদি রামলীলা’। দ্বিতীয় নামটি আমাদের ধরতাই দেয় যে, এই পালা আদপে হল খুদেদের জন্য লেখা একটি রামায়ণ। আর সব থেকে মজার কথা এই রামায়ণের ইলাস্ট্রেশনের জন্য হাতে করে রঙ-তুলি নিয়ে ছবি আঁকেননি অবনীন্দ্রনাথ। এই পুঁথির অলঙ্করণ করতে পালার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাময়িক পত্র-পত্রিকায় ছাপা ছবি, বিজ্ঞাপন, সিনেমার বিজ্ঞাপন কেটেকুটে লাগাতে থাকেলেন তিনি। আর রামায়ণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে তাল মেলাতে লাগল বিজ্ঞাপনগুলি। বেঙ্গল স্কুলের প্রাণপুরুষের হাতে কাটাকুটির এমন মজা সবাইকে আশ্চর্য করে দিল। কবি জসিমুদ্দীন এই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন। তিনি লিখলেন- ‘অতি আধুনিক কবিদের মধ্যে কেহ কেহ খবরের কাগজের এখান হইতে ওখান হইতে ইচ্ছামত কয়েকটি লাইন একত্র সমাবেশ করিয়া কোনও নুতন রকমের ভাব প্রকাশ হয় কীনা তার পরীক্ষা করেন। তেমনি তিনিও এই ভাবে খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনের ছবিগুলি লইয়া কোন একটা বিশেষ সৃষ্টি কাজে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন কি-না বলিতে পারি না’। এখন দেখা যাক সেরকম ছবিগুলি কী?

এই পাতায় (পৃষ্ঠা-২৯) লেখার বিষয় হল ভরতের দুঃস্বপ্ন দর্শন। রাজা দশরথ মৃত প্রায়। রাম চলেছেন বনবাসে। অযোধ্যা যেন নরক নগরী। এই পৃষ্ঠার জন্য তিনি বেছে নিলেন ‘ফক্স’ কোম্পানির দান্তেজ ইনফারনো ছবির বিজ্ঞাপন। যে বিজ্ঞাপনে লেখা আছে ‘SOULS IN HELL!’। অযোধ্যার নরক দশার কথাই যেন বলে ওঠে বিজ্ঞাপনটি।



এই পাতার (পৃষ্ঠা-৩৩) মূল বিষয় হল ভরত ও রামের অন্যান্য ভাইরা এসে মন্থরাকে জুতো পেটা করবে। আর ভরত পরম বিশ্বাসে রামের পাদুকা মাথায় করে নিয়ে আসবে। তাই মুখ্য বিষয় জুতো। আর সেই কারণে এই পাতার জন্য অবনীন্দ্রনাথ কেটে নিলেন ‘রাদুর’ জুতোর বিজ্ঞাপন। আবার খবরের কাগজ থেকে এক টুকড়ো লেখাও কেটে নিলেন। লেখাটি হল ‘Religious faith: that driving force’। এই শব্দকটি ভরতের ভাবনা ও মনের কথার সঙ্গে প্রযোজ্য।



এই পাতায় (পৃষ্ঠা-৪৪) লিখছেন সুর্পনখার নাক কাটার কাহিনী। সুর্পনখা কুশ্রী কিন্তু নিজে মায়াবলে সুশ্রী হয়ে রামের কাছে এসেছিলেন। এই কুশ্রী-র সুশ্রী হওয়ার যে প্রেরণা তা তো হিউম্যান সাইকোলজি। অবনঠাকুর এই পাতার জন্য ‘হিমানী স্নো’-এর বিজ্ঞাপন এর একটি ছবি কেটে নিলেন । যেখানে একজন কুৎসিত দর্শন কেউ চুরি করে হিমানী স্নো মেখে সুন্দর হতে চাইছে। হাস্যরস ও ব্যঞ্জনা এখানে শিল্পের ভাষা হয়ে ওঠে।



এই পাতার (পৃষ্ঠা-৪৬) বিষয় হল স্নো ক্রিম মেখে সুর্পনখা সাজ-গোজ করেছে। সে রামকে গান শোনাবে। তাই সেই পর্বের আগে সে তার সখীদের নিয়ে নাচে-গানে মেতে উঠেছে। খুলে বসেছে ‘ হিজ মাস্টার্স ভয়েস’।



অবনীন্দ্রনাথ এই পাতার জন্য রেকর্ড ও গ্রামাফোন এর ছবি ও গ্রামাফোন কোম্পানির লোগোটি কেটে নিলেন।
এই পাতার (পৃষ্ঠা-৪৯) বিষয় সীতাহরণ। এর জন্য বেছে নিলেন ‘হিন্দ কেশরী’ সিনেমার বিজ্ঞাপন। রাবণ যেন ভিলেনের মতো ঘোড়ায় চড়ে এসেছে সীতাকে তুলে নিয়ে যাবেন বলে রাবণ সীতাকে নিয়ে চলেছেন। সীতা তাঁর সমস্ত গয়না খুলে খুলে ফেলছেন। কাহিনীর এই জায়গাকে বোঝতে অবন ঠাকুর কেটে তুলে নিলেন (পৃষ্ঠা-৮৩) সমকালের গয়নার দোকানের ক্যাটালগের ছবি।



এবার বানর বাহিনী তৈরি লঙ্কা যেতে। ‘লঙ্কা’ এই স্থান নামের পরিপূরক বোঝাতে পঞ্জিকা থেকে তুলে নিলেন লঙ্কার ছবি, (পৃষ্ঠা-১৪৩)।



রামের বাহিনী বানর বাহিনী ও হনুমান বাহিনী। ‘কপি’ মানে বানর। সেটি বোঝাতে পঞ্জিকা থেকে কেটে নেওয়া ‘ওলকপি’র ছবি, (পৃষ্ঠা-১৪৫)।



রাবণের দরবার বোঝাতে সাহেব ফুটবল দলের সদস্যদের ছবি। এই সময় মোহনবাগান লাগাতার লড়ছে সাদা চামড়ার ফুটবল দলের সঙ্গে। তাই সেই সাদা চামড়ার ফুটবল দলের সদস্যদের তুলনা করা হল রাবণের দরবারের সদস্যদের সঙ্গে। খবরের কাগজ থেকে কেটে তোলা ছবি, (পৃষ্ঠা- ১৫৬)। এই ভাবেই গোটা খাতা জুড়ে রামায়ণের আশ্চর্য বিবরণ। শিল্পের উত্তর আধুনিকতার ভাষায় কনটেক্সট, ডি-কনটেক্সট একটা মস্ত বিষয়। সেই যাত্রা ১৯৩৪-৩৫ সালেই শুরু করে দিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।



কৃতজ্ঞতা: বঙ্গদর্শন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত