| 28 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
পাঠ প্রতিক্রিয়া সাহিত্য

শেষের কবিতায় জীবন্ত রবীন্দ্রনাথ

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

রেজাউল আহসান

শেষ জীবনে রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্যে কিছু নতুনত্ব দেখা যায়। তার এ নতুনত্বের আরেক আনজাম শেষের কবিতা উপন্যাস। শেষের কবিতায় আধুনিক অভিজাত সমাজের মানুষের মধ্যকার সম্পর্কের মেলবন্ধনের কথা এসেছে, এসেছে বিচ্ছেদ ও বিরহের কথা।

লেখার কলমের সঙ্গে চিত্রকল্পকে দেখার একধরণের গভীর অনুভূতি রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতায় উপলব্ধি করা যায়। যেখানে একেকটা বক্তব্যের সঙ্গে আরেকটা বক্তব্যের বিষয়গুলো যেনো বারবার কল্পনার চোখে দৃষ্টিত হয়। শেষ জীবনে এসে রবীন্দ্রনাথ দুজন মানব-মানবীর প্রেমের কাহিনী লিখলেন। তাও এ কোনো সররৈখিক প্রেম নয়, এ প্রেম চর্তুভুজাকৃতির। আর ব্যক্তিটি যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন তার জন্য এ আর এমন কী! তাই তো ১৯২৮ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছালেন তখনই তার হাতে রচিত হলো কালজয়ী উপন্যাস, ‘শেষের কবিতা’। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে গত ৯০ বছরে একই জনপ্রিয়তা ও ব্যাপক পাঠ্যবহুলতার মধ্যে রয়েছে। বাংলা সাহিত্যের খুব কম বই-ই এমন জনপ্রিয়তার কাতারে পৌঁছাতে পেরেছে। রবীন্দ্রনাথ তার সৃষ্টি, শিল্প, কাব্যময়তায় এক ও অনন্য। শেষের কবিতায় তিনি যে ভাষার ব্যবহার ঘটিয়েছেন তা আধুনিক বাংলা সাহিত্যের নতুন ধারারই উন্মেচক।

যেমনঃ ‘ফ্যাশনটা হলো মুখোশ, স্টাইল মুখশ্রী।’ বর্তমানে আমরা ফ্যাশন ও স্টাইল সম্পর্কে নতুনভাবে জানছি ও জানাচ্ছি কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ৯০ বছর আগেই সেসব ব্যবহার করেছেন শেষের কবিতায়। আবার অন্যথায় বলেছেন, ‘লোকে ভুলে যায় দাম্পত্যটা একটা আর্ট- প্রতিদিন তাকে নতুন করে সৃষ্টি করা চাই।’ দাম্পত্যকে আর্টের সঙ্গে তুলনা করে দাম্পত্যের সম্পর্ককে আরও বেশি গতিময় করেছেন। প্রমিত বাংলা ভাষায় রচিত চমৎকার বাক্যাবলির সুসংমিশ্রণ শব্দের আদলে রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ উপন্যাসটি লিখেছেন। যেখানে প্রেম আছে, বিরহ আছে, বিচ্ছেদ আছে, কাব্যিক ছন্দময়তা আছে, হাস্যরস আছে। অমিতের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ শেষের কবিতায় আমরা যেনো জীবন্ত রবীন্দ্রনাথকেই দেখতে পাই। শেষের কবিতার ভাষাগত শৈলী অপূর্ব। যেনো এক শব্দের পর আরেক শব্দ শোনার অপেক্ষা। গদ্য সাহিত্যের মধ্যেও যে ছন্দময়তা থাকতে পারে, তা শেষের কবিতার মধ্যে দিয়ে প্রমাণ হয়।

অমিত উপন্যাসের নায়ক। অমিতের এই চরিত্রকে রবীন্দ্রনাথ শৈল্পিক বিমূর্ততায় সাজিয়েছেন। বলতে গেলে সম্পূর্ণ উপন্যাসটিকে সে একাই টেনেছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘যে মানুষ অনেক দেবতার পূজারি, আড়ালে সব দেবতাকেই সে সব দেবতার চেয়ে বড়ো ব’লে স্তব করে; দেবতাদের বুঝতেও বাকি থাকে না অথচ খুশিও হন। কন্যার মাতাদের আশা কিছুতেই কমে না, কিন্তু কন্যারা বুঝে নিয়েছে অমিত সোনার রঙের দিগন্ত রেখা- ধরা দিয়েই আছে তবু কিছুতেই ধরা দেবে না। মেয়েদের সম্বন্ধে ওর মন তর্কই করে, মীমাংসায় আসে না। সেই জন্যই গম্যবিহীন আলাপের পথে ওর এত দুঃসাহস। তাই অতি সহজেই সকলের সঙ্গে ও ভাব করতে পারে- নিকটে দাহ্যবস্তু থাকলেও ওর তরফে আগ্নেয়তা নিরাপদে সুরক্ষিত।’

অমিতের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ভাষাকে আরও বেশি দৃঢ়তা দান করেছেন। যেখানে অমিত ছন্নছাড়া এবং কারও যুক্তিকে সে তোয়াক্কা করে না। সে নানান যুক্তির মধ্য দিয়ে তার কথাকে প্রতিষ্ঠিত করে। যেমন, তাজমহলের পুনরাবৃত্তির প্রসঙ্গে রবি ঠাকুরের ভক্ত আরক্তমুখে বলে উঠল,‘ভাল জিনিস যত বেশি হয় ততই ভালো।’

কিন্তু অমিত বলল তার ঠিক উল্টোটা,‘বিধাতার রাজ্যে ভাল জিনিস অল্প হয় বলেই তা ভালো, নইলে সে নিজেরই ভিড়ের ঠেলায় হয়ে যেত মাঝারি।’

শিলঙ পাহাড়ে অমিত ও লাবণ্য যখন একসঙ্গে ঘুরতে গেলো তখন অমিত লাবণ্যকে একটা ছ্যাৎলা পড়া পাথরের মধ্য বসতে অনুরোধ করলে লাবণ্য ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিন্তু সময় যে অল্প।’

অমিত বলল, ‘জীবনে সেটাই তো শোচনীয় সমস্যা লাবণ্যদেবী, সময় অল্প।… সময় যাদের বিস্তর তাদের পাঙ্কচুয়াল হওয়া শোভা পায়। দেবতার হাতে সময় অসীম; তাই ঠিক সময়টিতে সূর্য ওঠে, ঠিক সময়ে অস্ত যায়। আমাদের মেয়াদ অল্প, পাঙ্কচুয়াল হতে গিয়ে সময় নষ্ট করা আমাদের পক্ষে অমিতব্যয়িতা।’

শেষের কবিতা উপন্যাসে চর্তুভূজ প্রেম নির্ভরতার প্রয়াস পাওয়া যায়। যেমন- অমিতর সঙ্গে কেতকীর, লাবণ্যের সঙ্গে অমিতর, আবার শোভনলালের সঙ্গে লাবণ্যের। দ্বৈত প্রেমের আবেশে নিবিষ্ট উপন্যাসটি। যার প্রমাণ মেলে অমিতের একটি উক্তির মধ্য দিয়ে, ‘কেতকীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালবাসারই। কিন্তু সে যেন ঘড়ায় তোলা জল, প্রতিদিন তুলব, প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর লাবণ্যের ভালবাসা, সে রইল দীঘি। সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে।’ অথবা, ‘যে ভালবাসা ব্যাপ্তভাবে আকাশে থাকে অন্তরের মধ্যে সে দেয় সঙ্গ; যে ভালবাসা বিশেষভাবে প্রতিদিনের সব-কিছুতেই যুক্ত হয়ে থাকে সংসারে সে দেয় আসঙ্গ। দুটোই আমি চাই।’

লাবণ্যকে না পাওয়ার পেছনে অমিতের কিছু হালছাড়া স্বভাব প্রকাশ পেয়েছে। অমিতর ওয়েস্টার্ন মাইন্ডের একটা প্রভাব আমরা এখানে লক্ষ্য করি; যে কিনা তার ক্লাসমেট কেতকীকে লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ার সময় ভালবেসেছিল। আংটিও পরিয়ে ছিলো। কিন্তু সাত বছর পর, কেতকী যখন দেশে ফিরে অমিতকে চায়, তখন সে কেতকীকে ফেরাতে পারে না। অথচ সাত বছরের আগের প্রেমকে সে চাইলেই এড়িয়ে যেতে পারতো কিন্তু সে তা না করে লাবণ্যের কাছ থেকে দূরে সরে গেলো। অথচ উপন্যাসের শুরুর দিকে, বালিগঞ্জের সাহিত্য সভায় অমিত বলেছিল, ‘পাঁচ বছর পূর্বেকার ভালো-লাগা পাঁচ বছর পরেও যদি একই জায়গায় খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে তা হলে বুঝতে হবে, বেচারা জানতে পারে নি যে সে মরে গেছে।’

এই বাক্যের সাথে অমিতের বাস্তবতার কোনো মিল নেই। যেনো মনে হচ্ছে অমিত একটা ছদ্মবেশ; যে চেয়েছিল আত্মপ্রতিষ্ঠা ও খ্যাতি। অথবা অমিত সম্পর্কে বলতে  গিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রথমেই বলেছেন, ‘মেয়েদের সম্বন্ধে ওর আগ্রহ নেই, উৎসাহ আছে।’ হয়তো সেই উৎসাহই তাকে ভালবাসতে সাহায্য করেছে কিন্তু সে জন্যই সম্পর্কটা ঘর বাঁধা পর্যন্ত গড়ায়নি।

সম্পর্কের এক পর্যায়ে এসে লাবণ্য বুঝতে পেরেছিল, অমিতকে সে হয়তো জীবনে আর পাবে না। তাই তো সে বলেছিল, ‘তুমি আমার যত কাছেই থাক তবু আমার থেকে তুমি অনেক দূরে।’

মুক্তি পর্বে অমিত লাবণ্যকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছে কিন্তু লাবণ্যের মনে তেমন কোনো সাড়া নেই। অমিত নানাভাবে ওকে আগলে রাখছে কিন্তু লাবণ্য যেনো শান্ত ও নিবিড়। কেতকীর হাত থেকে আংটি খুলে অমিত একদিন লাবণ্যকে পরিয়েছিল আজ লাবণ্য সে আংটি খুলে আমিতের আঙুলে আস্তে করে পরিয়ে দিলো। আর বললো, ‘আমাকে তুমি কোন আংটি দিয়ো না।  কোন চিহ্ন রাখবার কিছু দরকার নেই। আমার প্রেম থাক নিরঞ্জন। বাইরের রেখা- বাইরের ছায়া তাতে পড়বে না।’ তাতে অমিতও কোনো বাধা দিলো না।

কেতকীর সম্পর্কে বলতে গিয়ে লাবণ্য বললো, ‘অন্তত হপ্তাখানেকের জন্য তোমার দলকে নিয়ে তুমি চেরাপুঞ্জিতে বেড়িয়ে এসো। ওকে (কেতকি) আনন্দ দিতে নাও যদি পারো, ওকে আমোদ দিতে পারবে।’ অমিত রাজি হলো। কিন্তু সাতদিন পর অমিত চেরাপুঞ্জি থেকে ফিরে যোগমায়ার বাসায় গেলো। কিন্তু ঘর বন্ধ, সবাই চলে গেছে। কোথায় গেছে তার কোনো ঠিকানা রেখে যায়নি। লেখকের ভাষায়, ‘সমস্ত শিলঙ পাহাড়ের শ্রী আজ চলে গেছে।’ যেন লাবণ্যই ছিল সব সৌন্দয্যের আধার।

অন্যদিকে, লাবণ্যের বাল্যবন্ধু শোভনলাল লাবণ্যকে চিঠি দিয়ে জানাল সে, শিলঙে এসেছে। লাবণ্যও চিঠির প্রত্যুত্তর দিলো। এবং শেষ পর্যন্ত তাদের সম্পর্ক ঠেকলো বিয়ের পিঁড়ি পর্যন্ত। অতঃপর যতিশংকর লাবণ্যের লেখা একটি চিঠি এনে অমিতের হাতে দিলো। এর এক পৃষ্ঠায় ছিলো লাবণ্য ও শোভনলালের বিয়ের খবর অন্য পৃষ্ঠায় একটি সুদীর্ঘ কবিতা এবং সেটাই হলো শেষের কবিতা। যতিশংকরের হাত থেকে লাবণ্যের চিঠি পাওয়ার পরও অমিতের মধ্যে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। যেখানে শোভনলালের সঙ্গে ছয় মাস পরে লাবণ্যের বিয়ের দিন ধায্য হয়েছে।

‘শেষের কবিতার শেষে লাবণ্য লিখছে,

‘তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান

গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।

হে বন্ধু, বিদায়।’

অমিতের ভালবাসার সব দানকে লাবণ্য অকোপটে স্বীকার করে নিলো। ভালবাসার দায় যে মানুষকে ঋণী করে সে কথাই যেনো এই লাইনের মাধ্যমে লাবণ্য জানান দিলো। অমিতের কথায়, ‘মন যখন খুব বড়ো হয়ে ওঠে তখন মানুষ যুদ্ধও করে, ক্ষমাও করে।’ লাবণ্য যুদ্ধ করে অমিতের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে আর আজ যখন মন খুব উদার তখন অকোপটে সব কিছু স্বীকার করে নিলো অর্থাৎ ক্ষমা করে দিলো।

রবীন্দ্রনাথ, ‘মানসী’তে বলেছিলেন, ‘মিলনে প্রেম ম্লান হয়।’ হয়তো তিনি প্রেমকে ম্লান করতে চাননি বলেই অমিত ও লাবণ্যের প্রেমকে বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে অম্লান করে রেখেছেন। শেষের কবিতা উপন্যাসের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তার যৌবনকালের ব্যক্তি মানসের চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণা, দর্শন ও তার রোম্যান্টিক সৌন্দর্যচেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। সমস্ত উপন্যাসজুড়েই নানা আদলে জীবন্ত রবীন্দ্রনাথই যেনো আমাদের কাছে ধরা দেন।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত