পদাবলি

 

আমার মা

সুবোধ সরকার

আমার মা, পাতা কুড়োনি মা
তারও আছে একটা পয়লা মে
ঘুমোতে যায় পাতা আর প্লাসটিকে
যখন চাঁদ অভিসিক্তায় থামে।

চাঁদ কী আর সেভাবে থামতে জানে
কোনরকমে এখনো আছে টিকে
আমার ছিল বাসন মাজা মা
হুবহু জনান্তিকে।

আমার ছিল ঘর ঝাঁট দেওয়া মা
দাসী এনেছি গো আমারই মায়ের নামে
ওই চোখে তুমি কেন চেয়ে আছ মা?
তোমার জন্য এসেছে পয়লা মে।

আমার মা , সারা বছর পাতা পুড়িয়ে রাঁধে
এই একটা দিন কাঁদে।

 

 

নিঃস্ব
তসলিমা নাসরিন

শরীর তোকে শর্তহীন দিয়েই দিলাম,
যা ইচ্ছে তাই কর,
মাচায় তুলে রাখ বা মশলা মেখে খা
কী যায় আসে আমার তাতে, কিছু কি আর আমার আছে!
সেদিন থেকে আমার কিছু আমার নেই, যেদিন থেকে মন পেলি তুই,
সবই তোকে দিয়ে থুয়ে নিঃস্ব হয়ে মরে আছি।
আমি তোর হাতের মুঠোয়,
আমি তোর মনের ধুলোয়,
গায়ে পায়ে শক্তি ছিল, নেই। সবই তোর, তুই ঋদ্ধ ভগবান।
শরীরটাকে কষ্ট দিলে আমার কেন কষ্ট হবে!
এ তো এখন তোরই শরীর।
মনটা যদি নষ্ট করিস, ছিঁড়ে ফুড়ে কুকুর খাওয়াস,
ক্ষতি আমার একটুও নেই,
ও মন আমি ফেরত নিয়ে কোথায় যাবো!
ও মন ধুয়ে জল খাবো কি!
ও মন কি আর আমাকে চেনে! আমাকে বাসে ভালো!
বাসে এক তোকেই, তোকেই জাদুকর।

 

 

 

একটি অলৌকিক কবিতা পাঠের আসর
অংশুমান কর

[পৌলোমীদির জন্য নয়। এ কবিতা ওঁর কন্যা বৃষ্টির জন্য]

কবিতা পড়ে মেয়েটি নেমে আসা মাত্র
সভাঘরে শুরু হল গুঞ্জন।
শীর্ণকায় এক কবি বললেন,
এঁর কবিতা আগে তো তেমন পড়িনি,
দিব্য লেখেন তো ইনি, খাসা।
এই কবির নাম নিত্য মালাকার।
তাঁর থেকে একটু দূরে বসে থাকা মণীন্দ্র গুপ্ত
স্মিত হেসে বললেন,
ভাবছি, আপনার পরের বইটির প্রচ্ছদ
আমি করে দেব।
রাশভারি চেহারার এক ভদ্রলোক বললেন,
তুমি এসে পড়ায় বাঁচলাম।
এখানকার সাহিত্যপত্রটির সম্পাদনার ভার
তোমাকেই ছেড়ে দেব।
সাগরময় ঘোষের কথা শেষ হওয়ার আগেই
উল্লাস করে উঠলেন
রাজপুত্রের মতো যে যুবক, তিনি জয়দেব বসু।
বললেন, শীতকালে আমরা এবার ট্রেকিংয়ে যাব
গুলমোহর গাছের নীচে বসে খাব
মোমো আর রেড ওয়াইন।
শুধু একটু বিষণ্ণ মল্লিকা সেনগুপ্ত।
বললেন, আমি শুধু ভাবছি বৃষ্টির কথা
রোরোর মতোই মেয়েটার সামনে পরীক্ষা
কী যে বড় ক্ষতি ওর হল!
শুনে মনে হল একবারের জন্য যেন
ছলছল করে উঠল মায়ের চোখ।
দেখে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বললেন,
পুজোর মধ্যে এখানে আসার ট্রেন্ডটা
আমিই শুরু করেছিলাম
তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দিল।
এইবার কথা বলে উঠলেন পৌলোমী
বললেন, এরকম ভাববেন না সুনীলদা
বৃষ্টি জানে যে,
মৃত্যুও একটা ইউনিফর্ম।

 

 

 

জলছুরি কাটছে পাথর 

অরুণকুমার চক্রবর্তী

যেখানে পৃথিবী শেষ জুবুথুবু ঝুলে আছে পঞ্চকোট পাহাড়
ওপারে আলকুশা গ্রাম . এ পারে সুনুড়ি ,
মাঝখানে অনন্ত জলের ঢল তিরতির বিলোচ্ছে লাবনি
স্থানীয় লোকের মুখে যার নাম ‘জোড় ‘
‘জোড়’ মানে – আমি নয় তুমি নয়
জল ও পাথর – জলছুরি কাটছে পাথর
.
অনিন্দ্য কঠিন শিল্পে নিমগ্ন নিষ্ঠায়
আশ্চর্য ভাস্কর জল
পাথরের ভাঁজে ভাঁজে রেখেছে ছুরির দাগ
.
ও পারে পলাশ প্রসব হোলে
সুনুড়িতে বেজে ওঠে মৃদঙ্গ- কাঁসর , সমবেত প্রার্থনা গান ,
ব্রজধুলি আকাশে ছড়ায় ……
.
যে রাধিকা আমাকে পাথর কোরে চলে গেছে
জল কেন তারও হাতে তুলে দেয় ছুরি ………

 

কফিন

বিভাস রায়চৌধুরী

আমার চোখ বুজে থাকার নাম চুমু
আমার এড়িয়ে যাওয়ার নাম গোলাপ
আমার ভালোমানুষির নাম মোমবাতি
#
কিন্তু আজ আকাশে তাকিয়ে দেখি
সার সার কফিন উড়ে যাচ্ছে…
#
কোথায় যাচ্ছে এইসব কফিন?
কাশ্মীর সীমান্ত ছেড়ে ,
কূটনীতি ছেড়ে,
আসন্ন নির্বাচন ছেড়ে,
টিভির টক-শো ছেড়ে,
কবির দেশপ্রেম ছেড়ে
কোথায় চলেছে এইসব কফিন?
#
পরিষ্কার শুনলাম আকাশের বন্দেমাতরম—-
“যাই
মা’র কাছে যাই একবার…
ব‌উয়ের কাছে
আর বাচ্চার কাছে…
কতদিন দেখা হয়নি! ”
#
কী আছে এই কয়েকটা কথায়?
অনেক না-না-না-না জীবনে আছে বলেই সকাল-সকাল আমি
চুমু, গোলাপ আর মোমবাতি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম
হাত থেকে পড়ে গেল সব!
ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল এদেশের মানচিত্রের প্রতিটি কোনায়…
#
আকাশ আমাকে বলল,” ভারতবর্ষ!
তোমার চোখ বুজে থাকার নাম চুমু
তোমার এড়িয়ে যাওয়ার নাম গোলাপ
তোমার ভালোমানুষির নাম মোমবাতি..

 

 

কর্কটক্রান্তির কবি

উত্তম দত্ত 

বৃদ্ধ ডেসমন্ড তার সপ্তম ঘন্টা বাজালেই
এই অন্ধকার তাঁবু ছেড়ে চলে যাবে তুমি।
গির্জার পাখিরা দেখবে, কুয়াশার গং মেখে
পুরনো পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছে ক্রুশকাঠ।

অথচ এইখানে একদিন পাখিদের ভাষা শিখে নিতে এসেছিল কর্কটক্রান্তির কবি ও প্রহরী।
এইখানে সুদীর্ঘ সঙ্গম-শেষে অপার্থিব নাচ করেছিল কিন্নর-দম্পতি।

এখানেই লঘু পাপে প্রাণদন্ড হলো মানুষের। অধিকন্তু সাত বছর বেঁচে থাকবে যে মানুষ
ভুল আদালতে সশ্রম কারাদন্ড হলো তারও,
সত্তর বছর।

সত্তর বছর পরে
তুমি যখন জেল থেকে বেরিয়ে আসবে
তখন এই অন্ধ আদালত বুড়ি হয়ে যাবে আরও।
পুরোনো দেয়াল থেকে খসে পড়বে নোনা অভিমান, নরম নদীর দিকে উড়ে যাবে
ওল্ড টেস্টামেন্টের ঘুমন্ত পাখিরা।

আর তুমি ১৩১বছরের তরুণ পরিব্রাজক,
রাতের সমুদ্রের মতো উন্মত্ত চুম্বনে
ছিঁড়ে ফেলবে কর্কটক্রান্তির বুড়ি প্রেমিকাকে।

 

 

টাইগার রিজার্ভে একদিন

সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

এপ্রিলের তপ্ত বিকেলে
অরণ্যের এবড়ো খেবড়ো পথে
হাওয়া ফুঁড়ে ছুটে চলে আমাদের হুডখোলা জিপ
স্পটেড ডিয়ার চকিতে রাস্তা পেরোয়
অচেনা গাছের আড়াল থেকে অবাক তাকিয়ে থাকে নীল গাই
মাইলের পর মাইল হলুদ ঘাস , কাঁটাঝোপ ঝুঁকে পড়েছে রাস্তায়
অদৃশ্য পোকাদের ক্লান্তিহীন গান-উৎসবে
ময়ূর-পেখমের মত দিন ভেসে যায়
উঁচু- নিচু দুর্গম পথ, সূর্যরশ্মির ভেতর থেকে কেউ যেন বলে ওঠে –
“…এ তো আমাদের দেশ, তোমরা এখানে কেন এলে ?”
মাথানি চেক-পোস্ট পেরিয়ে , আরও গভীর জঙ্গলে
হঠাৎ শুরু হয় পাখি আর বাঁদরের শোরগোল
গাইড বলে – “ওই দেখুন স্যার , একটা বুনো শুয়োর আধখাওয়া ফেলে রেখে গেছে …”
কিছুদূরে জলাশয়, সে কি ওখানে জল খেতে আসবে এখন ?
রুক্ষ , ভয়াল পথে এই এপ্রিলের তপ্ত বিকেলে
কার জন্যে এই অপেক্ষা , কার জন্যে এই অনিশ্চিত ক্যামেরা-প্রয়াস ?
দীর্ঘ , হলুদ ঘাসের আড়ালে যেন জেগে ওঠে ডোরাকাটা চোখ
আকাশে ওড়াউড়ি করে প্যারাকিট
সে কি আসবে এখন ….রুদ্ধশ্বাস থেমে থাকে হুডখোলা জিপের চাকা
আমরা কি তাকে ভয় পাই , নাকি সেই ভয় পায় আমাদের –
এ প্রশ্নে হেসে ওঠে ড্রাইভার গুরমিত সিং
অরণ্যে অপেক্ষা আর কোনঠাসা টাইগার রিজার্ভের মাঝখানে
আমাদের জিপ যেন আগ্রাসী , নাগরিক বাঘ ….

 

 

 

তারাপাঠ শেখো

কিংকর চক্রবর্তী

বাংলার বুক ছুঁয়ে ঝুঁকে আছে আরেক আকাশ
রাত হলে একথালা খুদকুঁড়ো নক্ষত্র তালাশ
আত্মীয় গন্ধের গানে সুর ধরে খাল-বিল-জোড়
বাংলার রামনামে সারারাত প্রেমের অঝোর
আমি তুমি একই জল স্রোতের কাজলে মায়াচোখ
বাংলার তারাগুলো একরোখা আনোখা অশোক
নদীটাকে ছিঁড়ে নিয়ে কোনখানে দিতে চাও বাঁধ?
যে-নদী শ্রাবণ মাখে সেইখানে আমরা অবাধ
কচিহাতে হিংসা গেঁথে রামনামে কোন সত্য দেখো?
অধর্ম করোনা রাম রাত্রিবেলা তারাপাঠ শেখো।

 

 

বিমূর্ত সময়

আশিরব্রত চৌধুরী

উপশম খেয়ে ফেলে ক্রমশ শরীর।
বিদ্রুপ ভাঙিয়ে খায় অঙ্কুর নোলক।
পাখির অমৃত কথা।
বিসর্জন ঘাট থেকে নিভে গেছে শিশুবট।
রুগ্ন বনাঞ্চাল।
পূর্বাপর শব্দের আকর।

হে কাল প্রকাশ লেখো
প্রাচুর্যহীন সংলাপ।

পাঁচিল ডিঙিয়ে যায় আহত সময়।
সম্ভাবনা ডুবে যায়
কোনো এক আহত সূর্যের দিন।

দূরত্ব কখনও আপেক্ষিক নয়।

প্রকট নিরুক্ত হলে জ্বলে উঠে নিজের প্রচ্ছায়া।

ধূপগন্ধ বিষণ্ণতা নৌকোয় চাঁদের খেলাঘর।

 

 

পরকীয়া কিংবা চিকেন চিজ কাবাব

শাশ্বত গঙ্গোপাধ্যায় 

ধরুন,কলকাতায় আপনার খুব বোরিং লাগছে, আপনি একটা নির্জন পাহাড়ি গ্রামে যাচ্ছেন দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির অর্কিডের খোঁজে l…ধরুন,বাড়িতে দিনের পর দিন কাটা পোনা আর ট্যাংরা মাছের ঝোল খেয়ে খেয়ে আপনার জিভ হেজে গেছে, আপনি আরসালানে গিয়ে চিকেন চিজ কাবাব আর মাটন রোগনজুস খেতে চাইছেন l ধরুন, সংসারের নিরানন্দ সাদা কালো ছায়াছবি দেখে দেখে আপনি ক্লান্ত,..ইচ্ছে করছে ইভনিং শো এ নতুন জমকালো সিনেমা দেখতে যেতে l..এইবার ভেবে দেখুন, এগুলো সবই কিন্তু আসলে পরকীয়া l গভীর গোপন পরকীয়া l একঘেয়ে জীবন থেকে বেরিয়ে,স্বকীয় জীবনের ধরা বাঁধা ছকের বাইরে একটু জিভের স্বাদ বদলানো…

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত