পলাশ মাহবুব-এর রম্য গল্প ‘হাই-হ্যালো’

আজ ০৬ ডিসেম্বর সাহিত্যিক ও নাট্যকার পলাশ মাহবুবের  শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

আমাদের মহল্লাতেই থাকে আবদুল হাই।
আসতে যেতে হাই-হ্যালো হয়।
আমার বেশ অনুরাগী। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সেটার জানান দেয় সে। দুই লাইন কথার মধ্যে তিন লাইন প্রশংসা। তবে জেনে-বুঝে যে করে না সেটা বুঝতে পারি। আবদুল হাইয়ের ব্যাপারটা অনেকটা অল্পবিদ্যা ভয়ংকরির মতো। আবদুল হাই অন্যের কাছ থেকে শুনে প্রশংসা করে। অথবা আমাকে খুশি করার জন্য করে যে কারণে তার প্রশংসায় বড় রকমের ফাঁক থেকে যায়। প্রশংসা হয়ে যায় নিন্দার চেয়েও খারাপ।
একদিন বললো ভাই, আপনার ওই নাটকটা তো সেইরকম হইছে।
তাই নাকি?
আরে হ। আমি তো মনে করেন যে চোখের পানি আটকাইয়া রাখতে পারি নাই। বউ কইলো, কি হইছে তোমার? বউরে বললাম চোখে বালুকা ঢুকছে। নাটক দেইখা কানতাছি সেই কথা তো বউরে বলন যায় না।
ওই নাটক দেখে তোমার কান্না চলে এসেছে হাই!
হ ভাই।
বাসি কান্নায় নতুন করে তাপ দেয়ার চেষ্টা করে আবদুল হাই।
কিন্তু ওটাতো হাসির নাটক ছিল। হাসির নাটক দেখে তোমার এসেছে কান্না! তারমানে আমি পুরোপুরি ব্যর্থ।
আবদুল হাই এবার হা হা করে হাসে। কথা ঘোরানোর জন্য খানিক সময় নেয়।
আরে ভাই আমি কি কথা শেষ করছি নাকি। টু দ্য পয়েন্টে তো ঢুকতেই দিলেন না। আমার কান্দনতো ছিল হাসির কান্দন। এমনই হাসির নাটক লিখছেন ভাই, হাসতে হাসতে কাইন্দালছি।
হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলেছো!
জ্বি ভাই। আমি মনে করেন নেত্রকোনার পোলা। চোখের কোনায় অলটাইম পানি রেডি থাকে। আমরা মনে করেন যে হাসলেও চোখে পানি আসে। হা হা হা।

আরেকদিনের ঘটনা।
এবার আমার বইয়ের প্রশংসা।
ভাই, আপনার ওই উপন্যাসটা, ওই যে ‌‘বলতে এলাম ভালোবাসি’। অসসসাধারণ। ভাই, ’স’ কিন্তু তিনটা দিছি। বুঝতেই পারতেছেন কি পরিমাণ ভালো লাগছে।
তাই নাকি? বলো কি?
হ ভাই। দুর্দান্ত কইলে কইলজা ভিজবো না। মন চাইতেছে কই, ধুর্দান্ত।
আবদুল হাইয়ের কথা শুনে হাসি।
আচ্ছা হাই, বইয়ের কোন জিনিসটা তোমার সবচাইতে বেশি ভালো লেগেছে?
এইডা কি আর আমার বলন লাগবো ভাই। সবাই কইতেছে নামডাই হইলো বইডার আসল জিনিস। বলতে এলাম ভালোবাসি। নাম পড়লে আর বই পড়ন লাগে না। এত সুন্দর নাম আপনার মাথায় ক্যামনে আসে ভাই?
ওই নাম তো আমার মাথায় আসেনি। আরেকজনের মাথায় এসেছে।
আবদুল হাই ধাক্কা খায়।
আপনার বইয়ের মইধ্যে আরেকজন মাথা ঢুকাইছে, বুঝলাম না বিষয়ডা।
মানে উপন্যাসটা আমার কিন্তু উপন্যাসের নামটা আরেকজনের কাছ থেকে নিয়েছি। নামটা হেলাল হাফিজের কবিতা থেকে ধার করা।
সেই কথাই তো বলতেছি ভাই . . .
আবদুল হাই সময় নিয়ে হাসে।
জ্ঞানী লোক ধার করে ঘি খায়। কি খায়? ঘি খায়। আজেবাজে জিনিস খায় না। আপনি জ্ঞানী লোক। ধার করে চমৎকার একটা জিনিস নিয়েছেন। প্রশংসা না করে উপায় আছে। হা হা হা।
মানুষ শাক দিয়ে মাছ ঢাকে। ঘি দিয়ে নিজের ভুল ঢাকার চেষ্টা করে আবদুল হাই . . .

তো এই আবদুল হাইয়ের সাথে শেষ যেদিন দেখা সেদিন তাকে বেশ উৎফুল্ল মনে হলো।
ভাই, সময় কিন্তু ঘনাইয়া আইছে। মনে আছে তো বিষয়ডা?
কোন বিষয়টা?
ওই যে, আপনারে প্রাইমারি লেভেলে থাকতে একটা সুসংবাদ দিছিলাম না।
ও হ্যাঁ হ্যাঁ। মনে পড়েছে। তা সুসংবাদ কি হাই স্কুলে উঠেছে নাকি?
জ্বি ভাই . . .
আবদুল হাই লজ্জিতভাবে হাত কচলায়।
ভাই, আমার অনাগত পুত্র সন্তানের জন্য আপনার কাছে একটা নামের আবদার করছিলাম। আমার নামের সাথে মিলাইয়া ছোট্টোর মইধ্যে সুন্দর।
তোমার ছেলের নাম তো রেডি করে রেখেছি কবেই।
কি বলেন ভাই! সত্য?
আবদুল হাইয়ের মুখের হাসি দ্বিগুন হয়।
তা কি নাম ঠিক করছেন ভাই?
হ্যালো।
হ্যালো!!
হমম।
এইডা কেমন হইলো ভাই!!
আমার কাছে তো দুর্দান্ত মনে হচ্ছে। তোমার নামের সাথে মিলিয়ে রেখেছি। হাইয়ের ছেলে ‘হ্যালো’। একটা ছন্দ আছে। তারওপরে নামটা ছোট্টো কিন্তু সুন্দর। সবার মুখে মুখে থাকে। নামের অর্থটাও দারুণ। ইদানিংকার নামের তো কোনও অর্থ থাকেনা। ননসেন্স।
কিন্তু ভাই, হ্যালো কি মাইনসের নাম হয়?
কেনো হবে না। আরে বোকা এটাতো মানুষেরই নাম। শোনে, ’হ্যালো’ শব্দটা একজন মানুষের নাম থেকেই এসেছে।
আলেকজেন্ডার গ্রাহাম বেলের নাম শুনেছো?
হ্যালো কি তার পোলার নাম?
আরে না। আলেকজেন্ডার গ্রাহামবেল হচ্ছেন টেলিফোনের আবিষ্কারক। তার বান্ধবির নাম ছিল ‘হ্যালো’। টেলিফোন আবিস্কার করে প্রথম ফোনটা তিনি বান্ধবিকে করেছিলেন। বান্ধবি ফোন ধরার পর তার প্রথম উচ্চারণ ছিল, হ্যালো . . .
ছেলের নাম রাখতে এসে টেলিফোন আবিষ্কারকের প্রেম কাহিনি শুনতে হবে এটা বোধহয় হাই ভাবেনি। সে শুকনা মুখ করে বললো, আইচ্চা ভাই, পরিবারের সাথে আলোচনা করে দেখি। পোলাতো মনে করেন যে আমার একলার না। সঠিক হিসাব করলে মাতার অংশই বেশি। তার মতামত নেয়ার দরকার আছে। কি বলেন?
অবশ্যই আলোচনার দরকার আছে। আলোচনাতেই সকল সমস্যার সমাধান নিহিত। তবে বিষয়টা তুমি তোমার স্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করবে। হাইয়ের ছেলে হ্যালো। আমাদের দেশে সন্তানের এরকম নাম তুমিই প্রথম রাখবে।
আইচ্চা ভাই।
মলিন মুখে সামনে আগায় হাই। প্রথম হওয়া নিয়ে তাকে খুব একটা আগ্রহী মনে হয়না।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত