পাওলো কোয়েলহো এর ‘আক্রায় পাওয়া পাণ্ডুলিপি’ বইটি কেন পড়বেন? 

১৯৪৭ সালে জন্ম নেওয়া ব্রাজিলের লেখক বিশ্ব মাতিয়ে চলেছেন। তার উপন্যাসগুলো ভেতরকে নাড়িয়ে দেয়, উদীপ্ত করে। পাওলো কোয়েলহোর অনন্য সৃষ্টি ‘আক্রায় পাওয়া পাণ্ডুলিপি’। ১০৯৯ সালে জেরুজালেম নগরীতে যখন ক্রসেড বাহিনীর আক্রমণের মুখে, তখনকার পটভূমিতে লেখা বইটি অবশ্যই তার নিজের নয়, অনুবাদ। ছোট ছোট প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে দিয়ে বইটি এগিয়েছে। কিন্তু জবাবগুলো এমনই যে পড়ামাত্র ভেতরটা নাড়িয়ে দেয়। এক হাজার বছর পরের পটভূমিতেও ওই সব প্রশ্ন আমাদের মনে দোলা দেয়, এখনো আমরা এসব প্রশ্নের জবাবের পেছনে ছুটি।

বইয়ের শুরুতেই বলা হয়েছে, ভীতিকর পরিস্থিতিতে সব আশা, সব সম্ভাবনা যখন শেষ, তখনই কপ্টের কাছ থেকে কিছু শোনার জন্য জেরুসালেমের ভেতরে এক খোলা চত্বরে জড়ো হয়েছিল নারী-পুরুষসহ প্রায় সব পর্যায়ের মানুষ। পবিত্র নগরীতে ওই ছিল তাদের শেষ দিন। রাত পোহানো-মাত্র তাদের হয় নিশ্চিতভাবে মৃত্যুবরণ করতে হবে, কিংবা অনিশ্চয়তার জগতে পা বাড়াতে হবে। জেনে বা না-জেনে প্রতিনিয়ত আমরা যেসব প্রশ্নের মুখোমুখি হই, নিজেদের অজান্তেই যেসব প্রশ্ন আমাদের কুঁড়ে কুঁড়ে খায়, তারা সে সব প্রশ্নই কপ্টকে করেছিল। কিভাবে তাদের অবস্থা বদলানো যায়, ভাগ্য, বিশ্বাস, মানুষের প্রকৃতি, বিশ্বস্ততা, নির্জনতা, সৌন্দর্য, সাহস, ভালোবাসা ইত্যাদি সম্পর্কে তারা জানতে চেয়েছিল।

আমাদের কারো কারো কাছে কেন ভালোবাসা ধরা দেয় না; কেন প্রচণ্ড পরিশ্রম করেও কেউ কেউ সাফল্য পায় না, আবার কারো জন্য সাফল্য যেন ধরা দিতে ওঁত পেতে থাকে? আমরা কাকে ভালবাসব? সৃষ্টিকর্তা কেন আমাকে সৃষ্টি করেছেন? এই দুনিয়ায় আমার কি কোনও মূল্য আছে? মূল্যই যদি থাকবে, তবে কেন কেউ আমাকে পাত্তা দেয় না? আমরা কি লড়াই করব? লড়াই করলে তো হারতে হতে পারে? তার চেয়ে যেভাবে আছি, তাতেই কি সন্তুষ্ট থাকা ঠিক নয়?

এরকম বেশ কিছু প্রশ্নে জবাবে কপট বলেছেন:

হরিণ ঘাস খায়, আবার তাকে গ্রাস করে সিংহ। এখানে কে সবচেয়ে শক্তিশালী, সেটি কোনও ব্যাপারই নয়। আসল কথা হলও এভাবেই আল্লাহ মৃত্যু আর পুনর্জীবনের বৃত্ত প্রকাশ করেন। আর ওই বৃত্তের মধ্যে বিজয়ী বা পরাজিত বলে কিছু নেই। এগুলো হলও অনিবার্য পর্ব। এর মধ্য দিয়ে যেতেই হবে। আল্লাহর দৃষ্টিতে এই দুনিয়ার কোনও কিছুই অপ্রয়োজনীয় নয়। এমনকি গাছের যে পাতাটা ঝরে যায়, মাথার যে চুলটি খসে পড়ে, এমনকি কোনও কাজ না থাকায় যে পতঙ্গটি মরে যায়, সেটিও অনর্থক নয়। সব কিছুরই অস্তিত্বশীল হওয়ার কারণ রয়েছে। কোনও ধরণের উদ্দেশ্য ছাড়াই একেবারে অপরিচিত কোনও লোকের জীবন রক্ষা করতে পারো তুমি। অনেক সময় রাস্তায় তোমার পাশ দিয়ে যাওয়া লোকের দিকে অকারণে একটু হেসেও একই কাজ করতে পারো। ওই লোকটি নিজেকে অকার্যকর ভেবে হয়ত আত্মহত্যা করতেও যাচ্ছিল। তোমার ওই হাসিটিই তাকে নতুন আশা আর আত্মবিশ্বাস দিয়ে তাকে ওই পথ থেকে ফিরিয়ে এনেছে।

আমাদের জীবনে কিছু সমস্যা আছে। কিন্তু সেগুলো এমন নয় যে সমাধান করা যাবে না। তবে এতে সময় লাগতে পারে। আমাদেরকে অবশ্যই আমাদের মা-বাবা, শিক্ষক, সন্তানদের সেবা করতে হবে, সঠিক পথে থেকে উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। প্রতিবেশীরা আমাদের কাছে যে প্রত্যাশা করে তা পূরণ করতে হবে। তাদের কথামতো চলে প্রত্যেককে একই রকম থাকার গুণ, বৈরিতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং বাধা বিপত্তিগুলো এড়ানোর কৌশল শিখতে ও অন্যদের শেখাতে হবে।

তুমি যদি নিজেকে ভালোবাসো, শ্রদ্ধা করো, তবেই কেবল ভালোবাসা পারে, তোমাকে শ্রদ্ধা করা হবে। কখনো সবাইকে খুশি করার চেষ্টা করবে না। যদি করো, তোমাকে কেউই শ্রদ্ধা করবে না। এমন লোকজনের মধ্য থেকে বন্ধু আর মিত্র সন্ধান করবে, যারা নিজেদের কাজ ও নিজেদের পরিচয়ে বিশ্বাস করে। আমি একথা বলছি না: তুমি কেবল সমমনা লোকদের সাথেই বন্ধুত্ব করবে। আমি বরং বলব, যারা তোমার থেকে ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা করে, এবং তুমিই ঠিক, তা তাদেরকে বোঝাতে সক্ষম হবে না, তাদেরই খোঁজ করবে।

যারা গান গায়, গল্প বলে, জীবনকে উপভোগ করে, খুশিতে যাদের চোখ ঝিলমিল করে তাদের সঙ্গে থাকবে। কারণ সুখ হলও ছোঁয়াচে। সুখ থেকেই সবসময় কোনও না কোনও সমাধান পাওয়া সম্ভব। আর যুক্তি কেবল ভুলের ব্যাখ্যা খুঁজে মরে। যারা কোনও বাধানিষেধ ছাড়া, কোনও বিচারবুদ্ধি বা পুরস্কারের আশা ছাড়া, ভুল বোঝাবুঝির শিকার হওয়ার ভয় ছাড়াই ভালোবাসার উজ্জ্বল আলো ছড়ায় তাদের কাছে থাকবে। যাদের চোখ আছে দেখার, তারা তোমার আলো দেখবে, দেখে মুগ্ধ হবে।

জীবনের অর্থ খোঁজার জন্য বেপরোয়া প্রয়াসে অনেকে ধর্মের দিকে ঝোঁকে। তারা মনে করে, বিশ্বাসের নামে কিছু করে তারা মহান কিছু করছে। তারা নিজেদের বলে, ‘আমরা ঈশ্বরের কাজ করছি।’
প্রথমে তারা নিবেদিতপ্রাণ অনুসারীতে পরিণত হয়, তারপর হয় নিবেদিতপ্রাণ প্রচারক, সবশেষে হয়ে পড়ে উন্মাদ। তারা বুঝতে পারে না, ধর্ম সৃষ্টি করা হয়েছে রহস্যকে অনুভব করার জন্য, প্রার্থনার জন্য। অন্যদের নির্যাতন করা বা ধর্মান্তরিত করার জন্য ধর্মের আবির্ভাব ঘটেনি। খোদার কুদরতের সর্বোত্তম প্রকাশ হলও জীবন।

এক তরুণী বাড়ি থেকে বলতে গেলে বেরই হতো না। তার মনে হতো, কেউ তার প্রতি আগ্রহী নয়। সে বলল, ‘আভিজাত্য সম্পর্কে আমাদের শিক্ষা দিন।’ উপস্থিত সবাই বিড়বিড় করে উঠল: ‘আমরা সবাই এখন হানাদারদের হামলার আশঙ্কায় আতঙ্কিত, যেকোনো মুহূর্তে রাস্তায় রক্তের বন্যা বয়ে যাবে, এমন সময় এটি কেমন ধরণের প্রশ্ন?’ কিন্তু কপ্ট হাসলেন। কাউকে বিদ্রূপ করার জন্য ছিল না এই হাসি। বরং তরুণীর সাহসের স্বীকৃতি ছিল এতে। কপ্ট বললেন: হরিণ যখন দৌড়ায়, তখন তাতে আভিজাত্য থাকে, এমনকি সে যদি সিংহের হাত থেকে প্রাণ বাঁচানোর জন্যও দৌড়ায়। আমরা যে পোশাক পরি, তাতে আভিজাত্য থাকে না, বরং আমরা যেভাবে পরি, তার মধ্যেই রয়েছে আভিজাত্য। আমরা যেভাবে তরবারি ঘোরাই, তাতে নয়, বরং যুদ্ধ এড়ানোর জন্য আমরা যে সংলাপ চালাই, তাতেই রয়েছে আভিজাত্য।

এভাবেই বইয়ের প্রতিটি পাতায় জীবনের প্রশ্নগুলো ছুড়ে দেওয়া হয়েছে, কপ্ট তার উত্তর দিয়েছেন। উত্তরগুলো পড়ার পর মনে হবে: আরে আমি তো এভাবে চিন্তা করে এসেছি এতকাল। তখন পাঠক বড্ড মুগ্ধ হবেন আপনি। এমন একটি বই না-পড়ে জীবনের সময় পেরিয়ে যাওয়া বোকামি মনে করি। হয়ত একটু বাড়াবাড়ি ঠেকবে, তবু বলি, বইটি প্রায়শ পড়ি আমি, বার বার পড়ি; পড়ি আর মুগ্ধ হই, শুদ্ধ হই। নিজের ভেতরকার আলোটুকু দেখতে পাই, আর সে আলোটুকু আমার চারপাশে ছড়িয়ে দিতেও এখন বড় ভালো লাগে।

সবেশেষে বইটির বাংলায় অনুবাদক: মোহাম্মদ হাসান শরীফকে অশেষ ধন্যবাদ দিতেই হবে- ঝরঝরে, সহজ ভাষায় বইটি পাঠককে কাছে পৌঁছানোর জন্য।

১৩৬ পৃষ্ঠার নান্দনিক বইটি বাজারে এনেছে ‘কালো’ প্রকাশন। যাদের শ্লোগানই হচ্ছে- ভালো বই। নিঃসন্দেহে এ বইটিও ভালো বই। বইটির মুদ্রিত মূল্য: ২৫০ টাকা। প্রচ্ছদ: মূল প্রচ্ছদের অনুকরণে তানভীর এনায়েত। বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ফোন করুন: কালো প্রকাশন, ফোন: ০১৯১৯-১১ ০৩ ৮৯

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত