ফাগুনবউ । পাপড়ি রহমান

আজ ২০ নভেম্বর কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমানের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


এইরকম দিনগুলিতে রোদ্দুর বরাবরই চড়তা থাকে। যদিও মাথার ওপরে ধূমল মেঘের চাঙারি বৃষ্টি নিয়ে ভেসে বেড়ায়। ভাসতে ভাসতে উড়ে চলে যায় বহুদূর। হয়তোবা দূরের কোনো আকাশে বা সুদূরের কোনো গাঁয়ে।

রোদ্দুরের তীব্র উত্তাপের মাঝে মেঘেদের এমন মতিচ্ছন্নতার কারণ ধরতে পারে না ভরত। প্রখর সূর্যের নিচে কেনইবা তারা জমে ওঠে? কেনই-বা খামোকাই ভেসে বেড়ায়? আবার কেনই-বা উড়ে চলে যায়? এই মেঘ-রোদ্দুরের খেলা নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবনার সুযোগ হয় না ভরতের। বা সে নিজেও এসব নিয়ে ভাবতে চায় না; কিন্তু টোটোর ছাদ গলিয়ে চৈত্রের তীব্র উত্তাপ তার বকুল-বিচি-রঙা ত্বকে জ্বলুনি ধরিয়ে দেয়। ফলে ভরতকে রোদ বা মেঘের তামাশা নিয়ে ভাবতে হয়। শুধু রোদ বা মেঘ নিয়ে ভাবাভাবিতে সব সাঙ্গ হলে ভরত খুশিই হতো। কিন্তু তা হবার নয়। ভরতকে আরো নানান কিছু ভেবেচিন্তে চলতে হয়। সূর্য-চন্দ্রের দিকে কড়া নজরদারি করতে হয়। বিশেষ করে বসন্ত ঋতু যখন বীরভূমের মাটিকে একেবারে বশ করে ফেলে। আর চারদিকে লেগে যায় রঙের মচ্ছব। দোলের রং ছড়ানোর আগেই এখানকার প্রকৃতি রাঙা হয়ে ওঠে। পলাশের ডালে ডালে ধিকিধিকি আগুন জ্বলে প্রচণ্ড দাবদাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। আর নীলমণিলতার আবছা নীলরং লতিয়ে ওঠে বাড়িঘরের সৌখিন ফটকে। কিছু পর্তুলিকা আর দোপাটি উঁচু ঘাসের জমিনে ডুবতে ডুবতে ফটফট করে তাকিয়ে থাকে। ফাগুনবউ আর টিকোমা পাল্লা দিয়ে ফুটতে শুরু করে। দুজনের চেহারাসুরতে এতটাই সাদৃশ্য যে, ধন্ধে পড়তে হয়। ফাগুনবউয়ের হলদে ফুলের আঁচল বিছিয়ে থাকে গাছের তলায়। পাতাহীন ফুল ভরন্ত বৃক্ষদের দিকে তাকিয়ে ভরত বড় উদাস হয়ে ওঠে। টোটোর হ্যান্ডেল সামলে বিড়বিড় করে বলে –

এছব বাহার কুথা থাকি চলি আছলো রে? এতুদিন তু দেখা পাই নাই তুদের?

ভরতের এই কথা একেবারে উড়িয়ে দেবার মতো নয়। আদতেই বোলপুরের বসন্ত বড় হুলেস্নাড় তুলে আসে। বসন্ত আসে গাছলতাকে নানান রঙে সাজাতে সাজাতে। আর মানুষের ঢল নামে। মানুষের শরীরে যত না আবির পড়ে, ফুল আর পাতায় পাতায় প্রকৃতির আবির পড়ে তার চাইতেও ঢেরগুণ বেশি। কোকিল ডেকে যায় মুহুর্মুহু। বীরভূমের মরার কোকিল এমনই ডাকে যে, যে-কোনো আগন্তুক বিভ্রমে পড়ে যাবে। পড়বেই। যেন এই তল্লাটে কোকিল ছাড়া আর কোনো পক্ষী নাই। অথচ ভরত জানে, আসল ঘটনা। নিত্য ভোরেই ঘুঘু আর দোয়েল অবিশ্রাম ডেকে যায়। ভরত দেখে লেজঝোলা ফিঙে আর চড়াইদের ইতংবিতং। তবে এটা সত্য, সারাদিনই লাগাতার ডেকে যায় কোকিল। কোকিলেরা সুখে ডাকে, না দুঃখে ডাকে, ঠিক ধরতে পারে না ভরত।

যেদিন লছমি একটু বেশি আশকারা দেয় – দারুর ঘন নেশায় আর লছমির ঢলোঢলো কালো দেহের ঘামগন্ধে ফুরিয়ে যায় রাত – ভরতের কাছে সেদিন সকালে দেখা প্রতিটা পাখিকেই সুখী মনে হয়। যেনবা তারা সুখের ওম পেয়ে পালক ফুলিয়ে হেঁটে বেড়ায়। কোকিলের একটানা ডাক বড় মধুর হয়ে কানে বাজে। আর ভরত একটা বাংলাগান গুনগুনিয়ে ওঠে –

ঘুম ভাঙাইয়া গেল রে মরার কোকিলে

আমায় উদাসী করিয়া গেল মরার কোকিলে

ধুস্! বাংলা বা হিন্দিগানের কলি গুনগুনালেই কি পেটে ভাত জুটবে? টোটোর স্পিড বাড়ায় ভরত। শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসের চাকা বোলপুরের মাটি ছুঁলো বলে! আগেভাগে রেলস্টেশনে না পৌঁছালে দুই-চারটা খেপ মারা যাবে না। এই ট্রেনটা আবার খুব সময় মেনে চলে। কালেভদ্রে এক-আধ ঘণ্টা এদিক-ওদিক হয় হয়তো। কিন্তু সময়জ্ঞান তার বরাবরই পাক্কা। অবশ্য দুই নাম্বার পস্নাটফরমে স্টপেজ হলে কিছুটা সময় হাতে পাওয়া যায়। যাত্রীরা এক্সেলেটর চেপে ওভারব্রিজ ডিঙিয়ে টোটো ধরতে আসে।

ভরতের অনুসন্ধানী-চক্ষু দ্রুত ঘোরে – কিছুটা আলাভোলা যাত্রী পেলে ৩০-৪০ রুপি তাপ্পি মারা যায়। এই তাপ্পি মানে আসল ভাড়ার চাইতে বাড়তি আদায়। অবশ্য প্যাসেঞ্জার চালাকচতুর হলে এই তাপ্পির ধান্ধাটা ছেড়ে দিতে হয়। নতুন কাপড়ের ওপর খামোকা তাপ্পি যেমন সৌষ্ঠব বাড়ায়, তেমনি এই বাড়তি রুপি সৌষ্ঠব হয়ে ঝুলতে থাকে দারুর বোতলে।

আর দারু না পিলে­ কেমনে কী? সারাদিন টোটো নিয়ে টো টো করে গায়ে-গতরে যে-বিষবেদনা জমে তা তাড়াতে দারু পিনা চাই। ভরতের অবশ্য আরেকটা উপায় জানা আছে – মালিশ! তেলমালিশ! লছমির মসৃণ-কালো আর কোমল হাতের জাদুকরী ডলাডলি। কিন্তু লছমির আজকাল আর মালিশমুলিশে মন নাই। এক যুগ একই বিছানায় চিৎ-কাত হয়ে শুয়ে থাকলে আওরতদের মন ঘুরে যায়। ফিকে হয়ে আসে প্রেমের একদার গাঢ় রং। তখন উলটা কারবার শুরু হয়। আওরতের ঠ্যাং-পিঠ-ঊরুর বিষবেদনা তাড়াতে খসমই নিজেকে উজাড় করে দেয়। তা এতে আপত্তির কিছু নাই। ভরত বরং লছমিকে মালিশমুলিশের জন্য মুখিয়েই থাকে। কিন্তু মালিশমুলিশের পরে ভরতের যদি ইচ্ছা জাগে, যদি তার হাতের চাপ ঘন হয়ে ওঠে – তাহলেই যত ভজঘট ঘটে যায়। লছমি ততক্ষণে ঘুমের তাড়নায় মরাকাঠ হয়ে আছে। ঘুম-লাগা ভারি কণ্ঠে হিসহিসানি তুলে বলে –

আ আমার মরদ! মরদ! রুজ রাইতেই কি তুর ঘুড়ারে লাগাম দিতে হইবেক? সর, মিনসে সরে শো। ছাওয়ালগো কাইল ইশ্কুলের দৌড় আছে।

লছমির কথা মিছে নয়। ভরত কিই-বা দেখে এই সোমসারের? দিনমান টোটোতে প্যাসেঞ্জার চড়ায় আর নামায়। আর সন্ধ্যা ঘনালো কি দারুখানার হাতছানিতে ভরত একেবারে বেহাল হয়ে ওঠে! দারুর বোতল ছাড়া ভরতের আপন আর কে আছে?

সোমসার-পিরথিমি যা কিছু সবই তো লছমি সামলায়। সারাদিন পরিশ্রমের পর লছমি যখন শুতে আসে, ভরত ততক্ষণে তিন পাইট মেরে দিয়েছে। আর মালিশমুলিশের বাহানা নিয়ে লছমিকে তেমন করে পেতে রাত্তির দ্বিতীয় পহর উতরে যায়। লছমির মেজাজ তখন বিগড়ে গেছে।

মরদগুলা দারু টেনে মাতাল না হলে বউয়ের ঘোড়ার লাগাম দিতে পারে না নাকি? ছালা, আমি কি তুর নেশার চক্ষে দীপিকাজি? দূরে থাক নিমরদ মিনসে।

লছমিকে বেশিক্ষণ ঘাঁটানোর সাহস পায় না ভরত। এমনিতে সারাবছরই লছমির মাথায় চৈত্র মাসের ভাঁপ ওঠে। ভরত পান থেকে চুন খসালো কি লছমি ঝটাঝট বাপের বাড়ির দেয়াল তুলে দেবে। তখন ভরতের নিজের মন্দির একেবারে শূন্য। রাতের পর রাত একা একা দারু পিয়ো। পাইটের পর পাইট মেরে যাও। খালি বিছানায় রাতভর তড়পাও আর বাংলা মদের বোতলের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকো – দিপীকাজি না হয় প্রিয়াংকা চোপড়ার কাঁচুলি বাঁধা পিঠ দেখার আশায়।

দুই

চান-সুরুযের হিসাব ভরত নির্ভুল রাখে। বিশেষ করে চৈত্রের শেষ পূর্ণিমার খবর শুধু ভরত নয়, বীরভূমের সবাই-ই কমবেশি
রাখে। এই শেষ পূর্ণিমাতেই জমে ওঠে দোলের উৎসব। শুরু হয় বসন্ত-কীর্তন। আর ম্যালা মানুষের ঢল নামে শান্তিনিকেতনের চত্বরে। আবির-ছড়ানো হাওয়া রঙিন হয়ে ওঠে। ভ্যানের ওপর রং ছড়িয়ে বসে বিক্রেতা। কেনো ভাই কেনো, রং কেনো। রং ছিটিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাও জীবনের জরা যত। আর চারদিকে তাকিয়ে দেখো, বসন্ত সমীরণে মেতেছে সবাই। ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে – দেখো, এন্তার ফুটে চলেছে পলাশ, ফাগুনবউ, নীলমণিলতা। কিছু পর্তুলিকা তাকিয়ে রয়েছে ঘাসের জমিনে।

ভরত ধাই করে টোটোর স্পিড বাড়ায়। এতক্ষণে শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস এসে গেছে। লোকজন ঢেউ হয়ে ভাসিয়ে দিতে এসেছে গত এক বছরের মালিন্য আর ক্লান্তি।

যাত্রীরা সব ঝটাঝট উঠে পড়েছে তাদের মনপছন্দ টোটোতে। ভরতের মনে শংকা ভর করে – আজ হয়তো খুব বেশি তাপ্পির রুপি জোটানো যাবে না। তার চোখ লাটিমের মতো চক্কর খায় – কোনো আলাভোলা প্যাসেঞ্জার ধরা যায় কিনা? যারা প্রথমবারের মতো আসে, তাদের এক লহমায় চিনতে পারে ভরত। তাদের ঠোঁটের কোণ আর কপালের ভাঁজ দেখেই চেনা যায়। ভরতের লক্ষ্য এরাই। এদের প্যাসেঞ্জার হিসেবে পেলে কিছু কাঁচা পয়সা আতকা জুটে যায়। আর দোলের দিনগুলিতে পকেট ভারী না থাকলে চলে কী করে? ভরপেট দারু না পিলে দোলের রং কেমন ফিকে দেখায়!

বোলপুর রেলস্টেশনে এসে ভরতের মুখ শুকিয়ে আমচুর হয়ে ওঠে। ট্রেন এসে পৌঁছেছে মিনিট বিশেক আগেই। এখন টোটোর লাইনে সে কিছুতেই ঢুকতে পারবে না। বেলাইনে গিয়ে টোটোর ঝাঁকে মিশে যাবে সে-উপায়ও আর নেই। ভরত আমচুর মুখ নিয়েই রাস্তার পাশে টোটো দাঁড় করায়। তখুনি দুই আওরত লাগেজ টানতে টানতে এগিয়ে আসে –

‘এই তুমি যাবে?’

‘কই যাবে?’

‘ব্রহ্মপলস্নী।’

‘ছাতাছ দিয়া ঢুকবে তো?’

আওরত দুইজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বলে –

‘হবে হয়তো।’

‘হা হা বুঝতে পেরেছি উঠুন উঠুন।’

‘কত নেবে?’

‘একছ বিছ দিয়েন।’

‘না না এত নয়। আশি।’

ভরত আজ খুব বেশি দরকষাকষিতে যেতে চায় না। বলা যায় না, আম আর ছালা দুটোই খোয়া যেতে পারে।

‘আচ্ছা ওঠো তো, অই ছ দিও।’

রেলস্টেশনের ভিড় সাঁতরে বড় রাস্তায় উঠে হাঁপ ছাড়ে ভরত। যাক বাবা, আজ আর টোটোর লাইন স্টিটেমে পড়তে হয় নাই। বনস্পতি, পলাশ আর আমগাছের ছায়ার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে ভরত হঠাৎ শোনে

ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে …

ভরত বলতে চায় কি চায় না, অথবা অবচেতন মনেই বলে –

‘বাহরে, গলা তো বহুত খুব আছে।’

চমকে উঠে গান থেমে যায়। আদতে তারা এই অনাহূত কথামালার জন্য প্রস্ত্তত ছিল না।

তারা আপনমনে বিভোর ছিল। চমকানো মুখ খলখল করে হেসে ওঠে –

‘আচ্ছা, আচ্ছা আমাদের গান তুমি বুঝতে পারছ?’

‘হাহাহা ওই বললাম না কণ্ঠ ভারি সোন্দর।’

‘তোমার নাম কী?’

‘ভরত।’

‘কী?’

‘বুঝতে পারছ না? ভরত, ভরত।’

‘ও।’

ফের গান ধ্বনিত হয়। ফের সুর আর কথা –

এই পথ যদি না শেষ হয়

তবে ক্যামন হতো তুমি বলো তো?

ভরত বড় সাবধানে আজ টোটোর স্টিয়ারিং ধরে রাখে। খামোকা ঝাঁকুনিতে গানের সুর কেঁপে উঠতে পারে।

আহা! কেন এরা এমন হাসে? আর এত গায়? আর এত খলখলিয়ে হেসে ওঠে? লছমি যদি এদের মতো করে একটু হাসতো? দুই-একটা গানের কলি ঠোঁটের কোনায় জমিয়ে রাখতো? ব্রহ্মপলস্নীতে থেমে থাকা নির্জনতা চুরমার করে দিয়ে ভরতের টোটো এগোয়।

জোর হাওয়াতে সুর উড়ে উড়ে আসে। আজ ভরতের টোটোর যেন ডানা গজিয়েছে। শূন্যে ভেসে চলেছে ভরত। যেন-বা কিছু মেঘ ঢুকে পড়েছে টোটোর ভেতর। চৈত্রের এমন অসহনীয় উত্তাপ শুষে নিতে পরবাসী মেঘ চলে এসেছে শান্তিনিকেতনের আঙিনায়।

ভরতের মাথায় অন্য চিন্তার ঘূর্ণি – আওরত দুইজনের বয়স কত? আজকাল আর মুখ দেখে কারো বয়স আন্দাজ করা যায় না। একজনের মুখের আদল জুহিজির মতন। আর অন্যজন যেন সাক্ষাৎ জিনাত আমান। আহা সেই কোনকালে দেখা সত্যম শিবম সুন্দরম! কী মোলায়েম এদের শরীর? আচ্ছা, লছমির শরীরটা অমন মোলায়েম নয় কেন? ভরত ভাবে জিজ্ঞেস করবে, তুমরা কি মাখো শরীরে?

ধুস্ – ভরত এসব ভাবছে কেন? খানিক বাদেই খেলা সাঙ্গ হয়ে যাবে। এরা নেমে যাবে গন্তব্যে। আর হারিয়ে যাবে চিরকালের মতো। কিন্তু আজ ভরতের কী যেন হয়? যাত্রী নেমে যাওয়ার প্রাক্কালে বলে ওঠে –

‘কুথায় যাইতে হলে আমারে কল করলে আমি চলে আছব।’

‘ওহো তাই নাকি? তাহলে তোমার মোবাইল নাম্বারটা আমাদের দিয়ে যাও।’

‘আর হ্যাঁ, আমরা বেরুবো। তুমি চারটে নাগাদ এইখানেই চলে এসো।’

তিন

খোয়াই পার হয়ে কোপাই নদীর দিকে যেতে যেতে ভরতের টোটো আজ যেন ময়ূরপঙ্খি হয়ে ওঠে। স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে ভরতের মনে হয়, সে যেন আজ সত্যি সত্যি তরতরিয়ে ভেসে চলেছে। হাওয়ার পরতে পরতে সুর মাখামাখি হয়ে আছে। চৈত্রের খরা আজ কি একটু কমতির দিকে? যদিও প্রচ- গরমের হলকা নাকমুখ ঝলসে দিয়ে যাচ্ছে। তবু ভরতের বড় আরাম লাগে। যাত্রীদ্বয়ের কণ্ঠের সুর তার মনপ্রাণ জুড়িয়ে দিচ্ছে।

কোপাইয়ের জল এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। তীরে দাঁড়ালে উষ্ণ ভাঁপ টের পাওয়া যায়। বাদলার কালে কোপাইয়ের এই শীর্ণ যৌবন নড়েচড়ে ওঠে। তখন চারপাশেও কেমন হিমভাব ছড়ানো থাকে।

কোপাই ফেলে খানিক দূর এগোতেই টোটোর দম যায় যায় অবস্থা হয়ে দাঁড়ায়। এমন বেকায়দায় অনেকদিন পড়ে নাই ভরত। ব্যাটারি ডাউন! অথচ গত রাতেই সে কিনা ব্যাটারি বদলে ফুলচার্জ লাগিয়েছিল। এখন করণীয় কী? শিকার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ভরত তটস্থ হয়ে ওঠে। স্টিয়ারিং বারকয়েক অন-অফ করেও সুবিধা কিছু হয় না।

অগত্যা অন্য টোটোওয়ালাকে হাত দেখাতে হয়। ভরত জানে, জুহিজি আর জিনাত আমানের সঙ্গে আর মোলাকাতের সম্ভাবনা নেই। বাড়তি ভাড়া নেবার জারিজুরি তারা ইতোমধ্যেই জেনে যাবে। ভরতের মনে তবু ক্ষীণ আশা, ফস্কে যাওয়া শিকার যদি আরেকবার খাঁচায় ফিরে আসে, যদি আসে!

সন্ধ্যা নাগাদ ফোন পেয়ে সে-আশা প্রলম্বিত হতে শুরু করেছিল, কিন্তু বিধি বাম!

ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে –

‘ভরত শোনো, আগামীকাল আসার দরকার নাই। আমরা রিজার্ভ টোটো নেব না। সময় নিয়ে ঘুরে ঘুরে সব দেখতে চাই।’

‘আচ্ছা। আচ্ছা। দেখো তবে।’

ভরতের গলার কাছটায় কী যেন বাধো বাধো ঠেকে। তার মন বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। আহা! একনজর দেখা হলেও বড় প্রশান্ত থাকা যেত। লছমির ছ্যাঙ-ছ্যাঙ-স্বভাব বিস্মৃত হওয়া যেত। আর জুহিজির মুখটা বড় প্রলুব্ধকর। বারংবার তাকালেও আশ মিটতে চায় না। কী যে মিষ্টি কণ্ঠ দুইজনার! কী পরিপাটি বেশভূষা! জুহিজির আসল নামটা জানা হলো না। ভরত জিজ্ঞেস করতে গিয়েও সংকোচে বিরত থেকেছে। কী না কী আবার ভেবে বসে? ওই আওরতের বড় দয়ার শরীর। চা খাওয়ার সময় ভরতকে পাশে বসতে দিয়েছিল। আর ভরতের মন মুহূর্তে ফুরফুুরে হয়ে গিয়েছিল।

চার

দোলের পূর্ব রাত্তিরে ফোন পেয়েছিল ভরত।

‘ভরত আগামীকাল ভোরে আসতে পারবে?’

ভরত জানে খুব বেশি ভাড়া আর তাদের কাছ থেকে হাতানো যাবে না। ফলে কী দরকার খামোকা গিয়ে? নিজের লাভ না হলে ভরত কিছুতে আগাতে চায় না। যাক গে। মরুক গে। তাতে ভরতের কী? যতই ডাকুক ভরত আর যাবে না। সে তো চেয়েছিল এই কয়দিন টোটোর সার্ভিস তাদেরই দিতে। কিন্তু তারাও তো ভরতের কথা মনে রাখে নাই। এইসব ফালতু আবেগ প্রশ্রয় দিলে ভরতের চলে না। কোনো বিদেশিনী এসেছে দুইদিনের জন্য, ফের উড়েও যাবে নিজের আকাশে। চলার পথে কত পাখি দেখে ভরত। কত ফুল। কাউকে ভালো লাগে। কাউকে লাগে না। যাকে ভালো লাগলো তার জন্য সন্ন্যাস নেওয়ার মতো হাঁদারাম ভরত নয়।

দোলের রাত্তিরে লছমিকে আবির মাখানোর প্রাক্কালে যদিও জুহিজির মুখটা বারকয়েক ভেসেছিল। ভরত জানে, এসবই দারুর কারসাজি। এই দারুই তো লছমিকে কোনো কোনো রাতে দীপিকাজি বানিয়ে দেয়। তা বানাক। ভরতকে পেটের ভাত জোগাড়ের ধান্ধায় চলতে হয়। মনের ভাবালুতা যতই পীড়ন করুক সেসবকে নিয়ে পড়ে থাকলে ভরতদের চলে নাকি?

দোলের পরদিনও ঢেউয়ের মতো মানুষ বোলপুরে। ভরত তড়িঘড়ি টোটো নিয়ে দৌড়ায়। যাত্রী নামিয়ে ফিরতি যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করে। বিকেল চারটায় কাঞ্চনজঙ্ঘার কিছু প্যাসেঞ্জার পাওয়া যাবে।

ভরত হঠাৎ বিস্মিত হয়ে দেখে সেই দুই আওরত! তারা তাকে দেখে কি দেখে না বা দেখলেও চেনে না। ভরতই ডাক দেয় –

‘অ্যাঁই অ্যাঁই জি।’

জুহিজি চমকে তাকায়, কিন্তু চিনতে পারে না তাকে। জিনাত আমান কিন্তু তাকে ঠিকই চিনতে পারে!

‘আরে ভরত! তুমি এইখানে?’

জুহিজির ফর্সা মুখে অভিমান না রাগ ঘনায়, ধরতে পারে না ভরত!

‘ভরত তুমি খুব খারাপ।’

‘ক্যান আছি নাই বলে?’

‘না তা নয়। তুমি কী করে জানলে যে আমরা এই সময়ে যাব?’

‘জানি না তো। মন বুলছিল।’

‘মন?’

‘হা মন বুলছিল ফির দেখা হবে।’

‘যদি দেখা না হতো?’

‘উহু এই যে দেখা হলো।’

ভরত আজ জিন্স-টি শার্ট পরে বেরিয়েছিল। ক্লিন শেভড! কপালে আবিরের তিলক আঁকা।

সব সংকোচ ঝেড়ে ফেলে জুহিজির দিকে ডানহাত বাড়িয়ে দেয় ভরত। আহা! ম্যালাদিন বাদে এক ফুল তাকে উন্মনা করেছিল  – ফাগুনবউ! সারা শরীর জুড়ে হলদে রঙের মিছিল! যখন ফুল ফোটে গাছে কোনো পাতার চিহ্ন থাকে না! এমন নয়নকাড়া পুষ্পকে একবার অন্তত স্পর্শ করা দরকার!

জুহিজি ইতস্তত করে নিজের হাত বাড়িয়ে দেয়।

ভরতের বকুল-বিচিরঙা চেহারায় কী এক অপার্থিব আলো খেলে যায় …

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত