পরদেশী

 

 

‘তুম তো ঠেহের পরদেশী, সাথ কেয়া নিভাওগে’

ঘুরে তাকায় সহেলি। স্কুলের গেটের বাইরে স্কুল বাসটা দাঁড়িয়ে। কলকল করতে করতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দুদ্দারিয়ে বাসে উঠছে। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে লম্বা শরীরটা। স্টিয়ারিংয়ে বসে আপনমনে দুলে দুলে গানটা গাইছে। তাল ঠুকছে দুহাতে ড্রাইভিং সিটের দুপাশে। ফর্সা গালের ওপর একচিলতে রোদ্দুর। ঘন গোঁফ আর কানের দুপাশ দিয়ে লম্বা চুল ঘাড় অবধি নেমেছে। এক লহমা দাঁড়িয়ে পড়ে সহেলি। ভারী অথচ মিষ্টি গলাটা বেশ লাগে তার।
সুবহা পহেলি গাড়ী সে ঘর তো লউট জাওগে….
দুই প্রিয় বন্ধু অদিতি আর শুভশ্রীর সঙ্গে হাঁটছিল সহেলি। সুন্দর গলায় গানটা শুনে দাঁড়িয়ে যায়। অদিতি বলে, কি রে সহেলি, কি দেখছিস? ও বলে দ্যাখ, কি ভালো গলাটা না? এটা কি নতুন ড্রাইভার ? শুভশ্রী বলে, হ্যাঁ, মাসখানেক হলো দেখছি। কেন, তুই দেখিসনি? সহেলি মাথা নাড়ে। না, আমি খেয়াল করিনি। অদিতি বলে, বাবা, তাই বলে দাঁড়িয়ে গেলি?  ড্রাইভারের গান শুনে ! সহেলি আর কোনো কথা না বলে দুই বন্ধুর সাথে পা চালায়।

বাড়িতে ফিরে সহেলি পড়ার টেবিলে বসে। স্কুল আর হাতে গোনা কয়েকদিন। সামনেই ক্লাস টুয়েলভের প্রি-টেস্ট। তারপর বোর্ড । বেশ কিছুক্ষণ বই নাড়াচাড়া করে সহেলি উঠে পড়ল। আজ কেন জানি মন বসছে না। চোখে ভেসে উঠছে একটা ফর্সা গাল। গালে কামানো দাড়ির সবুজ আভা। সেখানে একফালি রোদ চিকচিক। চোখ বুজে ফেলে সহেলি। সামনে অপার সমুদ্র। লম্বা বালুতটে সে একা দাঁড়িয়ে। বিকেলের রোদে বালি চিকচিক। সে ক্রমশঃ ঢেউয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

আজ প্রি-টেস্ট শেষ হল। সহেলির বেশ হালকা লাগছে অনেকদিন পর। বেশ অনেকক্ষণ স্কুল ক্যান্টিনে বন্ধুদের সঙ্গে দারুণ আড্ডা চলছে। শুভশ্রী বললো , আমার এবার উঠতে হবে রে। অদিতি বলে, কেন রে, আজ কিসের তাড়া তোর? শুভশ্রী বলে বাড়িতে যেতে হবে। মায়ের সঙ্গে একটু বেরোতে হবে। অদিতি বলে, আরে রিল্যাক্স ইয়ার। কতদিন পর আড্ডা মারছি। বোস তো। শুভশ্রী বলে, আরে এতক্ষণ বসলাম তো।তোরা আড্ডা মার না। অদিতি হেসে বলে, সহেলির সাথে আড্ডা মারা খুব মুশকিল। আগে এত ব্ল্যাবারিং করতো, ইদানিং তো কথাই বলতে চায় না। দ্যাখ না, আজও কত কম কথা বলছে। শুভশ্রী ভ্রূভঙ্গি করে একটা ফিচেল হাসি দেয়, আমি জানি কি হয়েছে। অদিতি- কি , কি হয়েছে? সহেলি বলে, কি ফালতু বকছিস, কিছুই হয়নি আমার। শুভশ্রী চোখ টেপে, হয়েছে। তোর চোখ এখন স্কুলবাস খোঁজে। অদিতি বলে, স্কুলবাস মানে? কি বলছিস তুই? সহেলি একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলে, ও যত বাজে বকে। না রে – আর দুমাস বাদে ফাইনাল, তাই টেনশন হচ্ছে।
মুখে বললেও বুকের মধ্যে বেজে ওঠে রাগ ইমন। সহেলির বাবা খুব ভালো এসরাজ বাজান। ছোটবেলাতেই মেয়েকে বুঝিয়েছেন বিভিন্ন রাগের আবেগ। মনে আছে সহেলির। সব শুদ্ধ স্বরের সঙ্গে শুধুমাত্র কড়ির মা লাগিয়ে জাদু করে ইমন – এ রাগ প্রেমের অনুভূতির রাগ। সারাজীবন শুনেও যে রাগ পুরোনো হয় না যে রাগ তাই হল ইমন, আবার সারাজীবন শিখেও যে রাগ শেখার শেষ হয় না, সেও ইমন। প্রেমেরই মত। শুভশ্রী বলে, ডোন্ট টক রাবিশ, যেদিন থেকে তুই ওই স্কুলবাসের ড্রাইভারটাকে দেখেছিস সেদিন থেকেই ইওর বিহেভিয়ার ইজ চেঞ্জড। সত্যি কথা বল, তুই রোজ আগে আগে গেট থেকে বেরিয়ে স্কুলবাসের দিকে যাস কি না ? সহেলি কোনো কথা বলে না। অদিতি বলে, কি রে ছুপা রুস্তুম। তুই যে বরাবরই একটু পাগলী, সেটা জানতাম। কিন্তু এসব কি রে? সহেলি চুপ করেই থাকে। মনের মধ্যে গুনগুন করে ওঠে মায়ের কাছে শেখা রবিঠাকুরের গান। দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে। বাবা বলেছে এই রবীন্দ্রসংগীতের মূল রাগ ইমন। অদিতি কনুই দিয়ে গুঁতোয়, কি রে সহেলি, চুপ কেন? তার মানে সত্যি? সহেলি উঠে দাঁড়ায়, কাঁধে ব্যাগটা নেয়। আস্তে বলে, যাইরে, কাল কোচিং সেন্টারে দেখা হবে। বাই। তাড়াতাড়ি পা ফেলে স্কুল কম্পাউন্ডের বাইরে চলে যায়।
সহেলিদের বাড়ি স্কুলের কাছেই। বাড়ি মনে স্টাফ কোয়ার্টার। সহেলির বাবাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। মা আপাতত গৃহবধূ হলেও উচ্চশিক্ষিত এবং বিশেষ করে রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী ও পৃষ্ঠপোষক। বাড়িতে পুরোদস্তুর শিক্ষা ও সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠা সহেলির। ওরা থাকে কলকাতার কাছেই একটা শিল্পাঞ্চলে। এখানেই জন্ম সহেলির। শিল্পাঞ্চল হলেও চারিদিকে সবুজের ছোঁয়া। ওরা যেখানে থাকে সেটা স্টাফ কোয়ার্টারের
মধ্যে হলেও একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ একতলা বাড়ি। চারদিকে বাগান । নানা গাছে ঘেরা। পা চালাতে চালাতে সহেলির একটু হাসি পায়। বন্ধুরা জানেনা এরমধ্যেই সবার কৌতূহলের বিষয় ওই স্কুল ড্রাইভারের সাথে ওর আলাপ হয়েছে। ও নিজেই আলাপ করেছে।
একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যে চওড়া রাস্তাটা স্কুল কম্পাউন্ডের দিকে বেঁকে গেছে সেই রাস্তার কোনে রাধুকাকার চায়ের দোকান। সেখানে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল ছেলেটা। সহেলি ওই রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছিল স্টাফ ক্লাবের দিকে। ছোটবেলা থেকেই সহেলি একটু ডাকাবুকো আর সংকোচহীন । খোলামেলা স্বভাবের।  তাই ছেলেটাকে প্রথম দেখার পর থেকে আলাপ করার যে দুর্দম ইচ্ছা জেগেছিল তার সদ্ব্যবহার করেছে। ছেলেটা অবাঙালী। তাই হিন্দিতেই কথা চালিয়েছে। সহেলি দেখছিল ছেলেটা ছ-ফুটের ওপরে লম্বা, রোগা, কিন্তু চেহারায় একটা লাবণ্য আছে। গায়ের রং টকটকে ফর্সা। ঘন মোটা গোঁফ আর ঘাড় পর্যন্ত লম্বা চুল। কিন্তু মুখে সবসময় একটা হালকা শিশুসুলভ সরল হাসি। ওর নাম রামপ্রকাশ শর্মা। বাড়ি রাজস্থানের মেওয়ারে। কথায় কথায় ও জেনে নেয় রামপ্রকাশ রাজপুত বংশের ছেলে। কিন্তু সংসারের অভাবে পড়ে স্কুলের পর বেশিদূর লেখাপড়া হয়নি। ড্রাইভিং শিখে ছোট গাড়ি চালাতো। কলকাতায় এক কাকা থাকে, কাকার কথায় বেশি রোজগারের সন্ধানে কলকাতায় আসে। কাকার যোগাযোগের মাধ্যমে এই স্কুলের একটা বাস চালানোর চাকরি পায়। কোম্পানীর স্কুল আর সেই সুবাদে মাথার ওপর একটা ছাদও জুটেছে।

এইসব ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্কতায় সহেলি প্রায় বাড়ির কাছে চলে আসে। শীত পড়ছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। হঠাৎই সামনে এক লম্বা ছায়ামূর্তি।
– হেলো জি – সঙ্গে একগাল হাসি। সহেলি দাঁড়িয়ে পড়ে।
– আপ ইহাঁ ক্যায়সে ?
– ম্যায় তো স্কুল কে বাহার হি খাড়া থে। আপকো দেখা নহী।
– ম্যায়নে তো স্কুল কে অন্দর হি থে, দোস্ত লোগো কে সাথ। আজ এক্সাম খতম হুয়া না।
– আচ্ছা। উমম, বাস এক বাত কেহেনা থা।
– হাঁ বোলো। রামপ্রকাশ একটু চুপ করে থাকে। তারপর বলে , স্কুল কা ছুটটি হো রহা হ্যায়, আগলে হপতে ম্যয় ঘর চলা জাউনগা।
– ও আচ্ছা, কিৎনে দিন কে লিয়ে?
– করিব তিন হপ্তা, স্কুল খোলনেকা পেহলে লউটনা পরেগা-
রামপ্রকাশ থামে। সহেলি কোনো কথা বলেনা।
– বহত দিন ঘর নহি গ্যাযা, মাম্মি পাপা ফোন পে বহত বার বাতায়া। সহেলি আস্তে বলে, হাঁ যাইয়ে না। রাম চুপ করে যায় আবার। ইতস্তত করে। সহেলি বলে , কুছ বোলনা হ্যায়?
– হাঁ, এক চিজ চাহিয়ে আপসে।
– কেয়া?
– এক ছোটাসা চিজ।
– হাঁ, বাতাও না !
– আপ দওগে না?
– আররে, পেহলে তো বাতাও সহি, কেয়া চাহিয়ে?
– আপকি এক পিকচার।
– পি – পিকচার? থমকে যায় সহেলি। বুকের মধ্যে আবার রিনরিন করে ওঠে এসরাজের তার।
– হাঁ, আপকা কোই ভি এক পিকচার। মিলেগা না? –
হাঁ হাঁ, দে দেগা।
– মেরা ঘর জানে কে পেহলে দে দেনা। সহেলি একটু হেসে বলে, কিউ? রাম একটু থতমত খেয়ে বলে, আয়সে হি, বাস আয়সে।
– নহি নহি, বাতানা পরেগা, বাতাও।
– বোলা না আয়সে হি, মতলব তিন হপতে আপকো দেখ নহি পায়েঙ্গে, আপ কি ইয়াদ আয়েগা, তো বাস ওহ পিকচার মেরা সাথ রাহেগা। এক নিঃশ্বাসে বলে যায় রাম। সঙ্গে সেই অপাপবিদ্ধ সরল ঝকঝকে হাসি। আবার দহেলির বুকের মধ্যে উথালপাথাল।

– ঠিক হ্যায়, কাল সুবহা দশ বাজে ক্লাব কে সামনে আ যানা। মিল যায়গা।
– বহত বহত সুকরিয়া।
– আররে চোপ, চলো, অভি মুঝে যানা হ্যায়। লম্বা পা ফেলে সহেলি তাড়াতাড়ি হাঁটতে থাকে বাড়ির দিকে।

ফাইনালের রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে। সহেলি এখন কলকাতার কলেজে। অদিতি ও শুভশ্রীর সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা হয়। তিনজন তিন স্ট্রিমে চলে গেছে। কলেজও আলাদা। তাই দেখাসাক্ষাৎ কমই হয়। কিন্তু মোটামুটি ভাবে রাম আর সহেলির সম্পর্কের কথাটা চাউর হয়ে গেছে তল্লাটের আনাচে কানাচে। এ নিয়ে হালকা একটা অশান্তি হয়েছে বাড়িতে। কিন্তু সহেলির একগুঁয়ে জেদের কাছে মা-বাবা কিছু বলতে পারেনি। বাবা বলতে চেয়েছিল আমি যে স্কুলের প্রধানশিক্ষক সেই স্কুলের বাস ড্রাইভারের সঙ্গে বন্ধুত্ব কতটা সমীচিন। কিন্তু সহেলির যুক্তি যে মা-বাবাই তাকে ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছে মুক্তমনা হতে, সমাজের কোনো অবস্থানের ভিত্তিতে কোনো সম্পর্ককে নিরুপন না করতে, ইত্যাদি ইত্যাদি। বেশ কিছুদিন এনিয়ে কথা কাটাকাটি হলেও সহেলির জেদের সামনে কিছুই টেকেনি। এটা এখন প্রায় নিয়মিত ব্যাপার যে সহেলি যখন স্টেশনের দিকে যায় কলকাতার ট্রেন ধরতে, রামপ্রকাশও সেইসময় সহেলিকে বাসে নিয়ে যায় স্টেশনের থেকে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের আনতে। প্রথম প্রথম রাম সংকুচিত হয়ে থাকতো, প্রকাশ্যে মিশতে কিছুটা কুণ্ঠাবোধ ও লজ্জা ছিল। কিন্তু সহেলি ওর জড়তা কাটিয়েছে। ওকে সাহসী হতে শিখিয়েছে। রামের লম্বা চেহারাটা যখন সামনে আসে, সহেলির মধ্যে একটা অদ্ভুত শান্তি ও নিরাপত্তার সহাবস্থান হয়, মনটা পরিতৃপ্ত লাগে। অদিতি একদিন ওকে ফোন করে জিজ্ঞেস করছিল এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কি? সহেলির দৃঢ় জবাব ছিল ভবিষ্যৎ ভেবে সম্পর্ক হয় না। সম্পর্কটা একটা বিশ্বাস যেটা প্রতিদিন রিনিউ করতে হয়। শুভশ্রীর সঙ্গে দেখা হলে শুভশ্রী জিজ্ঞেস করে, সীতাদেবী, তোমার রাম কেমন আছে ? সহেলি মজা করে বলে রাজপুত কা বেটা মুঝে অযোধ্যা নহি, রাজপুতনা লেকে জাযেগা, দেখ লেনা। তারপর দু বন্ধু হাসিতে গড়িয়ে পড়ে। রামের সঙ্গে দুই বন্ধুর আলাপ করিয়ে দিয়েছে। ওরা প্রথমদিকে এই সম্পর্ক নিয়ে, হাসাহাসি , মান অভিমান করলেও রামের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর স্বীকার করেছে যে রামের মধ্যে একটা অদ্ভুত স্নিগ্ধতা আছে , যেটা আর সবার থেকে আলাদা। হতে পারে ড্রাইভার, কিন্তু কোথায় যেন একটা আভিজাত্যের কৌলিন্য আছে ওর আচারে ব্যবহারে। সবথেকে বড় কথা দুই বন্ধুই বুঝতে পারে সহেলি রামের সাহচর্যে এসে ভীষণ ভীষণ খুশি। ওরা নামই দিয়ে দিল মেবার প্রেম।

আজ ভোর থেকেই আকাশ ভেঙে পড়ছে মুম্বাইয়ের ওপরে। ধারাপাতের তীব্রতা এত বেশি যে দুহাত দূরের কিছু দেখা যাচ্ছে না। বেলা হতে না হতেই একবুক জল জমে গেছে শহরের বিভিন্ন জায়গায়। সহেলি তার দশতলার এপার্টমেন্টের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ওর সুপারভাইজারকে মেসেজ করলো যে আজ আর অফিস যাওয়ার পরিস্থিতি নেই। মেয়েকেও স্কুলে পাঠায়নি। মিউজিক সিস্টেমে অফ এম চলছে। আর যে জানাচ্ছে শহরের সাম্প্রতিক হাল হকিকত। তারপর আবার গান, বৃষ্টির আওয়াজ শুনতে শুনতে খেয়াল করেনি, হঠাৎ গানের লাইনটা কানে ঢুকল,
আসুওকি বারিশ মে তুম ভি ভিগ যাওগে
যব তুমে একেলেমে মেরী ইয়াদ আয়েগি
আসুওকি বারিশ মে তুম ভি ভিগ যাওগে
তুম তো ঠেহের পরদেশী সাথ কেয়া নিভাওগে

মনটা এক নিমেষে পঁচিশ বছর পিছিয়ে গেল। সেই একচিলতে রোদ্দুরে স্কুল বাসের গেট দিয়ে দেখা গানের তালে তালে দীর্ঘ শরীরটা তাল ঠুকছে। সেই যেন সমস্ত চলমান জগতের সামনে থমকে যাওয়া। একপশলা ঝড়বৃষ্টির পর বয়ে যাওয়া হালকা ঠান্ডা হাওয়ার মত। মনে পড়লো শুভশ্রীর হাসিতে গড়িয়ে পড়তে পড়তে চিৎকার – ইয়ে জো হ্যায় রামলীলা, ডাল মে জরুর কুছ কালা।
সেদিনও এরকমই অঝোরধারে বৃষ্টি পড়ছিল। সেদিনই প্রথম। সেদিনই প্রথম সহেলির শরীরটা নিচ্ছিল রামের শরীরের ওম। তখন ড্রাইভার কোয়ার্টার্স প্রায় ফাঁকা। স্কুল চলছে। ওরা চলে এসেছিল রামের কোয়ার্টারের একচিলতে ঘরে। বাইরের বাজবৃষ্টিতে সহেলির মনের আগুন শরীরে তাপ ছড়ায়, দীর্ঘ শরীরটায় সব আগুন ধরিয়ে দেয়। রাম বাধা দেয়নি। সহেলিরও কোনো সংযম রইল না। সে এক চরম নিবিড় সুখসঙ্গম। বৃষ্টি ততক্ষনে থেমে গিয়েছিল। সব হয়ে যাওয়ার পর রাম গেছিল বাথরুমে। সহেলির কি খেয়াল হয়, বিছানায় পরে থাকা রামের পার্সটা খোলে। সামনের পকেটে গণেশের ছবি, কিছু ছোট কাগজের মধ্যে পায় সহেলির দেওয়া সেই ছবি। সেটার তলায় আরেকটা ছবি। খানিকটা বিবর্ন হলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না রামের পাশে একটি অল্পবয়সী মহিলা, কোলে একটি শিশু। বাইরে ততক্ষনে আকাশ ফর্সা হতে শুরু করলেও অন্ধকার নেমে আসে সহেলির দুচোখে। বিছানা থেকে ছিটকে ওঠে। দ্রুত জামাকাপড় পড়তে থাকে। রাম ঘরে ঢোকে। সহেলিকে দুহাত দিযে জড়িয়ে ধরতে যায়, সহেলি ছিটকে সরে যায়। চুপচাপ বিছানা থেকে ছবিটা তুলে রামের মুখের সামনে ধরে। রাম কিছু বলে না। ওর চুপ করে থাকা সহেলিকে বুঝিয়ে দেয় সব না জানা কথা।
সেইদিনের পর থেকে মানসিক অবসাদে চলে যায় সহেলি। রাম বোঝাতে চেষ্টা করে এটা বাল্যবিবাহ যেটা ওদের মুলুকে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। ওখানে মনের কোনো টান নেই। কিন্তু সহেলির মনের সব দরজা ততদিনে একদম বন্ধ হয়ে গেছে।

বৃষ্টির বেগ খানিকটা কম। দূরে তাকালে মুম্বাই শহরের উপকণ্ঠে ভাসাইএর এই হাউসিং এস্টেটের বাড়িগুলো আধো অন্ধকারে ঝাপসা লাগে। সহেলি বুঝতে পারে তার চোখদুটো ভেঙে ভেসে আসছে। ঠিক সেদিনের দুপুরের মতো।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত