| 22 জুন 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

তুমি বন্ধু কালা পাখি । পার্থ ঘোষ

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

সড়ক পথে চলমান যানবাহনের হেডলাইটের চোখ ধাঁধাঁনো আলো ছেড়ে ডানদিকের গড়ানে মেঠোপথে পা দিতেই একরাশ অন্ধকার গ্রাস করে ফেলল পলাশকে। থমকে গেল সে। ঝুম অন্ধকারে জোনাকির মত আলোর নড়াচড়া। জোনাকির আলো জ্বলে নেভে, এই আলো তো একভাবে জ্বলছে। ভালো করে লক্ষ্য করে পলাশ বুঝল জোনাকি নয়, মোবাইলের টর্চের আলো। স্বল্প আলোয় ছায়ামুর্তির নড়াচড়া। পলাশ নিজের মোবাইলের টর্চটা জ্বালতে গিয়েও জ্বালল না। অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে যেতে লাগল। পায়ের নিচে উঁচু নীচু প্রান্তর। ইঁটের টুকরো, শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি। মাথার ওপর কালো কালো ঝিরিঝিরি গাছের পাতার ফাঁকে আগত পূর্ণিমার চাঁদ। চাঁদের উজ্বলতায় গাছের পাতাগুলো অন্ধকার মেখে আরো কালো। কাল বাদে পরশু দোল পূর্ণিমা। 

সামনের বিস্তৃত প্রান্তর থেকে ভেসে আসছে মানুষের কোলাহল। মানুষ এখানে অন্ধকারে মেখে ছায়ামুর্তি। পুঁতুল নাচের পুঁতুলের মত তারা নড়ছে। চাঁদের আলো এখনও ম্রীয়মান। সেই আলোয় আর মোবাইল টর্চের আলোয় বোঝা যাচ্ছে ওখানে চলছে ক্রেতা বিক্রেতার মাঝে বোঝাপড়া, বিকিকিনি – মেলা বসেছে মেলা, দোলের মেলা। 

পলাশের মনে হল মোবাইল ফোনের প্রযুক্তি এখানে বেমানান। তার বদলে হ্যাচাক বা লণ্ঠন বা নিদেন পক্ষে লম্ফ যেন বেশ যথোপযুক্ত। খোলা আকাশের নিচে বসন্ত বাতাসে, দোল পূর্ণিমার চন্দ্রালোকে, ঝুম অন্ধকার মাখা গ্রাম্য পরিবেশে দূর থেকে ভেসে আসছে বাউলের লোকসংগীত, একতারার টুং-টাং, খোলের গুব-গুব শব্দ – গোলেমালে গোলেমালে পিরীত করো না….

পলাশের ভালোবাসার সোনাঝুরি। দূরে রাস্তা থেকে সভ্যতার টুকরো শব্দ ছিটকে আসছে ঠিকই, না আসলে যেন আরো ভালো হত। মোবাইলের টাওয়ার বিগড়েছে। কাজ করছে না নেটওয়ার্ক। এটা যেন আরো ভালো করে সোনাঝুরিকে আপন করে নেওয়ার একটা উপায় – শহর থেকে অনেক দূরে… চল কোথাও চলে যাই…

ছুটি কাটাতে বোলপুর। সকালের ট্রেনে স্টেশনে নেমে নির্দিষ্ট হোটেলে লাগেজ পত্র রেখে একটু ফ্রেস হয়ে নেওয়া। তারপর টিফিন করে বেরিয়ে পড়া ঝোলা ব্যাগটা পিঠে নিয়ে। মহামারীর পর থেকে বন্ধ বিশ্বভারতী, মিউজিয়াম। তাই বাইরে থেকে চোখের দেখা দেখে নেওয়া সেই প্রসিদ্ধ স্থানগুলো। ক্ষণিক দাঁড়িয়ে স্মরণ করে নেওয়া কবিগুরুকে। একমুঠো ধূলো তুলে কি মাথায় ছুঁইয়ে নেবে? সেই ধূলো কি এখনো ছড়িয়ে আছে তাঁর সাধের শান্তিনিকেতনের পথে ঘাটে? শিহরিত হয় মন, ওখানে কবি বসতেন, ওখানে ঘুরে বেড়াতেন, ওখানে বসে কবিতা লিখতেন, চর্চা করতেন, সাহিত্যের, শিল্পের। মোহিত হয়ে যায় পলাশ।

চমক আরো অপেক্ষা করছে তখনও পলাশের জন্য যখন রামকিঙ্কর বেজের স্থাপত্য, ভাষ্কর্য্যে দুই চোখ আটকে যায় পলাশের। পলাশ আর্টের ছাত্র নয়, তাই তার চোখের দৃষ্টিও অন্য সব সাধারণ মানুষের মতই। শুধু এই বিখ্যাত মানুষের বিখ্যাত শিল্পকলা তার রক্তের গতি বৃদ্ধি করে। সে মনে মনে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। যেমন একটু আগেই তিনশো বছরের বট বৃক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে তার শরীরের রক্ত চলাচলের গতি বেড়ে গিয়েছিল অনেকটাই। 

তিনশো বছর… হয়ত আসল গাছটা তার ঝুরি নামিয়ে নিজেকে নয় তার অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বট না বটের বংশধর? এর উত্তর দিতে পারে একমাত্র ইতিহাস। পলাশ শুধু সেই ইতিহাসকে সম্বল করে শিহরিত হয়, এই বটের ছবিই সে দেখেছিল সহজপাঠের পাতায়। এই বটবৃক্ষের নিচেই নাকি কবিগুরু এসে বসতেন। হয়ত তিনিও সেই পুরাতন বটবৃক্ষকে দেখে শিহরিত হতেন।

পুরাতন থেকে নুতনের মাঝে, পলাশ ঘুরে এসেছিল ডিয়ার পার্কের ভেতরে। হরিণদের সঙ্গে দেখা হওয়াটা নামমাত্র হলেও পার্কের মধ্যের বনানী তাকে উদাস করেছিল। শান্ত পরিবেশে, একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছিল শহুরে পলাশ। নিস্তব্ধতারও শব্দ আছে। বনের আছে নিজস্ব গন্ধ। গাছ থেকে খসে পড়া পাতার শব্দ যেন জোরে এসে আঘাত করে কর্ণপটহে। নাম না জানা পাখিরা সুর তোলে পাতার ফাঁকে ফাঁকে। পায়ের নীচে দলিত হয় শুকনো পাতা, কাঁকড়, পাথর। মচ্‌মচ্‌, খর্‌র্‌, খর্‌র্‌.. শব্দ ওঠে। শব্দের তীব্রতা আঘাত করে কানে। নিস্তব্ধতা ভঙ্গ হয়। গাছ থেকে গাছে দৌড়ে যায় কাঠবিড়ালী। রোদ আটকে বড় বড় বৃক্ষরা শীতল ছায়া উপহার দেয় পথিককে। সরসর শব্দে গা ঢাকা দেয় সরীসৃপ। পলাশ একটা নীচু হয়ে ঝুলে পড়া গাছের শুকনো ডালে বসে নিস্তব্ধতা উপভোগ করতে থাকে। ঋতুর কথা মনে পড়ে পলাশের। 

ঋতুর আসার কথা ছিল আসেনি। কেউ কথা রাখে না, ঋতুও রাখেনি। ইদানিং পলাশের সঙ্গে তার বনিবনা হচ্ছে না। ওর বাবা এন.আর.আই পাত্র দেখেছেন। ঋতু সেখানেই বিয়েতে মত দিয়েছে। ভবঘুরে পলাশের মধ্যে অনিশ্চয়তার মেঘ দেখেছে সে। পলাশ কোথাও টিঁকতে পারেনা। আজ এই চাকরী তো কাল আবার অন্য চাকরী। পলাশের মন ওকে এক জায়গায় থাকতে দেয় না। কলেজ ফেস্টে পরিচিত হওয়া ঋতুর সঙ্গে প্রেম চলছিল ভালোই। কিন্তু কিছুদিন পরই পলাশ বুঝতে পারে দুজনের রাস্তা আলাদা। প্রকৃতি প্রেমের ব্যাপারটা ঋতুর মধ্যে একদমই নেই। পলাশের পড়াশুনো বাংলা নিয়ে, ঋতুর বিষয় বিজ্ঞান। তাছাড়াও খাপ খায় না জীবনের ছোটখাটো অনেক বিষয়ে। তাই দ্বৈত সিদ্ধান্ত – যা পাখি উড়তে দিলাম তোকে….

পায়ে পায়ে অন্ধকারের চাদর সরিয়ে এগোতে থাকে পলাশ। সবাই কেনাকাটায় ব্যস্ত। জামা, কাপড়, হাতের কাজ, ব্যাগ আরো কত কি। পলাশের কিছু কেনার নেই। তবু সে একটা ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে’ লেখা হলুদ পাঞ্জাবী বিক্রেতার মোবাইল টর্চের আলোয় হাতে তুলে দেখে। দাম জিজ্ঞেস করে। দামটা একটু বেশি মনে হয়। মনে হয় এটা কিনলে হয়। ওর জীবনযাত্রার কথা বলে গেছেন কবিগুরু। নিজের দাম বলে পলাশ। দোকানি হবে না হবে না করেও পলাশের দেওয়া দামের থেকে দশ টাকা বেশি দামে দিতে রাজি হয়। পলাশ পাঞ্জাবীটা কিনেই নেয়। দোকানীকে মূল্য প্রদান করে পিঠ ব্যাগে ভরে নেয় পাঞ্জাবী। তারপর আবার হাঁটা। এবার কেনাকাটার অন্ধকার জায়গা ছেড়ে একটু আলোর দিকে। যেখানে রেস্টুরেন্ট, হোটেলের সামনে উদাস বাউল গান করছে নেচে নেচে। মানুষ ঘিরে আছে বাউলকে। একতারায় সুর তুলে বাউল গাইছে – তুমি বন্ধু কালা পাখি… আমি জানো কি…

পায়ে পায়ে পলাশ এগিয়ে গিয়ে বাউলের সামনের আসনে বসে। চা-ওয়ালা হাঁক দিয়ে যায় চা চা বলে। পলাশের দই…. দই চাই দই… ভালো দই হাঁকের কথা মনে করিয়ে দেয়। ছোটবেলায় পঁচিশে বৈশাখের সান্ধ্য অনুষ্ঠানে পাড়ার মাঠে প্যাণ্ডেল করে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করা হয়েছিল। পলাশ অমলের চরিত্রে অভিনয় করেছিল অমল ও দইওয়ালা নাটকে।  পলাশের চোখের সামনে নাটকের টুকরো ছবি ভেসে ওঠে। সে চা বিক্রেতাকে এক কাপ চায়ের অর্ডার করে। 

গরম চায়ে চুমুক দিতেই আবার ঋতুর কথা মনে হয় পলাশের। ঋতু পলাশকে আপন করে পেতে চেয়েছিল। পলাশের মনে হয়, ও একটু নিজেকে বদলালে হয়ত সম্পর্কটা টিঁকে যেত। কিন্তু কেন যে পলাশ নিজেকে বদলাতে পারে না, নিজেও জানে না। বাউল গানের কথাগুলো ওর বুকের মধ্যে কেমন কেটে কেটে বসে যাচ্ছে। আগের গান শেষ করে বাউল আর একটা গান ধরেছে। ঋতুকে খুব মিস করছে পলাশ। একাকী এই পরিবেশে যেন ঋতুকেই লাগবে ওর। পলাশও ঋতুকে খুব ভালোবাসে, খু..উ..ব। কিন্তু ওরা দুজনের কেউই কারো স্বাধীনতা খর্ব করতে চায় না। তাই দুরত্ব রাখে। নিজেদের বৃত্তে গড়িয়ে চলে। একমনে পলাশ বাউল সঙ্গীতে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে থাকে।

  • আমি জানতাম, তোকে এখানেই পাবো।

চেনা কণ্ঠস্বরে ঘুরে তাকায় পলাশ। ছিলা ছেঁড়া ধনুকের মত আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। অবাক বিশ্ময়ে বলে – তুই…! এখানে?

  • বিকেলের ট্রেনে। পারলাম না শহরে থাকতে। তোকে ছাড়া পারব না। আচ্ছা একটা কথা বল তো? তুই কি এরকমই থাকবি, চিরটাকাল?

পলাশ মৃদু হাসে – তুই কি এই প্রশ্নের উত্তর পেতে একা একা চলে এলি শান্তিনিকেতনে? 

  • না, ভাবলাম, তোকে ছেড়ে থাকার চেয়ে তোর সঙ্গে ভবঘুরে হয়েই যাই। যা থাকে কপালে। 

পলাশ ঋতুর হাতটা ধরে একটু চাপ দিয়ে বলে – আমিও চিন্তা করলাম, ভেসে গিয়ে তোকেও ভাসিয়ে কূলহারা নৌকো না হয়ে, এবার স্থিতু হবার চেষ্টা করাই ভালো। জাহাজ এবার নোঙর করুক যেকোন বন্দরে, যেখানে ঋতু পরিবর্তন হয় সারা বছরে।

ঋতুর গালে লালের ছটা লাগল। একটু ঘণিষ্ঠ হয়ে এসে বলল – বন্যরা বনে সুন্দর, পলাশরা বৃক্ষে, তু্‌ই এমনই থাক। 

বাউল গানের তালে তাল মিলিয়ে পলাশ ঋতুর কোমর জড়িয়ে ধরে বলল – আমার জীবনে ছয় ঋতু একত্র হয়ে বাস করুক। ঋতু তুই থাক, আমরা শুরুটা নতুন করে করি, কেমন?

পলাশ আর ঋতু একসাথে বসে আসনে, বাউলের সামনে। বাউল তখন পায়ের
ঘুঙুরে বোল তোলে, হাতের একতারা মাথার ওপর তুলে ঘুরে ঘুরে গায় – 

“বন্ধু বিণে প্রান বাঁচে না, 

আমি রব না রব না গৃহে

বন্ধু বিণে প্রান বাঁচে না।……”

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত