রক্তলোলুপ

“কী বলছেন টা কী? আপনার মেয়ে রক্ত খায়? রক্তের প্রতি আসক্ত? তার মানে?”

“এর মাথামুণ্ডু তো আমিও বুঝছি না ডাক্তারবাবু। তবে শিখা যতই বড় হচ্ছে ওর মধ্যে অস্বাভাবিকতা বাড়ছে। বিশেষ করে রক্ত নিয়ে ওর বাড়াবাড়ি রকম আসক্তি। হ্যাঁ, নিজের মেয়ে বলে রাখঢাক করে কথা বলব তেমন মানুষ আমি নই। নিজের চোখে দেখেছি ব্লেড দিয়ে হাত কেটে ফিনকি দিয়ে বেরনো রক্ত চুষে চলেছে শিখা।

একদিন, দুদিন নয়। দিনের পর দিন এই ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই এই অভ্যেস। একদিন দাড়ি কাটতে গিয়ে আমার গালের একদিকে একটু কেটে গিয়েছিল স্যর। প্রথমে আমি খেয়ালও করিনি। মেয়ে আমার পাশের ঘরে ছিল। হঠাৎ দেখি আমার গালের ধারে ঠোঁট নিয়ে গিয়ে রক্ত চুষছে। আমি এক ঠেলা মেরে ওকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হই। তাতে মেয়ের কি রাগ। যেন আমায় ভস্ম করে দেবে। 

মুখে অবশ্য বলল গালটা কেটে গিয়েছে। এত রক্ত। একটু চুষে না দিলে রক্তপাত বন্ধ হয় নাকি? সেদিন আমার মনে হয়েছিল ও শুধু রক্ত ভালোবাসে না, রক্তের গন্ধও পায়। মা মরা মেয়ে। এতদিন কোনও সমস্যা ছিল না। কি যে শুরু হল। রক্তের জন্য একেবারে ক্ষেপে উঠেছে।” একনিশ্বাসে কথাগুলি বলে কান্নায় ভেঙে পড়লেন বিশ্বনাথ লাহিড়ি।

ক্লাস সেভেনের একটা মেয়ে রক্তের প্রতি এত আকৃষ্ট। এ যেন লেডি ভ্যাম্পায়ার। ভাবা যায় না কোনওভাবেই। অন্তত ডাক্তার চিরঞ্জীব সোম তাঁর সুদীর্ঘ চিকিৎসক জীবনে এমন কথা কোনওদিন শোনেন নি। তাও উল্টো দিকে বসা মানুষটিকে এভাবে হতাশ হতে দেওয়া যায় না। বহু ডাক্তার-বদ্যি করে তাঁর কাছে এসেছেন। তাছাড়া চিরঞ্জীব নিজে একজন নামি সাইকিয়াট্রিস্ট। মানুষের মনের হাল হদিশ করাই ওঁর কাজ।

অনেকক্ষেত্রেই দেখেছেন রোগীদের মধ্যে মারাত্মক সব বিকার দানা বেঁধেছে। যাকে অনেকেই প্রেতাত্মাদের কারসাজি বলে রঙ দেওয়ার চেষ্টাও করেছে। অভিভাবকদের থেকেও পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন এব্যাপারে অগ্রণী হয়ে থাকে। 

এই তো মাসখানেক আগেই ওঁনার চেম্বারে এসেছিল একটি বছর বাইশের মেয়ে। দেখতে এককথায় রূপসী। কিন্তু সেই মেয়ে যে অসুস্থ তা ওর চেহারায় ধরা পড়ছিল সহজেই। চোখের নিচে পোঁচ পোঁচ কালি স্পষ্ট বোঝাচ্ছিল একের পর এক বিনীদ্র রজনী কাটাচ্ছে সে।

পোশাক আশাকও কেমন “পরতে হয় পরা” গোছের। প্রসাধনের ছিটেফোঁটা নেই। মেয়েটির এক সম্পর্কিত কাকা এসেছিলেন ওর বাবার সঙ্গে। 

ধারাবিবরণী দেওয়ার মতো সেই তুতো কাকা বলতে আরম্ভ করেছিলেন, ” ডাক্তারবাবু এ মেয়েকে ভূতে ধরেছে। যে মেয়ে রাতে ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে থাকে, কারণে অকারণে হেসে ওঠে, প্রলাপ বকে তার চিকিৎসা কী আপনাদের ডাক্তারি শাস্ত্রে আছে?”

মনে মনে খুব অসন্তুষ্ট হলেও সেটা নিজের মধ্যে রেখেই অর্পিতা নামের ওই যুবতীর চিকিৎসা শুরু করেছিলেন তিনি। ওকে কাউন্সেলিং করে বুঝতে পেরেছিলেন প্রেমে ব্যর্থ হয়েই মেয়েটির এই পরিণতি হয়েছে। মানসিক হীনমন্যতার চূড়ান্তে পৌঁছেই মেয়েটি মানসিক রোগাক্রান্ত হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাতে ঘুম ভেঙে হাঁটাহাঁটির কুঅভ্যেস। যাকে দুয়ে দুয়ে চার করে ওই তুতো কাকার মতো লোকেরা ভূতের নাম জড়িয়ে দিয়েছে। 

বলাবাহুল্য, ডাক্তার সোমের চিকিৎসায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেছিল অর্পিতা। এখন তো ও একটি স্কুলে পড়ায়। আর খুব তাড়াতাড়ি স্কুলেরই এক সহকর্মী শিক্ষকের সঙ্গে বিয়ে হতে চলেছে ওর। ডাক্তারবাবুকে এত কথা ফোনেই জানিয়েছে অর্পিতা। ডাক্তার চিরঞ্জীব সোম এভাবেই তাঁর পেশেন্টদের সঙ্গে আন্তরিক হয়ে ওঠেন। যে জন্য আরও অনেক জটিল মানসিক রোগীও তাঁর কাছে এসে সুস্থ হয়ে উঠছে। এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাচ্ছে। এমন নজির ভুরি ভুরি।

এহেন সেই ডাক্তারবাবুই শিখা লাহিড়ির রক্তলোলুপতার কথা শুনে ভারী চমকে উঠলেন। তাও শিখার বাবা মেয়েকে আনতে পারে নি তাঁর কাছে। শিখাকে নাকি কোনওমতেই বাড়ির বাইরে বের করা যাচ্ছে না। শিখার এই মারাত্মক রক্তপ্রীতির জন্য স্কুলে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কথা হল ডাক্তারবাবু সামনের সপ্তাহে নিজেই যাবেন বিশ্বনাথবাবুর যোধপুর পার্কের বাড়িতে। আসার আগে অবশ্য ফোনে জানিয়ে দেবেন কবে,কখন আসছেন তিনি।

ডাক্তার চিরঞ্জীব সোম সাইক্রিয়াটিস্ট হিসেবে কলকাতার একনম্বর হলেও তাঁরও এক যন্ত্রণাদায়ক অতীত আছে। স্ত্রী ও একমাত্র ছোট্ট সন্তানকে অকালে হারিয়েছেন তিনি। তখন সবেমাত্র ডাক্তার হিসেবে পসার জমতে শুরু করেছে। এক নামি নার্সিংহোমে তখন তিনি কর্মরত। সেদিনের রাতটা ছিল অমাবস্যার রাত। ডাক্তারবাবু তখন প্রায়ই দুই শিফটে ডিউটি করেন। আসলে কাজটা তাঁর বরাবরই খুব পছন্দ। ঘরে সুমনা থাকে তাঁদের শিশুসন্তান রাকাকে নিয়ে।

এই রাকা ছোট থেকেই কেমন যেন অদ্ভূত ধরনের। তখন ওর বয়স বছর দুয়েক। এই বয়সে পৌঁছেও কোনওদিন ছেলের মুখে এতটুকু হাসির লেশমাত্র দেখেন নি চিরঞ্জীব। নিজে ডাক্তার বলে নানা ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়েছিলেন রাকার। কোনও অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি। 

সুমনা বলত, ” চিন্তা করো না। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে।” ছেলের মুখের দিকে তাকালে মাঝেমধ্যে মনে হত যেন একটা জড়পিণ্ডমাত্র। অথচ দিব্য সুন্দর হয়েছে। লোকে বলে মায়ের মতো সুন্দর হবে রাকা। চিরঞ্জীবও ভারী খুশি। হোক না ছেলে মায়ের মতো। ভালোই তো।

কিন্তু দুবছর বয়সের ছেলের কোনও হাসি নেই মুখে, হাত-পা ছোড়া নেই। তবে খুব জোরে কেঁদে উঠত প্রায়ই। নিজের ছেলে হলেও অমন কুৎসিত স্বরে কেউ কাঁদতে পারে তা ভাবতেই পারত না চিরঞ্জীব। যেন অনেকগুলো কুকুর খারাপ কিছু দেখে রাতবিরেতে কেঁদে উঠছে। সে যে কি ভীষণ ক্রন্দন তা যে শোনে নি, সে কিছুতেই বুঝবে না।

চিরঞ্জীবের জিগরি দোস্ত শিশু চিকিৎসক প্রমথেশ মাইতি বলেছিল, ” বন্ধু চিন্তা করিস না। ওর ইএনটি জনিত কোনও সমস্যার জন্য এরকম কান্নার আওয়াজ বেরচ্ছে। যেমন আমরা ঘুমের মধ্যে ভয়ঙ্করভাবে নাক ডেকে উঠি, তেমনই কিছু আর কি।”

ঠিক হয়েছিল রাকাকে প্রমথেশের পরিচিত এক ইএনটি ডাক্তার দেখানো হবে। কিন্তু তার আগেই তো সব শেষ হয়ে গেল। 

সেদিন রাতের ডিউটি সেরে যখন বাড়ি ফিরেছিল চিরঞ্জীব তখন রাত প্রায় বারোটা। ডিউটির জন্য রাতবিরেতে বাড়ি ফেরা প্রায় নিয়ম হয়ে গিয়েছিল চিরঞ্জীবের। তাই একটা ডুপ্লিকেট চাবি থাকত ওঁর কাছে। তখন তো আর মোবাইল ফোন ছিল না। ফলে সারাদিন সেভাবে বউ-বাচ্চার খবর নেওয়া হত না। তবে চিরঞ্জীব এটা ভেবে নিশ্চিত ছিলেন সুমনা ঠিক সব সামলে রাখবে। নিজের স্ত্রীর প্রতি ভারী বিশ্বাস ওঁর। কিন্তু সেদিন বাড়ি ফিরে ওর দুনিয়াটাই পাল্টে গিয়েছিল।

ওদের বেডরুমে ঢুকে সুমনার নিথর দেহটা আবিষ্কার করেছিলেন চিরঞ্জীব। এমনিতে মনে হবে যেন ঘুমোচ্ছে। কিন্তু চোখ দুটো যেভাবে ঠিকরে বেরিয়ে এসেছিল, তা দেখে মনে হবে কোনও কিছু দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে মারা গিয়েছে সুমনা। পাশের ঘরে অর্থাৎ ওদের খাবার ঘরে বসা অবস্থায় পেয়েছিল রাকার নিষ্প্রাণ দেহ। ওভাবে বসা অবস্থায় কোনও শিশুর মৃত্যু হতে পারে সেটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল চিরঞ্জীবের।

এরপর যথারীতি পোস্ট মর্টেম হয়েছিল দুটি মৃতদেহর। কিন্তু সেরকম কোনও অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায় নি লাশ দুটিতে। তবে দুজনের শরীরেই নাকি হিমোগ্লোবিনের পরিমাণে প্রচুর ঘাটতি ছিল। এটাকেই আপাতভাবে মৃত্যুর কারণ ঠাউরেছিল চিকিৎসা বিজ্ঞান।

ডাক্তার চিরঞ্জীব কিন্তু কিছুতেই বউ-ছেলের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুকে মেনে নিতে পারে নি। ওর মনে হয়েছিল এর পিছনে অন্য কোনও রহস্য আছে। হতে পারে সেটা জাগতিক চোখে ধরা পড়ছে না।

এমনিতে ভূত-প্রেত, আত্মা ইত্যাদি বকওয়াশ মনে করলেও এই বিপর্যয় কিন্তু অন্য এক চিরঞ্জীবের জন্ম দিয়েছিল।

ডাক্তার চিরঞ্জীব যতটাই বিজ্ঞানের ব্যাপারে গোঁড়া, স্বামী বা পিতা চিরঞ্জীব যেন ততটাই কুসংস্কারাচ্ছন্ন এই ব্যাপারে।

বউ-বাচ্চার এই অকস্মাৎ মৃত্যুর ধাক্কা কাটতে সময় লেগেছিল বেশ কয়েক মাস। সেসময় তো ডাক্তারি প্রায় ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন চিরঞ্জীব। কিন্তু সহকর্মী চিকিৎসক বন্ধুদের সহযোগিতায় কালের নিয়মে ফের কাজের দুনিয়ায় ফিরে এসেছেন ডাক্তার চিরঞ্জীব সোম।

বন্ধুদের শত অনুরোধেও আর বিয়ে-থা’র দিকে ঝোঁকেন নি তিনি। আসলে সুমনা আর রাকাকে কোনওভাবেই ভুলতে পারে নি ও। পিতৃ-মাতৃহীন সুমনাকে হঠাৎ করেই বিয়ে করেছিল চিরঞ্জীব।

দুজনের আলাপ আচমকাই। আসলে সুমনাকে অত রাতে জনশূন্য হয়ে আসা রাস্তায় দেখে অবাক হয়েছিলেন চিরঞ্জীব।

রাতে ডিউটি সেরে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। সুমনাকে জিজ্ঞেস করলে ও বলেছিল পথ হারিয়ে নাকি এদিকে চলে এসেছিল। অত রাতে সুমনাকে ওভাবে ছেড়ে আসতে মন চায় নি চিরঞ্জীবের। ওকে প্রশ্ন করায় বলেছিল যে মেসে ও থাকে সেখানে সময়মতো ভাড়া দিতে না পারায় ওকে রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছে।

সেদিনই ওই সহায়সম্বলহীন মেয়েটিকে বাড়িতে এনে তুলেছিলেন চিরঞ্জীব।

ওঁর বাবা-মা অনেক আগেই প্রয়াত হয়েছিলেন। সেই অর্থে চিরঞ্জীবের কোনও গার্জিয়ান ছিল না। তবে ওঁর দিদি থাকতেন এই শহরেই। দিদিকে সুমনার কথা জানানোয় তিনি ভাইয়ের ওপর ভারী অসন্তুষ্ট হন। বলেন, ‘ ভাই একটা চালচুলোহীন মেয়েকে এভাবে বাড়িতে এনে তুলেছিস? আগপিছু একটা খবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলি না?” 

দিদির কথায় জেদ আরও বেড়ে গিয়েছিল চিরঞ্জীবের। এমনিতেই অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে মানুষ হয়ে ওঠা। একের পর স্কলারশিপ পেয়ে পড়াশুনা করা। হোস্টেলে, মেসে একগাদা ছেলেপুলের সঙ্গে রুম শেয়ার করে, হাত পুড়িয়ে রান্না করে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া। শেষপর্যন্ত ডাক্তার হয়ে ওঠা। এরকম একজন মানুষ বিপরীত দিকে থাকা আরেক অসহায় নারীকে কী ফেলে দিতে পারেন?

দিদি-জামাইবাবুর সঙ্গে সেদিনই যাবতীয় সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। সুমনাকে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে তার পরে পরেই। সুমনা কিন্তু প্রথম দিন থেকেই একটা কথা বলত, তার অতীতের ব্যাপারে যেন কোনও প্রশ্ন না করে চিরঞ্জীব। সে পথে হাঁটে নি চিরঞ্জীবও।

এ যেন গঙ্গার কাছে শান্তনুর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার মতো। তবে সুমনা-রাকার অকাল মৃত্যুর পর চিরঞ্জীবের বারবার মনে হয়েছে সুমনার অতীত সম্পর্কে এতটা নিরাসক্ত থাকা তাঁর উচিত হয় নি। হয়তো ওদের এভাবে মৃত্যুর রহস্য লুকিয়ে আছে এই অজানা অতীতের মধ্যেই।

শ্মশানের নির্জনতা হালফিলের বার্নিং ঘাটগুলিতে গেলে মোটেই পাওয়া যায় না। বরং কর্পোরেট ধাঁচের শ্মশানগুলো যেন শবদেহের সঙ্গে আসা মানুষগুলির হই-হট্টগোলের জায়গা হয়ে উঠেছে। একমাত্র অতি আপনজন ছাড়া বাকিদের দেখলে তো মাঝেমধ্যে মনে হয় ওরা বেশ কিছুটা সময় নিজেদের মতো করে কাটাতে এসেছে। গরম লাগলেও চিন্তা নেই।

পুরসভা থেকে তৈরি করে দেওয়া হয়েছে শীততাপনিয়ন্ত্রিত ঘরও। এক নয় একাধিক। একদিকে যখন শবদেহটি চূড়ান্ত তাপমাত্রায় জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে তখন ওই ঠাণ্ডার আমেজে বসে থাকাও এক চরম বৈপরীত্যের জানান দিচ্ছে। 

তবে এখন যে শ্মশানের ছবিটা ধরা পড়ছে তা কিন্তু মান্ধাতার আমলের সব নিদর্শন বহন করছে। শহর থেকে অনেক অনেক দূরের এই প্রত্যন্ত গ্রামীণ শ্মশানে এখনও কাঠের চুল্লিতে শবদেহ পোড়ানো হচ্ছে।

একদিক দিয়ে বয়ে চলেছে যৌবনবতী নদী। বর্ষাকালের প্রাক্কালে নদীর এই ভরপুর চেহারা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।

এখন অবশ্য রাত যথেষ্টই গভীর। স্ট্রিট লাইটের ঝলকানিও এখানে নেই প্রত্যাশিতভাবেই।

শ্মশানের এক প্রান্তে একটা অর্ধপোড়া লাশ। বোঝাই যাচ্ছে কেউ সেটা টেনে নিয়ে এসেছে কাঠের চুল্লি থেকে। মৃতদেহ ঘষটে আনার দাগও বিদ্যমান হয়ে উঠেছে। লাশটায় এবার ভাগ বসাবে কোনও এক অঘোরী সাধক।

হ্যাঁ, এই ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুরের শ্মশানে ডোমেদের বদান্যতায় মরা মাংসের ভাগ পেতে কোনও সমস্যাই হয় না পিশাচের পূজারীদের। তন্ত্রমন্ত্রের এই আদিম কার্যকলাপের মাধ্যমে শক্তি বাড়ায় অঘোরী সাধক কালভৈরব।

তাঁর গার্হস্থ্যকালীন জীবনের পরিচয় এখানে অপ্রাসঙ্গিক। তবে সে যে সুশিক্ষিত সেটা বোঝা যায় তার আদবকায়দায়। কোনও নতুন লাশ শ্মশানে এলেই কালভৈরব পাগল হয়ে ওঠে। সব লাশের ভাগ জোটে না। তবে ডোমেদের আনুকূল্য জুটে যায় কোনও না কোনও আধপোড়া দেহ।

তাতে একদিকে ভালোই হয়। খেতে অসুবিধা হয় না। প্রতি মাসে অন্তত একবার এই গহন শ্মশানে পদার্পণ ঘটে কালভৈরবের।

আগে ও শুধু মাংস নয়, মানুষের তাজা রক্তও ভারী পছন্দ করত। এখন সেই অভ্যেসে একটু লাগাম পরেছে। কিন্তু ওর পুজোর উপাচারের জন্য ওই তাজা রক্ত যে খুবই দরকার। 

যোধপুর পার্কে শিখা লাহিড়ির বাড়ি হাজির হয়েছেন ডাক্তার চিরঞ্জীব সোম। ওর বাবা বিশ্বনাথ লাহিড়ি জানতে পারেন নি ডাক্তারবাবুর আগমনের খবর।

আজকাল মেয়েকে ফেলে তিনি বিশেষ বাইরে যান না। কারণ, মেয়েটা যেন দিন দিন হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।

রক্তপানের বাসনায় ও যেন পাগল হয়ে উঠেছে। ঘরে সারাক্ষণের অ্যাটেন্ডান্স থাকে। তাও বিশ্বনাথবাবু মেয়েকে চোখের বাইরে যেতে দিতে চান না। 

মাঝেমধ্যে শিখার বাড়াবাড়ি এমন পর্যায়ে চলে যায় সেজন্য ওর হাত বেঁধে দিতে হয়। কোনও ছুতোয় একটা কাঁচি বা ব্লেড পেলেই হল। নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করে রক্ত চুষতে থাকে শিখা।

ওর শরীরের নানা অংশ সেই ক্ষতগুলির দগদগে উপস্থিতির পরিচয় দিচ্ছে।

কিন্তু ডাক্তার চিরঞ্জীব সোম তো আজ তাঁর রোগীকে দেখবেনই। আর সেটা যতটা নিভৃতে হয় সেটাই তিনি চান। ওকে শান্তি দিতে হবে যে।

এমনিতেই বিশ্বনাথবাবু বাড়ি নেই। তার ওপর অ্যাটেন্ডান্স মহিলাটিও কেমন যেন নেতিয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণ আগে পাশে রাখা জল খেয়েই ওর মাথাটা কেমন ঘুরে যায়। আর এখন ও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। 

ডাক্তার চিরঞ্জীব ধীরে ধীরে এগিয়ে যান শিখা লাহিড়ির দিকে। মেয়েটির দুটো চোখ বোজা। মুখের মধ্যে স্পষ্ট এক অব্যক্ত যন্ত্রণার ছবি।

কিন্তু সেসব দেখে তো চিরঞ্জীবকে ভুললে চলবে না।

মেয়েটির শরীরের মূল্যবান একটু রক্ত যে ওর দরকার। সিরিঞ্জটা দিয়ে নিজেই সেটা টেনে নিতে পারবে। তারপর চুকচুক করে পান করবে সেই তাজা রক্ত। যা ওকে আরও শত বছরের আয়ু দেবে।

এই মেয়ে নিজেই পিশাচিনীর বরকন্যা। এই রক্ত চট করে মেলে না। কয়েক লাখে একজনের মধ্যে পাওয়া যায়।

বেশ কয়েক বছর আগে আরও এক পিশাচিনীর রক্ত খেয়ে ওর সিদ্ধিলাভ হয়েছিল। সেটা ওর বিয়ে করা বউ সুমনা। চিরঞ্জীব ঠিক জানতে পেরেছিল এই মেয়ের রহস্য। তাই সুযোগ বুঝেই ওই রাতে ওকে খুন করেছিল। সুমনার রক্ত টেনে নিয়েছিল বিশেষ সিরিঞ্জের সাহায্যে। একইভাবে মেরেছিল ছোট্ট রাকাকেও।

রক্তের নেশা এভাবেই যেন মিলেমিশে একাকার করে দিয়েছিল একজন ডাক্তার আর অঘোরীকে।

আজ প্রায় পনেরো বছর পর আবারও একটা মাহেন্দ্রযোগ। ডাক্তার চিরঞ্জীব সোম আর দেরি করতে রাজি নয়।

কিন্তু একি? এ কার মুখ দেখছে চিরঞ্জীব। এ তো তার সেই পিশাচিনী বউ সুমনার মুখ। নিজের হাতে যাকে মেরে ফেলেছে।

শিখার মুখটা নিমেষে পালটে গিয়ে সুমনার আকার নিয়েছে। আর সুমনার চোখ দুটো খোলা। হাত আর বাঁধা নেই। বজ্রমুষ্ঠি এগিয়ে আসছে চিরঞ্জীবের গলার দিকে।

ভেসে হাসছে পৈশাচিক হাসি। চেতন হারাবার আগের মুহূর্তে রাকার কণ্ঠে কুৎসিত হাজারো বুনো কুকুরের ডাকও ভেসে এল চিরঞ্জীবের কানে।

মিনিট দশেক পর ঘরে ঢুকে বিশ্বনাথ লাহিড়ি আবিষ্কার করলেন ঘরের মধ্যে একজোড়া লাশ। একটা শিখার, অপরটা ডাক্তার চিরঞ্জীব সোমের। অ্যাটেন্ডান্স মহিলাটি ঘরের এক কোনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছে।

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত