পাঠিকা

।।অ র্পি তা ব ন্দ্যো পা ধ্যা য়।।

বাতাসে ভেসে আসা বাতাবিফুলের গন্ধটা প্রাণভরে নাকে টানল শৈলেশ্বর। পাখিটা একটানা ডেকেই চলেছে। যেন এ জীবনের কোনও একটা গূঢ় গোপন কথা সে বলতে চায় কিন্তু কাউকেই সেটা বোঝাতে পারছে না। চিঠিটা হাতে নিয়ে অফিসের জানলা দিয়ে দূরের গাছপালার দিকে অনেকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে বসে থাকে শৈলেশ্বর। বসেই থাকে। শুভ্রতা সেন? কে এই অপরিচিতা নারী?

এ গল্প আমি শুনেছিলাম আমার বন্ধু শ্যামল গুপ্তর কাছে। কিন্তু শ্যামল গুপ্ত এ গল্পের নায়ক নয়, নায়ক তার লেখকবন্ধু শৈলেশ্বর। সারাজীবন শৈলেশ্বর বানিয়ে বানিয়ে গল্প লিখে এল।কিন্তু জীবন তো সত্য। তাকে তো আর বানানো যায় না। সুতরাং যাঁরা গল্প লেখেন, তাঁরা জীবন সম্পর্কে সত্য কথা বলেন না বলেই ধরে নেওয়া হয়। যদিও কূটতার্কিক লেখকরা অবলীলায় বলে থাকেন তাঁদের এই মিথ্যাই নাকি আসল সত্য। শ্যামল গুপ্তকে বলা শৈলেশ্বরের এই কাহিনি নিছক গল্প, নাকি গল্পের আবরণে আসল সত্য, তা যাঁরা এ কাহিনি শুনবেন তাঁদের উপরেই বিচার করার ভারটুকু থাক। আমি কাহিনিটুকু শুধু বলে যেতে পারি মাত্র।

বছর খানেক আগে কোনও একদিন যখন শৈলেশ্বর অফিসে ঢুকেই তার টেবলে বাদামি রঙের একটা খাম পড়ে থাকতে দেখল, তখন বাংলায় বসন্ত এসে গেছে। হাওয়ায় একটা হালকা সুগন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। আম আর নিমফুলের মঞ্জরীর। চল্লিশ বছর আগে যখন শরীরে রক্তের কোষে কোষে প্রথম যৌবন নিঃশব্দে ঢুকে পড়তে শুরু করেছিল, তখন থেকেই তো জীবনের নেশা ধরানো এই মদির গন্ধের সঙ্গে তার পরিচয়।আজও প্রথম যৌবনের সেই গন্ধটায় রক্তের মধ্যে তেমনই যেন ঝিম ধরে উঠল তার। শুধু এর সঙ্গে মিশে গেল জীবন শেষ হয়ে আসার একটা উদাস বেদনা। সামনের বৈশাখেই তো পঁয়ষট্টি বছরে পা দেবে শৈলেশ্বর। দেখতে দেখতে জীবনের দিনগুলি কীভাবে শীতের বিকেলের আলোর মতো ফুরিয়ে গেল। দুপুরের হাওয়ায় ভেসে আসা নিমফুল…বাতাবিফুলের সুগন্ধের সঙ্গে তার অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক…সেই ‘কুব কুব’ পাখির ডাকটাও দূরের কোন গাছের মাথা থেকে একটানা ভেসে আসছে এখনও। আজও একইভাবে ডেকে চলেছে সে। মানুষেরই তা হলে শুধু বয়স বাড়ে? ওই পাখিদের নয়? একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে শৈলেশ্বর।বয়সের হিসেবে শৈলেশ্বরের সত্যি এই চেয়ার-টেবলে এসে আর বসার কথা নয়। অবসর তো কবেই নিয়ে ফেলেছিল সে। কিন্তু প্রবীণ লেখক হিসেবে প্রকাশনা সংস্থা এখনও তাকে আংশিক সময়ের জন্য রেখে দিয়েছে। সংস্থায় জমা পড়া পাণ্ডুলিপিগুলো ঝাড়াই-বাছাই করার জন্য।

আজও অফিসে সেজন্যই এসেছিল শৈলেশ্বর। এসেই টেবলে এই চিঠি। উলটেপালটে চিঠিটা দেখল সে। মেয়েলি হাতের লেখায় খামের উপর প্রেরিকার নাম ও ঠিকানা। শুভ্রতা সেন, নয়াবাজার, নয়াদিল্লি। বাতাসে ভেসে আসা বাতাবিফুলের গন্ধটা প্রাণভরে নাকে টানল শৈলেশ্বর। পাখিটা একটানা ডেকেই চলেছে। যেন এ জীবনের কোনও একটা গূঢ় গোপন কথা সে বলতে চায় কিন্তু কাউকেই সেটা বোঝাতে পারছে না। চিঠিটা হাতে নিয়ে অফিসের জানলা দিয়ে দূরের গাছপালার দিকে অনেকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে বসে থাকে শৈলেশ্বর। বসেই থাকে।শুভ্রতা সেন? কে এই অপরিচিতা নারী? বাঙালি মেয়েদের এরকম নামও হয় নাকি? হিন্দুস্থানি নামের অনুকরণে ‘মর্যাদা’ বা ‘নম্রতা’-র মতো নামও আজকার আকছার রাখা হচ্ছে বাঙালি মেয়েদের। কিন্তু শুভ্রতা নামটি আগে কখনও শোনেনি সে।

মধ্যবয়সে যখন সাহিত্যিক হিসেবে কিছু খ্যাতি অর্জন করেছিল শৈলেশ্বর, তখন অচেনা পাঠক-পাঠিকা-গুণগ্রাহীদের নানা রকম খামবন্ধ চিঠি আসত তার কাছে। চিঠিগুলি খুলে পড়ার চেয়ে হাতে ধরে থাকতেই তার বেশি ভাল লাগত। এক একটা চিঠি যেন এক একটা রত্নগুহার গোপন দরজা। বিশেষ করে সে চিঠি যদি কোনও অপরিচিতা নারীর হয়। দরজা খুলে ফেললেই চিচিং ফাঁকের মতো ভিতরে মুগ্ধতা, প্রশংসা, অকুণ্ঠ বন্দনার কী আশ্চর্য মণিমুক্তোর সন্ধান পাওয়া যাবে কে জানে! আস্তে আস্তে লেখার ক্ষমতা আর উৎসাহে যখন ভাটা পড়তে লাগল শৈলেশ্বরের, কম লিখতে শুরু করল সে। চিঠির সংখ্যাও তখন ক্রমে হ্রাস পেতে শুরু করল। বছর খানেক আগে, লেখা যখন প্রায় ছেড়ে দিয়েছে সে, তখন থেকে কেউ আর তাকে চিঠি লেখে না। লিখবেই বা কেন? প্রচলিত ইংরেজি প্রবাদই তো আছে, ‘আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড’। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। নগদ বিদায়ের এই যুগে মানুষের চোখের সামনে যতদিন আছ মানুষ ততদিনই শুধু মনে রাখবে তোমাকে। তারপর আর নয়। খামবন্ধ চিঠি হাতে পাওয়ার রোমাঞ্চকর সেই স্বাদ এখন যেন কোনও বিস্মৃত যুগের স্মৃতি। সেই স্বাদ নতুন করে আস্বাদনের জন্য যেন খামটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে শৈলেশ্বর। তারপর খুলে ফেলে খামটা। দিল্লির এক বাঙালি ক্লাবের প্যাডে লেখা টাইপ করা চিঠি। বাংলা সাহিত্যজগতে বর্তমানে প্রায় বিস্মৃত সাহিত্যিক শৈলেশ্বর নন্দীর মূল্যবান অবদানের কথা স্মরণে রেখে দিল্লির বাঙালি সমাজ তাকে বিশেষ সম্মান জানিয়ে যথার্থ সাহিত্যপ্রেমীর কর্তব্য পালন করতে চায়।দিল্লিতে যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়ার খরচ ক্লাবের। শৈলেশ্বর নন্দী যদি এই প্রস্তাবে দয়া করে সম্মতি জ্ঞাপন করে তা হলে তারা কৃতার্থ বোধ করবে। ক্লাবের সদস্যরা সবাই মিলে তার হাতে কুড়ি হাজার টাকার চেক তুলে দিতে চায়। চিঠির শেষে সম্পাদক হিসেবে শুভ্রতা সেনের নাম সই করা। অফিশিয়াল এই চিঠির সঙ্গে পিন দিয়ে আঁটা আর একটি গোলাপি কাগজে লেখা সংক্ষিপ্ত ব্যক্তিগত চিঠি — ‘আমি আপনার লেখা ছোটগল্পের একজন একনিষ্ঠ পাঠিকা। ছেলেবেলা থেকেই আপনার গল্প পড়ে বড় হয়েছি। আপনাকে এখানে নিমন্ত্রণ করে আনার মূল প্রস্তাবক আমিই। আপনার সঙ্গে আমার কিছু জরুরি ব্যক্তিগত কথাও আছে। আপনি যদি অনুগ্রহ করে দিল্লি আসেন তা হলে সেসব কথা বলার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করব। ইতি — শুভ্রতা।’

জানলা দিয়ে ভেসে আসা বাতাবিফুলের গন্ধের মতোই যেন অনির্ণেয়, রহস্যময় এই চিঠির ভাষা। কী জরুরি কথা থাকতে পারে তার সঙ্গে একজন সম্পূর্ণ অপরিচিতা নারীর? প্রবাসে থাকা বাঙালিরা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে প্রায়শই নিতান্ত সাধারণ মানের সাহিত্য পত্রিকা বের করে থাকেন। শুভ্রতা সেন সেরকমই কোনও পত্রিকায় শৈলেশ্বরকে নিয়মিত লেখার জন্য আবদার করে বসবে কি না কে জানে। কুড়ি হাজার টাকা সাম্মানিক দক্ষিণা পাওয়ার পর এই প্রার্থনা সে ফেরাবে কী করে? কিন্তু খুব ভাল পত্রিকা হলেও কি সে লিখতে উৎসাহ বোধ করত? লেখা তো কবে থেকেই প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে তার। গোলাপি কাগজে কালো কালিতে পরিষ্কার মেয়েলি হস্তাক্ষরে লেখা চিঠিটার দিকে তাকিয়েই থাকে শৈলেশ্বর। বুকের মধ্যে হঠাৎ কেমন ধক করে ওঠে। প্রৌঢ়ত্বে পা দিয়েছে সে অনেকদিন। কমবয়সি যুবকের মতো কোনও নারীর নাম শুনলেই বা চাক্ষুষ দর্শনেই প্রেমে পড়ার রোগ তার বহুদিন আগেই অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু তবুও প্রশ্নটা বারবার তার মাথায় ঘুরে ফিরে আসছে, শুভ্রতা সেনের ‘সেন’ বাদ দিয়ে শুধু ‘শুভ্রতা’ নামটিই কেন লিখল সেই নারী? আনুষ্ঠানিকতার ধরাবাঁধা রীতি ভেঙে ফেলে এভাবে ঘনিষ্ঠ হতে চাওয়ার কি বিশেষ কোনও কারণ আছে? কী সেই কারণ? ভাবতে গিয়ে নিজের মনেই আবার হেসে ওঠে শৈলেশ্বর। দেখো কাণ্ড! একজন পুরুষ আর নারীর দেখা হলেই তারা পরস্পরের প্রেমে পড়বে, তারপর গল্পের গাড়ি চলবে গড়গড়িয়ে, এই ধরাবাঁধা ফর্মুলার একেবারেই বিরোধী সে। অথচ সেও দিব্যি উলটোপালটা কীসব ভেবেই চলেছে। এর প্রকৃত কারণ কি জানলা দিয়ে অতর্কিত আততায়ীর মতো ঘরে ঢুকে পড়া ওই ফুলের গন্ধটা, যা হঠাৎ হঠাৎ আশেপাশের সব সঠিক স্থির-সংস্থানকে একেবারে তছনছ করে দিতে পারে? জানলাটা বন্ধ করে দিল সে।

সত্যি আজকাল আর লিখতে পারে না শৈলেশ্বর। একেবারেই পারে না। যেন ভুলেই গেছে লেখার প্রক্রিয়াটা। কী করে একটা লেখা ‘হয়ে ওঠে’। মাঝে মাঝে শুধু বিদ্যুৎঝলকের মতো মনে পড়ে যায় সেসব দিনগুলির কথা, যখন লেখাটা ছিল তার জীবনে শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। সামান্য চিন্তাভাবনাও স্ফুলিঙ্গের মতো হঠাৎ জ্বলে উঠে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ত মস্তিষ্কের কোষে কোষে। শুধু মস্তিষ্ক নয়, সমস্ত শরীরের ভিতর দিয়ে তা যেন বলতে চাইত — ‘আকার দাও, আমাকে একটা আকার দাও’।যতক্ষণ না ভাবনা সত্যি একটা আকারে বাঁধা পড়ছে, ততক্ষণ একটা অদ্ভুত অস্থিরতা রাতের ঘুম কেড়ে নিত তার।চিন্তাভাবনার বায়বীয় নিরাকার উপাদানগুলিকে একটা নিশ্চিন্ত ভাষার শরীর দিতে পেরে তবেই যেন শান্তি পেত সে। সে বড় গভীর শান্তি। সেই অস্থিরতা, সেই গভীর শান্তি দুই-ই যেন স্মৃতি থেকে আস্তে আস্তে লোপ পেয়ে যেতে বসেছে। মধ্যরাতের আরামের ঘুম ছুটিয়ে দিয়ে কোনও উদ্দীপক ভাবনাই আর তাকে ঘাড় ধরে এনে বসায় না লেখার টেবলে। শৈলেশ্বর বুঝতে পারে মস্তিষ্কের কোষগুলির ক্রমশ নিঃশব্দ মৃত্যু ঘটে চলেছে। এই নিঃশব্দ মৃত্যুর ঘটনাটা হয়তো শৈলেশ্বরের সম্পূর্ণ অজান্তেই সম্পন্ন হত, যদি না তার আগেই ঘটত সেই হৃদয়বিদারক ঘটনাটা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একদিন পড়ন্ত বিকেলে দাড়ি কাটছিল শৈলেশ্বর। পশ্চিম দিকের জানলাটা খোলা ছিল। সেখান থেকে কেমন একটা অদ্ভুত বিমনা আলো ঘরে ঢুকে পড়ায় ঘরের জিনিসপত্রগুলিকে যেন অচেনা দেখাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল সম্পূর্ণ অচেনা এক গ্রহের ভিতরে যেন দাঁড়িয়ে আছে সে। চিরকালের জন্য হারিয়ে যাওয়া যৌবনের দিনগুলির একটা বিস্মৃত গন্ধ হঠাৎ যেন পাক খেয়ে উঠেছিল মনের কোণে। এরকম দু’-একটি মুহূর্তের স্ফুলিঙ্গই দাবানলের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে সমস্ত অস্তিত্বের ভিতরে। আর সেই আগুনের মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় ভাষার শরীর। বহুদিন পর সেই দাবানলের উষ্ণতার স্বাদ কি তবে সে আবার ফিরে পেতে চলেছে? শরীর-মন রোমাঞ্চিত হয়ে উঠতে চাইছে তার। তখনই চোখে পড়ল সামনের আয়নায় এক বৃদ্ধের ছায়া, যার চামড়া বয়সের টানে কুঁচকে গেছে শীতের গাছের বাকলের মতো। কে এই বৃদ্ধ? কোত্থেকে ঢুকল ঘরে? খুঁজতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখে এ হাত অন্য কারওর নয়, একান্তভাবে তারই। ঠান্ডা একটা স্রোত যেন শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায়। নিজের শরীরের রক্ত, মাংস, চামড়া যে ভিতরে ভিতরে তার অজান্তে এতটা বৃদ্ধ হয়ে গেছে তা সে এতদিন জানতেই পারেনি? এত নিঃশব্দে ঘটে গেছে সবকিছু? বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো শৈলেশ্বর আয়নার কাছ থেকে তীব্র বেগে সরে এসে নিজের ডান হাতের চামড়া খুঁটিয়ে দেখে। কিন্তু কই, সেখানে তো সময়ের কোনও কুঞ্চনের রেখা এখনও সেভাবে ফুটে ওঠেনি! তা হলে সবটাই তার চোখের ভুল? এরকম ভুলও হয়? শৈলেশ্বর ভাবল আর একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পশ্চিমের জানলার এই আলোয় নিজের হাতের ছায়াটা আর একবার ভাল করে দেখে নেবে। কিন্তু সাহসে আর কুলোলো না তার। সেই বৃদ্ধের হাতের ছায়াটা যদি আবার ভেসে ওঠে আয়নায়? আয়নার সামনে একবার এগিয়ে গিয়েও ভয়ে পিছিয়ে এল সে।

শৈলেশ্বরের মনে পড়ল, তার বাবা শ্যামাপ্রসন্ন যখন মারা যান, তখন আশি বছর বয়স তাঁর। শৈলেশ্বরের বয়স তখনও চল্লিশ পেরয়নি। যুবকই বলা যায়। তার বাবার লোলচর্ম হাতটা দেখে যুবক শৈলেশ্বরের মনের ভাবটা যে কী হয়েছিল তা এখনও বেশ মনে করতে পারে প্রৌঢ় শৈলেশ্বর। বাবার প্রতি কেমন যেন করুণাই অনুভব করেছিল সে। শ্যামাপ্রসন্ন তো প্রকৃতি ও সময়ের অধীন, বৃদ্ধ তো তিনি হবেনই। কিন্তু শৈলেশ্বর তো তা নয়।সময়ের কত ক্ষমতা আছে যে তার হাতের চামড়ায় ওরকম কুঞ্চনরেখা এঁকে দিতে পারে? অনন্তকাল বাঁচার জন্যই তো সে জন্মেছে এই পৃথিবীতে। সেই গোপন বিশ্বাস যে হঠাৎ এভাবে ভেঙে যাবে, বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল শৈলেশ্বরের। সে আপ্রাণ মনকে বোঝাতে চাইল, সবটাই তো নিতান্ত চোখের ভুল। কিন্তু পারল না। সূক্ষ্ণ, গোপন একটা মৃত্যুচিন্তা যেন সাপের বিষের মতো কখন তার রক্তের ভিতরে ঢুকে গেছে। মস্তিষ্কের কোষগুলির নিঃশব্দ মৃত্যুসংবাদ সে আগেই টের পাচ্ছিল। এবার শারীরিক মৃত্যুর চিন্তা যে তাকে এভাবে নিষ্ক্রিয়, বিপন্ন করে তুলবে তা আগে কোনওদিন সে ভাবতে পারেনি।

এই অভিজ্ঞতা বস্তুত তার বছর খানেক আগের। তারপর সে আর এক লাইনও লিখতে পারেনি। কাগজ-কলম নিয়ে লেখার টেবলে যতবারই বসেছে, ওই কুঞ্চিত হাতের ছায়াটা চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। আর তখনই সবকিছু নিরর্থক মনে হয়েছে তার। গল্প লিখে একসময় যে বেশ কিছুটা খ্যাতি হয়েছিল তার, তার প্রমাণ তো দিল্লি থেকে আসা এক অপরিচিতা নারীর এই চিঠি। এই খ্যাতিকে মূলধন করেই কলকাতার একজন পরিচিত প্রকাশক চেয়েছিলেন শৈলেশ্বর নন্দীর পঞ্চাশটি গল্পের একটি সংকলন বের করতে, অন্য অনেক লেখকের যেরকম সংকলন এর আগে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রকাশনা থেকে। খ্যাতিমান হলেও শৈলেশ্বরের প্রতিভা যে বহুপ্রসবিনী, এমন নয়। লেখার ব্যাপারে সে বরাবরই খুব খুঁতখুঁতে। লেখা মনমতো না হলে কখনওই সে সেটা ছাপতে দিত না কোথাও। তার প্রকাশিত গল্পসংখ্যা তেমন বেশি নয়। তবুও প্রকাশক তার প্রকাশিত গল্পগুলি থেকে নির্বাচন করেছিলেন উনপঞ্চাশটি গল্প। প্রকাশক চাইছিলেন শৈলেশ্বরের আর একটিই মোটে মাস্টারপিস, যা সমগ্র সংকলনটিকে একটা হৈমলায়িক উচ্চতা দেবে, পাঠকের মুখে মুখে ফিরবে সেই গল্প। প্রকাশকের এই অনুরোধ শুনে শরীরের অন্তর্গত রক্ত বহুদিন পর ছলাৎ করে নেচে উঠেছিল তার।ঘোরলাগা মানুষের মতো সে অনেক রাতে গিয়ে বসেছিল তার লেখার টেবলে। সামনের সাদা দেওয়ালটার দিকে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেছে সে। কিন্তু আগে প্রতিটি ভাবের সঙ্গে যেমন ফুটে উঠত শব্দের শরীর, সেভাবে তার সামনে কোনও লাইন, কোনও শব্দ, কোনও ভাব এক মুহূর্তের জন্যও এসে দাঁড়াচ্ছে না। কোনওক্রমেই যাতে নিজের হাতটা চোখে আর না পড়ে, সেজন্য ফুলহাতায় শৈলেশ্বর আগেই ঢেকে নিয়েছিল দু’হাত। কিন্তু তাতে লাভ হল না কিছুই। কোনও ভাবনাকে সে আকার দিতে পারল না। তার মনশ্চক্ষে বারবার শুধু ফুটে উঠছিল লোলচর্ম সেই ধ্বংসের হাত, মৃত্যুর হাত। ওই হাতের হাত থেকে যেন আর কিছুতেই নিষ্কৃতি পাচ্ছে না সে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল শৈলেশ্বর, আর মনে মনে বলল — ‘নিষ্ফলা পরিশ্রমের ক্লান্তির থেকে কত আরামপ্রদ অনিবার্যের পায়ে নিশ্চিন্ত আত্মসমর্পণ। যে লড়াই কখনও জেতা যায় না, কী হবে সে লড়াই চালিয়ে গিয়ে? গল্প লেখা আর তার দ্বারা হবে না।’ প্রকাশককে ফোন করে এ কথাটা জানাতেই প্রকাশক বললেন — ‘‘মোটে তো আর একটা গল্প শৈলেশ্বরবাবু, একটা গল্পের জন্য আপনার সংকলনটা আটকে থাকবে? দেখুন না চেষ্টা করে।’’ নিজের মনে বিষণ্ণ হাসল শৈলেশ্বর। বাইরের মানুষকে সে কী করে বোঝাবে ভিতরে ভিতরে সে কীরকম রিক্ত, নিঃস্ব হয়ে গেছে? মনের যখন এই বেহাল দশা, তখন হঠাৎ এই চিঠিটা হাতে পেল সে। খোলা জানলা দিয়ে দূরে একটা উড়ন্ত চিল দেখতে দেখতে ভাবতে থাকে শৈলেশ্বর — সে  তো আজ সত্যি একজন ফুরিয়ে যাওয়া মানুষ, তার সঙ্গে কী এমন জরুরি দরকার থাকতে পারে একজন অপরিচিতা নারীর?

শুভ্রতা সেন নিজেই এসেছিল নয়াদিল্লি স্টেশনে শৈলেশ্বরকে রিসিভ করতে। হাজার লোকের ভিড়ে শ্বেতবসনা শুভ্রতাকে প্রথম দেখেই বহুদিন আগের একটা স্মৃতি মনে এল তার। বছর কুড়ি আগে সে একবার দিল্লি এসেছিল বেড়াতে। মূল উদ্দেশ্য ছিল দিল্লি হয়ে আগরায় গিয়ে তাজ মহল দেখা। একটা দ্বিধা নিয়েই গেছিল তাজ মহল দেখতে। তাজ মহল নিয়ে দীর্ঘদিনের জনশ্রুতির ফলে মনে একটা আশ্চর্য ছবি তৈরি হয়েছিল তার।স্বচক্ষে সেই নিষ্প্রাণ শ্বেতপাথরের স্তূপকে দেখলে কল্পনার সব নির্মাণ ধ্বংস হয়ে যাবে না তো? কিন্তু তাজ মহলের সামনে দাঁড়িয়ে রীতিমতো হতবাক হয়ে যেতে হয়েছিল শৈলেশ্বরকে। ধূ ধূ নীল আকাশের পটভূমিতে সেই অতিকায় এক শুভ্রতাকে কেমন যেন অলীক, অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। কোনও বস্তু কখনও এতটাই নিষ্কলঙ্ক শুভ্র হতে পারে? শুভ্রতা সেনকেও তাজ মহলের মতোই আশ্চর্য শুভ্র মনে হচ্ছিল তার। শুভ্র মুখের কোমল সৌন্দর্যকে আড়চোখে দেখে নিচ্ছিল শৈলেশ্বর। যেদিন সকালে দিল্লিতে সে পৌছল, সেদিন দুপুরেই তার সম্বর্ধনা জ্ঞাপন অনুষ্ঠান। পরদিন সকালের গাড়ি ধরেই আবার তাকে কলকাতায় ফিরে যেতে হবে। শৈলেশ্বর ভাবছিল, ওই নারী তা হলে শৈলেশ্বরকে কী করে বলবে তার জরুরি কথা? ওটা কি তা হলে নেহাতই কথার কথা ছিল? ভেবে দেখতে গেলে সেটাই তো স্বাভাবিক। শৈলেশ্বর তো পৃথিবীর কারও কাছেই তেমন জরুরি মানুষ নয় যে সত্যি কারও কোনও জরুরি কথা থাকতে পারে তার সঙ্গে।

মঞ্চে বসে সম্বর্ধনাকারীদের পক্ষ থেকে সদ্য পরিয়ে দেওয়া ফুলের মালাটা সামনের টেবলের উপর খুলে রেখে এইসব কথাই ভাবছিল শৈলেশ্বর। হঠাৎ খেয়াল করল অনুষ্ঠানগৃহের একেবারে শেষ প্রান্তে, শেষ সারিতে বসে আছে শুভ্রতা সেন। তাকেই দেখছে খুঁটিয়ে। এ যেন ঠিক দেখা নয়, জরিপ করে নেওয়ার মতো যেন তার চোখের দৃষ্টি। মুহূর্তে যেন সারা শরীরে বিদ্যুতের একটা ঝিলিক নেমে গেল তার। এই বিদ্যুতের অবশেষ এখনও বেঁচে আছে তার শরীরের আনাচে কানাচে? ভেবে অবাক হল শৈলেশ্বর। তার কাছে এখন এই অনুভূতি মনে হয় যেন গত জন্মের স্মৃতি। মাত্র ক’দিনের রোগে স্ত্রী কেতকী তাকে ছে়ড়ে চলে যাওয়ার পর আর কোনও নারীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেনি সে, আসার তাগিদও বোধ করেনি। একজন মানুষের অভাবে সমস্ত পৃথিবী শূন্য হয়ে গেছিল তার কাছে। তবুও যে বেঁচে থাকতে পেরেছিল শৈলেশ্বর, তা শুধু এই তীব্র বিচ্ছেদবেদনা ভাষার মধ্যে দিয়ে বারংবার বুঝে ওঠার জন্যই। কত বছর যে এভাবেই কেটে গেল মনে নেই ঠিক শৈলেশ্বরের। কেতকী চলে যাওয়ার পর মাস, বছর গোনাও যেন স্তব্ধ হয়ে গেছিল তার।যেন এক সময়হীন সময়ের মধ্যে বসবাস করছে সে। জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানের এক আবছা কাকজ্যোৎস্নায় বেঁচে রইল সে, সেই বিয়োগব্যথার আখ্যান লিখে যাওয়ার জন্য। কিন্তু একদিন মৃত্যু চিতাবাঘের মতো নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিয়ে এসে যে সেই মৃত্যুর স্মৃতিকে অবধি গ্রাস করে নিতে চাইবে, তা কখনও ভাবেনি শৈলেশ্বর। স্মৃতিবিলোপের এই দুর্যোগের মধ্যে ওই অপরিচিতা নারীর চক্ষের হঠাৎ চাউনির আলো যে বিস্মৃত একটা যুগকে এক নিমেষে চোখের সামনে উদ্ভাসিত করেই আবার নিভে যাবে, তাতে আর বিচিত্র কী? হঠাৎ বহুদিন পর যেন নিজের বুকের ভিতরের হৃৎপিণ্ডের শব্দটা শুনতে পাচ্ছিল সে।

অনুষ্ঠানের শেষে যখন মঞ্চ ছেড়ে একে একে সবাই চলে যাচ্ছে, তখন শুভ্রতাই শৈলেশ্বরের কাছে এগিয়ে এসে প্রস্তাবটা দেয় তাকে। খুব আন্তরিক ভঙ্গিতে বলে, ‘‘শৈলেশ্বরবাবু, আমার ওখানে চলুন। কথা আছে আপনার সঙ্গে। কাল সকালেই তো আপনার ট্রেন। আর তো সময় হবে না। রাতে আমার ওখানেই খেয়ে নেবেন। আপনার হোটেল তো ওখান থেকে কাছে। আমার ওখানে ডিনার সেরে হোটেলে চলে যাবেন।’’ শুভ্রতা যে বিবাহবিচ্ছিন্না এবং দিল্লির উপকণ্ঠের এক অ্যাপার্টমেন্টে একাই থাকে, সে কথা আগেই কানে গেছে শৈলেশ্বরের। সেখানেই সে নিয়ে যাচ্ছে শৈলেশ্বরকে। চোরা চাউনিতে শুভ্রতাকে দেখছিল শৈলেশ্বর। বয়স সঠিক বোঝা না গেলেও অনুমান করল প্রায় চল্লিশ ছুঁয়েছে। ভরা দিঘির মতো যৌবন এখনও শরীরের কানায় কানায়।

বাইরের ঘরে এনে তাকে বসায় শুভ্রতা। পরিপাটি করে সাজানো-গোছানো ঘর। খোলা দরজা দিয়ে ভিতরের ঘরে এলোমেলো করে রাখা মেয়েলি পোশাক-পরিচ্ছদের একটা ক্ষণিক আভাস চোখে পড়তেই চোখ সরিয়ে নেয় শৈলেশ্বর।ব্যাপারটা চোখে পড়তেই বোধহয় মৃদু একটু হাসি খেলে যায় শুভ্রতার ঠোঁটের কোণে। দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে কিচেনে চলে যায় শুভ্রতা। সোফায় চুপ করে বসে থাকে শৈলেশ্বর। এই গৃহে কোনও পুরুষের বসবাস নেই। মেয়েদের শরীরের আলাদা একরকম গন্ধ আছে। কেমন মিষ্টি মেদুর সেই গন্ধটা যেন উঠে আসছে ঘরের বাতাসে। কেমন যেন একটা আরামের আবেশে ঘুমিয়ে পড়তে চায় সমস্ত চেতনা। শুভ্রতা ঘরে ঢোকে কফির ট্রে হাতে নিয়ে। টেবলে কফির কাপ রেখে সুন্দর চাদরপাতা নিচু খাটটায় পা ছড়িয়ে বসে। ঈষৎ হেসে বলে, ‘‘কিছু মনে করবেন না শৈলেশ্বরবাবু। বসে থেকে থেকে কোমর ধরে গেছে, পা-টা একটু সামনে ছড়িয়ে বসলাম।’’ শৈলেশ্বর কুণ্ঠিত গলায় বলে, ‘‘না না, ঠিক আছে।’’

কিছুক্ষণ কথা বলল না কেউই। কী কথা বলবে, কারওরই যেন জানা নেই। হঠাৎ শৈলেশ্বরের চোখ পড়ল শুভ্রতার আশ্চর্য ফর্সা দুই পায়ের দিকে। যেন ঠিক মানুষের পা নয়, মসৃণ কোনও মর্মরমূর্তির দুই পা। শুভ্রতা শাড়িটা নীচের দিকে যথাসম্ভব টেনে নিল। তবুও সামান্য নড়াচড়ায় পা’দুটি বেরিয়ে পড়ছে মাঝে মাঝে। পায়ে বাঁধা রুপোর একজোড়া নূপূর। ঘরের উজ্জ্বল আলোয় তা ঝিকমিক করছে। শুভ্রতা বলল, ‘‘কফিটা নিন শৈলেশ্বরবাবু, ঠান্ডা হয়ে যাবে। শৈলেশ্বর ট্রে থেকে কফির কাপ হাতে তুলে নিয়ে বলল, ‘‘আপনার কী জরুরি কথা ছিল বললেন না তো!’’ শুভ্রতা কেমন যেন আবছা গলায় বলল, ‘‘হ্যাঁ, একটা কথা আছে আপনার সঙ্গে, যা শুনলে অবাকই হবেন, কিন্তু সেটা না বলে পারছি না। খুবই জরুরি ব্যাপার।’’ কোনও সুন্দরী নারীর মুখে এরকম কথা শুনলে শৈলেশ্বরের মতো একজন প্রৌঢ়েরও বুক দুরুদুরু করে উঠতেই পারে। কী বলতে চায় ওই নারী? শৈলেশ্বর খুব মৃদু গলায় বলল, ‘‘বলুন কী বলবেন।’’ ঈষৎ লাজুক হাসি খেলে যায় শুভ্রতার ঠোঁটের কোণে। নিচু গলায় সে বলে, ‘‘আমি আপনার লেখার একজন অন্ধ ভক্ত। এ যাবৎ আপনার লেখা আমি যেভাবে পড়ে এসেছি সেভাবে বাংলার আর কোনও পাঠক-পাঠিকা পড়েছে কি না আমার জানা নেই।’’ শৈলেশ্বর চুপ করে শুনছিল। লেখার জগৎ থেকে কবেই তো সে সহস্র যোজন দূরে সরে গেছে। জীবনের অদ্ভুত এক বিষাদ, এক দূরারোগ্য মৃত্যুচিন্তা গ্রাস করেছে তাকে। কোনও কিছুরই আর কোনও অর্থ খুঁজে পায় না সে। এই বিপন্ন মানসিক অবস্থায় এই প্রশংসা কীভাবে গ্রহণ করবে শৈলেশ্বর, সে বুঝতে পারছিল না।

শুভ্রতা বলে, ‘‘আমি তো আপনার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট।’’ শৈলেশ্বর বিষণ্ণ কৌতুকের হাসি হেসে বলে, ‘‘প্রকারান্তরে বলতে চাইছেন আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি, এই তো?’’ এ কথায় শুভ্রতা কেমন অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাকায় শৈলেশ্বরের দিকে, যেন তার মনের কোনও গুপ্ত অনুমান সত্যি কি না তা তার মুখ দেখে বুঝে নিতে চাইছে। চোখ নামিয়ে নিয়ে শুভ্রতা বলে, ‘‘না, আমি বলতে চাইছিলাম, ছোটবেলা থেকেই আপনার লেখা পড়ে বড় হয়েছি। আপনার লেখা পড়েই একটু-আধটু লিখতে শিখেছি।আপনার কাছে আমার পরম ঋণ। এই ঋণ পরিশোধনের জন্য আমি আপনাকে গুরুদক্ষিণা দিতে চাই।’’ শৈলেশ্বর বিষণ্ণ হাসি হেসে বলে, ‘‘কিন্তু আমি তো আর লিখব না। কী গুরুদক্ষিণা আর নেব আপনার কাছ থেকে?’’ সরাসরি শৈলেশ্বরের চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় শুভ্রতা বলল, ‘‘লিখবেন নাকি লিখবেন না, তা কি শুধু আপনার একার সিদ্ধান্ত?’’ শৈলেশ্বর অবাক হয়ে বলে, ‘‘তার মানে? আমি লিখব কি না সেটা আমি ছাড়া আর কে ঠিক করবে?’’ একটু চুপ করে রইল সে। তারপর বলল, ‘‘বেশ, কী গুরুদক্ষিণা দেবেন আপনি?’’ খোঁপার পিছনের দুটো ক্লিপ দু’হাতে খুলে খোঁপায় গুঁজতে গুঁজতে শুভ্রতা বলল, ‘‘আপনার লেখা দু’-একটা গল্পের লেখক হতে আমি রাজি। এই-ই আমার গুরুদক্ষিণা।’’ কথাটার অর্থ ধরতে না পেরে শৈলেশ্বর বলে, ‘‘কী বলতে চাইছেন আপনি? ঠিক বুঝলাম না।’’ শুভ্রতা বলে, ‘‘কতদিন ধরে আমার স্বপ্ন আপনার মতো একটা গল্প লেখার। কিন্তু সে তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।হাজার চেষ্টা করলেও আপনার মতো অত ভাল গল্প তো আমি লিখতে পারব না। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে ওরকম গল্প লেখার।ভেবে দেখলাম, গল্পটা যে আমাকেই লিখতে হবে তার কি কোনও বাধ্যবাধকতা আছে? গল্পটা তো আপনিই লিখে দিতে পারেন, শুধু নামটা থাকবে আমার। ব্যাপারটা তা হলে সহজেই মিটে যায়। শৈলেশ্বর বলল, ‘‘কিন্তু আমি তো আর তেমন ভাল লিখতে পারি না আজকাল।’’ শুভ্রতা বলল, ‘‘আপনার কোনও ভয় নেই শৈলেশ্বরবাবু। গল্প ভাল হোক বা না হোক, আদৌ দাঁড়াক বা না দাঁড়াক, আপনার সেসব নিয়ে কোনও চিন্তা নেই।আমি আমার সমস্ত আত্মস্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দিয়ে আপনার লেখা গল্প নিজের লেখা বলে স্বীকার করে নেব। ওই গল্পের সব দায় আমার। আপনি শুধু লিখুন, আর কিচ্ছু ভাবতে হবে না।’’

শৈলেশ্বর তাকায় এই সদ্যপরিচিতা নারীর দিকে। চমৎকার ছাঁদে কবরী বাঁধলেও কয়েক গুচ্ছ চুল উড়ে এসে চোখের উপর পড়েছে। কালো চুলের আলোছায়ার নীচে চোখের চাউনি যেটুকু পড়ে নেওয়া যাচ্ছে তাতে কৌতুকের লেশমাত্র নেই। বরঞ্চ মনে হচ্ছিল যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গেই কথাগুলি বলছে সে। চোখের দিক থেকে চোখ সরিয়ে তার মর্মরের মতো পায়ের দিকেই আবার চোখ রাখে শৈলেশ্বর। সেদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে, ‘‘কতদিন ধরে আমি লিখতে পারি না। লিখতে ইচ্ছে করে না।লিখতে বোধহয় আমি একরকম ভুলেই গেছি। অনেক কষ্টে আবার যদিও বা লিখতে পারি, তা হলে সে লেখার স্রষ্টা হিসেবে রাখতে হবে আপনার নাম? এই আপনার গুরুদক্ষিণা?’’

‘‘হ্যাঁ, আপনার লেখা যে আমি আমার নিজের বলে ভাবছি, এটা কি আমার মস্ত বড় দান নয়?’’

‘‘দান?’’

‘‘না তো কী? আপনার কি মনে হয় এরকম একটা সুযোগ আপনি ছাড়া অন্য আর কাউকে আমি দিতাম? কতখানি সম্মান যে আমি আপনাকে দিলাম আপনি তা অনুমান করতে পারছেন না?’’

না, অনুমান সত্যিই করতে পারছিল না শৈলেশ্বর। এরকম অদ্ভুত প্রস্তাব যে কেউ কাউকে দিতে পারে, সেটাই তো কখনও অনুমানের মধ্যে ছিল না শৈলেশ্বরের। লিখতে যে সে পারছে না, সে কষ্ট প্রতিমুহূর্তে তাকে কুরে কুরে খায়। ভাষা, শব্দ, শব্দের ভিতরে আর একটা শব্দ যেভাবে লুকিয়ে থাকে, তার নিঃশব্দ গোপন ফিসফিস যে শৈলেশ্বরের কাছে একদিন এভাবে ফুরিয়ে যাবে কোনওদিনও কি ভাবতে পেরেছিল সে? আজ যদি কোনও দৈব মুহূর্তে শব্দেরা তাদের সব রহস্য নিয়ে ফের এসে ধরা দেয় শৈলেশ্বরের কাছে, সত্যি যদি আর একটা গল্প আবার তার হাত থেকে বেরয়, তা হলে সে গল্পের সব স্বত্ব তুলে দিতে হবে ওই হৃদয়হীন নারীর হাতে? যে এরকম অবিশ্বাস্য একটা গুরুদক্ষিণার প্রস্তাব দিতে পারে? সে তো লেখালেখি করে বোঝা যাচ্ছে, তবুও তার কোনও ধারণা নেই কতটা রক্তক্ষরণ হলে তবে একটা গল্প জন্ম নিতে পারে? আর সেই রক্তক্ষরণের চিহ্ন সমস্ত অস্তিত্বে ধারণ করে যে লেখক, তার সঙ্গে গল্পের সম্পর্কটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? হঠাৎ শৈলেশ্বরের মনে হয় সে চিৎকার করে ওঠে এই নারীর এই স্বার্থপর অনৈতিক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে, প্রতিবাদ জানিয়ে বলে, আর সবকিছুর উপরেই চুরি-ডাকাতি চলে, ছলে বলে কৌশলে অধিকার কায়েম করা চলে, কিন্তু কারও সত্তার উপরে কেউ স্বত্ব আরোপ করতে পারে না। কিন্তু কোনওকিছুই বলা হয়ে উঠল না তার। লিখতেই যখন আর পারছে না সে, সরীসৃপের মতো অদৃশ্য গোপন একটা মৃত্যুচিন্তা যখন ভিতরে ঢুকে পড়ে জীবনের সব অর্থ, সব তাৎপর্য বারবার তছনছ করে দিচ্ছে, তখন এইসব অনুচ্চারিত প্রতিবাদের কোনও অর্থই তো থাকতে পারে না। শৈলেশ্বর চুপ করেই থাকে।

শুভ্রতা ঈষৎ হেসে বলে, ‘‘আমি জানি আপনি কী ভাবছেন।ভাবছেন যদি আদৌ লিখতেই আর না পারেন, তাই তো?’’ শৈলেশ্বর অবাক হয়ে তাকায় সামনে বসে থাকা এই নারীর দিকে। কী করে সে জানল শৈলেশ্বর বহুদিন আগে থেকেই বন্ধ্যা-নিষ্ফলা? জীবনের এককালের সব উদ্দীপনা আজ ধূসর স্মৃতির মতো হয়ে গেছে তার কাছে। শৈলেশ্বর সম্বন্ধে এটুকুও যে দয়া করে জেনেছে এই নারী, তাতেই যেন কৃতার্থ বোধ করে শৈলেশ্বর। গলার কাছে কী যেন দলা পাকিয়ে ওঠে তার। মনের ভাবটাকে কোনওরকমে গোপন করে বলে, ‘‘আপনি জানলেন কী করে আমি আর লিখতে পারি না? দয়া করে বলুন কী করে জানলেন।’’

‘‘ও মা! এ আবার জানতে লাগে নাকি? কতদিন ধরেই তো আপনার লেখা আর কোথাও বেরয় না। নিশ্চয়ই লিখতে পারছেন না বলেই বেরচ্ছে না। এ তো অনুমান করাই যায়।’’

‘‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, কিন্তু কেন লিখতে পারছি না সে কথা কি জানেন? কতটুকু জানেন আপনি আমার বিষয়ে?’’

হঠাৎ এমন তীব্রস্বরে কথাগুলি বলে ওঠে শৈলেশ্বর, যেন তার এই নিষ্ফলা বন্ধ্যাত্বের কারণ অবশ্যই জানা উচিত এই নারীর।শুভ্রতা শান্ত গলায় বলে, ‘‘কেন জানব না? আপনার সৃষ্টির উদ্দীপনা-শক্তিকে আস্তে আস্তে গ্রাস করে ফেলছে আপনার মৃত্যুচিন্তা।’’ চমকে ওঠে শৈলেশ্বর। কী করে জানল এই নারী তার বুকের ভিতরটাকে ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে খাওয়া মৃত্যুভয়ের কথা? তবে কি…নিজের হাতের দিকে তাকাল শৈলেশ্বর। না, ফুলশার্টের হাতায় তো হাত পুরো ঢাকা। চামড়ায় বার্ধক্যের কুঞ্চন যদি দেখা দিয়েও থাকে, এই নারীর তা চোখে পড়ার কথা নয়। কত সন্তর্পণে শৈলেশ্বর নিজের বার্ধক্যের চিহ্ন গোপন রাখতে চায় মানুষের কাছে, অথচ এই নারী জেনে ফেলল সবকিছু! এর উপর রাগ করবে নাকি কৃতজ্ঞ হবে, বুঝে উঠতে পারে না শৈলেশ্বর। শুভ্রতা আরও বলল, ‘‘আপনার শেষের দিকের অনেকগুলো গল্প জুড়েই আছে এই মৃত্যুচিন্তা। জীবন তো অনেকরকম, কিন্তু মৃত্যু একইরকম। ফলে আপনার শেষদিকের লেখায় বৈচিত্র্য আস্তে আস্তে কমে এসেছে। আপনি হয়তো তা খেয়াল করেননি।’’ শৈলেশ্বর অবাক হয়। তার মতো সামান্য একজন লেখকের কথা এত জানে এই নারী! অথচ শৈলেশ্বর নিজেই তো ভুলে গেছে কবে কী লিখেছিল। বিশদে মনে রাখার মতো কোনও উৎসাহ বোধ করেনি আর। শৈলেশ্বর চুপ করে ছিল। এরকম অদ্ভুত পরিবেশে, নির্জন এই ঘরে, অদ্ভুত এক নারীর, যার কিছুই সে ঠিক ঠাহর করতে পারছে না, তার সামনে বসে ঠিক কী আচরণ করা উচিত বুঝে উঠতে পারছে না।

শুভ্রতার কফি খাওয়া হয়ে গেছিল। খালি কাপটা ঠক করে সামনের টেবলে রেখে বলল, ‘‘একটা কথা বলুন তো শৈলেশ্বরবাবু, সারাক্ষণ আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন কেন আপনি?’’ চমকে ওঠে শৈলেশ্বর। তার আড়চোখের চোরা চাউনি এভাবে ধরা পড়ে যাবে এই নারীর কাছে, সেটা ভাবতে পারেনি সে। কারওর রক্তমাংসের পা যে এমন মসৃণ, নিটোল হতে পারে তা সত্যিই ভাবেনি সে। ওই দুটি পায়ের মর্মরশুভ্রতা যত অবাস্তব লাগছিল তার কাছে, ততই মোহময় হয়ে উঠছিল।নিজের অজান্তেই সেই দৃশ্য বারবার দেখা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না তার।

‘‘আমার পা’টা সত্যিই সাদা মার্বলের তৈরি কি না তা-ই দেখছিলেন, তাই না? যারা দেখে তারা কেউই ‘বিশ্বাস’ করে না।এমনভাবে সবাই তাকায় যে পা ঢেকে রাখতে হয়। আপনার গল্পের এক নায়িকা ঠিক যেভাবে তার পা ঢেকে রাখত। গল্পের নামটা মনে পড়ছে আপনার? সেই যে গল্পের নায়ক একজন শিল্পী, আগরায় গিয়ে বরফের মতো সাদা তাজ মহল দেখে হতবাক হয়ে গেছিল। তার পরিচিত এক নারীও অমন মর্মরশুভ্র।কিন্তু সমস্ত শরীর তার সভ্যতার ‘অসভ্য’ পোশাকে ঢাকা। ঠিক এরকম বাক্যই আপনি লিখেছিলেন। সেই শিল্পীর একান্ত ইচ্ছা ছিল একদিন সাহস করে সেই নারীকে গিয়ে বলে এক মুহূর্তের জন্য তার আবরণ উন্মোচন করতে, শুধুমাত্র সেই আশ্চর্য শুভ্রতা পরিপূর্ণভাবে একবার দেখতে চায় সে, আঁকতে চায় সেই শুভ্র সৌন্দর্যকে। কিন্তু সাহস করে তা আর বলাই হয়ে উঠল না।বহুদিন পর সেই নারীর সঙ্গে যখন জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে এক বিয়ের উৎসবে হঠাৎ দেখা, তখন সৌজন্যের কিছু কথাবার্তা আদানপ্রদানের পর সে ভাবল, আজ তো আর কোনও বাধা নেই, তার একদিনের সেই তীব্র আকাঙ্ক্ষার কথা আজ তো সে বলেই দিতে পারে। কিন্তু না, তার মনে হল আজ আর সে কথা বলা যায় না। আজ সে কথা অশ্লীল শোনাবে। কিন্তু সেদিন তা অশ্লীল ছিল না।’’

মুগ্ধ হয়ে শোনে শৈলেশ্বর। এসব গল্প সে কবে লিখেছিল আজ আর নিজেরই সব মনে নেই। এই নারী সবকিছু মনে রেখে দিয়েছে? অদ্ভুত ব্যাপার তো! শুভ্রতা হেসে বলে, ‘‘আপনার অন্য গল্পগুলির তুলনায় এই গল্পটা হয়তো একটু কাঁচা, কিন্তু অল্পবয়সে গল্পটা পড়ে খুব কেঁদেছিলাম, মনে আছে।’’ শৈলেশ্বর তীব্র গলায় বলে, ‘‘কেন? কাঁচা কেন? একজন পুরুষের এরকম মনে হতে পারে না বুঝি? আপনি একজন পুরুষের মনের খোঁজ কতটুকু রাখেন?’’

‘‘রাখব না কেন? আসলে আপনার গল্পের নায়কের সাহস বড্ড কম। একবার বলে দেখলেই পারত কী জবাব দেয় সেই নারী! হয়তো দেখা যেত পুরুষটির তুলনায় নারীটি অনেক বেশি সাহসী।এমনও তো হতে পারে যে তার সারাজীবন হয়তো কেটেছে এই ব্যর্থতা বোধে…যে এত অতুল রূপ শরীরে বয়ে বেড়ানো সত্ত্বেও তার ভিতরের রূপটাকে ছুঁতে পারার মতো পুরুষকে সারাজীবনে সে খুঁজেই পেল না। হয়তো সে আজও খুঁজে বেড়াচ্ছে এমন একজন কাউকে। আপনার গল্পটা তো এরকমও হতে পারত।’’ একটু হেসে তারপর বলে শুভ্রতা, ‘‘গল্পের নায়কের সাহস কম থাকতে পারে, কিন্তু গল্পের লেখকের? নায়ককে তো সৃষ্টি করে সে-ই। সেও নায়কের মতো ভিতু নাকি?’’ বুকের মধ্যে হাতুড়ির ঘা পড়ছিল শৈলেশ্বরের। যেমন ঘা পড়ত তিরিশ বছর আগে। এ অনুভূতির কথা সে ভুলেই গেছিল একরকম। বয়স তার তিরিশ বছর কমে গেল নাকি? হঠাৎ যেন কীসের ভূত চাপে শৈলেশ্বরের মাথায়। সোফা থেকে উঠে আস্তে আস্তে খাটের দিকে এগিয়ে যায় সে। হাঁটু গেড়ে বসে শুভ্রতার পায়ের কাছে। ঝুঁকে পড়ে তার খোলা পায়ের পাতায় আস্তে আস্তে হাত বুলোতে থাকে। শুভ্রতা এক লহমা শিউরে ওঠে, কিন্তু আত্মরক্ষার জন্য বিন্দুমাত্র উদ্যোগ নেয় না। দু’পা ছড়ানোই থাকে সামনে, শাড়ি দিয়ে তা ঢাকারও চেষ্টা করে না। তার দু’পায়ের অপরূপ শুভ্র লাবণ্য যেন চামচ দিয়ে মাখন তোলার মতো আস্তে আস্তে তুলে নিতে চাইছিল শৈলেশ্বর। কিন্তু শরীরের লাবণ্য থাকলেও, লাবণ্যের তো আর শরীর থাকে না। হতাশ হয়ে শেষে সেই লাবণ্যসাগর অগস্ত্যের মতো গণ্ডূষে পান করবে বলেই যেন নিচু হয়ে মুখ ডুবিয়ে দিতে চায় শৈলেশ্বর ওই দুই পায়ে। তারপর পায়ের পাতায় ঠোঁট চেপে ধরে দীর্ঘ চুম্বন করতে থাকে, যেন এভাবেই এই নারীর সমস্ত শুভ্রতা, সমস্ত প্রাণরস নিঃশেষ পান করে নেবে। একতিলও নড়ে না শুভ্রতা। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকে এক অদ্ভুত হাসি।তা বিজয়িনীর হাসি নাকি করুণার হাসি বোঝা যায় না। উন্মাদের মতো সেই মর্মরমূর্তির পায়ে মুখ ঘষতেই থাকে শৈলেশ্বর। রুপোর নূপূরের ধারালো কোণে ঘষা লেগে মুখের কয়েক জায়গায় কেটে গিয়ে রক্তক্ষরণ হতে থাকে তার। সেটা দেখে খুব আস্তে করে পা সরিয়ে নেয় শুভ্রতা। কেউ কোনও কথা বলছে না। সমস্ত চরাচরে যেন এমন এক পবিত্র শুদ্ধতা বিরাজ করছে, কোনও শব্দ উচ্চারণ করে যা ভেঙে ফেলার মতো পাপ বোধহয় আর হয় না।দীর্ঘ সময় নীরবতার মধ্যেই কেটে গেল।

রাতের খাওয়া শেষ করে নিঃশব্দে যে হোটেলে রাতে থাকার কথা ছিল সেখানে চলে গেল শৈলেশ্বর। পরদিন সকালে যখন শুভ্রতার কাছ থেকে বিদায় নিতে এল সে, শুভ্রতা খুব নরম গলায় বলল, ‘‘চোখ লাল কেন শৈলেশ্বরবাবু? সারারাত ঘুম হয়নি বুঝি? কোনও লেখার কথা ভাবছিলেন, তাই না? মৃত্যুর কথা আর ভাবছিলেন না নিশ্চয়ই।’’ এ কথার কোনও জবাব দেয় না শৈলেশ্বর। কাল সারাটা রাত কী তুমুল ঘোরের মধ্যে দিয়ে যে কেটেছে তার, তা কীভাবে সে বোঝাবে কাউকে? মস্তিষ্কের যে কোষগুলি শূন্য হয়ে গেছিল, সেখানে নানা অস্পষ্ট এলোমেলো চিন্তা যেন প্রেতের মতো ছায়া ফেলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তাদের নিঃশব্দ চিৎকার যেন শুনতে পাচ্ছিল শৈলেশ্বর। তারা রূপ চায়, আকার চায়, সেই নিটোল শুভ্র পায়ের মতো স্পষ্ট কোনও এক অবয়ব চায়। এ ছাড়া আর সবকিছুই যেন ধূসর, তাৎপর্যহীন। মৃত্যুর ভাবনা ভাবার মতো সময়ও যেন নেই তার। এ তো তার সেই যৌবনের রোগ, যা তাকে ছেড়ে চলে গেছিল কবেই। তিরিশ বছর পর তার হারিয়ে যাওয়া যৌবন আবার ফিরে এল নাকি তার কাছে? বস্তুত তা তাকে ফিরিয়ে দিল এই নারীই! আর যদি কখনও কোনও গল্প সে সত্যি লিখতে পারে, তা হলে ওই নারীই কি হবে না তার স্রষ্টা?

নমস্কার করে শৈলেশ্বর বলে, ‘‘ফিরে গিয়ে একটা গল্প লিখব আমি, পাঠিয়ে দেব আপনাকে।’’

‘‘সত্যিই লিখবেন তো?’’

হঠাৎ এমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে শুভ্রতার মুখ, যেন মনে হয় গল্পটা আসলে সে-ই লিখছে। মৃদু হেসে বলে, ‘‘থাক শৈলেশ্বরবাবু, ও লেখা আমাকে আর পাঠাতে হবে না। আমি জানব ওটা আসলে আমারই লেখা। এতদিন আপনার সব লেখা তো আমার নিজের লেখা ভেবেই পড়েছি। আপনি আর লিখছেন না, অর্থাৎ আমার নিজের লেখা বন্ধ হয়ে গেল ভেবে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল।’’ বুকের মধ্যে ধক করে উঠল শৈলেশ্বরের। কাল রাতে এই নারীর আশ্চর্য ব্যবহার কি ছিল শুধু তাকে দিয়ে আবার লেখাবার প্ররোচনা মাত্র? তার ভিতরে নতুন করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে দেওয়ার জন্য? কৃতজ্ঞতায় চোখে প্রায় জল এসে যাচ্ছিল শৈলেশ্বরের। মনে মনে সে বলল, ‘কে এই নারী? এর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা আসলে ঠিক কী?’’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে শ্যামল গুপ্ত বলল, ‘‘এই হল আমার বন্ধু শৈলেশ্বরের কাহিনি। এককালে বানিয়ে বানিয়ে নিখুঁত, একেবারে শিল্পসম্মত গল্প বানানোর অপরিসীম দক্ষতা ছিল শৈলেশ্বরের। কিন্তু এখন আর তেমন পারে না। নানারকম ফাঁকফোকর থেকে যায় গল্পে। যেমন এই যে গল্পটা সে আমায় বলেছিল, এর নারী চরিত্রটি মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। অন্যের লেখাকে কেউ নিজের লেখা ভেবে এভাবে আনন্দ পেতে পারে? তা ছাড়া কোনও পাঠিকা শুধুমাত্র লেখার জন্য একজন লেখককে এভাবে উজ্জীবিত করতে পারে? শৈলেশ্বরের কাছে আমি এই সংশয় প্রকাশ করাতে সে কেমন কাতর চোখ তুলে বলেছিল, ‘মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তো কতরকমেরই হতে পারে।’ আমি শৈলেশ্বরকে বললাম, ‘বেশ তো, এই সম্পর্ক নিয়েই তুমি আর একটা গল্প লেখো না কেন? এমনিতে যা অবিশ্বাস্য বা একদম অসম্ভব মনে হচ্ছে, তোমার শিল্পের স্পর্শে তা একেবারে স্বাভাবিক সত্য হয়ে উঠতে পারে কি না দেখি।’ শৈলেশ্বর বলেছিল, ‘লিখব, আমি এ গল্পটাই লিখব।’’ আমি শ্যামল গুপ্তকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘তোমার বন্ধু লিখেছিল সে গল্প?’’ শ্যামল গুপ্ত বলল, ‘‘জানি না, শেষবার যখন দেখা হল তার সঙ্গে বছর খানেক আগে, তখন বলেছিলাম, ‘শৈলেশ্বর, লেখা হল তোমার সেই গল্প?’ শৈলেশ্বর এ প্রশ্নে হঠাৎ যেন স্বপ্ন দেখে জেগে ওঠা মানুষের গলায় বলেছিল, ‘লিখব, লিখতে তো আমাকে হবেই। এই মৃত্যু আমাকে পেরতেই হবে।’

‘আর কবে লিখবে শৈলেশ্বর?’

‘এবার লেখা হয়ে যাবে। মনে হয় দু’জনের মধ্যে সম্পর্কের রহস্যটা প্রায় ধরে ফেলেছি।’’

জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘তারপর আর দেখা হয়নি শৈলেশ্বরের সঙ্গে?’’ শ্যামল গুপ্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘‘না, গত মার্চে যখন খোঁজ নিলাম, শুনলাম কঠিন রোগে আক্রান্ত। সে তখন মৃত্যুশয্যায়। সে আজও বেঁচে আছে কি না জানি না। জানি না সে গল্প তার শেষ পর্যন্ত লেখা হয়েছে কি না। নাকি মৃত্যুই জিতে গেল শেষ অবধি!’’

.

কৃতজ্ঞতা সানন্দা

 

 

 

.

 

 

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত