| 18 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

গোঁসাইবাড়ির বীথিলতা

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

বাড়িটা খুব সহজেই খুঁজে পেলো পরাগ। এত সহজে পেয়ে যাবে, তা ওর কল্পনাতেও ছিলনা। বাড়ির সামনে লোহার একটি ছোটখাটো গেট। যাকে ঠিক সদর দরজা বলা যায় না। লোহার হুরকা তুলে দরজা ঠেলতেই ক্যাঁক ক্যাঁক করে আওয়াজ হলো।

বাড়ির ভিতরে পা রাখলো পরাগ। ভিতরটা  শুনশান। উঠানে কিছু মরা পাতা এদিকওদিক ছড়িয়ে আছে। অপরিচিত এই বাড়িতে ঢুকতেই দ্বিধা-সংকোচ পরাগকে বেশ ভাল করেই আঁকরে ধরে। সেই সংকোচ থেকে মুক্ত হতে আর নিজের উপস্থিতির জানান দিতে পরাগ গলা খ্যাঁকানি দেয় শব্দ করে। নীরব বাড়িতে সেই শব্দ দিকভ্রান্তের মতো এদিকওদিক ঘুরে বেড়ায়, কোনো লক্ষ্য না পেয়ে। 

পরাগ বাড়িটার চারপাশ লক্ষ্য করে। নতুন দোতলা বাড়ির সাথে চারদিকে পুরানো টিনের বেড়া খুব বেমানান লাগছে। টিয়ে সবুজ রঙের গ্রিলে ঘেরা বারান্দা। সেখানে কিছু রাবারের স্যান্ডেল ছড়ানো। তা থেকে বোঝা যায় ভিতরে মানুষ রয়েছে। তবুও অদ্ভুত নিস্তব্ধতার ঘোরটপে বন্দী বাড়িটা।  

পরাগ এগিয়ে যায় সেই টিয়ে রঙের গ্রিলে ঘেরা বারান্দার দিকে। এ বাড়ির বাতাসে ততক্ষণে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে সে। নিস্তব্ধতার সাথে তাল মিলিয়ে যথাসম্ভব মধ্যম স্বরে পরাগ বলে, তালেব আলী আছেন? এটা কি তালেব আলীর বাড়ি?

প্রত্যুত্তরে বাড়িটার ভিতর থেকে একটি বাচ্চার কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো।

কান্না জীবনের অস্তিত্ব ঘোষণা করে, এতো স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম। তাই অবসন্ন এই সময়টাতে প্রাণচাঞ্চল্য খেলে যাবে, তা ভেবেই পরাগ একটু নড়েচড়ে দাঁড়ালো।  ধরে থাকা লাগেজের হাতবদল করলো। মাথার চুলে আঙুল বুলালো। একটু নেমে আসা সানগ্লাসটা ঠেলেঠুলে ঠিকঠাক বসিয়ে দিলো।

না, আজ কিছুই যেন নিয়মের তোয়াক্কা করছে না। সবকিছু ব্যত্যয় ঘটাতেই ব্যস্ত।  ঘর থেকে কেউ বেরিয়ে এলো না। নিজেকে পরিপাটি করে উপস্থাপন করার সব আয়োজন ভেস্তে গেলো পরাগের। গ্রিলের বারান্দার দরজাটা ভেজানোই থাকলো। 

বাচ্চাটার কান্না থেমে গিয়েছে এরমধ্যেই। সময়টা আবার থিতিয়ে পড়লো। শুধু একটি মরাপাতা অসাবধানতায় পরাগের পায়ের নিচে পড়ে মরমর শব্দে সময়টাকে কাঁপিয়ে তুললো।

পরাগ ভাবলো ফিরে যাবে। অপরিচিত এই বাড়ি থেকে  পরিচিত মানুষটির হারিয়ে যাওয়া কোনো সত্য খুঁজে পাওয়া যাবে না, এই বিশ্বাস শক্ত ভিত গাড়লো পরাগের মনে।

ঘুরে দাঁড়ালো পরাগ। তবে পা’দুটো এগোলো না। ঝিমিয়ে পড়া সময়ের সাথে সেও একটু জিরিয়ে নিতে চাইলো।

লোহার গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকেই অপরিচিত মানুষকে দেখে একটু থমকে গেলো রত্না। সামনে দাঁড়িয়ে পঁচিশ/ছাব্বিশ বয়সের একজন সৌম যুবক। পোশাকআশাকেও বেশ কেতাদুরস্ত। একে আগে কখনো দেখেনি, তা নিশ্চিত রত্না। 

রত্নাকে দেখেই পরাগ ছেড়ে দেওয়া হালটা আবার শক্ত করে ধরলো। যথাসম্ভব ভদ্রতার সাথে বললো–এটা তালেব আলী’র বাড়ি?

প্রত্যুত্তর এলো না। পালটা প্রশ্ন এলো। গ্রিলের বারান্দায় তাজুল এসে দাঁড়িয়েছে। বললো ‘আপনি কে?’ 

জং ধরা টিনের বাক্সটা পড়েছিলো ঘরের কোণে। তা থেকে পাওয়া পোস্টকার্ডের লেখাগুলো আবছা হয়ে এসেছিল। অপরিপক্ব হাতের লেখার জন্য বক্তব্যও খুব অস্পষ্ট ছিল। হঠাৎ উদয় হওয়া এক রহস্য ব্যবচ্ছেদের জন্য আর অন্য কোনো ক্লু ছিল না পরাগের কাছে। চিঠিটা ছাড়া। চিঠিটা এরকম।

মান্যবরেষু বড় বাবু,

পত্রের শুরুতেই আমার আদাব জানিবেন। শ্রেণীমতো বড়দের আদাব  এবং ছোটদের আমার স্নেহ জানাইবেন। আপনারা কেমন আছেন? পর সমাচার এই যে, মেজো বৌ-এর আটচালা ঘরটিতে নতুন এক পরিবার বসত গড়িয়াছে। সৈয়দ সাহেবের মেয়ের পরিবার। দেশে এবার আমের ফলন খুব ভাল হইয়াছে। চৌধুরিবাড়ির সকল আম উহারা নিজেরাই ভোগ করছে। বাড়ির সামনের ভিটায় একখান দোচালা ঘরও তুলিয়াছে তাহারা। এদতসত্বেও আমরা সকলেই আশাবাদী, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হইবে। চৌধুরীবাড়ির মেজবৌ স্বসম্মানে তাহার নিজের বাড়ি ফিরে আসবেন। পত্রপাঠ মাত্র আপনাদের খবর জানাইবেন।

                                       ইতি

                              তালেব আলী

বি: দ্র: মেজো বৌ কোনো গুনাহ্ করেন নাই। উনি অদ্যাবধি হিন্দু বিধবাই আছেন। তাহাকে যোগ্য সম্মান দিবেন।

পিসি ঠাকুমার ঘরের এককোণে পড়ে থাকা বাক্সটির নির্জন অস্তিত্ব অধিকাংশ সময় অবহেলিতই ছিল। সবসময় বন্ধ পড়ে থাকা বাক্সটি শুধু বিশেষ দিনে তার অবস্থান প্রকট করতো। মরচে পড়া ক্ষুদে তালাবন্ধ ডালাটি যখন ধীরে ধীরে পিসি ঠাকুমা খুলতেন তখন  সকলের উৎসাহ হয়তো অতোটা আহামরি হতো না, যদি না সেই সময় ঘরে সবার অবস্থান নিষিদ্ধ না হতো। সকলকে সরিয়ে নির্জন ঘরে বাক্স খুলতেন পিসি ঠাকুমা। তবে সেই নির্জনতাটুকুর জন্য বুড়িটাকে কটু কথাও শুনতে হয়েছে খুব।

সারাবছর যে বাক্স ঘরের এককোণে সবার অলক্ষ্যে পড়ে থাকে তার মধ্যে নিশ্চয় লুকিয়ে আছে কোনো মূল্যবান সম্পদ। এজন্যই তা খোলা নিয়ে এত রাখঢাক। 

পিসি ঠাকুমা বেঁচে ছিলেন এর ওর দয়ায়। শত দূরাবস্থাতেও সেই বাক্সে হাত দিতেন না। আর এজন্যই এ বাড়ির সকলেই ছিল যারপরনাই বিরক্ত। তাই বিশেষ দিনে পিসি ঠাকুমা ঘরের দরজা বন্ধ করে বাক্স খুলতেই সে বাড়ির কেউ যে লোভী নয় তা বোঝাতে উঁচু গলায় শুরু হয়ে যেত নিজেদের বড় মনের গুণগান। 

তবে, বড় মনের গালভরা গল্প যতই থাকুক না কেনো ওই বাক্সটার প্রতি সবারই আগ্রহ ছিল অদম্য। নেহাতই মধ্যবিত্ত নীতিবোধ সেই আগ্রহ দমিয়ে রাখতো। 

অবশেষে সুযোগ এলো। সবার আগ্রহ জাগানো সেই বাক্স খুলে দেখার দিন এলো। প্রায় নব্বই বছর বয়সে পিসি ঠাকুমা তার টিনের বাক্সের মায়া ত্যাগ করলেন। 

আদতেই টিনের বাক্সের মায়াই তিনি ত্যাগ করলেন। সত্যি বলতে পরাগদের বাড়ি বা বাড়ির মানুষগুলোর সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল আশ্রয়দাতা আর আশ্রিতার। তাই সেখানে মায়ার খুব একটা বসত ছিল না। 

পরাগের দাদুর একমাত্র বোন ছিলেন পিসি ঠাকুমা। পরাগ বুদ্ধি হওয়া অবধি তাঁকে দেখেছে। দাদু যতদিন বেঁচে ছিলেন পিসি ঠাকুমা অল্পবিস্তর সমীহ পেতেন। এরপর থেকে সকলে নিতান্তই দায়ে পড়ে একখান থাকার ঘর আর তিনবেলার খাবার দিয়েছিলো। পিসি ঠাকুমা মরে যাওয়াতে তাই পরাগদের বাড়ি সেইঅর্থে শোকের বাড়িও হয়ে উঠতে পারেনি। 

সেদিন বাক্সটা পরাগই খুলেছিলো। শ্মশানের কাজ শেষ করে এসে। পিসি ঠাকুমার ক্ষয়ে যাওয়া শরীরের মতোই বাক্সটিও ছিল ঝুরঝুরে। শতছিদ্রের ঢাকনা যথাসম্ভব বাক্সটার সম্ভ্রম লুকালেও ভিতরে তেলাপোকার অবাধ যাতায়াত আটকাতে পারেনি। পরাগ এক এক করে বের করে আনছিলো ফুলতোলা লালচে হয়ে আসা সাদা চাদর, দুই তিনটি আনকোরা  সাদা থান, একটি উলের চাদর আর একটি কাসার ঘটি। ভেতর থেকে তেমন কোনো মূল্যবান জিনিষ বের হতে না দেখে সবাই হতাশ হয়ে পড়েছিল। তখনই পরাগ বের করে আনলো একটি বোরখা, আরবী শব্দ লেখা একটি তাবিজ আর লাল পাথরের নাকফুল। পুরো বাক্স জুড়ে ঠাসাঠাসি করে থাকা এত জিনিষের মধ্যে এই তিনটি জিনিষই মুখ্য হয়ে উঠলো। নির্লিপ্ত জিনিষ তিনটি নিমেষেই এ বাড়ির নিস্পৃহ মানুষগুলোর মগজে আগুন ধরিয়ে দিলো দাউদাউ।  

হিন্দু বিধবার বাক্সে সোনাদানা বা ঠাকুরদেবতা নয়, পাওয়া গেলো একটি বোরখা, তাবিজ আর নাকফুল। অস্পৃশ্য এই জিনিষগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ বাড়ি থেকে সরিয়ে ফেলা উচিত। পাড়ায় এ বাড়ির লোকজন সজ্জন হিসেবে পরিচিত ও সম্মানিত। অনাহুত বুড়ির জন্য কেউ দুর্নামের ভাগী হতে রাজী নয়।

বাড়ির সবার একই কথা, এসব আপদ দূর করো। সকলের অজান্তে জিনিষগুলোকে অনেক দূরে ফেলে আসা হোক। 

পরাগ রাজীও হয়েছিলো তা ফেলতে। পাটে পাটে ভাঁজ করে রাখা বোরখাটা দুমড়ে মুচড়ে ভরতে গেলো বাক্সে।  তখনই বোরখার গোপন পকেট থেকে বেরিয়ে এলো একটি পোস্টকার্ড। একটি চিঠি। সেই চিঠিটি। 

দেশভাগের পর পিসি ঠাকুমা পরাগদের বাড়িতে চলে গিয়েছে। তাঁর নিজের বাড়ি অন্যকেউ দখল করেছে। এ অবধি ঠিক ছিল। কিন্তু ‘অদ্যাবধি হিন্দু বিধবাই আছেন’ এই বাক্যটিই একটা রহস্যের সন্ধান দেয়। সেই রহস্যের কিনারা করতেই পরাগ আজ এ বাড়িতে। 

রত্না এগিয়ে এলো যুবকটার দিকে। জানতে চায় ‘কোথা থেকে এসেছেন?’ পরাগ নিজের বৃত্তান্ত জানাবার আগে ঠিক জায়গাতে এসেছে কিনা নিশ্চিত হতে চায় ‘এটা তালেব আলী’র বাড়ি তো?’ গ্রিলের বারান্দা থেকে তাজুল নেমে এসেছে। ‘ আপনাকে আগে কখনো দেখিনি।’ হ্যাংলা লিকলিকে সদ্য গোঁফ গজানো কিশোর  তাজুলের কৌতুহল স্তিমিত না করে পরাগ রত্না’র সাথে কথোপকথনে আগ্রহী হয়। চল্লিশোর্ধ মহিলাটির মধ্যে ‘মা’ ‘মা’ ভাব আছে। চেহারাও বেশ বুদ্ধিদীপ্ত। পরাগ তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,’আমি তালেব আলী’র সাথে দেখা করতে এসেছি। এটা কি তাঁর বাড়ি?’ 

‘আপনি ভিতরে আসুন’—-রত্না লম্বা পা ফেলে বারান্দায় ওঠে। 

‘উঠে আসুন’ পরাগকে বারান্দায় রাখা চেয়ারে বসতে দেয় রত্না। পরাগ বসেই উসখুস করতে থাকে। যে মানুষটির জন্য এখানে আসা তাকে এখনো দেখতে পেলো না। ঠিক বাড়িতে এসেছে কিনা তা নিয়েও সংশয়ে পড়ে গেলো। একটু অধৈর্য্য হয়ে জানতে চায়, তালেব আলীর বাড়িই তো এটা? 

তাজুল এবার কথা বলার দায়িত্ব নেয়। ‘ আপনি কিভাবে চেনেন তাঁকে?’ পরাগ একটু হেসে বলে,’ তাঁকে আমি চিনি না। তবে পরিচয় পেলে তিনি আমাকে চিনবেন আশা করছি।’ পরাগের কথা বলার ঢঙে তাজুল ততক্ষণে বুঝে ফেলেছে সে এদেশীয় নয়। ‘আপনি কলকাতা থেকে এসেছেন?’ পরাগ মাথা দু’পাশে ঝাঁকিয়ে বলে—কলকাতা নয় অশোকনগর, চব্বিশ পরগণা। 

এ বাড়ি থেকে কতদূর হতে পারে পিসি ঠাকুমার নিজের বাড়ি? 

দাদু এখানে প্রায়ই আসতেন। এ অঞ্চলে চৌধুরীবাড়ির খুব নামডাক ছিল। দাদু প্রায়ই গল্প করতেন পরাগের কাছে। আশ্রিত বোনটার সোনালি অতীতের গল্প বলে, দাদু সে বাড়িতে পিসি ঠাকুমার সম্মানের জায়গাটা বারবার পোক্ত করার চেষ্টা করতেন। বলতেন, তারক খুব  বড় বাড়ির বউ, এই ছোট বাড়িতে ও সারাজীবন থাকবো না। দ্যাশের অবস্থা বদলালে ফিইরা যাইবো ও। দাদুর বিশ্বাস ছিল দেশ আবার আগের মতো হয়ে যাবে। আর তারেকশ্বরী ওরফে তারক ওরফে পিসিঠাকুমা ফিরে যাবে তাঁর নিজের ঘরে।

এ বাড়ির গায়ে গা লাগানোই একটি বড়সড় বাড়ি। হতে পারে ওটাই ছিল একসময় চৌধুরীবাড়ি। রত্নার বাড়িয়ে দেওয়া জলের গ্লাস হাতে নিয়ে পরাগ জিজ্ঞাসা করে—- চৌধুরীবাড়ি টা কোনদিকে ছিলো, জানেন কিছু? রত্না জানে না। চৌধুরীবাড়ি নামে এলাকায় কোনো বাড়ি ছিল না। 

না,চৌধুরীবাড়ি ছিল। দাদুর মুখে কত গল্প শুনেছে সে বাড়ির। প্রতিবেলা সে বাড়িতে পাত পেড়ে কতশত মানুষ খেতো। একচালার প্রতিমায় আশ্বিনে দূর্গাপূজা হতো। আর লক্ষ্মীপুজায় আশেপাশের গ্রাম থেকে মানুষ আসতো নাড়ু-মোয়া খেতে। 

গল্প শুধু দাদু নয়, পিসি ঠাকুমাও করতেন। গোঁসাইবাড়ির গল্প। এক যুবকের গল্প। বীথিলতার গল্প।

গোঁসাইবাড়ি, নোয়াখালি।

১০ই অক্টোবর; ১৯৪৬।

কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা। গোঁসাইবাড়ি অঞ্চলে লক্ষ্মীপূজাতে খুব আয়োজন হয়। চল্লিশ জোড়া নারিকেলের নারু বীথিলতা একা হাতেই বানিয়েছে আজ। এই ‘বীথিলতা’ নামটি অবশ্য তাঁর এ বাড়িতে এসেই পাওয়া। লক্ষ্মীপ্রতিমার মতো মুখ দেখে শ্বশুরমশাই দুইটি সোনার মোহর দিয়ে ডেকেছিলেন ‘বীথিলতা’ নামে। নামটা আপন হয়ে গেলেও সুখ সেভাবে আপন হয়নি তার। 

অল্পবয়সী বিধবা সে। সংসারের সব কাজে হাত লাগানোর অনুমতি নেই। শুধু ঠাকুর-দেবতার কাজে তার একচ্ছত্র অধিকার।

বীথিলতা  লক্ষ্মী পূজার জন্য নারিকেল পাক দিতে ব্যস্ত। বারবেলা চলে এসেছে। শহরের একপ্রান্তে দিয়ারা শরীফে জড় হচ্ছে একদল মানুষ। গোলাম সারোয়ার হুসেনি সেই মানুষগুলোর কাছে খুব মান্যবর।  তিনি দিয়ারা শরীফে জড় হওয়া সবাইকে আদেশ দিলো যারা দিয়ারা শরীফের পাক-পবিত্রতা নষ্ট করতে চায় তাদেরকে আক্রমণ করতে হবে। বুঝিয়ে দিতে হবে আল্লাহ্‌র ঘর অপবিত্র করার অধিকার তাদের নেই। 

বীথিলতার নারু, মোয়া বানাতে দিন প্রায় শেষ হয়ে আসে। পাশের পুকুর থেকে স্নান সেরে তিনি সন্ধ্যাবাতি জ্বালালেন।  আলোয় ভরে ওঠে বীথিলতার শ্বশুরবাড়ি। একই সাথে আকাশে উঠলো কোজাগরীর চাঁদ।

সেই চাঁদের আলোয় পথ দেখে কাশেম ফৌজ এগিয়ে চলে সুরেন্দ্র বসুর জামিনদার অফিসের দিকে। সেই ফৌজের মধ্যে একজন যুবক হুসেনির আদেশ পালনে সবচেয়ে অগ্রগামী। দিয়ারা শরীফের শত্রুদের ঔদ্ধত্যের জবাব দিতে হবে। একের পর এক আক্রমণ করছে সে।

গোঁসাইবাড়ির বীথিলতার শ্বশুরবাড়িতে তখন লক্ষ্মীপূজা শুরু হয়ে গেছে। বীথিলতা পঞ্চপ্রদীপের সলতেটা বাড়িয়ে দেয়। আগুনের তেজ বাড়ে। ঠাকুরমশায় ঘন্টায় হাত দিতেই পুরো বাড়ি কেঁপে ওঠে উলুধ্বনিতে। 

কাশেম ফৌজ ততক্ষণে গোঁসাইবাড়ি অঞ্চলে চলে এসেছে। এ অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী শত্রুকে উচিত সাজা দিতে হবে। তবেই সবাই শিক্ষা পাবে। দিয়ারা শরীফের দিকে কেউ অশ্রদ্ধায় তাকানোর সাহস পাবে না। 

কাশেম ফৌজের লক্ষ্য বীথিলতার শ্বশুরবাড়ি। তাঁতঘরে আগুন লাগানো হয় সবার আগে। ষাটখানা তাঁত একসাথে পুড়তে থাকে। সেই তাঁতের সাথে পুড়তে থাকে বাড়ির বড় আর সেজো বাবু। অত:পর লক্ষ্য ভিতর বাড়ি।

বীথিলতা মন্দিরের দরজা লাগিয়ে দেয় ভিতরে থেকে। সেখানে এ বাড়ির অনান্য মেয়েদের নিয়ে লুকিয়ে বাঁচতে চায়। ওরা যাই হোক ভগবানের ঘরে আঘাত করবে না। 

বীথিলতার সে ভাবনা ভুল প্রমাণিত হলো। মন্দিরের দরজায় করাঘাত নয়, আঘাত শুরু হলো। দুমদাম শব্দে ঢাকা পড়ে গেলো ভিতরের প্রতিটি নারীর আর্তচিৎকারে।  

কাশেম ফৌজের সবচেয়ে করিৎকর্মা আর উৎসাহী যুবকটি দায়িত্ব পায় মন্দিরের গায়ে ‘আল্লাহু আকবর’ লেখার। 

এরপরেই মন্দিরের দরজা ভেঙে ভিতর থেকে সবাইকে বের করে উঠোনে আনা হয়। বাড়ি ততক্ষণে পুরুষশূন্য হয়ে গেছে। কেউ পালিয়েছে। কেউ তলোয়ারের কোপে পড়েছে। আর তাঁতঘরে কেউ জ্যান্ত পুড়েছে। 

উঠোনে দাঁড়ানো অন্য মেয়েদের সাথে ভয়ে কাঁপছে বীথিলতা। কাঁপতে কাঁপতে তাঁর মুখের ঘোমটা সরে যায়। কোজাগরী চাঁদের আলোয় বীথিলতা সেসময় আরোও লাস্যময়ী হয়ে ওঠে। সেদিকে দেখে যুবকটির হাতের তলোয়ার খসে পড়ে। এমন লক্ষ্মী প্রতিমার মতো মুখটি তার আজীবন কাছে রাখার সাধ জাগে। বীথিলতাকে নিজের বিবি করতে চায় যুবকটি। 

অবিকল লক্ষ্মীমূর্তির মতো দেখতে বীথিলতা। যুবকটি কাশেম আলী’র কাছে এই লক্ষ্মীপ্রতিমাকে ধর্মান্তরিত করার  আর্জি জানায়। কাশেম আলি সেই আর্জিতে সম্মতি দেয়। বীথিলতাকে তুলে দেওয়া হয় যুবকটির হাতে। 

বাল্যবিধবা বীথিলতা ভয়ে, আতংকে বিহ্বল হয়ে চললো যুবকটির পিছু পিছু। 

কোজাগরী চাঁদের আলোয় ভাসছে সে রাত। যুবকটি বীথিলতার থরথর হাত ধরে বললো,’ আপনি আমার বিবি হবেন। আপনার কোনো ভয় নেই।’

বীথিলতা কিছু উত্তর দেয় না। শুধু নিঃশব্দে চোখের জল ফেলে। যুবকটি মিনতি করে,’ভয় নেই। কান্না বন্ধ করুন। আপনার কোনো কষ্ট হবে না।’ 

বীথিলতার শরীর এবার দুলে দুলে ওঠে। কান্নার বেগ বাড়ে। যুবকের কষ্ট হয়। বীথিলতার গালের উপর জমে থাকা জলের দাগ মুছে দিতে ইচ্ছে হয়—‘আপনি আমার কাছে না থাকলে কাশেম ফৌজের অন্য কেউ আপনাকে নিয়ে যাবে। আপনার অসম্মান করবে। আমি আপনাকে সম্মান দিবো। বিবি বানিয়ে রাখবো।’ 

আচমকা বীথিলতার কান্না থেমে যায়। যুবকের  কাছে এগিয়ে আসে—‘ আমাকে মেরে ফেলুন। না হয় দাদার কাছে পাঠিয়ে দিন।’

যুবকটি বিরক্ত হয়। আশাহত হয়। একটু তেজের সাথে বলে ‘যদি না পাঠাই?’

‘আমি গায়ে আগুন দিবো’—–আঁচলের তলায় লুকিয়ে আনা ছোট্ট পিতলের লক্ষ্মীমূর্তির সামনে বসা  বীথিলতা। কুপির আলোয় তাকেও লক্ষ্মীদেবী মনে হয়।

১৪ই অক্টোবর ১৯৪৬, সন্ধ্যায় বীথিলতাকে একটি নাকফুল পড়িয়ে নিকাহ করে যুবকটি। 

পরেরদিন ভোরে পদ্মফুলের নকশা করা একটি টিনের বাক্স, সেই যুবক আর  কালো বোরখা পড়ে বীথিলতা সন্দীপে যায়। সেখানে যুবকের বড় বুবুজান থাকে। নতুন বিবিকে নিয়ে যুবকের প্রথম সফর। 

মধুখাল পাড় হয়ে কালো কাপড়ে ঢাকা গরুর গাড়িতে ওঠে সেই যুবক আর তার নতুন বিবি। মুখের নেকাব সরায় বীথিলতা। নাকফুলের লাল পাথর থেকে আলো ঠিকরে পড়ছে তার চোখেমুখে। যুবকটি নতুন বিবির দিক থেকে চোখ সরিয়ে নেয়।

লম্বা সে পথে কোনো কথা হয় না দু’জনের। শুধু বীথিলতা আড়চোখে কয়েকবার দেখে যুবকটিকে। গরুর গাড়ি থেকে নামার ঠিক আগেই নিজের গলার তাবিজখানা খুলে দেয় বীথিলতাকে, যুবকটি। তাঁর নতুন বিবির সব বালা মুসিবত দূর হোক। 

সেই সময় থেকে তাবিজটি বীথিলতার হয়ে গেলো আজীবনের জন্য।

দূর্ভাগ্য যুবকটির। মুসিবত দূর হলো না। সেই সফরেই সে তার বিবিকে হারিয়ে ফেলে। দুইদিনের কলেরায় নতুন বিবি মারা যায়। একা ফিরে আসে যুবকটি গোঁসাইবাড়ি———

এরপর  কী হলো? প্রশ্ন করলে পিসি ঠাকুমা একগাল হেসে বলতেন, গল্প তো শ্যাষ দাদুভাই। গল্পের শ্যাষে সবাই সুখে-শান্তিতেই থাকে। 

দাদুর গল্পে যতই থাকুক চৌধুরীবাড়ি, মূলত চৌধুরীবাড়ির নাম কেউ জানে না। 

রত্না কোনদিন শোনেনি চৌধুরীবাড়ির নাম। তাজুলও শোনেনি। আশা হারিয়ে ফেলে পরাগ। পিসি ঠাকুমার বোরখা আর চিঠির সেই ‘অদ্যাবধি হিন্দু বিধবাই আছেন’ রহস্য ভেদ কি আদৌ করতে পারবে? এ বাড়ির কেউ চৌধুরীবাড়ি চেনে না। পিসি ঠাকুমাকেও চিনবে না।  তবুও তালেব আলী’র যদি দেখা পাওয়া যেতো। যার জন্য এরদূর আসা তিনি কি এখনো বেঁচে আছেন?

পরাগকে পথ দেখিয়ে দোতলার একটি ঘরে নিয়ে যায় তাজুল। বলে,’ দাদাজান কিছু বলতে বা শুনতে পারেন না। বিছানায় পড়ে আছেন ছয় বছর।’ বিছানার সাথে লেপ্টে থাকা বয়স্ক লোকটার ঘোলাটে চোখ, উদভ্রান্ত চাহনী। এর কাছে পরাগ কিভাবে জানতে চাইবে চৌধুরীবাড়ি আর পিসি ঠাকুমার কথা? 

পরাগ দু’একবার চিৎকার করে বা ইশারায় এখানে আসার কারণ বলার চেষ্টা করে। নিজের পরিচয় দেবার চেষ্টা করে। লাভ হয় না। বৃদ্ধ ঘোলাটে চোখটা মুদে ফেলে। নিরাশ পরাগ। ফিরতে হবে। বৃদ্ধের কাছ থেকে কিছুই জানা যাবে না। বৃদ্ধ নিজেকেই ভুলে গেছে। কীভাবে আজ থেকে সত্তর বছর আগের কথা মনে রাখবে? তবুও লাগেজ থেকে বোরখা আর নাকফুল টা বের করে শেষ চেষ্টা করে। 

এতেও লাভ হয় না। বৃদ্ধ একবার জিনিষগুলো দেখেই ছাদের দিকে চোখ ফেরায়। সেদিকেই তাকিয়ে থাকে নিরুত্তর চোখে। রত্না শ্বশুরের চোখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা। এই বাড়িতে একমাত্র রত্নাই বুঝতে পারে মানুষটিকে, তাঁর ইশারাকে। রত্না বলে, আব্বা এই বোরখার ব্যাপারে কিছু জানেন না। 

এ বাড়ির কেউ কিছু জানে না। বা বলতে পারে না। 

আশাহত পরাগের কাছে এদেশে আসাটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে।  রহস্য উন্মোচন করতে না পারার ব্যর্থতায় নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। তাহলে কি ভূল বাড়িতে এসেছে? বা ভুল এলাকায়? পরাগ বৃদ্ধকে আরোও কিছু বোলার চেষ্টা করতে চায়। রত্না বাঁধা দেয়। বলে, উনি কিছুই জানেন না। কিছু জানলে, আমিও জানতাম। যখন সুস্থ ছিলেন তখন আমার সাথে পুরাতন সময়ের অনেক গল্প করতেন। 

নিরাশ পরাগ বিদায় নেয় বৃদ্ধ আর এ বাড়ির সকলের কাছ থেকে। সুর্য তখন পশ্চিমে যাবার তাড়া করছে। শেষ বিকেলের রোদে গাছের পাতাগুলো তিরতির করে কাঁপছে। এ দেশটাও পরাগের নিজের দেশের মতো। এই বাড়ির উঠোন, গাছ সব একইরকম।  পরাগ লোহার ছোট গেট দিয়ে বাইরে বের হয়। লাগেজটা বা’হাতে ধরে হাঁটা শুরু করে। ইট বিছানো রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে সামনের বড় রাস্তার দিকে। পিছনে চলে যেতে থাকে তালেব আলীর বাড়িটি। 

হঠাৎ পিছন থেকে ডাক—দাঁড়ান, দাঁড়ান।

পিছনে রত্না আর তাজুল। প্রায় দৌড়ে আসছে পরাগের দিকে। পরাগ ইতস্ততভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে। 

তাজুলের হাতে পিতলের ছোট্ট লক্ষ্মীমূর্তি। বিকেলের আঁচহীন রোদ ছুঁয়ে আছে মূর্তিটাকে। রত্না এগিয়ে আসে। বলে, আমার শ্বশুরআব্বা এটা আপনাকে দিতে বললেন। খুব যত্নে রেখেছিলেন এই মূর্তিটা। 

পরাগ হাত বাড়িয়ে মূর্তিটা নেয়। 

গোঁসাইবাড়ির বীথিলতা নিত্য পূজা দিতো এই মূর্তিটাকে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত