Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,poem is a little myth

কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ: মিথ ও কবিতা । সাজ্জাদ কাদির

Reading Time: 6 minutes

বাংলায় কি বলবো মিথ (myth)-কে? অভিধান বলছে – পুরাণ, পুরাকাহিনী, অতিকথা, উপকথা, উপাখ্যান, কিংবদন্তি। সঙ্গে ব্যাখ্যা করে বলছে – প্রধানত কোনও গূঢ় রহস্যের ব্যাখ্যাপূর্ণ পৌরাণিক কাহিনী। আবার বলছে ‘গূঢ় অর্থপূর্ণ কাহিনী’। অর্থাৎ তা ‘পৌরাণিক’ না-ও হতে পারে। অভিধান তো খুব বিস্তৃত করে বলে না, তাহলেও একটি অভিধানে ব্যাখ্যা পাই আরও – প্রাচীন কাল থেকে পুরুষানুক্রমে প্রবহমান কাহিনী, বিশেষত কোনও জাতির আদি ইতিহাস সম্পৃক্ত বিশ্বাস ও ধারণা এবং নৈসর্গিক ঘটনাবলীর  ব্যাখ্যা। মিথ বলতে  যে ‘কাল্পনিক, উদ্ভাবিত বা বানোয়াট ব্যক্তি বা বস্তু’কেও বোঝায় তা-ও বলছে অভিধান। তবে পুরাণ, পুরাকাহিনী, অতিকথা, উপকথা, উপাখ্যান প্রভৃতি শব্দে মিথ কথাটির ধারণাকে যেন ধরা যায় না ঠিকমতো। আমরা ‘মিথ’ শব্দটিকেই ব্যবহারের পক্ষপাতী। বহু ব্যবহারের কারণে এ শব্দ এখন সুপরিচিত। আর যেহেতু বেশির ভাগ বাংলাভাষী শব্দটির অর্থ বোঝেন তাই একে বাংলা হিসেবেই মেনে নিয়ে স্থান দিতে পারি আমাদের ভাষায়, আমাদের অভিধানে।

গ্রিক mythos থেকে উৎপন্ন মিথ শব্দটির অর্থ, সংজ্ঞা, ব্যাখ্যা নিয়ে হিমশিম অবস্থা বিশেষজ্ঞদের। সে অবস্থার হদিস নেয়া যাক একটু।

একটি ব্যাখ্যা এ রকম – মিথ মূলত ঐতিহ্যবাহী, প্রাচীন কালের কাহিনী – যাতে আছে অতিপ্রাকৃত প্রাণী, পূর্বপুরুষ বা মহাবীর ও বীরাঙ্গনা। ওই কাহিনীতে প্রকাশ পায় জগৎ ও জীবন সম্পর্কে মানুষের মৌলিক ধারণা, প্রকৃতির নানা বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা, মন-মানসিকতার স্বরূপ, রীতি নীতি প্রথা বা  সমাজের আদর্শ। প্রাক-শিক্ষিত সমাজে সত্য ঘটনা হিসেবে মেনে নেয়া তাদের পূর্বকালের অতিমানবদের কাহিনীকে বলা হয় মিথ।

কোনও ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ঘটনা সম্পর্কে গড়ে ওঠা লোকবিশ্বাস বা কাহিনীও মিথ। এ মিথ বিশেষত সাংস্কৃতিক জগতে। যেমন – নজরুল বিদ্রোহী কবি, জসীম উদ্দীন পল্লীকবি, ফররুখ আহমদ রেনেসাঁর কবি প্রভৃতি এক-একটি মিথ।

মিথ কাল্পনিক বা অর্ধসত্য কিছু – যা গড়ে তোলে কোনও ভাবাদর্শের অংশবিশেষ। যেমন – বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, মৌলিক গণতন্ত্র, উত্তরাধুনিক কবিতা প্রভৃতি।

কাল্পনিক বা অপ্রমাণিত কাহিনী, ব্যক্তি বা বস্তু-ও মিথ। যেমন – হাতিম তাই, মহাবীর হানিফা, বনলতা সেন প্রমুখ।

মিথকে দার্শনিকেরা বলেন রূপক বা প্রতীকাশ্রিত কাহিনী। সাম্প্রতিক সাহিত্য ও সাহিত্য সমালোচনায় মিথ কোনও ধারণা-আশ্রিত বিষয়বস্তু বা দৃষ্টান্তরূপী চরিত্র। যেমন – রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনদেবতা’, শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’, জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’ প্রভৃতি।

      ইংরেজিতে মিথের প্রতিশব্দ অনেক। পুরাকাহিনী অর্থে পাই – লোককথা, গল্প, ঐতিহ্য, কল্পকাহিনী, উপকথা, গাথা, রূপক, প্রতীক, রূপকথা, লোককাহিনী প্রভৃতি। আধুনিক প্রয়োগে পাই – বিভ্রম, কাহিনী, অলীক, উদ্ভট, কল্পনা, উদ্ভাবনা, মায়া, কুসংস্কার, বানোয়াট, মিথ্যা, আষাঢ়ে, গালগল্প, আজগুবি প্রভৃতি। উদাহরণ – ‘বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত হিন্দু বিধবাদের প্রতি শরৎচন্দ্রের সহমর্মিতার বিষয়টি একেবারেই মিথ, তাঁর উপন্যাসে কোনও বিধবার বিয়ে দেন নি তিনি।’ ‘মেয়েদের ব্যাপারে মিথ অনেক – তারা পেটে কথা রাখতে পারে না, তারা পতিনিন্দায় অভ্যস্ত ইত্যাদি।’ ‘প্রতিদিন একটি আপেল খেলে রোগ-ব্যাধি ধরে না – এটা একটা মিথ।’


আরো পড়ুন: আমরা খনার কন্যারা

“প্রসঙ্গ সাহিত্য ও মিথ” (কলকাতা, ২০১০) গ্রন্থের “উপাখ্যান (‘মিথ’), তার স্বরূপ ও আমরা – একটি দার্শনিক আলোচনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে দেবব্রত রেজ (১৯১৭-১০৮৬) লিখেছেন, “… মিথ বা উপাখ্যান নির্মাণ, মিথের প্রসারণ – এ সবই এক ধরনের বিশিষ্ট চিন্তার রূপ। মানবিক চিন্তার একটি স্বতন্ত্র অনন্য স্বাধীন রূপ। এই মিথ বা পুরা উপাখ্যান নির্মাণ মানুষের চৈতন্যের উদ্ভবের সঙ্গে-সঙ্গে আরম্ভ হয়েছে। আর এই নির্মাণ চলবে যত দিন মানবচৈতন্যের অস্তিত্ব থাকবে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে, ঐতিহাসিক কালে আবার সুদূর ভবিষ্যতেও এই মিথ নির্মাণ সমানভাবেই চলবে। এবং এখনও চলছে।” তাঁর মতে, মিথ নির্মাণের উপযুক্ত বলে কোনও বিশেষ যুগকে চিহ্নিত করা যুক্তিযুক্ত নয়। সব যুগইAge of Mythology. তিনি আরও লিখেছেন, “মিথ কালেকালে কালাতীত রূপে নিজেকে বারংবার সৃজন করে।”

সাম্প্রতিক সাহিত্য আলোচনায় এক প্রধান টার্ম হিসেবে মিথের গুরুত্ব প্রমাণ করে এ সত্যকেই। কানাডিয়ান সাহিত্য সমালোচক ও সাহিত্যতত্ত্ববিদ নরথর্প ফ্রাই (১৯১২-১৯৯১) ভাষার বাক্যগঠন তথা পদবিন্যাসে আবিষ্কার করেছেন কতিপয় সূত্র। এ সূত্রগুলোকে তিনি শনাক্ত করেছেন “প্রথাগত মিথ ও রূপক”, আর এগুলোকে বলেছেন “আরকিটাইপ”। সুইস মনস্তত্ত্ববিদ কার্ল য়ুং (১৮৭৫-১৯৬১) বলেছেন, মিথ সমষ্টি অবচেতনের আরকিটাইপ অর্থাৎ এই অবচেতন থেকে সরাসরি উঠে আসা আদি মানস-শক্তি। ব্যক্তিগত অবচেতনের চেয়েও গভীরতর তলের যে অজ্ঞানতা থেকে আমাদের সজ্ঞানতা উদ্ভূত তাকেই তিনি বলেছেন ‘সমষ্টি অবচেতন’।

সমকালীন সাহিত্যতত্ত্ব মিথের সম্প্রসারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করে উপন্যাসকে। হ্যারি লেভিন বলেছেন, “মিথের উপাদান এবং মিথ নির্মাণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে উপন্যাসে।” মারকিন সাহিত্য সমালোচক স্ট্যানলি এডগার হাইম্যান (১৯১৯-১৯৭০) সাহিত্যকেই বলেছেন ‘মিথের অনুরূপ’। বিষয়টিকে বিশদ করেছেন নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাসিয়েলা এম বায়েজ, “Both myth and literature, as well as other art forms, affect and reflect the self-conceptions of the people of whose culture they are a part, they represent roles and attitudes that men and women unconciously imitate and, at the same time, they mirror the stances assumed by the members of society.” উত্তর-আধুনিক সাহিত্য নিয়ে আলোচনাকালে কলিন ফাল্ক লিখেছেন, “A mythic awareness may need to persist if we are to have any sense of meaning in the world at all: the configurations within which human life can most fundamentally be understood as falling… may in the need to be understood as a matter not of scientific order but of a poetic order which is inherently mythic.” তাঁর মতে, পৃথিবীর সকল দেশের উপন্যাসের পাতায়-পাতায় উদ্ভাসিত হয় মিথ, সমকালীন ঔপন্যাসিকদের পক্ষে মিথের বিশৃঙ্খল ও সৃষ্টিশীল দৃষ্টিভঙ্গিকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয় কিছুতেই। কারণ “the subtleties of societies and cultures can be better understood and understood and explained via the ambiguities, discrepancies, contradictions, and paradoxes of the great myths. Attitudes toward humanity, women, and in particular nature, learning, logic, and love are projected in the mythic narratives or world literature that embrace them.”

দেবব্রত রেজ লিখেছেন, “মিথের এমনই স্বরূপ যে তার তথাকথিত অর্থের শেষ নেই। সজ্ঞান মনের ভাষা দিয়ে তাকে প্রকাশ করতে গেলে সেই ভাষার যৌক্তিকত্ব বর্জন করতে হয়, যুক্তির ব্যাকরণ বাদ দিতে হয়, বাস্তব অভিজ্ঞতার পরিপন্থি পন্থায় তাকে প্রকাশ করতে হয়।

“মিথকে যে শুধু বিশেষ ভাষায় প্রকাশ করা যায় তা-ই নয়, মিথকে সুরেও প্রকাশ করা যায়। উদাহরণ, ভাগনার। সুর-ও এক ধরনের মিথ হয়ে ওঠে। যেমন, বিটোফেন-এর সিমফনি। মিথ হয়ে ওঠে চিত্রকলা। যেমন, দা ভিনচি’র লেডা, মোনালিসা। যেমন, আধুনিক কালের কানডিনস্কি, ক্লি, পিকাসো, চিরিকো এবয় আরও কত চিত্র। কবিতাও মিথ। যেমন, দানতে-র ‘ডিভিনা কমেডিয়া’, রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড। সমস্ত মহাকাব্যের অস্থিগুলিও মিথ।

“মিথের প্রধান লক্ষণ তা আমাদের অভিভূত করে। কি করে করে, কেমন করে করে, তার হদিশ জানা নেই। যেমন অভিভূত করে সুর, ছবি, কবিতা। একদিন যা মিথ ছিল তাই হয়তো আমাদের আধুনিক সভ্যতায় ছবি হয়ে উঠেছে, সিমফনি হয়ে উঠেছে, কবিতা হয়ে উঠেছে। আজকের কবিতা মিথ – মিথেরই ভগ্নাংশ।…”

মারকিন কবি রেজিনাল্ড শেফার্ড-ও বলেন, “… Myth also similiar to poetry in its formal operations. Myth is essentially metaphorical: like poetry, it translates ‘feelings’ in the sense of emotions and thoughts into ‘feelings’ in the sense of physical sensations…”.

মিথকে পুনর্লিখন,  পুনরুজ্জীবন ও পুনর্বিন্যাস করে থাকেন লেখকেরা। এই তিনটি রূপই বিপুল সমৃদ্ধি দিয়েছে বাংলা সাহিত্যকে। উদাহরণ অজস্র, কিন্তু উল্লেখ করছি সবচেয়ে প্রধান কয়েকটির মাত্র।

মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য, রামায়ণ-মহাভারত প্রভৃতির অনুবাদ, পুরাণ-পাঁচালি, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান মূলত প্রাচীন ভারতীয় ও মধ্যপ্রাচ্যীয় বিভিন্ন মিথের পুনর্লিখন। এ সবে কবিদের সংযোজন সামান্য। তাঁরা বেশি তলিয়ে দেখতে যান নি, প্রশ্নও তোলেন নি। পুনরুজ্জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ বৈষ্ণব পদাবলী। লোককাহিনীর গ্রামীণ কিশোর ও কিশোরী বধূর পরকীয়ার মিথকে প্রাণ দিয়েছেন কবিরা। কাহিনীতে উল্লিখিত চরিত্রদের মুখে কথা দিয়েছেন, ভাষারূপ দিয়েছেন তাদের আবেগ ও অনুভূতির। একটি লৌকিক মিথ এই পুনরুজ্জীবনে রূপ নিয়েছে জীবাত্মা ও পরমাত্মা মহিমান্বিত মিথের, একটি ধর্মমতের হয়েও পেয়েছে সর্বজনীন মিথের অধিষ্ঠান। এ কারণে পদাবলীর অনেক কবিও পরিণত হয়েছেন মিথে। পূর্ববঙ্গ গীতিকা ও ময়মনসিংহ গীতিকাতেও পুনরুজ্জীবিত হয়েছে অনেক মিথ। ফররুখ আহমদের ‘সাত সাগরের মাঝি’ আরও একটি সার্থক উদাহরণ। জসীম উদ্দীন পল্লীবাংলার মিথকে পুনর্জীবিত করেছেন ‘নকশি কাঁথার মাঠ’, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ প্রভৃতিতে। পুনর্বিন্যাসের সার্থক উদাহরণ মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’, ‘বীরাঙ্গনা’ পত্রকাব্য; রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘বিদায় অভিশাপ’, ‘বৈষ্ণব কবিতা’ ও অন্যান্য মিথ ভিত্তিক রচনা, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’, জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’ প্রভৃতি। পুনর্বিন্যাসের ফলে অনেক মিথ মূল্যায়িত হয়েছে নতুন ভাবে, সেই সঙ্গে নির্মিত হয়েছে নতুন মিথও। ‘তরুণ গরুড় সম কি মহৎ ক্ষুধার আবেশ…” – এই কবিতাংশে গরুড়ের মিথ পেয়েছে নতুন ব্যঞ্জনা। অন্যদিকে ‘বলাকা’ কবিতা নির্মাণ করেছে গতিবাদের মিথ। তবে দ্রোহের সঙ্গে প্রচলিত মিথকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন চর্যাপদের কবি-সাধকেরা। বিশেষ করে ব্রাহ্মণ্যবাদের মিথের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে নতুন সহজিয়া মিথ গড়ে তোলেন তাঁরা। এর ধারাবাহিকতায় এ দেশে আউল বাউল মারেফতি মুরশিদি সুফি মিথ পেয়েছে প্রতিষ্ঠা। এ মিথ অধ্যাত্ম সাধনার।

চর্যার কবিরা পরিচিত সিদ্ধাচার্য্য হিসেবে। তাঁদের একজন সরহপা  ধর্মসাধনার আনুষ্ঠানিকতার প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন নানা মিথকে। এ সূত্রে নির্মিত হয়েছে অনেক নতুন মিথ।

“… নগ্ন থাকলেই যদি মুক্তি পাওয়া যায়

      তাহলে শেয়ার কুকুররাই বা

      তা পাবে না কেন?

      লোম উৎপাটনেই যদি মোক্ষ হয়

      তাহলে যুবতীর নগ্ন নিতম্বই বা

      বাদ যাবে কেন?…

      সমাধি নয়, প্রব্রজ্যাও নয়

      গৃহে বাস করো সুখে

      নিজের সঙ্গিনীর সঙ্গে।

      যা কিছু কামনা বাসনা

      তার ভোগ সমাপ্ত না হলে

      কি করে মুক্ত হবে বন্ধন থেকে?…

      নয় মন্ত্র, নয় তন্ত্র, নয় ধ্যান –

      এ সবই ছলনামাত্র।

      হে মূর্খ, স্বভাবে যা শুদ্ধ

      সমাধিতে আবিল করো না

      সেই মন।

      কষ্ট  দিও না নিজেকে, থাকো সুখে।

      সুখে করো পানাহার আর মৈথুন –

      একবার নয় বারবার; পূর্ণ করো

      এই চক্রেরই আবর্তন।

      সংসারপারের সাধনা হবে

      এই ধর্মেই।…

      ক্ষেত্র, পীঠ, উপপীঠ

      ঘুরেছি সব তীর্থেই,

      তবু দেহের মতো এমন পবিত্র

      সুখস্থান পাই নি কোথাও।…

      কমলকুলিশে ইন্দ্রিয়ভোগে

      দুয়ের যে সুখ,

      কে আছে ত্রিভুবনে

      যে আনন্দ পায় না সেই রমণে;

      এতে সর্ব কামনা পূর্ণ হয় না, এমন

      আছে কি কেউ?…” (অনুবাদ: অলকা চট্টোপাধ্যায়)

সবশেষে কবিতার নানা মিথ নিয়ে সংক্ষেপে দু’-চার কথা। একটি মিথ, কবিতায় ছন্দ থাকতেই হবে। না, এমন কোনও ধরাবাঁধা নিয়মই নেই কবিতায়। ছন্দ, মাত্রা ইত্যাদি থাকলে ভাল – এই যা। তবে সব নিয়মেরই আছে ব্যতিক্রম।

আরেক মিথ, কবিতার সুনির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য থাকতে হবে। না, এমন কিছু সুনির্দিষ্ঠ করা নেই। কবিতা একটি মাত্র অক্ষরে লেখা যায়, কোটি-কোটি শব্দেও লেখা যায়।

তৃতীয় মিথ, কবিতা কোনও কিছু না ভেবে, কোনও কিছু না চিন্তা করেও লেখা যায়। না, তা যায় না। সকল শিল্পের মতো কবিতাও চিন্তাশীল মানুষের সৃষ্টি। কেউ-কেউ হঠাৎ করে তাৎক্ষণিক ভাবে ভাল কবিতা লিখে ফেলতে পারেন – এটা সত্য, কিন্তু সবাই কি পারেন? লেখার আগে ভাবতে হয়, যা নিয়ে লেখা তা নিয়ে চিন্তা করতে হয়, তারপর সম্পাদনা করতে হয়, তারপর আরও কাটাকুটি করতে হয় – যোগ-বিয়োগ করতে হয়।

চতুর্থ  মিথ, আচ্ছন্ন অবস্থায় ভাল কবিতা লেখা যায়। না, এ কথা সবসময় সত্য নয়। কেউ-কেউ অবশ্য প্রেমাচ্ছন্ন অবস্থায় ভাল কবিতা লিখেছেন। যেমন, রুমি।

কবিতার দুর্বোধ্য হওয়া চলবে না। এ মিথের ব্যাপারে বলতে হয়, বোধ্য হওয়াই বেশির ভাগ ধারার কবিতার লক্ষ্য। ‘দাদা’ কবিতায় এ সব নেই। এ কবিতা ইচ্ছাকৃত দুর্বোধ্য।

কবিতা ব্যাকরণ মেনে চলবে। না, কবিতা ব্যাকরণ ভেঙেও চলতে পারে।

সপ্তম মিথ, কবিতার ভাষা হবে শব্দাড়ম্বরপূর্ণ। মোটেও না, অত্যন্ত প্রয়োজন ছাড়া ভারি-ভারি শব্দ ব্যবহার না করাই ভাল।

সবশেষে কবিতা ও মিথ নিয়ে মারকিন কবি, ঔপন্যাসিক ও সাহিত্য সমালোচক রবার্ট পেন ওয়ারেন (১৯০৫- ১৯৮৯)-এর একটি মন্তব্য – “ The poem is a little myth of man’s capacity of making life meaningful. And in the end, the poem is not a thing we see, it is a light by which we may see an what we see is life.”

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>