কবিতার আলো অন্ধকার

কবি জিললুর রহমান,

কখনো কখনো আমার মনে হয়—কেন মনে হয়? মনে হয় কেন জানি কবিতার কাজ হচ্ছে অন্ধকারকে আলোতে নিয়ে আসা আবার আলোকে অন্ধকারে নির্বাসিত করণের একটি মোহন সুন্দর খেলা—অবশ্যই উভয়ের শিল্পসম্মতিতে । আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস অন্ধকারের ব্যক্তিত্ব কবির মনে আলোর চেয়ে বেশি প্রভাবক –যদিও আলো তাঁর একান্ত অন্বেষা । এবং শেষ পর্যন্ত অন্ধকার ও আ্লোর মোহন খেলায় যা নির্মিত হয়—তা কী একটি মেধাবী জগত ? অবশ্যই শব্দ ছন্দ ধ্বনি ভাবের সংলগ্ন- অসংলগ্ন অদৃশ্য ও দৃশ্যমান ছবিতে নির্মিত হয় একটি বাস্তব- অবাস্তবের মুখোমুখি প্রহেলিকা অথবা কল্পনাতীতবোধ সুন্দরের।

কবিকে বাঁচতে হলে বাঁচার তাগিদে বাঁচার কবিতাই লিখতে হবে যা শিল্পের রূপধর্মে মুখশ্রী লাভ করে।কবির সে জীবন দর্শন মুদ্রা জানা থাকতে হবে। কীভাবে যাদুকরিমন্ত্রে সাধারণকে অসাধারণ স্মরণীয়কে অবিস্মরণীয়তে রূপ দেয়া যায় এবংকবিতার হাজারো পথ ও মতের মধ্যে নিজের পৃথক পথ –স্বতন্ত্র প্রাসাদ নির্মাণের ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সাধক কবি রজ্জবজীকে আমার বেশি মানতে ইচ্ছা করে—তিনি বলেছেন ‘’ গৈব কুঁ রূপ দে / মৈন কুঁ ভাস দে/ বাণী দে বাণী দে /দে দে প্রকাশ দে ‘’। অর্থাৎ যা অদৃশ্য বা গয়েব বা যা অচিন তাকে রূপ দাও– ভাষা দাও –মৌনকে জীবন্ত করো – বাণী দাও মুখর –ভাস্বর করে তোলো। বস্তুবাদী ভাববাদী যিনিই হোন কবি হতে গেলে রজ্জবজীর প্রকল্প মানতেই হবে –বিশ্বজুড়ে এই মতের গত্যন্তর নেই।

আমরা জানি সময় ও পরিবেশ আন্তরিক বিজ্ঞজনের অভাব আবিষ্কারকের অনীহা অথবা কৌশলগত অবহেলাসহ বিবিধ কারণে অনেক সময় মহৎ কবিদের সৃজনীসত্তা – মহৎ শিল্প মহৎ কবি অন্ধকারে পড়ে থাকেন। আবার একথাও সত্য কালের ভ্রমণে কোনো মহৎ শিল্প বোদ্ধার চোখে পড়ে যায় অবহেলিত বা দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়া শিল্প বা কবিতার আকর –তখন এক প্রচণ্ড কম্পন জাগে আবিষ্কারের নেশায়। উন্নত জাতি ও দেশগুলিতে এ সত্যের যথেষ্ঠ প্রমাণ আছে। তবে ইতিহাসের নিয়তি যে রকমই হোকনা কেন—কবিকেই আত্মবিশ্বাসের গভীর আস্থায় আর নির্মাণ ও নির্মিতির দুঃসাহসে স্বীকৃতি দিতে হবে নিজেকে – বলতে হবে আমি কবি। অসাধারণের ভেতরে আমার মহতী শিল্পের গুরুত্ববহ সাধারণ স্থান আছে। কবিতা—মহৎ কবিতা—শিল্পনিদানে ধন্য কবিতা—বিষয় দৃষ্টির অভিজ্ঞানে সিদ্ধ স্থাপত্যকবিতা কখনো মরে না। কবিতা মৃত্যুহীন –তাই কবিরা মরে না। আর যে কবি কবিতার মৃত্যুহীনতার আসঙ্গ সম্পর্কের চরিত্র জানেন না এবং নিজের কবিতা যখন ঐশ্বর্যের ভাব ও কৃৎ সম্পদে কবিকে চিনতে পারে না –সে কবি ও কবিতার মৃত্যু অনিবার্য। কবির চেতনার মহার্ঘ্য নৈবেদ্য কবিকেই চিনিয়ে দিতে হবে—বলতে হবে এই যে দেখছো অসীম সুন্দরের অসামান্য আরতি এর সবই আমারই রচনা –অঞ্জলি পাতো – এ কবিতা আমার – যে কবিতা মহাকালের চিত্রপটে সংরক্ষণের জন্য এবং হৃদয়াবেগে নিঃসংকোচ প্রশান্ত আবৃত্তি অথবা একান্তমনের নিবিষ্টতায় পাঠের জন্য তোমাকে দিলাম।

যে কবিতা অষ্টপ্রহর জাগ্রত থাকে না সে কবিতা অবশ্যই মৃত। মনে ও স্মৃতিতে এ কথা সংরক্ষণ করতে হবে ইতিহাসের প্রতিটি যুগ কমবেশি ট্র্যাজিক –বেদনাবহ –অরুন্তুদ ঘটনা সংগঠক। সময়ের প্রেক্ষাপটে নক্ষত্রের ইশারায় কবি বা শিল্পীর বুঝে যাওয়া উচিত আমার কোথায় স্থান। অদৃশ্য ইশারায় শব্দ ধ্বনি ও বাক্যের আচরণ যে বোঝে না সে তো কবি নয় । কবিতা জীবনবোধ বোধনের শব্দবন্ধ চিত্রশালা। মনে রাখতে হবে উপেক্ষায় যে কবির শক্তি ও মেধা ভাষাও চিত্র-চিত্তজ্ঞান বৃদ্ধি পায় না –সে কবি নয়। মহৎ কবি উপেক্ষার জন্য অপেক্ষা করে –উপেক্ষা মেধাবী কবির স্নায়ুকে দ্বিধার তুর্কিকিরিচে রূপান্তরিত করে ।জীবন্ত কবিতো সর্বক্ষণ উদ্ভিন্ন দ্বিদলপত্রী চারা –ডাইকোটাইলিডন [ Dicotyledon]। কবিতার সহস্র পথ স্বতন্ত্রতার ভেতরেই বলতে হবে এটাই আমার পথ — নিজস্ব পৃথক। শিল্পের চরিত্র আচরণে অনন্যসাধারণ অপরব্যক্তি পথ । বলতে হবে আমি ঈর্ষাতে নির্ভয় পরশ্রীকাতরতার কাছে অসংকোচ – অভয় । অসংকোচ অভয় , কারণ আমার কবিতা আমার শিল্প আমার জীবন সম্পর্ক জীবনবোধের আরাধ্য মেধাবী ফসল। আমি প্রশংসার দাবিদার নই—আমি দাবি করছি আমি সত্য্ সুন্দরের দ্রষ্টা-স্রষ্টা— আমার শিল্প আছে সুন্দর আছে—আর কিছু নাই। এতক্ষণ আমি যা বলেছি তার সব কিছুই শিল্প ও শিল্পীর বা শিল্পাশ্রমের একান্ত মানবিক সততার প্রেক্ষিত নিয়ে। আবার একথাও স্মরণ করিয়ে দেয়া কর্তব্য মনে করি—সাহিত্য সংস্কৃতি শিল্পের জগত প্রকৃতপক্ষে মাইনরিটি ডমিন্যান্ট। এখানে ভালোমন্দের অবস্থান আছে। এখানে মহত্তম শিল্পপ্রেমিক কবি –শিল্পীর অবস্থান যেমন আছে –থাকবে তেমনি হাম্বাগ –আত্মম্ভরী –অহংকারী- হঠকারী –অবিমৃষ্যকারী- বৈড়ালব্রতিক মানুষের সংখ্যাও কম থাকে না—পৃথিবী জুড়েই তাঁর অসংখ্য উদাহরণ আছে এবং থাকবে। গাল্ভরা বচনের কুহনিকা রচনার হাই-ফালুটিন মানুষ সবসময়ে থাকবে। হাইড্রোপোনিক্স গাছ বা লতার মতো মৃত্তিকাহীন বেড়ে ওঠার লোক ও থাকে সৃজনশীল জগতে। অশিল্পীও শিল্পীর দাবিদার হতে বাধা নেই –কারণ শিল্প বিচারের কালের অন্তর্যামী নিত্য চক্ষুষ্মান।

এখানে একটু ঔপন্যাসিক ‘’ ফ্রঁসোয়া মোরিয়াক’কে [১৮৮৫-১৯৭০ ] স্মরণ করি। মোরিয়াক বলেছেন মানুষ সংস্কৃতির ফসল। অনেক সময় আমরা বিস্মৃত লেখক দ্বারাও প্রভাবিত হই। তিনি বলেছেন আমার কাছে কবির মূল্য বেশি। মোরিয়াক –রাসিন বোদলেয়র র‍্যাঁবো এদের নাম উল্লেখ করেছেন। কেন কবিদের উপর এতটা গুরুত্ব দিলেন তিনি। বলেছেন প্রকৃত ঔপন্যাসিক স্থান কাল পরিবেশ বর্ণ গন্ধকে পুনর্বার সৃষ্টি করেন জাগ্রত করেন । কিন্তু জীবন ও পরিবেশের বোধকে পুনর্জাগরণ ও পুনরুজ্জীবনের ক্ষমতা মহৎ কবিদেরই সব চেয়ে বেশি থাকে। মোরিয়াক বলেছেন—ইতিহাস ও সাহিত্যের বিরল ঘটনা ও অনন্য অসামান্য সার্থকতা এখানে যে—লেখক বিলীন হলেও – তাঁদের লেখা কখনো মরে না।যেমন শেক্সপীয়র বা হোমর কে আমরা জানি না। কিন্তু তাঁদের কীর্তিকে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ জানে। আমাদের রবীন্দ্রনাথের কথা ভাবুন [ যদিও কালের দুস্তর ব্যবধান হোমর শেক্সপিয়রের সাথে ] তাঁকে কয় জনে জানে ব্যক্তিজন হিসাবে? কিন্তু সমগ্র বিশ্বের কাব্যজগৎ মনীষার কাছে তিনি অমর—তাঁর সৃষ্টি অমরতার আসনে প্রতিষ্ঠিত। এখানেই কাব্যের শিল্পের জয়।।

ফাউজুল কবির
০৩ ০৮ ২০২০

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত