কবির কবিতা ও সময়

জীবনের সাথে সময়ের সম্পর্ক কোথায়? একটা জটিল প্রশ্ন বটে। আমি নিজেই কি এর উত্তর জানি? কিন্তু একথা বুঝি একজন একই সময়ে ব্যক্তিজীবন সমাজ-রাষ্ট্রীয় জীবনের অংশীদার। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন হয় তো একটি বিশেষ মাত্রায় বিশেষ অবস্থানের কারণে ইচ্ছার কিছু পরিমাণগত স্বাধীনতা থাকে। কিন্তু প্রাকৃতিক শক্তিনিচয় এবং যাকে সমাজ বলছি, যা আসলেই একটি ক্ষমতা! লগ্ন মৌমাছির চাকের মতোই সেখানে তাঁর অবস্থাটি কেমন, যদি না সে ক্ষমতা ও বিত্তের এবং রাজনৈতিক কূটনৈতিক শক্তির স্বাদ গ্রহণের অধিকারী না হয়? মানব ইতিহাসে মানুষের অবস্থানগত দিক আমাদের জানা আছে। আর এ কথাও আমরা জানি সমস্ত মানবিক সামাজিক প্রাকৃতিক ইতিবৃত্তের অভিনয় ঘটে সময় নামক এক দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান মঞ্চে। সময় এক সীমাহীন পরিক্রমা। আমরা যখন বলি—শুরুর যেমন সমাপ্তি আছে তেমনি সমাপ্তির ও আছে সুচনা। এটি নিঃসন্দেহে একটি বিশেষ প্রেক্ষিতে আপাত ধারণা। কারণ সময়ের বহমানতার নিরবচ্ছিন্নতার কথা আমরা জানি। সময়ের বহমানতার কোথাও বিচ্ছেদ নেই ফাঁক নেই। তবু আমরা এই মহাকালকে ক্ষণ দণ্ড পলসহ [সবশেষের ন্যানো সেকেণ্ডের ধারণা] নানাভাবে ভাগ করে মানব বিদ্যার সুবিধার্থে। মহাকাল কিন্তু আমাদের এ ভাগাভাগির কথা জানার প্রয়োজন মনে করে না।

মহাকাল ভাবুক বা না ভাবুক কিন্তু একজন কবিকে সময়ের কথা কালের কথা ভাবতে হয়। সে জানে সূচনা ও সমাপ্তিবিন্দু মহাকাল নিজেই জানে না। কারণ সময়ের মৃত্যু নেই। কবির মৃত্যু আছে বলেই কবি শুধু সময়ের কথা ভাবে না। ভাবে একারণে যে একটি ক্ষুদ্রফুল ধূলিকণা থেকে মানুষ সমাজ, প্রকৃতি, প্রাণী-জগত জীবন জীবনের রহস্য যুদ্ধ-মারী এবং বিশ্বব্রম্মাণ্ডের কোনো কিছুই তাঁর কাব্যবিষয় ও চিন্তার বাইরে নয়।

সবচেয়ে বড় কথা কবিকে অফুরন্ত জিজ্ঞাসা নিয়ে জীবন ও শিল্পের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিজের কর্মশালায় কজ করতে হয়। অসীম ও তাঁর প্রয়োজন সসীম ও তার জন্য জরুরি। জীবনের ও কর্মের সীমাবদ্ধতা আছে বলেই সূচনা ও সমাপ্তির বিষয় আসে এবং এটিও একটি বাস্তবতা। কবি জীবন বা ব্যক্তি জীবনের জন্য সর্বোচ্চ বাস্তবতা। আক্রান্ত সময়ের রচনা বা রচনাক্রান্ত সময় থেকে নিজের ও সৃষ্টির অতিক্রান্তির জন্যই কবির ঐকান্তিক প্রচেষ্টা বা সাধনা। কবিকে নিজের ভেতরে নিজের কাল বা সময়কে ধারণ করতে হবে এবং মহাকালের যাত্রায় সার্থক সাথি হতে হবে। এটাই কবির আমৃত্যু কাম্য। তাই সময় ও কাল তাঁর জীবন ও মহৎ সৃষ্টির উৎসবিন্দু। অর্থাৎ সৃজন থেকে সমাপ্তি আবার সমাপ্তি থেকে সৃষ্টির শুরু। এ এক চিরন্তন বহমান ক্রিয়া। ইতিহাসের স্রষ্টা- কারিগর হচ্ছেন মহান সময়। এলিয়ট এ কথাই বলেছিলেন। আর বলেছিলেন, জগতের সমস্ত অর্থ, অর্থময়তা এবং অর্থমুল্য তৈরি করে সময়। এলিয়ট সময়ের অর্থ খুঁজেছেন নদী আর মহাসমুদ্রে। আসলে কী বহমানতার সাদৃশ্য খুঁজেছিলেন! না তার সাথে অনন্ত কিছু? এ কথাতো তিনি তাঁর বিভিন্ন লেখায় বিভিন্নভাবে বারবার উচ্চারণ করেছেন। বলেছেন, আমাদের ভেতরে আছে নদী, “আমাদেরকে ঘিরে রেখেছে চতুর্দিকে মহাসমুদ্র।” কথাটি আমার কাছে গভীর অর্থবহ মনে হয়। মনে হয় অন্তর্গত সত্যের আমূল উদ্ঘাটন। নদী হচ্ছে মানুষের জন্য এক দৃশ্যমান সময়। ছবি অথবা মানুষের মতোই বহমান ভাবুক! মানুষের মতই জীবনের সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদের তো জানা আছে পৃথিবীর সকল বড় লেখকেরা আমাদেরকে জানিয়ে দিয়ে গেছেন, “লেখার জন্য দরকার মাত্র তিনটি জিনিস  অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও কল্পনা।” আমি এর সাথে যুক্ত করতে চাই অভিনব এবং অবিস্মরণীয় কল্পনা। আবার গার্ট্র্যুড স্টেইন বলেন, “নিজে যা জানি তা প্রকাশ করাই হচ্ছে লেখা।” আবার লেখার ও ভাবার জগতে সময়ের কথা বলেন ভিন্নভাবে উইলিয়াম ফকনার [২৫ সেপ্টেম্বর ১৮ ৯৭ – ০৬ জুলাই ১৯৬২] যিনি একজন শ্রেষ্ট ঔপন্যাসিক এবং ১৯৪৯ সালে নোবিল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমার লেখায় আমার চরিত্রকে মানুষকে জীবনকে কীভাবে সার্থকতার সাথে সময়ের সংশ্লিষ্টতায় এনে সময়ের জগতে গতিবান করেছি বা করতে পেরছি সে আমার এক নিজস্ব তত্ত্ব। আর সে তত্ত্ব হচ্ছে ‘’সময় হল তরল অবস্থা।‘’ ক্ষণিকের বিশেষ সময়ের ব্যক্তিগত অবস্থা তাঁর অস্তিত্ব নেই।

ফকনার বলেছেন ‘ছিলো’ বলে কিছু নেই। যা শুধু আছে তা হলো ‘আছে‘। ‘ছিলো’ যদি থাকতো তা হলে কোন দুঃখ বেদনা থাকতো না আমার তৈরি বিশ্বকে আমি পৃথিবীর শিরোবিন্দু বলে বিবেচনা করি।ছোটো সে শিরোবিন্দু, কিন্তু একে সরিয়ে নিলে গোটা বিশ্ব ধ্বসে যাবে। ‘’এ হলো ফকনারের সাহিত্যের ও বৈশ্বিক সময় চিন্তন। এখানে টি এস এলিয়টের ‘’FOUR QUARTETS” থেকে সময় সংক্রান্ত কয়েকটি ছোট ছোট উদ্ধৃতি পেশ করি যাতে পাঠকের বোধের সুবিশা হয় [আমার বিশ্বাস মতে]। ‘’Time present and time past./Are both perhaps in time future/If all time is eternally present/All time is unredeemable. [ Burnt Norton -1] Or ‘’ Go, go, go said the bird; human kind /Cannot bear very much reality.’’ Or ‘’Only through time is conquered ‘’

‘’THE DRY SALVAGES‘’ থেকে কিছু লাইন দেখা যেতে পারে সময়ের কথা—‘’We cannot think of a time that is oceanless/Or of an ocean not littered with wastage/Or of a future that is not liable/Like the past, to have no destination .’’ Or ‘’ People change, and smile: but the agony abides./Time the destroyer is time the preserver,/like the river with its cargo of deaed negroes ,cows and chiken coops,/ The bitter apple and the bite in the apple .’’ Or ‘’ Into different lives , or inti any future;/you are not same people who left that station/Or who will arrive at any terminus,’’। সময় চেতনার কথা এবং কবিতা শিল্পে চিত্রে সঙ্গীতে সময় চিন্তনের বিষয়টি এখানে শেষ করতে পারি।

কবির সৃষ্টিবোধের মধ্যে, সৃজন কর্মের মধ্যে সমাজ অবস্থা ও প্রকৃতির প্রেক্ষিতে আত্মসঙ্ঘাত ও আত্মসম্মিলন ঘটে থাকে। কবির নিজের সাথে তাঁর শিল্পেরও ক্রমাগত দ্বন্দ্ব চলতে থাকে, নতুবা সৃজন এগোয় না মূল্য অর্জন করে না অভিঘাত ছাড়া। অভিঘাতই আসল কথা। জীবন–শিল্প এবং এই মহাজগতের সৃষ্টি আর বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার তৈরির ক্ষেত্রে।

মহৎ শিল্প চিত্তমত্ততা অস্থিরতা উন্মাদনার চেয়ে ধৃতাত্মা–সংযত চিত্তই আশা করে বেশি। শিল্প তো ধৃতিরই কাজ। সন্তোষ অধ্যাবসায় পরিকল্পনা স্থিরচিত্ত ধৈর্যের কাজ। ধৈর্য–শব্দটির উপর জোর দিতে গিয়ে ফ্রাঁসোয়া সাগাঁ’র [ফ্রাঁসোয়া কুয়োরিজের ছদ্মনাম] একটি সাক্ষাতকারের কথা মনে পড়লো। স্পেনিশ বংশজাত এক ইঞ্জিনিয়রের কন্যা। ১৯৩৫ সালে কাজাকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। প্যারীর উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছেন ভাইবোনদের সাথে। শোরবর্ণে পড়ছিলেন, কিন্তু স্কুলের শেষ পরীক্ষায় ফেল করে বসলেন। তখন জুলাই মাস। ফেল করেই কাউকে কিছু না বলে লিখতে বসে গেলেন উপন্যাস ‘বঁজু ত্রিস্তে’ এবং আগস্টে শেষ করে ফেললেন। ১৯৫৪ সালের আগস্টে বইটি প্রকশ পেল। সে বছরই ‘প্রি দ্য ক্রিতিক’ পুরস্কার লাভ করলো। এই যে লেখালেখির শুরু আর থামলেন না উপন্যাসের পাশাপাশি লিরিক চিত্রনাট্য ইত্যাদিও লিখেছেন। তাঁর মেধার স্বীকৃতিও পেয়েছেন। একটা সাক্ষাৎকারে বলেছেন ‘’শিল্পের মায়াই হলো গিয়ে একজনকে এই বিশ্বাসে পৌঁছে দেয়া যে, মহৎ সাহিত্য জীবনের খুব কাছে, কিন্তু ঠিক উল্টোটাই সত্য।

জীবন নিরবয়ব আর সাহিত্য একটা গঠন‘’। তাঁর এমতের সাথে আমি দ্বিমত করি না। যদিও তিনি মনে করেন শিল্পকে বাস্তবের ভঙ্গি করা উচিত নয়। এটাও তাঁর নিজের শিল্পমত। কিন্তু তিনি যখন বলেন ‘’শিল্প বাস্তবকে গ্রহণ করবে আকস্মিক।‘’ একথার তাৎপর্যটি এরকম,- একটা শিল্পে ধৃত সমস্ত মুহূর্তগুলোই একেকটা পৃথক পৃথক মুহুর্ত। একটার পর একটা আসতে থকে, যুক্ত হয় রূপান্তরিত হয় জমাট বাধে সমাহারমুহুর্তে গ্রন্থিত হয় জীবনের পূর্ণাঙ্গ রূপাবয়বে একটা কেন্দ্রীয় আবেগের টানে।

তিনি যখন বলেন শিল্পকে বাস্তবতার ভঙ্গি দেয়া উচিত নয়—তখনও আমরা মানি– কারণ তাঁর মতো আমাদেরও বিশ্বাস আছে যে কোনো আলোড়নসৃষ্টিকারী সত্যের সারাৎসারকে আমরা উপন্যাসে পেতে পারি তার চরিত্রের সক্ষমতার ভেতর দিয়েই। তাঁর বিশ্বাস একমাত্র সৌন্দর্য সৃষ্টিই উপনাসের একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু যখন বলেন বাস্তব উপন্যাসগুলোর মধ্যে অবাস্তব দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছুই নেই। তখন তার সাথে সম্পূর্ণ একমত হওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না।যাক ধৈর্যের কথা বলতে গিয়ে অনেক কথাই বলে ফেললাম! যা অসংগতও মনে হতে পারে। তবে একথাও মনে রাখি যে শিল্পবিষয়ক কথা কখনো কখনো বাহুল্যে মাত্রা হারালেও যাত্রা হারায় না।

বাস্তব অবাস্তব সমস্তকে রচনাশিল্পে রূপান্তরের দায়িত্ব কবি ও শিল্পীর। আমাদের ব্যক্তিগত জীবন সমাজ আমাদের বিশাল দৈত্যাকার সমজবিগ্রহ নিরন্তর আমাদের অন্তর্জগত ও বহির্জগতের যে প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে মানূষকে কাচের টুকরোর মতো করে দিচ্ছে সেখানে সর্বক্ষণ মানুষ মহৎ সাহিত্যের চিকিৎসার জন্য বসে থাকবে একথাও ভাবা যায় না। আবার অমহৎ সাহিত্য থেকেও দূষণ ছাড়া ওন্য কিছু মিলবে এটাও আশা করা যায় না। তবু ব্যক্তি বা কবি মানুষের মধ্যে অসন্তোষ হতাশা বিদ্রোহ প্রকাশ পাবে। সমাজকে ভাঙ্গার কথা, বদলানোর কথা, বিপ্লবের কথা, বৈষম্য নিপীড়ন নির্যাতন থেকে মুক্তির কথা অবশ্যই প্রকাশ পাবে। চিরকাল পেয়েও এসেছে। অমানবিকতা থেকে মুক্তির দাবিতে রচিত কবিতা উপন্যাস নাটক সংগীত এর সংখ্যা অজস্র সহস্র। প্রতিষ্ঠান বা ক্ষমতা যখন অন্যকে অন্যায় অন্যায্যভাবে গ্রাস করে ত্রাস করে সেখনে প্রতিবাদের প্রতিরোধের ধ্বংসের প্রবণতা জাগবেই এটা নিয়মের ইতিহাস এবং ইতিহাসের নিয়ম। আবার এদেরকে প্রতিরোধের জন্য প্রতিষ্ঠিত থাকবে এটাও একান্ত সত্য। এ সত্যের মধ্য থেকে যে রক্তাক্ত মর্মান্তিক ট্র্যাজিক ইতিহাস–শিল্প নামাংকিত হয়ে গড়ে ওঠে সেখানে কী সত্য নাই সেখানে কী শিল্প নাই? আছে। শুধু শিল্পকে দেখার চেনার দৃষ্টিভঙ্গি আসল কথা। যখন মহৎ ধীরোদাত্ততা কাজে লাগে না জীবন অস্থির চঞ্চল হয়ে ওঠে তখন সকলে না হলেও শিল্পীদের মধ্যেও কেউ কেউ শিল্পে বাস্তবকে রূপ দেয়ার অর্থাৎ ভাংচুরের জন্য তৈরি হয়। তখন কবি ও শিল্পীকে ধীরোদ্ধত হয়ে উঠতে একটা শিল্প নিয়মের মধ্য দিয়ে। সেখানে প্রতিবাদের একটা ক্রাই জাগে। সে ক্রাই যদি বৃহত্তর মানবিকতার লক্ষে মননের সুস্থতায় জাগে মানবিক প্রতিরোধের চরিত্র পায় তখন তাকে সাহিত্য বলে মানতে কেন অস্বীকার করা হবে? এ জন্যই চিরায়ত সাহিত্য ধৃতির সাহিত্য। এ মুহূর্তে আমার সামনে একটা কবিতার বই পড়ে আছে। বইটি ঘুনপোকা কেটে কেটে একটা অসামান্য শিল্পকর্মে পরিণত করেছে। বইটি জানতো না ঘুণেপোকা কী জিনিস। এখন জেনেছে। আমরাও জানি না আমাদের জীবনের ভ্রুণের ভেতরেই পুঁতে দেয়া হয়েছে ক্ষয় মরণের বীজ। বিস্ময়ের এবং চিরন্তনের এক জেনেটিক শিল্প। যাক বইটির নাম “বের্টোল্ট ব্রেখট কবিতা সংগ্রহ”।

বিশ্ব নাট্যসাহিত্যের বিশাল মানুষ। কবি নাট্যকার এবং অবশ্যই মেধাবী। এখান থেকে [নাটকেরই অংশ] জেনারেল নামে কবিতাটির কিছু অংশ উদ্ধৃতি দিচ্ছি, কবিতাটি সারা বিশ্বে বহুল পঠিত এবং উচ্চারিত—

‘জেনারেল, তোমার ঐ ট্যাঙটা জব্বর গাড়ি বটে/ একটা গোটা অরণ্য ও ছারখার করতে পারে ছাতু করতে পারে/একশো মানুষকে।/কিন্তু ওর একটি গলদ / ওকে চালাবার জন্য লাগে মানুষ। জেনারেল মানুষ জীবটি বেশ কাজের / সে ঊড়তে ওস্তাদ, সে মারতে ওওস্তাদ।/ কিন্তু তাঁর একটি গলদ /সে ভাবতে ও পারে।

আমার তো মনে হয় যদি শীলার [ ১০ ন০ভেম্বর ১৭৫৯–০৯মে ১৮০৫] এবং উলফগ্যাং ফন গ্যেটে [ ২৮ আগস্ট ১৭৪৯ – ২২ মার্চ ১৮৩২] যদি ব্রেখট [১৮৯৮—১৯৫৬] এর সমসাময়িক হতেন বা অলৌকিকভাবে এ কবিতাটি পাঠের সুযোগ পেতেন মানবচরিত্র বিচারের বোধ আর সমকালীন চিন্তার এক অপূর্ব পরিশ্রুত চেতনের ভাষায় প্রকাশিত কবিতাটিকে বলতেন পৃথিবীর সবচেয়ে সহজবোধ্য অসাধারণ এক শ্রেষ্ট কবিতা।

এবার সেসিল ডে ল্যুইস [২৭ এপ্রিল ১৯০৪-মে ২২১৯৭২] এর কথা একটু স্মরণ করি।অসাধারণ ধারালো কবি সেসিল। চিন্তা ভাবনায় প্রশান্ত সৌম্য এবং সমসাময়িকদের মধ্যে শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন তিনি। তিনি মনে বিশ্বাস করতেন, একমাত্র কবিতাই সত্যকে সমর্থন ও ধারণ করে। এব্নগ প্রকৃত কবি ও কবিতা নিজেকে শিল্পের সত্যে নিজেই সমর্থন করতে পারে। সেসিল সারাটি জীবনই বিশ্বাস ও আস্থা রেখেছেন মহান রবার্ট ফ্রস্টের কাব্যমন্ত্রে- কবিতা সূচিত হয় আনন্দের প্রত্যয়ে আর সমাপ্ত হয় প্রজ্ঞালোকের আশ্রয়ে। কবিতাকে তিনি মহৎ
পেশা বা বৃত্তি মনে করতেন। বলতেন আমরা যখন তারুণ্যে কবিতা লেখা শুরু করি আমাদের হাতে তো কোনো অস্ত্র বা কৌশলী হাতিয়ার থাকে না। থাকে একটা আনন্দময় অভ্যাস সত্যকে ধরবার একটা নিরলস প্রচেষ্টা।

আমাদের ‘টেম্পারারমেন্ট’ শব্দের প্রিতি অসীম মায়া আমাদেরকে কবিতা ভ্রমণ করায়।তারপর ক্রমাগত অভ্যাস শব্দবোধে অধ্যাস আমাদেরকে কবিতার দিকে টেনে নিয়ে যায়। আমরা তখন নিজের অর্জিত বোধের কথা লিখি বোঝাতে চাই না। সত্যকার কবিতা কবির অন্তর্গত অভিজ্ঞতাকে বোধ থেকে বোধিতে পৌঁছে দেয়।এ জায়গায় কবি তাঁর সৃষ্টিকে কাব্যিক সত্যকে অভিজ্ঞতাকে সঞ্চারণের জন্য একটা সেতু তৈরি করেন সাবালক পাঠকের সাথে।

আধুকিক কবিতার তিনি একজন বিশিষ্ট ধারক কিন্তু কবিতায় ছন্দোহীনতাকে তিনি মেনে নেননি ।তিনি বিশ্বাস করেছেন অটল্ভাবে ছন্দ ও সংগীত্ময়তা ছাড়া কবিতা অসম্ভব। তিন বলেছেন– ‘Every good poem has grown out of the compost of all the poetry ever written, just as every original poet hos been accused in his time, as poets are to-day, of obscurity, of breaking the rules and flouting the tradition. Modern poetry is every poem, whether written last year or five centuries ago, that has meaning for us still.
In all ages there have been people narking about the incompetence and unintelligibility of the verse
of their contemporaries and other people acclaiming it as the highest peak of poetic achievement
, and yet other people to tell each poet exactly how ought to be writing and conducting his life .’’

দীর্ঘ উদ্ধৃতিটি ব্যবহার করতে হলো আধুনিক কবিতা এবং কবি ও পাঠক সম্পর্কটি নিজেকে এবং পাঠককে ধরিয়ে দেয়ার জন্য এবং বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। সেসিলের মহত্ত কোথায় কবি ও স্রষ্টা হিসাবে। যখন তিনি বলেন কাব্য ভাবনায় এবং কৃৎকৌশল চিন্তনে আমি কিছু অসাধারণ বহুমুখী প্রতভাবান কবির প্রভাবতাড়িত হয়েছি আর সেইসব গুণাবলিকে বিস্তারিত করেছি কবিতা সৃজনে। তিন ইয়েটস ওয়ার্ডসও্যার্থ ফ্রস্ট ভার্জিল ভালেরি অডেন হার্ডি প্রমুখের নাম করেছেন। তিনি বলেছেন যে কবিতা নিরংকুশভাবে বোধসম্পন্ন পাঠকপকে স্পর্শ করে তা অবশ্যই মৌলিক কবিতা। আমার মনে হয় বড় কবি লেখক লেখকরা একে অপরের উপর বেশি প্রভাবান্বিত হন না। তারা বোড় কাজের বড় চিন্তার ইঙ্গিত এবং সূত্রটা দ্রুত ধরে ফেলেন। বড় কবিরা ‘নোট মেকার পোয়েট’ হন না। আন্তর্জাতিকভাবে নোটমেকার পোয়েট আমার জানা মতে তাদেরকেই বলা হয় যে সব কবিরা বড় কবিদের কোনো কবিতার বিশেষ লাইন বা স্তবকের ভাবকে নিয়ে কবিতা লিখতে পারদর্শী এবং ওস্তাদ কবিরাও সাকরেদের কাজে খুশি হয়ে ঘরানার পিঠ চাপড়ান। পৃথিবীর সব দেশেই কম-বেশি এই তরিকার কাজ আছে। এরা নাম কুড়াতে আসে কাব্যধামে দীর্ঘদিন থাকে না—থাকতেও পারে না।

এবার ডে ল্যুইস সম্পর্কে কিছু কথা বলে নেয়া যেতে পারে। ওয়াল্ট হুইটম্যান—যার লেখার মধ্য দিয়ে বিস্ময়সৃষ্টিকারী [ কারো কারো মতে বিরক্তি ও নৈরাজ্য] ফ্রি-ভার্স সৃষ্টি হয়েছিলো তাকে তিনি মেনে নিতে পারেন নি। বলেছেন আমাকে প্রতিক্রিয়াশীল ও বলতে পারেন তবে ঐ লেখার ধাঁচটা তো উপন্যাসের। যদিও ইউরোপের অনেক লেখক ও হুইটুম্যানীয় ফ্রি-ভার্সে লিখছেন। কিন্তু তাঁর নিজের মতের পরিবর্তন কখনো তিনি করেননি। তিনি চমৎকার মজা করে একটি কথা বলেছেন—আমি কবি হতে চেয়েছি তাই কবিতা পড়েছি। আমি অন্যরকম মানূষ হতে চেয়েছি ‘এ ওয়ান ম্যান এলিট‘ এবং এটা ছিলো একটা সামাজিক প্রতিবাদ। সুইনবার্ন মেইজফিল্ড ভারজিল ইয়েটস কীটস টেনিসন সকলেই আমাকে আকর্ষণ করেছে। কবি হওয়ার জন্য তিনি প্রাত্যহিক প্রার্থনা পুস্তক পাঠের মটো বাধ্যতামূলক অভিধানের দুই-তিন পৃষ্ঠা পাঠ করেছেন। কবি বা কবিতার জন্য- ল্যুইস বলেছেন, একটি রঙ একটি রেখা একটি চিহ্ন একটি শব্দ এবং শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ আর অর্থের অতিরিক্ত মোহনীয় তাৎপর্য একটি অনন্য কবিতার বীজ হয়ে ঊঠতে পারে।
‘’COTEMPORARY POETS‘’ [ second edition—Editor JAMES VINSON , UK & USA 1975] এর ভূমিকা পত্রে চি ডে ল্যুইস প্রণিধানযোগ্য যে বক্তব্য দিয়েছেন টার একোতি অংশ এরকম—‘’Art cannot be a substitute for religion; but the habit of poetry has somethong in Common with the habit of prayer—through it we search the unknown and Search our own heart. to praise and to understand; we submit ourselves to a discipline which is partly a discipline of meditation , and partly one of craft,
of making language adapt itself to the conveying of states of mind incommunicable in any other way . The meditation and the craft are interfused, for his craft is the poet’s mode of meditation. ‘’ ল্যুইসের এই বক্তব্যের সাথে সবাই একমত হতে পারবেন এমন আশা করা যায় না। তবে বিষয়টি তো কোনো কবি বা পাঠককে কোনো একটি চিন্তনের ঘুড়ি ওড়াতে সাহায্য করতে পারে। নিদেনপক্ষে একটা অনুপ্রেরণা বা স্বপ্ন বা একটা মানসকল্প সৃজনের কথা ভাবাতে পারে। আসলে ল্যুইস সম্পর্কে এত কথা বলবার ভাবনা আমার মাথায় প্রথম দিকে ছিলো না। লিখতে বসে কাণ্ডটা হয়ে গেলো। আমি ভেবেছিলাম তাঁর একটাই বিশিষ্ট কবিতার কয়েকটি লাইন তুলে ধরে গুটিকয়েক কথা বলে অন্য কারো কবিতার কথা বলবো বা শুধু উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁর কবি স্বভাব সম্পর্কে জানান দেবো। এখানে ল্যুইসের একটি কবিতার অসাধারণ সহজ মাধুর্য্য দেখবো। যদি ও ল্যুইস বলেছেন, আমার কবিতা আমার মনে হয় একেকটা নতুন ফ্রেশ সিরিজ হিসাবে শুরু হয়—একটার পর একটা লাইন হিসাবে নয়।আমার কবিতার মধ্যে আমি নিরন্তর পরিবর্তন লক্ষ করি এবং আমার মধ্যেও। আমার চিন্তা আকাঙ্ক্ষা অনুভুতি ও সহানুভূতির জগতের পরিবর্তনের সাথ সাথে আবেগ বাড়ছে কবিতার ফর্মের আঙ্গিক প্রসারতা বাড়ছে। আধুনিক চিত্রকল্প কখনো ব্যক্তিগত রূপ নিচ্ছে, জীবন সমাজ রাজনীতি অর্থনীতি সামাজিক মূল্যবোধের সাথে সাথে কবিতায় ভাষা ও প্রকরণগত পরিবর্তনও ঘটছে। এটাই নিয়ম—জীবনে পরিবর্তন ঘটলে-শিল্পে ও তার প্রভাব পড়বে।আমি তার তিনটি কবিতা থেকে বিশেষ বিশেষ অংশ উদ্ধৃত করছি…

THE INNOCENT
A FORWARD child, a sullen boy,
My living image in the pool.
The glass that made me look a fool-
He was my judgement and my joy
Later, agirl and I desired
His shadow on the fern-flecked hill.
His double near our bed: and stil
The more I lived, the more he died,

BEAUTY’S END IS IN SIGHT

‘’Beauty’s end is in sight
Terminus where all feather joy’s alight
Wings that flew lightly
Fold and are iron, We see
The thin end of mortality‘’

THE NABARA

‘’Freedom is more than a word, more than the base coinage
Of statesmen, the tyrant’s dishonoured cheque, or the dreamer’s mad
Inflatedcurrency,

The ravisher shades of envy, Freedom is more than a word.
I see man’s heart two-edged, keen both for death and creation .’’

তিনটি কবিতার সংক্ষিপ্ত তিনটি ঊদ্ধৃতি জীবনবোধকে সন্ধান করে। প্রথমটি কৈশোরিক বা তারূণ্যের সহজ সরল রোমান্টিক নস্টালজিক প্রেমকে একটা ছেঁড়া ছেঁড়া ছবিতে বাধতে চায়। দ্বিতীয়টিতে জীবন ও প্রকৃতিকে মিলিয়ে আনন্দবোধে আকাশে ঊড়তে চায়- সমস্ত স্বপ্নকে ধারণ করেও মর্তভুমির সীমাবদ্ধতায় ফিরে আসে। তৃতীয়টিতে অসাধারণ ভাষা ভঙ্গিতে জীবন সমাজ স্বাধীনতাবোধ রাষ্টকাঠামোর নেতৃত্ব দুর্নীতি মানুষের স্বপ্ন ও আত্মিক মৃত্যু উঠে আসে চোখের সামনে। স্বাধীনতা শব্দের অধিক কিছু। কিন্তু মানুষের হৃদয়- সে কি দ্বিধার তলয়ার! একদিকে মৃত্যু আর অন্যদিকে জীবন? হয়তো বা তাই হয়তো বা নয়। এভাবেই কবিতা হয়ে ওঠে বোধ হয়।

প্রিয় জিললুর রহমান, ভেবেছিলাম আজ লেখাটার প্রায় অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারবো। কিন্তু শরীর দিলো না। একটু আস্তেই যেতে হবে। এখানে একটূ ভিন্ন কথা বলে রাখি। পরে হলে ভুলে যাবো। আমরা জানি আজকের যুগ শুধু কবিতা শ্রবণের যুগ নয়।শুধু পঠনপাঠন বা আবৃত্তির যুগও নয়।মর্কিন মুল্লুকের শ্রেষ্ট কবি ওয়ালেস স্টিভেন্স শুধু কবিতাকে নির্মিতি দিতেন না। পাশাপাশি তিনি কবিতাকে পাঠকের বোঝার জন্য সহজ আয়ত্বের জন্য কীভাবে কবিতাটিকে পাঠ করতে হবে সে রীতির উপর ও অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। সে কারণে তিনি কবিতাটির পাঠের রীতি ও ভঙ্গি অনুযায়ী সেভাবেই মুদ্রণ পৃষ্ঠায় সাজাতেন। এটা পাঠক বোধে যাওয়ার বা কবির নিজের বোধকে প্রকাশ করার একটি আন্তরিক কৌশল বটে।অবশ্য এটা ঠিক বোধগত চরণ বা লাইন নির্মাণ পাঠককে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। স্টিভেন্সের ভাবনা সম্পর্কিত কথাগুলি জানালাম এ কারণে যে, তাঁর কবিতাটির নাম ‘অব মডার্ন পোইয়েট্রি’।
কনফুসিয়াসকে নাকি জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো, যদি সমগ্র চিনকে শাসনের ভার আপনাকে দেয়া হয় তা হলে আপনি কী করবেন? কনফুসিয়াস নাকি বলেছিলেন, প্রথমেই আমি সকল মানুষ আর সকল জিনিসের আসল পরিচয় ও স্বরূপ জেনে নেবো। কনফুসিয়াসের বাণীর গভীরতা বুঝি।কারণ কবি ও শিল্পীর প্রধান-প্রাথমিক আবশ্যিক কাজই হলো মানুষ প্রকৃতি জীবন ও বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বস্তুনিচয়ের ভেতর-বাইরের সার্বিক পরিচয় উদ্ঘাটন করা। অর্থাৎ জীবন ও বস্তুর অন্তর্গত রহস্য ভেদ করা আর তার ছবি ও ভাব এবং প্রাণকে বর্ণনা করা।

অনেকদিন আগেই এজরা পাউণ্ড কবি –শিল্পীদের এ দায়িত্ব ও সমস্যাকে বুঝতে পেরে লিখেছিলেন,
‘’Artists are the antennae of the race. The one thing you should not do is to
suppose that when something is wrong with the arts, it is wrong with the arts
only, When a given hormone defects, it will defect through the whole system .’’
[ উদ্ধৃতি—নর্মান হোম পীয়ারসন—মার্কিন সাহিত্যের স্বর্ণ যুগ] ।

সুন্দর শব্দটি উচ্চারণ করা যতটা সহজ সুন্দরের সৃজন ততটা সহজ হলে সাধনা ও শিল্প শব্দের জন্ম হতো না। সৌন্দর্যের জন্য মূল্য দিতে হয়- কারণ তাকে আবিষ্কার করতে হয়। অসীমকে পেতে হয় জাগরণে-জীবনের সাধারণকে অতিক্রম করে। সুন্দর হঠাৎ আসে–হঠাৎ জাগে। যেন এমনই হয়, ‘গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ‘সুন্দর’, সুন্দর হল সে। ‘’মনে রাখতে হবে‘’ মানুষের অহংকার পটেই বিশ্বকর্মার বিশ্বশিল্প‘’।

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত