পরজীবী

।। স ঞ্জ য় রা য়।।

রবিবারের ‘পাত্র চাই’ কলমে বিজ্ঞাপনের পাতায় ছবিটা দেখে চমকে উঠল বিহান। ‘অস্মিতা! ডিভোর্সি!’
ফেসবুক-হোয়াটস অ্যাপহীন বিহানের বন্ধুদের সঙ্গে প্রায় যোগাযোগ নেই বললেই চলে। বিজ্ঞাপনে দেওয়া নম্বর দেখে মনস্থির করল অস্মিতাকে একদিন সে ফোন করবে। ওর ছবিটা দেখে বিহানের মনে ছেলেবেলার স্মৃতিগুলো ভিড় করে এল।
তখন কতই বা হবে, ক্লাস থ্রি কি ফোর! মাথায় এক জোড়া লাল ফিতে বাঁধা লাজুক মেয়েটা ক্লাসের প্রথম বেঞ্চটায় এসে বসল। বছরের মাঝখানে এসে ভর্তি হওয়ায় ক্লাসের সকলেই হতবাক। পরে শোনা গেল ওর বাবার বদলির চাকরি। ডাকাবুকো বিহান প্রথম দিনই অস্মিতার সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলল। লাজুক অস্মিতার নতুন পরিবেশে এসে যে বেশ অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল বিহান তা বুঝতে পারল। তবু নিজেই উদ্যোগ নিয়ে ক্লাসের সকলের সঙ্গে অস্মিতার পরিচয় করিয়ে দিল। তারপর ইস্কুলের দিনগুলি যতই গড়ায় অস্মিতা আর বিহান যেন একেবারে হরিহরআত্মা। টিফিন ভাগ করে খাওয়া। একসঙ্গে বাড়ি ফেরা, বিকেল বেলায় মাঠে গিয়ে ব্যাডমিন্টন। অস্মিতা ইস্কুল কামাই করলে বিহান ক্লাসওয়ার্কগুলি ওর খাতায় টুকে দিত। আবার কোনও দিন বিহান ইস্কুলে না এলে অস্মিতাও ওর খাতায় ক্লাসওয়ার্কগুলি তুলে দিত। বিহানদের পাশের পাড়াতেই অস্মিতারা ঘর ভাড়া নিয়েছিল, অস্মিতা আর বিহানদের মধ্যে একেবারে পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠল।
বিহানের এখনও মনে পড়ে একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজে শিল কুড়নোর দিনগুলি। বৃষ্টি-ভেজা আকাশে একই সঙ্গে রামধনুর দিকে চেয়ে থাকা। একে অপরের বেস্ট ফ্রেন্ড হিসাবেই ওরা একের পর এক ক্লাস পেরিয়েছে। তবু রঙ্গনটার সঙ্গে যখন অস্মিতা বেশি কথা বলত তখন বিহানের একটু হিংসাই হত। রঙ্গন ক্লাসের ফার্স্ট বয়। খুবই ভালো ছেলে। তাই হয়তো অস্মিতা ওর সম্বন্ধে বেশ উচ্চাশা পোষণ করত। অনেক সময় রঙ্গনের প্রতি অস্মিতার বাড়তি প্রশংসায় বিহান মনে মনে বেশ আঘাত পেত। গোমড়া মুখে বিহান অস্মিতার দিকে চেয়ে থাকত। রঙ্গনের সঙ্গে কথা শেষ করে অস্মিতা ছুটত বিহানকে ধরতে।

ছেলেবেলায় বিহানদের বাড়ির সামনের মাধবীলতা গাছটা অস্মিতার বড় প্রিয় ছিল। গ্রীষ্মের বিকেলে হালকা সুগন্ধে চারপাশ মাতিয়ে রাখত। নুইয়ে পড়া ফুলগুলির দিকে তাকিয়ে অস্মিতা বলত, ‘দেখ বিহান, কী সুন্দর! তবুও কেমন যেন অসম্পূর্ণ।

তুই ওই মোটা খুঁটিটাকে সরিয়ে দে, দেখবি গাছটা একেবারে মাটিতে লুটিয়ে পড়বে। কেমন যেন পরজীবী হয়ে বেঁচে আছে।’
অস্মিতার কথা শুনে বিহান বলত, ‘ওর সৌন্দর্যের তো একটা দাম দিবি। ধরে নে ওই খুঁটিটাই ওর জীবনসাথী। ওর সুগন্ধ চারদিকে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য ওকে সঙ্গ দিচ্ছে।’
দেখতে দেখতে ওদের জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষার সময় উপস্থিত হয়। রঙ্গন আর অস্মিতা একে অপরকে টেক্কা দিয়ে টেস্টে ভালো রেজাল্ট করে। বিহান ওদের থেকে একটু পিছিয়ে পড়ে। তার পর থেকেই ক্রমশ বিহান আর অস্মিতার সম্পর্কে নেমে আসে শীতলতা। অন্যদিকে রঙ্গনের সঙ্গে অস্মিতার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। দু’জনেই মাধ্যমিকে বেশ ভালো ফল করে। সেখানে বিহানের রেজাল্ট গড়পড়তা ছাত্রদের মতো। তখন থেকেই ছেলেবেলার বন্ধু অস্মিতা বিহানের থেকে আরও অনেকটা দূরে সরে যায়। ইতিমধ্যে অস্মিতার বাবার বদলির আদেশ আসে। অস্মিতারা অন্যত্র চলে যায়। তারপর বেশ কয়েক বছর বিহানের সঙ্গে অস্মিতার কোনও যোগাযোগ নেই। হঠাৎই বইমেলার ভিড়ে রঙ্গন আর অস্মিতার সঙ্গে দেখা বিহানের। বিহানকে দেখেই অস্মিতা চেঁচিয়ে ওঠে। পিছন ফিরতেই অস্মিতার হাসিমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে বিহানের পাতা ঝরা দিনগুলির কথা মনে পড়ে যায়।
—‘কেমন আছিস!’
—‘এই একরকম’।
—‘তুই?’
বিহান আর অস্মিতার কথার মাঝে রঙ্গন যেন বিতৃষ্ণার ভঙ্গিমা নিয়ে তাকায়।
বিহান বলে, ‘হ্যাঁরে রঙ্গন, তোর কী খবর?’
বিহানের কথায় গর্বের প্রচ্ছন্ন হাসিটুকু ঝুলিয়ে রঙ্গন বলে, ‘এই গাড়ি-বাড়ি আর অস্মিকে সামলাতে সামলাতেই দিনগুলি কেটে যাচ্ছে।’
বিহান স্বর্ণাভর কাছে শুনেছে জীবনযুদ্ধে সফল মেধাবী ছাত্র রঙ্গনকে বিয়ে করে অস্মিতার জীবনটা এখন সুখ সাগরে ভাসছে।

 

দুই

বিহান ছুটির দিনের এক সকালে ফোনটা করল। বিহানকে চিনতে পেরে আপ্লুত অস্মিতার বাবা বললেন, ‘ধরো-ধরো বাবা, আমি এক্ষুনিই অস্মিকে ফোনটা দিচ্ছি।’
বিহানের গলা শুনতে পেয়ে হতবাক অস্মি বলে উঠল, ‘এখনও তুই আমাকে মনে রেখেছিস!’ অন্যদিকে বিহানের উথালপাতাল করা মনটা শতশত প্রশ্ন নিয়ে অপেক্ষা করছে। অস্মিতার গলা শুনেই বিহান বলল, ‘সেদিনের ‘পাত্র চাই’ কলমে তোর ছবিটা দেখেই আঁতকে উঠেছিলাম। শেষ পর্যন্ত রঙ্গনটা তোকে…..।’
বিহানের কথা শেষ করতে না দিয়েই অস্মি বলল, ‘আরে ওসব কথা ছাড়। আর ওই কাগজের বিজ্ঞাপনটাও ফালতু। ওসব বাবার পাগলামো।’
বিহান কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু অস্মির কথার সাগরে বিহানের প্রাণ-মন সবকিছু ভেসে গেল।
কোনও এক শীত সকালের কুয়াশামাখা রহস্যময় প্রকৃতিতে গঙ্গার তীরে বিহানের সঙ্গে অস্মির দেখা হল। চোয়াল শক্ত করা কঠোর কঠিন মুখটাকে দেখে বিহান বড় কষ্ট পেল। প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এক রহস্যময়ী যেন বিহানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
—‘চল, ওই বেঞ্চটায় গিয়ে বসা যাক্‌।’
বিহানের কথায় অস্মি পত্রহীন শুকনো গাছটার নীচে গিয়ে বসল।
—‘তারপর, তোর খবর বল।’
—‘আমার আর কী! এই চলছে, ছাপোষা একটা জীবন। সাধারণ রোজগেরে জীবনটা টেনেটুনে কোনও মতে চালিয়ে নেওয়া।’
—‘বিয়ে করেছিস?’
—‘না রে, ওটা আর হয়ে ওঠেনি।’
দু’জনের খানিকক্ষণের নীরবতা ভেদ করে লঞ্চের ভোঁ-ভোঁ শব্দটা বেশ কর্কশ শোনাল। চারদিকে শহরটা শীতের আড়মোড়া ভেঙে একটু একটু করে যেন জেগে উঠছে। রহস্যময়ী প্রকৃতির মুখোশ ছেড়ে নরম রোদে ধীরে ধীরে মেলে ধরছে নিজেকে।
—‘আচ্ছা বিহান, ছোটবেলার সেই মাধবীলতা গাছটার কথা তোর মনে পড়ে!’
—‘তা হঠাৎই এই শীত সকালে তুই মাধবীলতাকে নিয়ে পড়লি কেন!’
—‘বল না।’
—‘আমাদের বাড়ির সামনেরটার কথা বলছিস। ওঃ, সে গাছ তো কবেই কেটে সাফ করে দিয়েছি।’
—‘নাঃ বলছিলাম ওই মাধবীলতার সঙ্গে আমার জীবনটার বেশ মিল। একদিন আমি তোকে বলেছিলাম না মাধবীলতাটা কেমন যেন অসম্পূর্ণ, পরজীবীর মতো বেঁচে রয়েছে। জানিস বিহান, আমার জীবনটাও সেই রঙ্গন নামক খুঁটিটাকে ধরে চারদিকে সুগন্ধ বিলিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু পারল না। খুঁটিটা সরে যেতেই পরজীবীটা কেমন যেন নুইয়ে পড়ল মাটিতে।’
কথাগুলো বলতে বলতে অস্মি কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। লঞ্চের ভোঁ-ভোঁ শব্দে সংবিৎ ফিরল।
—‘দেখ অস্মিতা, রঙ্গনকে তুই বড় বেশি ভরসা করেছিলি। জীবনের চূড়ান্ত সাফল্যে জয়ী রঙ্গনকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলি। সারা মন-প্রাণ সঁপে দিয়ে নিজের অস্তিত্বকে বিসর্জন দিয়েছিলি। তা না হলে তুইও তো কম ভালো ছাত্রী ছিলিস না। রঙ্গনের থেকে পড়াশোনায় তুইও তো কিছু কম ছিলি না অস্মি!’
বিহানের কথায় অস্মির চোয়াল দুটো যেন শক্ত হয়ে ওঠে। পরক্ষণেই কেমন যেন মিইয়ে যায়।
—‘আচ্ছা আমি কি সত্যিই একটা পরজীবী হয়ে রইলাম! বাবা তো আমাকে অনেক বুঝিয়েছিল, রঙ্গনকে বিয়ের চিন্তা ছেড়ে আগে তুই ইংলিশে এমএ-টা কমপ্লিট কর। অথচ তখন আমি রঙ্গনের প্রেমে পাগল। আমার নিজের কেরিয়ার নিয়ে একটুও ভাবনাচিন্তা ছিল না। আজ বাবার কথাগুলো বড্ড বেশি করে কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে। জানিস বিহান, মা-ও ওই একই কথা বলত। আমাকে রাত দিন কানের কাছে বলতেই থাকত, ওরে অস্মি, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা কর। কিন্তু আমিই তো সেসব কথায় পাত্তা দিইনি!’
কথাগুলো বলতে বলতে অস্মিতার নিজের প্রতি ঘৃণাবোধগুলো ক্রমশ ফুটে বেরিয়ে আসতে থাকে।
—‘তুই কি রঙ্গনের এগেনস্টে কোনও মামলা করেছিস?’
ভাবলেশহীন মুখে অস্মিতা জবাব দেয়, ‘না রে, আমি ওসব নোংরা পাঁকে রঙ্গনকে আর টেনে নামাতে চাইনি। আমি চাই ওর বদগুণগুলো পাল্টানোর প্রয়োজন ও জীবন থেকেই শিখুক।’
অস্মিতার কথায় বিহান যেন একজন পরিপূর্ণ মানুষকে খুঁজে পেল। অস্মির ক্ষমাপ্রবণ মানসিকতার তারিফটা না করে সে পারল না। সেদিনের চঞ্চলা হরিণী জীবন যুদ্ধের ঘাত-প্রতিঘাতে আজ কতটা পূর্ণাঙ্গ একথা ভেবেই বিহান বেশ বিস্ময় বোধ করল।
তিন
বাবা-ই একদিন অস্মিতাকে বলেছিল, ‘হ্যাঁ রে, বিহানের কোনও খবর নেই!’
—‘বাবা, তুমি আবার ওকে নিয়ে পড়লে! আমরা দুজন বেশ ভালো বন্ধু। প্রায়ই তো ফোনে ওর সঙ্গে কথা হয়।’
বাবা ইতস্তত হয়ে অস্মিকে বলল, ‘বিয়ের ব্যাপারে কিছু বলেছিস!’ বাবার কথায় অস্মিতার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।
—‘কী বলছ বাবা! তা আর হয় না। আমি বিহানকেও বলেছি আমরা দু’জন পরস্পরের ভালো বন্ধু হয়েই থাকব। এরই মধ্যে তোমার পরজীবী মেয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
এই সংসারে আমি আর ওই মাধবীলতা হয়ে গন্ধ ছড়াতে চাই না বাবা। আমি এমএ-টা কমপ্লিট করে স্বনির্ভর হতে চাই। আমার একটা চাকরি চাই বাবা।’
অস্মির চোখ দুটোয় স্বপ্নের বাতিগুলো যেন একটু একটু করে জ্বলে উঠছে। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সম্মানের সঙ্গে আজ সে বাঁচতে চায়। পরজীবী গাছটার অবলম্বনটা যখন ইচ্ছা সরে যেতেই পারে। অস্মির কাছে সংসার জীবনটা যে আজ বড় নিষ্ঠুর।

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত