| 17 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

জনক

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট

প্রফুল্ল রায়

শীতের দুপুরে সূর্য যখন সোজা মাথা র ওপর উঠে আসে সেই সময় দোতলার পশ্চিম দিকের লম্বা বারান্দায় লাল গালিচার ওপর বিছানা পেতে তার এক পাশে চশমার খাপ, রামায়ণ, মহাভারত, চণ্ডী আর দু-খানা বাংলা খবরের কাগজ যত্ন করে সাজিয়ে রেখে আসে শোভনা। ততক্ষণে দুপুরের খাওয়া শেষ হয়ে যায় শেখরনাথের। আঁচিয়ে, তোয়ালেতে মুখ মুছে আশি বছরের জীর্ণ, নড়বড়ে শরীর টানতে টানতে বারান্দায় চলে যান তিনি। শোভনা তাঁর পূত্রবধূ।

দুপুরে ধর্মগ্রন্থ আর খবরের কাগজ পড়ায় শেখরনাথের বহুকালের প্রিয় অভ্যাস। কিন্তু ইদানীং ক-বছর আর্থারাইটিসে ভীষণ কাহিল হয়ে পড়েছেন। দুই কাঁধে এবং কোমরে মাঝে মাঝে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয়। তখন মনে হয়, কেউ যেন তাতানো লোহার ফলা শরীরের ওই অংশগুলোতে জোর করে ঢুকিয়ে দিয়েছে। কড়া ডোজের ওষুধ আর ফিজিও থেরাপিতেও বিশেষ কাজ হচ্ছে না। আজকাল পেটে দুপুরের ভাতটি পড়লেই দু-চোখ জড়িয়ে আসে। বই বা কাগজ-টাগজ আর পড়া হয়ে ওঠে না, ওগুলো নড়াচড়া করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়েন।

দোতলার এই বারান্দাটা এমনভাবে টানা যে প্রথম দিকে দুপুরের রোদ একটু কোনাকুনি শেখরনাথের পায়ের ওপর স্থির হয়ে থাকে। আকাশের ঢাল বেয়ে সূর্য যত পশ্চিমে নামে, রোদ ক্রমশ তাঁর সারা গায়ে ছড়িয়ে যায়। রোদের টনিকটা তাঁর খুব দরকার।

অন্য দিনের মতো আজও শোওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন শেখরনাথ। যখন জেগে উঠলেন, বিকেল হয়ে গেছে। পশ্চিমের উঁচু উঁচু বাড়ি গাছপালার আড়ালে সূর্য ধীরে ধীরে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।

ঘুম ভাঙলেও শুয়েই রইলেন শেখরনাথ। মখমলের খাপ থেকে বাই-ফোকাল লেন্সের গোল চশমাটা বার করে চোখে পরে নিলেন। তাঁর সমস্ত শরীর এখন বেলাশেষের অনুজ্জ্বল সোনালি রোদের আরকে ডুবে আছে। শেখরনাথ জানেন কিছুক্ষণের মধ্যেই শোভনা স্যাকারিন-দেওয়া এক কাপ চা নিয়ে আসবে, সেটি শেষ হতে না হতেই দিনের শেষ আলোটুকু আর থাকবে না। হালকা পায়ে নেমে আসবে শীতের সন্ধে, তাপমাত্রা ঝপ করে নেমে যাবে কয়েক ডিগ্রি। তখন আর এক মুহূর্তও এই খোলা বারান্দায় শ্বশুরকে থাকতে দেবে না শোভনা; তাড়া দিয়ে দিয়ে ঘরের ভেতর নিয়ে যাবে। তার জন্যই অপেক্ষা করছেন শেখরনাথ।

আজ রবিবার।

বারান্দার ও-মাথায় একঝাঁক শালিক চঞ্চল পায়ে নাচানাচি করছে আর মাঝে মাঝেই হঠাৎ হঠাৎ খুশিতে কিচিরমিচির করে উঠছে। একতলায় চলছে তুমুল হইচই। তার মানে সন্দীপ, শোভনা, রাজা আর রুকু টেবল টেনিস কি ক্যারাম নিয়ে মেতে উঠেছে।

সন্দীপ শেখরনাথের একমাত্র ছেলে, একটা নাম-করা বড়ো কোম্পানির অ্যাকাউন্টস অফিসার। রাজা আর রুকু তাঁর নাতি-নাতনি। রাজা সেন্ট জেভিয়ার্সে ইংলিশ অনার্স নিয়ে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে। রুকুর এবার ক্লাস ইলেভেন, সে পড়ে ক্যালকাটা গার্লসে। ছেলেমেয়ের সঙ্গে সন্দীপ আর শোভনার সম্পর্ক বন্ধুর মতো। কোথাও যাবার না থাকলে দিনগুলো আড্ডা দিয়ে, ভিসিআর-এ ভোলো ছবি দেখে কি ক্যারাম-ট্যারাম খেলে ওরা কাটিয়ে দেয়। শালিকদের চেঁচামেচি কি নীচের তলার চিৎকার ছাড়া এখন আর কোথাও কোনো শব্দ নেই।

বাড়ির সামনে দিয়ে তিরিশ ফুট চওড়া অভয় হালদার রোড সোজা ট্রামরাস্তায় গিয়ে পড়েছে। তার ওধারে একটা মাঝারি পার্ক। শেখরনাথদের এদিকটায় বেশির ভাগ বাড়িই একতলা কি দোতলা, ক্বচিৎ দু-চারটে তেতলা। কিন্তু পার্কের ওধারে হাইরাইজের ছড়াছড়ি।

অভয় হালদার রোডে লোকজন বিশেষ নেই। বড়ো রাস্তায় দু-একটা ট্রাম, মিনি বাস কি ট্রাক গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যাচ্ছে। তাদের যেন কোথাও যাবার তাড়া নেই—সব কিছুই গন্তব্যহীন, ঢিলেঢালা, আলস্য মাখানো। দূরের পার্কটায় নানা রঙের পোশাক পরা অসংখ্য বাচ্চা ছোটাছুটি করছে, ওদের সঙ্গে রয়েছে মা কিংবা আয়ার দল। ইস্টম্যান কালারে তোলা নির্বাক সিনেমার একটি দৃশ্য যেন।

রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় উঠে বসেন শেখরনাথ। গা থেকে কম্বলটা খসে পড়ে, আস্তে আস্তে সেটা তুলে যখন ফের ভালো করে জড়িয়ে নিচ্ছেন সেই সময় চোখে পড়ে ট্রামরাস্তার মুখে এসে একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে গেল আর তার ভেতর থেকে মধ্যবয়সি একটি মহিলা নেমে রাস্তার লোকজনকে কিছু জিগ্যেস করতে করতে এ দিকেই এগিয়ে আসছে। খুব সম্ভব কারুর ঠিকানা খুঁজছে। ট্যাক্সিটা কিন্তু মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়েই থাকে। আশি বছরের নির্জীব চোখেও শেখরনাথ আবছাভাবে দেখতে পান, ড্রাইভার ছাড়া ট্যাক্সিটায় আরো একজন বসে আছে।

মহিলাটির বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। সুশ্রী, সম্ভ্রান্ত চেহারা। চিবুকের তলায়, গালে এবং কোমরে বেশ মেদ জমেছে কিন্তু সৌন্দর্যের শেষ রশ্মিগুলি এখনও তাঁর চোখমুখ থেকে একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি। পরনে কাঁথা স্টিচের দামি শাড়ি, চোখে ফ্যাশনেবল চশমা, ডান কাঁধ থেকে চমৎকার লেডিজ ব্যাগ ঝুলছে, বাঁ-হাতে বড়ো একটা সুটকেস।

কৌতূহলশূন্য চোখে লক্ষ করছিলেন শেখরনাথ। মহিলাটি বাড়ির নম্বর দেখতে দেখতে যখন তাঁদের ‘শান্তিনিবাস’-এর সামনে এসে দাঁড়ায় তখন চমকে ওঠেন। শরীর ভারী হয়ে গেলেও তিরিশ বছর আগের এক মেদহীন প্রাণবন্ত তরুণীর আদল যেন মহিলার সর্বাঙ্গে বসানো। সেই ডিম্বাকৃতি নিষ্পাপ মুখ, ঘন পালকে-ঘেরা উজ্জ্বল চোখ, তেমনই চিবুকের খাঁজ, মসৃণ ভাঁজহীন গলা। মনে মনে বিড় বিড় করেন শেখরনাথ, ‘হে ঈশ্বর, এ যেন সে না হয়।’

দোতলার বারান্দার ঠিক তলায় সদর দরজা। মহিলা সেখানে গেলে ওপর থেকে তাকে আর দেখা যায় না। তবে সে যে কলিং বেল টিপেছে তার সুরেলা আওয়াজ গোটা বাড়িটায় ছড়িয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ পর দরজা খোলার শব্দ শুনতে পান শেখরনাথ। টের পাওয়া যায়, সন্দীপরা সবাই হুড়মুড় করে আগন্তুককে দেখার জন্য দৌড়ে গেছে।

শেখরনাথ স্নায়ুমণ্ডলীকে টান টান করে বসে থাকেন। একসময় মহিলার গলা আবছাভাবে শোনা যায়, ‘এটা কি শেখরনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি?’

কণ্ঠস্বর চিনতে পারলেন শেখরনাথ। তিরিশ বছর আগে ছিল সেতারের ঝঙ্কারের মতো সতেজ; এতকাল বাদে কিছুটা মোটা আর খসখসে হয়ে গেলেও আগের রেশ অনেকটাই এখনও থেকে গেছে।

সন্দীপ বলে, ‘হ্যাঁ। আপনি কাকে চাইছেন?’

‘আমি—আমি ঢাকা থেকে আসছি। বসে কথা বলা যেতে পারে কি?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই, আসুন।’

এরপর দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ পাওয়া গেল।

আগন্তুক বলছিল ঢাকা থেকে আসছে। তার মানে সে—নিশ্চয়ই সে। এই শীতের বিকেলে অঢেল বাতাস চারিদিকে, তবু মনে হলো দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শেখরনাথের; ফুসফুস যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।

ওদিকে হইচই মাতমাতি থেমে গিয়ে নীচের তলাটা একেবারে নিঝুম হয়ে গেছে।

কী করবেন, প্রথমটা স্থির করতে পারলেন না শেখরনাথ। ব্যাকুল, বিহ্বল দৃষ্টিতে শীতের এই মিলন বেলাশেষে ম্রিয়মাণ রাস্তাঘাট আর বাড়িঘরের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে হঠাৎ মনস্থির করে ফেলেন। একটু পরে শোভনা কি সন্দীপ, কিংবা দু-জনেই দোতলায় ছুটে আসবে কিন্তু ঢাকা থেকে এইমাত্র যে এসেছে তিনি তার মুখ দেখতে চান না। এতকাল তাঁদের ধারণা ছিল সে মৃত। কিন্তু না, এখনও বেঁচে আছে, অথচ বছরের পর বছর তার মৃত্যুকামনা করতে করতে কবে যেন তাকে ভুলে গিয়েছিলেন শেখরনাথ। কী প্রয়োজন ছিল তিরিশ বছর পরে কলকাতায় এসে তাঁর বুকের গভীরে লুকোনো একটি ক্ষতকে ঘা দিয়ে দিয়ে রক্তাক্ত করে তোলার?

বিকল শরীরটাকে এক টানে টেনে তোলেন শেখরনাথ। যন্ত্রণার একটি প্রবাহ কোমর থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত তীব্র গতিতে নেমে যায়। অন্য সময় হলে তাঁর গলা দিয়ে কাতর আওয়াজ বেরিয়ে আসত। এখন কিন্তু তেমন কোনো অনুভূতিই হলো না।

বারান্দার বাঁ-পাশে তাঁর নিজস্ব ঘর। সেটায় দুটো দরজা। একটা দিয়ে বাড়ির ভেতরে যাওয়া যায়, আরেকটা এই বারান্দায় যাতায়াতের জন্য। ধড়ফড় করে ঘরে ঢুকে দুটো দরজাই বন্ধ করে দিলেন শেখরনাথ।

এখানে আসবাব বলতে খুব সামান্যই। এক ধারে দেওয়াল ঘেঁষে পুরোনো আমলের খাটে পুরু জাজিমের ওপর ধবধবে বিছানা। আরেক পাশে কাঠের ছোটো সিংহাসনে কালী থেকে গণেশ পর্যন্ত নানা দেবদেবীর মূর্তি। এ ছাড়া আছে আলনা, আলমারি, দু-একটা সেকেলে লোহার ট্রাঙ্ক। এক দেওয়ালে লক্ষ্মীর ছবিওলা বাংলা ক্যালেন্ডার এবং তার ওপর ফ্রেমে-বাঁধানো পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ বছরের এক মধ্যবয়সিনীর ফোটো। হাস্যোজ্জ্বল, সুন্দর এই মানুষটি হেমলতা—শেখরনাথের স্ত্রী। তেষট্টিতে যেবার তিনি মীরপুরে পুড়ে মারা যান সে বছরই ছবিটা তোলা হয়েছিল। এটাই হেমলতার শেষ ছবি।

দুই দরজায় খিল তুলতেই কেউ যেন ধাক্কা দিতে দিতে শেখরনাথকে বিছানায় তুলে দেয়। অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে তিনি স্ত্রীর ফোটোর দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে বসে থাকেন।

বহুবার শেখরনাথ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছেন, পেছন ফিরে তাকাবেন না। তিরিশ বছর আগে যা ঘটেছে, তার জন্যে ভেতরে বাইরে ভেঙেচুরে তিনি শতখান হয়ে গেছেন। হৃৎপিণ্ডে কত যে রক্তক্ষরণ হয়েছে তার খবর কে রাখে? সন্দীপ তখন পনেরো বছরের কিশোর। তার মুখের দিকে তাকিয়ে শোক, দুঃখ, কাতরতা ভুলতে চেষ্টা করেছেন শেখরনাথ। সময়ের হাতে এমন এক ম্যাজিক থাকে যা সমস্ত কিছুর তীব্রতা কমিয়ে দেয়; দিয়েওছিল। শেখরনাথের মনে হয়েছিল সব ভুলে গেছেন কিন্তু তিরিশ বছরের পলির স্তর সরিয়ে উঠে আসছে সেই দিনগুলো—ভীতিকর, আতঙ্কজনক, দুঃস্বপ্নে ভরা। বিস্মৃতিতে যা লুপ্ত হয়ে গেছে মনে হয়েছিল, এখন দেখা যাচ্ছে তার কিছুই হারায়নি; স্মৃতির কালাধারে অবিকল সংরক্ষিত আছে।

মনে পড়ে, দেশভাগের পর সেই আমলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে যখন শরণার্থীর ঢল নামল পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা বা আসামের দিকে, ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন হেমলতা। শেখরনাথকে বলেছিলেন, ‘চলো, বাড়ি বেচে কলকাতায় চলে যাই।’ সে সময় ইস্ট পাকিস্তানে জমিজমা বাড়িঘর বিক্রির তেমন সমস্য ছিল না।

শেখরনাথ তখন ম্যাকেঞ্জি ব্রাদার্সের জুট মিলে জুনিয়র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার। বয়স পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ। ঢাকা থেকে মাইল চল্লিশেক দূরে ধলেশ্বরীর পারে মীরপুরে ছিল চটকলটা। দেড়শো বছর ধরে শেখরনাথরা ওই শহরের স্থায়ী বাসিন্দা। বংশ-তালিকার দিক থেকে তাঁদের সপ্তম প্রজন্ম চলছিল। এর মধ্যে তাঁদের কেউ কোনোদিন অন্য কোথাও যাবার কথা ভাবেননি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বন্দ্যোপাধ্যায় বংশের শিকড় এই পুরোনো শহরটির মাটির তলায় বহুদূর ছড়িয়ে গেছে। এক কথায় তা উপড়ে ফেলা সহজ ছিল না। শেখরনাথ বলেছেন, ‘কলকাতায় যাব কেন? আমরা কি কোনো অপরাধ করেছি? এটা আমার দেশ এখানেই থাকব।’

‘কিন্তু দেখছ না, রোজ কত লোক চলে যাচ্ছে—’

‘যাক, আমরা যাচ্ছি না।’

হেমলতা উদ্বিগ্ন মুখে বলেছেন, ‘আমার মন বলছে, শেষ পর্যন্ত এদেশে থাকতে পারব না।’

শেখরনাথ ছিলেন প্রচণ্ড গোঁড়া, ব্রাহ্মণত্বের যাবতীয় সংস্কারকে তিনি প্রায় ধর্মপালণের মতো আগলে আগলে রাখতেন। কিন্তু তাঁর চরিত্রের অন্য একটি দিক ছিল, প্রতিবেশীদের তিনি বিশ্বাস করতেন, তাদের ওপর ছিল তাঁর অগাধ আস্থা। কণ্ঠস্বরে জোর দিয়ে বলেছেন, ‘এই শহরের সবাই আমাদের চেনে। তারা থাকতে কেউ আমাদের গায়ে একটা আঁচড় কাটতে পারবে না।’

হেমলতা উত্তর দেননি।

শেখরনাথ ফের বলেছেন, ‘মীরপুরে কম রায়ট হয়নি কিন্তু আমাদের কি কোনো ক্ষতি হয়েছে? লোকজন বিপদের সময় আমাদের পাশে ছুটে এসে দাঁড়ায়নি?’

তাঁদের প্রতিবেশীরা ছিল সহৃদয়, সহানুভূতিশীল। ঘোর দুঃসময়ে তারা চিরকাল পাশে পাশে। ছেচল্লিশের দাঙ্গার সময় যখন অখণ্ড ভারত জুড়ে রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল তখনও তারা শেখরনাথের গায়ে কাউকে একটা আঙুল ঠেকাতে দেয়নি। সবই ঠিক, তবু স্বামীর মতো মানুষের ওপর আস্থা রাখতে পারছিলেন না হেমলতা। দেশভাগের পর তাঁর বিশ্বাসের ভিতটাই আলগা হয়ে গিয়েছিল। তিনি অবশ্য শহরের মানুষ সম্পর্কে নিজের সংশয়ের কথাটা পরিষ্কার করে সেদিন কিছু বলেননি। শুধু শঙ্কাতুর সুরে জিজ্ঞেস করেছেন, ‘কিন্তু খুকু? তার ভবিষ্যৎ কী?’ তখন তাঁদের একটি সন্তানেরই শুধু জন্ম হয়েছে যার আদরের নাম খুকু। তখন খুকুর বয়স ছিল পাঁচ।

হেমলতার প্রশ্নের ভেতর পরিষ্কার একটা ইঙ্গিত ছিল যা বুঝতে অসুবিধে হয়নি শেখরনাথের। তাঁর স্ত্রীটি তাঁদের মতোই বরিশালের এক গোঁড়া ব্রাহ্মণ বংশের মেয়ে, বাপের বাড়ির যাবতীয় প্রাচীন সংস্কার এবং রক্ষণশীলতা অস্থিমজ্জায় পুরে তিনি শ্বশুরবাড়ি এসেছিলেন। তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল বন্দ্যোপাধ্যায় বংশের গোঁড়ামি। হেমলতার ভাবনাচিন্তা ধ্যানধারণা সব কিছুই শক্ত লোহার ফ্রেমে আটকানো, এই ফ্রেমটির বাইরে একটি পা ফেলাও তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

মনে মনে কিন্তু একটু কৌতুকই বোধ করেছিলেন শেখরনাথ, বলেছিলেন, ‘পাঁচ বছরের একটা ছোট্ট মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই ভেবে ভেবে মাথা খারাপ করে ফেলছ!’

‘ভাবতাম না, যদি দেশটা আগের দেশ থাকত। তা ছাড়া খুকুর বয়েস চিরদিন পাঁচ বছর থাকবে না।’

‘তোমার কি ধরণা এখানকার সবাই অমানুষ হয়ে গেছে?’

‘হয়তো হয়নি। কিন্তু খুকুর—’

‘বিয়ের কথা বলতে চাইছ তো?’

কিছু না বলে সোজা স্বামীর দিকে তাকিয়েছিলেন হেমলতা।

শেখরনাথ বলেছেন, ‘দেশে ভাঙন ধরলেও সবাই বাড়িঘর ফেলে ওপারে চলে যাবে না। যারা থাকবে তাদের ভেতর থেকে খুকুর জন্যে তোমার মনের মতো একটি ছেলে নিশ্চয়ই পেয়ে যাবে।’

….হঠাৎ ভেতর দিকের বন্ধ দরজায় আস্তে আস্তে টোকা পড়ে, সেই সঙ্গে শোভনার চাপা কণ্ঠস্বর শোনা যায়, ‘বাবা—বাবা—’

স্মৃতির ভেতর থেকে উঠে আসেন শেখরনাথ। কিন্তু সাড়া দিতে গিয়েও থমকে যান। শোভনা কেন এসেছে, তিনি জানেন।

কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করে শোভনা চলে যায়। একটু পরেই অন্য একজোড়া চেনা পায়ের শব্দ সিঁড়ি বেয়ে ব্যস্তভাবে দরজার সামনে এসে থামে। সন্দীপ, যার ডাক নাম লালু—এবার সে এসেছে।

সন্দীপ ডাকে, ‘বাবা, দরজা খোলো—’ তার গলা উত্তেজনা এবং অস্থিরতায় কাঁপছে।

শেখরনাথ চুপ, আচ্ছন্নের মতো বসে থাকেন।

সন্দীপ একটানা বলে যায়, ‘দরজা খোলো—দরজা খোলো, ঢাকা থেকে দিদি এসেছে।’

শেখরনাথের হৃৎপিণ্ড পলকের জন্যে থেমে এমন প্রবল গতিতে লাফাতে থাকে যে তার উত্থানপতনের শব্দ তিনি নিজেই যেন শুনতে পান। মনে হয়, বুকের ভেতর কেউ এলোপাথাড়ি হাজারটা ঢাক পিটিয়ে চলেছে।

ব্যাকুলভাবে সন্দীপ এবার বলতে থাকে, ‘বাবা, তুমি কি দিদির সঙ্গে দেখা করবে না? ও কি চলে যাবে?’

শেখরনাথ বসেই থাকেন। হতাশ, ব্যর্থ, বিপর্যস্ত সন্দীপ ডেকে ডেকে একসময় নীচে নেমে যায়।

স্বয়ংক্রিয় কোনো নিয়মে ধলেশ্বরী পারের সেই সব দিন আবার স্মৃতিতে হানা দেয় শেখরনাথের।

সেই সে খুকুকে নিয়ে হেমলতার সঙ্গে কথা হয়েছিল তারপর মীরপুরের আবহাওয়া দ্রুত বদলে যেতে থাকে। ওপার থেকে জলোচ্ছ্বাসের ঢলের মতো শরণার্থীরা যেমন ইন্ডিয়ায় চলে এসেছিল তেমনি বিহার উত্তরপ্রদেশ থেকেও অজস্র মানুষ উৎখাত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে চলে গেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম কি খুলনার মতো বড়ো বড়ো শহর ভরে যাবার পর তাদের অনেকেই চলে এসেছিল মীরপুরে। পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের মতো এদের মনেও ছিল সর্বস্ব হারানোর জন্য ক্রোধ, হতাশা আর তীব্র প্রতিশোধস্পৃহা। মীরপুরের নতুন আগন্তুকদের শক্ত চোয়ালে সবসময় নিষ্ঠুরতা ফুটে থাকত, দু-চোখে আগুন জ্বলত।

দ্বিজাতি তত্ত্বের মধ্যে যে প্রচণ্ড ঘৃণা আর অবিশ্বাস ছিল, দেশভাগের পরও তার বিষ এতটুকু কমেনি, বরং ক্রমশ বেড়েই যাচ্ছিল। ভারত আর পাকিস্তানের সম্পর্ক এমনই জটিল আর স্পর্শকাতর যে কোথাও পান থেকে সামান্য চুনটুকু খসলে সীমান্তের দু-ধারেই তুলকালাম ঘটে যেত। বাতাসে তখন বিদ্বেষের বারুদ, একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ এসে পড়ার অপেক্ষা।

যত দিন যাচ্ছিল মীরপুরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। মাঝে মাঝে ছোটোখাটো দাঙ্গাও হচ্ছিল। তবে আগের মতোই প্রতিবেশীরা শেখরনাথদের আগলে আগলে রেখেছে।

দেখতে দেখতে ক-টা বছর কেটে গেল। এর মধ্যে ম্যাকেঞ্জি ব্রাদার্সের ব্রিটিশ মালিক ঢাকার এক ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টের কাছে চটকল বেচে দিয়ে চলে গেলেন। কারখানার পরিবেশও আগের মতো রইল না। শেখরনাথ বুঝতে পেরেছিলেন এখানে তিনি অবাঞ্ছিত। হেমলতার সঙ্গে এ নিয়ে বহু আলোচনাও হয়েছে। এদিকে খুকু বড়ো হচ্ছিল। তাঁদের আরও দু-টি ছেলেও হয়েছে— সন্দীপ আর সঞ্জয়।

শুধু কারখানাতেই নয়, যে প্রতিবেশীরা ছিল তাঁদের আশাভরসা তাদের কারও কারও আচরণ, চোখমুখের চেহারা বদলে যাচ্ছিল। দেশভাগের পরও মানুষের প্রতি শেখরনাথের যে অগাধ বিশ্বাস ছিল তখন তাতে চিড় ধরতে শুরু করেছে। একবার ভাবছিলেন কলকাতায় চলে যাবেন, পরক্ষণে মনে হচ্ছিল দেখাই যাক না আর ক-টা দিন। আসলে কলকাতা ছিল তাঁর কাছে প্রায় অচেনা। সেখানে গিয়ে কী করবেন, কোথায় থাকবেন, ছেলেমেয়ে এবং স্ত্রীকে কীভাবে বাঁচাবেন, ভেবে উঠতে পারছিলেন না। ঘোর অনিশ্চয়তা তাঁকে স্থির কোনো সিদ্ধান্ত নিতে দিচ্ছিল না।

শেষ পর্যন্ত আচমকা সে বার দাঙ্গা বাধল মীরপুরে। পুরোনো প্রতিবেশীদের মধ্যে যারা শুভাকাঙ্ক্ষী ছিল তারা দৌড়ে আসার আগেই বাড়িতে আগুন লাগানো হলো, পুড়ে মারা গেলেন হেমলতা, লুট হয়ে গেল খুকু। সন্দীপ আর সঞ্জয় তখন স্কুলে, শেখরনাথ তাঁর জুট মিলে, তাই তাঁরা প্রাণে বেঁচে গেলেন।

এরপর শেখরনাথ ঠিক করে ফেললেন, এদেশে আর থাকবেন না। হিতাকাঙ্ক্ষীরাও বললেন, ‘কলকাতায় চলে যান। এখানকার যা হাল, না থাকাই ভালো।’ তারাই বাড়ি বিক্রির ব্যবস্থা করে দিল। যা দাম হওয়া উচিত তার আট ভাগের একভাগ মাত্র পাওয়া গেল।

কলকাতায় আসার পর এপারের আত্মীয়স্বজনরা, যারা পার্টিশানের সঙ্গে সঙ্গে দেশ ছেড়েছিল—অভয় হালদার রোডের এই বাড়িটা কিনে দেয়। ভালো একটি স্কুলে ভর্তি হলো সন্দীপ আর সঞ্জয়। শেখরনাথ এখানকার এক মার্কেন্টাইল ফার্মে ছোটোখাটো কাজও জোগাড় করলেন। সঞ্জয় কিন্তু বেশিদিন বাঁচেনি, কলকাতায় আসার বছরখানেকের মধ্যে ভুল চিকিৎসায় মারা যায়।

সর্বস্ব খোয়াবার পর সন্দীপকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন শেখরনাথ। এই ছেলেই তখন তাঁর ধ্যানজ্ঞান। সন্দীপও খুব শান্ত, বাধ্য, বাবা ছাড়া কিছুই জানত না। ছাত্র হিসেবেও অসাধারণ, মেধাবী। এম.কম-এ ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে কোম্পানি সেক্রেটারিশিপে ডিগ্রি নেবার পর অ্যাকাউন্টস অফিসারের চাকরি পেল। তারপর ওর বিয়ে দিলেন শেখরনাথ।

পূর্ব পাকিস্তান থেকে বুকের ভেতর দুটো দগদগে রক্তাক্ত ক্ষত নিয়ে শেখরনাথ কলকাতায় এসেছিলেন—হেমলতা আর খুকু। হেমলতা তো খুনই হয়েছেন। কিন্তু খুকু? প্রতিদিন তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন, খুকুরও যেন মৃত্যু হয়। ঈশ্বর তাঁর প্রার্থনা শোনেননি।

কখন সন্ধে নেমে গিয়েছিল, শেখরনাথ জানেন না। শীতের অন্ধকার আর হিমে বাইরের রাস্তায় কর্পোরেশনের আলোগুলোর তলায় কুয়াশার ছোটো ছোটো বৃত্ত চোখে পড়ে।

শেখরনাথ বিছানা থেকে নেমে যে ঘরের আলোটা জ্বালবেন, তেমন কোনো ইচ্ছাই নিজের মধ্যে খুঁজে পেলেন না। ঠান্ডা উত্তুরে হাওয়া যে খোলা জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকছে, সেদিকেও তাঁর খেয়াল নেই। আচ্ছন্নের মতো, অনুভূতিশূন্যের মতো তিনি বসেই থাকেন।

কতক্ষণ পর মনে নেই, আবার সিঁড়িতে পরিচিত চার জোড়া পায়ের আওয়াজ শোনা যায়। এবার আর সন্দীপ বা শোভনা আলাদা আলাদা আসেনি। রাজা আর রুকুও ওদের সঙ্গে এসেছে।

ফের দরজায় ধাক্কা পড়ে। ওরা একসঙ্গে ডাকতে থাকে, ‘বাবা—বাবা—দাদু।’

কিছুক্ষণ আগের মতোই সাড়া না দিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন শেখরনাথ।

এবার অন্য সবার গলা ছাপিয়ে সন্দীপের কণ্ঠস্বর কানে আসে, ‘তোমার ভয় নেই, দিদি চলে গেছে। ওর মুখ তোমাকে দেখতে হবে না। দরজা খোলো—’ তার গলায় ক্ষোভ, দুঃখ, হয়তো বা কিছুটা অধীরতাও মেশানো।

আশ্চর্য! যাকে তিনি দেখতে চাননি, যার জন্য তিরিশ বছর তাঁর কাছে মৃত্যু ছাড়া আর কিছু কাম্য ছিল না, সে চলে গেছে শুনে অদ্ভুত এক ব্যাকুলতা বোধ করতে থাকেন শেখরনাথ। নিজেকে টেনে-হেঁচড়ে খাট থেকে নামিয়ে আনেন, আলো জ্বেলে দরজা খুলে দেন।

কিছুক্ষণ স্থির চোখে শেখরনাথকে লক্ষ করে সন্দীপরা। তারপর একসঙ্গে সবাই ঘরে ঢোকে।

শেখরনাথের পরনে ধুতি এবং হাফ-হাতা খদ্দরের জামা ছাড়া আর কিছু নেই। রাস্তার দিকের জানালা দিয়ে হু হু করে উত্তরে হাওয়ার সঙ্গে হিম ঢুকছে। ঠান্ডায় তাঁর শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে কিন্তু তিনি বুঝি টের পাচ্ছেন না। শোভনা ছুটে ঘরের এক কোণের আলনা থেকে শাল এনে শ্বশুরের গায়ে ঘন করে জড়িয়ে দিয়ে তাঁকে ধরে ধরে বিছানায় বসিয়ে দেয়।

সন্দীপ, রুকু আর রাজা শেখরনাথের কাছে এগিয়ে এসেছিল, তবে তারা বসে না।

সন্দীপ বলে, ‘এ তুমি কী করলে বাবা! দিদিরা কত বছর ধরে আমাদের খোঁজখবর করছে। শেষ পর্যন্ত ঢাকার ইন্ডিয়ান হাই কমিশন এ বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করে নিতে পেরেছে; আর সেটা পেয়েই ওরা ছুটে এসেছিল, কিন্তু তুমি দরজায় খিল দিয়ে বসে রইলে, একবারও দিদিকে কাছে ডেকে নিলে না! দিদি কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। আর কোনোদিনই সে আসবে না।’ একটু থেমে আবার বলে, হারুণদা কী ভাবল বল তো?

রুদ্ধশ্বরে শেখরনাথ জিগ্যেস করেন, ‘কে হারুণদা?’

‘দিদির স্বামী।’

সন্দীপের কথা শেষ হতে না হতেই শেখরনাথের মুখচোখের চেহারা একেবারে বদলে যায়। তাঁকে অত্যন্ত অসুস্থ দেখায়। মনে হয় তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে। হারুণ নামটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণত্বের প্রাচীন সংস্কারগুলি শেখরনাথকে বিপর্যস্ত করে তুলতে থাকে। ভাঙা, আবছা আবছা গলায় তিনি বিড়বিড় করেন, ‘স্বামী—খুকুর স্বামী!’

সন্দীপ বাবার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করছিল। বরাবরই সে ধীর, স্থির, ধৈর্যশীল। কিন্তু এখন তাকে কিছুটা উত্তজিত দেখায়, ‘জানো, হারুণদা দিদির জন্য কী করেছেন! তিনি হাত না বাড়িয়ে দিলে দিদি আজ কোথায় তলিয়ে যেত!’ এরপর একটানা সে যা বলে তা এইরকম। তেষট্টিতে মীরপুরের সেই রায়েটের পর দাঙ্গাবাজরা যখন খুকুকে লুট করে নিয়ে যায় সেই সময় ওই অঞ্চলের সাব-ডিভিসনাল অফিসার ছিলেন হারুণ। তিনিই কয়েক মাস বাদে খুকুকে উদ্ধার করে নিজেদের বাড়ি নিয়ে যান। তারপর তাকে ফিরিয়ে দেবার জন্য শেখরনাথদের খোঁজ করতে থাকেন। কিন্তু ততদিন তাঁরা কলকাতায় চলে এসেছেন।

বছরখানেক চেষ্টার পরও যখন শেখরনাথদের সন্ধান পাওয়া গেল না তখন লাঞ্ছিতা একটি মেয়েকে সামাজিক মর্যাদা দেবার জন্য বিয়ে করেন। তাঁর মা-বাবার দিক থেকে কোনোরকম বাধা আসেনি, বরং তাঁরা পরম উদারতায় খুকুকে গ্রহণ করেছিলেন।

সেদিনের সেই তরুণ অফিসার হারুণ এখন ঢাকায় এডুকেশন মিনিস্ট্রির জয়েন্ট সেক্রেটারি। ওঁদের এক ছেলে, দুই মেয়ে। ছেলে ডাক্তার, মেয়েরা কলেজে পড়ছে।

সন্দীপ বলে, ‘ভীষণ অন্যায় হয়ে গেল বাবা, দিদি আর কোনোদিন আমাদের এখানে আসবে না।’

শেখরনাথ চুপ করে থাকেন।

সন্দীপ এবার বলে, ‘হারুণদাও এসেছিলেন। মেয়ে বাপের বাড়িতে কীরকম অভ্যর্থনা পায় সেটা বুঝে বাড়িতে ঢুকতেন। তা আর হলো না।’

ছেলের কথায় শ্লেষ ছিল। সেদিকে লক্ষ্য নেই শেখরনাথের। জোরে শ্বাস টানার মতো শব্দ করে বলেন, ‘এসেছিল!’

‘হ্যাঁ। ট্রাম রাস্তায় ট্যাক্সিতে বসেছিলেন।’

শেখরনাথের মনে পড়ে, বিকেলে খুকু যে ট্যাক্সি থেকে নেমেছিল তার ভেতর একজনকে বসে থাকতে দেখেছেন। সে-ই তা হলে হারুণ!

আরও খানিকক্ষণ বাদে সন্দীপরা চলে যায়। সাড়ে আটটা বাজলে শোভনা শেখরনাথের জন্য রাতের খাবার নিয়ে আসে—দু-খানা সুজির রুটি, আলু-কপির তরকারি, এক বাটি দুধ আর একটি সন্দেশ। শ্বশুরকে খাইয়ে, বিছানা করে তাঁকে শুইয়ে দিয়ে, চারপাশে নেটের মশারি গুঁজে চলে যায়।

অন্যদিন শোবার সঙ্গে সঙ্গে দু-চোখ জুড়ে আসে কিন্তু আজ ঘুম আসছে না। বার বার খুকুর মুখটা শেখরনাথের চোখের সামনে ফুটে উঠতে থাকে। অনেকক্ষণ শুয়ে থাকার পর মশারি সরিয়ে তিনি বাইরে বেরিয়ে আসেন এবং অস্থির পায়ে উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘরময় পায়চারি করতে থাকেন। টের পান, বুকের ভেতর অনবরত কীসের ভাঙচুর চলছে।

সারারাত নিদ্রাহীন কাটিয়ে ভোরবেলায় শেখরনাথ মনস্থির করে ফেলেন। তাঁর ঘরের সঙ্গে যে বাথরুমটি রয়েছে সেখানে গিয়ে চোখে মুখে জল দিয়ে দোতলার শেষ মাথায় রাজার ঘরের সামনে এসে দাঁড়ান। কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করার পর ঘুম ভাঙে রাজার। দরজা খুলে অবাক হয়ে যায় সে। বলে, ‘দাদু তুমি! কী হয়েছে?’

শেখরনাথ বলেন, ‘কিছু না। তোর পিসি কলকাতায় কোথায় উঠেছে রে?’

‘পার্ক স্ট্রিটের একটা হোটেলে।’

‘তুই আমাকে এখনই সেখানে নিয়ে যেতে পারবি?’

নিজের কানে শোনার পরও যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না রাজার, বিভ্রান্তের মতো সে বলে, ‘তুমি যাবে!’

শেখরনাথ আস্তে মাথা নাড়েন, হ্যাঁ।

‘কিন্তু গেলে তো দেখা হবে না।’

‘কেন?’

‘আজ সকালের ফ্লাইটে ওরা ঢাকায় যাচ্ছে। আমরা যেতে যেতে পিসিরা বেরিয়ে পড়বে।’

একটু ভেবে শেখরনাথ বলেন, ‘তা হলে তাড়াতাড়ি মুখটুখ ধুয়ে রেডি হয়ে নে। আমরা এয়ারপোর্টেই যাব। কাউকে এখন এ কথা বলার দরকার নেই।’

নিজের ঘরে ফিরে এসে দ্রুত পোশাক পালটে নেন শেখরনাথ। এক ধারে ছোট একটা লোহার সিন্দুক আছে, সেটা খুলে তার ভেতর থেকে মাঝারি একটা চামড়ার ব্যাগ বার করে সিন্দুকটা ফের বন্ধ করে দেন।

আরও কিছুক্ষণ পর রাজাকে সঙ্গে নিয়ে শেখরনাথ যখন চুপিসারে বেরিয়ে পড়েন তখনও এ বাড়ির অন্য কারও ঘুম ভাঙে নি।

শীতের এই ভোরে চারপাশের বাড়িঘর, ট্রামরাস্তা, দূরের পার্ক—সব কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে আছে। কর্পোরেশনের বাতিগুলো এখনও কেউ নিবিয়ে দিয়ে যায়নি, মরা মাছের চোখের মতো সেগুলো জ্যোতিহীন। রোদ উঠতে এখনও অনেক দেরি।

একটা ট্যাক্সি নিয়ে শেখরনাথরা এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেখেন খুকুরা আগেই এসে গেছে।

দূর থেকে খুকু অর্থাৎ মণিকা শেখরনাথদের দেখতে পেয়েছিল। হারুণ আর সে থমকে দাঁড়িয়ে যায়। ওদিকে রাজা আর শেখরনাথও থেমে গিয়েছিলেন। তার হৃৎপিণ্ড তোলপাড় হয়ে যাচ্ছিল। লক্ষ করছিলেন, খুকুর ঠোঁট দুটো থরথর করছে। তার মুখে কষ্ট আনন্দ অভিমান অভিযোগ—কত রকমের অভিব্যাক্তি যে খেলে যায়।

কতক্ষণ পর খেয়াল নেই, পায়ে পায়ে মেয়ের কাছে চলে এসেছিলেন শেখরনাথ। হঠাৎ পঞ্চাশ বছরের মধ্যবয়সী খুকু বালিকার মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। তার হাত-পায়ের জোড় যেন বিচিত্র আবেগে আলগা হয়ে যাচ্ছিল, হুড়মুড় করে সে বাবার পায়ের কাছে আছড়ে পড়ে কিন্তু তাঁকে ছোঁয় না।

নিচু হয়ে মেয়েকে বুকের কাছে তুলে নিয়ে দু-হাতে অনেকক্ষণ জড়িয়ে রাখেন। শেখরনাথ টের পান তাঁর বুক চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে।

দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন হারুণ। অত্যন্ত সুপুরুষ, বুদ্ধিদীপ্ত, উজ্জ্বল চোখমুখ। একসময় তাঁকে কাছে ডাকেন শেখরনাথ। এগিয়ে এসে হারুণ তাঁর পা ছুঁতেই তাঁকেও বুকে জড়িয়ে নেন তিনি।

অডিও সিস্টেমে ঘোষণা করা হয়, ঢাকা ফ্লাইটের যাত্রীরা যেন এয়ারক্রাফটে গিয়ে উঠে পড়েন, উড়ানের আর দেরি নেই।

ধীরে ধীরে হারুণ আর খুকুকে বুকের ভেতর থেকে মুক্ত করে সেই চামড়ার ব্যাগটা থেকে সোনার হার, একজোড়া রুলি আর একটা হিরের আংটি বার করেন। মেয়েকে সেই গয়নাগুলো দিয়ে বলেন, ‘তোকে তো কিছুই দেওয়া হয়নি। তোর বিয়ের জন্যে তোর মা এগুলো বানিয়ে রেখেছিল।’ হিরের আংটিটা হারুণকে দিয়ে বলেন, ‘এটা পরো। মাপ ঠিক হবে কিনা জানি না। যদি না হয় সোনার দোকানে নিয়ে গিয়ে ঠিক করে নিয়ো।’

এরপর অনেকক্ষণ চুপচাপ।

অডিও সিস্টেমে আরেক বার ঘোষণা হতেই হারুণ বলেন, ‘এবার আমাদের যেতে হবে।’

আস্তে মাথা নাড়েন শেখরনাথ।

হারুণ ফের বলেন, ‘একবার ঢাকায় আসুন। যাবার সব ব্যবস্থা আমি করে দেব।’

শেখরনাথ বলেন, ‘তার আগে ছেলেমেয়েদের নিয়ে তোমরা এসো।’

‘আসব।’

হারুণরা সিকিউরিটি এনক্লোজারের দিকে এগিয়ে যান। সেদিকে তাকিয়ে শেখরনাথ মনে মনে বলেন, ‘বেশ ছেলেটি।’ রক্তের ভেতর জমানো বহুকালের সংস্কারগুলির কথা এই মুহূর্তে তাঁর মনে থাকে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত