দেবীদর্শন

 

-“ধুত্তেরি শালার বৃষ্টি!”
হাতের গেলাসটা টেবিলে ঠক করে রাখলো সুনীল।
অল্পেই তার নেশা চড়ে যায়, তারপর বেসুরে গান ধরে। শেষে ধরাধরি করে বাড়ি পৌঁছতে হয়।
পল্টুদার দোকানের সকলেই জানে সেটা। জয়দেবও। তাই চুপচাপ মাথা নামিয়ে রুটি তড়কা খেতে লাগল।
কেউ পাত্তা দিল না দেখে সুনীলের বোধহয় একটু প্রেস্টিজে লাগলো। আরো স্বর চড়িয়ে বললো, “তবে তোদের আর কি, বাঁআ জল জমলেই অটোর ভাড়া দুগনা! লে, লুটে লে! নিজেদের তো আর বাড়ি ফেরার তাড়া নেই… অন্যদের লুটি!”
কথাটা মুলতঃ জয়দেবকেই বলা। অটোচালক হলেও, সে একটু অন্যরকম। গ্রাজুয়েট বেকার। মা বাবা কেউ নেই, একাই থাকে নিজের মতো একটা ঘর ভাড়া নিয়ে। চুপচাপ থাকে বলে সকলেই ওকে ভালবাসে, খ্যাপায়ও।
“সুনীলদা, আর খেও না, বাড়ি যাও এবার।” পাশ থেকে আব্দুল বলল।
“দুশশালা মোল্লা, তোর বাপের পয়সায় খাচ্ছি, যে আওয়াজ দিচ্ছিস!” মুহুর্তে পরিবেশটা থমথমে হয়ে উঠল। আব্দুল মুখ লাল করে কী একটা বলতে যাচ্ছিল, জয়দেব ইশারায় থামাল, “চেপে যা আব্দুল!”
এইসব পরিস্থিতি পল্টুদাকেই সামলাতে হয়। “আহ সুনীল, আবার ভুল বকছিস! যা, যা, অনেক রাত হলো, আমি দোকান বন্ধ করব। আব্দুল, জয়দেব, তোমরাও একটু হাত চালাও ভাই!”
জয়দেব বাকী রুটি মুখে পুরে হাত ধুতে গেল। পল্টুদা ওকে ফিসফিস করে বলল, “কিছু মনে করিস না রে ভাই, মাতালটা বড্ড জ্বালায়, তাই…”
-“আরে না না, আমি মনে করবো কেন, আব্দুলটা…”
-“ওকেও বলছি বুঝিয়ে। যা, তুই সাবধানে বাড়ি যা, সকাল থেকে ঝুম বৃষ্টি পড়ছে। গতিক সুবিধার নয়।”
বাড়ি! বাড়িই বটে। একচিমটে মৌরি মুখে ফেলে জয়দেব নিজের মনেই হাসলো। নেশার ঘোরে হলেও সুনীল বলেছে কিন্তু ঠিকই। সত্যি, আর সকলের কিছু না হোক একটা বাড়ি আছে, সেখানে অপেক্ষা করবার লোক আছে। কিন্তু তাকে অন্ধকার ঘর খুলে ঢুকতে হয় রোজ।
আর নিজের লোক বলতে একজনকেই জানে… মিতালি…
নাঃ, আবার! ভাববে না সে মিতালির কথা। এমনিতে সে নিজেকে ভুলিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু এইরকম বৃষ্টিতে তার উপোসী শরীর আর মন দুটোই বড্ড আনচান করে ওঠে।
কিছুক্ষণ উদ্দেশ্যবিহীন অটো চালিয়ে সে যখন ডেরায় ফিরলো, তখন প্রায় মাঝরাত। পোষাক বদলে জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে আবার সেই দম বন্ধ করা একাকীত্বটা ঘিরে ধরলো তাকে। ঘরের আলো নিভিয়ে, দেওয়ালের তাক থেকে কোয়ার্টার –এর বোতল টা বার করে গেলাশ আর জলের বোতল গুছিয়ে বসলো সে। রোজ মদ খায় না সে, খালি যেদিন বৃষ্টি পড়ে, আর যেদিন পড়ে না… কে যেন বলেছিলেন? নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলো জয়দেব। তারপর নিজেকেই বলতে লাগল, “আমি শালা জয়দেব, এই এলাকার অন্য কোনো অটোওয়ালা আছে আমার মতো! আমি গ্র্যাজুয়েট। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নামও আছে। কিন্তু চাকরি না পেয়ে পেটের দায়ে অটো চালাতে হয়… মা তো ছিল না ছোটবেলা থেকেই, আহা রে, বাপটা আর কিছুদিন বেঁচে থাকলে… আর ওই শালা মিতালি!”
পকেট থেকে মিতালির বহুবার দেখা ছবিটা বার করে। “মাইরি তোকে একেবারে দেবীর মতো দেখতে… কিন্তু আমার যে কবে সত্যিকারের দেবী দর্শন হবে!”
একটু দম নিতে থামলো সে। মিতালি তাকে সত্যি ভালবাসে, খোজ খবর নেয়, রান্না করে খাবার পাঠিয়ে দেয় বরকে লুকিয়ে। তার অটোতে মেলায় বা পীরবাবার থানে যায়। সুযোগ পেলে চুমু-টুমু খেতেও দেয়। ওর বর শেখরটা বুড়ো, তাই ছেলেপুলে হয় নি… আচ্ছা, জয়দেব একটা বাচ্চা দিতে পারে না মিতালিকে?
“মিতালি আমার বৌ হলে ঐ মাতাল সুনীলের কি সাধ্য হতো আমাকে নিয়ে মস্করা করবার! নাঃ রে জয়দেব, নেশা হয়ে যাছে রে তোর!” নিজেকেই বললো সে। কী সব ভুলভাল চিন্তা! মিতালি তো শেখরের বৌ, কী করে জয়দেবের… হঠাত মনে পড়ে যায়। গতকালই গঞ্জের বাজার থেকে ফেরার সময় মিতালি বললো না, যে ওর বরের খুব অসুখ, মরে গেলেই ও জয়দেবের…
ধ্বক করে জ্বলে উঠলো জয়দেবের চোখদুটো। শেখর মরে গেলেই!! হ্যাঁ, ওর মিতালিকে চাই। এই রকম একলা জীবন, আর সহ্য হচ্ছে না। এখনই চাই, এই মুহুর্তেই। বুড়ো শেখরকে খতম করে দেবে। মিতালি শুধুই তার! তার দেবী, তার প্রেম। অন্য কারো সাধ্য কি তাকে ছোঁবার! এক ঢোকে বাকি বোতলটা শেষ করে, অন্ধকারেই তার বড় ছুরিটা খবরের কাগজে মুড়ে, দরজা বন্ধ করে বৃষ্টির মধ্যেই জয়দেব অটো চালিয়ে চললো মিতালির বাড়ির দিকে।
বেশী দূর নয়, কিন্তু তুমুল বৃষ্টিতে ধীরে চালাতে হচ্ছে। নেশাটাও চড়ছে। শেখর মরলে আজ রাতেই মিতালিকে নিয়ে এলাকা ছাড়বে সে। ভোরের ট্রেন ধরে শহরে চলে যাবে। দু’জনের একটা আস্তানা ঠিক জুটে যাবে, আর লোকের ভীড়ে তাদের চিনবেও না কেউ। আর তারপর, বাকী জীবনটা শুধু সে আর মিতালি…
“ঈশশ, এই বুদ্ধিটা এতদিন আসেনি কেন…” নিজেকেই ধিক্কার দিতে দিতে মিতালির বাড়ির থেকে একটু দূরে অটোটা দাঁড় করালো জয়দেব। সারা পাড়া নিঃঝুম। নেমে, কাগজে মোড়া ছুরিটা হাতে এগিয়ে গেল চেনা দরজাটার দিকে। কিন্তু… কড়া নাড়বে? অন্য কেউ যদি জেগে যায়… এইসব ভাবতে ভাবতেই হঠাত দরজাটা খুলে গেল, আর মিতালি বেরিয়ে এসে হাউমাউ করে উঠলো… “জয় দা, তুমি কোথা থেকে… এস, তুমিই একমাত্র বাঁচাতে পারবে…” হতভম্ব জয়দেব মিতালির সঙ্গে ঘরে ঢুকে দেখল শেখরের বেজায় টান উঠেছে, প্রত্যেকটা শ্বাসের সঙ্গে চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে প্রায়… মুখটা বেঁকে গেছে… “কী করি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না, এখুনি হাসপাতালে না নিয়ে যেতে পারলে…” মিতালি ককিয়ে ওঠে।
আগুপিছু না ভেবে জয়দেব তার ছুরির প্যাকেট ছুঁড়ে ফেলে, পাঁজাকোলা করে শেখরকে তুলে নেয়। “তুই দরজা বন্ধ করে আয় আমার সঙ্গে, টাউন হাসপাতালে নিয়ে যাব এখুনি। চিন্তা করিস না।”
বৃষ্টিভেজা, অন্ধকার রাত চিরে, জল ভেঙ্গে জয়দেবের অটো এগোয়। পিছনের সীটে অসুস্থ শেখরকে কোলে জড়িয়ে ফোঁপানো মিতালিকে আয়নাতে দেখে জয়দেবের সত্যিকারের দেবীদর্শন হয়…।

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত