লাল্লু’ র জীবনবোধ কি আমাদেরও প্রভাবিত করেনা

১৪ মে কথাসাহিত্যিক,প্রকাশক,সংগঠক প্রসূন বসুর প্রয়াণ দিবস। ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


লাল্লু মহারাজ
লেখক – প্রসূন বসু
প্রকাশকাল – ২০০৫
প্রকাশক – নবপত্র প্রকাশন
দাম – ৩০ টাকা
:
শহর কলকাতা ।
এবং আরও স্পষ্টতর করে বললে উত্তর কলকাতা । সুতানুটির এই উত্তরাংশেই বসবাস লাল্লু মহারাজের । কেন তার নাম লাল্লু মহারাজ এ নিয়ে আশ পাশের লোকজন ভেবেই থই পান না , মহারাজ হতে গেলে যা যা থাকার দরকার , তার কিছুই নেই ওর মধ্যে । সাত মহলা বাড়ী , ঘোড়াশালে ঘোড়া , হাতিশালে হাতি — কিছুই নেই তার , অথচ নিজের আসল নামের পিছনে এই গালভরা নামটি কিন্তু দারুণ শোভা বর্ধন করে ।
ছেলে বুড়ো সকলের কাছেই সে মহারাজ — লাল্লু মহারাজ ।
বইয়ের শুরুতেই লাল্লুর সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দেন লেখক , তাঁর নিজস্ব দক্ষ বর্ণনায় , আর আমরা , পাঠকরা মুগ্ধ হয়ে জড়িয়ে পড়ি লাল্লুর সাথে — লেখকের লেখনীর যাদুকরীতে ।
লাল্লু ভাবতে ভালবাসে ।
ভাবনায় বুঁদ হয়ে থেকে চারপাশের শত সমস্যার সমাধান করে ফেলে সে । খুব অবাক লাগছে ? অবাক না হয়ে উপায় নেই , কারণ শুধুমাত্র এই চমকই নয় , এমন হাজারো চমক এ বইয়ের প্রতিটি ছত্রে ।
লাল্লু নির্ভীক রেবেল ।
উত্তর কলকাতার গলিতে দাঁড়িয়ে সে দিব্যি গলা ছেড়ে গান করে । বংশী বাবু যখন স্বভাব সিদ্ধ বাজখাঁই গলায় ধমকে ওঠেন তাকে , লাল্লু স্পষ্টই জানায় , — ” বেশ করছি । একশো বার করবো । রাস্তা কি আপনার একার ? রাস্তা পাবলিকের । ”
সত্যিই তো ! সাধারণ আম জনতা কে নিয়ে ছোটোদের উপযোগী এমন মনকাড়া বই খুব বেশী চোখে পড়ে কি ?
লাল্লুর এই বীর স্বভাবের জন্য স্থানীয় থানার ছোট বাবুকেও রেয়াত করে না সে । অথচ এই লাল্লুই দিনের পর দিন নিজের মামার হাতে মার খায় মুখ বুজে । স্বভাবের এই ভিন্নধর্মীতাই পাঠকের কাছে লাল্লুকে আরও গ্রহণীয় করে তোলে ।
লাল্লু আর তার প্রিয় বন্ধু , বা রাজা আর তার সেনাপতি , মুকুটবিহীন , ঢাল তলোয়ারহীন সেনাপতি । প্রতি মুহূর্তে জড়িয়ে পড়েছে হাড় হিম করা একের পর এক নানা অ্যাডভেঞ্চারে । —- ” আবার শব্দ । কিছুক্ষণ সব চুপচাপ । ফের শব্দ । খটাস । চোখ বড় বড় হয়ে গেল বিশুর , ঠিক পানতোয়ার মতো । চোখের পলক পড়াই বন্ধ হয়ে গেল তার । কি যে অঘটন আছে আজ কপালে ! কে জানে ! কার মুখ দেখে উঠেছিলো সে আজ ? ওঃ , সেই বুড়িটার ? দাঁত উঁচু , মুখ লম্বা , নাক খ্যাদা , চোখ ট্যারা , কালোপ্যাঁচা সেই বুড়িটাকে দেখলেই বুক হিম হয়ে যায় । ”
‘ লাল্লু মহারাজ ‘ এর পরতে পরতে লেখকের ফেলে আসা বাল্যকালের ছবি ।
জীবনাবসানের কিছুদিন আগে লেখা এই বই তাই বারবার মনে করিয়ে দেয় , জীবনের অনন্ত রূপটির কথা , যে জীবন লাল্লু উপভোগ করেছিল। ২১ নং পৃষ্ঠায় লেখক বলছেন , — ” পুরনো দিনের ঘটনাগুলির কথা মনে পড়লেই তন্ময় হয়ে যেতো বিশু । অসীম স্নেহে , অকুণ্ঠ ভালবাসায় সে সময় এক হাত এসে পড়তো তার ওপর , সে হাত লাল্লুর । বয়সে সম হলেও জীবন আদর্শবোধে লাল্লু ছিল কএক ধাপ এগিয়ে ।
আসলে লাল্লু কে চেনা , তাকে বোঝা সহজ কাজ নয় । একের পর এক ঘটনায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলে লাল্লু নিজেই জানিয়েছে , মানুষ চেনা সবচেয়ে কঠিন কাজ । এই জীবনবোধের উজ্জ্বল উচ্চারণই লাল্লু মহারাজ কে এক স্বতন্ত্র আসল দিয়েছে ।
‘ লাল্লু মহারাজ ‘ বইটিতে ছড়িয়ে থাকা অজস্র চরিত্রের কোলাজ আমাদের , পাঠকদের আরও একবার মনে করিয়ে দেয় , — লেখক তাঁর লেখার উপকরণ একত্র করেন প্রতিদিনের বাস্তব চালচিত্র থেকেই , — , মুন্না , মিঠু , কালী ডাক্তার , হীরালাল , বিশু , বংশীবাবু , এমনকি থানার ছোটবাবু , — এরা সবাই আমাদের প্রাত্যহিক পটচিত্রে ভেসে ওঠা অতি চেনা কিছু মুখের প্রোফাইল ।
‘ লাল্লু মহারাজ ‘ আসলে লেখকের জীবন দর্শনের জীবন্ত দলিল — যে দলিলের পরতে পরতে লেখকের আজন্ম পালিত মুল্যবোধের চিহ্ন , তাই ‘ লাল্লু মহারাজ ‘ শুধু মাত্রই ছোটদের এক বই নয় , ‘ লাল্লু মহারাজ ‘ চিরচেনা সমাজ কাঠামোর মুলে সজোরে Satire এর কুঠারাঘাত !!

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত