প্রেম @ পিকনিক

দা পিকনিকার্স। নিক্‌স নিয়োগির কোম্পানী। পিতৃদত্ত নাম নিখিলরঞ্জন। একটু বুড়ো বুড়ো, তাই ছোটো করে ছেঁটে হ্যাপেনিং করে নিয়েছে। গোটা শীতকাল জুড়ে তার রমরমা ব্যবসা। ফেসবুকে একটা পেজ আছে। সেখানে নিত্যনতুন ছবি পড়ে, আপডেটস, আর অর্ডার আসে। ভ্যারাইটি কাস্টোমার।সেবার ছোটো ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটা থিম পিকনিক করেছিল- চড়ুইভাতি। গো-অ্যাস-ইউ-লাইকে কেউ অপু-দুর্গা, কেউ পাখি, কেউ গাছ। একজন গামলা সেজেছিল। সিলভার কালারের গেঞ্জি কাপড়ের প্যান্ট জামা আর মাথায় একটা গামলার টুপি বা হেলমেট যাই বলুন। একজন শেফ ছিল আর একজন গামছা পরা রাঁধুনি। ‘দুই বিঘা জমি’র বাবু এসেছিল ছিপ আর পারিষদ সাথে। ফার্স্ট-গামলা। পরে সবাই সেসব সাজ-পোশাক ছেড়ে জিনি অ্যান্ড জনি, বেনেটন পরে নিয়েছিল; জ্যাকেট-হুডি এইসব। ডিসেম্বর তো, ঠান্ডা লেগে যাবে।

তারপর থেকে থিম পিকনিক খুব চলছে।এবারে রক অ্যান্ড রোল। গায়কদের পিকনিক কি না। সবাই বড় চুল। কেউ ঝুঁটি , কেউ আবার আলুলায়িত ঝাঁকড়া। রক বাউল এসেছে একজন। তবে মন কেড়েছে ম্যাডোনা। মেয়েটি দেখতেও ডাকসাইটে সুন্দরী। টাইট চামড়ার পেন্টুলুন আর জ্যাকেট। ভেতরে টি শার্টটা শতছিন্ন। হাতে পাড়ার আঁস্তাকুঁড় ঘেঁটে লোহা-পলা থেকে কুকুরের বকলেস আর রুদ্রাক্ষ সব আছে। এক কানে রেড ইন্ডিয়ানদের পাখির পালক, অন্য কানে রুপোলি গিটার। চুলে তিনটে সবুজ স্ট্রিকিং। চোখে পান্ডার মতো কাজল। তারই মাঝ দিয়ে বিলোল কটাক্ষ হানছে আর বাউল রকবাজ থেকে জিমি গিটার ছেত্রী সব্বাই তার পায়ে কোমরে আর সব কোথায় কোথায় পথ হারাচ্ছে।

এইসব সময়ে শত ব্যস্ততার মধ্যেও নিকস মনটা হঠাৎ একলা ব্যথায় চিনচিন করে ওঠে। দু বছর আগে ‘ছোটো কবিতার স্টল’ নামে এক কবিদল পিকনিকে এসেছিল। তাদের সঙ্গে এসেছিল কাব্যকলি। আগেও চেনা ছিল ফেসবুকে। ভারী লাবণ্যময়ী। হলুদ তাঁতের শাড়ি পরে এসেছিল। কাজল চোখদুটি ইতিউতি উড়ে বেড়াচ্ছিল নদীর ধারে, আমগাছের ছায়ায়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিক্‌স ‘চা চলবে?’ ‘পকোড়া?’ এসবেই মন দিয়েছিল বেশি। তারপর পিকনিক শেষে বাড়ি আর রাত দশটায় ফেসবুক মেসেঞ্জারে নিভৃতালাপ। রিনরিন করে বেজেছিল কাব্যকলির কবিতার মতো সে সব কথা , টুপটাপ ঝরেছিল অনেক শিশিরবিন্দু । পরের বছর আবার দেখা। এবার নীল কলমকারী। নিক্‌স লক্ষ্য করছিল দাড়ি-না-কামানো নীল জিন্স বড্ডো ছোঁকছোঁক করছে । তারপর  চিজ বাইটস ভাজা দেখতে একটু ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নিক্‌স। তারপর  স্পেশালধোঁয়া ওঠা এক প্লেট ভরা সুগন্ধ নিয়ে হাজির, নিজের হাতে তুলে দেবে কাব্যকলির চম্পাকলি হাতে, কিন্তু সে বেমালুম হাওয়া! খুঁজতে খুঁজতে বাগানবাড়ির পেছন দিকটাতে গেল। হয় তো কবিতা পেয়েছে, লিখছে দু-এক কলি। কিন্তু আঘাত, ঢ্যাং করে পিয়ানোর সব কটা রিড একসাথে বুকে বাজল। দাড়ি-না কামানো ব্লু জিন্স এর গলা। ঐ নিকস মালটা এত পাটিসাপটা মার্কা কেন বল তো? ছাড়তেই চায় না তোকে। তুইও ভালোই চালাচ্ছিস। না?

কাব্যকলি ঝর্নার মতো হাসি সহ বলে, ধুর পাগল, বয়েসে বড়ো, তাই কিছু বলতে পারি না। ক্যাবলা চৈতন্য মাল। একটা গোটা শক্তি কি জয় দা বলতে পারবে না। খেলছে খেলুক না! তোর তো গর্ব হওয়া উচিৎ!  আমি কি ফেলনা না কি? আশেপাশে কত গড়াগড়ি যায় ব্যথিত বকুল…।

হাতের প্লেটের ধোঁয়া ততক্ষণে হাওয়ায় মিশে গেছে।উলটে কান থেকে আগুন বেরোচ্ছে। শরীর খারাপের অজুহাতে অ্যাসিস্টেন্ট গঙ্গার হাতে সব ভার দিয়ে টাটা সাফারি হাওয়ার বেগে চালিয়ে চালিয়ে সোজা কলকাতা। কাব্যকলি আনফ্রেন্ডেড অ্যান্ড ব্লকড, ফ্রম লাইফ আর ফেসবুক।

তাও মন তো! কেমন করে মাঝে মাঝেই।পিকনিকে এলে তো আরো বেশিই করে।এখন আর কারো জন্যে প্লেট ভরা সুস্বাদ নিয়ে যায় না; ভাজাভুজি হলে নিজের এক প্লেট নিয়ে একটু তফাতে বসে বিয়ারের ক্যান খোলে। আজও তাই করল। এসিস্ট্যান্ট  গঙ্গা আরো দু-চার প্লেট দিয়ে গেল। আরো চার-পাঁচ ক্যান উড়ে গেল। কুয়াশার ডিসেম্বরে ঠিক তখনই ম্যাডোনা এসে দাঁড়ালো , বলল- “হাই, আয়াম নিকিতা। মে আই জয়েন ইউ?

কুয়াশার চিকের আড়ালে ঠিক যেন নব্বই সালের হিন্দি সিনেমার ড্রীম সিকোয়েন্স। অজান্তেই গান বেরিয়ে এল, হরে রামা হরে কৃষ্ণা…।

নিকিতা পটাং করে একটা ক্যান খুলে ফেলল। খুলে গেল নতুন সন্ধ্যের সম্ভাবনা বোধহয়।

আর একটু তফাতে দাঁড়িয়ে এসিস্ট্যান্ট  গঙ্গা দু হাত কপালে ঠেকালো- হে পিকনিক ঠাকুর! এদের দেখো তুমি।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত