শঙ্কর ও কুমির দিঘি

প্রিয়াঞ্জলি দেবনাথ

শেষ বিকেলের অস্তগামী সূর্য নন্দীদের বড়দিঘির ধার ঘেঁষা হেলান নারকেল গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে আস্তে আস্তে নিভে যাচ্ছে। দিঘির পশ্চিম প্রান্তের ঘাটের পাশে চড়া জমা রুপোলি বালি-মাটির ওপর নরম সূর্যের আলো পড়ে যেন সোনালি রঙ ধারণ করেছে। বিশু আনমনা হয়ে ঘাটের একেবারে নিচের সিঁড়ির ওপরের সিঁড়িতে এসে বসল। যেখানে পাশাপাশি থাকা দুটো শজনে গাছ দিঘির জল ও ডাঙার কিছুটা অংশে শজনের সাদা ফুল বিছিয়ে রেখেছে। বিশু সেই জলের অংশটার দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর গলায় হালকা আওয়াজ করে ডাকল —
— শঙ্কু, এই শঙ্কু।
আবার সব চুপচাপ। শেষ বিকেলের সূর্য আস্তে আস্তে ডুবে গেল, কিন্তু আলো পুরোপুরি নেভেনি। মিনিট কয়েক পর দিঘির পাড়ের কাছের জলটা কেমন ঢেউ খেলে খেলে উঠল। ঘোলাটে অন্ধকারে দিঘির জলের ঢেউ ভেঙে একটা শঙ্কু আকৃতির প্রাণীর মাথা হঠাৎ ঘাটের শ্যাওলা ধরা সিঁড়িতে এসে মুখ রাখে। মনে হল ধূসর রঙের একটা বৃহৎ আকৃতির কুমিরের মাথা। বছর তেরো-চোদ্দের বিশু এই মাথাটির ওপর একটু নিচু হয়ে ঝুঁকে পড়ে তার আলত হাতে মাথাটিতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তার হাতের স্পর্শে কুমিরের মতো এই প্রাণীটি আস্তে আস্তে চোখ বুজে বিশুর পায়ের পাতার ওপর মুখ এলিয়ে দিল। বিশু মুখে আর কোনো কথা বলল না। তার বুকপকেটের ভেতর থেকে ছোলা-মটর ভাজার একটা ঠোঙা বার করে একটা একটা করে ছোলা মটর প্রাণীটির বিশালাকৃতি মুখগহ্বরের ভেতর গুঁজে দিতে দিতে তাকে নিজের কোলের কাছে টেনে নেয়। এমন মমতাময়ী সখ্যতাকে কেন্দ্র করে চারিপাশের প্রকৃতিও যেন এই সময় এই দুটি জীবের সাথে একাত্ম হয়ে ওঠে। বিচ্ছুরিত নারকেল পাতার ফাঁক দিয়ে সন্ধ্যের মৃদু হাওয়া চারিদাকে ক্রমশ অন্ধকার নামিয়ে আনল।

উত্তর দিনাজপুরের একটি ছোট্ট গ্রাম কুমিরদিঘি। নন্দীদের সাতপুরুষের ভিটে-মাটি ও জমিদারি এখানে। জমিদরিরই একটি অংশ এই দিঘিটিও। লোকমুখে প্রচলিত কৃষ্ণপ্রসাদ নন্দী অর্থাৎ নন্দীদের জমিদারির প্রবর্তক যিনি, তিনিই নাকি ঢাকা থেকে ফেরার পথে পদ্মার বুক থেকে একটি ছোট্ট কুমিরের বাচ্চা এনেছিলেন। সেই সময় পাশের গ্রামের মোক্তার চৌধুরী মশাই-এর সাথে এক মদের আসরের বাক-বিতণ্ডায় তিনি নিজের প্রতিপত্তি বোঝানোর জন্য নাকি বলেছিলেন, তাঁর ক্ষমতা এতই যে হিংস্র কুমিরকেও তিনি পোষ মানাতে পারেন। তারই ফলস্বরূপ কুমিরের আমদানি। নাম দিয়েছিলেন শঙ্কর। আসলে বড়লোকদের বাহারি শখ আরকী। সেই থেকেই তিন-চারশো বছর ধরে শঙ্কর এই দিঘিতেই রয়ে গেছে। কত প্রজন্ম এল, কত প্রজন্ম গেল। কিন্তু তিনি রয়েছেন স্বমহিমায়। তবে কৃষ্ণপ্রসাদ ঠিকই বলেছিলেন। পোষ মানিয়েছিলেন বটে তিনি এই কুমিরটিকে। শিখিয়েছিলেন মানুষের সাথে সখ্যতা। খাইয়েছিলেন মানুষেরই খাবার। বলা বাহুল্য সেই থেকেই এই অঞ্চলের নাম হয়ে যায় কুমিরদিঘি।

মাঘ মাসের এক শনিবার। বারের পুজোর সাথে সাথে গ্রামের কুলচণ্ডী তলায় দু’দিকে খেজুর গাছ বেষ্টিত কুলগাছকে কেন্দ্র করে চলছে কুলচণ্ডী পুজো। প্রত্যেক ঘরের দু’জন করে পুরুষ তাদের কাঁধে একটি মইকে আশ্রয় করে তাতে পুজোর সামগ্রী সাজিয়ে এবং মেয়েরা মাথায় সরা করে ভোগ নিয়ে চলেছে দেবতার উদ্দেশ্যে। কচি-কাচারা তাদের অনুসরন করছে। আজ গ্রাম ভর্তি লোকজন। বহু দূর থেকে এসেছে কুটুমেরাও। নন্দী বাড়ির ছোটো ছেলে গনেশের তখন ক্লাস ফাইভ। তার বন্ধু-বান্ধবেরাও তার সমবয়সি। তাই গ্রামের এই সব পুজো-পার্বনে এই কচি-কাচাদেরই উন্মাদনা সব থেকে বেশি। গ্রামের নবাগত খুদে অতিথিদের নিয়ে গনেশ ও তার সাঙ্গ-পাঙ্খ চলেছে তাদের বড় দিঘির উদ্দেশ্যে।বন্ধুত্ব করাবে শঙ্করের সাথে। কিন্তু হঠাৎই ঘটে গেল দুর্যোগ। হেলান নারকেল গাছের পাশ দিয়ে দিঘির দক্ষিন দিকের যে ঘাট নেমে গেছে সেখান থেকেই পা পিছলে পড়ে গেল গনেশের মামাত ভাই বছর সাতেকের বিষ্টু। ছেলেদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল উত্তেজনা, একটা হৈ চৈ রব। তখন সন্ধ্যা নেমেছে। ঠিক যে সময়টা দিঘির পশ্চিমের ঘাটে বিশু তার পশু বন্ধুটিকে কোলের কাছে নিয়ে ছোলা-মটর খাওয়াচ্ছিল। হৈ চৈ শব্দে চমকে উঠল বিশু। সময় নষ্ট না করেই তড়িঘড়ি ঘাটের এ’দিকটা ছুটে এল সে। কিন্তু ততক্ষণে জলের বুদবুদের মধ্যে ছোট্ট শিশুটি হারিয়ে গেছে সন্ধ্যের অন্ধকারে। দিঘির পাড়ে ছেলেরা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে। বিশু লাফিয়ে দিঘিতে নামতে যাবে, ঠিক এমন সময় ঢেউ খেলে গেল দক্ষিনের ঘাটের কাছটা। আস্তে আস্তে জল থেকে ভেসে উঠল বিষ্টুর শরীর। তারপর শঙ্কুর এবড়োখেবড়ো পিঠ। জলে পড়ে বিষ্টুর জ্ঞান হারালেও এযাত্রার মতো বেঁচে গেল তারা সবাই।

শঙ্কর এমনই গ্রামের কত কচি-কাচাদের নিজের পিঠে করে প্রদক্ষিণ করিয়ছে এই দিঘি। আর বিশু, সে তো তার নিত্য সঙ্গী। মা-মরা এই ছেলেটি জন্ম থেকেই মনে হয় জেনেছে তার মা-বাবা-ভাই-বোন-বন্ধু সবই এই শঙ্কর। কী অদ্ভুত সখ্যতা একটি জলের জীবের সাথে একটি ডাঙার জীবের। গ্রামের মানুষগুলোও তাদের শঙ্করকে বড্ড ভালোবাসে। শ্রদ্ধা করে। জন্ম থেকেই তাদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না সবকিছুরই সঙ্গী এই কুমিরটি। তারা যে ঈশ্বর মানে তাকে।

এরপর মাঝে দু’মাস কেটে গেল। বৈশাখের এক সকাল। দিঘির জল শান্ত স্নিগ্ধ। চারিদিকের আম ও লিচুর মুকুলের ভারে গাছগুলো নুয়ে পড়েছে মাটিতে। আবার কোনো কোনো গাছের সবুজ বিশু-আম পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে আকাশের দিকে। শঙ্কর তখন দিঘির পশ্চিমের বালি-মাটির চড়ার ওপর গা এলিয়ে দিয়ে সকালের নরম রোদে নিজেকে সেঁকে নিচ্ছিল। এমন সময় একদল বহিরাগত শহুরে লোক মাথায় টুপি, হাতে লম্বা নলের বন্দুক নিয়ে এল কুমিরদিঘি গ্রামে। দিঘির ঘাটের কাছটায় এসে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে বাক্যালাপ শুরু করল। গ্রামের লোকেরা ছুটে এল তাদের দেখতে। ডাকা হল নন্দী বাড়ির সদস্যদেরও। কারন দিঘির মালিক তারা। শুট-বুট পরা লোকগুলো জানাল তারা বনদপ্তর থেকে আসছে। এই গ্রামের কুমিরের কথা তারা শুনেছে। এত বছরের পুরোনো কুমিরটি বনদপ্তর তথা দেশের ঐতিহ্য। তাই এটিকে সংরক্ষণের জন্য নিয়ে যাবে তারা সরকারি দপ্তরে। গ্রামের লোকজনদের মধ্যে হা-হা-কার পড়ে গেল। তারা এ প্রস্তাবে নারাজ। কিন্তু সরকারি আদেশের কাছে তারা নিরুপায়। শুরু হল কান্নার রোল। একটা থমথমে পরিবেশ। বিশু সেদিন তার শঙ্কুকে জড়িয়ে ধরে অনেক কেঁদেছে। শঙ্করের চোখ থেকেও সম্ভবত দু’ফোঁটা জল বেরিয়েছিল। তারপর শঙ্কর নিরবে নেমে গেল দিঘির জলে। আর তাকে দেখা গেল না সেদিন। কুমিরদিঘি গ্রামের আকস্মিক এই বিপর্যয়কে মেনে নিতে পারল না প্রকৃতিও। তাই মনে হয় সেদিন সারা রাত ধরে চলল কালবৈশাখীর তাণ্ডব। তছনছ করে দিল শান্ত-শিষ্ট গ্রামটিকে। আম ও লিচুর বোলে ছেয়ে গেল দিঘির জল।

বিশু এই ঝড়ের মধ্যেও সারা রাত দিঘির ধারেই বসে ছিল। শঙ্করকে অনেকবার ডেকেছে। কিন্তু কোথায় শঙ্কর ! ঝড়ের তাণ্ডবে কি তবে সেও নিস্তেজ হয়ে গেল ! ঝড় থেমে গেলে পরেরদিন সক্কাল সক্কাল বনদপ্তরের গাড়ি এসে দাঁড়াল দিঘির কাছে। দিঘির জল যেন তখনও একটা ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। বনদপ্তরের লোকজনদের মধ্যে শুরু হল জল্পনা-কল্পনা। কীভাবে নিয়ে যাবে তারা এই বিশালাকৃতির বৃদ্ধ কুমিরটিকে ! আর গ্রামবাসীদের মধ্যে নেমেছে শোকের ছায়া। এইভাবে দুপুর গড়িয়ে এল। ঠিক করা হল জল তোলপাড় করে জাল ফেলে শঙ্করকে তোলা হবে। এমন সময় শান্ত জলের গভীর থেকে শঙ্কর ভেসে উঠল মাঝ দিঘিতে। গ্রামবাসীদের দীর্ঘ নিশ্বাস ও বনদপ্তরের শহুরে লোকগুলোর হুল্লোরে একঝলক যেন কেঁপে উঠল দিঘির জল। তারপর শঙ্করের বিশালাকৃতির শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে তোলা হল ডাঙায়। কিন্তু এ কী ! এ যে একটা মৃত প্রাণীর শরীর !

খবরটা ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। খবরের চ্যানেল, সংবাদপত্রের লোকেরা ভিড় জমালো কুমিরদিঘি গ্রামে। নানা ভাবে ছাপানো হল শঙ্করের গল্প ও ছবি। কত লোকের কত বিস্ময়। কিন্তু কুমিরদিঘির লোকেরা, তারা যে সত্যি সত্যি ভালোবেসেছিল শঙ্করকে। যে ভালোবাসার কোনো শান্তনা হয় না। শেষ পর্যন্ত তাদের অনুরোধেই শঙ্করের মৃতদেহের সমাধি হল বড়দিঘির পশ্চিম পাড়ে। তারপর সরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠল তার উপর শঙ্কু আকৃতির শঙ্করের বৃহৎ মন্দির। স্থাপন করা হল কষ্টিপাথরের বাঁকানো শঙ্করের মূর্তি। সাদা ও সবুজ মার্বেলে বাঁধান হল মন্দির চাতাল। এক আভিজাত্যপূর্ণ মন্দির। কত বৈভব তার সাজ-সরঞ্জামে। গ্রামবাসীরাও আজকাল খুব গর্ব অনুভব করে তাদের শঙ্করের জন্য, এই কুমিরদিঘি গ্রামের জন্য।

এখন সকাল-সন্ধ্যে পুজো হয় মন্দিরে। ধূপ জ্বলে, সন্ধ্যা-আরতি হয়। কিন্তু এত জাঁকজমকের মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিল বিশু। হারিয়ে যাচ্ছিল তার প্রাণের বন্ধু শঙ্কু। বিশু মন্দিরে যায় না। দিঘির পাড়ে বসে থাকে রাতের পর রাত। চোখের জল ফেলে। তবু সে পাথরের মূর্তি দর্শন করে না। এইরকমই একদিন গভীর রাতে দিঘির ধারে বসে বিশু একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে দিঘির জলের দিকে। মৃদু-মন্দ গতিতে তখন ঝোরো বাতাস বয়ে যাচ্ছে জলের ওপর। হঠাৎই চোখে-মুখে অন্ধকার নেমে এল বিশুর। ঘাটের কাছের জলটা কেমন ঘোলাটে হয়ে বড় বড় ঢেউ খেলে গেল। তারপরই ঘটল ঘটনাটি। দিঘির জল থেকে আস্তে আস্তে উঠে এল শঙ্কর। বিশুর পায়ের কাছে এসে পায়ের পাতার ওপর এলিয়ে দিল তার বিশালাকৃতির মুখটি। চমকে উঠল বিশু। কাঠ হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর কেন জানি না সে ছুটে গেল মন্দিরের ভিতর। কিন্তু কী আশ্চর্য ! শঙ্করের মূর্তি সেখানে নেই। তারপর আবার সে ছুটে এল দিঘির পাড়ে। বিশুর সারা শরীর অসার হয়ে উঠল। শঙ্কর তখন পশ্চিমের বালি-মাটির চড়ার ওপর স্নিগ্ধ চাঁদের আলোতে নিজেকে মেলে দিয়েছে। শুক্লপক্ষের গোল চাঁদ তখন শঙ্করের পিঠে পড়ে বিচ্ছুরিত হয়েছে দিঘির ধারঘেঁষা থোকা থোকা বেগুনি ধুতরো ফুলের ওপর। যা বাতাসের মৃদু আন্দোলনে ক্রমাগত মাথা নেড়ে চলেছে । দিঘির চারিদিকের আম ও লিচুর মকুলের মিষ্টি গন্ধে তখন বিশু ও তার কুমিরদিঘি কেমন যেন নেশাগ্রস্থ, বিভোর হয়ে উঠল।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত