প্রিয় সোনাই

০১.
তোমাকে স্বপ্নে দেখলাম। ইদানীং মাঝে মাঝেই স্বপ্নে দেখি তোমাকে। বলা হয় না। তোমার কণ্ঠস্বর শুনলে, কিংবা, তোমাকে একটু দেখলে যে প্রশান্তি ভর করতো, বিশ্বাস করো, স্বপ্নের ভেতর তোমাকে দেখলেও বুকের ভেতর সেই একই প্রশান্তি ভর করে। ঘুম ভেঙে যায়। ভীষণ দুঃসময় ঘিরে ধরে।

অনেক জরুরী কথা বলা বাকি। ফিরে আয়, তুই ফিরে আয়, সোনাই!

০২.
জেগে আছি বলে লিখছি, এমন না। সন্ধ্যায় আলতো বৃষ্টি হয়েছে। আমি বেরোই নি। শুয়ে শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করেও ঘুম আসে নি। বুকের ভেতর যার সর্বস্ব লোপাট হবার আশঙ্কা, চোখে তার ঘুম আসে কীভাবে? বিস্তারিত বলতে পারছি না। দ্রুত ফিরিস। খুবই দ্রুত।

০৩.
বিকেলে একা একাই হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। একটা চড়ুই দেখলাম আরেকটা চড়ুইয়ের জন্য বসে আছে। একটা কাঁঠাল পাতা অবসন্ন পড়ে আছে পথে। বটগাছ থেকে নেমে আসা থোকা থোকা জট ছুঁয়ে আসা হলো। মন খারাপ হলো। বাস টেম্পু ট্রাকের হর্ণ, রিক্সার বেল, মানুষের কোলাহল এসব এখন বেশ ভালো লাগে। হারিয়ে যাওয়া যায়। ভীড়ের ভেতর তুমি যত একা হতে পারবে একা একাও ততটা পারা যায় না। আমি ভীড় খুঁজি ইদানীং। হ্যাঁ, ওই বিকেলটুকুই আমার। বা, ওই যতটুকু সময় হেঁটে হেঁটে ফিরি। পিছুটান নেই আর। ফলে অনিয়ম বেড়েছে। ও! এ মাসের শেষ দিকে পদ্মায় যাওয়া প্রায় ঠিক, যত্রতত্র এখন আর থুতু ফেলি না, ফুল হাতা শার্ট পড়ি, সিঁথি বদলে ফেলেছি, এরকম একগাদা গল্প জমে আছে। একটা মোরগের লাল টায়রা ফোকাস করে ছবি তুলতে গিয়ে কিভাবে ব্যর্থ হলাম সেই রহস্যবেদনার গল্প তো তোমাকে বলাই হয়নি!

ঘর আমাকে টানে না আর। আমি আবার বেরিয়ে পড়বো। পথ যেদিকে নেয়, চলে যাবো। এই শরৎ আমার অসহ্য লাগে। আমার পাগল পাগল লাগে! কাশফুল, নীল আকাশ, তুলোর মতো মেঘ, হলুদ রোদ… এইসব সহ্য হয় বলো?

আজ এক ভয়াবহ চাঁদ উঠেছে, সোনাই। দেখিস!

০৪.
নীড়ে ফিরবো। ফেরাটা অবশ্য-কর্তব্য। জানানো জরুরী ছিলো। মনে হলো, দ্বিধা-পর্বতে মাথা না-কুটে মরাই শ্রেয়।
এদিকে প্রচণ্ড রোদ। দেহ ও মনে সেসবের ভয়াবহ প্রভাব। মাতৃছায়া ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে।

সোনাই, আমি যাই…

০৫.
গন্তব্য যার নির্দিষ্ট পথের আনন্দ তার সীমিত। আনন্দ এই যে, আমার কোনো গন্তব্য নেই। ফলে প্রতিটি স্টপেজ, প্রতিটি আনন্দনগরই আমার ঠিকানা। কিংবা ধরে নিতে পারো, আমার আসলে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, তাই এই মিথ্যে সান্তনা। দেখলাম, বিনা পরিকল্পনাতেও সেদিন একই আকাশের ঈশান কোণে আমরা তাকিয়েছিলাম। একই ছবি আমরা দুজনে তুলেছি। এসব দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ভেবেছি শুধু, ‘এতো মিল কী করে সম্ভব! কী করে!?’ মন খারাপের এক ফালি মেঘ সূর্যটাকে ঢেকে দিচ্ছে অবিরাম। এই যে পুজো, অথচ আমি উদ্দেশ্যহীন—গন্তব্যহীন— এসব তোমাকে ভাবায় না আজ আর। শেকড়ের টান আমার তো সেই কবেই ছিন্ন হয়েছে। নতুন করে যেটুকু তৈরী করেছিলাম এমন উদাসীনতায়, অবহেলায় সেটাও একদিন নেই হয়ে যাবে, আমি জানি। মানুষের মন কথা বলতে পারে বলে রক্ষা, নইলে এই ভোর বেলায় গলায় পাহাড় সমান আড়ষ্ঠতা নিয়ে কথা আগানো যায় না।

একটি সন্তান জন্মের সাথে সাথে যেমন জন্ম হয় একজন মায়েরও, তেমনি, সেদিন ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম, সেপ্টেম্বর মানেই তো একটি সম্ভাব্য কবি-জীবনেরও জন্ম। তোমার জন্মের দিকে তাকিয়ে এখনও কৃতজ্ঞতায়, শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসে।

কথা আগানো যাচ্ছে না।

তোমার শিউলি কতদূর পরিপূর্ণ হলো, জানিও।

শুভ শারদীয়া।

০৬.
প্রচণ্ড শীত আর গরম একইসাথে টের পাচ্ছি। ফেরার পথে আলতো বৃষ্টি ধরেছিলো; ভিজেছি সামান্যই। বৃষ্টির জল শুকিয়ে যাবার আগেই আবার ঘামে ভিজে গেছি। জীবনটাকে তোমার মতো ছক কষে কষে কাটানো আমার সাধ্যের বাইরে। অন্যদের মতো গতানুগতিক জীবন আমাকে কখনোই টানেনি। এখনও টানে না। ফলে রোদ-বৃষ্টির সামান্য এই ভিন্নতা আমার ভালো লাগছিলো। ভেবেছিলাম কিছুই হবে না। কিন্তু এখন জ্বর আসছে। যে জীবনে আমাদের আনন্দের ঘটনাগুলো হাতে গুনে বলে দেয়া যায়, সেখানে তুমি বলো, জ্বরের চাইতেও সেই মুহূর্তের আনন্দটা কি মূল্যবান নয়? যদিও মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা। নাক বন্ধ হয়ে আছে। চোখও জ্বালাপোড়া করছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় ব্যথা তো তোমার অনুপস্থিতি!

কে বলো পোড়ায় কারে, কে জ্বালায় আপন শরীর!

০৭.
১৩ জুন। আনলাকি থার্টিন। হয়তো শেষের শুরু।
পরে ভেবে দেখলাম, দৃশ্যে শেষতম সংলাপটি না থাকলেই ভালো হতো। মৌনতা অনেক কথা বলে।
খারাপ লাগছে ভেবে:
আমি তোমার অংশ নই; বর্ধিতাংশ!

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত