অধ্যাপক মোজাফফর, বামপন্থা ও স্বাধীনতা

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ইরাবতী পরিবার সোহরাব হাসান’র লেখায় জানায় বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। লেখাটি ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ প্রথম আলোয় প্রকাশিত।আজ তার প্রয়াণে তা আবার পুনঃপ্রকাশ করা হলো।


 

যে দেশের মানুষ রাষ্ট্রীয় পদ ও পদক পাওয়ার জন্য সদা উন্মুখ থাকেন, সে দেশের একজন রাজনীতিকের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক গ্রহণ না করা মোটেই সামান্য ঘটনা নয়।
তিনি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ; প্রায় নিষ্ক্রিয় এবং বিভক্ত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) একাংশের সভাপতি; যিনি নিজেকে কুঁড়েঘরের মোজাফফর বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। সরকার ২০১৫ সালে অন্যদের সঙ্গে তাঁকেও স্বাধীনতা পদক দেওয়ার
ঘোষণা দিলে তিনি সবিনয়ে তা নিতে অস্বীকার করেন। তাঁর মত হলো, রাজনীতির অর্থ দেশসেবা, মানুষের সেবা। পদ বা পদবির জন্য কখনো রাজনীতি করিনি। পদক দিলে বা নিলেই সম্মানিত হয়, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আমি বিশ্বাসী নই।
১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকার ছয় সদস্যের যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছিল, তাঁদের মধ্যে একমাত্র মোজাফফর আহমদই বেঁচে আছেন। উপদেষ্টা কমিটির অন্যান্য সদস্য ছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মণি সিংহ, মনোরঞ্জন ধর ও খোন্দকার মোশতাক আহমদ। আহ্বায়ক ছিলেন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। শেষোক্ত দুজন ছাড়া বাকি সবাই আওয়ামী লীগের বাইরের মানুষ এবং তিনজনই বামপন্থী। মাওলানা ভাসানী ও মোজাফফর আহমদ ছিলেন ন্যাপের নিজ নিজ অংশের সভাপতি; মণি সিংহ কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান এবং মনোরঞ্জন ধর ন্যাশনাল কংগ্রেসের সভাপতি। তাজউদ্দীন আহমদ সবাইকে নিয়ে চলতে চেয়েছিলেন।
মোজাফফর আহমদের বয়স এখন ৯৪ বছর। থাকেন বারিধারায় মেয়ে-জামাতার বাড়িতে। তাঁরাই তাঁর দেখাশোনা করেন। কয়েক দিন আগে অসুস্থতার কারণে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। এখন বাড়িতেই আছেন। চলাফেরা করতে পারেন না। বারিধারার এই পরিবেশ তিনি মানিয়ে নিতে পারছেন না, সে কথা অনেকবার বলেছেন। সেখানে নিজেকে মনে হয়েছে ‘সোনার খাঁচায় বন্দী’। তাঁর স্ত্রী আমেনা আহমদ ন্যাপের সহসভাপতি ও সংরক্ষিত আসনে নবম ও দশম সংসদের সাংসদ।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারে বর্তমানে বেশ কয়েকজন অ-আওয়ামী লীগ সদস্য আছেন। আওয়ামী লীগ একসময় এটিকে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার বলে অভিহিত করত। কিন্তু স্বাধীনতার অব্যবহিত পর মোজাফফর আহমদই প্রথম জাতীয় সরকারের দাবি তুলেছিলেন।
বছর কয়েক আগেও তাঁকে দেখা যেত কাকরাইলের কোনো পত্রিকা স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে পত্রিকা পড়ছেন কিংবা বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। যখন দলের দাপট নেই, কর্মী নেই, তখন সাধারণ মানুষই ভরসা। রাজনীতিক হয়েও রাজনীতির বাইরের মানুষ, বিশেষ করে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ করতে তিনি বেশি আগ্রহী ছিলেন। কারও লেখা ভালো লাগলে টেলিফোন নম্বর জোগাড় করে তাঁকে ফোন করতেন। রিসিভার তুললেই ওপার থেকে শোনা যেত সেই পরিচিত কণ্ঠ, ‘ চিনতে পারছ, আমি কুঁড়েঘরের মোজাফফর।’
মোজাফফর আহমদের জন্ম ১৯২২ সােলর ১৪ এপ্রিল কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বারের এলাহাবাদ গ্রামে। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। তার আগে ছিলেন একাধিক কলেজে। চুয়ান্নতে মাত্র ২২ বছর বয়সে মুসলিম লীগের এক মন্ত্রীকে পরাজিত করে প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল পূর্ব পাকিস্তান ব্যবস্থাপক সভায় মোজাফফর আহমদ বলেছিলেন, ‘আজ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের যে প্রস্তাব আনা হয়েছে, সেটি আমাদের নেতা মাওলানা ভাসানীর একক কিংবা কোনো একটি দলের দাবি নয়। এটি হলো পূর্ব পাকিস্তানের ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষের দাবি। এটি আবেগের কিংবা ভোট লাভের স্লোগান নয়। এটি হলো প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ব্যতীত অভ্যন্তরীণ সব ব্যাপারে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত এ অঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা।’
পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফায় সে স্বায়ত্তশাসন পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছে এবং রণাঙ্গেন উপিস্থত না থাকলেও এর নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এই যুদ্ধে অন্যান্য দলের কোনো ভূমিকা ছিল না। দল কেন; সেনা, পুলিশ, ইপিআর, আনসার, ছাত্র-তরুণ, নারী, বাঙালি-অবাঙালিসহ সর্বস্তরের মানুষেরই ভূমিকা ছিল। আর যুদ্ধটাও একাত্তরের ২৬ মার্চ শুরু হয়নি। শুরুরও আগের শুরু ছিল। বামপন্থীরা মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করতে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। এটাই ইতিহাসের সত্য।
স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতিতে বামপন্থীদের বিচ্যুতি বা দুর্বলতা যত প্রকটই হোক না কেন, স্বাধীনতা-পূর্ব রাজনীতি তথা মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের ভূমিকা খাটো করে দেখার উপায় নেই। ষাটের দশকের মাঝামাঝি বামপন্থীরা মস্কো ও বেইজিং—দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মণি সিংহ, মোজাফফর আহমদ, খোকা রায়, মোহাম্মদ ফরহাদ, মতিয়া চৌধুরী, পঙ্কজ ভট্টাচার্য প্রমুখ ছিলেন মস্কো শিবিরে। আর বেইজিং শিবিরে ছিলেন মাওলানা ভাসানী, কাজী জাফর আহমদ, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো প্রমুখ। এ বিভাজন সত্ত্বেও নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তবে বেইজিংপন্থীদের যে অংশটি ‘দুই কুকুরের লড়াই’ বলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, তারা স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশের অস্তিত্ব স্বীকার করেনি।
ভারতে মস্কোপন্থী বামপন্থীরা সিপিআইেয়র সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছিল। তখন ইন্দিরা গান্ধী ও কংগ্রেসের ওপর দারুণ প্রভাব ছিল সিপিআইয়ের। অন্যদিকে বেইজিংপন্থী অংশ সিপিআইএমের সমর্থন পেলেও কংগ্রেসের নীতিনির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। একাত্তরে ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে আলাদা গেরিলা বাহিনী গঠিত হয়েছিল। ছয় হাজার কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তারা দেশের ভেতরে পাঠিয়েছে। বেইজিংপন্থীদের নিয়ে গঠিত কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি দেশের ভেতরে ঘাঁটি স্থাপন করে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। অনেকে ভারতে প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। কিন্তু বামপন্থীরা শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের উগ্রবাদী অংশের বিরোধিতার মুখে পড়েন। এ কারণে অনেক নেতা–কর্মী যুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নিলে ভারত রণকৌশল হিসেবে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি সই করে। এর আগেই অবশ্য বিচক্ষণ তাজউদ্দীন মুক্তিযুদ্ধকে জাতীয় রূপ দিতে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন এবং বিভিন্ন দেশে প্রতিনিধিদলেও বামপন্থীদের যুক্ত করেন।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে যে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন ছিল, সেটি অনেকটাই অনুপস্থিত ছিল। এর জন্য আওয়ামী লীগের একদেশদর্শী নীতি বেশি দায়ী, না বামপন্থীদের হঠকারিতা—তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। সেই সময়ে প্রধান বিরোধী দল ন্যাপ কিংবা সিপিবির কাছ থেকেও মানুষ ভিন্ন ভূমিকা আশা করেছিল। আগ বাড়িয়ে সব বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতার নীতি না নিয়ে স্বতন্ত্র অবস্থান নিতে পারলে হয়তো তারাই সত্যিকার বিরোধী দল হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু সেটি তারা করতে পারেনি বলেই শূন্যস্থানটি পূরণ করে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে আসা জাসদ। রুশ-ভারতবিরোধী স্লোগান দিয়ে দলটি রাজনীতি শুরু করলেও তাদের আসল খুঁটি কোথায় ছিল তা এখনো রহস্যাবৃত। বাহাত্তরে তারা যাকে ‘চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নক’ বলে অভিহিত করেছিল, ২০০৮ সালে তাদের সঙ্গেই গাঁটছড়া বাঁধে দলের একাংশ।
পঁচাত্তরের আগের ও পরের রাজনীতিতে একটি বড় ফারাক আছে। পঁচাত্তর–পূর্ববর্তী রাজনীতিতে বিরোধী দলগুলোর নালিশ ছিল: আওয়ামী লীগ চার মূল নীতি, বিশেষ করে সমাজতন্ত্র কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাপারে আন্তরিক নয়। অতএব প্রকৃত সমাজতন্ত্র ও খাঁটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র করতে হলে ক্ষমতার পরিবর্তন জরুরি। আর পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন ও বিরোধীরা পাল্লা দিয়ে ডানেই হাঁটছেন। বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের ফারাকটাও কমে যাচ্ছে। সংবিধানে অষ্টম সংশোধনী বহাল রেখে যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়া যায় না তা রাজনীতির অ আ ক খ পড়া বালকটিও বোঝে। তবে এর দায় বামপন্থীরাও এড়াতে পারেন না। বামেরা শক্তিশালী হলে এবং ক্ষমতার সঙ্গে লীন না হয়ে গেলে আওয়ামী লীগ যেকোনো নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করার ক্ষেত্রে তাদের কথা ভাবত। এখন ভাবে, ডান দিক থেকে চাপ আসবে কি না। এটি আওয়ামী লীগের জন্য যেমন, তেমনি দেশের জন্যও বিপজ্জনক।
তবে বামপন্থীদের বর্তমানের ভগ্নদশা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা বিচার করা ভুল হবে। আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার আগে যে সমাজতন্ত্রমুখী কর্মসূচি নিয়েছিল কিংবা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ যে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল, তাতে বামপন্থীদের প্রভাবও অনস্বীকার্য। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ষাটের দশকে বামপন্থীরা মস্কো-বেইজিং বিরোধে দ্বিখণ্ডিত না হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ভিন্নও হতে পারত।
যদি এবং কিন্তু দিয়ে ইতিহাস হয় না। তাই ইতিহাসে যার যা ভূমিকা, সেটুকু স্বীকার করতে হবে। তাতে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটির কৃতিত্ব খর্ব হবে না, বরং ঔদার্য প্রকাশ পাবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনাই ছিল সবাইকে নিয়ে পথচলা। স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মুক্তির জন্য কাজ করা। কিন্তু বাম-মধ্য সবাই সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ডানের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। উপেক্ষিত হয়েছে আমজনতার স্বার্থ।
অসুস্থ হওয়ার আগে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে টেলিফোনে কথা হতো। দেশ, সাধারণ মানুষের সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতি–প্রকৃতি নিয়েই তিনি বেশি কথা বলতেন। তাঁর মতে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হেলও সমাজতন্ত্রের আবেদন শেষ হয়নি। নতুন আঙ্গিকে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। পৃথিবী বদলাচ্ছে, বাংলাদেশও বদলাবে। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রাজনীতির দুরবস্থা কেন? তিনি বলেছিলেন, রাজনীতি পেশাও নয়, ব্যবসাও নয়। রাজনীতি হলো একটি অঙ্গীকার, যার মূল লক্ষ্য জনসেবা। রাজনীতির ভিত্তি হবে নিজের দেশকে ভালোবাসা, গরিব মানুষের স্বার্থরক্ষা করা।
মোজাফফর আহমদের এই উপলব্ধি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাবে কি না, সে প্রশ্নের জবাব ভবিষ্যৎই দেবে।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত