প্রজাপতি (পর্ব-২)

শিখা পিছন ফিরে কী করছে, বুঝতে পারছি না। ওর খোলা চুলগুলো ঘাড়ের পাশ দিয়ে এমনভাবে এলিয়ে পড়েছে, পিছন ফিরে, মাথা নামিয়ে কী করছে, কিছুই বুঝতে পারছি না। ডানা খসা প্রজাপতিটার সঙ্গে কথা বলছে নাকি, ‘প্রজাপতিঠাকুর, আমি তোমাকে মারিনি, আমার একটা ভাল বিয়েতে বাগরা দিও না, দোহাই ‘…না বাবা, জোরে হাসব না। শিখার পিছনটাও দারুণ, না? একটু একটু লম্বা ঘাড় আর কাঁধটার ঠিক মাঝখানে, স্লাইট উঁচু লাগছে। যেন ওখান থেকেই পিঠটা নেমেছে একদিকে। আর মাথাটা নিচু বলে, মনে হচ্ছে, ঘাড়টা নেমে গেছে আর-একদিকে। আর খুলিটার নিচে, ঘাড়ের ওপর কুচো কুচো চুলগুলো, দেখলেই মনে হয় ওখানটা খেয়ে দিই। জামাটাও এমন, পিঠের অনেকখানি দেখা যায়। দেখেই মনে হয়, পিঠটা খুব মিহিন একটু রোঁয়া রোঁয়া ভাবের। জামার নিচেটা আলগা হয়ে রয়েছে। হাত দিলেই ঢুকে যাবে। এখন ওর জামার ডোরাগুলোকে মনে হচ্ছে যেন শিকের গরাদের মত। তার নিচে, আবার সেই পিঠ, শিরদাঁড়াটা একটু একটু ফুটে আছে। সকালবেলা তো এখন, চানটান করেনি। শায়াটা আলগা আলগা, গোলাপী রঙের মোটা শাড়িটা কোনরকমে গোঁজা। তার জন্যেই কোমরের খানিকটা দেখা যাচ্ছে। শিরদাঁড়ার হাড়টা সেখানেই একটু দেখা যাচ্ছে। তারপরেই পিঠটাকে চিরে, ঠিক যেন একটা সরু নালি। ওর নিশ্চয় খেয়াল নেই, শায়াটা অত ঢ়িলে হয়ে গেছে। পিঠের যেখানে শেষ, আর কোমরের যেখানটায় সুরু, সেই সরু জায়গাটা ছাড়িয়ে, নিচের চওড়া দিকে বেশ খানিকটা দেখা যাচ্ছে। আর একটু নিচেটাই কেমন, আমি জানি। স্‌সাহ্‌ আমার হাত দুটো যেন কেঁই কেঁই করে ওঠে হ্যাঙলা কুকুরের মত।

কিন্তু, শিখা কী করছে। ওকি এদিকে ফিরবে না। আমি তো সত্যি বলছি, প্রজাপতিটাকে মারতে চাইনি। ধরতে চেয়েছিলাম। একবার অবিশ্যি খুব রাগ হয়ে গিয়েছিল। পালকের ঝাড়নের ছপটিটা দিয়ে পিটিয়ে ছিঁড়ে কুটে দিতে ইচ্ছা হয়েছিল। বিরজুর জুয়ার আড্ডায় একদিন যেমন বিপিন হারামজাদাকে দিয়েছিলাম। একটা ছপটি দিয়ে, চোরটাকে প্রায় তুলার মতই ধুনে দিয়েছিলাম। তারপরেও ও কেমন করে বেঁচেছিল, জানি না। প্রজাপতিটার ওপর যখন রাগ হয়ে গিয়েছিল, তখনই শিখা বলেছিল আমাকে নাকি খুনীর মত দেখাচ্ছে।

তা দেখাতে পারে। আমার ব্যাপারে, সেটা একেবারে আশ্চর্যের কথা না। তবে প্রজাপতিটার ওপর আমার একবারই রাগ হয়েছিল। যখন কড়িকাঠের গায়ে গিয়ে বসেছিল। আসলে ওর ফরফরানির জন্যেই ও মরলো। ঠিক যেন ছেউটি ছুঁড়ির মত ছটফটিয়ে ওঠা। সেই যে কথা বলছিলাম, একবার যেমন হল পিকনিক করতে গিয়ে কারখানার স্টাফ উইথ ফ্যামিলি সব। ওরকম কিছু হলে, আমার ডাক পড়বেই। কেন পড়ে, তাও জানি। যদি কোন বিপদ আপদ হয়; আচ্ছা গুণ্ডাটাকে নিয়ে যাওয়া যাক, এই আর কী। কারখানারই এক কষ্ট্রাকটারের গ্রামের দিকে বাগানবাড়িতে পিকনিক হয়েছিল। স্‌সাহ্‌, পিকনিক নাকি ওর নাম। নিজেরা যত লোক, তার থেকে বেশী চাকরবাকর বেয়ারা বাবুর্চি। গাড়ি গিয়েছিল সাতটা।

কিন্তু সে যাক্‌গে, কথা হল মেয়েগুলোকে নিয়ে। মেয়েগুলোর মধ্যে কে যে চৌদ্দ, আর কে যে চব্বিশ, কারুর বাপের বলবার ক্ষমতা ছিল না। সাজগোজ আর পোশাকের বাহার কী। যেমন ওদের খাই-খাই ভাব, তেমনি যারা দেখবে, তাদেরও খাই-খাই ভাব। তার সঙ্গে মায়েদের রেস্‌ তো ছিলই। স্টাফের মধ্যে আবার ক’টা ছিল আইবুড়ো। বয়সের হিসাব চেয়ে লাভ নেই, ওরা সব খোকা কার্তিক। বিয়ে যখন করেনি, ওদের বয়সও হয়নি। ওদর সব বৌদিরা তো ছিলই, ভাইঝিরাও ছিল। বৌদিদের সঙ্গে খালি কথা, কথা তো না, কথার রসবড়া। চোখ ঘুরিয়ে ঢুলু ঢুলু করে, কেবল কথার রসের গাঁজলা। কিন্তু বৌদিরা যতই হ্যাঁচকা দিক, মোচড় মারুক, ঠাকুরপোদের হাত্তা সব অন্যদিকে।

চ্যাটার্জি কী কাণ্ডটাই না করছিল। ওদিকে তো সালোয়ার কামিজের বুক পাছা ফেটে যাবার যোগাড়, কিন্তু খুকীটির কাকু কাকু বলে আদর কাড়বার কী ঘটা! এই বুক চেপে চেপে জড়িয়ে ধরে, নয় তো উরত চেপে কাকুকেই কাইচি মেরে হুড়োহুড়ি করে ফেলে দিতে চায়। কী? না, খুঁকি কাকুর সঙ্গে একটু হুড়যুদ্ধ করছে। আর কাকুটিও তেমনি। যা তুলে নেবার, তা তুলে নিচ্ছে। কখনো গাল টিপে দেয়, ঠোঁটে একটু টোকা মেরে দেয়, ঘাড়ে হাত দিয়ে ঝাঁকানি দিয়ে দেয়। কিন্তু একটু দূরে দূরে, একেবারে দঙ্গলের মাঝখানে না। উ-ই বিচুলির টিবিটার কাছে, পুকুরটার আমবাগানের ছায়ায়, ঝোপঝাড়ের আশেপাশে।

কিছু বলতে যাও, তা হলে সুখেন নোঙরা ইতর। ‘তোর মত একটা ছোটলোক গুগু ভাল কিছু দেখবে কী করে রে। তুই তো সব কিছু ওরকমই দেখবি?’ হ্যাঁ, আমি তো খারাপই দেখব। দেখব—দেখব, তা বলে কি বলতে যাব নাকি। মাথাখারাপ! আমিও যা তুলে নেবার, তাই নেব। আমি তো আর কাকু না, সুখেনদা। কারখানার স্টাফও না, একটা গুণ্ডা। মতলব, স্‌সাহ্‌। লগে লগেই ভাইজা ফালাইলাম। একটু দূরে গিয়ে, হাত তুলে চেঁচিয়ে বললাম, ‘কে কে খেতের কড়াইশুটি খাবে চলে এস।’

বলা মাত্রই, ‘আমি আমি’ করে এক দল দৌড় মারলো। আমার লক্ষ্য, হয় চোপরার মেয়ে না হয় মিত্তিরের। দেখলাম, সে দুটোই আসছে। সত্যি অড়হর, আর তার মধ্যে বড় বড় এক একটা হলদে চাদর বিছিয়ে রাখার মত ফুল ফোটা সর্ষের খেত—লোকে যে বলে সর্ষে ফুল দেখছে, মোটেই সেরকম মনে হয়নি, খুব সুন্দরই লাগছিল, আর উঁচু উঁচু আখের খেত, আর নীল ঝকঝকে আকাশ-শীতকাল তো, সবটা একেবারে দারুণ। তার মাঝখান দিয়ে মেয়েগুলো যখন ছুটে আসছিল, ঠিক রঙ-বেরঙের প্রজাপতির মত লাগছিল।

আমি কিন্তু ঠিক ছুটছিলাম। যাতে, ওদের ছুটিয়ে নিয়ে, বেশ দূরে চলে যাওয়া যায়। আর ওদিকে ঠিক লক্ষ্য রাখছিলাম, কাকুরাও আসে কি না; নাহ, খোকা কার্তিকদের ওদিকে তো ঝোলা নেমে গেছে, অতটা ছোটাছুটি পোষাচ্ছিল না। সব বুড়ো মাকড়সা, বসে আছি পথ চেয়ে, যা আসবি তা থাবায় চলে আয়! নড়াচড়া পোষাবে না। তবে ডাকাডাকি করলো অনেক, ‘যেও না, যেও না।’ কে কার ঝাড়ে বাঁশ কাটে। সব ছুটতে ছুটতে ততক্ষণে আমার কাছাকাছি।

আরে বাপু, কোয়ার্টার কম্পাউণ্ডের মেসিনে-ছাঁটা ঘাসের মাঠ তো না। টেনিস লনও না। ধাপে ধাপে আল, থেকে থেকে ধানকাটা মাঠ, তার ওপর দিয়ে ওরা কি সেরকম ছুটতে পারে। মিত্তিরের মেয়ে, নামটা ছিল জিনা—উহ্ রে স্‌সা—কী নাম, একেবারে রণরণানো। আমি ওর হাতটা ধরে ফেললাম, ‘পড়ে যাবে, আমার হাত ধর।

হাত না একেবারে ডানাটা চেপে ধরলো। ব্যস, কাকুর পাওয়ানা সুরু হয়ে গেল, আমিও তখন চ্যাটার্জি কাকু। কনুইটা ওর শরীরের সঙ্গে লাগিয়ে ছুটলাম। তারপরে একটা মটরশুটির খেত দেখে, ঠিক পঙ্গপালের মত ঝাঁপিয়ে পড়লাম।

অন্যদিকেও আমার লক্ষ্য ছিল ঠিক। চাষীরা দেখলেই লাঠি নিয়ে তেড়ে আসবে। এই এক কেলাসের লোক বাবা। বাড়িতে থাকলে, কিছু নিয়ে যাও। মাঠে গিয়ে হাত দিয়েছ তো, পেদিয়ে খাল খিচে দেবে। তা সে নিজের পাড়ার লোক, ভাই-বেরাদার হলেও মাপ নেই। আর, এদের কাছে বাবা ওসব সুখেন গুণ্ডা-টুণ্ডা চলবে না। ষাঁড়ের থেকেও গোঁয়ার। ‘শহরের লোক, শহরে গে বীরত্ব ফলাও,এখেনে একেবারে পুতে ফেলে দেব।’

তবে আমি ঠিক করে রেখেছিলাম, হাত জোড় করে কত্তাটত্তা বলে মেয়েগুলোকে দেখিয়ে বলব, ‘এরা তো কিছু বোঝে না কত্তা, দোষ করে ফেলেছে। নাও, দুটো টাকা নাও।

সেটি হবে না। তুমি দিতে চাইলেই, অমনি একেবারে ল্যা ল্যা করে নিয়ে নেবে, তা পাওনি। ‘কেন, আমি কি দোকান খুলে বসেছি, না হাটে এসেছি বিক্রী করতে? এইরকম বলবে। তারপরে হয় ক্ষ্যামা, নয় তো গালাগালি দিয়ে ভাগানো। আর যদি কত্তা তুষ্ট হন, তবে একেবারে দেবতা। ‘তা নেন, পয়সার কথা বলেন কেন, ছেলেমানুষ সব, দু-চারটে মটর বৈ তো না! তবে, অপুরুষ্ট্র ছিড়বেন না, পুরুষ্ট্রগুলোন খান।’

আমার ভাগ্যি ভালো, পঙ্গপালগুলোকে কেউ তেড়ে আসেনি। জিনা আমার পিঠের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে মটর তুলছিল। মটর তো তুলছিল না, গাছ টেনে ছিড়ছিল। আর খালি বলছিল, সুখেনদা,আমাকে দাও। তুমি খালি নিজেই নিচ্ছ।’

অথচ একটাও নিইনি। আমার হাত থেকে ও-ই থাবা দিয়ে নিচ্ছিল। আরে, আমার তখন গাছের মটরে নজর ছিল নাকি। আমার যা পাবার ঠিকই পাচ্ছিলাম। আর কচি কচি মটর দানা ওর মুখে পুরে দিচ্ছিলাম। দিতে গিয়ে দু-একবার আদর করে গালটা টিপেও দিচ্ছিলাম। আর ও, সেই যে এক বুলি শিখেছে, খালি লাভলি লাভলি বলে, আমার পিঠের ওপর ধামসাচ্ছিল। দে দোল দোল, ধামসা। খুব ধামসা। এদিকে ধামসানি, ওদিকে কচি মটরের রসে মুখ ভরপুর। তখন হাতটা দু-একবার বেমক্কা এদিক ওদিক করলাম। ব্যস, বুঝে নিলাম, পুরোপুরি চ্যাটার্জি কাকু হয়ে গেছি। কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম, ‘জিনা, চল আমরা আখের খেত থেকে আখ খেয়ে আসি।’

অমনি চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিল। মুখে হাত চাপ দিয়ে থামিয়ে বললাম, ‘খবরদার, ওদের বলো না, বেশী লোক গেলে ফসকে যাবে। তুমি আর আমি যাই চল।’

তৎক্ষণাৎ রাজী। ওর হাত ধরে অন্য দিকে ছুটতে আরম্ভ করলাম। বাকী মেয়েগুলো ঝাঁক বেঁধে কলকল করে উঠলো। আমি বললাম, ‘তোমরা থাক, আমরা এখুনি আসছি।’

জিনা বেশ মজাই পেল তাতে। উরে স্‌সাহ্‌, এক চোখ বুজে, চোখ মারল আমাকে। আমি তো ওর হাত ধরেছিলাম। তখন হাত দিয়ে, প্রায় বগলদাবা করে নিলাম। মাইরি, আমার যেন মনে হল, আদুরে খুকিটি শিখার থেকে বড় বড়। অথচ, জিনার বয়স তো না কি চৌদ্দ। চৌদ্দ! কিড়! কাকুরা তো তাই বলে, কিডি’। আর শিখা তো একুশ না বাইশ। শিখাকে সবাই যত বাড়াতে পারেনি, খুকিটিকে দেখছি, চ্যাটার্জি তার থেকে অনেক বেশী বাড়ন্ত গড়ন করে তুলেছে।

স্‌সাল্লা! হলুদ রঙের সরষে খেতটা পেরিয়ে, ওকে প্রায় শূন্যেই তুলে নিলাম। ও খিল খিল করে হাসলো। হাত দিয়ে আমার ঘাড়টা আঁকড়ে ধরলো। কসম! মনে হলো, সত্যি সরষে ফুল দেখছি।

না না, সরষে ফুল কী। আমার ঠিক মনে হল, আমি ক্ষ্যাপা ষাঁড় হয়ে গেছি। লাল রঙ দেখা ষাঁড়। কিছুটা দূরেই আখের খেত দেখে রেখেছিলাম। ওকে নিয়ে সেখানে গেলাম। আড়ালে গিয়ে খেতের ধারে দূবঘিাসওয়ালা একটা ছোট জায়গায় ওকে নামালাম। সেখান থেকে কেউ আমাদের দেখতে পাচ্ছে না। পেছনে, ডাইনে, বাঁয়ে দেখে নিলাম। খাসা! দরজা বন্ধ করা ঘরেও এত নিরিবিলি আর ফাঁকা মনে হয় না। বাঁ দিকে ঘন বাঁশবন। ডান দিকে আর পেছনে, খালি ধান কাটা মাঠ, অড়হর মটর সর্ষে আখের খেত। একটা মানুষ কোথাও নেই, মাথার ওপরে তো খালি আকাশ। সামনে লম্বা আখের খেত। দুবাঘাসের ওপর প্রজাপতিটা আমার বুকের কাছে।

জিনা তখনো হাসছিল ঘাসের ওপর পড়ে। আমিও ওর পাশে, ঠ্যাঙ ছড়িয়ে দিয়ে, একটা হাত ওর কোমরের ওপর রেখে খুব হাসছিলাম। ওকে হাসি বলে নাকি। মাতলামি বলে, সত্যি, কয়েক পাত্র চড়ালে যে রকম হয়, ঠিক সেইরকম মনে হচ্ছিল। মাথায় কিসসু ছিল না, প্রজাপতিটার শরীর ছাড়া। ওকেই বোধহয় নেশা চড়ে যাওয়া বলে। হাসতে হাসতেই, আমি ওর দুই বিনুনি দুদিকে ছড়ানো, ঘাড়ের মাঝখানটায় হাত দিয়েছিলাম। আঙুল দিয়ে ওখানে একটু বিলি কাটতেই, ‘উহ্’ বলে একেবারে চিত হয়ে পড়েছিল। বলেছিল, সুড়সুড়ি দিও না সুখেনদা।’

সুড়সুড়ি লাগবেই তো। কিন্তু ও চিত হয়ে পড়তেই আমি একটা হাত ওর বুকের নিচে,পেটের ওপর রেখেছিলাম। সালোয়ার কামিজের সঙ্গে যে উড়নিটা থাকে, সেটা রেখেই এসেছিল। কামিজটা ছিল বোধহয় কটস-উলের। বেগনি রঙ, তাতে আবার ফুল ফুল ছাপ। কিন্তু ফেটে যাবার যোগাড় যে! মিসেস মিত্তির, আমার মিত্তির বউদিরও যে এত না। বলেছিলাম, সুড়সুড়ি দিই নি তো ‘ বলেই হাতটা বুকের ওপর তুলে দিয়েছিলাম। তারপরে যেন খুবই মজা করছি, এমনিভাবে আমার মুখটা চেপে দিয়েছিলাম ওর কাঁধের কাছে। আমনি কোমরটাকে ঢেউ দিয়ে তুলে, হিসহিস করে হেসে উঠেছিল। ঘাসের ওপর পা দাপিয়ে, ঘাড় গলা কুঁকড়ে বলেছিল, “উহ্ম, সুখেনদা, কাতুকুতু লাগছে। আমার নেশা তখন চরমে। বলেছিলাম, মুখে কী মেখেছ বল তো, ব্রিলিয়ান্ট গন্ধ ” বলেই ঠোঁট দুটো ওর গালে চেপে দিয়েছিলাম। প্রজাপতিটা হাসতে হাসতে কাত হয়ে পড়েছিল। পড়লে কী হবে, দাঁতাল কখনো ওসব মানে! আমার যেখানকার হাত সেখানেই ছিল। আমার হাত তো না, চ্যাটার্জি কাকুর হাত। তার হাতে যেমন স্নেহ, স্নেহ না, স্তেহ বল, আমার হাতেও তখন সেইরকম। বড্ড স্তেহ, বাঘের যেমন মাংসে। বী হাতটা ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম ওর ঘাড়ের নিচে দিয়ে। গালে ঘষতে ঘষতে, ওর ঠোঁটের ওপর ঠোঁট চেপেছিলাম। যেমন ছেলেমানুষকে আদর করতে হয়। ছেলেমানুস তো।

তবে জিনা কিন্তু বড় মেয়েদের মত করেনি। এরকম অবস্থায় শিখারা হলে যা করতো। এমনভাবে তাকাতো আর এমন দু-চারটে কথা বলতো, ব্যস, তুমি কত। তাতে যেন আরো নেশা, আরো চড়া। সেখানে ধমকই ঠমক। জিনা কিন্তু হাত পা ছোঁড়াছড়িই বেশী করছিল। হাসছিল, আবার উহ্ আহ্ করছিল। কাত হয়ে, উপুড় হয়ে,চিত হয়ে, মাদী বিড়ালের মত ওলট-পালট খাচ্ছিল।

খাক না, আমার কাজ আমি করে যাচ্ছিলাম। অন গড় বলছি, তখন যদি কোন লোক এসেও পড়তো-না, আমি মানতাম না। কুকুরগুলোর যেমন অবস্থা, আমি সেই রকম হয়ে গিয়েছিলাম। ভাবলে খুব জঘন্য লাগে, কিন্তু কী করব, আমার মধ্যে বোধহয় একটা কুকুরও আছে। অবিশ্যি আমার থেকেও খারাপ অবস্থা অন্য লোকের দেখেছি। জীবনে প্রথম দেখা একটা ঘটনার কথা তো কোনদিনই ভুলিনি, ভুলবও না। নিজের সঙ্গে ন্যাকামি করে লাভ নেই, আসলে আমি চেষ্টা করলেও বোধহয় আর কখনো ভুলতে পারব না। মেয়েদের সঙ্গে আমার কিছু ঘটলেই, মানে শুটিং গেম যাকে বলে না, সেই কথাই বলছি, সেই প্রথম দেখা ঘটনাটার কথা মনে পড়বেই পড়বে। কেন, আমি বুঝতে পারি না। বিভূতি আমার বন্ধু, যে এখন একটা শহরে ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট হয়েছে, আর নয় তো গিরিন, যে এখন ঘাড়ে গদানে মোটা হয়ে গেছে—কী জানি ছাব্বিশ বছরেব একটা ছেলে, কী করে ঘাড়ে গদানে ওরকম মোটা হয়ে যায়, চশমা পরে, পাঞ্জাবী গায়ে দেয় আর কোঁচা ঝুলিয়ে বুলডগ মাক মুখ করে ইস্কুলে পড়াতে যায়, যে দু’জন আমার সঙ্গে ঘটনাটা দেখেছিল, তাদের নিশ্চয় ওসব কথা মনেই নেই আর।

কিন্তু আমি ভুলতে পারিনি। তখন কত আর বয়স হবে, আট-নয়, বড় জোর দশ। এই সন্ধ্যে প্রায় হয়ে আসে, শীতকাল, মাঠ থেকে ফিরছিলাম! ফেরার সময় হিসাবে একটু দেরীই হয়ে গিয়েছিল। বেলা থাকতে থাকতেই ফেরবার কথা। তখনো যুদ্ধ শেষ হয়নি। কিসের ছাই যুদ্ধ, কিছুই জানতাম না। শুনতাম মহাযুদ্ধ চলছে। ব্ল্যাক আউটের কথা একটু একটু মনে আছে, আর মিলিটারিদের যাতায়াত। বড় বড় ট্রাক, জীপ সব সময়েই দেখতাম, আর যততো শাদা আর কালো আমেরিকান, সাহেব আর নিগ্রো। আমাদের শহরের বেশ্যাপাড়ায় প্রায়ই তারা আসতো। কোনদিন দেখিনি, ইস্কুলে সবাই বলাবলি করতো। একটা ছেলে ছিল গণেশ মোদক, পাড়াটা ওদের বাড়ির কাছে। ও বলতো, কাল মিলিটারিরা মাগী পাড়ায় এসেছিল। তখন কিন্তু খুব লজ্জা লাগতো, একটা থ্রি ফোরে পড়া ছেলে, মাগী পাড়া বলে কী করে। এখন বুঝতে পারি, ওর বাপ মা যা বলতো, ও-ও তাই বলতো। ওর বাপ মা’র কথা পরে অনেকবার শুনেছি তো।

আমরা ফিরছিলাম, আর ফেরবার পথে, সেই পাড়াটার পাশ দিয়ে আসতে হত। আরে স্‌সাহ্‌, দেখি কিনা, পাড়াটার মোড়ের কাছেই যে নর্দমা ঘেঁষে দেওয়ালটা, তার গায়ে একটা মেয়েমানুষকে ঠেসে ধরেছে একটা শাদা মিলিটারী। প্রথমটা তো ভেবেছিলাম, মেয়েমানুষটাকে বুঝি সাহেবটা মাবছে। আমরা তিনজনেই দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। মাতাল আমেরিকানটা কী যে করছিল, প্রথমটা বুঝতে পারিনি, যেন একটা খুনের মত কিছু করবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তার হাতের মুঠোয় কয়েকটা দশ টাকার নোট দেখা যাচ্ছিল। মেয়েমানুষটা হাত দিয়ে সাহেবটাকে ঠেলে দিতে চাইছিল, কিন্তু চীৎকার করছিল না, কেবল বলছিল, ‘আহ্ মরণ, কুকুর না বেড়াল গো। মাতালটা ঘরে না গিয়ে এখানেই চেপে ধরেছে। এই ঘরকে চল, চল। ততক্ষণে ব্যাপারটা সব এমন স্পষ্ট দেখা গেল, আর কী একটা যে বুঝলাম, তখন ঠিক জানতাম না। এই আর কি, যেন একটা খারাপ অথচ অদ্ভুত কিছু। আমরা এমনিতেই পালাতাম, কিন্তু তার আগেই, ভিখিরির মত একটা লোক কোথা থেকে তেড়ে এসে, খেকিয়ে উঠেছিল, ‘এ্যাই ছোঁড়ারা, বাপের সাঙা দেখছিস, অ্যাঁ? পালা বলছি।’

তাড়া খেয়ে দৌড়ে পালিয়েছিলাম। পালিয়ে, বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে তিনজনে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে কথা বলছিলাম। কী কথা বলেছিলাম, সে সব কি আর এখন মনে আছে। সেই ব্যাপারটা নিয়েই কথা বলেছিলাম, খানিকটা ভয়ে ভয়ে আর একটা খারাপ খারাপ ভাব নিয়ে। খালি এই কথা মনে আছে, গিরিন বলেছিল, ‘বাড়িতে এ সব বলিস না যেন, মারবে। সত্যি, গিরিন মাস্টার হবে না তো কে হবে। কিন্তু তা আর বলতে হবে না, সে জ্ঞানটি টনটনে। বাড়িতে বলা চলবে না। তবে সেই ব্যাপারটা আমি কোন দিন ভুলতে পারিনি, কোন দিন পারব বলেও মনে হয় না। ওটা একটা এমন ব্যাপার, যেন আমার গায়ে কেউ কলকে পুড়িয়ে ছাপ দিয়ে দিয়েছে। গায়ে মানে মনে। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আর ইস্কুল মাস্টার, তাদের নিশ্চয় মনে নেই ও সব, কারণ ওরা তো খারাপ না, আমার মত হয়নি। কিন্তু আমার যে কেন মনে গেঁথে গেল, কে জানে। এমন কি, যখন একলা থাকি, তখন যদি সেই ব্যাপারটা মনে পড়ে যায়, অমনি শরীরটা গরম হয়ে রণরণ করে ওঠে। আর কোন মেয়ের সঙ্গে যখন খেলি, তখন একবারের জন্যে হলেও মনে পড়বে। শুধু তাই না, আমার ওরকম করতেও ইচ্ছা করে, ঠিক সেই মিলিটারিটার মত। কেন, তা বুঝতে পারি না। ও ব্যাপারটা মনে করা মানেই, ঝাঁঝালো নেশা করার মত। ঠিক একটা ম্যাজিকের মত, চট করে চড়ে যায়।

অথচ ব্যাপারটা কুকুর-টুকুরের মতই তো। খুবই জঘন্য, অথচ কী একটা নেশা, কোন তাল জ্ঞান থাকে না। কেন, বাবার ব্যাপারটা কী। আমার মা দেখতে তো দারুণ সুন্দরী ছিল। আমার তেরো বছর বয়সে মা মারা গেছে। আমার পরিষ্কার মনে আছে, মায়ের রঙ ছিল কি রকম একটা সোনালী সোনালী ফরসা। সাহেবদের যেমন একটা লাল মুলো ভাবের ফরসা আছে, সেরকম না। চোখ দুটো দেখতে বেশ ছিল। বড় বড় ঠিক না, অথচ এমন একটা ভাব ছিল চাউনির মধ্যে, আর কেমন একটা ঢুলুঢুলু ভাব, কেমন আদুরি-আদুরি, মরবার কয়েকদিন আগেও মা’র চোখে কাজল ছিল। ওই সেই মিত্তিরের বউ বা চোপরার বউয়ের মতই অনেকটা ভাবভঙ্গি মায়েরও ছিল, কিন্তু ওদের যেমন গা না-ঘামানো পোকা পড়া ভাব, মায়ের সেরকম ছিল না। ঠাকুর চাকর ঝি থাকলেও মা দু’বেলা রান্না করতো। সংসার চালানোর ভার বইতে হত কিছু, তা হলেও, মায়ের একটা কি ভাব ছিল, হয়তো তার নামই সখী সখী ভাব। কী রকম বলব, একটা সুন্দর পুতুলের মত। সব সময় খালি লাল ঠোঁট দুটো যেন ফুলেই আছে। কাজকর্ম সব কিছুর মধ্যেই একটা পড়ি পড়ি মরি মরি গা টিস টিস ভাব।

ওসব সবই বাবার জন্যে হয়েছিল, আমার মনে হয়। বাবা কালো, চেহারাখনিও বেশ দশাসই। এই প্রায় আমার মতই অনেকটা, তবে, তবু যা হোক, আমার গায়ের রঙটা ঠিক বাবার মত হয়নি, মায়ের মতও না, মাঝামাঝি, আর চোয়াল চিবুক ঠোঁটটোটগুলো মায়ের মতই হয়েছে। বড়দাটা ঠিক মায়ের মতই হয়েছে, অবিকল, আর মেজদাটা বাবা বসানো। ছোট বোনটা দু’ বছর বয়সেই মরে গিয়েছিল, থাকলে মায়ের মতই হত, আর তারপরে এতদিনে তেইশ চব্বিশ বছরের হত, উরে স্‌সা, তা হলে আর দেখতে হত না, শহরের ছোঁড়ারা টোপ ফেলে ফেলে অস্থির করতো, রপোটের জ্বালায় টেকা যেত না। দেখছি তো সব চারদিকে, একটু চোখ লাগবার মত হলেই হল, ছিনে জোঁকের মত সব লেগে থাকে সেই মেয়ের পিছনে। আমি নিজে লেগে থাকতে পারি, আর আমার বোনের পিছনটা কি কেউ ছেড়ে দিত। অত্‌তো না।

মাকে আমার এমনিতে খারাপ লাগতো না, একমাত্র বাবার বন্ধুদের সঙ্গে কথাবাত বলার ভাবভঙ্গি ছাড়া। মা যে দেখতে বেশ, আর বাবার বন্ধুরা যে বাবার কেলে হুমদো মুখখানি দেখতে আসতো না, মায়ের কাছে মন্দা পায়রাগুলোর মত পেখম ছড়িয়ে ঘুরঘুর করতো, তা আমি ছেলেবেলাতেই বুঝতে পারতাম। লোকগুলোর চোখের দিকে তাকালে স্রেফ শুয়োরের বাচ্চা বলে মনে হত। মায়ের আদুরি আদুরি ঢঙঢাঙ দেখেও এমন রাগ হত, মনে হত, মাকে একেবারে কামড়ে খামচে ছরকুটে দিই, মাইরি। আর রাগ হত, যখন দেখতাম, বাবা মা রোজ একটা আলাদা ঘরে শুতে যেত। ছ’ বছর বয়স থেকেই তো আমাকে দাদাদের সঙ্গে আলাদা ঘরে শুতে যেতে হত। বাবার মত লোককেই স্ত্রৈণ বলে কি না জানি না, তবে সেই যে একটা কথা আছে না, মাগের অাঁচল ধরে থাকা, বাবার ঠিক তাই ছিল। বাবাকে মনে হত, মা-খোর। তার ওপরে, ভদ্রলোকের মেজাজটা এমন রাগী ছিল, বড় চাকরির অহঙ্কার ছিল, যেন আমরাও কেরানী চাকর বেয়ারা। আদর-টাদর করতো, কিন্তু চোয়াড়ে ভাবভঙ্গি দেখলে কাছে যেতে ইচ্ছা করতো না। বড় চাকরি, প্রচুর ঘুষ, মেলাই তেল দেবার লোক, সব মিলিয়ে লোকটাকে স্‌সাহ্‌ দারুণ ক্রুয়েল মনে হত! যেন একটা বাঘের মত। মার কম খেয়েছি নাকি! রেগে গেলে, এমন মারতো, মারাত্মক—ওই হাতের এক একখানি থাপ্পড় খেলে আর কাউকে দেখতে হত না। আর রেগে গেলে চোখগুলো এমন জ্বলজ্বল পুত্ৰ এল দেখ গয়ে—।

তা সে যাক্‌গে, মা-ই ছিল বাবার ওষুধ। আমি কোন দিন মনে করতে পারি না, মায়ের দিকে যেভাবে তাকাতো, আমাদের দিকে কোন দিন বাবা সেরকমভাবে তাকিয়েছে কি না, সেইরকম মিঠে মিঠে হাসি-হাসি ভাবে। সে সব তবু একরকম মেনে নেওয়া যেত, সব থেকে রাগ হত, যখন দেখতাম, দুজনে আলাদা শুতে চলে যেত। বাবার ওপর তখন কী ঘেন্না যে হত না, সমান সমান হলে বোধ হয় লড়েই যেতাম। দু-একদিন যদি আমাদের ঘরে মায়ের একটু দেরী হত, তা হলেই ঘরের বাইরে বাবার স্যাণ্ডেলের ফটর ফটর শোনা যেত। তার মানে, ‘থাকতে পারছি না, কিছু মানব না, তোমাকে আসতেই হবে।’ এখন অবিশ্যি বুঝতে পারি, ফাদারের তেমন দোষ ছিল না। ওটা বাঘের খিদে, বাঁধাধরা, একেবারে টাইমলি। আর তো কোন নেশা ছিল না, মদ না, অন্য মেয়েমানুষ না। নেশা ছিল বউ, ঘুষ, লোকের ত্যালানি।

তা হলেই বোঝা যাচ্ছে, আমি জিনাকে নিয়ে যেভাবে তখন আখের খেতের ধারে সাপটে পড়েছিলাম, কেউ এসে পড়লেও মানতাম না, তার থেকে এসব লোকের অবস্থা ভাল ছিল না। মোটেই না। এরকম অনেক মানুষের কথা আমি বলতে পারি, অনেক ঘটনা, যা চোখের সামনে ভাসছে। আমাদের এই শহরেরই অনেক নামী লোকের কথা জানি, কেউ নেড়ি, লুকিয়ে লুকিয়ে, কেউ বাঘা বাঘা ভাবে, লক্ষ্য ঠিক এক দিকে, ঝাঁপিয়ে পড়বেই, কোন কিছু মানবে না। আমিও মানিনি, মানতামও না। চ্যাটার্জি কাকুর কাজ আমার হাত করে যাচ্ছিল, প্রজাপতিটা তেমনি ওলট-পালট ছটফট করে যাচ্ছিল, আর হাসতে হাসতেই উহ্ আহ্ করছিল। আমার তখন সালোয়ার কামিজের ওপর এমন রাগ হচ্ছিল, প্রায় ঘেন্নাই বলতে হয়। শায়া শাড়ি তার চেয়ে অনেক ভাল, কোন ঝামেলা নেই। আমার আর তখন হাসি ছিল না। হয়তো শিখা থাকলে বলতো, সুখেনদা, তোমাকে খুনীর মত দেখাচ্ছে। আমার চোখের সামনে সেই ছেলেবেলার দেখা আমেরিকান আর বেশ্যাটার চেহারা ভাসছিল। আমি সালোয়ারের ফিতেটা খুঁজে টানাটানি করছিলাম। জিনা এঁকেবেঁকে গড়িয়ে তখন প্রায় আখ খেতের মাটিতে গিয়ে পড়েছে, সুখেনদা, প্লীজ, হি হি হি, প্লী—জ, ভীষণ কাতুকুতু—হি হি হি—উহ্ উহ্?

কিন্তু সালোয়ারের দড়িটা খুঁজে পাইনি। শেষটায় প্রায় জিনা চীৎকার করেই উঠেছিল, ব্যথা লাগলে বা হঠাৎ চোট লেগে গেলে যেরকম কেঁদে চেঁচিয়ে ওঠে, সেই রকম শব্দ বেরিয়েছিল ওর গলা দিয়ে, আর আচমকা এমন গুটিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল যে, আমি থমকে গিয়েছিলাম। তবে বিশ্বাস করিনি, সত্যি কিছু হয়েছে বলে, মেয়েদের ওসব ন্যাকরা আমার জানা আছে। তবু যেন কেমন একটু মনে হয়েছিল, তাই উঁকি দিয়ে ওর মুখ দেখেছিলাম। দেখেই আমার চিত্তির উলটে গিয়েছিল, প্রায় ঘাবড়েই গিয়েছিলাম। জিনার মুখটা যন্ত্রণায় বেঁকে গিয়েছিল, মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল, যেন নিশ্বাস ফেলতে পারছিল না। মরেছে, স্‌সাহ্‌ অক্কা পেয়ে যাবে নাকি। কী বিচ্ছিরি হয়েছিল মেয়েটার গোটা চেহারা, মুখটা মনে হয়েছিল, একটা বয়স্ক মেয়েছেলের মুখ, খুকীর ভাঁজও ছিল না। তার ওপরে বুকটার চেহারা এমন বদলে গিয়েছিল, দু’টো মালসার মত ছড়িয়ে গিয়েছিল। ওর দুটো হাতই বুকের নিচে পাঁজরের কাছে চেপে ধরা ছিল, কোনরকমে ফিসফিস্ করে বলেছিল, ‘ভীষণ লেগেছে। তখনো ঠিক পুরোপুরি বিশ্বাস করব কি না বুঝতে পারছিলাম না, কিন্তু ছেউটির মুখটা যেরকম হয়ে উঠেছিল, নীল নীল ভাব আর চোখের পাশ দিয়ে গাল অবধি একটা শিরা যেন তিরতির করে কাঁপছিল। তখন জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোথায় লেগেছে? তার কোন জবাব দেয়নি জিনা। একেবারে কাঠ হয়ে পড়েছিল। আর আমার তো চোরের মন, ভেবেছিলাম, লোকে বোধ হয় একেই সেই ধর্ষণ বলে। অথচ আমি তো তা করিনি। তখনি মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিলাম, মরে গেলে, আখের খেতের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলে দিতে হবে। দিয়ে তারপরে ভালমানুষের মত সকলের কাছে গিয়ে বলব, ‘জিনা তো অনেকক্ষণ আমার কাছ থেকে চলে এসেছে, আমি তো অন্য দিকে চলে গেছলাম। ও এখনো ফেরেনি? তা হলে তো খুঁজে দেখতে হয়।

তা বললে কি হয়, ঠিক কী করব তা-ই বুঝতে পারছিলাম না। সত্যি সত্যি আমি তো আর চ্যাটার্জি কাকু নই, তার হাতের কাজ-কারবার অন্যরকম। তখন যা মাথায় এসেছিল, তাই করেছিলাম। পাঁজরার যেখানটায় ও হাত চেপে রেখেছিল, সেখানটা আস্তে আস্তে ডলে দিয়েছিলাম। কী কুগ্রহ রে বাবা। জিনা ঠোঁট নেড়ে জল চাইছিল। সেখানে জল কোথায়। একমাত্র বাঁশ ঝাড়টার কাছে একটা ডোবা দেখা যাচ্ছিল। কোন রকমে সেখান থেকে রুমাল ভিজিয়ে নিয়ে এসে ওর চোখে মুখে একটু দিয়েছিলাম। তাইতেই আস্তে আস্তে চাঙা হয়ে উঠেছিল যাক বাবা, স্বস্তি। এদিকেও না, ওদিকেও না, মাঝখান থেকে খুনী হয়ে পড়ছিলাম আর কী। আখ ভেঙে খাইয়েছিলাম ঠিকই, আর স্নেহও করেছিলাম তারপরে। তখন ওর মুখ দেখে আমার আবার কী রকম কষ্টও হচ্ছিল, এক এক সময় হয়-না, কারুর কষ্ট দেখলে বুকের মধ্যে কী রকম টনটন করে সেই রকম করছিল। মনে হয়েছিল, আমি যেন ওর দাদা, আমার ছোট বোন ও, আর দাদাদের মনটা বোধহয় ছোট বোনের জন্য এরকমই টাটায়—কী জানি, জানি না ছাই। আসলে ওই চ্যটার্জি শুয়োরটার ওপর হিংসায় আর রাগেই বোধহয় ওরকম করেছিলাম, তবে জিনাকেও কি ভাল বলা যাবে! কাকুর আদর খেয়ে খেয়ে তো বারোটা বাজিয়ে বসে আছে। যাক গে, তখন আর সুড়সুড়ি কাতুকুতু হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি কিছুই ছিল না। কিন্তু মেহেও অরুচি, মেজাজ একদম খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ওসব চ্যাটার্জি কাকুরই পোষায়, চল্লিশ পঞ্চাশের খোকা কার্তিকের, মাংসের তাল নিয়ে খানিকটা রগড়ারগড়ি। ওদের দম আর কত হবে!

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত