প্রতিটি সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে…


আজ জামাইষষ্ঠী। প্রবাদ বলে, যম-জামাই-ভাগনা তিন নয় আপনা। অর্থাৎ, যম বা মৃত্যু, ভাগ্নে বা বোনের ছেলে আর জামাই কখনও আপন হয় না। তাহলে প্রাচীন কাল থেকে বেছে বেছে এদের মধ্যে থেকে জামাইকে আপন করার চেষ্টা কেন করেন শাশুড়িরা? হিন্দুশাস্ত্র বলছে, পুরোটাই স্বার্থের খাতিরে। জামাইয়ের হাতে মেয়ের ভবিষ্যৎ। তাই মেয়ে যাতে সুখে-শান্তিতে ঘরকন্না করতে পারে তার জন্যই নাকি জামাইষষ্ঠীর (Jamai Shasthi) এই নিয়ম (Ritual) বা উৎসবের চল হয়েছে বাঙালির ঘরে ঘরে। ইরাবতীর পাঠকদের জন্য জামাইষষ্ঠী নিয়ে নিজের ভাবনা লিখেছেন  বিতস্তা ঘোষাল।


আমি কোনোদিনই কোনো ষষ্ঠীতে বিশ্বাসী নই।যেমন সিদুর শাখা পলায় নই।তবে যারা বিশ্বাস করেন তাদের অমর্যাদা করছি না।
ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি মা নিয়ম করে কয়েকটি ষষ্ঠী করেন।সেদিন একপ্রকার উপোষ কিংবা সারাদিন পর হয়তো কিছু খাওয়া ।আমার তখন থেকেই বিরক্ত লাগে।কেন সব ষষ্ঠী মেয়েদের! সন্তানের মঙ্গল কামনা কী বাবারা করেন না? নিশ্চয়ই করেন।সন্তানের দুঃখ কষ্ট আনন্দ বাবাদের প্রভাবিত করে না এমন বাবার সংখ্যা নিতান্তই হাতে গোনা।তাহলে ষষ্ঠীর ব্যাপারে কেন মায়েদের এত নিয়ম।আমার ঠাকুমা এ বিষয়ে বেশ প্রগতিশীল ছিলেন।মাকে বলতেন, বৌমা সংসারের এত বড় দায়িত্ব সামলে, স্কুলে পড়িয়ে, দেওর, সন্তান সকলকে সমান ভাবে তুমি নিরন্তর পরিসেবা দিয়ে চলেছ।উপোষ করে , ব্রত পার্বন করে নতুন করে কী করবে! তার থেকে পেট ভরে খেয়ে সকল মানুষের মঙ্গল কামনা করো। তাতেই সবার উন্নতি হবে।
ঠাম্মার কথা খুব প্রভাবিত করেছিল সেই ছোট্ট আমিকে। মনে হয়েছিল সত্যি তো, ঠাম্মা তো এসব না করেও রত্ন গর্ভা মা।চার সন্তান এক কন্যা সবাই যে যার ক্ষেত্রে স্বনামধন্য ।তবে কী জন্য মিছে এসব!
ধীরে ধীরে মা অনেক ব্রত বন্ধ করলেন, কিছু ঠাম্মার চাপে, আর কিছু নিজের শারীরিক কারনে।কিন্তু দূর্গা ষষ্ঠী , জামাই ষষ্ঠী এসবের বিরাম নেই।অবশ্য মা বলেন, জামাই ষষ্ঠী করিনা, মেয়ে ষষ্ঠী করি, যাতে করে এই দিন সবার একসঙ্গে কিছুক্ষণ কাটানো যায় ।
আমাদের বাড়িতে যদিও কখনোই দিনের দিন এই অনুষ্ঠান পালিত হয় না।প্রথমত, মায়ের স্কুল ছুটির উপর নির্ভরশীল, আর দ্বিতীয়ত, বড় জামাইয়ের বিয়ের সময় সেলসে চাকরী।তার কোম্পানি কখনোই ছুটি দিত না।ফলে সবমিলিয়ে কোনো এক রবিবার শুরু হল উদযাপন ।অবশ্য জামাই ষষ্ঠীর যেমন ভুরিভোজের ছবি দেখা যায়, তেমনি নয়।একেবারেই ঘরোয়া আড্ডায় যেমন হয় তেমনি।প্রথম দিকে বন্ধুদের মুখে গল্প শুনতাম, শ্বশুর বাড়িতে ও খুব ধুম জামাই আদরের।কিন্তু ক্রমশ বুঝতে পেরেছি এই দিনটা খুব চাপের।
বিশেষ করে বাড়ির বৌদের।ননদ ননদাই আসবে, তাদের আতিথেয়তা , কিন্তু নিজের কপালে নিয়ম।
আমি প্রথম থেকেই কোনো ব্রত উপোষ, ষষ্ঠী এসবের ধারে কাছে নেই।খাওয়াতে ভালোবাসি, মানুষ ভালোবাসি।যখন খুশি এসো, রান্না করে দেব, কিন্তু প্রথা মেনে কিছু করতে পারব না।
রোজ পুজো করে উঠে সকলের মঙ্গল কামনা করে ধূপ জ্বালাই দুবেলা। তখনই আমার মনের মধ্যে সব ব্রত পার্বণ, ষষ্ঠী পালন হয়ে যায় ।
সন্তান সেতো রক্তের, আমারই জঠর থেকে তার উৎপত্তি ।তার জন্য আলাদা করে আর কিছু করিনা।আর জামাই যে হবে সেও তো সন্তান তুল্য।প্রতিটি মুহূর্ত তার জন্যেও প্রার্থনা করব, এতে আর অবাক হবার কী আছে !
তাই ঘরে ঘরে আজ ষষ্ঠী চলুক, মা ষষ্ঠীর ধনেরা আনন্দ করুক, তাদের মায়েরা উপোষ করুক, ফল খাক, ডালিয়া, ওটস,ওটস,রুটি, সুজি. . এসব খেয়ে সন্তানের মঙ্গল কামনা করুক।
আমি বাবা ভাত ডাল পোস্ত খাই।আর মনে মনে বলি, হে আমার ঈশ্বর জগতের প্রতিটি মায়ের সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে. .

 

 

 

 

 

.

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত