| 19 এপ্রিল 2024
Categories
উৎসব সংখ্যা’২০২১

ইরাবতী উৎসব সংখ্যা গল্প: জরায়ুজ । রাজেশ কুমার

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট
 
 
প্রতিটা মুহূর্তই আসলে বেঁচে থাকার লড়াই। নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা। ঠিক সাড়ে পাঁচটার সময় অফিস বেয়ারা অসিত ফাইল হাতে চেম্বারে ঢুকতেই চিরদিনের এই বস্তাপচা, সস্তা দর্শনটাই মনে এল সায়নের। অন্য কেউ হলে হয়তো মেজাজ হারাত। সায়ন সামলায় নিজেকে।সে জানে মুহূর্তরা ঠিক কতটা দামি। এই পরিস্থিতিতে মেজাজ হারালে আখেরে তারই ক্ষতি। নিজেকে বোঝায় সে, সব মানুষের মধ্যেই রোল কনফ্লিক্ট আছে, চিরকাল থাকবে। এসব খুব সাধারণ ব্যাপার, তাকেই সামলাতে হবে ঠান্ডা মাথায়। অসিতের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে সে। বলে, ভেবেছিলাম আজ আর দেরি করব না। বেরিয়ে পড়ব এখুনি। এখন মনে হচ্ছে শতরঞ্জি না গোটানো পর্যন্ত রেহাই নেই আমার। কথাগুলো না বললেও চলত, বিশেষত চেয়ারে বসে। অফিসে কাজের হিসেব চলে না। সময়েরও না। অফিস টাকা দেয়। অনেকগুলো টাকা। বিনিময়ে কাজ বুঝে নেবে ওরা। তবুও বলে সায়ন। আসলে কথা বললে ভেতরের বিরক্তিভাবটা কেটে যায় অনেকটা। অসিত ফাইলটা টেবিলে রেখে বলে, কর্তার ইচ্ছায় কর্ম।
আপনি আর কী করবেন বলুন! সায়ন ফাইলের ফিতে খুলতে খুলতে বলে, তুমি আর তোমার বড় সায়েব দুজনে মিলে কোনদিন খুন করে ফেলবে আমায়। কী যে বলেন স্যার! বলে লাজুক হেসে বেরিয়ে যায় অসিত। ফাইলটা পাঠানোর আগে ইন্টারকমে ফোন করেছিল বড় সায়েব। আর্জেন্ট অ্যান্ড কনফিডেনসিয়াল। এই ধরনের ফাইলে বড় সায়েব সাধারণত তার ওপরেই ভরসা রাখে। সায়ন তাড়াতাড়ি ডুব দেয় নোটশিটের পাতায়, কেজো কথার ধারাবিবরণীর মধ্যে। যতটুকু সময় বাঁচানো যায় আর কী! ভীষণ কমপ্লিকেটেড ম্যাটার। বিশেষত ল’য়ের অ্যাসপেক্টটা। দিল্লি অ্যাপ্রুভাল দেবে কিনা কে জানে! সাতপাঁচ ভেবে ফাইলে নিজের নোটটা রেখে বেরতে বেরতে বেশ খানিকটা দেরিই হয়ে যায় তার।  
 
নীচে দীপক দাঁড়িয়ে থাকে গাড়ি নিয়ে। অফিসের ড্রাইভার সে। লিফট থেকে নেমে গাড়িতে ওঠে সায়ন।ব্যাগটা সিটে নামিয়ে হেলান দিয়ে বসে। তারপর বড় করে একটা শ্বাস ছাড়ে। শ্বাসবায়ুর সঙ্গে যেন ত্যাগ করে নিজের শরীরটাও। এখন আর অফিসের কেউ নয় সে। কারও ছেলে নয়, কারও স্বামী নয়, কারও বাবা নয়। সে এখন লেখক। লেখক সায়ন মজুমদার। তার এই লেখক সত্তাটাকে অশরীরী ভাবতেই পছন্দ করে সে। পছন্দ নয়, র‍্যাদার বিশ্বাস। লিখতে গেলে সাধের শরীরটার মধ্যে নিজেকে আটকে রাখলে চলে না। অশরীরী হয়ে ঘুরে বেড়াতে হয় ঘাম, পুঁজ, লালা, তেষ্টা, কামনা, বিকার এসবের সন্ধানে।
 
দীপক চাবি ঘুরিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলে, স্যার একটা কথা বলব! অন্য দিন হলে আগ্রহ ভরে শুনত সায়ন। কিন্তু আজ তার হাতে সময় বড় কম। ভেতরে ভেতরে সে ছুটছে। তার সমস্ত ইন্দ্রিয় প্রত্যাখ্যান করতে চাইছে যত কেজো কথা, অপ্রয়োজনীয় যান্ত্রিক শব্দ, এল ই ডি আলোর অহেতুক ঝলকানি। দুপুরে লেখালিখির এক বন্ধু ফোন করেছিল। একটা নামী পত্রিকার পূজাবার্ষিকীর জন্য গল্প চায়। দুই দিন মাত্র সময়। ফোনটা পেয়েই বড় অসহায় বোধ করেছিল সায়ন। হাতে একটাও গল্প নেই। এমনিতেই নানান কারণে এই ক’মাস লেখা হয়েছে কম। মায়ের মৃত্যু, ট্রান্সফার পোস্টিং, আরও কিছু কিছু বিষয়। বসা হয়নি ঠিক মতো। তার ওপর যে কটা গল্প ছিল, সবই দেওয়া হয়ে গেছে কোথাও না কোথাও। না বলে দিতেই পারত সে। কি এমন ক্ষতি হত! ছাপার অক্ষরে ওই নামটুকু ছাড়া! সামান্য সম্মান দক্ষিণা। সেদিকে অবশ্য নজর থাকে না সায়নের। লেখালেখি তার নেশা, পেশা নয়। কিন্তু এখানেও সেই রোল কনফ্লিক্ট। হাড়েহাড়ে টের পায় সায়ন। ব্যক্তি মানুষ যেন চ্যালেঞ্জ করে বসে লেখক মহাশয়কে। খিল্লি উড়িয়ে বলতে চায়, কিসের লেখক! দুদিনে যদি একটা গল্পই না দাঁড় করাতে পারিস! লেখক সায়ন চটুল হাসে। দুদিন! মানে আটচল্লিশ ঘন্টা এখনও। দেখাই যাক না শেষ অব্দি কী দাঁড়ায়! দীপক সামনের রাস্তায় চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে আবার, স্যার একটা কথা বলব! সায়ন বলে, তাড়াতাড়ি বলে ফেলো। আজ কিছু শোনার অবস্থায় নেই আমি। দীপক লুকিং গ্লাসের মধ্যে দিয়ে সায়নের দিকে তাকায় এক ঝলক। হয়তো মেপে নিতে চায় একটা কিছু। তারপর গলায় মাপা উদ্বেগ মিশিয়ে জানতে চায় স্যার, শরীর খারাপ লাগছে! সায়ন উত্তর দেয় না। পিছনের সিট থেকে সোজা সামনের রাস্তায় তাকিয়ে বলে, যা বলার তাড়াতাড়ি বলে ফেলো। আর বেশি দেরি কোরো না। এরপর সুযোগ নাও পেতে পারো। দীপক সি এ আইল্যান্ড থেকে ডান দিকে যাওয়ার ইন্ডিকেটর দিয়ে স্টিয়ারিংয়ে আর একটু স্টেডি হয়ে বসে। তারপর মনঃসংযোগ রাস্তায় রেখেই বলে, স্যার তিন মাস হল টাকা পাচ্ছি না। মালিক একটা পয়সা দিচ্ছে না। বললেই বলছে অফিস পেমেন্ট করেনি এখনও। অথচ অ্যাকাউন্ট সেকশানে খবর নিয়ে জেনেছি পেমেন্ট সব ক্লিয়ার। সামনেই পুজো। বাড়িতে দু-দুটো বাচ্চা। আপনি যদি একটু বলে দিতেন মালিককে…। অন্য সময় হলে সায়ন বিষয়টা নিয়ে ভাবত। যতই হোক, একটা মানুষের রুটি রুজির ব্যাপার। একটা ফোনও হয়তো করে দিতে পারত গাড়ির মালিককে। কিন্তু সায়ন জানে বিষয়টা ঠিক এতটাও সহজ সরল নয়। গাড়িগুলো সব টেন্ডার ডেকে ভাড়া নেওয়া। একটাও অফিসের কেনা নয়। সায়নের ফোন পেলে দীপকের মালিক বকেয়া মাইনে দীপককে দেবে সে নিশ্চয়তা নেই। উলটে নালিশ করার জন্য গাড়ি থেকেই নামিয়ে দিতে পারে তাকে। তখন সায়নেরও কিছু করার থাকবে না অফিসিয়ালি। বিষয়টা ফাঁকা সময়ে ভাবা যেতে পারে। আপাতত তাকে বের হতে হবে গল্পের সন্ধানে, এসব থেকে অনেক দূরে। পুরনো কোন সংলাপ, ডায়রির ছেঁড়া পাতা, বাতিল জাবেদা খাতা অথবা কোন গোপন গুহ্য ভাষার কাছে। গাছ, আকাশ, নদী, মাছ, সাপ, পাখি, মাথা ঠুকতে হবে সবার সামনে।
 
সন্ধের কলকাতা আলো আর যানবাহনে ভর্তি। ট্রাফিক সিগন্যালে সার দিয়ে মোটর বাইক, অ্যাপ ক্যাব আর প্রাইভেট কার। মাঝে মাঝে দু একটা আকাশি নীল রঙা ইলেক্টিক বাস। ব্যাক লাইটের আলোয় লাল পিঁপড়ের সারির মতো দাঁড়িয়ে আছে সকলে। সায়ন জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে বাইরে। নীল সাদা উড়াল পুলের ধার ঘেঁষে বিরাট এক হোর্ডিংজুড়ে বিরাট অনুষ্কার সুখি দাম্পত্য। দূরে ছড়ানো ছেটানো কতগুলো স্কাইস্ক্র্যাপার। মাথার ওপর ফ্যাকাসে মরা চাঁদ, রাত ঘন হওয়ার অপেক্ষায়। সায়ন তাকিয়ে থাকে সেই দিকে। কান খাড়া করে যেন শুনতে চায় বাতাসের শব্দ, ঘাসপোকার গুঞ্জন, ঝাঁঝিপাতার মধ্যে ছোট্ট রঙিন মাছের বিষ্ময়কর শব্দ। গাড়ি ছুটে চলে লেক টাউন, বাঙুর, দমদম পার্ক হয়ে কেষ্টপুরের দিকে। বেলঘড়িয়া এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে সে উঠবে দিল্লিরোড। হাতে ঘন্টা দেড়েক সময়। অন্যদিন এই সময়টা সে বন্ধুদের সঙ্গে কাটায় মোবাইলে  কথা বলে। অনেক সময় গান শোনে। কিন্তু আজ আর সেসব করলে চলবে না। এই দেড় ঘন্টা সময়ের মধ্যেই যেখান থেকে হোক তাকে খুঁজে আনতে হবে একটা ছোটগল্পের বীজ। সেই বীজ ধারণ করে মাথার ভেতর লালন করতে হবে চারাগাছ। তাকে জল হাওয়া দিয়ে পরিণত করতে হবে ডালপাতা মেলা আস্ত একটা গল্পগাছে। তারপর রাতেরবেলা ল্যাপটপে ফেলে সেই গল্পের ইমোজি নেওয়া তো শুধু সময়ের অপেক্ষা। দুদিন একটু দেরি করে শুলেই চলবে। গায়ে গতরে ব্যথা হবে এই যা। গদ্য লেখা তো আসলে রাজমিস্ত্রীরই কাজ।  
 
সায়ন চোখ বুজে ভাবতে থাকে। তার ভেতর অশরীরীভাবটাও জাঁকিয়ে বসে বেশ। তার মনে পড়ে ছোটবেলার বন্ধুদের মুখ। দুর্গাপুজোয় ক্যাপ বন্দুক নিয়ে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখে বেরনোর কথা। প্যান্ডেল হপিং কথাটা তখন চালু ছিল না। চালু ছিল না আরও অনেক কিছুই। এক জেনারেশান পার করে আর এক জেনারেশান আসতে সময় লেগে যেত প্রায় বারো তেরোটা বছর। আজকের মতো দু-তিন বছরেই পাল্টে যেত না সব। তার মনে পড়ে স্কুল লাইফ, কলেজ লাইফের কথা। প্রথম সিগারেট, ঠোঁটে ঠোঁট রাখা, অরুণিমার হেঁটে যাওয়া। সে নিজেকে ফিট করাতে চায় এসবেরই মাঝে কোন এক জায়গায়। ছোট্ট ফ্লুরসেন্ট মাছ হয়ে ঢুকে পড়তে চায় এদেরই কারও মধ্যে। কিম্বা সাঁতার কাটতে চায় ফেলে আসা সেই সময়ে। কিন্তু পারে না। বারে বারে কোন এক অদৃশ্য বাঁধা এসে টেনে ধরে তাকে। দুটো সময়ের দূরত্ব যেন পার করতে দেয় না কিছুতেই। আচ্ছা, যে মানুষ সময়কে ফেলে আসে পিছনে আর যে ফিরে যেতে চায় সেই ফেলে আসা সময়ে দুজনেই কী একই! তাহলে চাইলেই ফিরে যেতে পারছে না কেন সে! অনায়াসে হয়ে উঠতে পারছে না কেন তারই কোন ক্লাসমেট! প্রীতম, মানস, বিশু কিম্বা অপূর্ব। কেন পারছে না তুলে আনতে তাদের ব্যর্থতা, হারিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা। নিজের কাছেই কোন উত্তর পায় না সায়ন। হাল ছেড়ে মোবাইল নিয়ে পড়ে সে। সোশ্যাল মিডিয়া, ডেইলি হান্টেও খবর থাকে নানা রকম। বিচিত্র সব ঘটনা, বিচিত্র সব মানুষ জনের কথা। তার তো প্রয়োজন শুধুমাত্র একটা স্ফুলিঙ্গ। স্মার্টফোনে আঙুল চালাতে থাকে সে। বছরে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করতে চাইলে শুরু করুন এই ব্যবসা, চোদ্দ মিনিট বসে থাকার প্রভাব পোষাতে পারে এক মিনিটের ব্যায়াম কিম্বা সকালে খালি পেটে চা কফি খেলে কী হয়! যতসব ঝোলঝাল বিষয়। দরকারের সময় কাজে আসে না কিছু। মোবাইল ঘাঁটা বন্ধ করে সে।
 
দেখতে দেখতে চায়ের দোকান এসে যায়। বেলঘড়িয়া এক্সপ্রেসওয়ের ওপর দুদিকে পরপর টি স্টল। এখানেই নির্দিষ্ট একটা দোকানে রোজ দাঁড়ায় সায়ন। চা খায়। খানিক তাকিয়ে থাকে রাস্তার দিকে। জায়গাটা বেশ ভালো লাগে তার। ছেলেমেয়েরা জোড়ায় জোড়ায় আড্ডা দেয়। চা সিগারেট চিপস ম্যাগি খায়। বেশির ভাগই কম বয়সি। অফিস ফেরতা, আল্ট্রা মর্ডাণ। কর্পোরেট কালচারে বিলং করে। মাঝে মধ্যে ওদের কথাবার্তা কানে আসে সায়নের। বেশ অন্য রকম। এই তো সেদিন একটা মেয়ে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে সঙ্গের ছেলেটিকে বলছিল, তোমার তো আবার বিয়ের মাস এসে গেল। রোজই সেজেগুজে বউয়ের সঙ্গে ছবি দেবে ফেসবুকে। ছেলেটা বলছিল, ধুস এখন কোথায়! সে তো এপ্রিল মাসে। দেরি আছে এখনও। বেশ মজা লাগছিল সায়নের। বিষয়টার মধ্যে একটা গল্প গল্প ব্যাপার আছে। কিন্তু গল্পটা যে ঠিক কী ধরে উঠতে পারছিল না সে। আজ চায়ের ভাঁড় হাতে সেই দুটো ছেলে মেয়ের কথাই ভেসে উঠল তার মনে। দোকানি ভদ্রলোক এক গাল হেসে বলল, দুপুরে মাল আনতে গেছিলাম। এইমাত্র ফিরলাম। আর একটু আগে আসলে খোলা পেতেন না। সায়ন রোজকার খদ্দের। তাই চেনা। ভদ্রলোক রোজই কিছু না কিছু বলে। নিজে থেকেই। ভদ্রতাবশত উত্তর দিতে হয় সায়নকে। সে বলে, ও তাই নাকি! ভদ্রলোক বলে, সারাদিন বিশ্রাম পাইনি একটু। বাইক নিয়ে গিয়েছিলাম সেই হাতিবাগান। এই এত মাল, দেখতেই তো পাচ্ছেন। ঠোঁট উলটে ঘাড় নাড়া ছাড়া উপায় থাকে না সায়নের। ভদ্রলোক আবারও বলে, বয়স হচ্ছে তো আজকাল আর পারি না।
 
সায়ন চায়ের দাম মিটিয়ে গাড়িতে ওঠে। না, আজ আর কিছু হবে বলে মনে হচ্ছে না। চিন্তা ভাবনাগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে সব। হন্যে হয়ে খুঁজলে এমনই হয়। সবার মুখই একসঙ্গে ভেসে উঠছে ক্যানভাসে। একসঙ্গে সবাই বলছে, এসো আমার মধ্যে আশ্রয় নাও। আমায় নিয়ে লিখে ফেলো নতুন একটা কিছু। এ অবস্থায় মাথাটাকে একটু বিশ্রাম দেওয়া দরকার। চিন্তা ভাবনায় ছেদ আনতে সায়ন কেজো কথায় ফেরে। দীপকের দিকে তাকিয়ে বলে, তোমার মালিককে আমি ডেকে পাঠাতেই পারি। কিন্তু তাতে চাকরি যেতে পারে তোমার। দীপক গাড়ি চালাতে চালাতেই ঘাড় নাড়ে। জানি স্যার। তবুও যদি চেষ্টা করেন একবার। অন্তত ভয় টয় দেখিয়ে…। সায়নের হাসি পায়। ক্ষমতার অপব্যবহার! তারপর কী ভেবে কে জানে জিজ্ঞেস করে, তুমি একটা গাড়ি নিচ্ছ না কেন! অফিসে যাতে চালাতে পারো সে ব্যবস্থা না হয় করে দেবো। কত জন তো এভাবেই করে ফেলল কত কিছু। দীপক শুকনো গলায় বলল, টাকা কোথায় পাবো স্যার! সায়ন অবাক হল। টাকা কী কেউ ঘর থেকে বের করে নাকি! ব্যাঙ্ক লোন আছে না! তেমন হলে সেকেন্ড হ্যান্ড অন্তত নিয়ে নাও একটা। স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যাবে। দীপক বড় করে শ্বাস ছাড়ল একটা। ওসব হবে না স্যার। আমাদের লোন দেবে না কেউ। কেন! জিজ্ঞেস করল সায়ন। দীপক বলল, আমাদের কোন কাগজ নেই। আধার কার্ড, প্যান কার্ড এমন কী ভোটার কার্ডও…।
আমরা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মানুষ। সুন্দরবন এলাকার। ভিটে মাটি বিক্রি করে বাবা চলে এসেছিল কলকাতায়। লেখাপড়া জানি না। একটা ভাড়ার ঘর ছাড়া আমাদের আর কিছু নেই। দীপকের কথায় কোথা থেকে যেন ভেসে এল নোনা হাওয়া। জলে জোয়ারের শব্দ পেল সায়ন। তার চোখে ভেসে উঠল বাদাবনের জঙ্গল, সুন্দরী গাছ, নোনা জলের মাটি আর হাজার হাজার কালো রোগা হাড় জিরজিরে মানুষ। আশ্রয়হীন, মূক, বধির। দীপক বলে চলছিল আরও অনেক কথা। ওদের জমি বাড়ি, আপদ বিপদ, আত্মীয় অনাত্মীয়। সবকিছুই যেন দেজা ভু। আগে, অনেক আগে কোথাও শুনেছে সায়ন। কিম্বা সিনেমার মতো দেখেছে ঘটনা পরম্পরা। বর্ষার রাত, ভেঙে পড়েছে মাতলা পিয়ালি কিম্বা রায়মঙ্গলের বাঁধ। জল ঢুকছে, ভাসিয়ে দিচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। হোগলাপাতায় ছাওয়া মাটির ঘর এইমাত্র ধ্বসে পড়ল ঝুপঝাপ শব্দে। চাষের জমি তলিয়ে গেছে সেই কোন শেষ রাতে নদীর রাক্ষুসে আগ্রাসনের কাছে। মানুষজন আশ্রয় নিয়েছে ফ্লাড সেন্টারে। ব্যস্ত সমস্ত এক লোক খালি গায়ে লুঙ্গি গুটিয়ে চলেছে ছেলে ছোকরা যোগাড় করতে। ভাঙনের মুখে যতটুকু গড়ে তোলা যায় প্রতিরোধ। তারপর জল নামলে আসে মহামারি। জমির বুকে থিতিয়ে থাকে নুন। চাষ আবাদ পিছিয়ে যায় আরও তিন চার বছরের জন্য। তারও কিছুদিন পর কোন এক শীতের সকালে সেই লুঙ্গি পরা খালি গা লোক বউ ছেলে আর সামান্য সম্বল কাপড়ের পুঁটলিতে বেঁধে নিয়ে পারি দেয় অজানার উদ্দেশ্যে। ঘন কুয়াশা পেরিয়ে ভেসে চলে নৌকা, যেন অজস্র পাখির ডাকের খোঁজে।
 
হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে খেয়াল হয় সায়নের, দীপক তখনও যেন কী সব বলছে। চোখ বোজে সে। কানও বন্ধ করে। বন্ধ চোখে দেখে শুধু সেই নৌকার ভেসে চলা।  একমনে শোনে একলা জলের ছলাৎ ছল শব্দ। তার চোখে ভেসে ওঠে অর্ধেক দেখা অর্ধেক না দেখা  এক পৃথিবীর ছবি।
 
গাড়ি ছুটে চলে সম্পূর্ণ অন্য এক পৃথিবীর রাস্তা দিয়ে।  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত