| 21 এপ্রিল 2024
Categories
উৎসব সংখ্যা’২০২১

ইরাবতী উৎসব সংখ্যা গল্প: বনলতার সঙ্গে সম্ভাব্য । সরোজ দরবার

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

এই কলকাতা শহরের ভিতর একখানা সুড়ঙ্গ আছে; আপনি জানেন, বনলতা? সেই সুড়ঙ্গে একবার সেঁধিয়ে যেতে পারলে আপনাকে দেওয়া হবে দু-এক পাত্র সুরা। জীবনের ছোট-বড় ওঠাপড়া তখন আপনার আর গায়ে লাগবে না। আপনি ভাসতে ভাসতে একটা ইচ্ছেখুশির পৃথিবী বানিয়ে খানিকক্ষণথেকে যেতে পারেন সেখানে। বনলতা, আপনি জানেন এইসব? এই শহরের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী আপনি; কত পুরুষ আপনার পায়ের নখে মুখ রেখে কেঁদেছে। শুধু এই প্রত্যাশায় যে, আপনি একবার ঠিক তাদের টেনে তুলে নেবেন বুকে। আর আপনার বুকের ভিতর মুখ রেখে, সেই কাঙ্ক্ষিত মোম উষ্ণতায় ধিকি ধিকি গলে গলে যাবে তাহাদের সমস্ত পুরস্কার। অসম্ভব আনন্দের সেই জ্বলেপুড়ে শেষ হয়ে যাওয়া। বহুবার বহু পুরুষ নানা ভাবে আপনাকে জানিয়েছে সে-কথা। পুরুষের সুখ, তৃপ্তি, অতৃপ্তি – কিছুই আপনার অজানা নয়, বনলতা। আপনি অন্তর্যামী।

ওই সকল পুরুষকে আমি কতবার দেখেছি আপনার পাশে পাশে| নধর বেড়ালের মতো তারা আপনার কোমর ছুঁয়ে ঘুরে বেড়ায়|সেইসব পুরুষরা, আপনাকে জয় করেছে ভেবে নিয়ে মনে মনে, আপনার জন্য এনেছে উপঢৌকন| দামী শাড়ি, গয়না, বিদেশ থেকে আনা সুগন্ধী| বুকের ধক আছে, এমন পুরুষ, আর-একটু সাহসী হয়ে আপনাকে উপহার দিয়েছে অন্তর্বাস। আপনি মৃদু হেসে জানতে চেয়েছেন, এই চীরটুকু যে একটা গোটা পৃথিবী ঢাকতে পারে, আপনি জানলেন কী করে? সেই পুরুষ বিষণ্ণ অথচ তৃপ্তির হাসি হেসে আপনাকে বলেছে, সে আমি স্বপ্নে দেখেছি। স্পর্শকরেছি তাকে। আর আমি সেই পৃথিবীকে চিনব না! আপনি সহাস্যে গ্রহণ করেছেন পুরুষের সেই ছেলেমানুষি। নিয়েছেন অন্তর্বাস। তারপর, আর কেউ না জানুক, আমি তো জানি, সেই বস্ত্রখণ্ড আপনি ফেলে দিয়েছেন ডাস্টবিনে। আপনার কাজের মেয়েটি কুড়িয়ে পেয়ে বলেছে, দিদি, এত ভালো জিনিসটা তুমি ফেলে দিয়েছ? আপনি ফিরেও তাকাননি। উত্তর দেননি সে-কথার|মেয়েটি, সেই কিছুটা অল্পবয়সি মেয়েটি,এরপর একদিন অজান্তেই, তার শরীরে তুলে নিয়েছে অজানা কোনও পুরুষের  কামনা, যা আপনার জন্য বরাদ্দ ছিল। কী আশ্চর্য খেলা, ভাবুন বনলতা, আপনার সামান্য একটা কাজে সম্পন্ন হল, কেউ কিছু জানতে বুঝতে অব্দি পারল না। কোথাকার তরবারি রাখা হল কোথায়। ওই অল্পবয়সি মেয়েটি যখন সে অন্তর্বাসখানা পরে তার পুরুষটির সামনে দাঁড়াবে, তখন সেখানে আসলে থাকবে দুটি পুরুষ। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও কেউ কারুর কথা জানবে না। একটু পরেই একজন পুরুষ লুটিয়ে  পড়বে মাটিতে। একখণ্ড কাপড়ের ভিতর মুখ লুকিয়ে থাকবে আত্মগোপন করে। আর, অপরজন তখন মেতে উঠেছে এক অসম্ভব খেলায়। সে-খেলার কথা আপনার থেকে ভালো আর কেউ জানে না বনলতা।

তবে, আমি জানি বনলতা, আপনি তাদের ঘেন্না করেন, যারা এই পৃথিবীর সমস্ত উন্মুখ প্রকাশের উপর আবরণ দিয়ে ঢেকে দিতে চায়; আসলে সেই আবরণ থাকা মানেই, তাতে উন্মোচনের খেলা জুড়ে যাওয়া। এই লুকোচুরি খেলা একরকমের অশ্লীল পুঁজিবাদী উদ্যোগ, আপনি জানেন বনলতা। আপনি তাই সেইসব পুরুষদের প্রত্যাখ্যান করেছেন সগর্বে। কিন্তু এও তো সত্যি, আপনি ছলনাময়ী| নইলে প্রতিদিন পায়ের নখ কেন রাঙিয়ে তোলেন বাসনার রঙে, আর কেন নতুন নতুন পুরুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে সেখানে!আপনাকে দেখে আমার কিন্তু হেঁয়ালি মনে হয় না। মনে হয় আপনি মেরিলিন মনরোর সেই খেলুড়ে মুহূর্তটি। যখন হাওয়ায় উড়ে গেলইহজগতের স্কার্ট। আর, মেরিলিন যেন নিজেকে ঢাকতে চাইছেন-কি-চাইছেন-না, এমত আপাত বিহ্বল অবস্থায় আচমকাই স্বর্গ নামিয়ে আনলেন পৃথিবীতে; এই পৃথিবীতখনই জেনেছিল অমরাবতীর অর্থ; আপনি, বনলতা, আপনিও সেই অনির্বচনীয় খেলুড়ে; সম্মোহন আর প্রত্যাখ্যান দুই হাতে নিয়ে লোফালুফি করতে করতে আপনি ঘুরে বেড়ান; আপনার সামনে তাই পুরুষ এসে পোকপতঙ্গের মতো ঝাঁপ দেবেই; আপনি এক বিচ্ছিরি রকমের সুন্দর আগুন, বনলতা, সে কথা এই কলকাতা শহরের কে না জানে!

কিন্তু আমি আপনাকে বাজি রেখে বলছি, এই তাবৎ অভিজাত পুরুষকুল আপনাকে যা দিতে পারেনি, আমি, এই ভিখিরি, এই দাসের অধম দাস, আপনাকে সেই জিনিস দিতে পারি। ওরা তো সেরকম করে কলকাতা দেখেইনি, জানবে কী করে যে, কোথায় আছে সেই আশ্চর্য সুড়ঙ্গ। ওরা কি কখনও দেখেছে বকুলবাগান রো-এর পাশের বস্তি! বিরাট বিরাট বাড়ি, জানেন বনলতা, তার সামনের রাস্তা দিয়ে আমি আসছি, আর দেখছি, একজন পুরুষ আর নারী কেমন সেই সব বড় বড় বাড়ির অভিজাত গোপনীয়তাকে  চোখ মেরে পাশপাশি শুয়ে আছেন ফুটপাথের উপর। ওই রাস্তা ধরে আসার সময় আমাদের গাড়ি হর্ন দেয় থেকে থেকেই। আশেপাশে অনেকে ঘোরাঘুরি করে তো! তখন কটা বাজে, এই সাড়ে এগারোটা, কলকাতায় সে আর এমন কী রাত বলুন! তাই অনেকেই জেগে থাকে। আমি দেখেছি, বনলতা, তখনও কেউ কেউ স্নান করেন, ভালো করে ঘষতে থাকেন তাঁর ঊরু। আমি দেখতে থাকি, জানেন তো বনলতা, মানুষটা তাঁর শরীর থেকে মলিনতা ধুয়ে ফেলতে এতটাই তন্ময় যে, পৃথিবীর আর কোনও দিকেই তার খেয়াল নেই। এরকম মনোযোগ একমাত্র ঈশ্বরের সামনে দাঁড়িয়ে হয়তো থাকে মানুষের, বা শিল্পের সামনে। সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, ওই মানুষটির কাছে এই মালিন্যমুক্তিই একইসঙ্গে শিল্প এবং ঈশ্বর। অথচ, ভাবুন বনলতা, এই দুটো জিনিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমরা এ পর্যন্ত কত হাজার হাজার শব্দ খরচ করে ফেলেছি।

এই খবর আপনাকে কেউ দেবে না, বনলতা। ওই পকেটভারী পুরুষদের সাধ্য কই যে, আপনাকে এসব দেখাবে। ওরা জানে, উন্মুক্ত ঝর্নার সামনে লিরিলযুবতির স্নান। তাতে বাণিজ্য আছে বনলতা, জীবন নেই; সেখানে নন্দনতত্ত্ব খুঁজে কী হবে! অথচ আপনি কি জানেন, এই কলকাতা শহরেই আছে উন্মুক্ত ঝরনা। আমি আপনাকে দেখাতে পারি, সেই ঝরনার নিচে স্নান করছে কলকাতার অপ্সরাগণ। আনোয়ার শা রোড কে না চেনেন বলুন, তখন বাস যাচ্ছে দ্রুত, অটো, ট্যাক্সি, গাড়ির হর্ন মিলেমিশে একটা ক্যাকোফোনি তৈরি করেছে| আর আপনি বিশ্বাস করবেন না বনলতা, সেই ক্যাকোফোনি ছাপিয়ে ভেসে আসছে জল পড়ার শব্দ। আপনি সেদিকে তাকালেই দেখবেন, অসামান্য রুপসিরা সেই জলের নিচে বসে স্নান করছেন। সিক্ত তাদের বসন। এই শহরের সামনে প্রতি রেখায় উন্মুক্ত তাদের যৌবন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, সেখানে হিন্দি সিনেমা নেই। বাণিজ্য নেই| ফলে, অশ্লীলতা নেই। কী পবিত্র সেই দেবকন্যাদের স্নান, আপনার চোখ ধুয়ে যাবেপবিত্রতায়। আপনি চিনতে পারবেন সুন্দরকে। এই সুন্দরের কথা ওই পুরুষরা আপনাকে কী করে বলবে, বনলতা? বিজ্ঞাপন শুনে শুনে ওরা শিখেছেন নন্দনের অ-আ-ক-খ। অন্তর্বাসের দাম জানেন ওঁরা, তাই বলে তার সৌন্দর্যতত্ত্ব ওঁদের জ্ঞাত হতে পারে না।

আমি বলছি, বনলতা, আপনি একদিন চলুন আমার সঙ্গে, ওই বকুলবাগান রো-এর পাশের রাস্তায়। ওই রাত এগারোটা, সাড়ে এগারোটা নাগাদ। আমি আপনাকে দেখাতে পারব, শংকর আর উমার শয়ন। সমস্ত হইচইয়ের ভিতর দুজন ঘুমোচ্ছেন। ঘুম তাঁদের কাছে ঈশ্বর। ঈশ্বর এক জরুরি সত্তা, বনলতা। আমরা চাইলেও তা উপেক্ষা করতে পারি না।

আমি যতবার এই যুগলমূর্তি দেখেছি, বনলতা, শুধু একটা কথাই মনে হয়েছে, এই উন্মুখের ভিতর সঙ্গম কী করে সম্ভব! এত প্রকাশের ভিতর কি গোপনের মশারি টাঙিয়ে নেওয়া যায়!এই কথা আমি যতবার ভাবছিলাম, ততবার কলকাতা শহর আমাদের দিকে তাকিয়ে তীব্র ব্যঙ্গে হাসছিল। তারপর একবার বলল, মূর্খ এও জানো না, আমার বুকের ভিতর আছে একটা সুড়ঙ্গ। ওরা তার ভিতরেই ঢুকে যায়। তখন আমি ওদের নিজস্ব একটা পৃথিবী তৈরি করে দিই। সেখানে ওরা সুখে বাস করে, কিছুক্ষণ। চাইলে তুমিও যেতে পারো। কিন্তু একা একা গিয়ে কী করবে! একা একা কোনও সুখ নেই। স্বয়ং ভগবান পাননি। তাই তো তিনি বহুরূপে প্রকাশিত। আমি, এই যে তিলোত্তমা, আমিও তো একা সুখী নই। আমার ভিতরে তাই আছে অন্য আমি। আমরা দুয়ে মিলে লীলা করি| তাতেই আমাদের সুখ। কেন তুমি শোননি, এই কলকাতার ভিতর আছে, আর এক কলকাতা। হেঁটে দেখতে শিখুন।

আমি মাথা হেঁট করে বলেছিলাম, শুনেছিলাম, বুঝিনি। আজ বুঝলাম। তখন কলকাতা শহর আমাকে দেখিয়ে দিল সেই সুড়ঙ্গ। আমি বাজি ধরে বলছি বনলতা, সে খোঁজ আপনাকে আর কেউ দেবে না। দিতে পারবেই না।

এখন বলুন, কামুক পুরুষের মতো আমি যে প্রশ্নটি করছি, তার একখানা খেলুড়ে জবাব দিন। প্রশ্নটা হল এই যে, একটা রাত কি আপনি আমার সঙ্গে পালাতে পারবেন? আমরা দুজন ওই সুড়ঙ্গ ধরে একটা অন্য পৃথিবীতে তাহলে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আসি।

চুপ করে থাকবেন না, কিছু একটা উত্তর দিন বনলতা, প্লিজ।

(দুই)

– আপনার কি বড় অল্পতেই নেশা হয়ে যায়?

এটা একটা প্রশ্ন হল! প্রায় এগার ‘শো শব্দ ধরে আমি আপনাকে কত না কথা বললাম, আর তার বিনিময়ে আপনি মাত্র এরকম একটা কেজো প্রশ্ন করে বসলেন! আমি বেশ ক্ষুণ্ণ হলাম, বনলতা, বললাম,

– কেন বলুন তো?

– তখন থেকে যে নাম ধরে ডাকছেন, সেটা আমার নাম নয়।

– মানে, আপনি বনলতা নন?

– কোনোদিন ছিলাম না।

– তাহলে আপনার নাম কী? মেরিলিন মনরো?

– তাতে কী এসে যায়?

– কিন্তু আপনার একটা নাম না থাকলে কথা এগোবে কী করে?

– যেভাবে এগোচ্ছিল, আর হ্যাঁ, আরও একটা কথা…

– বলুন।

– আমাকে আজ অব্দি কেউ অন্তর্বাস উপহার দেয়নি। ওটা আপনার কল্পনা। দ্বিতীয়ত, আপনি যে বললেন…

– আরও কি বলে ফেলেছি আমি?

– আমার পায়ের নখে এসে শতেক পুরুষ হুমড়ি খাচ্ছে, এরকম কোনও ব্যাপার নেই। আমি সাধারণত নখ রাঙাতে পছন্দ করি না।

– আর কিছু?

– থাকলেও বলছি না। আপনি ধীরেসুস্থে আপনার মদটুকু খান। তাড়াতাড়ি বেশ খানিকটা খেয়ে ফেলেছেন বলে আপনার সম্ভবত নেশা হয়ে গিয়েছে।

এ ভারী আজব কথা বলছেন আপনি, বনলতা। কেন বলছেন, আমি জানি। আমি ভিখিরি, দাসের অধিক দাস, তাই আমাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা কথা বলা খুব সহজ। এটাই আপনার বিত্তশালী পুরুষ প্রেমিকদের বলতে পারতেন!তা ছাড়া, আমি তো আপনার প্রেমিক নই। আমি শুধু আপনাকে এই কলকাতায় সুড়ঙ্গ দেখাতে চাই। যার খোঁজ শুধু আমিই আপনাকে দিতে পারি।

– বিনিময়ে আমাকে কী দিতে হবে? জানতে চেয়েছিলেন আপনি।

– একটা দিন মদ খাইয়ে দেবেন। যেদিন আমার খুব মরে যেতে  ইচ্ছে করবে, সেদিন।

দেখুন বনলতা, এক একদিন আমার সত্যিই মরে যেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে প্রচণ্ড বৃষ্টি-বাদলের রাত যেমন ঘুম ভেঙে ঝলমলে সকাল হয়ে ওঠে, তেমন এই ক্লান্তিকর জীবনটা একদিন চকচকে মৃত্যু হয়ে উঠুক। আবার মরে বেঁচে যেতেও খুব সাধ হয়। সত্যি বলতে, পুরো ব্যাপারটা যেএত কনফিউজিং, কী বলব! জীবনটা এরকমই বনলতা| আপনি কী করে জানবেন। আপনি অন্তর্বাস উপহার পাওয়া নায়িকা, আপনি কী করে জানবেন জীবন কেমন অদ্ভুত। এই যে আমি গাড়ি চড়ে ফিরি বললাম, তাই বলে কি আমি ভিখিরি নই। আমি চাকরি করি বনলতা, বেতনও পাই; কিন্তু মাসের কুড়ি দিনের মধ্যে আমার সেই বেতন ফুরিয়ে যায়। আমি তারপর থেকে ধার করে সিগরেট খাই। চা খাই ঘনঘন, যাতে টিফিনের পয়সা বাঁচে। চা দিতে আসা ছেলেটি আমাকেতবু স্যার বলে সম্বোধন করে। কিন্তু, বিশ্বাস করুন বনলতা, আমার অ্যাকাউন্টে আর সাড়ে চারশো টাকা পড়ে আছে। বলুন, আমি ভিখিরি নয়! এর পরেও প্রত্যেকদিন গিয়ে আমি নিয়মিত কাজ করি, যাতে পরের মাসের অন্তত কুড়ি দিনের বেতন পাই। নইলে তো না খেতে পেয়ে মরে যাব! বলুন বনলতা, আমি দাস নই! অথচ সকলেই জানে আমি ভালো আছি। কী যে কনফিউজিং এ জীবন, সে আপনাকে আমি কী করে বোঝাব বনলতা! আমি নিজেই বুঝতে পারি না; বোঝার চেষ্টা যখন করি, তখনআমার মদ খেতে ইচ্ছে করে। কী করে খাব! পয়সা তো নেই। আমি বন্ধুদের ফোন করি। তাদের পয়সা আছে, কিন্তু সকলের পকেট গলে বেরিয়ে গিয়েছে সময়। কেউ ধরে রাখতে পারেনি। আমি ক্রমশ নির্বান্ধব, নির্জন হয়ে একা, জানেনবনলতা, বিক্রি শেষে ঝুড়িতে পড়ে থাকা একটা সাদা ফ্যাকাশে ঘোলাটে চোখের মাছের মতো পড়ে থাকি। আমি জানি, আমি মরেই আছি, তবু ফের মরে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু এও আমি জানি, সেই আউট্রাম ঘাটে সোনালি মেঘের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া আমার হবে না; তাহলে কি সেই বহুতল পড়ে থেকে পড়ে থেঁতলে মৃত্যু! নাকি মেট্রোতে! কী কুৎসিত একটা ক্যাওস হবে বলুন দিকি! আমার ভয় হয়। লজ্জা লাগে। নিজেকেই আর ভরসা করতে পারি না। তখন আমি আর থাকতে না পেরে  আপনাকে ফোন করি। বলি, বনলতা, আমাকে একটু মদ খাওয়াবেন? আপনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন| বললেন, বেশ তো চলে আসুন। তারপর মশকরা করে বললেন, শুধু শুধু মদ খাবেন? আমি তো আপনাকে মদ খাওয়াব, আপনি বিনিময়ে কী দেবেন বলুন? আমি বললাম, দেব, আপনাকেই সে জিনিস দেওয়া যায়। এক কলকাতার ভিতর যে একটা সুড়ঙ্গ আছ, আমি বাজি রেখে বলতে পারি, তার খোঁজ কেউ জানে না। আমি আপনাকে সেই সুড়ঙ্গ দেখাব, আজকের দিনটা শুধু আপনি আমাকে বাঁচিয়ে দিন।

– তবে যে বড়, আপনার সঙ্গে একটা রাত আমি সুড়ঙ্গে পালাতে পারিকি-না জানতে চাইছিলেন?

– চাইছিলামই তো!

– কিন্তু তার আর মানে কী থাকল? মদ খাওয়ানোর শর্ত হিসেবে আপনাকে তো আমাকে সুড়ঙ্গের খোঁজ দিতেই হবে।

– সেই তো একই হল

– না হল না, আপনার সঙ্গে পালানোটা হল না…

– আপনি সত্যি আমার সঙ্গে একটা রাত পালাতে চান বনলতা! সেই আপনি, যাকে দেখে মনে হয় বিজ্ঞাপনে দেখানো অলৌকিক নারী, সেই আপনি আমার সঙ্গে পালাবেন?

– পালাতে পারি, কিন্তু তার আগে আপনি মদটা শেষ করুন|

– মদ তো আমি এখনও খাইনি বনলতা!

– সে কী! আমি তবে আপনাকে কী খাওয়ালাম! আর, আপনি নেশা করে আমাকে নিয়ে যে এত কথা রচনা করলেন, সে সব কি ভুয়ো বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন!

– আপনার কি সত্যি মনে হয় বনলতা, সাড়ে চারশো টাকা নিয়ে আমি মদ খেতে এসেছি!আর আপনি, আপনি সম্পূর্ণ অচেনা আমাকে কেন মদ খাওয়াবেন বনলতা? আপনার কী দরকার এতগুলো টাকা খরচ করার?

আপনি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন| তারপর বললেন,একটাসুড়ঙ্গ দরকার।

(তিন)

আমিজানি না বনলতা, আর কোনোদিন আমাদের দেখা হবে কি-না। শ্রেণিগত ভাবে আপনি যে জায়গায় অবস্থান করেন, তাতে এই ভিখিরি, এই দাসের অধিক দাস ব্যক্তির সঙ্গে আপনার দেখা হবেই বা কেন! আপনি সুন্দর, সুগন্ধী নারী! শতেক পুরুষ আপনার নখরঞ্জনিতে হোঁচট খেয়ে পড়বে ভবিষ্যতে। আপনি আমাকে ভুলে যাবেন, বনলতা। তবু এই যে এক বিকেল নেশা আপনি উপহার দিলেন, আমাকে আরও কিছুদিনের জন্য বাঁচিয়ে দিলেন, এর জন্য আমি কৃতজ্ঞ।

– আপনি আবার প্রলাপ বকতে শুরু করেছেন। আপনি বলে উঠলেন বনলতা।

– একদিন নাহয় একটু প্রলাপে অনুমতি দিলেন। আমি পালটা বললাম।

আপনি শুনে চুপ করে গেলেন। আমার মনে হল, এখুনি আপনাকে কিছু একটা দেওয়া উচিত। আমি আপনাকে বললাম, বনলতা, কিছু যদি মনে না করেন, আমি কি আপনাকে একটা গান উপহার দিতে পারি?

– আপনি লিখেছেন?

– তা নয়। তবে এক্ষেত্রে আমি ভিখিরি বলে আমার কোনও কষ্ট নেই বনলতা। আমি রবি ঠাকুরের ভাঁড়ার থেকে আপনাকে একটা গান দিয়ে যাই।

– বেশ তো দিন|

আমি ধীরে ধীরে বললাম,

মন যবে মোর দূরে দূরে

             ফিরেছিল আকাশ ঘুরে

             তখন আমার ব্যথার সুরে

                        আভাস দিয়ে গিয়েছিলে ॥

যবে     বিদায় নিয়ে যাব চলে

         মিলন-পালা সাঙ্গ হলে

             শরৎ-আলোয় বাদল-মেঘে

             এই কথাটি রইবে লেগে–

             এই শ্যামলে এই নীলিমায়

                         আমায় দেখা দিয়েছিলে ॥

– এই কথা আপনি আমাকে উপহার দিলেন?

– দিলাম।

– তাহলে আমিও আপনাকে একটা গান উপহার দিই?

– বনলতা, আপনি আমাকে ধনী করে তুললেন আজ। ভাবুন, আজ থেকে আপনার দেওয়া একটা   গান থাকবে আমার কাছে। আপনাকে অনর্বাস দেওয়া পুরুষরা তো তা পাবে না।

– আবার অন্তর্বাস! বনলতা, আপনি তখন চোখ পাকালেন|

– আচ্ছা আর বলব না। এই হাত পাতলুম, দিন এবার গানখানা|

বনলতা, আপনি তখন আপনার জ্যোৎস্নার মতো স্নিগ্ধ  কণ্ঠে বলে উঠলেন,

আমার সকল ভালোবাসায়    সকল আঘাত সকল আশায়

        তুমি ছিলে আমার কাছে, তোমার কাছে যাই নি ॥

        তুমি মোর আনন্দ হয়ে    ছিলে আমার খেলায়–

        আনন্দে তাই ভুলেছিলেম,    কেটেছে দিন হেলায়।

        গোপন রহি গভীর প্রাণে         আমার দুঃখসুখের গানে

        সুর দিয়েছ তুমি, আমি          তোমার গান তো গাই নি ॥

এই শুনে আমি যারপরনাই লজ্জিত হলাম বনলতা। বললাম, এ গান তো আমার আপনাকে দেওয়ার কথা।

এবার আপনার চোখে ফিরে এল সেই খেলুড়ে আলো| এইখান থেকে, ঠিক এইখান থেকে আপনি রহস্যময়ী, ছলনাময়ী হয়ে ওঠেন বনলতা।  কেননা, আমার কথার উত্তরে আপনি এখন বললেন, আমি আর আপনি তো আলাদা নই! আপনি আমাকে যে গান দিলেন, সে আপনার কাছেই থাকল। আমি যে গান দিলাম, সেও আপনার কাছেই থাকল।

আমার ঘোর লেগে যায়, বনলতা। বিশ্বাস করুন, আমি তো মদ খাইনি, তবু, এক মাথা নেশায় যেন আমি আচ্ছন্ন হয়ে আছি| আমি বুঝতে পারি, আমি এখনও বেঁচে আছি, আপনি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, বনলতা।

বনলতা, আমি জানি, এবার আপনি চলে যাবেন। চলে তো আপনাকে যেতেই হবে। সারাক্ষণ আপনি আমার কাছে থাকলে, এ পৃথিবীতে মড়ক নেমে আসবে। আপনি বরং চলেই যান, বনলতা। আমি কোনক্রমে একটা কোথাও মাথা গুঁজে রাত কাটিয়ে দেব। কাল থেকে আবার ভিখিরি আমি। দাসের অধিক দাস| কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি সত্যিই জানি, এই কলকাতা শহরের বুকে একটা সুড়ঙ্গ আছে| সেখানে একবার সেঁধিয়ে পড়তে পারলে, বেশ খানিকক্ষণ একটা ইচ্ছেখুশির পৃথিবীতে থাকা যায়। অনেক ঘুরে ঘুরে আমি তার দেখা পেয়েছি। এই দরিদ্র, লাঞ্ছিত, এই পরানুগ্রহে বেঁচে থাকা জীবনটা, বিশ্বাস করুন, আমি আর সত্যিই বাঁচতে চাই না। ভাগ্যিস এই সুড়ঙ্গটা পেয়ে গিয়েছিলাম বলে, আমি জানি, আরও কিছুদিন আমি কোনক্রমে বেঁচে যাব। এটুকুই বনলতা, মাত্র এটুকুই। সোনার হরিণী আপনি। ছলনার জাল বিস্তার করে দিনকে রাত, রাতকে দিন করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। আপনার তো গুণগ্রাহীর অভাব নেই। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমার আর কিছু নেই,এই এক সুড়ঙ্গ ছাড়া। বনলতা, আপনি কথা দিন, আরও একদিন আমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবেন। তাহলে আমি আরও কিছুদিন হয়তো বেঁচে যাব।

কিন্তু দোহাই বনলতা, খবরদার আপনি যেন বলে ফেলবেন না, আপনি বলে কেউ কোথাও নেই। রহস্যময়ী আপনি, এই কথা বলে তো দিব্যি চলে যাবেন। কিন্তুআমার নেশা কেটে গেলে, আমি আর তখন ঘুমোতে পারব না| সেই অসহ একাকীত্বের রাত আমার সহ্য হবে না। আমি মরে যাব বনলতা। আপনি আমাকে বাঁচিয়ে দেবেন সেদিনও। কিছু সত্যি না বলে। কিছু মিথ্যে সত্যির মতো করে বলে। মেরিলিনের স্কার্টের মতো, উড়ে যেতে চায় তবু যেন থেকেও যেতে চায়, ওইটুকু ছলনা আমার জন্য বরাদ্দ রাখবেন, বনলতা।

সুড়ঙ্গ ধরে আমি খানিকক্ষণ চলে যাব ইচ্ছেখুশির পৃথিবীতে। জীবনের যত ওঠাপড়া, অন্তত কিছুক্ষণ যেন গায়ে না লাগে। একটু দেখবেন, বনলতা, প্লিজ।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত