| 19 এপ্রিল 2024
Categories
উৎসব সংখ্যা’২০২১

ইরাবতী উৎসব সংখ্যা গল্প: ওয়াইন বার । স্বর্ভানু সান্যাল

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

তলানিটুকু গলায় ঢেলে দিয়ে ওয়াইন গ্লাসটা চকলেট কালারের রেকলাইন্ড লেদার সোফার কাপ হোল্ডারে নামিয়ে রাখতেই দেখতে পেলাম আমার বাঁ দিকের সোফার কাপ হোল্ডারে আর একটা ওয়াইন গ্লাস। আঙুলগুলো দেখে মনে হল মেয়েটার ড্রেসিং সেন্স মন্দ না। সরু সেক্সি আঙুল্গুলো এমন করে গ্লাসটার  স্লিম কোমর জড়িয়ে আছে যেন মনে হচ্ছে কোনো মানি প্ল্যান্ট। টারকোয়েজ কালারের নেল পালিশ। উঁহু শুধু নেল পালিশ নয়। নেল আর্ট করা। টারকোয়েজ কালারের ব্যাকগ্রাউন্ডে গোলাপী পাম লিফ। নখগুলো এমন কাচের মত স্বচ্ছ যেন এখুনি গলে গিয়ে ভিতরের নরম মাংস বেরিয়ে আসবে শামুকের মত। আমার ইচ্ছে করল মেয়েটার মুখটা আড়চোখে দেখে নিতে। কিন্তু নিজেকে নিবৃত্ত করলাম। তাড়া কি? পাশের সোফাতেই যখন আর গ্লাস যখন অর্ধেকের বেশি ভর্তি, তখন আলাপ করার সুযোগ পাওয়াই যাবে। বেশি আদেখলেপনা না দেখালে অনেক সময় মেয়েরা তাড়াতাড়ি পটে। 

এই ওয়াইন বারটাতে আমি গত দশ বছর ধরে আসছি। বারটা বন্ধ হয় সাড়ে এগারোটায়। আমি প্রতি সোমবার নটা নাগাদ আসি এখানে। এই সময়টাতেই আসি তার কারণ হল, আমি লোকজন একদম পছন্দ করি না। ফাঁকা বারে বরডিয়াক্সের তিরতিরে আমেজ নিতে নিতে আমি আমার মাথার গল্পগুলো গুছিয়ে নিই। সোমবার বারে সবচেয়ে কম লোক হয়। আর সন্ধে নটার পরে বারটা প্র্যাকক্টিকালি ফাঁকা থাকে। আজ যেমন। আমি ছাড়া আর কেউ নেই। আই মীন এতক্ষণ ছিল না। সবে একজন নেল আর্ট করা সুন্দরী আই মীন সম্ভবত-সুন্দরী (আমি শুধু ওর নখ দেখেছি এখনো)  আমার পাশের সোফাটা দখল করেছে। সোমবার রাত দশটায় একা ওয়াইন বারে এসেছে যখন নিশ্চয়ই স্বাধীনচেতা। এখন যাকে বলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট উওম্যান। হয়তো একটা গল্প পেয়ে যেতে পারি। ও আচ্ছা বলা হয় নি। আমি একজন গল্প লিখিয়ে। না সখের না। ফুল টাইম। আসলে আমার গল্প সঙ্কলন স্বপ্ন শহর বইটা হঠাত এমন বিক্রি হয়ে গেল যে পট করে বসের মুখে রেজিগনেশান লেটারটা ছুঁড়ে মেরে দিয়ে বেরিয়ে এলাম। বস বলেছিল, “গল্প লিখলে বউ বাচ্চার পেট ভরবে না। ওসব ছেড়ে দিয়ে মন দিয়ে কোড লেখো।” এক নম্বরের হারামির…যাকগে যাক। যেটা বলেছিলাম। আমি এই সময়টায় সুরাসেবন করতে আসি বারটা সম্পূর্ণ  ফাঁকা থাকে বলে। যেন এক্সক্লুসিভ্লি আমার জন্য রিসার্ভ করা। আর এই বারটাতেই আসি কারণ এই সোফা। বাকি সব বারে লম্বা কানা ওঠা বার টুল থাকে। ওগুলোতে বসলে মনে হয় রনপা লাগিয়ে কেউ আমায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একটু বেসামাল হলেই পপাত ধরণী তলে হবো। কি করে যে লোকে ওই অস্বস্তিকর টুলে বসে ওয়াইন এনজয় করে কে জানে? 

আমার এই নিজের সাথে নিজের রাঁদেভোর ব্যাপারে আমি খুব পার্টিকুলার। এই বারে পাশাপাশি দুটো রেল্কাইনার। সামনে ফায়ার প্লেস। আমি এসে ডান দিকেরটা দখল করি। ডান দিকের কাউচটার পাশেই জানলা। আমি জানলা দিয়ে চোখ বাইরে রাখি।  উদ্দেশ্যহীন কিছু মানুষ অ্যাকুরিয়ামের মাছের মত ইতিউতি ঘুরে বেড়ায়। ভিতরে বাক কি বিঠোভেনের ছন্দবদ্ধ সুরের শরীর আর বাইরে অসংলগ্ন নিরন্তর চলাচল এই বৈপরীত্য, এই ডিকোটমি আমায় একটা নিঃশর্ত আশ্রয় দেয়। আমি সোফাটায় শরীর এড়িয়ে দিলেই বারটেন্ডার ইরিনা এসে আমায় এক গ্লাস বরডিয়াক্স রেড দিয়ে যায়। আমি স্যাতো মনগ্রাভে প্রেফার করি। ফ্রেঞ্চ ভাষায় কোনো স্ট্রেসড সিলেবল নেই। ফ্রেঞ্চ ওয়াইনও মাখনের মত স্মুথ। গলাটা ঠিক যতটা শুকোলে মাথার মধ্যে একটা রিনরিনে সুর বাজতে থাকে, ঠিক ততটা গলা-শুকিয়ে-দেওয়ার-মতন নির্ভুল পরিমাণের ট্যানিন।  ক্যাবারনেট সভিগনন, মারলেট আর ক্যাবারনেট ফ্রাঙ্ক ভ্যারাইটির আঙুরের একটা অলীক যুগলবন্দি। ইরিনা এসে যখন থ্রী-কোয়ার্টার ফুল ওয়াইন গ্লাসটা আমার সামনে নামিয়ে রাখে, আমি ওর বাঁশ পাতার মত হিলহিলে শরীরটা দেখে একটা হার্টবীট মিস করি। বড় করে একটা শ্বাস নিই। ওর পারফিউমের গন্ধটা আমার এক্স গার্ল ফ্রেন্ড অর্যমার কথা মনে করিয়ে দেয়। অর্যমা ওর নামের মতই একটা ভীষণ অনন্য একটা প্যাকেজ ছিল। এখনো বুকের ভিতরটা চিন চিন করে ওর নরম বুকটার কথা মনে পড়লে। আমি বিশ্বাস করি, সাফল্যের পথে মানুষকে একাই চলতে হয়। সঙ্গী সাথী যত ছেড়ে আসা যায় তত দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে আকাশ সঙ্গমে যাওয়া যায়। পাঠকের হাতে ছেড়ে এসেছি আমার গল্পদের। একই সাথে ছেড়ে এসেছি অনেক মেয়ে বন্ধুকে। তবু অর্যমাকে আমি ছেড়ে পথ চলতে পারি নি।

ঠিক এক ঘন্টা সময় নিয়ে আমি প্রথম পেয়ালাটা শেষ করি। তারপর আর দু গ্লাস স্যাতো মনগ্রাভে শেষ করি পরের এক ঘন্টায়। এই সময় আমার নেশাটা ঠিক অপ্টিমাম হয়। ইরিনার মুখটা পূর্ণিমার চাদের মত লাস্যময়ী হয়ে ওঠে আমার চোখে। তখন আমি উঠে বার কাউন্টারে গিয়ে ওর সাথে গল্প জুড়ি। ও ওর এক্স বয়ফ্রেন্ডদের গল্প বলে। ইরিনা এখনকার মেয়েদের তুলনায় একটু রক্ষণশীল। ছেলেদের ছোঁক ছোঁক করাটা ওর পছন্দ না। তার মানে এই নয় যে বিয়ের আগে পর্যন্ত কুমারী থাকতে হবে এমন ধনুক ভাঙা পণ ও করেছে। তবে পেটে দু পেগ স্কচ পড়লেই ছেলেবন্ধু তাকে বিছানায় নিতে চাইলে ইরিনা পত্রপাঠ বিদায় দিয়ে দেয় তাকে। এই করে প্রথম দুটো গেছে। ওর থার্ড বয়ফ্রেন্ডটা পাগলাটে টাইপের ছিল। সাপ পুষত। একটা বেবি পাইথন। একদিন স্টিভের অ্যাপার্ট্মেন্টে প্যাসোনেট আদরের শেষে ইরিনা আধা ঘুমে আধা জাগরণে তলিয়ে গেছিল। ঘুমের মধ্যে আবেশে স্টিভকে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে পিচ্ছিল, ঠান্ডা যে জিনিসটার গায়ে নিজের স্লেন্ডার লেগ দুটো তুলে দিয়েছিল সেটা সেই বেবি পাইথনটা ছিল। পুরো এক মাস ঠিক করে ঘুমোতে পারে নি ইরিনা। ঘুমোলেই চমকে চমকে জেগে উঠত। স্টিভকে রিকুয়েস্ট করেছিল পাইথনটাকে বিদায় দিতে। স্টিভ ইরিনাকেই টাটা বাই বাই করে দেয়। ওর নাকি পাইথনটাকে কোলবালিশ করে না শুলে ঘুম হয় না। উইয়ার্ড সোউল, ইরিনার ভাষায়। আমি গল্প শুনি আর ওর বুকের ডালিমের দিকে তাকিয়ে থাকি। একদম পারফেক্ট সাইজের। একটুও অতিরিক্তি মেদ নেই। ঠিক যেন যত্ন করে বানানো জাম্বো সাইজের ফিসবল।

আমার প্রথম গ্লাসটা শেষ হয়েছে মানে এখন দশটা বাজে। এখন ইরিনার আমায় সেকেন্ড সার্ভিং বরডিয়াক্স দেওয়ার কথা। কিন্তু কাউন্টারে ইরিনাকে দেখছি না। হয়তো সিগারেট খেতে বাইরে গেছে। আমি কখনো ওই খুনে সাদা কাঠি ঠোঁটে ছোঁয়াই নি। তবে অর্যমা স্মোক করত। ওর সিগারেট খাওয়া ঠোঁটে চুমু খেতে আমার বেশ লাগত। সেই অর্থে আমায় প্যাসিভ স্মোকার না বলে প্যাসিভ সাকার বলা চলে। আমি তামাক চুষে নিতাম ওর ঠোঁট থেকে। শুধু দেড়টা বছর আমাদের সম্পর্ক ছিল। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দেড়টা বছর। অর্যমার পাতলা শরীরটা প্রতি রাতে বিছানায় পিষে ফেললেই সুনিবিড় তমস্বিনী কাহিনীরা আমায় ঘিরে ধরত এসে। তারপর দিনভর সেইসব কাহিনীকে শব্দের শরীর দিতাম।

আপনি বোধ হয় সেই বিখ্যাত সাহিত্যিক সুধন্য সরকার, অ্যাম আই রাইট?

যাক চিনতে পেরেছে আমায় তাহলে? শুধু নেল আর্ট করে না, বই টইও পড়ে। অবশ্য, ট্রুথ বী টোল্ড, সত্যি বলতে, যারা আমায় চেনে তারা শুধু মাত্র আমার লেখা পড়েই আমায় চেনে তেমন না, কখনো কখনো আমার দুর্বিনীত স্বভাব, আমার ছক ভাঙা লেখার স্টাইল, আমার ধুমকেতুর মত সাফল্যের শিখরে পৌঁছে যাওয়া, আমার মেয়েদের প্রতি দুর্বলতা, আমাকে নিয়ে চালু মুখরোচক গসিপ এসবের জন্যও আমাকে চেনে অনেকে। আর হয়তো চেনে সেই ঘটনাটার জন্য। ফ্রন্ট পেজ নিউজ হয়েছিল। সত্যি বলতে আমি মনে করি মার্কেটিং-এর ভাল মন্দ হয় না। তোমার নাম চাউর হওয়াটা দরকার। তবে অর্যমার দিব্যি নিয়ে বলতে পারি সাহিত্যের সঙ্গে আমি অন্তত কখনো প্রতারণা করি নি। মনে যে ভাব যেমনটা এসেছে তেমনভাবেই তাকে শব্দে ধরেছি। কাহিনীকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে, চরিত্রদের অলীক বানিয়ে নিজেকে ঈশ্বরের পর্যায়ে উন্নীত করার চেষ্টা করি নি। গল্প লিখতে বসে একটি সমান্তরাল মহাবিশ্ব তৈরী করার ঔদ্ধত্য দেখাই নি কখনো। এই সততার জন্যই হয়তো পাঠক কখনও আমায় নিরাশ করে নি। ভালবাসায় ভরিয়ে দিয়েছে। ওদের সুখ, দঃখ, কাম, বিরাগ, প্রতারণাকে আমি শুধু শব্দের নিগড়ে বেঁধেছি মাত্র। আমার এতটুকু কল্পনাশক্তি নেই। এতটুকু ওরিজিনালিটি নেই। আমি শুধু যা দেখেছি, যা শুনেছি সেটুকুই লিখেছি।   

আর সস্তা সিনে ম্যাগাজিনে কি ট্যাবলয়েডে আমার চরিত্রের দোষের ব্যাপারে যে সব গল্পগাছা চাউর হত, অস্বীকার করব না, তার কিছুটা হয়তো সত্যি। নারী শরীরের প্রতি একটা অদ্ভুত দুর্বলতা আছে আমার। ছিল। আমার গল্পে যে নারী চরিত্ররা আসত তাদের এতটাই যত্ন করে গড়তাম, প্রতিটা মেয়েকে এতটাই অনন্যা করে গড়তাম, যে গল্প লেখার শেষে সেই তিল তিল করে গড়ে তোলা গল্পের নায়িকার সাথেই আমার প্রেম করতে ইচ্ছে করত। আমারই গল্পের নায়িকাদের সাথে আমার রাত কাটাতে ইচ্ছে করত। গল্পের শেষে আমার চরিত্ররা প্রকৃত বাস্তবের থেকেও বেশি বাস্তব। আর আমার গল্পের নারীর প্রতিকৃতি হিসেবে আমি রক্ত মাংসের অনেক মেয়ের সাথে সম্পর্ক তৈরী করেছি। রিলেশান। অ্যাফেয়ার নয়। অ্যাফেয়ার কেন জানি মনে হয় শুধুই শরীরী। আর আমি শুধুই একটা মন। অনেক নারী শরীর নিয়ে রাতভর খেলা করেছি। কিন্তু অর্যমার দিব্যি নিয়ে বলতে পারি, যে আমি কখনও আমার গার্লফ্রেন্ডদেরও ঠকাই নি। আমি প্রথমেই সম্পর্কের শুরুতেই আমার গার্লফ্রেন্ডের নতুন নামকরণ করতাম। আমার গল্পের চরিত্রের নাম দিতাম। অবশ্যই যদি সে রাজি থাকত। সে যদি নিঃশর্ত ভাবে তার নিজের আইডেন্টিটি, নিজের পরিচয়কে সমর্পণ করে আমার গল্পের নায়িকার আইডেন্টিটি নিতে চাইত তবেই। জ্ঞানত কোনো মেয়েকে আমি অসম্মান করি নি। আমার গল্পের নারীরা এতটাই রহস্যময়ী, এতটাই এনিগম্যাটিক, এতটাই বর্ণময় তাদের ব্যক্তিত্ব, আমার গল্পের প্রেক্ষাপটগুলো এতটাই কুহেলিকায় আচ্ছন্ন যে অনেক তন্বী সুন্দরীই আমার গল্পের চরিত্র হয়ে কিছুদিনের জন্য সেই ফ্যান্টাসি ল্যান্ডে বাস করতে সানন্দে রাজী হয়ে যেত। আমার সাথে শরীরের কুহকে মাতত। আমি কোনো রক্তমাংসের নারীর সাথে শরীরী প্রেম করি নি। হয়তো ওটাই আমার অহঙ্কার ছিল। আমি বাস্তবের থেকেও অধিক বাস্তব, এক ধরণের অধিবাস্তব তৈরী করি শব্দ দিয়ে যা কিনা মাকড়সার মত ধীরে ধীরে গিলে নেয় আগুনের মত লেলিহান রুপসীদের। তবে শুধু একবার মাত্র, শুধুমাত্র একটা মেয়ের আসল পরিচয়ের সাথে রাত কাটাতে চেয়েছিলাম। তার পিতৃদত্ত নাম…উঁহু ওর নাম ওর মা রেখেছিল। সিংগল মাদার। বাবা অন্য একটা মেয়ের সাথে পালিয়ে যায়  ওর জন্মানোর পরে পরেই। আমি শুধু একজনকেই ওর মাতৃদত্ত নামে ডাকতে চেয়েছিলাম। সে হল অর্যমা। কিন্তু…  আসলে আমি অন্যের অনুভূতিকে ভাষা দিতে পেরেছি।  নিজের অনুভূতিগুলোকে কখনো ভাষা দিতে পারি নি। 

হ্যাঁ। সোহম। সোহম। সেই আমি। আমিই সেই। তবে আপনার দাঁড়িপাল্লায় আমার ভাল আর মন্দের মধ্যে কোনটার পাল্লা ভারি তা বলতে পারি না।

আলো কোনো সারফেস থেকে প্রতিফলিত হলে তবেই আলো। নয়তো আলো আছে না নেই কে বলতে পারে বলুন? তেমনই মানুষের চেতনায়, হিউমান কনসাসনেসে প্রতিফলিত হলে তবেই ভাল মন্দ। নয়তো ভাল মন্দ বলে কিছু আছে কিনা কে বলতে পারে? ভাল আর মন্দ সমাজের প্রয়োজনে তৈরী শুধু দুটো টেম্পোরারি চেকলিস্ট।

তা ঠিক। তবে চেতন বস্তু হিসেবে আপনার নিও কর্টেক্সে আমার একটা ইমেজ থাকবে। সাদা অথবা কালো অথবা ধূসর। 

আমার আসলে কাউকে জাজ করার অধিকার নেই। 

কেন? গুরুর বারণ আছে না আপনি লইয়ার? 

আমার সেন্স অফ হিউমার ভীষণ পুওর। একটু “উইয়ার্ড” ইরিনার ভাষায়। কিন্তু মেয়েরা দেখেছি আমার লক্ষণরেখা পেরোনোটাকে ক্ষমাঘেন্না করে নেয়। তবে সব সময় নয়। আমার এক কবি বান্ধবী একটি সাহিত্য সমাবেশের শেষে ওয়াইন ওপেনার দিয়ে ওয়াইন বটল খুলছিল একবার. ওপেনারের পাকানো দাঁড়াটা ছিপির মধ্যে যখন ঢুকে যাচ্ছিল আর তার সঙ্গে ওপেনারের লিভার বাহুগুলো খুলে যাচ্ছিল, আমি মজা করে বলেছিলাম, যেন রমণরতা কোনো রমণী পা খুলে দিচ্ছে সুখের আবেশে। ইন ফ্যাক্ট আমি বলেছিলাম, দ্য ওপেনার ইজ স্ক্রুয়িং ইটসেলফ অ্যান্ড গেটিং এক্সাইটেড। বলা বাহুল্য, এমন অসাধারণ উপমাটি কবিবর ভালভাবে নেন নি যদিও তাঁর লেখায় প্রতি দু পংক্তিতে একটি করে জঙ্ঘা, যোনি, শিশ্ন, বাহুমূল থাকে। পরের দিন প্রায় সব কটা ট্যাবলয়েডে ফ্রন্ট পেজ হয়েছিল স্টোরিটা। তবে ওই যে বললাম মার্কেটিং ভাল হোক বা মন্দ, যতক্ষণ লোকে আমার নাম শুনছে আই অ্যাম ওকে। পাঠককে সাহিত্য সরোজের ধারে নিয়ে আসার দায়িত্ব লেখকেরই। আর আমি তার জন্য সবরকম চেষ্টা করতে রাজি।

আসলে আমি একজন কাচ মানুষ। মেড অফ সলিড গ্লাস। নেল আর্ট করা হাত ওয়াইনের গ্লাস ঠোঁটে ছুঁইয়ে বলল মেয়েটা।  

এতক্ষণে আমি পার্শ্ববর্তিনীর দিকে ফিরে তাকালাম। আমার অনুমান চট করে ভুল হয় না। সত্যি চোখ আটকে যাওয়ার মত কানের লতি। কুমোরের চাকা থেকে সদ্য বেরিয়ে আসা চকচকে মসৃণ আর হালকা ভেজা গলা, বুক, কোমর। চুল মাথার ওপর চুড়ো করে বাঁধা। শুধু দু কানের পাশ দিয়ে  দু এক গাছি চুল নেমে এসে বুকের ওপরে পড়ে হ্যাংলামি করছে। চোয়ালের অংশটা বাইরের দিকে সামান্য ঠেলে বেরিয়ে এসেছে যেটা এক চিমটে নিষ্ঠুরতা যোগ করেছে ওর রূপে। তুলসী গাছের মত নমনীয় অথচ ঋজু শিরদাঁড়া। বারগান্ডি কালারের লং স্লীভ ম্যাক্সি ড্রেস পরম সুখে উপভোগ করছে শরীরের ওম। শুধু চোখের মধ্যে একটা বিরাট শুন্য। যেন একটা অতল খাদ। একবার ঝাঁপ দিয়ে পড়লে সে এক অনন্ত পাতাল যাত্রা। সেখানে বিষণ্ণতা নেই, আনন্দ নেই, জীবন নেই, মৃত্যু নেই, আছে শুধু এক চিরস্থায়ী আলো আঁধারি। এক চিরস্থায়ী নাস্তি। 

আমি চেতনা আর সংজ্ঞাহীনতার দিগন্তরেখায় এসে দাঁড়িয়েছি। পানাপুকুরের ব্যাঙের মত একবার ডুবে যাচ্ছি শব্দহীনতায়, আবার ফিরে আসছি শব্দময়তায়। টুপ করে ডুবছি। ভুস করে ভেসে উঠছি আবার। আমাদের সত্তার কতটুকুই বা চেতন। মৈনাক পর্বতের মত আমাদের অধিকাংশটাই ডুবে থাকে সান্দ্র তরল অন্ধকারে। হরিণীর মত জান্তব গন্ধ ভেসে আসছে ওর কাঁচুলির মত বুক থেকে। দূরাগত শ্রুতির মত ভেসে আসছে বিপন্ন বিহ্বলতা। গল্পের অনতিক্রম্য পরিসরে বন্দী হয়ে আছি আমি কত শত বর্ষ ধরে। বছর না দিন না ঘন্টা-মিনিট-সেকেন্ড নাকি স্থান-কালের মাত্রার বাইরে কোনো ফিফথ ডাইমেশানে আমার অবস্থান। কার্য কারণ সম্পর্ক রহিত এক নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি আমার। রাতের শরীর বেয়ে রুদ্ধ সঙ্গীত খুঁজে ফিরি আমি মগ্নচৈতন্যের অন্ধকারে।   

আমি আসলে একটা রিফ্লেকশান, প্রতিবিম্ব। আয়নার ওপারে আমার জন্ম, আমার জীবন। আমি রক্ত মাংসের শরীরের একটা ত্রুটিহীন অনুকরণ মাত্র। অলীক সত্তা। তাই আমার কাউকে জাজ করার যোগ্যতা নেই। কাচের মত শীতল গলায় বলল আমার পাশে বসা মেয়েটা। 

অর্থাৎ আপনার কোনো গল্প নেই। তাই তো? বিন্দু বিন্দু ঘামছি আমি। একটা পোড়া সূর্য জন্ম নিচ্ছে আমার বুকের গহনে।

ঠিক তাই। সত্যি যে, সত্য যা, তার গল্প থাকে। অতীত থাকে। বর্তমান থাকে। শুরু থাকে। শেষ থাকে। আমার নেই। আপনার কাছে আমার সেই উদ্দেশ্যেই আসা। 

আপনি চান আপনার গল্পটা আমি লিখে দিই। 

আপনি মোমের মত নরম বুকে মুখ ডুবিয়ে দিতে ভালবাসেন। তাই না? ওর হেলে সাপের মত হাতটা আমার হাতটা টেনে নিয়ে নিজের বুকের খাঁজে রাখল নেল আর্ট করা সুন্দরী। দেখুন কেমন সলিড গ্লাস? আসলে আমার শরীর নেই। রক্ত মাংস মজ্জা নেই। যোনি নেই। জঙ্ঘা নেই। অন্ধকার যখন সাঁত করে গিলে নেয় কাউকে আমি কিছুক্ষণের জন্য আয়নার ওপারের অন্ধ কারাগার  থেকে মুক্তি পাই। আমি তখন সলিড গ্লাসের শরীর নিয়ে আসি। আপনি আমার গল্পটা লিখুন। তাহলে আমি রক্ত মাংসের শরীর পাব। তারপর আমার সাপের মত শরীরের ভাঁজে ভাঁজে, খাঁজে খাঁজে খুঁজে নেবেন অস্থির সুখ। শরীরের সুখ পেতে ভীষণ ইচ্ছে হয় আমার। চামড়ার সঙ্গে চামড়া ঘষা লাগলে তবেই জীবনের কলরোল, উতরোল — গরম লোহার মত হিসহিস করে বলল মেয়েটি। 

                                       

সাপের মত শরীর। সাপ। বেবি পাইথন। ইরিনার বয়ফ্রেন্ডের কোলবালিশ। একটা সাপ, একটা প্রকাণ্ড সাপ খুঁজে ফেরে মানুষের শৈশব, কৈশোর, যৌবন। একটা অলীক ময়াল ধীরে ধীরে গিলে নেয় সমস্ত অস্তি। আমার হাতটা ও ওর স্তনমূলে বসিয়ে দেয়। গরম মোমের মত গলে যাচ্ছে ওর শরীর। ইরিনা এখনো নিয়ে এলো না আমার বরডিয়াক্স। 

আমি হাত সরিয়ে নিই। ইরিনাকে আদর করার পর থেকে আমি অন্য কোনো নারীকে ছুঁই নি কখনো। আমার স্বপ্নশহর গল্প সঙ্কলনের টাইটেল স্টোরির নায়িকা অর্যমা, আমার শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি। ইরিনাকে অর্যমা নাম আমিই দিয়েছিলাম। দেড় খানা বছর ওর পালকের মত শরীরে আমি রাজহাসের মত ভেসেছি। কিন্তু সেইদিন আমি অর্যমাকে ওর মাতৃদত্ত নাম ইরিনা ফিরিয়ে দিতে এসেছিলাম। আমি অর্যমাকে নয় ইরিনাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিতে এসেছিলাম। ইরিনা রাজি হয় নি। ইরিনা সফল গল্পকার, খ্যাতনামা গল্পকার সুধন্য সরকারকে ভালবাসে নি। ও শুধু আমার গল্পের দুনিয়ার অর্যমা হতে চেয়েছিল। অলীক শরীর চেয়েছিল। অলীক ভালবাসা। ও বলেছিল, আমি আমার গল্পের দুনিয়া থেকে বেরিয়ে রক্তমাংসের মানুষকে ভালবাসলে আমার গল্পরা ফুরিয়ে যাবে। গল্পকার সুধন্য সরকার শেষ হয়ে যাবে। সেদিন বারে আর কেউ ছিল না। শুধু আমি, ইরিনা আর এক অসীম শুন্যতা। আমায় প্রত্যাখ্যান করে মুখে মাপা হাসি নিয়ে ক্লীন করছিল গ্রাহকদের ছেড়ে যাওয়া টেবিল। যেন কিছুই হয় নি। যেন একটা ভিখিরিকে দেখে সিগন্যালে দাঁড়ানো গাড়ির কাচ তুলে দিয়েছে। ও টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরে ঘুরে ঠুংঠাং তুলে নিচ্ছিল ছুরি কাচি প্লেট। ওর শরীরের সুবাস চেটে নিচ্ছিল অন্ধকারের নারীশরীর লোভী ক্ষুধার্ত কণারা। আমি একটা সলিড গ্লাসের ডেকরেটিভ আইটেম তুলে নিয়ে গিয়ে ঠং করে মারি ওর সুন্দর ছোট্ট মাথাটায় পেছন থেকে। ঠং। ঠং ঠং। পর পর তিনবার। ওর ঝালর ঝালর সোনালি চুলের মত চুঁইয়ে নামছিল কালচে রক্ত। 

আর গল্প লেখা হত না আমার। তাই আর দরকার ছিল না আমার থাকার। একটা বিরাট গল্পের মধ্যেই আমাদের বাস। গল্পের মধ্যেই আমরা থাকি। আমরা এক অনিবার্য সত্যের প্রতিফলন, প্রতিবিম্ব মাত্র। গল্প ফুরোলেই অন্ধকার সাঁত করে গিলে নেয় আমাদের। একটা ময়াল সাপ নিরন্তর আমাদের পিছু পিছু ঘোরে।  ইরিনার হাত থেকে ছেতরে পড়া স্যাতে মংগ্রাভের বোতলের ভাঙা কাচ দিয়ে ঠান্ডা মাথায় নিজেকে হত্যা করি সময় নিয়ে। সারারাত সময়টা কম নয়। ইরিনার লোহিত কণিকারা আমার লোহিত কণিকাদের সাথে সারারাত সঙ্গম করেছে সে রাতে। এত কাছ থেকে ইরিনাকে, এত নিবিড় ভাবে আর কখনো পাইনি আমি আমার গল্পের অর্যমাকে, আমার বাস্তবের ইরিনাকে।   

ফ্রন্ট পেজ নিউজ হয়েছিল পরের দিন। সব প্রথম শ্রেণির কাগজে। সব দ্বিতীয় শ্রেণির ট্যাবলয়েডে। তারপর থেকে এ বার বন্ধ পড়ে আছে।          

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত