| 15 এপ্রিল 2024
Categories
উৎসব সংখ্যা’২০২১

ইরাবতী উৎসব সংখ্যা গল্প: অমূল্যনিধি । তন্ময় সরকার

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

স্টেশনের সামনে টাইলসে বাঁধানো চত্ত্বরে গাড়িটা এসে থামল, এই নিষ্কলুষ নির্মল ভোরবেলা। দীর্ঘদিনের নিস্তব্ধতার গায়ে ঘুম ভাঙানোর কম্পন দিয়ে ইঞ্জিনটা ঘরঘর শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল। সেই শব্দের অভিঘাতে গভীর ঘুমের অতল থেকে ধীরে-ধীরে জাগরণের তল স্পর্শ করল ছায়া।

দু’জন রেলপুলিশ পরষ্পরের সঙ্গে কথা বলছে। গাড়ি থেকে নেমে সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসছে শতদল।

একটা পিলারের পাশে ধুলোধুসর চটের উপর অবিন্যস্তভাবে ছায়া শুয়ে আছে। শতদল মুখের মাস্ক খুলে উবু হয়ে বসে ডাকল, “মা!”

দূরবর্তী কোনও জনপদ থেকে যেন ডাকটা ভেসে এল ছায়ার চেতনার কাছে।

দূরবর্তী শহর বর্ধমান থেকে বিশেষ পুলিশি অনুমতি নিয়ে গত রাতে বেরিয়েছে শতদল। নিশ্চিত হয়ে। যৌথভাবে লোকাল থানা আর রেলপুলিশের তরফ থেকে যে-ছবিগুলো পাঠানো হয়েছিল তাতে শতদলের সন্দেহের কোনও অবকাশ ছিল না।

ছায়ারানি শেষবার শতদলকে কল করেছিল ত্রিশে মার্চ, “আমি যেভাবে হোক বাড়ি যাব।”

শতদল অবাক হয়েছিল, “এই পরিস্থিতিতে তুমি ঠাকুরনগর থেকে সন্দেশখালি ফিরবে! মাথা খারাপ নাকি? পাগলামো কোরো না মা। এখন এই কড়া লকডাউন… কোনও কম্যুনিকেশন নেই… বাইরে বেরোলেই পুলিশের ধরপাকড়

ফোনের ওপাশ থেকে ছায়ার মৃদু স্বর শোনা গেল, “আমারে যে যেতেই হবে, শত। বাড়িটা ফাঁকা পড়ে আছে।”

মা-কে শতদল কিছু বোঝানোর চেষ্টা করার আগেই ফোন কেটে দিয়েছিল ছায়া। সেই থেকে তার ফোনটা বন্ধ।

শতদল দুর্ভাবনার তাড়নায় মাসিকে ফোন করেছিল আরএকবার। ঠাকুরনগর বোনের বাড়ি থেকে ছায়া তখন বেরিয়ে গিয়েছে।

চোখের উপর ভোরের আলোর তীব্র ঝাপটা। তার মধ্যেই ঝাপসা শতর মুখ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

বাদায় মধু ভাঙতে গিয়ে বাঘের পেটে গিয়েছিল শম্ভু। তারপর ত্রিশটা বছর শুধু সাধনা করে গিয়েছে ছায়া। সেই সাধনার ধন, বর্ধমান বিএলআরও অফিসের কর্মী শতদল, ওর সামনে এখন উবু হয়ে বসে ডাকছে আবার, “মা, ওঠো। আমি তোমাকে নিতে এসেছি।”

উঠে বসে ছায়া। আর চমকে ওঠে!

শতদল চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে ছায়া একা মানুষ। অঢেল সময়। মাঝে-মাঝে ঠাকুরনগরে বোনের বাড়িতে এসে কয়েকদিন কাটিয়ে যায়। কিছুদিন আগে তেমনই এসেছিল। তারপর হঠাৎ এই রোগের প্রকোপ। রাতারাতি লকডাউন। কাজকর্ম বন্ধ। মানুষের চলাচলের উপর কঠোর বিধিনিষেধ।

মায়ার বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটি লরির ফাঁকা খোলের মধ্যে উঠে পড়েছিল ছায়া। আরও দশবারোজনের সঙ্গে। মনে হয় আটা ভর্তি করে লরিটা গিয়েছিল ঠাকুরনগর। ফেরার পথে কিছু ফাটকা পয়সার ধান্দা। মানুষগুলোও ঘরে ফেরার তাড়নায় অনন্যোপায়। পারস্পরিক বে-আইনি বোঝাপড়ায় অনেকটা রাস্তা এসেছিল ওরা। কিন্তু বিপত্তি ঘটল হাবড়ায় এসে। পুলিশ ধরে ফেলল— ভিতরে খাদ্যসামগ্রী নয়, বীজাণুবাহী মানুষ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে লরি। মানুষগুলোকে ভাগিয়ে দিল পুলিশ। এত লোক রাখবে কোথায়! শুধু শাঁসালো মালিকের ড্রাইভার আর খালাসিকে পুরে দেওয়া হল শ্রীঘরে। এসব হাঙ্গামার ভিতর লরির পেটের মধ্যে পড়ে থাকল ছায়ার ব্যাগপাটরা। আর মোবাইলটা কি পড়ে গেল, নাকি কেউ চুরি করে নিল, ছায়া বুঝতে পারেনি।

এদিককার যেকোনও রেলস্টেশন বাসস্থানহীন মানুষদের উত্তম ঠিকানা। কংক্রিটপ্রেমীদের দক্ষিণখোলা ফ্লাটের চেয়ে এই বাসস্থান শ্রেষ্ঠতর। এর চতুর্দিক খোলা।

এভাবে বসে থেকে কি রাত কাটবে?” নিজের ভাঁজ করা চটটা খুলে দিয়ে লোকটা বলল, “শুয়ে পড়ো।

তিনহাত দূরের এক অতিবৃদ্ধা জিজ্ঞেস করল, “কে রে বিকাশ?”

লোকটার কাঁচাপাকা একমাথা নোংরা চুল, আলুথালু। ফুলহাতা ফতুয়ার উপর হাফহাতা বোতাম-ছেঁড়া জামা চাপানো। ফতুয়ার রঙ বুঝি একসময় ছিল আকাশি আর জামাটা খয়েরি। এখন দুটোই কালচে ছাই রঙ। ভাঁজগুলোতে নোংরার আঁকাবাঁকা প্রলেপ। গায়ে অসহ্য বোটকা গন্ধ। বৃদ্ধাকে সে উত্তর দিল, “নতুন।”

…,” বৃদ্ধা পেছন ফিরল।

অসহনীয় দারিদ্রের ভিতর দিয়ে ছায়ার গত বছরগুলো কেটেছে। কিন্তু তা ছিল একটা নিছিদ্র চালের নীচে, শক্ত খাটের বিছানায় আর সস্তার সাবানে ধোয়া সাফসুতরো পরিচ্ছন্নতায়। এমন নোংরা ধুলোমাখা চটের উপর, অপরিচিত এবং যারপরনাই অপরিচ্ছন্ন এই পরপুরুষের পাশে কেমনকরে শুতে হয়, শুলেও ঘুম কীভাবে আসে— ছায়া জানে না। দুর্গন্ধের তীব্রতায় গা গোলায়, ঘেন্নায় বমি আসে।

স্টেশনের পাবলিক টয়লেট। ছায়া কোনওমতে প্রাতকৃত্য সেরে বেরিয়ে দেখে সেই লোকটা। যার পাশে ও সারারাত শুয়ে ছিল। যাকে বুড়িটা বিকাশ’ বলে ডেকেছিল। তখনও ছায়ার কাপড় স্খলিতগুছিয়ে ওঠা হয়নি। বিকাশের চোখের তারায় শকুনির মতো ললুপ চাহনি। বয়স গিয়েছে মিনসের, কিন্তু স্বভাব যায়নি। দু’পা পিছিয়ে ছায়া ঝাঁজিয়ে উঠল, “কী ব্যাপার? এখেনে দাঁড়িয়ে হা-করে কী দেখছ? বেরোও!”

ভ্রূ কপালে তুলে দাঁত বার করে হাসল বিকাশ। কুমতলবের বেপরোয়া পুরুষরা যেমন করে হাসে“তোমাকে চৌকি দিচ্ছি। বাইরে তারক দাঁড়িয়ে আছে। মহা হারামি…”

হারামির চোখ চিনতে ছায়ার ভুল হয় না। শম্ভু চলে যাওয়ার পর এমন অনেক সামলাতে হয়েছে। এই বিগতযৌবনের আঙিনায় এসে যদিও বহুদিন এসব ভাবতে হয়নি, তবুও পুরোনো অভিজ্ঞতার কুশলী চোখ বিকাশের চোখের দিকে চেয়ে সতর্ক হয়ে উঠেছে। তাড়াতাড়ি কাপড় ঠিক করে বেরিয়ে আসে ছায়া। পাঁচিলের আড়ালের বাইরে সত্যিই একটা ছন্নছাড়া কম বয়সী লোক দাঁড়িয়ে আছে। পোশাকপরিচ্ছদ ভিখারির মতো। কিন্তু তার চোখে কোনও মতলবের বিষ নেই। শয়তানরা এভাবেই সাধু সেজে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। যেমন বিকাশ চেষ্টা করছে।

টিকিট কাউন্টারের সামনে থামের গোড়ায় যে-চটের উপর কাল রাতে ঘুমিয়েছিল সেটা অর্ধেক গোটানো। বসার মতো জায়গা করে রাখা। ছায়া দ্বিধায় পড়ে গেল। ও কি বসবে এখানে? এখানে না-বসলে কোথায় বসবে? এই জায়গাটা কি ওর জন্যে বরাদ্দ করা হয়েছে? নাকি ও এটা দখল করেছেএসব টালমাটাল ভাবনার ফাঁকে একটা উটকো পাগলী গোছের মহিলা এসে তার ঢাউস পুঁটলিটা ফেলল ওপাশের ফাঁকা জায়গায়। সঙ্গেসঙ্গে তেড়ে গেল সেই বৃদ্ধা, “দূর হ! আমাদের শোয়ার জায়গা হয় না, আবার নতুন পাপ! বেরো!

বৃদ্ধা তার অশক্ত হাতের লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে গেল। পাগলী কতকগুলো গালাগাল বিড়বিড় করতে করতে চলে গেল রেলগেটের রাস্তার দিকে।

বৃদ্ধার লাঠির দিকে চোখ রেখে নিজের জায়গা পাকা করতে তাড়াতাড়ি বসে পড়ল ছায়া। বৃদ্ধা একবার আড় চোখে দেখল ছায়াকে। তারপর নিজের বোস্কার মধ্যে কনুই পর্যন্ত হাত ঢুকিয়ে একটা আংটা-ভাঙা কাপ বের করে ধীরে ধীরে চলে গেল শনিমন্দিরের আড়ালে।

বিকাশ এল একটু পরে। এসেই বলল, “যাই!”

বাধ্য হয়ে বিকাশের চটের অর্ধেক ভাগ নিলেও এই বদমায়েশের সঙ্গে কথা বলার কোনও প্রবৃত্তি ছায়ার ছিল না। সকালসকাল যা ঘটেছে ভাবলেই রাগে ঘেন্নায় লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ছায়া। তবু বিকাশের যাই’ শুনে মুখ ফসকে বেরিয়ে এল, “কোথায়?”

পেটে কিছু দিতে হবে তোনাকি? হাতির দুধ খেয়ে তো আর দিন কাটবে না,” দন্ত বিকশিত করে বলল বিকাশ।

হাতির দুধ!”

এই দ্যাখো! হাতির দুধ চেনে না,” এবার শব্দ করে হাসল বিকাশ, “চাপকলের মুখটা দেখেছকেমন হাতির শূঁড়ের মতো,” বলে মুখের কাছে কনুই নিয়ে কবজি বেঁকিয়ে সে হাতির শূঁড়ের নকল করে দেখাল।

তুমি কি এদের সবার খাবার জোগাড় করে বেড়াও নাকি?” ছায়া নয়, বোধহয় তার অবচেতন বলল কথাটা।

না না! নিজেরই জোটে না, সবার! হুঁহ্!” বলতে-বলতে উঠে পড়ল বিকাশ এবং পা-চালিয়ে চলেও গেল।

  

পেটের মধ্যে চোঁ-চোঁ করছিল অনেকক্ষণ। এর মধ্যে তারক নামের ভোলেভালা লোকটা কোথা থেকে একখানা শুকনো পাউরুটি এনে চিবোচ্ছিল। তা দেখে খিদেটা চাগাড় দিল আরও বেশি। বহু বছর অনেক কষ্টে নিজের এবং নিজের আগে শতদলের খিদের হিল্লে করতে হয়েছে ছায়াকে। কষ্টের হলেও উপায়গুলো জানা ছিল তার। কিন্তু খোলা প্লাটফর্মে ময়লা চটের উপর বসে এখন নিজেকে দিশেহারা মনে হচ্ছে। স্বজনপড়শি বিহীন স্টেশনে কীভাবে খিদের অন্ন জোগাড় করতে হয় ছায়ার জানা নেই। এরা নিশ্চয়ই মানুষের কাছে চেয়ে খায়। কিন্তু এই লকডাউনে মানুষ কোথায়? একটা কাক বা কুকুরও চোখে পড়ছে না। আর যদিও বা কাউকে পাওয়া যায়, ছায়া কি খাবার চেয়ে খেতে পারবে?

অসহায়তায় আর দুর্ভাবনায় ছায়ার খিদে মরে গিয়ে মনে তীব্র ভয়ের সঞ্চার হল। সেই ভয়ের মধ্যে বারবার বিদ্যুতের ঝলকানির মতো জেগে উঠছিল সকালে দেখা বিকাশের চোখ। আধবুড়ো লোকটাকে মোটেই সুবিধের মনে হয়নি। এই তো দুপুর নেমে এসেছে। আর কয়েক ঘণ্টা পরেই আবার আসবে রাত। আবার শুতে হবে ওরই চটের ভাগ নিয়ে!

সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়তেই তেরচা রোদ এসে পড়ল টিকিট কাউন্টারের সামনে। জ্বলে উঠল পিঠ। আর তখনই বিকাশ এল। ময়লা মুখের মধ্যে যেন দুটো জ্বলজ্বলে কাচের গোলা বসানো। সেই অদ্ভুত উজ্জ্বল চোখে কোনও যুদ্ধজয়ের হাসি। হাতে রাংতার কাগজে প্যাচানো কিছু-একটা।

সয়াবিনের ঝোল আর ভাত মিলেমিশে মণ্ড পাকিয়ে গিয়েছে। “নাও,” বলে বিকাশ সেটা ঠেলে দিল ছায়ার দিকে।

এসব ফন্দির কথা ছায়া আগেই শুনেছে। নিশ্চয়ই এই সয়াবিন-ভাতের মধ্যে কিছু মেশানো আছে। ওটা খেয়ে ছায়া যখন বেহুঁশ হয়ে যাবে, তখনই জ্বলে উঠবে বিকাশের সেই শয়তানি চোখভাবতেই বুকের মধ্যে কেঁপে উঠল ছায়ার।

ছায়া দেরি করছে দেখে বিকাশ নিজেই খেতে শুরু করল। তার নোংরা হাতের শুকনো ময়লা সয়াবিনের ঝোলের সঙ্গে কাদা হয়ে মিশে যাচ্ছে। ওর গায়ের বোটকা গন্ধ এখন রোদে তেতে আরও গেঁজে উঠেছে। ছায়ার খালি-পেট পাকিয়ে ওঠে। অর্ধেকটা খেয়ে আবার এগিয়ে দেয় বিকাশ, “খেয়ে নাও, খেয়ে নাও। অবস্থা খুব খারাপ। এর পরে আর কিছুই জুটবে না।

বিকাশের বলার ঢঙে কোনও অজানা আশঙ্কার ইঙ্গিত। সেই আশঙ্কাই ছায়াকে বিকাশের হাতের কাদা-মাখা সয়াবিনভাত খেয়ে নিতে প্ররোচিত করে। আর এই খাওয়াই ছায়ার কাল হয়।

সন্ধে থেকে শরীরের মধ্যে আইডাই। বার দুয়েক বমি। এবং একটু রাত বাড়তেই চোখ ছলছল। খুব শীত, খুউব। ক্রমশ হুঁশ হারিয়ে যাচ্ছে। কী সাংঘাতিক বদমাশ এই বিকাশ নামের আধবুড়ো লোকটা। যা ভেবেছিল তাই। আফসোস হয়, মারাত্মক আফসোস। নিজের বোকামো ভেবে নিজেকেই চড়া কষাতে ইচ্ছে করে। আর ভাবতে পারছে না ছায়া। চোখের সামনে ভেসে উঠছে শতদলসন্দেশখালির ঘর, নদীর পাড়ে বাঁধা নৌকো, সাতজন মৌয়ালের দল, একটা মুখোশ। না না একটা নয়, সবার মুখে মুখোশ… শম্ভুর মুখে, শতর মুখে, বিকাশের মুখে… তারপর ঘোর অন্ধকার।

একটা হাত। ঘুরে বেড়াচ্ছে চুল থেকে কপালে, মুখে, গলায়, বুকের কাছে…

লাফিয়ে ওঠে ছায়া। দুর্বল শরীরে যতটুকু জোর অবশিষ্ট আছে, সেটুকু একত্রিত করে ধাক্কা দেয় বিকাশকে, “শালা শুয়োরসর্। দুশ্চরিত্র কোথাকার! দূরে যা, দূরে যা বলছি। শয়তান…”

কখন ভোর হয়ে গিয়েছে। পুবের আকাশে হলুদগোলা ঢেলে দিয়েছে কেউ। তার খানিক কমলা আভা ছলকে পড়েছে মাঝবয়সী বিকাশের ময়লা মুখের উপর। পেছনে ছিটকে পড়ে হতভম্বের মতো সে তাকিয়ে আছে ছায়ার দিকে।

বিকাশ ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়ায়। কয়েক সপ্তাহের না-কাটা কাঁচাপাকা গোঁফদাড়িতে বাঁহাতের তালু ঘষে। তারপর পেছন ফিরে সোজা চলে যায়। একবারও ফিরে তাকায় না। চলেই যায়।

তুই এটা কী করলি মা?” বুড়িটার কথায় সম্বিত ফেরে ছায়ার, “কাল যখন তুই জ্বরে বেহুঁশ হলি, ও তো পাগলের মতো করতে লাগল। সারা রাত ধরে তোর কপালে ভিজে কাপড় দিয়েছে। রাত থাকতে হাসপাতালের মোড়ে গেছে ওষুধ আনতে। এখন নাকি জ্বর হলে ওষুধ দেচ্ছে না দোকানদাররা। বলে, হাসপাতালে নিয়ে যাও। তাও অনেক চেয়েচিন্তে দুটো ওষুধ এনেছে। ওই দ্যাখ্!”

ছায়ার পাশে চটের উপরে পড়ে আছে আধ-বোতল হলদে ঘোলাজল আর দুটো ট্যাবলেট।

দশ দিন। গুণে গুণে দশ দিন হল, বিকাশ আর আসেনি। তার বোচকা, চট, খাবারের থালা, জলের বোতল— সব পড়ে আছে। ছায়া আগলে বসে আছে সেসব।

নানা লোকে নানা কথা বলে। তারক বলে, “পুলিশে ধরেছে ওরে। প্রফুল্লনগরে রাস্তার ধারে বসে ছিল। এখন এই রোগের জন্যে পাড়ায় অচেনা লোক দেখলেই সবাই পুলিশকে জানিয়ে দিচ্ছে।”

সাজু নামের একটা অল্প বয়সী মেয়ে বলল, “বিকাশকাকু এখন অশোকনগরে থাকে। এই তো পরের টেশন।”

বুড়ি কোথা থেকে কী শুনেছে, “ও সবজির গাড়িতে চড়ে মধ্যমগ্রামে চলে গেছে।”

ছায়া শোনে। আর চট আগলে পড়ে থাকে। পাঁচ-ছ’ দিন হল খাওয়ার কষ্ট কমেছে সবার। হকার্স ইউনিয়ন প্রতিদিন রাতে খিচুড়ি, না-হয় ডালভাত খাওয়াচ্ছে। পেটচুক্তি। ইসএই সময় যদি বিকাশ থাকত! পেট ভরে দুটো খেতে পেত। ভাবে ছায়া। আর অনুশোনায় পুড়ে পুড়ে কয়লা হয়ে যায় তার অন্তর।

এই মাত্র দশ দিনেই ক্রমশ খুব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে সন্দেশখালির ঘর, বোনের বাড়ি, শতদল… মনে হয় এসব ছায়ার কোনও পূর্বজন্মের অতীত। এখন তো এই স্টেশননোংরা চট, দুর্গন্ধওয়ালা বোচকা, আর রাতের কাঙালিভোজ— এই তো সত্য। এই তো জীবন। যেন যুগযুগান্তরের জীবন। যে জীবনে আশা আছে, আছে একটি স্বপ্ন কেউ ফিরে আসার স্বপ্ন। শুধুই মরা শামুকের খোলের মতো ফাঁকা নয় এই দিনাতিপাত…

অস্থির হয়ে ওঠে ছায়া। প্রতি রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবে— আরও একটা দিন চলে গেল। কই সে তো আজও ফিরল না! কোনওদিন কি আর ফিরবে নাভাবলেই বুকের মধ্যে হাহাকার। আশা নিরাশার নিয়ত দোলা। নির্ঘুম ধুলোবালির শয্যায় শুধু এ-পাশ ও-পাশ। একসময় নিজের কাছে নিজেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়— বিকাশের জন্যে ছায়া অপেক্ষা করবে, যতদিন সে ফিরে না-আসে…

কিন্তু বিকাশ ফিরে আসে না। মাঝে-মাঝে ঘুমের মধ্যে মনে হয় কপালের ওপরে সেই নোংরা হাতের স্পর্শ! চমকে তাকায় ছায়া। কেউ নেই। মনের ভুল।

  

চলো মা,” শতদল মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।

সেই যে ঘুম থেকে উঠে চমকে উঠেছিলে ছায়াএখনও তার ঘোর কাটেনি। ছায়ার একদম গা-ঘেষে শুয়ে আছে বিকাশ। সামান্য নড়াচড়া করছে। গত রাতে কখন ফিরেছে, কখন এসে শুয়েছে ছায়ার পাশে, কিছুই টের পাওয়া যায়নি।

শতদলের হাত ধরে টিকিট কাউন্টার থেকে ধীরে ধীরে নেমে আসে ছায়ারানি।

গাড়ির দরজা খুলে গিয়েছে। শতদল ভিতরে ঢুকে ডাকছে, “উঠে এসো, মা।”

ড্রাইভার স্টার্ট দিয়ে দিয়েছে। গাড়ির দরজা ধরে একবার পেছন ফিরে তাকাল ছায়া। বিকাশ উঠে বসেছে। ছায়ার দিকেই সে তাকিয়ে আছে। ভ্রূ-জোড়া কপালে তুলে দাঁত বার করে হাসছে আধবুড়ো বিকাশ। পাগল অথবা নির্বোধ শিশু যেভাবে হাসে। শতদল আবারও ডাকল, “দেরি কোরো না মা। উঠে এসো।

ওরা চলে এসেছে অনেকখানি রাস্তা। চৌত্রিশ নাম্বার জাতীয় সড়ক ধরে গাড়ি এখন হু-হু করে ছুটছে বর্ধমানের উদ্দেশ্যে। এতক্ষণে একটাও কথা বলেনি ছায়া। শুধু তার দু’গাল বেয়ে বিরামহীন জলধারা নেমে যাচ্ছে। নির্ঝরের মতো তা যেন থামার নয়। শতদল বলল, “আর কেঁদো না মা। সব বিপদ তো কেটে গেছে‌!”

ছায়া ভেজা আর ভারি গলায় বলল, “আপনজন কাছে এলে কার না চোখে জল আসে, বাবা? ও তুই বুঝবি না।”

শতদলের চোখ এড়াতে ছায়া জানালার বাইরে তাকায়। সেখানে তার মনটার মতোই সবকিছু মুহূর্মুহ পেছনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

 

 

 

4 thoughts on “ইরাবতী উৎসব সংখ্যা গল্প: অমূল্যনিধি । তন্ময় সরকার

  1. খুব ভালো লাগলো, এই লেখনীর ছন্দে এক কল্পনার বাস্তবে যেন সব কিছু নিজের চোখে দেখেছি আমি। খুব জানতে ইচ্ছে করছে বিকাশ বাবুর চরিত্রটি …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত