| 22 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
উৎসব সংখ্যা’২০২১

ইরাবতী উৎসব সংখ্যা: ব্রতী মুখোপাধ্যায়ের কবিতা

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট
প্রশ্ন
প্রশ্ন চিবিয়ে খায়। জিভে-দাঁতে ঠোক্কর লেগে ঠোঁট দিয়ে কখনও বাইরে যায় না।
প্রশ্ন তারও থাকে। চোখ লাল আর ঘোলাটের সংসার। ঝুলে থাকে। ঝুলতেই থাকে।
খায়নি বেচারা! কাজ নেই। গেঞ্জিটা ছেঁড়া ও নোংরা, লুঙ্গিটাও। সুস্থ না। অবশ্যই
হাঁটাচলায় খুব অসুবিধে। ঘরে হয়ত কেউ নেই। ঘরই নেই।
ভাবি একটি টাকা দেব। ভাবি দুটি টাকা দেব। পাঁচ পর্যন্ত এসে আমি থামি।
মানুষটির ভেতরেও হিসেব। এক। একের পর দুই। দুইএর পর মা কালীর নাম।
যদি সিকে ছেঁড়ে।
চোখের দিকে তাক করে। চোখ ফেরায় না।
প্রশ্ন চিবিয়ে খায়। কী করলে কেউ কখনও চিবিয়ে খাবে না!
 
 
আজান
আজানের সুর আমার ভাল লাগে
লিখলাম
লেখার পরে ঘড়ির দিকে চোখ
আমার
এই শব্দ বাড়তি কি?
ভাল লাগে
বাদ দেয়া যাবে না
সুর
ঠিকই আছে
আজান?
এইসময় ঘাড়ের কাছে ছায়া, ধারালো নখ
আজানের সুর আমার ভাল লাগে
পাঁচটি শব্দ
পরের চরণ আসছে
খুব ছোট যখন
ঘুম ভাঙতে বাবার গলায়
জবাকুসুমসঙ্কাশং…
প্রথম কবিতা
সেসব খুব বেশিদিনের কথা না
রিফিউজি মা কী একটা টিকে দিয়েছিল
জন্মের পরই রিফিউজি মা কী একটা টিকে দিয়েছিল।
ছোট্টছিলাম টের পাইনি।
বড় হতে দেখলাম রাজা-রানির মুকুটে যতধরনের মণিমাণিক্য থাকুক
তাদের আমার কখনও কিছুতেই পছন্দহয় না।
ভাইবোনবন্ধুজন বলেছিল আমরা এখন সব্বাই রাজা।
রসিকতাও নিষ্ঠুর হয়।
ভাইবোনবন্ধজনবলেছিল, সূর্যকেও শাসন মেনে চলতে হয়।
আমার তো এটা না ওটা, ওটা না এটা
শুনতেশুনতেযাওয়া।
সূর্যকে কেউ জিজ্ঞেস করিনি
নিশ্চলঅনুশাসন তারকেমনলাগে।
পরের বাড়ির চাকরের কাজ মাইনে যতই হোক।
সূর্যও কি মনে মনে জপছে নাআজাদিইচাই?
যা বলছিলাম।
জন্মের পরই রিফিউজি মা কী একটা টিকে দিয়েছিল।
কবিতার ধমনীরা জানে
কবিতার ধমনীরা জানে লোক চোখকে না জানিয়ে কণা কণা অণুকাহিনির রাতদুপুরের
গান, ভোর ভোর যে মানুষ ফুরনের কিছু কাজ পাওয়া যাবে ভেবে রেললাইন বাঁয়ে
রেখে পথে নেমেছে কীভাবে চোখের জল ঝরে পড়ার আগেই কোত্থাও নেই, কীভাবে
শূন্য হাতে ঘরে ফিরে বউ বাচ্চার সামনে ভেঙে পড়তেও পারেনা দাঁড়াতেও পারেনা
সোজা হয়ে,কবিতার ধমনীদের জিজ্ঞেস করলে ভেঙে বলবে অবশ্য, সহজে ভাঙবেনা
পাখিসব তেষ্টার বাংলা করলে কী যে হয় জানে, ছেঁড়াখোঁড়া মেয়েরাও পুড়তে
পুড়তে জলআনতে যায় নদীকে যদিও ঠান্ডা মাথায় খুন করা চলতেই থাকে,
বালিচুরি নিয়মিত চলতে থাকে যেবৃত্তান্ত না জানলেওবালুচরীরদিব্যিকেটেযায়
যেহেতুমরাবিকেল থেকেই নক্ষত্রদের সুখজ্ঞাপন মুখগুলি দেখতে পাওয়া একটুও
কঠিনএখন নেই, তার মজ্জার অতলে যেকাঁদনবাদ্যিগরিবধ্বনিবাজেকবিতার
ধমনীরাভেঙে বলে দেবে, সহজে ভাঙবে না
মা রোজ সন্ধে সন্ধে বেরিয়ে যায়, কোথা যায় কদাচ বলে না, যাবার আগে মুখে একটু
স্নো-পাউডার তারকনাথ নজর করে, মা তবু ফিরত আসে, তার তরেই আসে,
জুয়ান বাপটা সেই একবার কুনখান যে গেল কে একজন ডেকে লিয়ে গেল,
আর ফিরলনি, মা তার কুনখান যায় তারকনাথ শুধায় না, অসময়ের শেয়াল
তার ছাতির ভিতর হৃদপিণ্ড ঠুকরে ঠুকরে খায়, শিরীষ বকুল রজনীদের
গন্ধাগন্ধের মনে সেসব কথা স্পষ্ট লেখা আছে কবিতার ধমনীরা জানে
আছি নেই এর মধ্যে
ক)
আছি নেইএর মধ্যে যে নদী তার নাম শিপ্রা না, জলের রঙ লাজুক শ্যামল,
নিকট থেকে দেখতে চাইলে সূর্যবক্ষের আঁচ কস্তুরীর মাথাখারাপ গান মিশিয়ে
অনবরত উস্কানি দেয় খুন হয়ে যেতে,গাছ বলতে ডেট পাম, জমিতে কখনও
ঘাস নামে কিছু না কিছু ছিল, প্রজাপতিরা হাজার হাজারমরে পড়ে ঘাটতি নেই
রঙের ছড়াছড়ির, মরে পড়ে একের পর এক আগুনডানার গর্ভবতী বিহঙ্গ
খ)
বিহঙ্গ ভাঙা ভুবনের কোন মাটির কুটির থেকে উড়ে এসেছিল কিছুতে কেউ কিচ্ছুই
বলতে পারল না, শুধু ধুলোউড়ির মখমলিন ধ্বনিস্রোতে কুটিরস্থিতা ছেঁড়া বোষ্টুমির
সময়-অসময়ের কান্না আলাপটুকুর রকমে, যাদের হাতে ত্রিশূল ছিল, তলোয়ারাদি ছিল,
কেউ কারো পিতার পরিচয় জানতে পারেনি বলে ভর সন্ধেবেলা তৃষ্ণানিবারণের উদ্দেশ্যে
পান করছিল আঁজলা ভরে কুসুমমেয়ের বুকের রক্ত
গ)
বুকের রক্ত সেদিনও জাহ্নবীর জলের মতো কলুষিত হয়ে উঠতে পারেনি, ছায়া ছায়া
হাত কাছেপিঠে, হাতে হাতে শঙ্কর মাছের চাবুক আর মেড ইন জার্মান রিভলভার,
ছিয়াত্তরটি লাশ ফেলে দেয়ার পরশঙ্খে শঙ্খে ফুঁ, বেকার ছেলের কেরানি বাপের কাছে
নিউজ আসছিল, নয়ানজুলিতে যে ধর্ষিতাকে মৃত্যুর দোর থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল
তার বাপের কাছেও আসছিল শ্মশান আর গোরস্তানের নিউজ
ঘ)
নিউজ ডেস্কে আঙুলগুলি বিদ্যুতের চরিত্রে কাঁপছিল, বস্তুত সেসব আঙুল বলতে যা
বোঝায় ছিলই না,সবার বিরুদ্ধেই মাতৃহত্যার অভিযোগ সাক্ষ্যসাবুদ সমন্বয়েই উপস্থাপন
সম্ভব, আছি নেইএর মধ্যে যেনদী তার মুখেই যে কজন পেচ্ছাব করতে করতে হিমালয়
দাপিয়ে হাসছিল তাদের কারো কান ছিল না, বউবাচ্চা ছিল না, ছিল না মা বাবা স্বজন,
বিহঙ্গের পেট ছিঁড়ে অমাবস্যার আঁধারকেও ভয় পাইয়েছিল
ভুল সকল ভুলে যাই সকল
ভুল সকল ভুলে যাই সকল সিঁড়ি দিয়ে উঠছে আর নামছে, আড়চোখে পড়ে নিচ্ছে আমার
মুখের মাসলগুলো কী লিখছে কী লিখতে চেয়ে, পড়ে নিচ্ছে ভুলসকলের প্রস্তুতির দিনরাত্রি,
ভুলে যাই আর ভুলেযাইনির মধ্যিখানে যে বুড়িগাঙ তার জলে খয়েরি খেয়ার একঘেয়ে
ছলাৎছল ভাসানের আহাজারি বুকে
ভুলসকল ভুলেযাইসকল কপালের দহনলেখা লিখছে আর মুছছে, মূর্তিপুজোর ভূমিখণ্ডে উৎসবের
রঙিন জামা পরে কেউ সেসব লক্ষ করছে না
এইমাত্র আরেকবার গুলির শব্দ হল, এইমাত্র আরেকবার খুন হল, খুন যে হল আকাশ দেখতে পেল
তার ছেঁড়া গেঞ্জির বুকে লেখা জমিন ছোড়ব নাই
 
 
 
সাতে পাঁচে না থাকলেও
সাতে পাঁচে না থাকলেও সবে যখন আঠারো মায়ের জ্বর বাড়েও না কমেও না
সবসময় একশো এক, তারপর আর কী,ষাট ষাট বলবে কেউ রইল না
তার আগেই ছয়ে ঋতু না বলে রিপু বলতে শেখা, একে চন্দ্রের পর দুইএ পক্ষ ছিল,
অথচ পক্ষশ্রমে উড়ালএতকষ্টেরযেবাছুনবললেইবাছাআরসহজনা, মানেতিনের নেত্র
অধরাই, যার ফলে চারে বেদের বদলে বেত, পাঁচ এল পঞ্চশর হয়েই, সাপের পাঁচ পা
দেখলাম না কিন্তু চারদিকে চারশো বিশ নজরে এল, সোজা কথায় একশো পারসেন্ট
বারোটা বেজে গেল
শুধু শকুন্তলার শিউলিতলাই না, স্কুলকলেজ কারখানা হাসপাতাল ব্যাঙ্ক পোস্টাপিস মুদির
দোকান কবিতা, বলতে কি সংসারের সমস্তই নয় ছয়, অন্যদিকে মনোরমা আর ছেঁড়া
বোষ্টুমির মধ্যে সত্যিমিথ্যে উনিশবিশ
জানতে বাকি ছিল বাহান্নও যাহা তেপ্পান্নও তাহা
এখন দেখছি সাতসকাল কোনো অর্থেই নিশাবসান মনে না হওয়ায় দশ দিশার অন্ধকারে
চেয়ে, চেয়ে চেয়ে শূন্য, শূন্য, শূন্যই
তেঁতুল পাতায় নজন কেন যে কেউ কেউ শুনিয়েছিল, সত্তরের দশককে কেন যে কেউ কেউ
মুক্তির দশক বলতে বলতে ইন্টারন্যাশনাল শুনিয়েছিল একদিন
 
 
 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত