Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,puja 2021 irabotee article nahida ashrafi

উৎসব সংখ্যা প্রবন্ধ: আইনচর্চায় বাংলা ভাষা প্রয়োগে সংকট ও সম্ভাবনা

Reading Time: 7 minutes

‘কী লাভ বলুন বাংলা পড়ে?

বিমান ছেড়ে ঠেলায় চড়ে?

বেঙ্গলি ‘থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ’  তাই তেমন ভালোবাসে না

জানেন দাদা , আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না।‘

একবার ভাবলাম শুরুতে ভবানীপ্রসাদ কেই স্মরণ করবো? না করেই বা উপায় কী বলুন? রক্ত দিয়ে কেনা বাংলা ভাষা যেভাবে আছড়ে পাছড়ে চলছে তাতে বড় শংকা হয়। কর্পোরেট হোক কী কেরানি, পাবলিক কী প্রশাসন বেশ ঘটা করে অফিসে, বাড়িতে, জনসমুদ্রে, গণমঞ্চে কী নির্দ্বিধায় বুক ফুলিয়ে সিনা টান করে ইংরেজিতে কথা বলে যাচ্ছেন। হোক সে ভুলভাল তাল বেতাল।  তাতে কার কী এসে যায়? তবু ইংরেজি তো বলা হচ্ছে। আর হিন্দি আগ্রাসন তো পশ্চিমবঙ্গকে এরই মধ্যে নেতিয়ে ফেলেছে ,  বাংলাদেশেও স্যাটেলাইট দেবতার বদৌলতে কিছুটা ঠেলেঠুলে বসার চেষ্টায় আছে। আর একবার বসতে পারলে শোয়ার জায়গা নিজেই বার করে নেবে। 

সে যাই হোক, আজ বাংলাভাষা যখন আমরা নিজেরাই পরিপূর্ণভাবে আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির অংশ করতে পারছি না, কর্মের যথাযথ হাতিয়ার করতে পারছি না তাহলে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরবো কী? খিচুড়ি ভাষা? এক লেখায় সব শাখা নিয়ে যেহেতু কথা বলা সম্ভব নয়, আজ শুধু আইন চর্চায় বাংলা ভাষার সংকট ও সম্ভাবনার কিছু দিক নিয়ে আলোকপাত করবো।  

বাংলাদেশ  বিচার বিভাগের ইতিহাস প্রায় হাজার বছরের পুরনো। সুদীর্ঘকাল ভারতীয় বিচার বিভাগের ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনের ফলে আজকের বিচার বিভাগ এই পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।  বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসের ক্রমপর্যায়কে মূলত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়—

১- হিন্দু শাসনকাল

২-মুসলিম শাসনকাল

৩-ব্রিটিশ শাসনকাল এবং

৪-স্বাধীনতা পরবর্তী পর্যায়।   

প্রাচীনকালে  বিচারকাজ  ধর্ম এবং সামাজিক রীতিনীতি দ্বারাই পরিচালিত হতো। তৎকালীন রাজাগণ আইনবিভাগ, শাসনবিভাগ এবং বিচার বিভাগের প্রধান ছিলেন।  শ্রুতি, স্মৃতি, ধর্মশাস্ত্র, পুরাণ ইত্যাদি আইনের উৎস হিসেবে বিবেচিত হতো। এছাড়াও অর্থশাস্ত্র এবং মনুস্মৃতি ভারতীয় আইনের উল্লেখযোগ্য বিধান হিসেবে বিবেচিত হতো।

ভারতীয় উপমহাদেশে ১১০০ সালের দিকে মুসলিম শাসনকাল আরম্ভ হয়। মুসলিম বাদশাহগণ রাজ্য পরিচালনায়  কুরআন, হাদিস, ইজমা এবং কিয়াসের আলোকে বিচারকাজ  সম্পন্ন করতেন। সে সময়ে বিচার ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য সুলতান কর্তৃক ‘কাজী’ নিযুক্ত হতো এবং সর্বোচ্চ আদালত ছিলো সম্রাটের আদালত যা সম্রাট স্বয়ং পরিচালনা করতেন। সুলতানকে এ কাজে সহায়তা করতেন দুইজন ‘মুফতি’। মুসলিম শাসনামলে আদালতসমূহ দুইটি বিধানের আলোকে পরিচালিত হতো- ফিকহ-ই-ফিরোজ শাহ এবং ফতোয়া-ই-আলমগীরী।  

ব্রিটিশ  কলোনিয়াল পদ্ধতি সূচনার  সাথে সাথে ভারতীয় বিচার বিভাগে বিরাট পরিবর্তন সূচিত হয়। ব্রিটিশ শাসনামল আঠারো’শ  শতকের  মাঝামাঝি হতে শুরু হয়ে প্রায় দুশো  বছর পরিচালিত হয়। ১৬৬১ সালে চার্লস ২য় কর্তৃক প্রদত্ত  সনদ অনুযায়ী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে নিয়ন্ত্রিত ফ্যাক্টরি এবং মাদ্রাজ, বোম্বে ও কলকাতায় অবস্থিত কোম্পানির নিয়ন্ত্রনাধীন ব্যবসায়িক কেন্দ্রসমূহের দেওয়ানি এবং ফৌজদারি উভয় প্রকারের বিচারকার্য ব্রিটিশ আইন দ্বারা পরিচালিত হতো। ১৮৫৭ সালে  সিপাহী বিপ্লবের পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বিলোপ সাধন  হয় এবং ইংল্যান্ডের রাজা ভারতবর্ষ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে।  ফলশ্রুতিতে ১৮৬১ সালে ইন্ডিয়ান হাইকোর্ট এ্যাক্ট পাশ করা হয়। উক্ত আইন পাশ হওয়ার মধ্য দিয়ে সুপ্রীম কোর্ট, সদর দেওয়ানী আদালত এবং সদর নিজামত আদালতের বিলোপ সাধন  হয় এবং কলকাতা, মাদ্রাজ এবং বোম্বেতে হাইকোর্ট স্থাপিত হয়। পরবর্তিতে ১৯১৫ সালে  ভারত  শাসন  আইন পাশ হয় যার মাধ্যমে হাইকোর্টের গঠন, এখতিয়ার এবং ক্ষমতা নির্ধারিত হয়।    

১৯৪৭ সালে পাশকৃত হাইকোর্ট অব বেংগল অর্ডার এর ৯ নং ধারা অনুযায়ী ভারতীয় স্বাধীনতা আইন পাশ হয় যার দ্বারা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য জন্য পৃথক হাইকোর্ট ঢাকাতে স্থাপিত হয়। ১৯৪৭ সালের ফেডারেল কোর্ট অর্ডার অনুযায়ী পাকিস্তানের করাচিতে ফেডারেল আদালত স্থাপিত হয়। ফলে সেসময় থেকে প্রিভি কাউন্সিলে আপিল দায়েরের পরিবর্তে পাকিস্তানের ফেডারেল আদালতে আপিল দায়ের করা শুরু হয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধান রচনার ফলে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত হিসেবে ফেডারেল আদালতের পরিবর্তে সুপ্রীম কোর্ট বিবেচিত হয়।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ল’স কন্টিনিউএন্স এনফোর্সমেন্ট অর্ডার,১৯৭১ পাশ করা হয় যার ফলে বাংলাদেশে ২৫শে মার্চ, ১৯৭১ এর পূর্বে পাশকৃত সকল আইন বলবত  করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৭৪০ টি আইন, ৫০৭ টি অধ্যাদেশ এবং বহু রেগুলেশন প্রচলিত রয়েছে।

দেশের উচ্চ আদালতে মামলা করা একটি যুদ্ধের মত বিষয় মনে হতে পারে যদি আপনি স্বল্প শিক্ষিত হোন বা ইংরেজি ভাষার উপর দক্ষতা আপনার না থাকে। দেশের অধ:স্থন আদালত গুলোতে বাংলায় মামলা পরিচালনা করা হয় সবার বোঝার জন্য। কিন্তু উচ্চ আদালতে সব পরিচালিত হয় ইংরেজি ভাষায়! বিষয়টি এমন যে এটি শুধু, বিচারপতি ও আইনজীবীই বুঝবেন। যার মামলা তার বোঝার প্রয়োজন নেই! অদ্ভুত নিয়ম! যার কারণে উচ্চ আদালতে আইনজীবী ছাড়া আপনি এক পা নড়তে পারবেন না। এবং তার ফলাফল দুর্নীতি, আপনার আর্থিক ক্ষতি, না জেনে জিম্মি হয়ে থাকা।

যদিও বলা হচ্ছে, কিছু কিছু আইনি শব্দ ইংরেজিতে প্রচলিত যার বাংলা করা যায় না। তারপরেও সাধারণ কিছু ইংরেজি শব্দের বাংলাও করা হচ্ছে না কেন? উচ্চতর আদালত স্পষ্টত  জানিয়েছে, “আমরা আদেশ জারি করছি যে, বাংলা ভাষার পবিত্রতা রক্ষা করতে সর্বোতভাবে চেষ্টা করতে হবে। এই ভাষার প্রতি আর কোনো আঘাত যাতে না আসে সে বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে।‘ এই আদেশে আরো বলা হয়েছে, “যারা ‘ভিউয়ার’,’ লিসেনার’  শব্দগুলো ব্যবহার করেন , তাদেরকে এই আদালতে এসে প্রমাণ করতে হবে- এই শব্দের যথাযথ বাংলা নেই।‘ এমনকি উচ্চআদালত থেকে রেডিও-টিভিতে বাংলা ভাষার বিকৃত উপস্থাপনা বন্ধের জন্য বলা হয়েছে। নি:সন্দেহে এটি একটি ভাল সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিচার বিভাগের সর্বস্তরেই  এখনো বাংলার চর্চা হচ্ছে না।

কিন্তু এখানে লক্ষণীয় যে সংবিধানে ‘সুপ্রীম কোর্ট’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছ। অর্থাৎ সুপ্রীম কোর্ট-এর ‘যাথাযথ বাংলা হিসাবে সর্বোচ্চ আদালত ব্যবহার করা হয় নি। সোজা মানে দাঁড়াল খোদ সর্ষের ভেতরেই ভূত ঢুকে বসে আছে । সর্বোচ্চ আদালত শব্দবন্ধে ‘আদালত’  শব্দটা ফার্সি থেকে নেয়া, তাই সুপ্রিমকে বাংলা করলেও শব্দবন্ধটি যথাযথ বাংলা হয়ে উঠছে না। হাইকোর্ট ব্যবহার করা হয়েছে, উচ্চ আদালত নয়। কিন্তু, অন্যক্ষেত্রে আবার ‘অধঃস্তন আদালত ব্যবহার করা হয়েছে, ইংরেজি নয়।

সংবিধানের ১৫৩ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলা ও ইংরেজি পাঠের মধ্যে বিরোধের  ক্ষেত্রে বাংলাটা প্রাধান্য পাবে। “ অর্থাৎ বাংলাকে সর্বোচ্চ মযার্দা দেয়া হয়েছে।

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হয়েছে। প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার’ অধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উচ্চ আদালতে কেন বিচার প্রার্থীরা বাংলায় বিচার চাইতে পারবে না?

আদালতের ভাষা সবার জন্য সহজবোধ্য করতে আদালত  এখনো  কেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না? ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ ৭০ বছর পরও উচ্চতর আদালতে বাংলা ভাষায় বিচারকার্য ও রায় লেখা চালু হয়নি। তবে গত কয়েক বছর মুষ্টিমেয় কয়েকজন  বিচারককে বাংলায় রায় লেখার প্রবনতা দেখা গিয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগে কোন কোন বিচারক ভাষার মাসকে বিবেচনায় রেখে ২/১টি রায় বাংলা ভাষায় দিলেও আদালতে ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে বাংলার প্রচলন নেই বললেই চলে। উচ্চতর আদালতে বাংলা ভাষার প্রয়োগ কেন নেই, কেন করা হচ্ছে না, এর সুনির্দিষ্ট জবাব পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলা ভাষা ব্যবহারে আইনগত কোন বাধা থাকলে পুর্বে বাংলায় দেয়া রায়গুলো কি আইন বিরুদ্ধ?

কোন সীমাবদ্ধতা না থাকলে বাংলাদেশ বিচার বিভাগের উভয় বিভাগের নিয়োজিত বিচারপতিরা বাংলা ভাষী হওয়া সত্ত্বেও  ইংরেজিতে  রায় দেয়ার  মানসিকতা বদলাচ্ছে  না। অথচ বাংলা ভাষার বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করলে উভয় পক্ষের বিচার প্রার্থীদের বক্তব্য প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরা সহজ হবে।

বলা হয়ে থাকে, রায়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বর্পুণ আইনি শব্দ বিদেশি হওয়ার কারণে ইংরেজিতে রায় দেয়া হয়। যে শব্দগুলোর বাংলায় রুপান্তর করা যায় তা কেন এখন পর্যন্ত বাংলায় বলা হচ্ছে না। আইনগুলো ইংরেজি ভাষা থেকে বাংলায় রুপান্তর করার কাজ শুরু করলেই  বিচার অঙ্গনে বাংলা প্রচলন সহজ হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উচ্চ আদালতে তাদের নাগরিকদের বোঝার জন্য  নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করা হয়। যেমন ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন ও নেদারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চ আদালতে বিচার কাজ চলে তাদের নিজ নিজ মাতৃভাষায়। কিন্তু এর বিপরীত চিত্র বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতে।

অন্যদিকে সংবিধানের, বহু জায়গায় বাংলা শব্দের ভুল বানান পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। যেমন: প্রস্তাবনায় `খ্রীষ্টাব্দ` ও `আশী` শব্দ দু`টি। অথচ এদের প্রকৃত বানান হলো: `খ্রিস্টাব্দ`, `আশি`।

বাংলা ভাষা আজ আর্ন্তজাতিক ভাষা। ইংরেজির কাছে বাঁধা পরে থাকবে কেন এটি? সর্বস্তরে বাংলার সবোর্চ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে অগ্রহী ভুমিকা রাখতে হবে বিচার বিভাগকেই। স্বাধীনতা অর্জনের পর বর্তমানেও এ ব্যাপারে সুষ্পষ্ট নির্দেশনা বা বাধ্যবাধকতা না থাকায় আমাদের মাতৃভাষা বহু ক্ষেত্রে উপেক্ষিত। ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ৩৫৭ ধারায় ফৌজদারী আদালতের রায় ‘আদালতের ভাষায়’ অথবা ইংরেজীতে লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ রয়েছে। হাইকোর্ট ব্যতীত অন্যান্য আদালতের ভাষা কী হবে তা ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ৫৫৮ ধারা মতে সরকার নির্ধারণ করতে পারেন। হাইকোর্টে সাক্ষীদের সাক্ষ্য কীভাবে গৃহীত হবে সে বিষয়ে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৬৫ ধারা মোতাবেক হাইকোর্টকে দেয়া হয়েছে। এ প্রকার বিধি প্রণয়নের জন্য হাইকোর্টের চুড়ান্ত এখতিয়ার রয়েছে (সূত্রঃ সিলেক্ট কমিটি রিপোর্ট, ১৯৬১)। ১৯০৮ সনে প্রণীত দেওয়ানী কার্যবিধি আইনের ১৩৭ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যে পর্যন্ত সরকার অন্য নির্দেশ প্রদান না করেন সে পর্যন্ত হাইকোর্টের অধীনস্থ যে আদালতে যে ভাষা প্রচলিত আছে সে আদালতে সে ভাষাই প্রচলিত থাকবে।’’

সিভিল রুল্স এন্ড অর্ডারস (১ম খন্ড) এর ১১নং বিধিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘মামলার পক্ষগণ আর্জি , বর্ণনা, দরখাস্ত ইত্যাদি এবং এফিডেভিট ইংরেজি ভাষায় দাখিল করিবেন।’’ আদালতে বাংলা ভাষার ব্যাপক প্রচলন করতে হলে উক্ত আইন সমূহের পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংশোধন এবং প্রয়োজন মত নতুন আইন, বিধি ও বিজ্ঞপ্তি জারি করা আবশ্যক।

বর্তমানে পার্লামেন্টের আইন সমূহ বাংলায় পাশ হয়। সাথে সাথে এগুলোর ইংরেজি ভার্সনও প্রকাশ করা যেতে পারে। মহান ভাষাদিবসকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় রায় প্রদান করেন বিচারপতি এবাদুল হক। এর পর বিচারপতি আব্দুস সালাম ও বিচারপতি খায়রুল হক বাংলা ভাষায় রায় প্রদান করে উচ্চ আদালতে বাংলাভাষার মর্যাদাকে সু-উচ্চে তুলে ধরেন। উচ্চ আদালতে সর্বাধিক বাংলাভাষায় রায় দিয়ে অমর হয়ে আছেন চট্টগ্রামের কৃতি সন্তান শ্রদ্ধেয় বিচারপতি আব্দুস সালাম মামুন। অন্যান্য বিচারপতিরা এ ধারাকে শাণিত করতে বিরাট অবদান রাখতে পারেন।

বর্তমানে আইন মন্ত্রনালয় বাংলাদেশ কোড এ ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় যুগপৎ আইন প্রকাশ করে মাতৃভাষায় আইন চর্চার পথকে অনেক সুগম করেছে। কিন্তু ‘ল জার্নাল সমূহ (ডি,এল,আর/বি,এল,ডি/ল ক্রনিক/এম,এল,আর/বি,এল,সি/বি,এল,টি প্রভৃতি) এখনও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভার্সন পুরোপুরি চালু করতে পারে নি। ফলে মাতৃভাষায় আইন চর্চা চরমভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। বাংলা ভাষায় সকল আইন রচনা ও প্রকাশ করতে হবে।

ভালো ইংরেজি জানা অনেক সিনিয়র আইনজীবীকে দেখেছি যারা সুন্দর বাংলায় আর্জি/জবাব লিখতে পারেন না। এটা বাংলার প্রতি অবহেলা ও উদাসীনতা ছাড়া আর কিছুই নয়। অনেকে পাণ্ডিত্য  জাহির করতে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে গ্রহণ বা ইংরেজির অধিক গুরুত্ব দিতে পারছেন না। সাধু চলিতের মিশ্রনে লেখা আর্জি- জবাব দেখলে মাতৃভাষার প্রতি  অবজ্ঞা আরো সুস্পষ্ট বোঝা যায়। বাংলা ভাষাকে বিশ্বের দরবারে সঠিক ভাবে তুলে ধরতে ইংরেজি জানা দরকার কিন্তু সর্বস্তরে মাতৃভাষাকে চালু করতে না পারলে বিশ্ববাসীরা এ ভাষাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে এগিয়ে আসবে না।

এখন থেকে বাংলায় গেজেট, রায়, রাষ্ট্রপতির আদেশ ইত্যাদি সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় প্রকাশ করে সাথে ইংরেজী ভার্সন প্রকাশ করা যেতে পারে। অতীতের সমস্ত গেজেট, রায় ও দেশি বিদেশি আইন বইয়ের বাংলা অনুবাদে আইন অঙ্গন সমৃদ্ধ করতে হব। স্বাধীনতাউত্তর  বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর নির্দেশ সম্বলিত এক বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়েছিল। এর পর অফিস আদালতে ব্যাপক সাড়া  জাগে।

বর্তমানে নিম্ন আদালত সমূহে আর্জি , বর্ণনা, দরখাস্ত, এফিডেফিট, হাজিরা ইত্যাদিতে বাংলা ভাষার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছে। বিচারকরা অনেকেই বাংলায় আদেশ ও রায় প্রদান করছেন।জেলা ও মহানগর আদালত সমূহও কিছু কিছু রায়, ডিক্রি, আদেশ বাংলায় দিচ্ছেন, যাদের সাধুবাদ জানানো যায়। বাংলা সাঁট লিপি বা ষ্টেনোর অভাবে এক সময় আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহারে প্রধান বাঁধা ছিল। বর্তমানে সে বাধা দূর হওয়া সত্বেও মাতৃভাষায় উচ্চ আদালতে ব্যাপক রায় দেয়া হচ্ছে না। 

এ ব্যাপারে সরকার ও মাননীয় প্রধান বিচারপতির সুদৃষ্টি প্রত্যাশা করছি। আদালতে ব্যবহৃত ও বহুল প্রচলিত ফারসি ও ইংরেজি শব্দ সমূহের উদ্ভট বাংলা না করে সে গুলোকে চালু রেখে বাংলা অনুবাদ করা যেতে পারে।যেমন- এজাহার এজলাশ, পেশকার, সোলেনামা, নামজারী, জামিন, তলবানা, তপশীল, রিভিশন, হাজিরা, মুসাবিদা, এওয়াজ, মুনসী, সুরতহাল, আলামত ইত্যাদি শব্দ।

যেহেতু দীর্ঘ দিন ইংরেজি ভাষায় সবকিছু চালু ছিল, তাই আইন আদালতে দ্রুত বাংলা চালু এতো সহজ নয়। আইনজীবী, বিচারক, আদালত কর্মচারী, আইন শিক্ষার্থী, গবেষক ও শিক্ষকগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আইন আদালতে মাতৃভাষা বাংলা চালু করা সম্ভব। এজন্যে গত ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন পাশ হয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। বিচারক, আইনজীবী ও ভাষাবিদদের সমন্বয়ে এ ব্যাপারে একটি শক্তিশালী কমিটি করে আইন আদালতে বাংলা ভাষা চালুর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

“দেশ ও জাতির বড় সম্পদ তার ভাষা ও সাহিত্য। সব দেশে, সব যুগে ভাষা ও সাহিত্য শিল্পকে অবলম্বন করেই সম্ভব হয়েছে সব রকম উন্নতি ও প্রগতি” আবুল ফজল এর এই উক্তিই প্রমাণ করে সর্বস্তরে মাতৃভাষার প্রচলন ও প্রয়োজন কতটা  জরুরি। নইলে রবি ঠাকুরের সুরে সুর মিলিয়ে একদিন আমাদেরও বলতে হবে, যথার্থ অধিকার থেকে আমরা আমাদের নিজেদের দোষেই ভ্রষ্ট হয়েছি। সর্বত্র বাংলাই হোক প্রাণের তৃষ্ণা নিবারণের মাধ্যম;  ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

 

 

(আইনের বিবিধ ধারা ও উপধারা জানার প্রয়োজনে বিবিধ বই ও তথ্যসূত্র দিয়ে বেশ কয়েকজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ আইনজীবী আমাকে সহযোগিতা করেছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁদের সকলের কাছে আমার কৃতজ্ঞতা ও ঋণ স্বীকার করছি।)

       

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>