| 20 এপ্রিল 2024
Categories
উৎসব সংখ্যা’২০২১

ইরাবতী উৎসব সংখ্যা শিশু: অবিনাশ মামা । দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

অমিয় একটু এগিয়ে গিয়ে হাত নেড়ে জয় কে ডাকলো। এই তো সেই বাড়ি। অমিয়র চিনতে ভুল হয়নি।অবিনাশপুরের অবিনাশ মামার বাড়ি। নাম আর নিবাস এক হলে সেই ব্যক্তির নাম ভোলা যায়না। প্রায় কুড়ি বছর পরে অমিয় আসছে এই পাড়ায়। তখন অমিয়র নিজের মামাবাড়ি ছিল এখানেই। পরে মামারা বাড়ি বদল করে সিউড়ি চলে যায়।

অবিনাশ মামা একাই থাকে। স্ত্রী গত হয়েছে অনেকদিন হলো। অবিনাশ মামার দুই ছেলে কলকাতায় থাকে।ওদের সঙ্গে অমিয়র তেমন যোগাযোগ নেই। শুধু অবিনাশ মামাকে বিজয়ার চিঠি পাঠায় অমিয় যেমন ছোটবেলায় পাঠাতো। এটা অবশ্য অবিনাশমামারই শেখানো। কেমন করে সুন্দর চিঠি লিখতে হয়।

“শ্রীচরণেষু ” বানানটা যে কতবার ভুল হতো অমিয়র।অবিনাশমামা বলতো এর পরের বার ভুল বানানে চিঠি এলে, এখানে এলেই শাস্তি হবে। কিন্তু শাস্তিটার কথা বেমালুম ভুলে যেত নিজেই। বড্ড ভুলোমন বরাবর। আবার নতুন করে বানান শেখাতো।

আজ কাল আর কেউ চিঠি দেয় না। ইমেলের যুগ।কিন্তু অবিনাশমামা এসবে এখনো অভ্যস্ত নয় তা জানে অমিয়।

– “অবিনাশ মামা ও অবিনাশ মামা ”

বারতিনেক ডাক দিতেই অবিনাশমামা বেরিয়ে এলো। অবাক হয়ে কিছুক্ষণ ভাবলেশহীন মুখে তাকিয়ে রইলো।তারপর আস্তে আস্তে যেন দৃশ্যটা চোখের সামনে ফুটে উঠলো। কাঁপা কাঁপা আনন্দঘন গলায় বললো -“অমিয়, কতদিন পরে এলি। একবার এদিকে আসতে মন হয় না তোর।

জয় ইতস্তত করে ভেতরে ঢুকলো। ঘরদোর বেশ অপরিচ্ছন্ন। কড়ি-বরগার ঘর। পাশাপাশি দুটো ঘর। অনেক ক্যালেন্ডার টাঙানো। ক্যালেন্ডারের গায়ে অনেক জায়গায় লাল কালি দিয়ে মার্ক করা। ক্যালেন্ডারের মাথায় শুকনো ফুল গোঁজা। একটা সোঁদা সোঁদা গন্ধ সারা ঘরে।

অমিয় পরিচয় করিয়ে দিলো- “এই আমার বন্ধু জয়। আমরা দুজনে একই কলেজে পড়াই। “

-“বাবা তাই নাকি ? তুই কলেজে পড়াস ? কোন বিষয় ?”

– “ইংরেজী “

-ওহ আচ্ছা। খুব ভালো , খুব ভালো খুব খুশি হলাম রে। আমি তো অনেক পড়াশোনা করেছিলাম , প্রচুর বই পড়তাম একসময়, এখন সব ভুলে গেছি।

তোরা বস আমি একটু চা করে আনি।”

-“না না তুমি ব্যস্ত হয়ো না।”

ততক্ষণে অবিনাশ মামা রান্নাঘরে ঢুকে গেছে। একটা কী পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো।অমিয় তক্ষুনি দৌড়ে গেলো। একটা কৌটো পড়ে গেছে নিচে। সেটা তুলে দিতেই অবিনাশমামা চমকে তাকিয়ে বলে উঠলো- “অমিয় কখন এলি ?”


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


অমিয় ততোধিক অবাক। এই পাঁচ মিনিট আগের কথা ভুলে গেছে অবিনাশ মামা। ভুলে যাওয়া রোগটা তাহলে দিনে দিনে বেড়ে এখন পুরো মস্তিষ্কেরই দখল নিয়েছে।
অবিনাশ মামা তখনো বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছে -‘তোকে কতদিন দেখিনি। কেন আসিসনা আর? আমাদের ভুলেই গেছিস।”

অমিয় সব কৌটোবাটা ঘেঁটে নিজেই চা করলো। বাড়িতে দুধ নেই। কৌটোগুলোয় আরশোলা আর ইঁদুর ঘুরে বেড়াচ্ছে। এরকম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কী করে এইভাবে পড়ে আছে অবিনাশ মামা ভাবতেই অমিয়র চোখে জল এলো।

অবিনাশমামা ঘরে বসে বসে নিজের থেকেই হঠাৎ করে অনেক কথা বলছিলো।

– “মনু আর চিনু কলকাতায় ওদের ফ্ল্যাটে নিয়ে গেছিলো। কিন্তু আমাকে নিয়ে খুব সমস্যায় পড়েছিল ওরা। দু’ দুবার রাস্তা ভুল করে অন্য পাড়ায় চলে গেছি। একদিন একটা স্টেশনে সারা রাত বসেছিলাম। কিছু মনে করতেই পারিনি। তারপর ওরা এখানে পৌঁছে দিয়ে গেছে। আর ওরা আসেও না। কেন আসবে? যদি আমি চিনতে না পারি।”

-“আমাকে যে চিনেছো?”

-“হ্যাঁ তা চিনেছি। কিন্তু আবার কিছুক্ষণ পরে না চিনতেও পারি।”বলে অবিনাশ মামা একচোট হাসলো।

সন্ধে হয়ে এসেছিলো। জয় বললো -“বাড়িতে অল্প চাল, ডাল থাকলে খিচুড়ি বসিয়ে দিই চল।”

অমিয় রাজি হলো। ঝেড়ে ঝুড়ে কিছু পাওয়াও গেলে। দু ঘন্টা লাগলো রান্নাঘরের হাল ফিরিয়ে মোটামুটি একটা ভদ্র অবস্থায় আনতে। রান্না করে অবিনাশমামার ঘরে নিয়ে আসতেই দেখে অবিনাশ মামা খুব হাসি হাসি মুখে বসে আছে। হাতে একটা ছোট্ট কাঠের বাক্স। -” তোর ছোটবেলায় পাঠানো বিজয়ার চিঠিগুলো। দ্যাখ সব এই বাক্সের মধ্যে আছে। আমি লাল কালি দিয়ে সব ভুল বানান ঠিক করে দিয়েছি।”

অমিয় চিঠিগুলো হাতে নিয়ে দেখছিলো। চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো সেই সব দিন। পোস্টকার্ডের পেছনে লাল নীল স্কেচপেনে আঁকা মা দুর্গার মুখ।”

হঠাৎ অবিনাশমামার মুখ পরিবর্তন হলো

বিরক্ত হয়ে বললো -” চিঠি গুলো দাও। কে তুমি ? আমার ঘরে ঢুকে পড়েছো !

যাও, চলে যাও বলছি।”

অমিয় সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসে। বারান্দায় আসন পেতে অমিয় আর জয় খেতে বসে।

সামনের উঠোনটা শিউলিফুলে ঢেকে রয়েছে। এখানে অমিয় আর ওর বোন রিঙ্কু লুকোচুরি, কানামাছি খেলতো। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে জয় কে বলে ওঠে-” ভাবছি অবিনাশ মামাকে কলকাতা নিয়ে যাবো। এখানে এইভাবে পড়ে থাকতে দেব না।”

জয় খাওয়া থামিয়ে বললো-“ঠিক বলেছিস আমারও খুব খারাপ লাগছে ওঁর অবস্থা দেখে।”

কড়িবরগার ঘরগুলো খুব ঠাণ্ডা। পাশের শোয়ার ঘরের বিছানাটা পরিষ্কার করলো দুজন। একটা পাতলা চাদর গায়ে শুয়ে পড়লো। কিন্তু রাত বাড়তেই মনে হলো ঠাণ্ডাটা আরও কামড়ে ধরেছে। অমিয় এপাশ ওপাশ করছিলো।
জয় বললো-“দাঁড়া আমি কাঠের আলমারিটা খুলে দেখছি আর একটা মোটা চাদর পাই কি না। জয় ঘরের আলোটা জ্বেলে আলমারিটা খুলে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ কিছু একটা দেখে চিৎকার করে উঠলো।

সাপখোপ নাকি? এখানে থাকা কিছু অস্বাভাবিক নয়।

অমিয় তড়িঘড়ি বিছানা থেকে উঠে জয়- এর কাছে গিয়ে যা দেখলো তা দেখে অমিয়র চক্ষুস্থির। অবিনাশ মামার বড় করে বাঁধানো , চন্দনের ফোঁটা দেওয়া একটা ছবি। তাতে মৃত্যুতিথি লেখা আছে আগের বছরের পয়লা পৌষ।

হঠাৎ ওদের ঘরের দরজাটায় ধাক্কা দেওয়ার শব্দ হলো।
জয় আর অমিয় একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে দাঁড়িয়ে রইলো। দরজাটা আপনা থেকেই খুলে গেলো।দাঁড়িয়ে আছে অবিনাশ মামা।

জয়ের হাতে ধরার ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অবিনাশমামার চোখদুটো জলে ভরে উঠলো।
বললো -” দেখেছিস , ভুলেই গেছিলাম “

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত