| 5 মার্চ 2024
Categories
উৎসব সংখ্যা’২০২১

উৎসব সংখ্যা শিশু: ছন্দেরা কি মিলবে । শ্রীপর্ণা ঘোষ

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট
কত কত কবি কবিতা লিখছে। লিখতে লিখতে একদিন হঠাৎ কেউ কোনো ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে না। তখন কবিদের ভারি মুশকিল হলো। কারণ সম্পাদকরা কবিদের কাছ থেকে কবিতা চাইছে। যারা মুশকিলে পড়েছে তাদের মধ্যে আমিও একজন।কিন্তু শব্দেরা আমার খুব বন্ধু ছিল। আমি শব্দদের জিজ্ঞেস করলাম, “ছন্দ ফিরিয়ে আনতে গেলে কী করতে হবে?”
 
শব্দেরা বলল, “দু’কোটি বইএর দেশ’ পেরিয়ে একটা পুরোনো বই যার নাম ‘ছন্দেশ্বরী’ তার মধ্যেই ছন্দবুড়ির বাস। সেই ছন্দবুড়িই ছন্দ ফিরিয়ে আনতে পারবে।”
 
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এই বইয়ের দেশ কোথায়?”
 
শব্দেরা বলল, “তা আমরা জানি না। তুমি বইদের জিজ্ঞেস করো।”
 
আমি আমার স্কুলের পাঠ্য বইদের জিজ্ঞেস করলাম ছন্দবুড়ির কথা। তারা বলল, “আমরাতো ছোটোখাটো বই। আমরা অত কী জানি! তুমি বরং লাইব্রেরিতে গিয়ে মোটা মোটা পাতাওয়ালা বড়ো বড়ো বইদের জিজ্ঞেস করো। ”আমি তখন ছোটো লাইব্রেরি গেলাম। সেখানকার বইগুলো খুব ডাকাডাকি করছিল দোকানদারের মতো। এ বই বলে, “আমাকে পড়ো, খুব ভালো।” ও বই বলে, “ওটা-তো ভালো, কিন্তু আমি খুব হাসির।” আরেক বই বলল, “শুধু হাসলে হবে নাকি! সিরিয়াস গল্পও তো পড়তে হবে।” আরেকটা বই আমার হাতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বলে,
 
“এই নাও ভূতের গল্প পড়ো।” আরো কত বই এইরকম করেই চলল। কিন্তু আমি যেই ছন্দবুড়ির কথা জিজ্ঞেস করলাম তখন সবাই চুপ করে গেল।
 
এক কবিতার বই বলল, “এর সন্ধান খুব বড়ো বইরাই দিতে পারবে।” তখন একটা বিজ্ঞ বিজ্ঞ বই বলল, “সেই বইতো এখানে নেই। সেতো বড়ো লাইব্রেরিতে আছে।” আমি তখন বড়ো লাইব্রেরিতে গেলাম সেটা ছোটো লাইব্রেরিটার একদম উল্টো।এখানে আমাকে কেউ পাত্তাই দিল না। আমি বড়ো বইএর সন্ধান চাইলে দেমাক দেখিয়ে বইরা বলল, “নিজে খুঁজে নাও।”
 
অনেক খুঁজে খুঁজে আমি বড়ো বইদের কাছে গেলাম। তারা খুব জ্ঞানী আর দেমাক আরো বেশি।তারা আমার কথার সাড়াই দিচ্ছিল না।শেষে একজন আমার কথায় সাড়া দিলে আমি তাকে ছন্দবুড়ির কথা জিজ্ঞেস করলাম। তখন সব বড়ো বড়ো বইগুলো হেসে কুটোপাটি খেতে থাকল। বলছিল, “তোমার মতো ছোটোমেয়ে যাবে ছন্দবুড়ির কাছে! ‘দু’কোটি বইএর দেশ’ পেরোবে তুমি! হা হা হা হা. . .”
 
আমি বললাম, “কেন ‘দু’ কোটি বইএর দেশ’ পেরোতে কত সময় লাগবে?”
 
বইগুলো বলল, “তা পেরোতে তোমার বয়স হয়ে যাবে।”
আমি বললাম, “তাছাড়া কী আর কোনো উপায় নেই?” একটা বই বলল, “না না নেই নেই।” আরেকটা বই বলল, “কে বলল নেই? আছে আরেকটা পথ।”অন্য একটা বই বলল, “তুমি কোন পথটার কথা বলছো?” এরকম আলোচনা চলতে থাকল।
 
হঠাৎ তাদের মাঝে আরেকটা বড়ো বই এসে বলল, “আমি জানি সেই আরেক পথের ঠিকানা। সেই পথে গেলে ‘দু’কোটি বইএর দেশ’ পেরোতে হবে না। তুমি একেবারে ‘ছন্দেশ্বরী’ বইতে ঢুকে পড়বে।”
 
ঐ বইটা আমাকে বইগুলোর ফাঁকে একটা ছোট্ট গর্ত দেখালো। আমি সেই গর্ত দিয়ে ঢুকে গেলাম। সেখানে দেখলাম অনেকগুলো ছন্দের বই — ছন্দতীর্থ, ছন্দের টুংটাং, ছন্দের সহজপাঠ, ছন্দের নিয়ম-কানুন আরো কত বই। কী সুন্দর দেখতে, কত সুন্দর ছবি আঁকা। খুঁজতে খুঁজতে ‘ছন্দেশ্বরী’ বইটা খুঁজে পেয়ে গেলাম।
 
বইটা খুব পুরোনো। ধুলো আর মাকড়সার জালে ভর্তি। বইটার মধ্যে ঢুকে পড়ে সূচিপত্রে দেখলাম, শুধুমাত্র একটা ছন্দের বুড়ি নয় দশটা ছন্দের বুড়ি  আছে। তাছাড়া ছন্দের পিসি, ছন্দের মাসি, ছন্দের বাবা-মা, জ্যেঠা, মামা, আরোও কতজন!
 
প্রথমে যে ছন্দেরবুড়ির সঙ্গে দেখা হল। তাকে বললাম, “তুমিই কি সেই ছন্দেরবুড়ি?” সে বলল, “হ্যাঁ, আমিই সে। এসো আমার সঙ্গে এসো।”
 
আমি তার সঙ্গে একটা ঘরে গেলাম, সেখানে একটা হাঁড়ির মধ্যে কী যেন হচ্ছিল! বুড়িটা হাঁড়ির কাছে গিয়ে বলল, “একটা কচিপাতা, এক ডজন কাগজ, ছয় শিশি কালি। আমার দিকে ফিরে বলল, ‘দেখো এক্ষুনি হয়ে যাবে।” পরক্ষনেই ভয় পেয়ে বলল, “একি, হচ্ছে না কেন? এই পাতায় তো এটাই লেখা আছে।”
 
সেই ঘরের জানলা দিয়ে অন্য একজন বুড়ি বলল, “হি হি, হবে না তো। এরপর যা করতে হবে সেটা আমার পাতায় লেখা আছে।” তারপর দ্বিতীয় বুড়িটা হাত নেড়ে আমায় বাগানের দিকে ডাকলো, “এই মেয়ে, আয় আমার সঙ্গে। দেখবি এক্ষুনি হয়ে যাবে।” সেখানেও একটা হাঁড়িতে কী যেন হচ্ছিল।
 
তৃতীয় একটা বুড়ি একটা লাঠি হাতে সেখানে এসে দ্বিতীয় বুড়িটাকে বলল, “এই পাতাটা খুঁজতে আমি কিন্তু তোকে সাহায্য করেছি। আমাকে নে।”
 
দ্বিতীয় বুড়িটা বলল, “না, তা কী করে হবে?”
 
তখন তৃতীয় বুড়িটা তেড়ে এসে লাঠি দিয়ে হাড়িটা উল্টে দিল। কোথা থেকে চতুর্থ একটা বুড়ি এসে বলল, “যা যা আমার সব গাঁদা গাছ নষ্ট হয়ে গেল। এখন আমি কী করব? আমার যে গাঁদা ফুল লাগবে।”
 
সেখানে পঞ্চম একটা বুড়ি এসে বলল, “বেশ হয়েছে তোর গাঁদা গাছ নষ্ট হয়েছে। আমার জায়গায় বাগান করেছিলিস না!”
 
চতুর্থ বুড়ি বলল, “কে বলল এটা তোর জায়গা? আমাকে এখানে চাষ করতে বলেছিল ছন্দের রাজা।”
 
এত ঝগড়ার শব্দে আমার কানে তালা লেগে যাচ্ছিল। হঠাৎ অন্য একটা বুড়ি আমায় হাত ধরে টেনে একটা ঘরে ঢুকিয়ে নিল, বলল, “তুমি এখানে কেন এসেছো?”
 
আমি বললাম, “তুমিই কি আসল ছন্দের বুড়ি?”
 
সে বলল, “হ্যাঁ।”
 
আমি বললাম, “কবিরা কেন ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে না?”
 
বুড়িটা বলল, “এই রকম যে হবে তা আমি আগেই জানতাম।”
 
আমি বললাম, “কেন?”
 
বুড়ি বলল, “সে অনেক কথা। ছন্দের যে রাজা ছিল সে আমাকে ছন্দের বইটার ভার দিয়েছিল।সেটা জানতে পেরে অন্যরা হিংসায় জ্বলে যাচ্ছিল। তারা খালি সুযোগ খুঁজতো বইটা নিয়ে নেবার জন্য।আমি বইটাকে কোন সময়ে হাত ছাড়া করতাম না। রাতেও ঘুমোতাম না। তারপর একদিন বসন্তের ফুরফুরে হাওয়া দিল আর ওই দুষ্টু ঘুমের মাসি-পিসিরা আমার দু’চোখের পাতায় এসে বসল। অমনি আমি ঘুমের দেশে চলে গেলাম। আমি জেগে নেই টের পেয়ে‘ছন্দেশ্বরী’ বইএর ছন্দেরা সবাই ঝগড়া শুরু করেদিল। ঝগড়ার চোটে পাতাগুলো বই থেকে খুলে গেল। আর সবাই একটা করে পাতা নিয়ে চলে গেল। আমার কাছে কেবল একটা পাতা রয়ে গেল। এখন সব কিছু ঠিক করতে গেলে সব পাতাগুলো একসঙ্গে করতে হবে।”
 
আমি ভেবে বললাম, “এমন কী কোনো সময় আছে যখন সবাই একত্র হয়?”
 
বুড়ি বলল, “হ্যাঁ, রোজ ঊষাকালে সবাই একত্র হয়। ছন্দের-রাজা তো এখন আর নেই তাই তার পেয়াদাটা এখন সবার সারাদিনের কাজ ঠিক করে দেয়।”
 
আমি বললাম, “কী কাজ ঠিক করে দেয় পেয়াদা?”
 
বুড়ি বলল, “কোন ছন্দ কোন কবির কলমে গিয়ে বসবে তা ঠিক করে দেয়।”
 
আমি বললাম, “এইরকমই যদি হয় তবে কবিদের কলমে ছন্দ আসছেনা কেন?”
 
বুড়ি বলল, “পেয়াদাটা কাজ জানে নাকি? ও তো কবির কলমের জায়গায় মুদিখানার কলমে ছন্দদের বাসা বাঁধতে বলে। তাছাড়া ছন্দের বইটা না থাকলে ছন্দ আসবে কী করে?”
 
আমি পরেরদিন ঊষাকালে ছন্দদের সবাইকে বললাম, “এখানে আসল ছন্দের-রাজা কে?”
 
সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, “আমার কাছে ছন্দের বইয়ের পাতা আছে আমিই রাজা।”
 
আমি তখন তাদের ভেংচি কেটে বললাম, “পাতা থাকলে কী হবে বইটাতো নেই। তার মানে তোমাদের কারোর কাছে ছন্দ নেই।”
 
সবাই দারুণ ভয় পেয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগলো।
 
আমি বললাম, “তোমরা যদি পাতাগুলো না দাও, সব ছন্দেরা যদি না মেলে তাহলে কবিতায় ছন্দ বসবে কী করে?”
 
আসল ছন্দের বুড়ি তার পাতা দিয়ে বলল, “এই বই আমাদের কারো একার নয় সবার। রাজার স্বপ্ন ছিল, যে এই বই সবার হবে।”
 
তখন সবাই পাতাগুলো দিয়ে দিল আর সব ছন্দেরা একসঙ্গে মিলে গেল।
 
সবশেষে ছন্দেরা আমাকে একটা খাতা দিল। সেটা ছিল জাদু খাতা। আমি যদি তাতে গদ্যও লিখি তবু সেটা পদ্য হয়ে যাবে। তারপর ফিরে গিয়ে দেখলাম, সব কবিদের কলমে আবার ছন্দেরা বসে  কবিতা গড়ে তুলছিল। 
 
 
 
 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত