পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব এবং বিশ্ব বিপ্লবের প্রাসঙ্গিকতা: একটি মার্কসীয় বিশ্লেষণ (পর্ব-১)

 

সাম্প্রতিক বিশ্বায়ন পর্বে এসে সাম্রাজ্যবাদ আরও বেশি বিস্তৃত শোষণমূলক রূপ পরিগ্রহ করেছে। ভৌগোলিকভাবে বলতে গেলে, পুঁজিবাদের অসম চরিত্র ধনী অঞ্চলকে আরও ধনী করেছে এবং দরিদ্র অঞ্চলগুলোকে আরও দরিদ্র করেছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থা গঠন করে সম্পদের অসম বিনিময় ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদ যে কৌশল অবলম্বন করেছে তা তাকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বিচারে পুঁজি পুঞ্জীভবনের একটি বিশ্ব ব্যবস্থায় পরিণত করেছে। আন্তর্জাতিকতাবাদের ছদ্মাবরণে প্রকাশিত হলেও আজকের দিনে নব্য রক্ষণশীলবাদী নীতির অনুসারী পুঁজিবাদের আগ্রাসী শোষণমূলক চরিত্রই প্রতিফলিত হচ্ছে। তাই উদারবাদী অর্থনৈতিক তত্ত্বের আড়ালে কাজ করছে নব্য রক্ষণশীলবাদ। পুঁজির পুঞ্জীভবনের ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করেই রাজনৈতিক ক্ষমতার বৃত্ত প্রস্তুত হয়। পুঁজি পুঞ্জীভবনের এই সীমাহীন প্রবণতা পুঁজিবাদের অভ্যন্তরে বেশকিছু সংকট সৃষ্টি করে এবং এ সংকট পর্যবসিত হয় সমাধানহীন এক বিশৃঙ্খলায়।

মার্কসীয় বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পুঁজি নিজে কখনোই এ সংকটের সমাধান দিতে পারে না, বরং একে আরও তরান্বিত করে। কিন্তু মার্কসের সময়কার প্রাথমিক পুঞ্জীভবন এখন বিস্তৃত হয়ে বৈশ্বিক পরিসরে শ্রম শোষণ করছে। পুঁজির বিশ্বায়ন যে ভারসাম্যহীনতা ও অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে কোনো উদারবাদী ও নব্য-উদারবাদী অর্থনীতিবিদ তার সমাধানের পথ বাতলে দিতে পারছেন না। তাই নব্য-উদারবাদের শেষ ত্রিশ বছরে সামাজিক অসমতা সর্বোচ্চ মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এখানেও মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গি কার্যকর। তিনি বলেছিলেন, অতি পুঞ্জিভবনের পুরনো সংকটই এই ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতার উদগাতা।

পুঁজির অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব: পুঁজিবাদের প্রধানতম অভ্যন্তরীণ সংকটটি নিহিত আছে অতি উৎপাদনের মধ্যে। অতি উৎপাদনের পরে স্বাভাবিকভাবে পুঁজির স্বার্থে বেশ কিছুদিন আর উৎপাদনের প্রয়োজন পড়ে না। ফলে শ্রমিক ছাঁটাই হয়ে ওঠে মুনাফালোভী পুঁজিবাদের একমাত্র অবলম্বন। এর অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে দেশজুড়ে বেকারত্ব, দারিদ্র, অস্থিরতা, জনসেবা খাতগুলোর স্থবিরতা। তাই পুঁজিবাদের নিহিতার্থই হচ্ছে বিপুল তেজীভাবের পর মন্দা বা সংকটের মুখোমুখি হওয়া। লেনিন তাঁর সাম্রাজ্যবাদ গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের তেজীভাবের পর ১৯০০-০৩ সালে কীভাবে সংকট দেখা দেয়। সে সময়ে প্রখ্যাত চিন্তাবিদ মেনার্ড কিন্সের তত্ত্ব পুঁজিবাদের সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে। ঘাটতি বাজেট, ব্যাংক সুদ নিয়ন্ত্রণ ও সরকারের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে সংকট নিরসনের পথ দেখান। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আনতে তাঁর তত্ত্ব কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। তবে মুদ্রাস্ফীতি সত্ত্বেও কিনসীয় মডেল পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী দেশগুলোতে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধিতে সক্ষম হয়। এ মডেল ৩৭ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভঙ্গুর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে কিনসীয় তত্ত্ব সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের আন্তর্জাতিক সংহতি ও বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পুনর্গঠনের কাঠামোগত ভিত্তি প্রস্তুত করে।

উল্লেখ্য যে, পশ্চিমের পুঁজিবাদী দেশগুলোতে জনগণের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেলেও কিনসীয় মডেল ঔপনিবেশিক শাসনাধীনে থাকা সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলোতে জনগণের জীবনমান উন্নত করতে পারেনি। উপরন্তু, এ মডেল অনুন্নত দেশে অর্থনৈতিক ঋণ ও সাহায্যের নামে ঔপনিবেশিক শোষণের নব্য কৌশল উদ্ভাবন করে। মুদ্রাস্ফীতির প্রভাবে নিও ক্ল্যাসিকাল মতবাদের পুনর্জাগরণ হয়। এ মতবাদের প্রবক্তারা শুধুমাত্র মুদ্রা ও ব্যাংক ঋণদানের ক্ষেত্রেই সরকারি নিয়ন্ত্রণ সীমাবদ্ধ রাখার পক্ষপাতি। ষাটের দশকের শেষার্ধে সংকট আরও ঘনীভূত হলে নিও ক্ল্যাসিকাল ও কিনসীয় মতবাদের সংমিশ্রণে নতুন ত্বত্তের প্রবর্তন করা হলো। কিন্তু কোনো তত্ত্বই পুঁজিবাদের আসন্ন সংকট নিরসনে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারলো না। এ সংকট নিরসনে পুঁজিবাদ সত্তরের দশকে নতুন নতুন আধুনিক সংস্কারমূলক মতবাদ দাঁড় করায়। কিন্তু কোনো মতবাদই গভীর সংকটে নিমজ্জিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে উদ্ধার করতে পারছিল না। ১৯৭৪ সালে আরও এক দফা সর্বব্যাপী সংকট উপস্থিত হয়। এবারের সংকটে নতুন কিছু অনুষঙ্গ সংযোজিত হয়। বল্গাহীন মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রা ব্যবস্থার আকস্মিক পতনের পাশাপাশি দেখা দিল জ্বালানি, কাঁচামাল সংকট ও পরিবেশ বিপর্যয়। এবারকার সংকট মোকাবেলায় পুঁজিবাদ রক্ষণশীল অর্থনৈতিক মতবাদ গ্রহণ করে যা নব্য-উদারবাদের মোড়কে প্রচারিত হয়। এর প্রধান প্রবক্তা মিল্টন ফ্রিডম্যান সংকট এড়ানোর জন্য বেকারত্বকে অপরিহার্য মনে করেন। নব্য-উদারবাদ আর্থিক সংকটকালেও একটি নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত পুঁজির পুঞ্জীভবন প্রক্রিয়াকে নিরাপদ রাখার জন্য আন্তর্জাতিক কৌশল অবলম্বন করে। ১৯৪৪ সালের মন্দা নিরসনে পুঁজিবাদ বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ গড়ে তোলে তৃতীয় বিশ্ব শোষণের প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেয়ার জন্য। আশি ও নব্বইয়ের দশকে মন্দা মোকাবেলায় তেমনি গড়ে তোলা হয় বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা। এ সংকট নিরসনে একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে পুঁজিবাদ সমরবাদী নব্য-রক্ষণশীল নীতি গ্রহণ করে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কূটনীতির পরিবর্তে সাম্রাজ্যবাদ এখন সমরবাদকে বেছে নিয়েছে। বিশ্বের কাঁচামাল ও প্রাকৃতিক সম্পদকে দখলে আনতে নব্য-উদারতাবাদ পর্বে যেমন নিচু মাত্রার যুদ্ধকে কৌশল হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছিল, এখন সে স্থলে প্রত্যক্ষ সামরিক আগ্রাসনকে স্থান দেয়া হয়েছে। বিশ্বের তেল সম্পদকে নিয়ন্ত্রণে এনে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তিবলে বিশ্ব অর্থনীতিতে আধিপত্য বিস্তারে সচেষ্ট। এ নীতি বাস্তবায়নেই শুরু হয়েছে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়া যুদ্ধ। এ যুদ্ধ অর্থনীতির খেসারত দিতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে অর্থনৈতিক স্থবিরতা।

এ যুদ্ধ অর্থনীতির বিকাশ ঘটানো পুঁজিবাদী বিশ্বে নতুন কোনো ঘটনা নয়। পুঁজিবাদ ১৯২৯-৩৩ সালের মহাসঙ্কট কটিয়ে উঠেছিল ফ্যাসিস্ট জার্মানির সামরিক প্রস্তুতির মাধ্যমে। একইভাবে মার্কিন যুত্তরাষ্ট্রে ভারী শিল্পগুলো মন্দা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল ১৯৪০ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য সামরিক প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে। এভাবে যুদ্ধ অর্থনীতিতে রাষ্ট্রই হয়ে ওঠে শিল্পের প্রধান বাহক। ফলে রাষ্ট্র ও একচেটিয়ার অন্তর্মিলন একটি বিশেষ রূপ লাভ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ অর্থনীতি ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্প ফার্মগুলোর ব্যয় হ্রাসকরণের চিরায়ত নীতি প্রত্যাখ্যান করে সাধারণ নাগরিক অধিকার খর্ব করে প্রজাতন্ত্রকে ক্রমশ দুর্বল করে তুলেছে। কারণ সামরিক খাতে খরচ সরকারি কর্মকান্ডের মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে উৎপাদন ও উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করলেও পূর্ণ বিনিযুক্তির স্তরে তা দ্রব্যমূল্যের ওপর ঊর্ধ্বচাপ সৃষ্টি করে। বিকাশের এ প্রণালী মুদ্রাস্ফীতির সৃষ্টি করে। মুদ্রাস্ফীতি একচেটিয়া অতি মুনাফাকে আরো বৃদ্ধি করে, রাষ্ট্র ও একচেটিয়ার স্বার্থকে আরো সমন্বিত করে এবং তাদের অন্তর্মিলনকে আরো ব্যাপক ও শক্তিশালী করে। একচেটিয়া ও রাষ্ট্রের এই অন্তর্মিলনের ফলে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে একচেটিয়াগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং রাষ্ট্রীয় ঋণের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান খরচ বহন করতে সরকারকে বাধ্য করে।

তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ফান্ড জনগণের মৌল মানবিক চাহিদা পূরণের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে বৃহৎ কর্পোরেশনগুলোর ভর্তুকির কাজে। ফলে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে গুটিকয়েক মানুষের স্বার্থে বৈষম্যমূলক পথে। এ বৈষম্য ক্রমশ ভারসাম্যহীনতা ও গণঅসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রীটে’র মতো সামাজিক আন্দোলনের। কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রমাগত সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত দেশে পরিণত হয়েছে। সুতরাং সাম্র্রাজ্য যত শক্তিশালী হয়েছে, প্রজাতন্ত্র তত দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রজাতন্ত্র ও সাম্রাজ্যের এ দ্বদ্ব পুঁজির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের একটি বিশেষ রূপ।

প্রজাতন্ত্র ও সাম্রাজ্যের মধ্যকার দ্বন্দ্ব: মার্কস রাষ্ট্রকে শ্রেণী শোষণের হাতিয়ার বলে গণ্য করতেন। রাষ্ট্র যখন জনস্বার্থের পরিবর্তে গুটিকয়েক ধনিক শ্রেণীর সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বার্থে পরিচালিত হয়, তখন আর সে রাষ্ট্রকে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র বলা যায় না, সে রাষ্ট্র অবশ্যই শোষণমূলক। ব্রিটিশ, রোমান বা অন্যান্য সাম্রাজ্যের মতো মার্কিন সাম্রাজ্য সবসময় মানুষের অধিকারকে পদদলিত করেছে, রাষ্ট্রকে পরিণত করেছে সংখ্যালঘু শোষক শ্রেণীর শোষণযন্ত্রে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এ বৈশিষ্ট্যটি পুঁজিবাদের ইতিহাসে নতুন কোনো ঘটনা নয়। পূর্ববর্তী সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতো তা ব্রিটিশ জনগণ বহন করতো। সুতরাং, পুঁজির অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শোষণমূলকভাবে মুনাফা নিংড়ে নেয়া। আর এ কাজটি করতে গিয়ে তাকে অবশ্যই বিস্তার লাভ করতে হয়। পুঁজি রপ্তানির মধ্য দিয়ে এ বিস্তারের কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। এ পুঁজি রপ্তানির মাধ্যমে একদিকে যেমন বহির্বিশ্ব থেকে উচ্চহারে উদ্বৃত্ত মূল্য শোষণ করা হয়, তেমনিভাবে বলপূর্বক বাজার দখলের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য নিজ দেশের জনগণকে বাধ্য করা হয়। নতুন বাজার দখল করতে গিয়ে যে সামরিক ব্যয়ের প্রয়োজন হয় তা নির্বাহের জন্য জনগণকে রুটি কেনার অর্থ মারণাস্ত্র ক্রয়ে নিয়োজিত করতে হয়। ফলে জনগণের জীবনযাত্রার মান ক্রমশ নেমে যায়।

একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে রক্ষণশীল সমরবাদ আরও খোলাখুলি রূপ নেয়ায় সাম্প্রতিক বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ‘ফিসক্যাল ক্লিফ’১ ও ‘শাট ডাউন’২-এর মতো জাতীয় সংকটের সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রজাতন্ত্র হিসেবে ক্রমাবনতি ঘটার প্রধান কারণ হচ্ছে তার অসম অর্থনৈতিক কর্মসূচি। করনীতির কথাই ধরা যাক। ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কর্পোরেশনগুলো ফেডারেল রাজস্ব আয়ের ৫০ শতাংশ প্রদান করতো। নব্বইয়ের দশকে এ করের হার কমে মাত্র ৭ শতাংশে পৌছায়।

কালক্রমে করের হার আরও কমে আসে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কর্পোরেশনগুলোর করের হার তখনই কমিয়ে আনা হয় যখন তাদের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে সর্বাধিক। এই চরম অমানবিক ও অসম করব্যবস্থাটি প্রবর্তিত হয় রিগ্যান কর্তৃক আনুক্রমিক আয়কর (Progressive Income Tax) ব্যবস্থার বিলোপ সাধনের মধ্য দিয়ে।

সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার এ অসম চরিত্রটিকে সমতার নীতি দিয়ে পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে। আধুনিক সমাজে সমতার নীতিকে দু’ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। একটি হচ্ছে, গণতান্ত্রিক নাগরিকত্বের সমতা ও অপরটি হচ্ছে শর্তমূলক সমতা। গণতান্ত্রিক নাগরিকত্বের সমতার বিভিন্ন দিকের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে আইনবহির্ভূতভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো নাগরিক যেন বঞ্চিত না হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের করনীতির এ বৈষম্য রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে বৈধতা পাচ্ছে। এক্ষেত্রে আইনের শাসনের ন্যায়সঙ্গত ভিত্তিটি আলোচনাসাপেক্ষ। এ প্রসঙ্গে লন ফুলারের৪ ‘আইনের অন্তর্নিহিত নৈতিকতা’ বিষয়ক ব্যাখ্যাটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। ফুলার বলেন, কিছু বিশেষ নীতিমালা অনুসরণ না করে যদি ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে এ ব্যবস্থাটি প্রবর্তন ও রক্ষা করার সাহসী উদ্যোগটি বিভিন্নভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। সুতরাং, এসব নীতিমালাই আইনের অন্তর্নিহিত নৈতিকতার ভিত্তিটি নির্মাণ করে। এই নীতিমালার যেকোনো একটি সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন হলে আইনগত ব্যবস্থাপনাটি পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়বে। এ মূলনীতি বা নীতিমালাগুলোকে আট ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম মূলনীতিটি হচ্ছে আইনকে অবশ্যই সর্বজনীন হতে হবে। অর্থাৎ, আইনগত ব্যবস্থাটিকে আচরণের সাধারণ মানদন্ড অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে অধীনস্থদের অভিযোগ করার কোনো সুযোগ না থাকায় ব্যবস্থাপকরা সহজেই তাদের সাধারণ আচরণবিধি থেকে দূরে সরিয়ে নিতে পারে।

এভাবে আইনের সাধারণ চরিত্রটি বিনষ্ট করে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র প্রতি মুহূর্তে বিশেষ একটি স্বার্থান্বেষী ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণে সদাসচেষ্ট।

ফুলার বর্ণিত দ্বিতীয় মূলনীতিটি হচ্ছে : আইনের অন্তর্নিহিত নৈতিকতার একটি অপরিহার্য দিক হলো, যাদের জন্য আইনটি প্রণীত হবে তাদের কাছে এটি সরকারিভাবে ঘোষণা করা হবে।

কিন্তু পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে এর বিপরীত দৃষ্টান্তই লক্ষণীয়। জনগণের সম্পদ তাদের অজ্ঞাতসারেই বহুজাতিক কর্পোরেশনের হাতে তুলে দেয়া হয়। সরকারের পররাষ্ট্রনীতি বা যুদ্ধনীতি জনগণের কাছে গোপন রাখা হয়। সরকারি তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার যে জনগণের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকারের একটি এ বিষয়টি সাম্র্রাজ্যবাদী শাসক গোষ্ঠী উপেক্ষা করে চলে।

আইনের শাসনের তৃতীয় মূলনীতিটি হলো, আইনকে অবশ্যই প্রত্যাশিত বা সম্ভবনাময় এবং অতীত পর্যালোচনামূলক হতে হবে। ফুলার মনে করেন, একটি অপরাধ আইন তখনই প্রত্যাশিত হবে যখন অপরাধীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হবে। তিনি হিটলার কর্তৃক এ নীতি লংঘনের দৃষ্টান্ত দেন। তিনি হত্যাকান্ডকে বৈধতা দেয়ার জন্য নিহত ব্যক্তিকে ‘হুমকি’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

হিটলারের মতো হত্যাকান্ডকে বৈধতা দিতে আজকেও মার্কিন সাম্র্রাজ্যবাদ একই কৌশল অবলম্বন করছে। গুয়ানতানামো কারাগারে বন্দী অপরাধী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের অপরাধের সপক্ষে কোনো তথ্য প্রমাণ মার্কিন সরকার হাজির করতে পারেনি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের মার্কিন নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ বলে ঘোষণা করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই ২০-২৫ বছর জেল খাটার পর প্রমাণিত হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি আদৌ মার্কিন রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি ছিলেন না। তেমনিভাবে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের নামে ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়াসহ বহু দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণহত্যা চালানো হয়েছে। আলেন্দে, গাদ্দাফি, চসেস্কুসহ বহু বিশ্বনেতাকে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়। সম্প্রতি ‘প্রধান সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী’ সন্দেহে ওসামা বিন লাদেনকে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেনকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। উপর্যুক্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে আইন তার প্রত্যাশিত রূপ পেতে ব্যর্থ হয়েছে।

ফুলারের চতুর্থ মূলনীতিতে বলা হয়েছে, আইনকে অবশ্যই সুস্পষ্ট হতে হবে। তিনি মনে করেন, যা কিছু স্বচ্ছ এবং যুক্তিসম্মত তা অপরিহার্যভাবে অস্পষ্ট হতে পারে না।

এ নীতিমালার আলোকে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের PNAC (Project for New American Century) ডকট্রিনের তিনটি দিক বিশ্লেষণ করে দেখতে পারি। ডকট্রিনে বলা হয়েছে, (১) একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এশিয়ায় সামরিক ঘাঁটি বাড়ানো প্রয়োজন। এজন্য লক্ষাধিক মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। (২) ভূমধ্যসাগর ও পারস্য উপসাগরে বিমান বাহিনীর উপস্থিতি কমিয়ে এনে প্রশান্ত মহাসাগরে নৌ বাহিনীর উপস্থিতি বাড়াতে হবে। (৩) সমগ্র অঞ্চল জুড়ে পরিকল্পিত বাহিনী গঠন ক্ষমতার উন্নতি সাধনের জন্য সম্মুখ সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।

প্রথম অংশে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ বোঝাতে কি বোঝোনো হচ্ছে বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্পষ্ট। অথচ এ লক্ষ্য অর্জনে লক্ষাধিক মার্কিন সৈন্যের সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। যে মার্কিন জনগণ অপরিসীম কষ্ট ও ত্যাগের বিনিময়ে সামরিক ব্যয় নির্বাহ করবে, তাদের কাছে স্পষ্ট করা হচ্ছে না একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জটি কী? দ্বিতীয় অংশে, প্রশান্ত মহাসাগরে নৌবাহিনী বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে এটি সুস্পষ্ট, কিন্তু কেন? এর কোনো দিক-নির্দেশনা এখানে নেই। তৃতীয় অংশে সমগ্র অঞ্চলে সামরিকীকরণের জন্য সামরিক নেটওয়ার্ক গঠনের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সমগ্র অঞ্চল জুড়ে কেন সামরিকীকরণ প্রয়োজন এর কোনো সুস্পষ্ট ব্যাক্ষ্যা এখানে নেই।

অন্তর্নিহিত নৈতিকতার পঞ্চম বৈশিষ্ট্যটি হচ্ছে, আইনে কোনো স্ববিরোধিতা থাকতে পারবে না। অন্য কথায়, একটি আইন তখনই স্ববিরোধী হয়, যখন তাতে মানবাচরণের জন্য কোনো যুক্তিসম্মত দিক-নির্দেশনা থাকে না।

এ বৈশিষ্ট্যটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দেয়া একটি সংজ্ঞার সঙ্গে এর একটি জাতীয় নিরাপত্তা নীতির তুলনামূলক বিশ্লেষণে যাচাই করে দেখা যাক। সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের প্রবক্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একটি পুস্তিকায় সন্ত্রাসবাদের একটি আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এ সংজ্ঞাটি হলো: ভীতিপ্রদর্শন, বলপ্রয়োগ বা ধীরগতিতে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যেমে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সহিংসতার ব্যবহার কিংবা কোনো রাজনৈতিক,ধর্মীয় বা আদর্শিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য সহিংসতার হুমকি প্রদানই হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ। কিন্তু এই সন্ত্রাসবাদের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র কাউন্টার ইন্সারজেন্সী নামক এক ধরনের রাষ্ট্রীয় নীতি গ্রহণ করে তা-ও কিন্তু তাদের সংজ্ঞায়িত সন্ত্রাসবাদের অনুরূপ। উদাহরণস্বরূপ, লাতিন আমোরিকায় জাতীয় নিরাপত্তা ডকট্রিন নামে প্রবর্তিত মার্কিন নীতির কথা বলা যায়। কেনেডী প্রশাসনে গৃহীত এ মার্কিন নীতির ভূমিকা সম্পর্কে কলাম্বিয়ার মানবাধিকার কমিটির স্থায়ী সদস্য আলফ্রেডো ভ্যাসকুয়েজ ক্যারিজোসা লিখেছেন, মার্কিন প্রশাসন আমাদের সেনাবাহিনীকে কাউন্টার ইন্সার্জেন্সী ব্রিগেডে পরিণত করেছে যা ডেথ স্কোয়াডের মতো নতুন কৌশলকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এ কর্মকান্ড কোনো বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য নয়, বরং অভ্যন্তরীণ শত্রুর বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ। এ নীতি আমাদের সমাজকর্মী, ট্রেড ইউনিয়নের সমর্থক, প্রচলিত ব্যবস্থার বিরোধী নারী-পুরুষ এবং সন্দেহজনক সাম্যবাদী চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে বৈধতা দিচ্ছে। এ তালিকায় আমার মতো মানবাধিকার কর্মীও আসতে পারে।

সুতরাং মার্কিন সরকারের দেয়া সংজ্ঞা অনুসারে, মার্কিন রাষ্ট্রীয় নীতি ও কর্মকান্ড নিরীক্ষিত হলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই একটি সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্রে পর্যবসিত হয়। এ পর্যবেক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রনীতিকে স্ববিরোধী বলে প্রতীয়মান করে।

অন্তর্নিহিত নৈতিকতার ষষ্ঠ উপাদানটি হচ্ছে, আইন কখনোই অসম্ভব কিছু দাবি করতে পারবে না। ফুলার মনে করেন,কঠোর বাধ্যবাধকতার নীতি অনেক সময় দোষ বা অভিপ্রায় ছাড়াই আইনসিদ্ধ বাধ্যবাধকতা আরোপ করে থাকে।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পর ২০০২ সালে মার্কিন বিচার বিভাগ এক অধ্যাদেশ জারি করে যাতে উল্লেখ ছিল: ‘যদি আপনারা কোনো শত্রু যোদ্ধাকে আটক করেন তাকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা যাবে না এবং রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী পাবার সুযোগ দেয়া হবে না। অপরদিকে, একজন যুদ্ধকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট শত্রু শিবিরে যুদ্ধরত যেকোনো মার্কিন নাগরিককে আটক করতে পারবেন এবং তাকে আইনজীবী পাওয়ার কোনো সুযোগ দেয়া হবে না।

এ দাবিটি নিতান্তই অসম্ভব। কারণ এটি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ লাভের মতো একটি অন্যতম মৌল মানবিক চাহিদাকে অস্বীকার করছে। এটি সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণায় স্বীকৃত একটি অন্যতম মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার। আইনের ক্ষেত্রে সর্বজনীনতা প্রয়োজন, এটি সরাসরি তাকে উপেক্ষা করছে। এটি এমন এক ধরনের কঠোর বাধ্যবাধকতার নীতি যা ব্যক্তির দোষ বা অভিপ্রায়কে খতিয়ে দেখার সুযোগ দেয় না। এ ধরনের কঠোরতা অমানবিকতার শামিল।

আইনের অন্তর্নিহিত নৈতিকতার সপ্তম মূলনীতিটি হলো, আইন ঘন ঘন পরিবর্তিত হওয়া উচিত নয়। যে আইন সহসাই পরিবর্তিত হয় তা মানব আচরণকে যথার্থ নির্দেশনা দানে ব্যর্থ হয়।

আইন তখনই বারবার পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, যখন তা সর্বজনীনতাকে প্রত্যাখ্যান করে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত এলিট শ্রেণীর প্রয়োজনে বিশেষ বিশেষ রাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে। যেমন, মনরো ডকট্রিনে লাতিন আমেরিকায় আধিপত্য, ট্রুম্যান ডকট্রিনে সারা বিশ্বের ওপর একক কর্তৃত্ব, আইনজেনহাওয়ার ডকট্রিনে মধ্যপ্রাচ্যের সম্পদের দখলদারিত্বের দিকটি স্থান পায়।

সবশেষে অন্তর্নিহিত নৈতিকতা প্রশাসনিক কর্মকান্ড ও আইনের মধ্যে সঙ্গতি রেখে চলার সুপারিশ করে। ফুলার বলেছেন, এ সঙ্গতি নানাভাবে বিনষ্ট হতে পারে। এগুলো হচ্ছে ভুল ব্যাখ্যা, আইনের অপ্রাপণীয়তা, আইন ব্যবস্থার সংহতি রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় দূরদৃষ্টির অভাব, উৎকোচ, কুসংস্কার, ঔদাসীন্য, নির্বুদ্ধিতা, ব্যক্তিগত ক্ষমতার চর্চা প্রভৃতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত ব্যক্তিগত ক্ষমতার চর্চা বা এলিট স্বার্থ রক্ষার জন্য আইনকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। অধিকাংশ সময়েই উৎকোচের বিনিময়ে প্রণীত এসব আইনে যথেষ্ট দূরদৃষ্টির অভাব থাকে এবং নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক বলে প্রতীয়মান হয়। যেমন, পিএনএসি ডকট্রিনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এখানে বিশ্বময় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বলিষ্ঠ ও তাত্ত্বিক নীতির প্রতি জোরালো সমর্থন অন্বেষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, পুরো বিশ্বের ওপর নিজেদের পছন্দমতো বিধিমালা রপ্তানি করা কিংবা প্রয়োজনে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়ার দর্শন এতে বাতলানো হচ্ছে।

উপর্যুক্ত পর্যালোচনা প্রমাণ করে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বললেও নিজে কখনোই আইনের শাসনের ধার ধারেনি। সাম্প্রতিককালে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা একচেটিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবাদাসে পরিণত হয়েছে। তাই আইনের ওপর বৃহৎ কর্পোরেশনগুলোর অন্যায় প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অন্যায় প্রভাবের বিরুদ্ধেই ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রীট’ আন্দোলন গড়ে উঠেছে। এ আন্দোলনের পটভূমিতে ছিল রাষ্ট্রসৃষ্ট অসমতা ও বৈষম্য। মন্দা চলাকালীন সময়ে দেখা গেছে, আপামর জনতার জীবনযাত্রার মান অতিমাত্রায় নেমে গেলেও শীর্ষ ধনীদের সম্পদ ও আয় বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে জোসেফ স্টিগলিজ মন্তব্য করেছেন,

“একটি অর্থনীতিতে মোট দেশজ উৎপাদন যতই বাড়ুক না কেন, তার সুফল যদি অধিকাংশ মানুষ ভোগ না করে, বিপুলসংখ্যক মানুষ যদি ক্রমবর্ধমান হারে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাহলে সেটি একটি ব্যর্থ অর্থনীতিএকদম মৌলিক বিবেচনায়। আর যে নীতির কারণে সমাজে নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে যায় বা অধিকাংশ মানুষের জীবনমানের অবনমন ঘটে সেটাও মৌলিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ নীতি।”

পুঁজিবাদের এ মৌলিক ত্রুটি আজকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার যৌক্তিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের মতোই আন্তঃরাষ্ট্রীয় দ্বদ্বকেও পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা উপেক্ষা করতে পারে না। আজকের বিশ্বের অধীশ্বর কর্পোরেট মনোপলিগুলোর ক্ষমতা ও আধিপত্যের লড়াইকে কেন্দ্র করে পুঁজিবাদ আরেক ধরনের সংকটের পথে এগোচ্ছে। তাই শোষক শ্রেণীর সঙ্গে শোষক শ্রেণীর দ্বদ্বও পুঁজির অভ্যন্তরীণ দ্বদ্বের একটি বিশেষ রূপ।

[ক্রমশ…]

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত