ইরাবতী,ইরাবতী.কম,purnendu pattrea,irabotee.com,bitasta ghoshal,copy righted by irabotee.com

পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতা

Reading Time: 2 minutes

হে সময়, অশ্বারোহী হও

বিরক্ত নদীর মতো ভুরু কুঁচকে বসে আছে আমাদের কাল। যাচ্ছি যাব, যাচ্ছি যাব এই গড়িমসি করে চূড়ো ভাঙা চাকা ভাঙা রথ যে রকম ঘাড় গুজে ধুলোয় কাতর, সে রকমই শুয়ে বসে আছে। খেয়াঘাটে পারাপার ভুলে-যাওয়া, নৌকার মতন, সময় এখন।

মনে হয় সময়ের পায়ে ফুটে গেছে দীর্ঘ পেরেক বা মনসার কাঁটা ছিড়ে গেছে স্ম্যান্ডেলের স্ট্র্যাপ কিংবা জুতোর গোড়ালি মনে হয় তার সব কোটপ্যান্ট ধোবার ভাটিতে হয়তো বা কোনও এক লেকা্যাল ট্রেনের হু হু ভিড়ে চুরি হয়ে গেছে পার্স, পার্সে ছিল অগ্রিম টিকিট।

প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে নিয়ে যাবে পাহাড়ের সোনালী চূড়োয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে আকাশের সিথি থেকে সিদুরের টিপ এনে দেবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে নক্ষত্রের ক্যামেরায় ছবি তুলে উপহার দেবে অ্যলবাম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে কলকাতায় এন দেবে শঙ্খের সাগর।

প্রতিশ্রুতি যত্রতত্র ছড়াবার ছিটোবার কথ, থুতু, মলমুত্র নয় প্রতিশ্রুতি লাল নীল পতাকার ব্যতিব্যস্ত ওড়াউড়ি নয় প্রতিশ্রুতি প্রেসনোট, দৈববাণী, দেয়ারের লিপিচিত্র নয়। প্রতিশ্রুতি শীতের চাদর প্রতিশ্রুতি ভাঙা চালে খড় প্রতিশ্রুতি সাদা ভাত, ভাতে দুধ, দুধে ঘন সর প্রতিশ্রুতি চেতনার স্তরে স্তরে সপ্তসিন্ধুজলের মর্মর।

হে সময়, হে বিকলাঙ্গ বিভ্রান্ত সময় কানা কুকুরের মতো এটো-কাটা ঘাঁটাঘাঁটি ভুলে পৃথিবীর আয়নায় মুখ রেখে জামা জুতো পরে সূর্যের বল্লম হাতে, একবার অশ্বারোহী হও।

   

মাঝে মাঝে লোডশেডিং 

মাঝে মাঝে লোডশেডিং হোক। আকাশে জ্বলুক শুধু ঈশ্বরের সাতকোটি চোখ বাকী সব আলকাতরা মাখুক। আমরা নিমগ্ন হয়ে নিজস্ব চশমায় আর দেখি না কিছুই সকলে যা দেখে তাই দেখি। আকাশের রঙ তাই হয়ে গেছে চিরকালে নীল। বাতাস কি শাড়ি পরে কারো জানা নেই।

মাঝে মাঝে লোডশেডিং হোক। সাদা মোমবাতি জ্বেলে তোমাকে সম্পূর্ণ করে দেখি। নারীকে বাহান্ন তীর্থ বলেছে শুনেছি এক কবি। আমি তার গর্ভগৃহ, সরু সিড়ি, সোনার আসন চন্দনবটিতে থাকে কতটা চন্দন দেখে গুনে গুনে মেপে দেখে তবেই পাতাবো মৌরীফুল।

   

সরোদ বাজাতে জানলে

আমার এমন কিছু দুঃখ আছে যার নাম তিলক কামোদ এমন কিছু স্মৃতি যা সিন্ধুভৈরবী জয়জয়ন্তীর মতো বহু ক্ষত রয়ে গেছে ভিতর দেয়ালে কিছু কিচু অভিমান ইমনকল্যাণ। সরোদ বাজাতে জানলে বড় ভালো হতো। পুরুষ কিভাবে কাঁদে সেই শুধু জানে।

কার্পেটে সাজানো প্রিয় অন্তঃপুরে ঢুকে গেছে জল। মুহুর্মুহু নৌকাডুবি, ভেসে যায় বিরুদ্ধ নোঙর। পৃথিবীর যাবতীয় প্রেমিকের সপ্তডিঙা ডুবেছে যেখানে সেখানে নারীর মতো পদ্ম ফুটে থাকে। জল হাসে, জল তার চুড়িপরা হাতে, নর্তকীর মতো নেচে ঘুরে ঘুরে ঘাগরার ছোবলে সব কিছু কেড়ে নেয়, কেড়ে নিয়ে ফের ভরে দেয় বাসি হয়ে যাওয়া বুকে পদ্মগন্ধ, প্রকাশ্য উদ্যন। এই অপরূপ ধ্বংস, মরচে-পড়া ঘরে দোরে চাঁপা এই চুনকাম দরবারী কানাড়া এরই নাম?

সরোদ কাজাতে জানলে বড় ভালো হতো। পুরুষ কীভাবে বাঁচে সেই শুধু জানে।

   

বুকের মধ্যে বাহান্নটা আলমারি 

বুকের মধ্যে বাহান্নটা মেহগনি কাঠের আলমারি। আমার যা কিছু প্রিয় জিনিস, সব সেইখানে। সেই সব হাসি, যা আকাশময় সোনালী ডানার ওড়াওড়ি সেই সব চোখ, যার নীল জলে কেবল ডুবে মরবার ঢেউ সেই সব স্পর্ম, যা সুইচ টিপলে আলোর জ্বলে ওঠার মতো সব ঐ আলমারির ভিতরে।

যে সব মেঘ গভীর রাতের দিকে যেতে যেতে ঝরে পড়েছে বনে তাদের শোক, যে সব বন পাখির উল্লাসে উড়তে গিয়ে ছারখার হয়েছে কুঠারে কুঠারে তাদের কান্না, যে সব পাখি ভুল করে বসন্তের গান গেয়েছে বর্ষার বিকেলে তাদের সর্বনাশ সব ঐ আলমারির ভিতরে। নিজের এবং অসংখ্য নরনারীর নীল ছায়া এবং কালো রক্তপাত নিজের এবং চেনা যুবক-যুবতীদের ময়লা রুমাল আর বাতিল পাসপোর্ট নিজের এবং সমকালের সমস্ত ভাঙা ফুলদানির টুকরো সব ঐ বাহান্নটা আলমারির অন্ধাকার খুপরীর থাকে-থাকে, খাজে-খাজে বুকের মধ্যে।

           

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>