Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

প্রবন্ধ: জাপানিদের চোখে রবীন্দ্রনাথ । প্রবীর বিকাশ সরকার

Reading Time: 7 minutes

১৯৮৭ সালে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন জাপানের সমুদ্রবন্দরনগরী কোবের হিরোইউকি ইমামুরা। তখন তিনি ২৭ বছরের তরুণ। জাপানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে ১৯৮২ সালে বহু শ্র“ত রবীন্দ্র গবেষক অধ্যাপক কাজুও আজুমায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম যান এবং প্রেমে পড়ে যান শান্তিনিকেতন ও কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের। আবার যান ১৯৮৭ সালে তুলনামূলক দর্শনশাস্ত্রে এমএ সম্পূর্ণ করে রবীন্দ্রনাথের ধর্মচেতনা নিয়ে গবেষণা করেন। রবীন্দ্রনাথকে পুরোপুরি অনুধাবনের জন্য বাংলা ভাষা শিখেছিলেন। তারপর যতই পড়েছেন রবীন্দ্রনাথ ততই তাকে বিস্মিত করেছে! মনে হচ্ছে পরে তিনি গবেষণামূলক একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যার সন্ধান পাচ্ছি ইন্টারনেটে। প্রবন্ধটি The Western Response to Rabindranath TagoreÑ The Myth of Tagore as a Mystic-Prophet?1998). তিনি মিস্টিক তথা আধ্যাত্মীক রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পেয়েছিলেন।

প্রকৃতপক্ষে বিগত শত বছর ধরে রবীন্দ্রনাথকে বিশিষ্ট জাপানিরা বিভিন্নভাবে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধপূর্বকালে ঋষিকবি, দার্শনিক, প্রকৃতি বন্দনার কবি, ধর্মীয় আধ্যাত্মীক তথা মিস্টিক কবি আবার জাতীয়তাবাদী কবি হিসেবেও ভাবতে সচেষ্ট হয়েছেন। এদের মধ্যে শতবর্ষী স্বনামধন্য চিকিৎসক ও লেখক ডা. হিনোহারা শিগেআকি একমাত্র ব্যতিক্রম যিনি কবিকে ‘প্রকৃতিবিজ্ঞানী’ বলে অভিহিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ভেবেছেন, সান্নিধ্যে এসেছেন এবং লিখেছেন অন্যান্য জাতির মধ্যে জাপানিরাই সবচেয়ে বেশি বিস্ময় জাগায়। তাকে স্বচক্ষে দেখেননি কিন্তু লেখা পাঠ করে বুঝতে চেষ্টা করেছেন, মতামত, অভিমত লিখে রেখে গেছেন সেসব দলিলপত্রের সংখ্যাও সুপ্রচুর। যত খুঁজে চলেছি ততই বেরিয়ে আসছে। গত বছর দু-তিনটি রবীন্দ্রবিষয়ক সংকলন নিয়ে এই পাতায় আলোচনা করেছিলাম। এবার ৬-৭টি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মর জন্য যেগুলো আর খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। ১. ‘কাতেই শুউহোও’ পত্রিকা : একাধিক জায়গায় তার বক্তৃতা শুনে তৎকালীন জাপানের কতিপয় অগ্রবর্তী এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি তাকে তাদের প্রতিষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অধ্যাপক ড. নারুসে জিনজোও (১৮৫৮-১৯১৯) আমেরিকায় উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত খ্রিস্টান শিক্ষাবিদ এবং নারীশিক্ষার অগ্রদূত ১৯০১ সালে মেয়েদের জন্য সর্বপ্রথম সর্ববৃহৎ বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিহোন জোশি বিশ্ববিদ্যালয় বা জাপান মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১৬ সালে ওই সময় তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য। তিনি কবিকে আমন্ত্রণ জানালেন বক্তৃতা করার জন্য নাগানো জেলার কারুইজাওয়া নামক স্থানে অবস্থিত তার বিশ্ববিদ্যালয় শাখায়। রবীন্দ্রনাথ পাহাড়ঘেরা সবুজ প্রাঙ্গণে ছয় দিন অবস্থান করেছিলেন। সেখানে তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন, ধ্যান করেছেন এবং ছাত্রীদের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে মতবিনিময় করেছেন। ওই সালেই তৎকালীন অগ্রসর পত্রিকা ‘কাতেই শুউহোও’ বা ‘দি হোম ইউকলি’তে অধ্যাপক নারুসে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে দুটি নিবন্ধ লিখেন ‘তাগো-রু শি’ বা ‘টেগোর মহাশয়’ (১৪ জুলাই, ১৯১৬) এবং ‘তাগো-রু শিসেই অ কারুইজাওয়া নি মুকায়েতে’ বা ‘ঋষিকবিকে কারুইজাওয়ায় স্বাগত জানাতে’ (২৫ আগস্ট) নামে। এই পত্রিকাটিতে রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতা ‘স্পিরিট অব জাপান’ জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। ২০১১ সালে য়োকোহোমাস্থ ওওকুরায়ামা কিনেনকান ভবনে এই পত্রিকাটির কয়েকটি পৃষ্ঠা খুঁজে পাই। এতে প্রকাশিত অধ্যাপক নারুসে ‘তাগো-রু শি’ নিবন্ধে আমাদের জানাচ্ছেন : রবীন্দ্রনাথের ধর্ম ব্রাহ্মধর্মে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু তার গন্তব্যে সমস্ত ধর্মের সমন্বয় ঘটেছে একটি আদর্শে সেটা হল সম্প্রীতি। অধ্যাপক নারুসের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথ ১৯২৪ এবং ১৯২৯ সালেও বক্তৃতা করেছেন। সন্দেহ নেই যে, এশিয়া মহাদেশে আধুনিক নারীশিক্ষা বিকাশের লক্ষ্যে সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি রবীন্দ্রনাথকে খুব আকৃষ্ট করেছিল। এই মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়টি এখনও প্রাচ্যের মধ্যে অগ্রসর একটি প্রতিষ্ঠান। ২. ‘টেগোর’ প্রথম সংখ্যা বুলেটিন : ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর আহ্বানে জাপানেও ব্যাপক কর্মসূচি গৃহীত হয়েছিল। জাপানে এই অনুষ্ঠান সম্পর্কিত প্রধান যোগাযোগের দায়িত্ব বর্তেছিল শান্তিনিকেতনস্থ রবীন্দ্রসদনের পরিচালক ক্ষিতীশ রায়ের ওপর। শুধু রাজধানী টোকিও নয়, ওসাকা, কোবে, নাগাসাকি শহরেও উদ্যোগ নেয়া হয়। এসব জায়গা থেকে বিভিন্ন প্রকাশনাও প্রকাশিত হয়েছিল কিন্তু কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে সংরক্ষণের অভাবে। তবু বহু খোঁজাখুঁজির পর কিছুউদ্ধার করা যাচ্ছে। রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে নাগাসাকিতে তেমনি ‘নাগাসাকি তাগো-রু কেনকিউকাই’ বা ‘নাগাসাকি টেগোর রিসার্চ সোসাইটি’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫৯ সালেই। এর উদ্যোক্তা ও প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন নাগাসাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়ামাগুচি কিয়োশি। তিনি ছিলেন অসম্ভব রবীন্দ্রভক্ত। ১৯৫৯ সালে টোকিওতে যে টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয়েছিল তারও সক্রিয় সদস্য ছিলেন তিনি। ৩৬ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থাকৃতির সংকলনে প্রথমেই রয়েছে উপনিষদ থেকে উদ্বৃত একটি স্তোত্র। নিবন্ধ লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথের চোখে তাইকান/ক্ষিতীশ রায়, তিনি জাপানি খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী য়োকোয়ামা তাইকান সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের অনুভূতি কী ছিল ব্যাখ্যা করেছেন। লেখাটি ইংরেজি থেকে জাপানিতে অনুবাদ করেছেন অধ্যাপক ইয়ামাগুচি। পরবর্তী গবেষণাধর্মী লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লুইগি পিরানদেল্লো/অধ্যাপক ইয়ামাগুচি, তিনি ইতালির নোবেলজয়ী কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার লুইগি পিরানদেল্লোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনা করেছেন। বিরলতম আত্মা/কেন তাগাওয়া, কাঠখোদাইশিল্পী তাগাওয়া জানাচ্ছেন, ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ জাপানে আসার পথে চীনের সাংহাই মহানগরে জাপানিদের বিদ্যালয়ে বক্তৃতা করেছিলেন প্রবাসী জাপানি ও ভারতীয়দের উদ্দেশে। তখন সেই স্কুলের ছাত্র হিসেবে কবিকে স্বচক্ষে দেখেন এবং মুগ্ধ হয়ে পড়েন। পরবর্তীকালে জাপানে ফিরে তার রচনাগুলো পড়ে শান্তিনিকেতনে যাওয়ার ইচ্ছেতে শিল্পী সমিতি গঠন করে চিত্র বিক্রির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহে নিযুক্ত হন। কিন্তু ১৯৩৭ সালে চীন-জাপান যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে আর স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। তারপর তো ১৯৪১ সালে বেধে গেল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। পরাজিত বিধ্বস্ত দরিদ্র কঠোর জীবনযাপনে পর্যবশিত হয়েও রবীন্দ্রনাথকে ভুলে যাননি তাগাওয়া, কবিকে তিনি তার জীবনের ঝর্ণা বলে অভিহিত করেছেন। সাকায় রবীন্দ্রনাথ/মাসাহিসা য়োশিমুরা, গ্রন্থাগারিক তার স্মৃতিচারণে বলছেন, ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ওসাকা শহরে এসেছিলেন এবং তখন একজন ভারতীয় তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এসসি সরকার কোম্পানিতে কবিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। যথারীতি কবি এসেছিলেন তখন সেখানে তরুণ আমি কর্মরত ছিলাম এবং কবির সান্নিধ্য লাভ করেছিলাম। সৌমশান্ত বুদ্ধিদীপ্ত ঋষিকবিকে আর ভুলতে পারিনি। সংকলনটিতে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি থেকে একাধিক কবিতা অনুবাদ করেছেন যথাক্রমে শিরো ফুকুচি, উচি মাৎসুও, নাগাও জিনবো ও ইয়ামাগুচি কিয়োশি। সংকলনের শেষ লেখাটি অধ্যাপক ইয়ামাগুচি তার এক ভারতীয় বন্ধু অধ্যাপক তমালকে দীর্ঘ চিঠি লিখেছেন- সেখানে ভারতীয় সমাজ, শিক্ষা, ইতিহাস এবং রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গও এসেছে। ৩. (ক) টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন ফর রবীন্দ্রনাথ টেগোর সেন্টেনারি জয়ন্তী বুলেটিন-১ তাগো-রু তানজোও হিয়াকু নেন সাই কিনেন কাইহোও ইচি : একই নামে দুটো সংকলন প্রকাশিত হয়েছে ১৯৫৯ সালের জানুয়ারি মাসে। কিন্তু কোনোটি আগে বলা যাচ্ছে না। দুটোই জাপানি ও ইংরেজি ভাষায় এবং মিল-অমিল বিদ্যমান। কিন্তু দুটোই মহামূল্যবান, কারণ দুর্লভ সব তথ্য ও আলোকচিত্র সন্নিবেশিত। দুটো সংগ্রহ করেছি যথাক্রমে টোকিওর উয়েনো শহরে অবস্থিত তাইকান স্মৃতিজাদুঘর এবং য়োকোহামাস্থ ওওকুরায়ামা কিনেনকান ভবন থেকে। (ক) চিহ্নিত বুলেটিনের পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪৮ এবং গ্রন্থাকৃতির। প্রচ্ছদে প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী কাৎসুতা শোওকিনের অংকিত চিত্র ব্যবহৃত হয়েছে। সূচিপত্র অনুযায়ী মাত্র দুটি লেখা ইংরেজিতে আর সব জাপানি ভাষায়। প্রথম লেখাটি রবীন্দ্রনাথের দুটি বাণী জাপানি ভাষায়, কিন্তু কোন গ্রন্থ থেকে সংকলিত তা উল্লেখ নেই। প্রধানত চারটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে রচনাগুলোকে। প্রথম ভাগ ‘টেগোর স্মরণে’ বিভাগে লিখেছেন : টেগোরকে স্মরণ করি/ওওকুরা কুনিহিকো, টেগোরের অন্তমুর্দ্রা/কুসানো শিনপেই, সেই সময়কার কথা/হারাদা মিচিও, প্রচ্ছদ ও ছবি/কাৎসুতা শোওকিন, ইজুরা এবং টেগোর/ওকাকুরা কোশিরোও। ওওকুরা কুনিহিকো ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বন্ধু, তিনি ছিলেন একাধারে ব্যবসায়ী, লেখক, গবেষক, আধ্যাত্মীক চিন্তক, সমাজসেবী এবং তোয়ো বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য। তার টোকিওর বাসভবনে কবি ১৯২৯ সালে প্রায় তিন সপ্তাহ আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। স্বদেশে ফিরে গিয়ে তাকে স্বস্বাক্ষরিত প্রায় দুইশ’ গ্রন্থ এবং একটি ভারতীয় নৌকা উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। সেগুলো এখনও য়োকোহামার ওওকুরায়ামা কিনেনকান ভবনে সংরক্ষিত আছে। গ্রিক হেলেনিক শৈলীতে নির্মিত নয়নাভিরাম বিশাল প্রাসাদোপম এ ভবনটি ছিল কুনিহিকোর নতুন বাসভবন এবং আধ্যাত্মীক গবেষণা কেন্দ্র। কবির জন্মশতবর্ষে গঠিত মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান দফতর ও রবীন্দ্রগবেষণা কক্ষও এখানেই স্থাপিত হয়েছিল। স্মৃতিচারণের শেষ পর্যায়ে তিনি বলছেন, ‘৩০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে তিনি (কবি) রেখে গেছেন সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিপুল মহৎ কীর্তিসমূহ। আমরা খুব শিগগির তার জš§শতবর্ষ উদযাপন করতে যাচ্ছি, তাই এই ক্ষণে আমি নিজেকে গভীরভাবে সেই দৈব-অদৃশ্যের আশীর্বাদপুষ্টদের একজন বলে মনে করি, যিনি কবির সঙ্গে আমার সাক্ষাতের সুযোগ করে দিয়েছেন।’ প্রখ্যাত কবি কুসানো শিনপেই যখন ২৩ বছরের হংকং শহরে কবিকে দেখেছিলেন ১৯২৪ সালে। সেই স্মৃতির ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। হারাদা মিচিও ছিলেন ১৯২৯ সালে জাতীয় ডায়েট (সাংসদ) গ্রন্থাগারের গ্রন্থগারিক এবং কুনিহিকোর øেহধন্য। কুনিহিকোর বদৌলতে কবির সেবা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তখন ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল দু’জনের মধ্যে। স্বদেশে ফিরে রবীন্দ্রনাথ সেই বছরের শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ডিসেম্বর মাসের ২২ তারিখযুক্ত একটি শুভেচ্ছাপত্র পাঠান। তাতে লিখেছিলেন : To Harada san, my salutation is to him who knows me imperfect and loves me. স্বনামধন্য অধ্যাপক ওকাকুরা কোশিরোও রবীন্দ্রসুহৃদ ওকাকুরা তেনশিনের পৌত্র, তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রথম জাপান ভ্রমণের সময় সদ্যপ্রয়াত বন্ধুবর তেনশিনের বাসভবনে বিধবা পতœী ও আÍীয়বর্গের সান্নিধ্যে কাটিয়েছিলেন সেই বিষয়ে কিছ– কথা লিখেছেন। দ্বিতীয়ভাগ ‘টেগোরের সঙ্গে সমব্যথী’তে লিখেছেন, টেগোরকে নিবেদিত/কাতায়ামা তোশিহিকো, ট্রেভির ঝর্ণা গীতাঞ্জলি/ইয়ামাগুচি কিয়োশি, টেগোর এবং চীন/সাকামোতো তোকুমাৎসু, টেগোর এবং বৌদ্ধধর্ম/ইনাজু কিজোও। কাতায়ামা তোশিহিকো একজন বিখ্যাত ফরাসি সাহিত্য বিশেষজ্ঞ এবং রবীন্দ্রগবেষক। রবীন্দ্রনাথের ৭০তম জš§বর্ষে প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থ ‘গোল্ডেন অব টেগোর’ এ তার একটি রচনা গ্রন্থিত হয়েছে। বর্তমান নিবন্ধে তিনি এক জায়গায় বলছেন, ‘বিশেষ করে আমি মনে করি রবীন্দ্রনাথের অংকিত নারীচরিত্র আমাদের হৃদয়ে থেকে যাবে- মর্যাদাবাহী অন্তরমথিত সঙ্গীতময় নারীর ছাপমূর্তি ভুলে যাওয়া অসম্ভব।’ ইতালির রোমে বেড়াতে গিয়ে ‘গীতাঞ্জলি’ খুঁজে পেয়ে সেটা পড়ার পর অন্তরের মধ্যে আশ্চার্য এক অনুভূতি সঞ্চারিত হয় অধ্যাপক ইয়ামাগুচির। ‘গীতাঞ্জলি’ পাঠ করে তার মনে হয়েছে, গীতাঞ্জলি হচ্ছে বিশ্বখ্যাত ট্রেভির ঝর্ণা, যা শান্তির প্রতীক। অধ্যাপক সাকামোতো চীনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক বিষয়ে জানাচ্ছেন, ‘ভারতের জাতীয়তাবাদে গণতান্ত্রিক রবীন্দ্রনাথের অনুমান ও অগ্রধারণায় বর্তমান চীন ও ভারতের প্রবৃদ্ধি ধরা পড়েছিল।’ অধ্যাপক ইনাজু কিজো তার নিবন্ধের এক জায়গায় বলছেন, ‘টেগোরের ধর্ম-সংক্রান্ত মানসিক জাগরণ অবিশ্বাস্যরকম দ্রুতই ঘটেছিল। জীবনস্মৃতিতে ২০ বছরের সময় এক সকালের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে তিনি বুদ্ধদেবের প্রতি নিবেদিত হন তখন থেকেই তার নতুন জীবনের শুরু।’ তৃতীয় ভাগ ‘তরুণ প্রজšে§র আলো’তে লিখেছেন, টেগোরের সন্নিকটে/মোরিমোতো তাৎসুও, টেগোরের থেকে শিখতে চাই/আসানো কোওসুই, টেগোর এবং আমি/ইয়ামাজাকি সেইজোও। টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের মিশন/আরাই কান, ওওকুরায়ামার টেগোর গবেষণা কক্ষ, রবীন্দ্রনাথের দুটি কবিতার দুটি অংশ/ইয়ামামুরা শিজুকা। অধ্যাপক মোরিমোতো তাৎসুও একজন স্বনামধন্য রবীন্দ্রগবেষক নিবন্ধের এক জায়গায় মন্তব্য করেছেন, “টেগোর বর্তমানে ভারতে ‘গুরুদেব’ অর্থাৎ ‘শিক্ষক’ হিসেবে শ্রদ্ধার পাত্র, কিন্তু তিনি ভবিষ্যতের মানবজাতির শিক্ষক হিসেবে পরিগণিত।” চতুর্থ ভাগ ‘শান্তিনিকেতনে অবস্থানকালে’ লিখেছেন, শান্তিনিকেতনে থেকে/শিনইয়া কাসুগাই, গুরু টেগোরকে স্মরি/ওতানি য়োশিমি, বনবিদ্যালয় স্মরণে/ওবারা কুনিয়োশি। অধ্যাপক শিনইয়া কাসুগাই রবীন্দ্রগবেষক এবং বিশ্বভারতীর প্রাক্তন শিক্ষক, তিনি উক্ত প্রবন্ধে শান্তিনিকেতন সম্পর্কে বহু তথ্য দিয়েছেন, যা জাপানিরা জানে না বললেই চলে। ওবারা কুনিয়োশি জাপানের স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ এবং তামাগাওয়া গাকুয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য। তিনি ছিলেন গভীরভাবে রবীন্দ্রভক্ত এবং তার প্রতিষ্ঠানের প্রথম দিকে শান্তিনিকেতনের আদলে একটি সবুজ শিক্ষালয় গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। শান্তিনিকেতন ভ্রমণ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু পারেননি। এ ছাড়া এই সংকলনে আছে কীভাবে টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হল তার ইতিবৃত্ত। আর আছে শিক্ষাবিদ ওবারা কুনিয়োশির বনবিদ্যালয় এবং চিত্রশিল্পী কাৎসুতা শোওকিনলিখিত প্রচ্ছদ ও চিত্র লেখাটির ইংরেজি অনুবাদ ও সমিতির বিভিন্ন সংবাদ। এই সংকলনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের তিনটি দুর্লভ চিত্র এবং কাৎসুতাকে উপহার হিসেবে প্রদত্ত বিখ্যাত ‘ঔম’ কবিতার ফটোচিত্র। ৪. (খ) টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন ফর রবীন্দ্রনাথ টেগোর সেন্টেনারি জয়ন্তী বুলেটিন-১ : ২৪ পৃষ্ঠার বুলেটিনে ক-এর পুনরাবৃত্তি আছে এতে। এটা সম্পাদনা করেছেন অধ্যাপক কিজো ইনাজু এবং ১ জানুয়ারি ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত। তবে নতুন যা আছে তাহল, ইংরেজিতে টেগোর মেমেরিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের প্রস্তাবিকা অর্থাৎ কী কী কাজ করবে সমিতি ভবিষ্যতে তার বিবরণ। টেগোর স্মরণে লিখেছেন ওওকুরা কুনিহিকো অনুবাদ করেছেন জাপানি থেকে অধ্যাপক ইয়ামাগুচি কিয়োশি। অধ্যাপক ইয়ামাগুচি পূর্বে লিখিত ট্রেভির ঝর্ণা গীতাঞ্জলি জাপানি থেকে নিজেই অনুবাদ করেছেন। আর আছে রবীন্দ্রনাথের দুটি দুর্লভ আলোকচিত্র। ৫. ‘শিসেই তাগো-রু তো কারুইজাওয়া’ মিনি বুকলেট : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমৃত্যু ভক্ত ছিলেন অহিংস মতবাদে বিশ্বাসী মাদাম তোমি কোরা (১৮৯৬-১৯৯৩)। তিনি ছিলেন একাধারে মনস্তত্ত্ববিদ, লেখক, গবেষক, অনুবাদক, রাজনীতিবিদ, নারীমুক্তি আন্দোলনের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নেত্রী, দু’বার ডায়েট (সাংসদ) সদস্য এবং জাপান টেগোর অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম সভাপতি (অধ্যাপক কাজুও আজুমা সাধারণ সম্পাদক)। ১৯১৬ সালে যখন তিনি জাপান মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তখন রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতা শোনেন কারুইজাওয়া ক্যাম্পাসে। সেই থেকে তিনি ছিলেন রবীন্দ্রঅন্তপ্রাণ। রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী আরও চারবার জাপান ভ্রমণে তিনি ছিলেন দোভাষী এবং তত্ত্বাবধায়ক। তিনি রবীন্দ্রনাথের অনেক রচনা ইংরেজি থেকে জাপানিতে অনুবাদ করেছেন, কবিকে নিয়ে বিস্তর লিখেছেন। শান্তিনিকেতনে ছুটে গিয়েছেন দু’বার। তার বাড়ির নাম রেখেছিলেন ‘শান্তিনিকেতন’ নামে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরও তিনি ছিলেন রবীন্দ্রপ্রচারে সর্বদা সক্রিয়। ১৯৮১ সালে রবীন্দ্রনাথের ১২০তম জš§বার্ষিকীতে নাগানো জেলার কারুইজাওয়াতে অবস্থিত মাউন্ট আসামার পাদদেশের নির্জন সবুজভূমিতে কবির একটি আবক্ষ স্মারক মূর্তি স্থাপন করেন ‘জিনরুই ফুছেন’ বা ‘যুদ্ধহীন মানবজাতি’ নামে দু’জনের স্মৃতিকে জাগরুক রাখার জন্য। এটাই জাপানে গুরুদেবের প্রথম স্মারকমূর্তি। এ উপলক্ষে অনাড়ম্বর একটি অনুষ্ঠানে বিতরণ করা হয়েছিল স্বল্পসংখ্যক ৮ পৃষ্ঠাবিশিষ্ট একটি স্মারক বুকলেট। এটাতে এখানে কবির ধ্যান করা, কবিতা লেখা, বক্তৃতা করা, প্রকৃতিদর্শন সবই সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত আছে। ৬. মাসিক ‘রেনবোও’ সাহিত্য কাগজ : জাপানের প্রসিদ্ধ বন্যপাখি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা পাখি বিশেষজ্ঞ নাকানিশি গোদোও (১৮৯৫-১৯৮৪)। তিনি আরও একাধিক গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি কবি, গীতিকার, প্রায় ৫০টি গ্রন্থ রচয়িতা এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকে ভূষিত। তিনি ছিলেন অসাধারণ রবীন্দ্রভক্ত। ১৯২৯ সালে কবি যখন জাপানে নাকানিশি তখন ৩৪। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে সক্ষম হন এক ইতালি দম্পতির মাধ্যমে। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতেই ব্যস্ততম কবির সঙ্গে ৫৫ মিনিট নিভৃতে কথা বলার দুর্লভ সুযোগ পান এবং কবির একটি আবক্ষ আলোকচিত্রে স্বাক্ষর গ্রহণ করেন। কবিকে নিয়ে একটি ইংরেজি কবিতা ‘এ সং অব হোলি ল্যান্ড’ লিখে উপহার দিলে কবি অত্যন্ত খুশি হন এবং নিজেই পাঠ করেন। পরে আরও দুটি ইংরেজি কবিতা কবিকে নিয়ে লিখে ভারতে প্রেরণ করেন এতখানি রবীন্দ্রনাথকে ভালোবেসেছিলেন তিনি। দ্বিতীয় কবিতাটির কয়েকটি লাইন এরকম : Oh! Tagore, the spirit of freedom shining upon the earth. As this flower much purifies the air, its silence prevailing about with her muteness and flavour, so you clarify everything by your personal presence. And in its air the hearty laudatory moment of mine pushes naturally from within. (Dedicated to R.Tagore) প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসহ সেই দীর্ঘ বর্ণনাই করেন ১৯৮২ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত মাসিক সাহিত্য সংকলন ‘রেনবোও’তে। নিজে প্রকৃতির পুজারি এবং পরিবেশবাদী ছিলেন বলে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিবন্ধনা ও মানবপ্রেমের বাণীসমৃদ্ধ কবিতা শুনে তিনি প্রভূত উদীপ্ত হয়েছিলেন। তাই তার অনুধাবনে রবীন্দ্রনাথ মূল্যায়িত হন এভাবে : ‘টেগোর ও গান্ধী দুজনেই বস্তুবাদ এবং যন্ত্রসভ্যতার হুমকির প্রতি জোরালোভাবে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। টেগোর মানুষের মানবতা ধ্বংসকারী যন্ত্রসভ্যতাকে ঘৃণা করতেন।’                  

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>