Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Rabindranath in the trap of fascism

পঁচিশে বৈশাখ স্মরণ: ফ্যাসিজমের ফাঁদে রবীন্দ্রনাথ । এমএ মোমেন

Reading Time: 7 minutes

রবীন্দ্রনাথের ‘মৌলবাদী ভক্ত’-রা রবীন্দ্র প্রশ্নে কোনো যুক্তি মানতে রাজি নন। তারা রবীন্দ্রনাথও যে মানুষ এবং দু-একটা রাজনৈতিক ভুল তিনিও করে ফেলতে পারেন এটা তাদের কাছে অবিশ্বাস্য। এমনই একটি ভুল নিয়ে তার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন রমাঁ রলাঁ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক বিশ্ব। নিজের ভুল বুঝে তিনি যখন খানিকটা মুখ খুললেন (সবটুকু খোলা সম্ভব ছিল না, কারণ মুসোলিনি সরকারের অর্থে পুত্র ও পুত্রবধূসহ ছয়-সাতজনের বহর নিয়ে তিনি ইতালি গিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়েছেন। সাগ্রহে মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং মুসোলিনির পাঠানো গ্রন্থাবলি তার প্রতিষ্ঠানের জন্য গ্রহণ করেছেন), চটে গেল ইতালির গণমাধ্যম। তখন পর্যন্ত সাহিত্যে এশিয়ার একমাত্র নোবেল লরিয়েট রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে খুব বাজে একটা রিপোর্ট করল। নিজের সম্পর্কে এমন বিব্রতকর বর্ণনা রবীন্দ্রনাথকে কখনো শুনতে হয়নি। রবীন্দ্রনাথ-মুসোলিনি অ্যাফেয়ারের কারণে ইউরোপের যেসব বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মী রবীন্দ্রনাথের ওপর চটে ছিলেন, তারাও মনে করলেন প্রতিবেদনটিতে বাড়াবাড়ি রয়েছে।

কল্যাণ কুণ্ডু’র ইংরেজি রচনা ‘মুসোলিনি অ্যান্ড ট্যাগোর’ থেকে উদ্ধৃত ভাষান্তরিত:

বোলোনিয়ার পত্রিকা অ্যাসালতো ২৮ আগস্ট রিপোর্ট করে:

ঠাকুর দুবার ইতালি এসেছেন এবং আমাদের ওপর তার কাব্যের গুরুভার চাপিয়ে দিয়েছেন আসলে একজন ঝানু অভিনেতা …এই কবি তার কবিতা ও শব্দের মতোই মধুমাখা, দাওয়াত পেয়ে ইতালি এসেছেন, ইতালি সরকার তার খরচ দিয়েছে, তাকে সাহায্য করেছে। তিনি ইতালির উচ্চ প্রশংসা করেছেন, ফ্যাসিবাদকে মহিমান্বিত করেছেন, মুসোলিনির প্রশংসাগীত গেয়েছেন… আজ আমরা দাবি করছি, ঠাকুরকে কবি হিসেবে আমরা আর পছন্দ করি না।

আর এরই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে রাজনৈতিক প্রচারণায় কাজে লাগানোর যে পরিকল্পনা মুসোলিনি করেছিলেন তা একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে গেল।

রবীন্দ্রনাথের এ অনিচ্ছুক স্খলন নিয়ে কল্যাণকুমার কুণ্ডুর ইতালি সফরে রবীন্দ্রনাথ ও মুসোলিনি প্রসঙ্গ (প্রকাশ: পুনশ্চ জানুয়ারি ২০০৯) গ্রন্থে বিস্তারিত লিখিত হয়েছে।

মুসোলিনির আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ইতালি গমন এবং দুবার এ স্বৈরশাসকের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সরাসরি সাক্ষাৎ বহু বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। রবীন্দ্রনাথও তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। কল্যাণ কুণ্ডুর ইংরেজি রচনা ‘মুসোলিনি অ্যান্ড ট্যাগোর’-এর অংশবিশেষ প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় অনূদিত হলো—

মুসোলিনি ও রবীন্দ্রনাথ

ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারী মুসোলিনির আমন্ত্রণ গ্রহণ করে গণস্বাধীনতার ঐকান্তিক সমর্থক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছিলেন। ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত এবং বিশেষ করে ইউরোপের বামঘেষাঁ সংবাদ মাধ্যমগুলোয় এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়।

শেষ পর্যন্ত চার্লস অ্যান্ড্রুর কাছে একটি দীর্ঘ চিঠি লিখে দাওয়াতের প্রেক্ষাপটের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। চিঠিটি ৫ আগস্ট ১৯২৬ দ্য ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান পত্রিকায় ছাপা হয়। পুনঃসম্পাদিত পত্রটি ভাষান্তরিত হয়ে ইউরোপের বেশ কয়েকটি সংবাদপত্রেও প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুসোলিনির আমন্ত্রণে ইতালি সফর ঘিরে যেসব ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে বেশ সময় লেগে যায়। এ নিবন্ধটিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন আদর্শ ও বিশ্বাসের দুই ব্যক্তিত্বের অসমীচীন সাক্ষাতের কাহিনী সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে।

জীবদ্দশায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুবার ইতালি সফর করেছেন। একবার ১৯২৫ আরেকবার ১৯২৬ সালে। যদিও ইংল্যান্ড সফরের আগে এবং ইংল্যান্ডে যাওয়ার সময় অনেকবারই তাকে ইতালি হয়ে যেতে হয়েছে।

ইতালিতে তার দ্বিতীয় সফরের সময় তিনি দুবার মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

১৯২০ দশকে ইতালির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

মুসোলিনি ক্ষমতায় এলেন অক্টোবর ১৯২২-এ। তার ব্যক্তিগত বাহিনী ‘ব্ল্যাক শার্টস’ নির্মমভাবে মুসোলিনির বিরোধিতাকারীদের দমন করে। শেষ পর্যন্ত সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয় এবং রাতারাতি ক্ষমতা খাটিয়ে সংবাদপত্রগুলোকে ফ্যাসিস্ট মুখপাত্রে পরিণত করা হয়। এ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আর্জেন্টিনা থেকে ফেরার পথে ১৯২৫ সালে রবীন্দ্রনাথ তার প্রথম ইতালি সফর শুরু করেন। কিন্তু সেবার রবীন্দ্রনাথ যেহেতু রোম সফর করেননি, সেজন্য ১৯২৫-এর সফরে মুসোলিনির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়নি। তবে রবীন্দ্রনাথের মিলানে অবস্থান সম্পর্কে মুসোলিনি অবহিত ছিলেন।

দ্বিতীয় সফর ১৯২৬

বিশ্বভারতীতে নিযুক্ত হওয়ার দাপ্তরিক পত্র অধ্যাপক ফোর্মিকি পেলেন ১৯২৫-এর জুলাইয়ে। তিনি আনন্দিত হন, কিন্তু প্রস্তাবিত বিনিময় কর্মসূচিতে একজন ইতালীয় পণ্ডিতের সংস্থান করার মতো অর্থ সংগ্রহ করতে না পারায় তিনি আশঙ্কিত ছিলেন অধিকন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি বইপত্রও ক্রয় করতে পারেননি। বিষয়টি অধ্যাপক ফোর্মিকির জন্য বিব্রতকর পরিস্থির সৃষ্টি করল। কারণ তিনি জানেন, তার আগে যেসব ইউরোপীয় অধ্যাপক ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে ঠাকুরের বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছেন, তারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ সেখানে দান করে এসেছেন। তহবিলের জন্য মরিয়া হয়ে এবং শেষ পর্যন্ত কোনো বিকল্প উৎস না পেয়ে সবকিছু ব্যাখ্যা করে ও সাহায্য চেয়ে তিনি মুসোলিনির কাছে চিঠি লিখলেন।

এর আগ পর্যন্ত মুসোলিনির ভারত প্রসঙ্গ বা ভারতসংক্রান্ত কোনো নীতিমালা ছিল না। ১৯২০ দশকের মাঝামাঝি ভারতের পরিস্থিতি ফ্যাসিস্ট প্রচারণার অনুকূলে ছিল। তার ব্যক্তিগত দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ফোর্মিকির চিঠি মুসোলিনির টেবিলে তখনই তার মনে একটি ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মুসোলিনি রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে রীতিমতো আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সম্ভবত তিনি মনে করেছিলেন, ঠাকুরের মতো মানুষ যেখানে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসহ শান্তি ও স্বাধীনতার প্রবক্তা, তিনি যদি তার ফ্যাসিস্ট শাসন সম্পর্কে কোনো ইতিবাচক মন্তব্য করেন, তা বাইরের বিশ্বে অত্যন্ত সমাদৃত হবে।

হঠাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো এত বড় মানুষ মুসোলিনির ফাঁদে ধরা পড়লেন, এর অন্য কারণও ছিল। রবীন্দ্রনাথ ইতালীয় ভাষা জানতেন না, ইতালির রাজনীতি সম্পর্কে ততটা জ্ঞাত ছিলেন না। কাজেই যখন ফোর্মিকির আবেদন মুসোলিনির ব্যক্তিগত দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তার কাছে পৌঁছল, তিনি উদারভাবে আবেদনের অনুমোদন দিলেন। মুসোলিনি নিশ্চিত ছিলেন, তার অনুমোদন টোপ হিসেবে কাজ করবে এবং ঠাকুর সে বড়শিতে ধরা পড়বেন।

অধ্যাপক ফোর্মিকির দুশ্চিন্তা দূর হলো। ১৯২৫ সালের নভেম্বরে তিনি বিশ্বভারতীতে যোগ দিলেন। সঙ্গে নিয়ে এলেন ইতালির একটি গোটা ধ্রুপদ পাঠাগার। সে সঙ্গে আরেকজন বিখ্যাত ভারতবিশারদ অধ্যাপক টুসির এক বছর অবস্থানও নিশ্চিত হলো, সব খরচের জোগান দিয়েছে ইতালি সরকার।

মুসোলিনির এ অভাবনীয় অভিব্যক্তিতে রবীন্দ্রনাথ এতই অভিভূত হয়ে পড়েন যে তখনই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাকে টেলিগ্রাম পাঠালেন। তিনি লিখলেন:

‘আমি আপনাকে আশ্বস্ত করতে চাই, আপনার প্রকাশিত এ সহানুভূতি ইতালীয় জনগণের প্রতিনিধির কাছ থেকে এসেছে, আর তা আমাদের দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্কের যোগাযোগের দোয়ার খুলে দেবে। আমাদের দুই দেশেরই সব সম্ভাবনা রয়েছে ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতাপূর্ণ মহান কোনো কিছু সৃষ্টির।’

ব্যক্তিগতভাবে রোমে হাজির হয়ে রবীন্দ্রনাথ তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাইলেন এবং অধ্যাপক ফোর্মিকিকে তার সফরের আয়োজন করতে বললেন। এমনিতেই প্রথম সফরকালীন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্বিতীয় একটি সফর হওয়ার কথা। অধ্যাপক ফোর্মিকি তার দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কবির পুনরায় ইতালি আসার ইচ্ছা কথা জানালেন। এবার মুসোলিনির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ার পথে আরো একধাপ এগিয়ে গেল। সরকার এবার সরাসরি কবির দিকে আতিথ্যের হাত বাড়িয়ে দিল।

রবীন্দ্রনাথ ৩০ মে ১৯২৬ রোম পৌঁছলেন। পরদিন অধ্যাপক ফোর্মিকিকে নিয়ে পালােজ শিকিতে মুসোলিনির অফিসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেন। এই প্রথম কবি এবং স্বৈরশাসক মুখোমুখি হলেন।

আলোচনার শুরুতে মুসোলিনি বললেন, আমি অনেক ইতালিয়ানের একজন, যে আপনার সব বই পড়েছে, অবশ্যই যেগুলো আমাদের ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার এ বক্তব্য স্পষ্টতই রবীন্দ্রনাথকে নাড়া দিল। বিশ্বভারতীর জন্য তার উদার উপহার এবং অধ্যাপক টুসির সেবাদানের ব্যয়ভার বহন করায় তিনি মুসোলিনিকে ধন্যবাদ দিলেন। মুসোলিনি জানতে চাইলেন, কবি কতদিন রোমে অবস্থান করার ইচ্ছাপোষণ করছেন।

মুসোলিনি যখন জানলেন পরের সপ্তাহে কবি ফ্লোরেন্স যেতে চান, তিনি জোর দিয়ে বললেন, কবি যেন কমপক্ষে এক পক্ষকাল রোমে থাকেন, বিশ্রাম করেন এবং নৈসর্গিক দৃশ্য অবলোকন করেন। পুনরায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বর্ধিত আলোচনার সময় রবীন্দ্রনাথ বললেন, কোন বিষয়ে ভাষণ দেবেন, তা তখনো ঠিক করেননি। মুসোলিনি তখনই জোর দিয়ে বললেন, ‘চিত্রকলা নিয়ে বলুন, চিত্রকলা নিয়ে বলুন।’

হোটেলে ফেরার পথে রবীন্দ্রনাথের কাছে মুসোলিনি সম্পর্কে তার কী ধারণা হয়েছে অধ্যাপক ফোর্মিকি জানতে চাইলেন। তিনি জবাব দিলেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই। তিনি একজন মহান ব্যক্তিত্ব। তার ওই মাথা অনেক তেজস্বী, আর তা আমাকে মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর বাটালির কথা মনে করিয়ে দেয়। তার ওপর লোকটির যে সরলতা তাতে যেভাবে তাকে নিষ্ঠুর স্বৈরাচার হিসেবে চিত্রিত করার প্রচেষ্টা করা হয়ে থাকে, তা বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে।’ রবীন্দ্রনাথের এ ভাষ্যের অংশবিশেষ পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়েছে। মুসোলিনির জীবনী লেখক অন্যত্র লিখেছেন,.. যাদের সঙ্গে তার কদাচিৎ দেখা হয়েছে, তার ব্যক্তিত্বের চৌম্বকশক্তি তাদের ওপরই বেশি কাজ করেছে। তার পরও এটা সত্য যে তিনি চাইলে যেকোনো সাক্ষাত্প্রার্থীকে মুগ্ধ করতে পারতেন। অনেকেই স্মরণ করেন কীভাবে তারা একসময় মুসোলিনির জাদুতে মুগ্ধ হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার ব্যতিক্রম নন। দুজনের মধ্যে সাক্ষাত্কারের এ হচ্ছে সংক্ষিপ্ত বিবরণী; এটি ইতালীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। 

রোম ত্যাগ করার আগে রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয়বার এবং শেষবার মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ১৩ জুন। এ সময় বৈঠক বেশ দীর্ঘ হয় এবং আরো আন্তরিক পরিবেশে তা অনুষ্ঠিত হয়।  রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘এক্সিলেন্সি, আপনিই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি অপবাদক্লিষ্ট মানুষ।’ মুসোলিনির মুখ থেকে জবাব বের হলো ‘আমি তা জানি, কিন্তু আমি কী করতে পারি?’

বৈঠক শেষ হলো। পরদিন রবীন্দ্রনাথ ফ্লোরেন্সের উদ্দেশে রোম ত্যাগ করলেন, তারপর তার তুরিন সফর। ২২ জুন ১৯২৬ ইতালির সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়ার সময় কবি মুসোলিনিকে টেলিগ্রাম করলেন, এক্সিলেন্সি আপনাকে এবং আপনার মাধ্যমে যে ইতালীয় জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়েছে, সেই জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিয়ে আপনার উদার আতিথেয়তা এবং আমার প্রতি আপনার সদয় অনুভূতির জন্যও ধন্যবাদ জানিয়ে ইতালি ত্যাগ করছি।

এ বার্তা প্রেরণ করে বরীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তার দল ট্রেনে সুইজ্যারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হলেন, ইতালিতে ফিরে আসা আর কখনই নয়।

ইতালি সফরের পরের সফর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুইজারল্যান্ডে রমাঁ রলাঁর সঙ্গে ভিলানভুতে কয়েক দিন কাটান। সেখানে রলাঁর সঙ্গে তার দীর্ঘ কথোপকথন চলে। রলাঁ ইতালির ফ্যাসিস্ট শাসনের কট্টর সমালোচক ছিলেন। ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে সংঘটিত নৃশংসতা, সহিংসতা এবং ক্রমবর্ধমান উত্পীড়নের একটি চিত্র রমাঁ রলাঁ রবীন্দ্রনাথের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করলেন এবং কার্যত তার ইতালি সফরের নিন্দাও করলেন।

কোনো সন্দেহ নেই, ইতালি সফরের শেষ দিকে রবীন্দ্রনাথ নিজেও এক ধরনের অস্বস্তিবোধ করতে শুরু করলেন। কিন্তু তিনি ইতালিতে যে সংবর্ধনা পেয়েছেন, এটি তাকে যতটা পুলকিত করেছে এবং মুসোলিনি যে কৌতূহল সৃষ্টি করেছেন তাতে ইতালি এসে তিনি যে ভুল করেছেন, এটি বিশ্বাস করতে চাইলেন না। তার ইতালি সফর নিয়ে কয়েকটি ইউরোপীয় সংবাদপত্রের তীর্যক মন্তব্য সম্পর্কে রলাঁ তাকে অবহিত করলেন।

রলাঁর কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ উভয় সংকটে পড়ে গেলেন এবং শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন সাক্ষাত্কারের মাধ্যমে একটি লেখা ফরাসি সংবাদপত্রে প্রকাশ করা হবে, যাতে তিনি তার সফরের অপছন্দের দিকগুলোর প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করবেন। রলাঁ প্যারিস থেকে তার বন্ধু ডুহামেলকে ডাকালেন, উদ্দেশ্য ফরাসি সংবাদপত্রে সাক্ষাত্কারটি প্রচারের ব্যবস্থা করা।

কিন্তু সে ব্যবস্থাটিও কাজে লাগল না। রবীন্দ্রনাথ যে লেখাটি তৈরি করলেন তাতে কোনোক্রমেই তার মন থেকে ইতালির সেই আমন্ত্রণকারীর দেয়া জাঁকালো সংবর্ধনার কথা ঝেড়ে ফেলতে পারছিলেন না। হতাশ রলাঁ ও ডুহামেল তাকে অনুরোধ করলেন ইতালি থেকে নির্বাসিত মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা না বলে কিছু লেখা বা বলার দরকার নেই।

জুরিখে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রফেসর সালভাদরির সাক্ষাত্কার এবং ভিয়েনায় মডিগলিয়ানির সঙ্গে সাক্ষাত্কার নির্ধারিত হলো। জুরিখে সালভাদরি অসুস্থতার কারণে কবির সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারেননি, কিন্তু তার স্ত্রী সে শূন্যতা পুষিয়ে দিলেন। আলোচনার শুরুতে অধ্যাপক পত্নী বললেন, ‘আপনি এত ভালো মানুষ, আপনি কেন ইতালিতে এলেন, যে ইতালি আজ সহিংসতা ও নিপীড়নের দেশ?’

রবীন্দ্রনাথ তার সফরের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করলেন। এক পর্যায়ে তিনি বললেন, ফ্যাসিস্ট আন্দোলনের সূত্রপাত কিংবা ফ্যাসিস্টদের কার্যক্রম সম্পর্কে পড়ার কোনো সুযোগই আমার হয়নি এবং এ ব্যাপারে আমার কোনো মতামতও ব্যক্ত করিনি। আসলে আমার অধিকাংশ সাক্ষাত্কারে সতর্কতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছি যে ফ্যাসিজমের পক্ষে বিপক্ষে কিছু বলার মতো যোগ্যতা আমার নেই। এ সম্পর্কে আমার পড়াশোনা নেই। আর মুসোলিনি সম্পর্কে বলতে গেলে অবশ্যই আমাকে বলতে হবে শিল্পী হিসেবে তিনি আমাকে আকৃষ্ট করেছেন, তার কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যক্তিত্ব আমাকে নাড়া দেয়। ইতালিতে যার সঙ্গেই আমার দেখা হয়েছে, প্রায় সবাই একবাক্যে আমাকে আশ্বস্ত করেছেন, নৈরাজ্য এবং সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়া থেকে মুসোলিনি ইতালিকে রক্ষা করেছেন।

অধ্যাপক পত্নী জোর দিয়ে বললেন, ‘এটা সত্য নয়। যারা ফ্যাসিস্টদের পক্ষে, এটা তাদের বক্তব্য। যারা ফ্যাসিবাদবিরোধী তাদের আপনার সঙ্গে দেখা করতে দেয়া হয়নি। আর্থিকভাবে ধ্বংস হওয়া থেকে মুসোলিনি ইতালিকে রক্ষা করেছেন, এটা সত্যি নয়। কিন্তু যা আমাদের অসন্তুষ্ট করেছে তা হলো আপনি অনিচ্ছায় হলেও ফ্যাসিবাদের সমর্থনে সহায়তা করেছেন। আমরা জানি, এটা আপনার অনিচ্ছাকৃত। আপনি এত ভালো যে ইচ্ছাকৃতভাবে ফ্যাসিবাদের সমর্থন করতে পারবেন না।’ সাত বছর আগে অমৃতসর হত্যাযজ্ঞের সময় যে মানসিক উত্তেজনা ও পীড়ন তিনি অনুভব করেছেন, ইতালির কাহিনী শুনে রবীন্দ্রনাথ স্পষ্টতই সেই মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে শুরু করেছেন।

ভিয়েনা থেকে তিনি তার বন্ধু চার্লস অ্যান্ড্রুর কাছে দীর্ঘ চিঠি লিখলেন, তার সফরের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করলেন। কেমন করে সাক্ষাত্কারপ্রার্থী সাংবাদিকদের ফাঁদে পড়েছেন, তা বললেন। আরো বললেন, তার সফরের কোনো পর্যায়েই ফ্যাসিবাদের কোনো প্রশংসা করেননি, তবে শিল্পী হিসেবে মুসোলিনির প্রশংসা করেছেন। বিনয় ভাষণে বিস্তৃতভাবে লিখিত চিঠিটি পরে ৫ আগস্ট ১৯২৬ ‘ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

ইতালি সম্পর্কে কবির ধারণা হঠাৎ বদলে যাওয়ার অধ্যাপক ফোর্মিকির মনে খটকা লাগে। তিনি একই পত্রিকায় তার দিককার কাহিনী নিয়ে একটি প্রতিবাদী প্রতিবেদন পাঠালেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠির নমনীয় স্বর রমাঁ রলাঁ পছন্দ করেননি। তার পরও তিনি চিঠির নির্বাচিত অংশ শনাক্ত করে মূল বিষয়গুলো বের করলেন, পুনরায় সম্পাদনা করে ইউরোপীয় সংবাদপত্রে প্রচারের জন্য বিতরণ করলেন। ফলে মুসোলিনির ইতালির সঙ্গে তার সম্পর্ক শেষ হয়ে এল।

   

এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা 

       

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>