রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে বৌদ্ধ প্রসঙ্গ

।। ডঃ ত প ন বা গ চী।।

উনিশ শতক বাঙালির নবজাগরণের সূচনায় সাহিত্য-সংস্কৃতির উপলব্ধির সঙ্গে ধর্মচিন্তাজাত দার্শনিক উপলব্ধির সংযোগ ঘটে। বৌদ্ধসাহিত্যের অনুবাদ ও সমালোচনা এই উপলব্ধিকে জাগ্রত রাখে। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামদাস সেন, রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, কেশবচন্দ্র সেন, অঘোরনাথ গুপ্ত, নবীনচন্দ্র সেন, শরৎচন্দ্র দেব, সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ প্রমুখ মনীষীতুল্য ব্যক্তি বুদ্ধদেবের জীবন ও দর্শন নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন। রবীন্দ্রমানস গঠনে এদের চিন্তাাধারা প্রভাব ফেলেছিল। বুদ্ধ সম্পর্কে পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গিও তাঁর অজানা ছিল না। হীনযান-মহাযান সম্পর্কেও তাঁর ধারণা স্পষ্ট ছিল। বুদ্ধদেবকে নিয়ে তাঁর নানামাত্রিক ভাবনা নিয়ে গ্রন্থও রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক আবহেও ছিল বৌদ্ধ দর্শনের চর্চা। তাঁর ভাই দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘আর্যধর্ম এবং বৌদ্ধধর্মের পরস্পর ঘাতপ্রতিঘাত ও সঙ্ঘাত’ (১৮৯৯) এবং সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘বৌদ্ধধর্ম’ (১৯০১) গ্রন্থদুটিই তার প্রমাণ বহন করে। এছাড়া রাজেন্দ্রলাল মিত্রের ‘দি সংস্কৃত বুদ্ধিস্ট লিটারেচার অফ নেপাল’ গ্রন্থটি তাঁকে অনেক বৌদ্ধআখ্যানের সন্ধান দেয়। এই গ্রন্থ থেকে কবি যে সকল আখ্যান তাঁর সৃষ্টিসম্ভারে ব্যবহার করেছেন, তা হলো, শ্রেষ্ঠ ‘ভিক্ষা, পূজারিণী, উপগুপ্ত, মালিনী, পরিশোধ, চন্ডালী, মূল্যপ্রাপ্তি, নগরলক্ষ্মী ও মস্তকবিক্রয়। ‘কথা ও কাহিনী’ কবিতাগ্রন্থের সকল আখ্যানই তিনি গ্রহণ করেছেন বৌদ্ধ কাহিনী থেকে। এই গ্রন্থের আখ্যা-অংশে ‘বিজ্ঞাপন’ শিরোনামে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য থেকে মেলে-
‘এই গ্রন্থে যে-সকল বৌদ্ধ-কথা বর্ণিত হইয়াছে তাহা রাজেন্দ্রনাথ মিত্র-সংকলিত নেপালী বৌদ্ধসাহিত্য সম্বন্ধীয় ইংরাজি গ্রন্থ হইতে গৃহিত। রাজপুত-কাহিনীগুলি টডের রাজস্থান ও শিখ-বিবরণগুলি দুই-একটি ইংরাজি শিখ-ইতিহাস হইতে উদ্ধার করা হইয়াছে। ভক্তমাল হইতে বৈষ্ণব গল্পগুলি প্রাপ্ত হইয়াছি। মূলের সহিত এই কবিতা গুলির কিছু কিছু প্রভেদ লক্ষিত হইবে-আশা করি, সেই পরিবর্তনের জন্য সাহিত্য-বিধান-মতে দন্ডনীয় গণ্য হইব না।’
‘কথা ও কাহিনী’ গ্রন্থের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কবি অন্যত্র বলেছেন,
‘এক সময়ে আমি যখন বৌদ্ধ কাহিনী এবং ঐতিহাসিক কাহিনীগুলি জানলুম তখন তারা স্পষ্ট ছবি গ্রহণ করে আমার মধ্যে সৃষ্টির প্রেরণা নিয়ে এসেছিল। অকস্মাৎ ‘কথা ও কাহিনী’র গল্পধারা উৎসের মতো নানা শাখায় উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। সেই সময়কার শিক্ষায় এই-সকল ইতিবৃত্ত জানবার অবকাশ ছিল, সুতরাং বলতে পারা যায় ‘কথা ও কাহিনী’ সেই কালেরই বিশেষ রচনা।’ [সাহিত্যে ঐতিহাসিকতা, সাহিত্যের স্বরূপ]


‘কথা’ কাব্যে যে কয়েকটি কবিতা আছে তা হলো: কথা কও, কথা কও, শ্রেষ্ঠভিক্ষা, প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণ, মস্তকবিক্রয়, পূজারিণী, অভিসার, পরিশোধ, সামান্য ক্ষতি, মূল্যপ্রাপ্তি, নগরলক্ষ্মী, অপমান-বর, স্বামীলাভ, স্পর্শমণি, বন্দী বীর, মানী, প্রার্থনাতীত দান, রাজবিচার, গুরু গোবিন্দ, শেষ শিক্ষা, নকল গড়, হোরিখেলা, বিবাহ, বিচারক, পণরক্ষা
আর ‘কাহিনী’ কাব্যে রয়েছে ৮টি কবিতা। তা হলো: কত কী যে আসে, গানভঙ্গ, পুরাতন ভৃত্য, দুই বিঘা জমি, দেবতার গ্রাস, নিষ্ফল উপহার, দীনদান, বিসর্জন। অর্থাৎ ‘কথা’ ও ‘কাহিনী’র এই ৩৩টি কবিতাই বৌদ্ধকাহিনীজাত। এর বাইরেও অজস্র কবিতা রয়েছে যাতে বৌদ্ধসংস্কৃতির উপকরণ রয়েছে। তবে ‘পুনশ্চ’ কাব্যের ‘শাপমোচন’, ‘পরিশেষ’ কাব্যের ‘বুদ্ধজন্মোৎসব’, ‘বোরোবুদুর’, ‘সিয়াম, ‘বুদ্ধদেবের প্রতি, ‘প্রার্থনা, ‘বৈশাখী পূর্ণিমা; ‘পত্রপুট’ কাব্যের ১৭-সংখ্যক কবিতা, ‘নবজাতক’ কাব্যের ‘বুদ্ধভক্তি’ এবং ‘জন্মদিনে’ কাব্যের ৩ ও ৬ সংখ্যক কবিতায় তীব্রভাবে রয়েছে ভগবান বুদ্ধের উপস্থিতি।’কথা ও কাহিনী’ কাব্যের প্রায় পুরোটাই বুদ্ধ প্রসঙ্গ। ‘শ্রেষ্ঠভিক্ষা, ‘মস্তক বিক্রয়, ‘পূজারিণী’, ‘অভিসার’, ‘পরিশোধ’, ‘সামান্য ক্ষতি’, ‘মূল্যপ্রাপ্তি’, ‘নগরলক্ষ্মী’, ‘শাপমোচন’ প্রভৃতি কবিতায় বৌদ্ধআখ্যানের প্রত্যক্ষ গ্রহণ রয়েছে। এছাড়া ‘পুনশ্চ’ কাব্যের ‘শাপমোচন’ কবিতায় আছে বৌদ্ধধর্মীয় আখ্যান-
গান্ধর্ব সৌরসেন সুরলোকের সংগীতসভায়
কলানায়কদের অগ্রণী।
সেদিন তার প্রেয়সী মধুশ্রী গেছে সুমেরুশিখরে
সূর্যপ্রদক্ষিণে।
সৌরসেনের মন ছিল উদাসী।
‘পরিশেষ’ কাব্যের ‘বুদ্ধজন্মোৎসব (১) এ আমরা রবীন্দ্রনাথের বুদ্ধপ্রশস্তি উপলব্ধি করতে পারি-
হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী,
নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব
ঘোর কুটিল পন্থ তার,
লোভজটিল বন্ধ।
নূতন তব জন্ম লাগি কাতর যত প্রাণী,
কর ত্রাণ মহাপ্রাণ, আন অমৃতবাণী,
বিকশিত কর প্রেমপদ্ম
চিরমধুনিষ্যন্দ।
‘বোরোবুদুর’ দেখার প্রতিক্রিয়ায় রবীন্দ্রনাথ একটি অসাধারণ কবিতা লিখেছেন। তাতে তিনি বোরাবুদুরের বর্ণনার পাশাপাশি বুদ্ধের আদর্শের কথা প্রকাশ করেছেন একান্ত অনুসারীর মতো। সবশেষে তিনি লিখেছেন-
তাই আসিয়াছে দিন,
পীড়িত মানুষ মুক্তিহীন,
আবার তাহারে
আসিতে হবে যে তীর্থদ্বারে
শুনিবারে
পাষাণের মৌনতটে যে বাণী রয়েছে চিরস্থির-
কোলাহল ভেদ করি শত শতাব্দীর
আকাশে উঠিছে অবিরাম
অমেয় প্রেমের মন্ত্র,-চ্বুদ্ধের শরণ লইলাম।
সারনাথে মূলগন্ধকুটিবিহার প্রতিষ্ঠা-উপলক্ষে ‘বুদ্ধদেবের প্রতি’ নামের এক কবিতায় তিনি বুদ্ধদেবের নামের মহিমা প্রচার করেছেন। বুদ্ধের নামে এই দেশ ধন্য হয়েছে, সেই গৌরবও প্রকাশ পেয়েছে অই কবিতায়। রবীন্দ্রনাথের কাছে বুদ্ধের জন্ম মানে মহাজাগরণ। তাই তিনি লিখেছেন-
ওই নামে একদিন ধন্য হল দেশে দেশান্তরে
তব জন্মভূমি।
সেই নাম আরবার এ দেশের নগর প্রান্তরে
দান করো তুমি।
বোধিদ্রুমতলে তব সেদিনের মহাজাগরণ
আবার সার্থক হোক, মুক্ত হোক মোহ-আবরণ,
বিস্মৃতির রাত্রিশেষে এ ভারতে তোমারে স্মরণ
নবপ্রাতে উঠুক কুসুমি।
চিত্ত হেথা মৃতপ্রায়, অমিতাভ, তুমি অমিতায়ু,
আয়ু করো দান।
তোমার বোধনমন্ত্রে হেথাকার তন্দ্রালস বায়ু
হোক প্রাণবান।
খুলে যাক রুদ্ধদ্বার, চৌদিকে ঘোষুক শঙ্খধ্বনি
ভারত-অঙ্গনতলে, আজি তব নব আগমনী,
অমেয় প্রেমের বার্তা শতকণ্ঠে উঠুক নিঃস্বনি-
এনে দিক অজেয় আহ্বান।

‘সিয়াম’ নামে দুটি কবিতা আছে তাঁর। প্রাচীন সিয়াম হলো থাইল্যান্ডের ব্যাংকক শহর থেকে সুখুমভিট সড়কে ৩০ মিনিটের দূরত্বের একটি দর্শনীয় স্থান। এটি সমুট পার্কন প্রদেশে অবস্থিত। প্রায় ৩২০ একর স্থান জুড়ে রয়েছে বিচিত্র স্থাপনা। প্রায় ১১৬টি সৌধ রয়েছে এখানে।
প্রথম দর্শনে এবং বিদায়কালে কবির যে অনুভূতি তারই প্রকাশ এই দুটি কবিতায়। প্রধম দর্শনের উপলব্ধি করতে গিয়ে কবি লিখেছেন বুদ্ধের কথা-
হৃদয়ে হৃদয়ে মিল করি
বহু যুগ ধরি
রচিয়া তুলেছ তুমি সুমহৎ জীবনমন্দির,-
পদ্মাসন আছে স্থির,
ভগবান বুদ্ধ সেথা সমাসীন
চিরদিন-
মৌন যাঁর শান্তি অন্তহারা,
বাণী যাঁর সকরুণ সান্ত্বনার ধারা।
আবার সিয়াম দেখে বিদায় নেওয়ার কালেও কবি বুদ্ধের নাম বিস্মৃত হননি। কেবল বুদ্ধের কারণে সিয়ামকে কবির আপন মনে হয়েছে। সেখানে এক সপ্তাহের অবস্থানেই রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছে শতাব্দীর শব্দীহ গান।
কোন্? সে সুদূর মৈত্রী আপন প্রচ্ছন্ন অভিজ্ঞানে
আমার গোপন ধ্যানে
চিহ্নিত করেছে তব নাম,
হে সিয়াম,…
বিদায়ের সময়ে তাই বুদ্ধের কথা স্মরণ করেন কবি। সিয়ামের পুরাকীর্তি এবং বুদ্ধমূর্তি দেখে রবীন্দ্রনাথ কেবল আপ্লুত নন, শ্রদ্ধায় আনত হন। তাই তাঁর সশ্রদ্ধ উচ্চারণ ধ্বনিত হয়-
পূজার প্রদীপে তব, প্রজ্বলিত ধূপে।
আজি বিদায়ের ক্ষণে
চাহিলাম সি্নগ্ধ তব উদার নয়নে,
দাঁড়ানু ক্ষণিক তব অঙ্গনের তলে,
পরাইনু গলে
বরমাল্য পূর্ণ অনুরাগে-
অমস্নান কুসুম যার ফুটেছিল বহুযুগ আগে।
‘প্রার্থনা’ শিরোনামের কবিতায় রয়েছে ভগবান বুদ্ধের নানাকৌণিক উপস্থাপনা। ‘পত্রপুট’ কাব্যের ১৭ সংখ্যক কবিতাও বুদ্ধের প্রসঙ্গ নিয়ে রচিত। ‘নবজাতক’ কাব্যের ‘বুদ্ধভক্তি’ এবং ‘জন্মদিনে’ কাব্যের ৩ ও ৬ সংখ্যক কবিতা বুদ্ধদর্শনধন্য। ‘খাপছাড়া’ কাব্যের ৬৬-সংখ্যক কবিতায় বুদ্ধের এক ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে-
বটে আমি উদ্ধত,
নই তবু ক্রুদ্ধ তো,
শুধু ঘরে মেয়েদের সাথে মোর যুদ্ধ তো ।
যেই দেখি গুন্ডায়
ক্ষমি হেঁটমুন্ডায়,
দুর্জন মানুষেরে ক্ষমেছেন বুদ্ধ তো ।
পাড়ায় দারোগা এলে দ্বার করি রুদ্ধ তো-
সাত্তি্বক সাধকের এ আচার শুদ্ধ তো ।
প্রবন্ধসাহিত্য যেহেতু চিন্তামূলক, তাই তাতে বুদ্ধ প্রসঙ্গ বেশি উচ্চারিত হয়েছে। ‘সমালোচনা ১৮৮৮’ গ্রন্থের ‘অনাবশ্যক’ নামের প্রবন্ধে রয়েছে বুদ্ধের উপস্থিতি। ‘আত্মশক্তি’ গ্রন্থে স্বদেশী সমাজ ও দেশীয় রাজ নামের প্রবন্ধদুটিতে রয়েছে বুদ্ধের কথা। ‘ভারতবর্ষ’ গ্রন্থে ‘সমাজভেদ’, ‘নববর্ষ’, ‘ব্রাহ্মণ’, ‘চীনেম্যানের চিঠি’ ও ‘অত্যুক্তি’ প্রবন্ধে বুদ্ধের উল্লেখ রয়েছে।
প্রবন্ধগ্রন্থ ‘সমালোচনা’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’, ‘প্রাচীন সাহিত্য’, ‘সাহিত্য’, ‘সমাজ’, ‘শিক্ষা’, ‘রাজাপ্রজা’, ‘ধর্ম’, ‘সঞ্চয়’, ‘পরিচয়’, ‘জাপানযাত্রী’, ‘লিপিকা’, ‘জাভাযাত্রীর পত্র’, ‘মানুষের ধর্ম’, ‘ভারতপথিক রামমোহন’, শান্তিনিকেতন’, ‘কালান্তর’, ‘পথের সঞ্চয়’, ‘আত্মপরিচয়’, ‘সাহিত্যের স্বরূপ’ ‘বিশ্বভারতী’, ‘ইতিহাস’, ‘বুদ্ধদেব’, ‘খৃস্ট’ প্রভৃতি গ্রন্থে একাধিকবার বৌদ্ধধর্ম, সংস্কৃতি ও আখ্যানের উল্লেখ রয়েছে।
রবীন্দ্রসাহিত্যে গৌতম বুদ্ধ, বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধআখ্যান এসেছে নানাভাবে। নাটকে, কবিতায় ও প্রবন্ধে বুদ্ধ প্রসঙ্গের অবতারণা ব্যাপক হলেও উপন্যাস এবং ছোটগল্পে সরাসরি বুদ্ধপ্রসঙ্গ নেই বললেই চলে। নাটকে আমরা দেখতে পাই ১০টি নাটকে বৌদ্ধআখ্যান রয়েছে। মালিনী (১৮৯৬), রাজা (১৯১০), অচলায়তন (১৯১২), গুরু (১৯১৮), অরূপরতন (১৯২০), নটীর পূজা (১৯২৬), চন্ডালিকা (১৯৩৮), নৃত্যনাট্য চন্ডালিকা (১৯৩৮), শ্যামমোচন (১৯৩১) নাটকে বৌদ্ধআখ্যান রয়েছে। তবে শাপমোচনকে কেউ কেউ নাটক না বলে ‘কথিকা’ বলতে চান। এই ১০টি নাটক ছাড়াও ‘শোধবোধ’ নাটকে প্রাসঙ্গিক উক্তি ও সংলাপে বৌদ্ধপ্রসঙ্গ রয়েছে।

বৌদ্ধআখ্যান নিয়ে রবীন্দ্রনাথ কোনো উপন্যাস রচনা করেননি। তবে ‘ঘরে বাইরে” (১৯১৬) উপন্যাসে নিখিলেশের আত্মকথায় এবং ‘শেষের কবিতা’ (১৯২৯) উপন্যাসে ১৩শ পরিচ্ছেদের প্রাসঙ্গিক উক্তিতে বুদ্ধপ্রসঙ্গ রয়েছে। ‘শোধবোধ’ (১৯২৬) নাটকে বুদ্ধদর্শনের প্রভাব নেই, কিন্তু বুদ্ধপ্রসঙ্গের উল্লেখ রয়েছে। যেমন সতীশ ও নলিনীর সংলাপে-
নলিনী । আমি যদি তোমাকে সত্যি কথা বলি, খুশি হোয়ো, অন্যে বললে রাগ করতে পার।
সতীশ। তুমি আমাকে অযোগ্য বলে জান, এতে আমি খুশি হব?
নলিনী। এই টেনিস্?কোর্টের অযোগ্যতাকে তুমি অযোগ্যতা বলে লজ্জা পাও? এতেই আমি সব চেয়ে লজ্জা বোধ করি। তুমি তো তুমি, এখানে স্বয়ং বুদ্ধদেব এসে যদি দাঁড়াতেন, আমি দুই হাত জোড় করে পায়ের ধুলো নিয়েই তাঁকে বলতুম, ভগবান, লাহিড়িদের বাড়ির এই টেনিস্?কোর্টে আপনাকে মানায় না, মিস্টার নন্দীকে তার চেয়ে বেশি মানায়। শুনে কি তখনই তিনি হার্মানের বাড়ি ছুটতেন টেনিস্?সুট অর্ডার দিতে।
সতীশ । বুদ্ধদেবের সঙ্গে-
নলিনী । তোমার তুলনাই হয় না, তা জানি। আমি বলতে চাই, টেনিস্?কোর্টের বাইরেও একটা মস্ত জগৎ আছে-সেখানে চাঁদনির কাপড় পরেও মনুষ্যত্ব ঢাকা পড়ে না। এই কাপড় পরে যদি এখনই ইন্দ্রলোকে যাও তো উর্বশী হয়তো একটা পারিজাতের কুঁড়ি ওর বাট্?ন্?হোলে পরিয়ে দিতে কুণ্ঠিত হবে না-অবিশ্যি তোমাকে যদি তার পছন্দ হয়।
সতীশ । বাট্?ন্?হোল তো এই রয়েছে, গোলাপের কুঁড়িও তোমার খোঁপায়-এবারে পছন্দর পরিচয়টা কি ভিক্ষে করে নিতে পারি।
নলিনী । আবার ভুলে যাচ্ছ, এটা স্বর্গ নয়, এটা টেনিস্?কোর্ট।
এখানে গৌতম বুদ্ধদেবকে সর্বমান্য গণ্য করা হয়েছে। বুদ্ধের প্রতি প্রবল শ্রদ্ধাবোধের কারণেই এখানে তাঁর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে। সনাতনধর্মাবলম্বী চরিত্রের মুখে রাম, কৃষ্ণ কিংবা কোনো দেবতার নাম না বলে বুদ্ধের নাম বলার মাধ্যমে বুদ্ধধর্মের প্রতি রবীন্দ্রনাথের আস্থারই প্রমাণ বহন করে।
‘ঘরে বাইরে’ (১৯১৬) উপন্যাসেও আছে বুদ্ধের উল্লেখ। নিখিলেশের আত্মকথা-য় এসেছে রাজপুত্র সিদ্ধার্থের প্রসঙ্গ। যেমন-
‘এই-সব কথা ভাববার কথা। স্থির করেছিলুম এই ভাবনাতেই প্রাণ দেব। সেদিন বিমলাকে এসে বললুম, বিমল, আমাদের দুজনের জীবন দেশের দুঃখের মূল-ছেদনের কাজে লাগাব।
বিমল হেসে বললে, তুমি দেখছি আমার রাজপুত্র সিদ্ধার্থ, দেখো শেষে আমাকে ভাসিয়ে চলে যেয়ো না।
আমি বললুম, সিদ্ধার্থের তপস্যায় তাঁর স্ত্রী ছিলেন না, আমার তপস্যায় স্ত্রীকে চাই।’
বুদ্ধদেব যে তাঁর স্ত্রীপরিজন ছেড়ে সাধনার পথে নেমেছিলেন, অর্থাৎ সর্বত্যাগী হয়ে পথে নেমেছিলেন। তাঁর এই ত্যাগের উদাহরণকে সামনে এনে নিখিলেশ তাঁর বিপরীতে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়েই তপস্যার কথা বলেছেন। একই উপন্যাসে আছে সমস্ত ভারতবর্ষে জাগরণের নায়ক হিসেবে বুদ্ধের প্রসঙ্গ। যেমন-
‘মানুষ এত বড়ো যে সে যেমন ফলকে অবজ্ঞা করতে পারে তেমনি দৃষ্টান্তকেও। দৃষ্টান্ত হয়তো নেই, বীজের ভিতরে ফুলের দৃষ্টান্ত যেমন নেই; কিন্তু বীজের ভিতরে ফুলের বেদনা আছে। তবু, দৃষ্টান্ত কি একেবারেই নেই? বুদ্ধ বহু শতাব্দী ধরে যে সাধনায় সমস্ত ভারতবর্ষকে জাগিয়ে রেখেছিলেন সে কি ফলের সাধনা?’
আলেকজান্ডার নয় গৌতম বুদ্ধ যে পৃথিবী জয় করেছিলেন তার উল্লেখও আছে এই উপন্যাসের অন্যত্র। এই উক্তির মাধ্যমে বুদ্ধের মানবপ্রেমের কথা প্রকাশিত হয়েছে। আলেকজান্ডার জয় করেছিলেন অস্ত্রে, বুদ্ধ জয় করেছেন প্রেমে। উপন্যাসে উলি্লখিত প্রসঙ্গটি এমন-
‘আমি বললুম, মাস্টারমশায়, অমন করে কথায় বলতে গেলে টাক-পড়া উপদেশের মতো শোনায়; কিন্তু যখনই চোখে ওকে আভাসমাত্রেও দেখি তখন যে দেখি ঐটেই অমৃত। দেবতারা এইটেই পান করে অমর। সুন্দরকে আমরা দেখতেই পাই নে যতক্ষণ না তাকে আমরা ছেড়ে দিই। বুদ্ধই পৃথিবী জয় করেছিলেন, আলেক্?জান্ডার করেন নি, এ কথা যে তখন মিথ্যেকথা যখন এটা শুকনো গলায় বলি। এই কথা কবে গান গেয়ে বলতে পারব? বিশ্বব্রহ্মান্ডের এই-সব প্রাণের কথা ছাপার বইকে ছাপিয়ে পড়বে কবে, একেবারে গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গার নির্ঝরের মতো?’
‘শেষের কবিতা’ (১৯২৯) উপন্যাসেও আছে বুদ্ধপ্রসঙ্গের অবতারণা। লাবণ্য ও অমিতের সংলাপে পাওয়া যায় বৌদ্ধধর্ম প্রচারের পথ সম্পর্কে। শোভনলালের পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে ঔপন্যাসিক রবীন্দ্রনাথ হিউয়েন সাঙের তীর্থযাত্রা ও আলেকজান্ডারের রণযাত্রার খবর জানিয়েছেন। বৌদ্ধধর্মের প্রচার কোন এলাকা দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে তার রূপরেখাটিও লেখক তুলে ধরেছেন। এতে লেখকের ঐতিহাসিক জ্ঞানের পাশাপাশি বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে ধারণারও প্রকাশ ঘটেছে। উপন্যাসের পাঠ থেকেই তা তুলে ধরা যায়।-
লাবণ্যর বুকের ভিতরে হঠাৎ খুব একটা ধাক্কা দিলে। কথাটাকে বাধা দিয়ে অমিতকে বললে,শোভনলালের সঙ্গে একই বৎসর আমি এম.এ. দিয়েছি। তার সব খবরটা শুনতে ইচ্ছা করে।
এক সময়ে সে খেপেছিল, আফগানিস্থানের প্রাচীন শহর কাপিশের ভিতর দিয়ে একদিন যে পুরোনো রাস্তা চলেছিল সেইটেকে আয়ত্ত করবে। ঐ রাস্তা দিয়েই ভারতবর্ষে হিউয়েন সাঙের তীর্থযাত্রা, ঐ রাস্তা দিয়েই তারও পূর্বে আলেকজান্ডারের রণযাত্রা। খুব কষে পুশতু পড়লে, পাঠানি কায়দাকানুন অভ্যেস করলে। সুন্দর চেহারা, ঢিলে কাপড়ে ঠিক পাঠানের মতো দেখতে হয় না, দেখায় যেন পারসিকের মতো। আমাকে এসে ধরলে, সেখানে ফরাসি পন্ডিতরা এই কাজে লেগেছেন, তাঁদের কাছে পরিচয়পত্র দিতে। ফ্রান্সে থাকতে তাঁদের কারো কারো কাছে আমি পড়েছি। দিলেম পত্র, কিন্তু ভারত-সরকারের ছাড়চিঠি জুটল না। তার পর থেকে দুর্গম হিমালয়ের মধ্যে কেবলই পথ খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছে, কখনো কাশ্মীরে কখনো কুমায়ুনে। এবার ইচ্ছে হয়েছে, হিমালয়ের পূর্বপ্রান্তটাতেও সন্ধান করবে। বৌদ্ধধর্ম-প্রচারের রাস্তা এ দিক দিয়ে কোথায় কোথায় গেছে সেইটে দেখতে চায়। ঐ পথ-খেপাটার কথা মনে করে আমারও মন উদাস হয়ে যায়। পুঁথির মধ্যে আমরা কেবল কথার রাস্তা খুঁজে খুঁজে চোখ খোয়াই, ঐ পাগল বেরিয়েছে পথের পুঁথি পড়তে, মানববিধাতার নিজের হাতে লেখা। আমার কী মনে হয় জান?চ্
আর গানের কথা যদি বলা হয়, তাহলে অজস্র গানে রয়েছে বুদ্ধের বাণী ও দর্শনের অভিঘাতসৃষ্ট চরণ।
রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্যকর্মের বিচারেই বলা যায় যে, গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা ও দর্শন যতখানি প্রভাব বিস্তার করেছে, আর কোনো একক মনীষী তা করতে পারেননি।
রবীন্দ্রনাথ বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত না থেকেও বুদ্ধের বাণী প্রচারে যতটা ভূমিকা রেখেছেন, আর কোনো লেখক তা পেরেছেন বলে মনে হয় না। গৌতম বুদ্ধ এবং বৌদ্ধধর্ম নিয়ে রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি ও মূল্যায়ন বিধৃত রয়েছে বিভিন্ন রচনায়। সেখান থেকে কয়েক মন্তব্য এখানে উল্লেখ করা যায়।
১. বৌদ্ধযুগের যথার্থ আরম্ভ কবে তাহা সুস্পষ্টরূপে বলা অসম্ভব ্ত শাক্যসিংহের বহু পূর্বেই যে তাহার আয়োজন চলিতেছিল এবং তাঁহার পূর্বেও যে অন্য বুদ্ধ ছিলেন তাহাতে সন্দেহ নাই । ইহা একটি ভাবের ধারাপরম্পরা যাহা গৌতমবুদ্ধে পূর্ণ পরিণতি লাভ করিয়াছিল । মহাভারতের যুগও তেমনি কবে আরম্ভ তাহা স্থির করিয়া বলিলে ভুল বলা হইবে । পূর্বেই বলিয়াছি সমাজের মধ্যে ছড়ানো ও কুড়ানো এক সঙ্গেই চলিতেছে । ভারতবর্ষে ইতিহাসের ধারা, পরিচয়]

২. ভগবান বুদ্ধ একদিন যে ধর্ম প্রচার করেছিলেন সে ধর্ম তার নানা তত্ত্ব, নানা অনুশাসন, তার সাধনার নানা প্রণালী নিয়ে সাধারণচিত্তের আন্তর্ভৌম স্তরে প্রবেশ করে ব্যাপ্ত হয়েছিল। তখন দেশ প্রবলভাবে কামনা করেছিল এই বহুশাখায়িত পরিব্যাপ্ত ধারাকে কোনো কোনো সুনির্দিষ্ট কেন্দ্রস্থলে উৎসরূপে উৎসারিত করে দিতে সর্বসাধারণের স্নানের জন্য, পানের জন্য, কল্যাণের জন্য। [ সংযোজন, শিক্ষা]
৩. মহাপুরুষেরাই পুরাতন সত্য বলিতে পারেন-বুদ্ধ, খৃস্ট, চৈতন্যেরাই পুরাতন সত্য বলিতে পারেন। সত্য তাঁহাদের কাছে চিরদিন নূতন থাকে, কারণ সত্য তাঁহাদের যথার্থ প্রিয়ধন। [সত্য, সমাজ]
৪. মনে ক্রোধ দ্বেষ লোভ ঈর্ষা থাকলে এই মৈত্রীভাবনা সত্য হয় নাু এইজন্য শীলগ্রহণ শীলসাধন প্রয়োজন। কিন্তু শীলসাধনার পরিণাম হচ্ছে সর্বত্র মৈত্রীকে দয়াকে বাধাহীন করে বিস্তার। এই উপায়েই আত্মাকে সকলের মধ্যে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়। .. এই মৈত্রীভাবনার দ্বারা আত্মাকে সকলের মধ্যে প্রসারিত করা এ তো শূন্যতার পন্থা নয়। তা যে নয় তা বুদ্ধ যাকে ব্রহ্মবিহার বলছেন তা অনুশীলন করলেই বোঝা যাবে। [শান্তনিকেতন ৭]
৫. জাপান স্বর্গমর্ত্যকে বিকশিত ফুলের মতো সুন্দর করে দেখছে; ভারতবর্ষ বলছে, এই যে এক বৃন্তে দুই ফুল, স্বর্গ এবং মর্ত্য, দেবতা এবং বুদ্ধুমানুষের হৃদয় যদি না থাকত তবে এ ফুল কেবলমাত্র বাইরের জিনিস হত এই সুন্দরের সৌন্দর্যটিই হচ্ছে মানুষের হৃদয়ের মধ্যে। [জাপান-যাত্রী ১৩]
৬. বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে জনসাধারণের প্রতি শ্রদ্ধা প্রবল হয়ে প্রকাশ পেয়েছে; এর মধ্যে শুদ্ধ মানুষের নয়, অন্য জীবেরও যথেষ্ট স্থান আছে। জাতককাহিনীর মধ্যে খুব একটা মস্ত কথা আছে, তাতে বলেছে, যুগ যুগ ধরে বুদ্ধ সর্বসাধারণের মধ্য দিয়েই ক্রমশ প্রকাশিত। প্রাণীজগতে নিত্যকাল ভালোমন্দর যে দ্বন্দ্ব চলেছে সেই দ্বন্দ্বের প্রবাহ ধরেই ধর্মের শ্রেষ্ঠ আদর্শ বুদ্ধের মধ্যে অভিব্যক্ত। অতি সামান্য জন্তুর ভিতরেও অতি সামান্য রূপেই এই ভালোর শক্তি মন্দর ভিতর দিয়ে নিজেকে ফুটিয়ে তুলছে; তার চরম বিকাশ হচ্ছে অপরিমেয় মৈত্রীর শক্তিতে আত্মত্যাগ। জীবে জীবে লোকে লোকে সেই অসীম মৈত্রী অল্প অল্প করে নানা দিক থেকে আপন গ্রন্থি মোচন করছে, সেই দিকেই মোক্ষের গতি। জীব মুক্ত নয় কেননা, আপনার দিকেই তার টান; সমস্ত প্রাণীকে নিয়ে ধর্মের যে অভিব্যক্তি তার প্রণালীপরম্পরায় সেই আপনার দিকে টানের ‘পরে আঘাত লাগছে। সেই আঘাত যে পরিমাণে যেখানেই দেখা যায় সেই পরিমাণে সেখানেই বুদ্ধের প্রকাশ। [জাভাযাত্রীর পত্র ১৯]
৭. ইতিহাসের যে-একটা আবছায়া দেখতে পাচ্ছি সেটা এই রকম-বাংলা সাহিত্য যখন তার অব্যক্ত কারণ-সমুদ্রের ভিতর থেকে প্রবাল-দ্বীপের মতো প্রথম মাথা তুলে দেখা দিলে তখন বৌদ্ধধর্ম জীর্ণ হয়ে বিদীর্ণ হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে নানাপ্রকার বিকৃতিতে পরিণত হচ্ছে। স্বপ্নে যেমন এক থেকে আর হয়, তেমনি করেই বুদ্ধ তখন শিব হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। শিব ত্যাগী, শিব ভিক্ষু, শিব বেদবিরুদ্ধ, শিব সর্বসাধারণের। বৈদিক দক্ষের সঙ্গে এই শিবের বিরোধের কথা কবিকঙ্কণ এবং অন্নদামঙ্গলের গোড়াতেই প্রকাশিত আছে। শিবও দেখি বুদ্ধের মতো নির্বাণমুক্তির পক্ষে; প্রলয়েই তাঁর আনন্দ। [বাতায়নিকের পত্র, কালান্তর]

৮. বুদ্ধ যখন অপরিমেয় মৈত্রী মানুষকে দান করেছিলেন তখন তো তিনি কেবল শাস্ত্র প্রচার করেন নি, তিনি মানুষের মনে জাগ্রত করেছিলেন ভক্তি। সেই ভক্তির মধ্যেই যথার্থ মুক্তি। খৃষ্টকে যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে ভালোবাসতে পেরেছেন তাঁরা শুধু একা বসে রিপু দমন করেন নি, তাঁরা দুঃসাধ্য সাধন করেছেন। তাঁরা গিয়েছেন দূর-দূরান্তরে, পর্বত সমুদ্র পেরিয়ে মানবপ্রেম প্রচার করেছেন। মহাপুরুষেরা এইরকম আপন জীবনের প্রদীপ জ্বালান; তাঁরা কেবল তর্ক করেন না, মত প্রচার করেন না। তাঁরা আমাদের দিয়ে যান মানুষরূপে আপনাকে। [খৃষ্ট]
৯. যখন ভারতবর্ষে উন্নতির মধ্যাহ্নকাল তখন ধীরে ধীরে কতকগুলি নূতন দর্শন ও নূতন দল নির্মিত হইতে লাগিল এবং তাহাদের প্রভাবে বৌদ্ধধর্ম উত্থিত হইয়া সমাজে একটি ঘোরতর বিপ্লব বাধাইয়া দিল। পৌরাণিক ঋষিরা ভুল বুঝিলেন, তাঁহারা মনে করিলেন এরূপ বিপ্লব অনিষ্টজনক। অমনি পুরাণে, সংহিতায় ও অন্যান্য নানাপ্রকার সমাজের হস্তপদ অষ্টপৃষ্ঠে বন্ধন করিয়া ফেলিলেন এবং ভবিষ্যতে এরূপ বিপ্লব না বাধে তাহার নানা উপায় করিয়া রাখিলেন। সমাজের স্বাস্থ্য নষ্ট হইল এবং সমাজ ক্রমশই অবনতির অন্ধকারে আচ্ছন্ন হইয়া পড়িল। সংস্কারশীলতার অভাবে ও রক্ষণশীলতার বাড়াবাড়িতেই হিন্দুসমাজ নির্জীব হইয়া পড়িল। [বঙ্গে সমাজ-বিপ্লব, পরিশিষ্ট]
১০. বৌদ্ধধর্ম সন্ন্যাসীর ধর্ম। কিন্তু তা সত্ত্বেও যখন দেখি তারই প্রবর্তনায় গুহাগহ্বরে চৈত্যবিহারে বিপুলশক্তিসাধ্য শিল্পকলা অপর্যাপ্ত প্রকাশ পেয়ে গেছে তখন বুঝতে পারি, বৌদ্ধধর্ম মানুষের অন্তরতম মনে এমন একটি সত্যবোধ জাগিয়েছে যা তার সমস্ত প্রকৃতিকে সফল করেছে, যা তার স্বভাবকে পঙ্গু করে নি। ভারতের বাহিরে ভারতবর্ষ যেখানে তার মৈত্রীর সোনার কাঠি দিয়ে স্পর্শ করেছে সেখানেই শিল্পকলার কী প্রভূত ও পরমাশ্চর্য বিকাশ হয়েছে। শিল্পসৃষ্টি-মহিমায় সে-সকল দেশ মহিমান্বিত হয়ে উঠেছে। [বৃহত্তর ভারত, কালান্তর]
১১. বাংলায় যত ধর্মবিপ্লব হয়েছে তার মধ্যেও বাংলা নিজমাহাত্ম্যের বিশিষ্ট প্রকাশ দেখিয়েছে। এখানে বৌদ্ধধর্ম বৈষ্ণবধর্ম বাংলার যা বিশেষ রূপ, গৌড়ীয় রূপ, তাই প্রকাশ করেছে। [ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণ, সংগীতচিন্তা]
১২. বুদ্ধদেব যে অভ্রভেদী মন্দির রচনা করিলেন, নবপ্রবুদ্ধ হিন্দু তাহারই মধ্যে তাঁহার দেবতাকে লাভ করিলেন। বৌদ্ধধর্ম হিন্দুধর্মের অন্তর্গত হইয়া গেল। মানবের মধ্যে দেবতার প্রকাশ, সংসারের মধ্যে দেবতার প্রতিষ্ঠা, আমাদের প্রতি মুহূর্তের সুখদুঃখের মধ্যে দেবতার সঞ্চার, ইহাই নবহিন্দুধর্মের মর্মকথা হইয়া উঠিল। শাক্তের শক্তি, বৈষ্ণবের প্রেম, ঘরের মধ্যে ছড়াইয়া পড়িল; মানুষের ক্ষুদ্র কাজে-কর্মে শক্তির প্রত্যক্ষ হত, মানুষের স্নেহপ্রীতির সম্বন্ধের মধ্যে দিব্যপ্রেমের প্রত্যক্ষ লীলা অত্যন্ত নিকটবর্তী হইয়া দেখা দিল। এই দেবতার আবির্ভাবে ছোটোবড়োয় ভেদ ঘুচিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। সমাজে যাহারা ঘৃণিত ছিল তাহারাও দৈবশক্তির অধিকারী বলিয়া অভিমান করিল, প্রাকৃত পুরাণগুলিতে তাহার ইতিহাস রহিয়াছে। [মন্দির, ভারতবর্ষ]
কৃতজ্ঞতাঃ প্রজ্ঞাদর্পণ
.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত