রসিক নজরুল

বাংলা সাহিত্যে দ্রোহ, প্রেম, সাম্য, মানবতা ও শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। মূলত তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর রসিক রূপটিও প্রবাদপ্রতিম। তাই নজরুলের লেখনীতে অনায়াসেই উঠে আসে, ‘আমি খেলিব খেলাব, হাসিব-হাসাব, কাঁদিব কিন্তু কাঁদাব না।’

ব্যক্তিগত জীবনেও নজরুল ইসলাম দারুণ কৌতুকপ্রিয় ছিলেন। এই কৌতুকপ্রিয়তার জন্যই তিনি খুব হাসতে পারতেন, হাসাতে পারতেন। তাঁর হাসির বিষয়ে নানা গল্প প্রচলিত আছে। তাঁর অট্টহাসি বহুদূর থেকে শোনা যেত।

একবার নজরুলকে তাঁর বন্ধুরা খুঁজছেন। এ বাড়ি ও বাড়ি খোঁজা হচ্ছে। হঠাৎ দূর কোনো বাড়ি থেকে অট্টহাসির শব্দ কানে আসতেই নজরুলের খোঁজ মিলল। এমনই ছিল নজরুলের হাসির সুনাম।

হাসির এ উপস্থাপনায় নজরুল নিজেই নিজেকে তুলে ধরেছেন একটি হাসির গানে,

‘আমি দেখব হাসি

আমায় দেখলে পরে হাসতে হাসতে পেয়ে যাবে কাশি।

আমি হাসির হাঁসলী ফেরি করি এলে আমার হাসির দেশে

বুড়োরা সব ছোঁড়া হয়, আর ছোঁড়ারা যায় টেঁসে

আমার হাস-খালিতে বাড়ি, আমি হাসু-হানার মাসি।’

দিলখোলা হাসির সাথে প্রাণ মাতানো উচ্ছ্বাস নিয়ে নজরুল চলতেন। হয়তো আড়াল করতেন তাঁর বয়ে বেড়ানো নিত্যদিনের গরিবীআনাকে। নজরুল নিজে দরিদ্র ছিলেন, দরিদ্রদের ভালোবাসতেন। আর জানতেন দরিদ্রদের মনের কথাটিও। ধনী ও দরিদ্রের সামাজিক স্তরবিন্যাস নিয়ে নজরুলের একটি চমৎকার বিয়েবিষয়ক গান আছে।

‘বাপরে বাপ কি পোলার পাল পিল্ পিল্ কইর‌্যা আসে

সব কিলবিল কইর‌্যা আসে।

কি কলই ফেইল্যাছে বাবা এই বিবাহ-রূপ চাষে।

পোলার পাল না ছাতাইর‌্যা পাখি

খ্যাচ্ খ্যাচাইয়া উঠছে ডাকি

‘অমুক দাও আর তমুক দাও’

‘ইয়ে খাইমু আর উয়ো লাও’

মাংস যেন ছিইর‌্যা খাইব গিলতে চায় গোগ্রাসে ।

কেউবা আইস্যা ধরে কোঁচা, কেউবা টানে কাছা,

কাউয়ার দল যেমন কইর‌্যা খ্যাদায় দেখলে প্যাঁচা,

নেতরি গেঁড়রি যেন তৈলের ভাঁড়

লবণের ভাঁড় জ্বালায় হাড়,

ব্যাঙের ছাও ব্যাঙাচি যেন বাইরায় আষাঢ় মাসে,

আমি জাইন্যা শুইন্যা চইড়্যাছি বাপ আপন শূলের বাঁশে।’

নজরুল যখন লেটো গানের দলে ছিলেন, তখনো তাঁর সুখ্যাতি ছিল ‘রসিক’ এবং ‘মজার গান রচয়িতা’ হিসেবে। অবশ্য লেটো গানের ধরনই ছিল এই। সহজ কথায় মানুষকে আনন্দ দেওয়া। সে সময়ে নজরুলের রচনা করা ‘দেওরা-ভাবীর গীত’ নামে পরিচিত বেশকিছু গান পাওয়া যায় :

‘দেওরা : ও সোনার ভাবীরে, কি উপায় করিরে

তোর সনে মোর ভাব রাখা দায়…

ভাবী : ও সাধের দেওরা রে,

ও ছোট দেওরা, তোর রাখনা কথা

পরাণে সয়না রে।’

এ ছাড়া ‘ঘরজামাই’ নামে নজরুলের রচিত আরেকটি লেটো গানে পাওয়া যায়,

‘খেতে এসে পাই না খেতে

আলিস লাগলে পাই না শুতে

বিছনা আমার ঢিকশালেতে, মশা মারি তালে তালে ।

বৌ-এ মারে নাক ঝামটা,

রেগে গেলে নাচে খেমটা

আবার গাছ কোমরে ধরে ঝাঁটা,

বলে পিঠের তুলবো ছাল।’

লেটো পালার গানে কৌতুক বিষয়টি ছিল সব শ্রেণির জন্যই উপজীব্য। নজরুলের লেটো গানে আছে,

‘আমার কান দুটো ধরে, বলে গেছে বাবা,

পরের উপকার করিস না।

ছেঁড়া জুতো পরে বরযাত্রী যাবি,

ভালো দুটো পেলে বদলিয়ে নিবি,

পায়ে ভরে সোজা বাড়ি চলে আসবি,

পিছন ফিরে তাকাবি না ।

ওরে পরের মাকে, নিজের মা ভাববি,

পরের বোনকে নিজের বোন মনে করবি।

ওরে পরের বৌকে,

নিজের বৌ মনে করিস না;

যদি করিস তা হলে,

মার খেয়ে চামড়া থাকবে না ।’

বিচিত্র জীবন নজরুলকে বৈচিত্র্যময় সাহিত্য রচনায় উৎসাহিত করেছিল। গাড়োয়ানদের সাথে থাকার সময় নজরুল লিখেছিলেন ‘গোড়োয়ানী উল্লাস।’

‘কলগাড়ী যায় ভোঁদর ভোঁদর হাওয়া গাড়ি খুচুর খুচ

ছ্যাকরা গাড়ি খসড় ফসড় ঝড়াং ঝড়াং ঘুচুর ঘুচ।’

এখানে ভোঁসর, খুচুর খুচ, ঘসড় ফসড় কিম্বা ঝড়াং শব্দগুলো তৎকালীন সাহিত্যবোদ্ধাদের ঠিক পছন্দ ছিল না। সেই সময়কার সাহিত্যে এসব ‘গ্রাম্য’ ভাষার স্থানও ছিল না। তবু নজরুল আরবি সাহিত্যের উপমার সাথে সাথে বাস্তব জীবনে প্রচলিত কিন্তু সাহিত্যে অপ্রচলিত শব্দগুলোকে তুলে এনেছেন আশ্চর্য নৈপুণ্যে।

যেমন চুলকানি শব্দটিকে ‘খাউজানি’ লিখেছেন গভীর মমতায়। নজরুল উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, খোসপাঁচড়া ‘খাওজাইয়া’ গ্রামীণ মানুষ মনের মতো করে যা প্রকাশ করতে পারে ‘চুলকানি’তে তা মেটে না।

‘খাওজাইয়া খাওজাইয়া মরলাম মাগো মা খোচপাঁচড়ায়

যেন কাবলিওয়ালা হালুম বাঘা কুত্তা মেখুর আঁচড়ায়।

ইচ্ছা করে হালায় আমার এই যে দেহ খইস্যা

ধইর‌্যা এক্কুরে শেষ কইর‌্যা দিই কইস্যা কইস্যা ঘইস্যা,

ময়লা কাপড় লইয়া টোবি ঘাটে যেমন আছড়ায়।

ফোট হইছে, গোট হইছে, অঙ্গে ধরছে পোক

ইন্দ্রের লাহান গায়ে যেন হইছে হাজার চোখ,

হ্যাঁচড় দিমু কি মাদার গাছে, বেত-বনে, গাছ-গাছড়ায়।

আমার সারা গায়ে যেন বড়ি দিছে কোন আভাগ্যা বুড়ি,

পক্ষীর দল ঠোকরাইয়া খায় আমি হাত-পা ছুঁড়ি,

প্যাঁচা ভাইব্যা এক লাখ কাওয়া আমারে যেন খ্যাঁচড়ায়।’

এমন আরেকটি লেটো গানে আছে,

স্বামী : কোথায় গেলে পেঁচামুখী একবার এসে খ্যাচ-খ্যাচাও।

স্ত্রী : বলি, গাই-হারা বাছুরের মতন গোয়াল থেকে কে চ্যাঁচাও।

শুধু সাহিত্যেই নয়, বাউণ্ডুলেপনার সাথে রসবোধের সমন্বয় ঘটেছিল নজরুলের জীবনে। শিল্পী আব্বাসউদ্দিনের জীবনীতে এমন একটি ঘটনার উল্লেখ করা আছে।

অসামান্য প্রতিভাবান কবি কাজী নজরুল ইসলাম যখন ইসলামী হামদ, নাত, গজল রচনা শুরু করলেন, সে সময়কার একটি ঘটনা।

আব্বাসউদ্দিন একদিন সকালে তাঁর বাসায় গেলেন। গিয়ে দেখেন গভীর মনোযোগ দিয়ে তিনি কী যেন লিখছেন। নজরুল ইশারায় আব্বাসউদ্দিনকে বসতে বললেন। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর জোহরের নামাজের সময় হলে আব্বাসউদ্দিন উসখুস করতে লাগলেন।

নজরুল জিজ্ঞেস করলেন ‘কী, তাড়া আছে? যেতে হবে?’

আব্বাসউদ্দিন বললেন ‘ঠিক তাড়া নেই, তবে আমার জোহরের নামাজ পড়তে হবে। আর আজ এসেছি ইসলামী গজল নেবার জন্য। তোমাকে সেই দুদিন আগে বলে রেখেছিলাম। গজল না নিয়ে আজ যাব না।’

উল্লেখ্য, নজরুলের বাউণ্ডুলে স্বভাবের কারণে সবাই এইভাবে ধরেবেঁধে তাঁর কাছ থেকে লেখা আদায় করত।

নামাজ পড়ার কথা শুনে নজরুল তাড়াতাড়ি একটি পরিষ্কার চাদর তাঁর ঘরের আলমারি থেকে বের করে বিছিয়ে দিলেন। এরপর আব্বাসউদ্দিন জোহরের নামাজ শেষ করার সাথে সাথে নজরুল আব্বাসউদ্দিনের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন ‘এই নাও তোমার গজল।’ বলে খুব হাসতে লাগলেন।

আব্বাসউদ্দিন বিস্ময়ের সাথে দেখলেন, তাঁর নামাজ পড়ার সময়টুকুতে নজরুল সম্পূর্ণ নতুন একটি গজল লিখে ফেলেছেন।

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত