বুলগানিনবাবুর বস্তুবাদ

বুলগানিনবাবু জানেন টেবিল থেকে তার ঊনিশশো ছেষট্টি সালের জিওমেট্রি বক্সটা ফেলে দিলেই এই জ্বর সেরে যাবে। আর তাতেও জ্বর না কমলে ঊনিশশো বাষট্টি সালের পেন্সিল বক্সটা উল্টে রাখলেই হবে। তিনি এও দেখেছেন সেই কবেকার পুরোনো রাজশেখর বসুর চলন্তিকা তাক বদল করে রাখলেও জ্বর কমে। যদি এগুলোতেও জ্বর না সারে তাহলে তিনি উল্টে দেন এটা-সেটা, স্থান বদল করেন জিনিসপত্রের, কিছু জিনিস হাত থেকে ফেলে দিয়ে দেখতে থাকেন। একটা না একটা লেগে যায় আর জ্বর কমতে থাকে।
শুধু জ্বর নয় এই জগত সংসারের যাবতীয় ঘটনা বুলগানিনবাবু নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন আশে পাশের বিভিন্ন বস্তু নাড়া-চাড়া করে, ওলট-পালট করে। কিন্তু ব্যাপারটা খুব সহজ নয়। কোন ঘটনায় যে কোন জিনিসটার নাড়াচাড়ায় ঘটনার গতি প্রকৃতি বদলে যাবে তা খুঁজে বার করা এক দুরূহ ব্যাপার। সত্যি বলতে কী সব সময় যে বুলগানিনবাবু তা খুঁজে পান তাও নয়। চুরাশিতে যখন শিখবিরোধী দাঙ্গা চলছিল, তখন তিনি অনেক চেষ্টা করেও সঠিক বস্তুটি খুঁজে পাননি। একই রকম হয়েছিল নব্বইয়ের হায়দ্রাবাদ দাঙ্গা আর বিরানব্বইতে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর বোম্বাইয়ের দাঙ্গায় সময়। এই দাঙ্গাগুলোর সময় বুলগানিনবাবু প্রাণপণে চেষ্টা করেছেন সঠিক জিনিসটা খুঁজে বার করতে কিন্তু পাননি।
এমন নয় যে জিনিসগুলো খুব গোপন কিছু। জিনিস বলতে চারপাশে ছড়ানো সাধারণ জিনিসগুলোই। হয়ত সেটা একটা গ্লাস বা চিরুণী বা বোরোলীনের টিউব বা বাথরুমের মগ বা দাঁড়ি কামানোর রেজারটা – এই রকম সব জিনিস। প্রতিটা জিনিসের সাথে বুলগানিনবাবু তিনটি কাজ করেন। প্রথমে জিনিসটা তার জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে রাখেন তাতে কাজ না হলে জিনিসটা আগের জায়গাতেই উল্টে রাখেন। এতেও কাজ না হলে জিনিসটা মেঝেতে বা মাটিতে ফেলে দেন ওপর থেকে। যদি এই তিনটে কাজেও কোনও ফলাফল দেখা না যায় তাহলে তিনি বুঝে যান সেটা সঠিক জিনিস নয়। তখন তিনি অন্য জিনিস নিয়ে কাজ করেন। কখনো বুলগানিনবাবু অল্প চেষ্টাতেই জিনিসটা পেয়ে যান আবার কখনো দিন দুয়েক বা দিন কুড়ি সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রেই অবশ্য তিনি জিনিসটা পান না। তবে কার্গিল যুদ্ধের সময় বুলগানিনবাবু একেবারে প্রথম থেকেই লেগে ছিলেন লাগাতার তিন মাস। দশ জুলাই রাতে শোবার ঘরের দেওয়াল ঘড়িটা সরিয়ে বাইরের ঘরে টাঙিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। পরের দিনই বাতালিকের শিখরগুলো দখল করে নিয়েছিল ভারতীয় সেনারা। তিন দিন পরে অপারেশন বিজয়ের সাফল্য ঘোষণা হয়।
বুলগানিনবাবু এখন নিজের বা পরিবারের দরকারে এই সব কাজ করেন না। আগে কিছু কিছু করেছেন যেমন প্রথমেই বলা হয়েছে নিজের জ্বর সারানোর কথা। শুধু নিজের নয় ছোটোবেলায় কেউ অসুস্থ হলেই বুলগানিনবাবু তার এই ক্ষমতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করতেন। বড় হয়ে ওঠার সাথে সাথে তার মনে হল এটা এক ধরণের সিদ্ধাই আর নিজের স্বার্থের কাজে লাগালে এই ক্ষমতা কমে যাবে তার, চাই কী চলেও যেতে পারে। তাই বুলগানিনবাবু শুধু দেশের সংকটে এই ক্ষমতা কাজে লাগাবার চেষ্টা করেন, বিশেষত দাঙ্গার সময়। এর পেছনে হয়ত তার চৌষট্টি সালের দাঙ্গার স্মৃতি কাজ করে। তখন তিনি নয়-দশ বছরের বালক। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থান সহ গোটা চব্বিশ পরগণা জুড়েই ছড়িয়েছিল দাঙ্গা-হাঙ্গামা আর তার আতঙ্ক। কাতারে কাতারে লোক রাতারাতি উদ্বাস্তু হয়ে চলে এসেছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে। এই আতঙ্কের ঢেউ বাদুড়িয়ার এক অখ্যাত গ্রামেও এসে আছড়ে পড়েছিল। ছোটোবেলার সেই আতঙ্ক হয়ত তার অবচেতনে দাঙ্গা রোখার একটা ইচ্ছে জাগিয়ে তোলে।
বুলগানিনবাবুর বাবা লাল পার্টি করতেন। পঞ্চান্ন সালে কলকাতায় নিকিতা ক্রুশ্চেভ আর নিকোলাই বুলগানিন এসেছিলেন। দমদম বিমানবন্দরের বাইরে থিকথিকে ভিড়ে সোভিয়েতের পতাকা নিয়ে হাজির ছিলেন বুলগানিনবাবুর বাবা। লিমুজিন গাড়িতে চেপে দু’জনকেই তার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়তে দেখেছিলেন তিনি। লাখে লাখে লোককে সেদিন হাজির করা হয়েছিল কলকাতায়। একটু এগোতে না এগোতেই ভিড়ের বহর দেখে দু’জন অতিথিই আশ্রয় নেন পুলিশের রেডিও ভ্যানে। তাই রাস্তার ধারে ভিড়ের মধ্যে অনেকেই সেদিন বুলগানিনবাবুর বাবার মত বুলগানিনকে বা ক্রুশ্চেভকে দেখার সৌভাগ্য হয় নি। এর কিছুদিন পরেই বুলগানিনবাবুর জন্ম এবং সেই সময় জন্ম নেওয়া আরো কিছু বাচ্চার মতোই তার নাম রাখা হয় নিকোলাই বুলগানিনের নামে। দীর্ঘ বাম শাসনযুগের জন্য নাম নিয়ে তাকে খুব একটা ট্যাঁরাব্যাঁকা কথা শুনতে হয় নি। যখন বামযুগের অবসান হল তখন বুলগানিনবাবু রিটায়ারমেন্টের কাছে এসে গেছেন আর নিজের স্বদেশে ক্ষমতার অলিন্দ থেকে সরিয়ে দেওয়া প্রয়াত নিকোলাই বুলগানিনও কবেই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছেন। বাবা পার্টি কর্মী হলেও বুলগানিনবাবুর দ্বন্দমূলক বস্তুবাদের প্রতি কোনো আগ্রহ ছিল না। চৌষট্টির দাঙ্গার কিছু পরেই তিনি তার সিদ্ধাই আবিষ্কার করেন এবং তার নিজস্ব বস্তুবাদ গড়ে তোলেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে কোনো পুজোতে ব্যবহার্য প্রতিটি জিনিস রাখার আর ব্যবহারের নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। তার সিদ্ধান্ত ছিল সহজ। যদি এর জন্য পুজোয় প্রভাব পড়ে তাহলে অন্য যে কোন বস্তুর নির্দিষ্টভাবে রাখলে তার প্রভাব এই বিশ্ব চরাচরে কোথাও না কোথাও পড়বেই। বুলগানিনবাবু তার এই সব সিদ্ধান্ত এবং নিজস্ব বস্তুবাদের কথা গোপন রেখেছেন চিরকাল। কখনো কাউকে বলেন নি। তার দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ পেলে এই বিদ্যা লোপ পাবে।
বর্তমানে বুলগানিনবাবু পেনশনভোগী। আর এই অখন্ড অবসর জীবনে তিনি তার বস্তুবাদকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াসে ব্যস্ত থাকেন। আগে শুধু দেশের সমস্যাতেই তিনি বস্তুবাদ প্রয়োগ করার চেষ্টা করতেন এখন তিনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তা প্রয়োগ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আজ এই তীব্র জ্বরের ঘোরের মধ্যে তিনি শুনতে পাচ্ছেন গাড়ির আওয়াজ। বুঝতে পারছেন কদিনের চলতে থাকা অশান্তিকে দাঙ্গার রূপ দিতে লোক ঢুকে আসছে এলাকার বাইরে থেকে। এবার বেছে বেছে বিশেষ কোনো সম্প্রদায়ের দোকানগুলোকে জ্বালিয়ে দেবে ওরা যাতে ওদের জ্বালানো আগুনের চেয়েও গরম হয়ে ওঠে সেই সম্প্রদায়, গোষ্ঠীর লোক। তাদের বুকেও জন্ম নেবে প্রতিশোধের আগুন, হাতে উঠে আসবে হাতিয়ার।
বুলগানিনবাবু শুনতে পাচ্ছেন চীৎকার, নাকে এসে লাগছে কেরোসিনের গন্ধ। জ্বরের ঘোরে ঘরে চরকির মতো ঘুরছেন বুলগানিনবাবু। এটা ফেলছেন, ওটা উল্টে রাখছেন কিন্তু আর সময় নেই। এতদিন যে দাঙ্গা দূর থেকে থামানোর চেষ্টা করেছেন তিনি সেই দাঙ্গা আজ আবার সেই ছোটোবেলার মতো বাড়ির দোরগোড়ায় এসে পড়েছে। বুলগানিনবাবুর সহসা মনে পড়ল কীভাবে বাবা তখন লোকদের একজোট করে সবার মনে বল জুগিয়েছিলেন, রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।
অসহায় আক্রোশে টেবিল থেকে টান মেরে সব ফেলে দিলেন বুলগানিনবাবু। কোনো জিনিসই হাতে তুলে আজ তিনি এই দাঙ্গা আটকাতে পারছেন না। জ্বরের ঘোরেও জানলা দিয়ে তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন বসিরের দোকানে ওরা কেরোসিন ঢালছে। তিনি শুনতে পেলেন তার ছেলে, বৌমা, নাতির সিঁড়ি দিয়ে ছুটে ওঠার আওয়াজ। ওরা ছুটে এসে ঘরের দরজা আর জানলাগুলো বন্ধ করতে লাগল। তাদের কোনো ভয় নেই। এরা মুসলিমদের দোকান-ঘর লুঠতরাজ করতে এসেছে। তাদের শুধু ঘরের মধ্যে চুপ বসে থাকলেই হবে। কিছু না দেখলেই হল।
ঘরের কোণ থেকে বাবার সেই পু্রোনো লাঠিটা তুলে নিয়ে ছেলেকে খুব ঠান্ডা স্বরে বুলগানিনবাবু বললেন, ‘খোকা দরজাটা খুলে দে।’

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত