সম্পাদক ও ব্যক্তি রমাপদ চৌধুরী

Reading Time: 4 minutes

।।রাজা মিত্র।।

শুনেছিলাম তাঁর সাহিত্যকর্মে যতই রসের প্রস্রবন প্রবাহিত হোক না কেন, বাংলা সাহিত্যে অগ্রগণ্য এই মানুষটি আপাতদৃষ্টিতে ছিলেন কঠোর কুলিশ একটি ব্যক্তিত্ব। কিছুদিন আগে সাহিত্য আকাদেমির একটি অনুষ্ঠানে সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ জানালেন, তরুণ বয়সে তিনি একটি গল্প এবং খ্যাতনামা একজন সাহিত্যিকের সুপারিশপত্র নিয়ে তৎকালীন আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয় বিভাগে রমাপদ চৌধুরীর সমীপে হাজির হয়েছিলেন। রমাপদবাবু ঐ সুপারিশপত্র না পড়েই কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলে বলেছিলেন, ‘এসব কী? লেখাটা ঐ টেবিলে রেখে যান।’ বলা বাহুল্য, বুদ্ধদেব গুহ অতঃপর পালিয়ে আসার পথ পাননি। আমার অভিজ্ঞতা অবশ্য অন্যরকম। ওঁর লেখা ‘ছাদ’ উপন্যাসের সিনেমা স্বত্ব সংগ্রহ করাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। তবু আমি কিছুটা শঙ্কিত ছিলাম এই কারণে যে, আমার হাতে অগ্রিম হিসেবে কিছু টাকা দেওয়ার মতো ছিল না, এবং আমি শুনেছিলাম উনি টাকা পয়সার ব্যাপারে যথেষ্ট পার্টিকিউলার। যাই হোক, ওঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের দিনে আমার সঙ্গে যে কথোপকথন হয়েছিল তা হল-

-কী ব্যাপার? কি চাই? -ইয়ে মানে, আপনার লেখা একটি কাহিনীর চিত্রস্বত্ব কিনতে চাই। -আমার কোন লেখা? -আপনার ‘ছাদ’ নামে ঐ ছোট উপন্যাস… -ছাদ…ছাদ নিয়ে কি সিনেমা হয়? -হয় বলেই তো আমি ওটার চিত্রস্বত্ব কিনতে এসেছি। -আচ্ছা, তা আপনি আগে কোনো ছবি করেছেন? -করেছি অনেক…একটি জীবন, নয়নতারা… -ঐ ছবিগুলো আপনি করেছেন! তাহলে তো কথাই নেই। বসুন বসুন…চা খাবেন তো? -কিন্তু ইয়ে…মানে, আপাতত আমি বায়না হিসেবে কোনো টাকা দিতে পারবো না, পরে দেবো। – দিতে হবেনা এখন। যখন সুবিধে হবে, তখন দেবেন। – তাহলে আপনি একটু লিখিত অনুমতিপত্র দিন। উনি নিজের লেটারহেড প্যাড বের করে আমাকে প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র লিখে দিলেন। -কিন্তু ঐ চিত্রস্বত্ব দেওয়ার জন্যে আপনাকে কত দিতে হবে? – আপনার যা খুশি…পাঁচ-দশটা টাকা দিলেও চলবে। -কিন্তু এই ছবি যদি তেমন ভালো না হয়? – এ ছবি যদি ঝুলেও যায়, তাতেও কিছু যায় আসে না। আপনার সুনাম ঠিকই থাকবে। এই নিন আমার কন্সেন্ট।

এই কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে আশা করি মানুষ রমাপদ চৌধুরীকে বুঝে নিতে অসুবিধে নেই। ‘ছাদ’ কাহিনী নিয়ে যে ছবিটি আমি করেছিলাম তার প্রযোজক ছিল দূরদর্শন এবং সেই কারণেই আমি ছবিটি হিন্দিতে করতে বাধ্য হয়েছিলাম, এবং মুখ্য চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যাকেও তাঁর প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও অভিনয় করতে রাজি করাতে পেরেছিলাম। রমাপদ চৌধুরী অন্যান্য বাঙালি সাহিত্যিকদের তুলনায় খুব বেশি লেখেননি। আমরা তরুণ বয়সে অপেক্ষা করে থাকতাম পূজা সংখ্যায় তাঁর উপন্যাসটি প্রকাশিত হবার জন্যে। এছাড়াও বহুকাল আগে ওঁর লেখা একটি ছোটগল্প- ‘ভারতবর্ষ’ পড়ে আমরা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম যে এই প্রতীকী গল্পে তিনি ভারতবর্ষের বিদেশি সাহায্য বা অনুদান নেওয়ার নির্লজ্জ প্রবণতা তিনি কীভাবে বিবৃত করেছিলেন। সেই থেকেই আমরা তাঁর সাহিত্যের অনুরাগী। বাংলা সাহিত্য বহু অগ্রগণ্য সাহিত্যিককে জনসমক্ষে পরিচিত ও উপস্থাপিত করার ক্ষেত্রে আনন্দবাজার গোষ্ঠীর অবদান অনস্বীকার্য। তার অন্যতম কৃতিত্ব ওদের সম্পাদকমডলী। ওদের বহুল প্রচারিত সাহিত্য পত্রিকা ‘দেশ’-এর সম্পাদক সাগরময় ঘোষ প্রবাদপ্রতিম একজন মানুষ। প্রকাশক বাদল বসুও এ প্রসঙ্গে স্মরণীয় বলা যেতে পারে। ছোটগল্প নির্বাচন ও প্রকাশের ক্ষেত্রে বিমল করও একই কৃতিত্বের দাবিদার। রমাপদবাবু ছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার ‘রবিবাসরীয়’ বিভাগটির সম্পাদনার দায়িত্বে। বহু প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের বয়ানে তাঁর ঐ সম্পাদনকর্মের বৈশিষ্টের কথা শুনেছি। লেখা নির্বাচনের ব্যাপারে তিনি ছিলেন নিরপেক্ষ ও নির্মম। কারোর সুপারিশ, ব্যক্তিগত অনুরোধ বা কোনো ধরনের সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাতিত্বের দোষে তিনি দুষ্ট ছিলেন না একেবারেই। এই কারণেই ঐ বিভাগটিকে তিনি একটি বিশেষ মাত্রায় উন্নীত করতে পেরেছিলেন। যেখানে শুধুমাত্র উত্তীর্ণ রচনাগুলিই প্রকাশিত হতে পারতো।

রমাপদ চৌধুরীর ওপর তথ্যচিত্র নির্মাণের প্রসঙ্গঃ

একদা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে আমি বলেছিলাম রমাপদ চৌধুরীকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের প্রযোজনার কথা। সুনীলদা তখন সাহিত্য আকাদেমির সভাপতি। সুনীলদা বলেছিলেন, প্রচার এবং সাহিত্যসভা বিমুখ ঐ মানুষটিকে আমি যদি রাজি করাতে পারি তাহলে সাহিত্য আকাদেমি ঐ ছবি প্রযোজনা করতে পারে। আমিও কপাল ঠুকে আগেরবারের মতোই ওঁর ওপর ছবি নির্মাণের প্রস্তাব দিলাম, এবং এও বললাম ওঁর কাহিনী ‘ছাদ’ নিয়ে আমি একটি হিন্দীতে টেলিফিল্ম করেছি কয়েক বছর আগে। ছবিটির নামকরণ হয়েছিল ‘অহঙ্কার’ এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে আমি রাজি করাতে পেরেছিলাম হিন্দিতে সংলাপ বলাতে ইত্যাদি ইত্যাদি। উনি সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন। তবে মত দিলেন এই বয়সে তিনি বেশি দৌড়োদৌড়ি করতে পারবেন না। আমি বললাম অবশ্যই। আপনি আপনার শৈশবের কথা, ছাত্রজীবন, যৌবন অতিক্রম করে এই বয়সে পৌঁছনো পর্যন্ত যা-ই আপনার কাছে উল্লেখযোগ্য মনে হবে সেই সব কথা বলবেন। এইভাবেই ওঁর পারিবারিক এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে দু-তিন দিন ধরে ছবির মূল ভিসুয়াল প্রস্তুত হলো। এরপর আমি উনি যে সব ঘটনার কথা উল্লেখ করলেন সেই প্রাসঙ্গিক ছবি বা দৃশ্যকল্প কাট অ্যাওয়ে করে করে একটি এক ঘন্টার মতো দৃষ্টিনন্দন চলচ্চিত্র নির্মাণ করলাম। ওঁর এই দীর্ঘ আত্মকথনের মধ্যে দিয়ে সমাজ ও সাহিত্য বিষয়ক ওঁর দৃষ্টিভঙ্গী এবং কয়েকটি বিশেষ বিশ্লেষণ প্রতিভাত হয়েছে। সত্যি বলতে কী, সম্পাদক লেখক এবং সমাজ সচেতন মানুষ হিসেবে যে দীর্ঘ সময় তিনি অতিক্রম করে এসেছেন তার একটি প্রামাণ্য দলিল এই দৃশ্যায়নে চিরায়ত হয়ে রইল। সত্যি বলতে কী এমন নিরহঙ্কার, অকপট, এত স্বচ্ছ আত্মকথন এর আগে আমি কোনো প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিককে বলতে শুনিনি। শুনিনি এদেশের এবং বিদেশের যাবতীয় সাহিত্য পুরস্কার প্রাপকের হাতে অচঞ্চল, অবিচলিত মানসিকতা। যিনি বলেন, ভারতে শিল্প বিপ্লব যদি কিছু হয়ে থাকে তবে তা করেছে ভারতীয় রেলপথ। যিনি বলেন তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রেরণা কোনও সাহিত্যিক নন; একজন কবি-জীবনানন্দ দাশ। তাঁর ধ্যান ও ধারণার গভীরতা আমরা কোন নিরিখে বিচার করব।

বন্ধুদের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করে লেখার ক্ষেত্রে প্রবেশ ও প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক হয়ে ওঠার বিবৃতি তিনি অকপটভাবে বিবৃত করেছেন। এরকম ঘটনা আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও জানি- তিনি ‘অতসীমামী’ গল্প লেখার সুবাদে সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলেন এবং অগ্রগণ্য সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। রমাপদ চৌধুরীর সাহিত্যিক হিসেবে সূচনাপর্বের প্রতিষ্ঠার প্রামাণ্য বিবরণ আমি এই ‘একজন লেখক বলছেন’ এই শিরোনামে চিত্রায়িত করেছি মাত্র। সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব নিয়ে আলোচনা করার অধিকার আমার আছে বলে আমি মনে করি না। সে বিচার করবে- কাল…আবহমান কাল।

কৃতজ্ঞতাঃ নন্দঘোষ লেন

.

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>