বাংলায় নবজাগরণের দূত রামমোহন

আজ ২২ মে সমাজ বাংলা নবজাগরণের অন্যতম নায়ক রাজা রামমোহন রায়ের জন্মজয়ন্তী। ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


।।বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য।।

তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন আধুনিক এক ভারতের। দেশের মানুষকে অতীতমুখী, মধ্যযুগীয় মানসিকতার গণ্ডি থেকে বের করে এনে এক নতুন যুগের জীবন দর্শনের আলো দেখানোই ছিল উদ্দেশ্য। গভীর ইতিহাস চেতনা, দৃঢ়তা আর ঈশ্বরবিশ্বাস তাঁর জীবন সংগ্রামে বার বার প্রকাশ পেয়েছে। তবু, তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্য তৎকালীন হিন্দু পণ্ডিতসমাজ তাঁকে ‘পাষণ্ড’, ‘ম্লেচ্ছ’, ‘বকধূর্ত’, ‘কাপটিক’, কিংবা ‘নগরান্তবাসী’ নামে সম্বোধন করেছিলেন। এমনকী, এক সময় হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের গোঁড়া, ধর্মান্ধ, অসহিষ্ণু কিছু মানুষ তাঁর প্রাণনাশেরও চেষ্টা করেছিল। সে জন্য তাঁকে কম হেনস্থাও হতে হয়নি। তবু, চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষকে ভালবেসে, বদ্ধ এই সমাজের মধ্যে আলোড়ন তুলে তিনি চেয়েছিলেন সমাজ ব্যবস্থার ক্ষতিকারক নানা দিক বদলে ফেলতে।— তিনি রাজা রামমোহন রায়।

এক যুগ সন্ধিক্ষণে রামমোহনের জন্ম— সে সময় ভারতের ইতিহাসে মধ্যযুগের অবসান শুরু হয়েছে তবু জীবনের সর্বস্তরে আসন্ন নতুন যুগকে বরণ করে নেওয়ার মতো উদারতা কিংবা সাহস খুব কম মানুষেরই ছিল। আর কঠোর জীবন সংগ্রামের মধ্যে রামমোহন হয়ে উঠেছিলেন ঊনবিংশ শতকের বাংলার নবজাগরণের অন্যতম এক নায়ক। ১৭৭২-এর ২২ মে, হুগলি জেলার রাধানগরে তাঁর জন্ম। পালপাড়া গ্রামের নন্দকুমার বিদ্যালঙ্কার বা হরিহরানন্দ তীর্থস্বামী কৈশোরেই রামমোহনের মধ্যে আধ্যাত্মিক চিন্তার বীজ রোপন করেছিলেন। পরে পটনায় আরবি এবং কাশীতে সংস্কৃত শিক্ষা লাভ করেন।

কর্মজীবনের প্রথম দিকে রামমোহন পৈতৃক জমিদারির দেখাশোনা করতেন, পরে ১৭৯৬-এ নাগাদ কলকাতায় জোড়াসাঁকো অঞ্চলে এসে জমি, বাড়ি, বাগানের মালিকানা লাভ করেছিলেন। পরে অবশ্য ১৮১৪ থেকে তিনি কলকাতায় বসবাস শুরু করেন এবং চৌরঙ্গী ও মানিকতলায় সম্পত্তিও কিনেছিলেন।

আনুমানিক ১৮০৩-০৪ সালে রামমোহন মুর্শিদাবাদ গিয়েছিলেন। সেখানেই আরবি ও ফারসি ভাষায় একেশ্বরবাদ বিষয়ে তাঁর প্রথম লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘তুহফাৎ উল মুবাহ‌্‌হিদ্দীন’।

রামমোহনই প্রথম বাঙালি তথা ভারতীয় মনীষী যিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রের আড়ালে থাকা জ্ঞানবিজ্ঞান এবং নানা প্রকার প্রয়োগবিদ্যার বৃহৎ সভ্যতা এ দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারে। যদিও ব্রিটিশদের শোষণনীতি তিনি কখনও সমর্থন করেননি। তবুও রামমোহন মনে করতেন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন অন্তত কিছু সময়ের জন্য ভারতের পক্ষে লাভজনক হয়েছিল। কেননা আধুনিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হওয়ার জন্য দেশের মানুষের সঙ্গে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির যোগাযোগের একান্ত প্রয়োজন ছিল। আর আধুনিকতার সেই মন্ত্র এ দেশ রামমোহনের কাছ থেকে লাভ করেছিল।


রামমোহনের বাড়ি। বর্তমানে সংগ্রহশালা।

সতীদাহ প্রথা আইনত বন্ধ করার জন্য রামমোহন বদ্ধপরিকর হয়েছিলেন। সতীদাহ নিয়ে চূড়ান্ত বিতর্ক বিবাদের ফলে তৎকালীন রক্ষণশীল হিন্দুসমাজ ক্রমেই রামমোহনের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ হয়েছিল। ১৮৩০-এর ১৭ জুন, সংস্কৃত কলেজে এক সভায় হিন্দুধর্ম রক্ষার জন্য রাজা রাধাকান্ত দেব, রামকমল সেন, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ রক্ষণশীল নেতৃবর্গ ‘ধর্মসভা’-র পত্তন করেছিলেন।

এতে বেন্টিঙ্কের সহযোগিতায় সতীদাহ প্রথা রদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ পত্র জমা দেওয়া, কিংবা ব্যারিস্টার বেথিকে প্রিভি কাউন্সিলে মামলা লড়তে পাঠানো কোনও কিছুই বাদ যায়নি। অন্য দিকে, পুরস্কার স্বরূপ রামমোহন পেয়েছিলেন ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুৎসা আর নিন্দা। শুধু তাই নয়, সমাজে যাঁরা সতীদাহ প্রথা রদের আইনকে সমর্থন করে ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও ফতোয়া জারি হয়েছিল। তাঁদের সঙ্গে কেউ বিবাহ বা আহার করলে তিনি জাতিচ্যুত হিসেবে গণ্য হতেন। শোনা যায়, পরিস্থিতি এমনই হয়ে উঠেছিল যে রাস্তাঘাটে রামমোহনকে নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে চলাফেরা করতে হত। তাই, যত দিন না পর্যন্ত প্রিভি কাউন্সিল সতীদাহ প্রথা রদের বিরুদ্ধে রক্ষণশীল গোষ্ঠীর আবেদন পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছিল তত দিন রামমোহনকে দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছিল।

ইতিমধ্যেই রামমোহনের ব্যক্তিত্বের আকর্ষণে তাঁকে কেন্দ্র করেই একটি মিত্রগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। ১৮১৫-তে তাঁদের নিয়েই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ‘আত্মীয় সভা’। প্রতি সপ্তাহে এক দিন এর অধিবেশন হত বিভিন্ন সদস্যদের বাড়িতে। সেখানে উপস্থিত থাকতেন দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, গোপীমোহন ঠাকুর, কালীশঙ্কর ঘোষাল, রাজনারায়ণ সেন, কৃষ্ণমোহন মজুমদার, বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়, নন্দকিশোর বসু প্রমুখ। সেখানে শিবপ্রসাদ মিশ্র যেমন বেদ ও উপনিষদ পাঠ করতেন তেমনই গোবিন্দ মাল ব্রহ্মসঙ্গীত পরিবেশন করতেন। সেখানে জাতিভেদ, সতীদাহ, বহুবিবাহ, বিধবাবিবাহ প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা হত সদস্যদের মধ্যে।

বিশেষ উল্লেখযোগ্য ১৮১৬-তে এই সভারই এক অধিবেশনে ডেভিড হেয়ার হিন্দু কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব রাখেন। আর যে গোষ্ঠীটি আত্মীয় সভাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল ১৮২৮-এ ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠার পরে তা আরও উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছিল। তবে এই সভার সকলে কিন্তু রামমোহনের মতো সংস্কার বিষয়ে মুক্তমনা ছিলেন না। ‘আত্মীয় সভা’-য় সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে সমালোচনা হতেই বেশ কিছু সদস্য এর সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করেছিলেন। তবে দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রমানাথ ঠাকুর, হরিহর দত্ত, মথুরানাথ মল্লিক, কালীনাথ রায়চৌধুরী প্রমুখ এই আন্দোলনে রামমোহনকে শেষ পর্যন্ত সমর্থন করেছিলেন। এ ছাড়াও ডিরোজিওর তরুণ শিষ্যরা রামমোহনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তবে রামমোহন পরিণত বয়সে ব্যক্তিগত জীবনে খুবই নিঃসঙ্গ ছিলেন। তাঁর ছিল দুই পুত্র, রাধাপ্রসাদ ও রমাপ্রসাদ।


ব্রিস্টলে রামমোহনের সমাধিস্থল

সংবাদ মাধ্যমকে উন্নত করতে রামমোহন তিনটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। দ্বিভাষিক ‘ব্রাহ্মনিক্যাল ম্যাগাজিন ব্রাহ্মণ সেবদি’, বাংলায় ‘সংবাদ কৌমুদি’, ও ফরাসি ভাষায় ‘মীরাৎ-উল-আকবর’। রামমোহনকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয়। প্রায় ৩০টি বাংলা গ্রন্থের তিনি রচয়িতা। তাঁর রচিত ‘ব্রহ্মসঙ্গীত’, ‘গৌড়ীয় ব্যকরণ’ উল্লেখযোগ্য। শোনা যায়, সে কালের বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ কালীমির্জার কাছে রামমোহন সঙ্গীতশিক্ষা লাভ করে বাংলায় ধ্রুপদ রচনা করেছিলেন। পরে ব্রাহ্মসমাজে এই গান গাওয়ার প্রচলন হয়েছিল। ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে নিজ খরচে তিনি অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল স্থাপন করেছিলেন। এ ছাড়াও ইংরেজি ভাষায় হিন্দুধর্মের প্রতিশব্দ ‘হিন্দুইজম’ শব্দটি তাঁরই সৃষ্টি।

তিনি দিল্লির বাদশার দূত হিসেবে ইংল্যান্ডে তৎকালীন রাজার কাছে গিয়েছিলেন। সেখানে লি‌ভারপুল বন্দরে তিনি সংবর্ধিত হয়েছিলেন। ১৮৩২ সালের শেষের দিকে তিনি প্যারিসে গিয়ে সম্রাট লুই ফিলিপের দ্বারা সংবর্ধিত হয়েছিলেন।

আট দিনের জ্বর ভোগের পরে ব্রিস্টলে ১৮৩৩-এর ২৭ সেপ্টেম্বর রাজা রামমোহনের মৃত্যু হয়েছিল মাত্র ৬২ বছর বয়সে। তবে তাঁর মৃত্যুর কারণ আজও পরিষ্কার নয়। মৃত্যুর দশ বছর পরে দ্বারকানাথ ঠাকুর তাঁর সমাধির উপর একটি সুদৃশ্য স্মৃতি সৌধ তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন।

কৃতজ্ঞতাঃ এবিপি

 

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত